Home Naar e Ishq Naar e Ishq part 42

Naar e Ishq part 42

Naar e Ishq part 42
তুরঙ্গনা

অকস্মাৎ রোজির আগমনে কমবেশি সকলেই অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। অন্তত এই মূহুর্তে মেয়েটার আসা একদমই ঠিক হয়নি। এদিকে ড্রইংরুমের বিধস্ত অবস্থা ও জায়ান-কেকে’র গায়ে র’ক্ত দেখে সে আরো বেশি হতভম্ব হয়ে গেল। মনে মনে বিস্ময়ের সাথে আওড়াল,
“এরা কি এতক্ষণ মা’রামা’রি করছিল? কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব? হামিদ আর কেকে… তা-ও মারামারি?”
রোজি কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের ন্যায় কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে থাকার পর, ধীর পায়ে কয়েক কদম এগিয়ে এলো। বিস্ময়ের সাথে থমথমে গলায় বলল,
“কেউ কি আমায় বলবে এখানে কি হচ্ছে? তোমরা পাগল হয়ে গিয়েছ? নিজেদের মধ্যে এভাবে মারামারি করছো? কিন্তু কেনো?”
রোজি উত্তরের আশায় উৎসুক দৃষ্টিতে সকলের দিকে তাকাল। শেষমেশ কেকে’র দিকে তাকানোর আগেই, হুট করে সে দৃঢ় পায়ে উল্টো ঘুরে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় চলে গেল। তার এমন প্রস্থানে রোজির সন্দেহ আরো খানিকটা বাড়ল। সে সরাসরি সাদের দিকে তাকিয়ে, কিছুটা ক্ষিপ্ত স্বরে বলল,
“আর কেউ কিছু না বলুক, অন্তত তুমি তো বলো এখানে কি হয়েছে?”
মুহূর্তেই সাদ ইতস্তত করতে লাগল। সে রোজি’কে বলবেই বা কি। আর সবটা রোজিকে বলে দিলে মেয়েটার প্রতিক্রিয়াই বা কি হবে—সেসব ভাবতে ভাবতেই তার আবারও অক্কা পাবার দশা হলো।

কেকে রুমে এসেই দরজাটা লাগিয়ে দিল। মেজাজটা বেশ চড়া; ধ্বস্তাধস্তিতে হাত-পায়ের কিছুকিছু জায়গায় চোট লেগেছে। সে সোজা ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ানোর আগেই, ঘরের কোণ থেকে ব্যস্ত পায়ে হন্ত হয়ে এগিয়ে এলো সুহিন। কেকে’র আপাদমস্তক একঝলকে পরখ করে নিয়ে বলল,
“কি হয়েছে আপনার?…নিচে ওতো আওয়াজ…”
সুহিন নিজের কথা শেষ করতে পারল না। তার আগেই কেকে কড়া দৃষ্টিতে তার দিকে মুখ ফেরাল। কিন্তু রমনীকে অদ্ভুত এক সাজে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, তার বিগড়ানো মেজাজ খানিক স্তিমিত হলো। ভ্রু-যুগল কুঁচকে প্রশ্ন ছুড়ল,
“এসব কি পড়েছিস?”
সুহিন অপ্রস্তুত হয়ে নিজের দিকে তাকায়। পরনে একখান সাদা শার্ট আর নিচে তারই স্বামীর কালো রঙের টাউজার। জামাকাপড়ের কোনো উপায়ান্তর না পেয়ে ক্লোজেট হতে এসব বের করেই গায়ে জড়িয়েছে সে।
সুহিন শুকনো মুখে কেকে’র দিকে তাকিয়ে বলল,
“এখানে তো আমার পড়ার মতো কোনো কিছুই নেই। পড়ে আসা কাপড়গুলো ধুয়ে বারান্দায় দিয়েছি। আর শুধু শার্টে অস্বস্তি হচ্ছিল, তাই আপনার ক্লোজেট থেকে…”
সুহিন কথা অসমাপ্ত রাখল। কেকে একঝলকে রমণীর গায়ে আলুথালু হয়ে থাকা নিজের শার্ট-টাউজার পরখ করে নিয়ে বলল,

“ইউ লুক সো ফানি!”
কেকে’র অভিব্যক্তিতে ঠাট্টা রইলেও, সে হাসল না। বরং তার নিরেট গম্ভীর্যের মাঝে এমন একটা মন্তব্য শুনে সুহিন চোখদুটো সরু করল। চাপা রাগ দেখিয়ে বলল,
“ফানি মনে হলেও হাসবেন না। হাসতে ইচ্ছে করলে, আমার জামা-কাপড়ের ব্যবস্থা করে দিয়ে তারপর হাসুন।”
কেকে আর কথা বাড়াল না। পূর্বের ন্যায় মেজাজ নিয়ে নিজের ক্লোজেটের দিকে এগিয়ে গেল। নতুন একখান কালো শার্ট আর টাউজার বের করে, তোয়ালে নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল।
কেকে’র এমন ত্যাছড়া মেজাজ দেখে, সুহিন চোখের পলক ঝাপটে কিছু একটা ভাবল। দ্বিধাহীনভাবে পেছন হতে প্রশ্ন করল,
“বললেন না তো নিচে এতক্ষণ ধরে কি হচ্ছিল? আপনাদের ফ্রেন্ডশিপ তো অনেক ভালো।… তাহলে নিশ্চয় আমাকে নিয়ে কোনো ঝামেলা হয়েছে,তাই না?”
সুহিনের কথায় কেকে’র মেজাজটা অজান্তেই খানিক চটে গেল। সে ঘুরে দাড়িয়ে ললাটে বিরক্তির ভাজ ফেলে বলল,

“সবটা তো শুনেছিসই তবে, ড্রামা করার আর কি প্রয়োজন?”
সুহিনের খানিক মন খারাপ হলো। কিছু হোক বা না হোক,সব রাগ এসে তার উপরই ঝাড়বে। সুহিন ভারী শ্বাস ফেলে বলল,
“কোথায় শুনলাম? আপনিই তো রুম থেকে বের হতে নিষেধ করেছিলেন। এইজন্য আমি আর যাইওনি।”
—“ওয়াও, তুই কবে থেকে আমার এতো বাধ্য হলি?”
কেকে’র তাচ্ছিল্যে সুহিন মিনমিন করে বলল,
“না মানে, আপনি দরজাটা পেছন থেকে লাগিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন।”
তার কথা শুনে কেকে ভারী শ্বাস ফেলল। দরজা কখন লাগিয়েছে সেটাও তার মনে পড়ছে না। তবে রমণীর ভাবগাম্ভীর্য দেখে চাপা রাগের মাঝেই আওড়াল,
“তাই তো বলি…এনিওয়ে, নিচে কি হয়েছে ওসব নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে না। তুই তোর মতো থাক। বাকি সবটা আমি একাই হ্যান্ডেল করে নেবো।”

সুহিনের আর বুঝতে বাকি রইল না, নিচে এতক্ষণ ধরে খুব বড়কোনো গন্ডগোল হয়েছে। আর সেটা কি নিয়ে, তা-ও সে ভালোমতোই আন্দাজ করতে পারল। তথাপি সে এক বিশেষ কৌতূহল হতে জিজ্ঞেস করেই বসল,
“সত্যি বলতে, আপনি কিন্তু সবটাই ধোঁয়াশা করে রেখেছেন। সে-রাতেও আমি আপনাকে অনেকগুলো প্রশ্ন করেছিলাম কিন্তু আপনি কোনোটারই উত্তর দেননি।”
কেকে সুহিনের দিকে একমনে খানিকক্ষণ চেয়ে থাকে। সুহিন কিছুটা ঘাবড়ে যায়, কেকের প্রতিক্রিয়ায় কি হবে সে ভাবনায়। হুট করে না রেগে গেলেই হলো। কিন্তু তবুও সে বাহ্যিক অবয়ব দৃঢ় ও উৎসুক রেখে, কেকের উত্তরের অপেক্ষায় রইল।
কেকে তার আশংকা মোতাবেক কোনো প্রতিক্রিয়া করল না। বরং আচমকা হাতের কাপড়গুলো বিছানার দিকে ছুঁয়ে দিয়ে, সুহিনের মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। সুহিন পিছিয়ে যাবার আগেই, কেকে তার বাহু চেপে ধরে নিরেট গলায় বলল,
“তোরও সেসব এখনই জানতে হবে? এখনই মরে যাচ্ছি না তো আমি; একটু রেহাই দে আমায়।”
সুহিন অপ্রস্তুত হয়ে চুপসে গেল। ইতস্তত করে বলল,
“আমি আসলে সেভাবে কিছু বলতে চাইনি…আপনি আগে…’
সুহিনের কন্ঠস্বর থেমে থেমে আটকে যাওয়ায়, কেকে তার ভেতরের অবস্থাটা ঠিকই টের পেল। ভারী শ্বাস ফেলে রমণীকে নিজের দিকে খানিকটা টেনে নিয়ে, গলার ভাঁজে চুল গলিয়ে হাত পাঁচ’আঙ্গুলি গুঁজে দিল। তাকে নিবিড়ভাবে নিজের সাথে আঁকড়ে, রমণীর ছোট্ট মুখটা খানিক উঁচিয়ে তুলল। একরাশ অসহায়ত্ব নিয়ে বলল,

“ওয়াইফি! তুই আমাকে না বুঝলে, আমায় আর কে বুঝবে বলতো? কার কাছে যাবো আমি? পৃথিবীতে তুই ছাড়া আমার আর নিজের বলতে কেউ আছে? আমার বেটার হাফ তো তুই, তাই না? তাহলে কেনো আমায় বাকিদের মতোই বারবার ভুল বুঝিস, বলতো?”
সুহিন বাকহারা হলো। কি বলবে বুঝতে পারছে না। তবে এইটুকু নিশ্চিত, এই লোকটার ভেতরে আরো অনেক জটিল রহস্যের জটলা পেকে আছে। যা সে কোনোভাবেই কাউকে বলতে ইচ্ছুক নয়।
সুহিন নিজেকে স্থির রেখে শান্ত সুরে বলল,
“আমার কি দোষ বলুন…আপনি আমাকে নিজের ভাবেন অথচ কখনোই কিছু বলেন না। হয়তো আমি আপনার ভাষায় গাধা, কিন্তু এতোটাও অবোধ নই যে, আপনি বললে আমি বুঝব না আপনার ঠিক কি নিয়ে সমস্যাগুলো হচ্ছে। কেনো আপনি সবকিছু এতো ধোঁয়াশে করে রেখেছেন। কাউকে কিছু জানতেও দিচ্ছেন না, কোনোকিছুই বলছেনও না। এতো কিসের দুশ্চিন্তায় থাকেন আপনি, হ্যাঁ?
সুহিনের কন্ঠস্বর সামান্য জোরালো হওয়া মাত্রই কেকের ভ্রু-যুগল কুঁচকে গেল। ললাটে ভাজ ফেলে সুহিনকে ছেড়ে দিয়ে নিরেট স্বরে বলল,
“বেশি বুঝিস তুই! তোকে কে বলল আমি দুশ্চিন্তায় থাকি। আমার কোনো চিন্তাই নেই। থাকলেও সেটা তোর জন্য৷”

কেকে অদ্ভুতপূর্বক ভাবে খানিক গা-ছাড়া ভাব নিল।মুহূর্তেই সুহিন চোখদুটো ছোট ছোট করে ফেলল। মুখটা চাপা গাম্ভীর্যের আড়ালে ঢেকে গেল এক নিমিষেই। রমণী হঠাৎ ত্যাছড়া সুরে বলল,
“আপনি আসলেই একটা শীতলরক্তের প্রাণী।”
কেকে তার নির্লিপ্ততা কাটিয়ে রুক্ষ স্বরে শুধালো,
“হোয়াট ডু ইউ মিন?”
সুহিন নূন্যতম দ্বিধা না করে বলল,
“গিরগিটির কথা বলেছি। গিরগিটি যেমন ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলায়, আপনিও ঠিক তাই।”
কেকে দাঁতে দাঁত রেখে, কড়া সুরে বলল,
“একটু বেশিই বলছিস না? আদর করতে করতে গাধা থেকে বাদর হয়ে যাচ্ছিস?”
সুহিন বিরক্তি নিয়ে মুখের উপর বলল,
“আর আপনি কাউয়া থেকে গিরগিটি।”
কেকে দাঁত পিষে তার দিকে তেড়ে আসতে নিয়েও থেমে গেল। চোখ গরম করে সুহিনকে একপলক দেখে নিয়ে, বিছানা হতে জামাগুলো তুলে ওয়াশরুমের দিকে এগোতে এগোতে শাঁসালো,
“দাঁড়া ফ্রেশ হয়ে আসি একবার, তারপর তোকে দেখাচ্ছি মজা…!”
কেকে ওয়াশরুমে চলে যেতেই সুহিন মুখ ভেঙচিয়ে আওড়াল,
“আমি করলেই বেশি বেশি, নিজে করলে কিচ্ছু না।”

আয়নার সম্মূখে চুপচাপ কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সুহিন। চুলগুলো তার এখনো হালকা ভিজে। পিঠ ঘেঁষে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষ অতিযত্নের সাথে তার একগোছা চুল নিয়ে আলতোভাবে হেয়ারড্রায়ার দিয়ে শুকানোর বন্দবস্তে ব্যস্ত।
এক সকালেই দুবার গোসল সেরেছে কেকে। এতে খুব বেশি সমস্যা না হলেও, তার ঝাঁকড়া চুলগুলো আবারও ভেজাতে হয়েছে। গম্ভীর মুখে ওয়াশরুম থেকে ফিরে, হেয়ারড্রায়ার দিয়ে নিজের চুল শুকাতে গিয়েই হঠাৎ সুহিনের দিকে নজর পড়ে। কোনোকিছু না ভেবেই, হঠাৎ ধমকে ওঠে,
“এখনো চুল ভেজা রেখেছিস কি অসুখ বাঁধানোর জন্য?”
সুহিন তার ধমকে তৎক্ষনাৎ থতমত খেয়ে গেলেও, কেকের হাত থেকে নিস্তার পায়নি। সুহিন মানা করলেও, লোকটা তাকে শেষ অব্দি টেনেটুনে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে নিজের কাজ করে চলেছে। একটা সময় পর সুহিন অত্যাধিকমাত্রায় অস্থির হয়ে উঠে সরে আসতে চাইল,
“অনেক হয়েছে, আর কিছু করতে হবে না।”
কেকে কপাল কুঁচকে তাকে চেপে ধরে একজায়গাতেই স্থির দাঁড় করিয়ে রাখল। আয়নার প্রতিফলনে রমণীর শুকনো মুখের দিকে তাকিয়ে রুক্ষ স্বরে বলল,
“আর একটুই তো আছে, এতো ছটফট করছিস কেনো?”
সুহিন আয়নায় কেকের গম্ভীর মুখটার দিকে তাকিয়ে,মাথা নুইয়ে মিনমিন করে বলল,
“সুরসুরি লাগে…!”
সুহিনের কথা শুনে কেকের হাতটা থেমে গেল। ভ্রু কুঁচকে বলল,
“সিরিয়াসলি? গাধা একটা!”

বলেই সে হাত থেকে হেয়ারড্রায়ারটা রেখে দিয়ে, এবার রমণীর বাদামী কেশে চিরুনি চালালো। সুহিন বুঝতে পারছে না, এমন অদ্ভুত লোকের সংসার সে কিভাবে করবে। হুট করে এমন রূপের পরিবর্তনেই তো সে দিশেহারা হচ্ছে। লোকটা হঠাৎ তার সাথে এমন কেনো করছে। অবশ্য একটা বিষয় সুহিন নিজেও জানে—শুরু হতেই সে খেয়াল করেছে কেকে তার নিজের চুলের প্রতি কিছুটা দূর্বল। রমণীর বাদামী চুলে দূর্বলতা নাকি এতে তার প্রতি এই দুর্ধর্ষ পুরুষের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু লুকিয়ে তা সুহিনের বোধগম্য নয়। তবে বিষয়টা অদ্ভুত হলেও, সুহিন খানিকটা মজা পেয়েছে।
রমণীর এরূপ ভাবনার মাঝেই কেকে হঠাৎ আরেক প্রচেষ্টায় মেতেছে। সে চুলগুলোর গোছা কয়েকভাগ করে বিনুনি গাঁথার চেষ্টা করছে। তবে অনেকটাই বেগ পেতে হচ্ছে এ-কাজ করতে গিয়ে—যা তার চোখে-মুখে ফুটে ওঠা অস্থিরতাতেই স্পষ্ট।
আয়নায় সুহিন বিষয়টা লক্ষ করতেই, কপাল কুঁচকে বলল,
“আপনি এটা কি করছেন?”
এই প্রথমবার কোনো কাজে এতোবার ব্যর্থ হয়ে, কেকের চোখ-মুখ বিরক্তিতে কপালে উঠে যাচ্ছে। দাঁতে দাঁত পিষে সে বলল,

—“বিনুনি গাঁথে কিভাবে?”
সুহিন উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল,
“আপনাকে হঠাৎ বিনুনি গাঁথতে কে বলল?”
একনিমিষেই কেকে তার হাতজোড়া থামিয়ে দিয়ে, কিঞ্চিৎ বিরক্তি নিয়ে আয়নায় সুহিনের মুখটা দেখল। চুলগুলো পেছন হতে সুহিনের সামনের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল,
“তোর চুল তুই নিজেই বাঁধ, আমি আর পারব না। কিন্তু চুল খোলা রাখবি না কখনো!”
সুহিন মনে মনে বিড়বিড় করে,”আজব লোক! আমার চুল নিয়েও ওনার এতো সমস্যা?”
মুখে রমণী ভ্রু উঁচিয়ে প্রশ্ন ছুড়ল,
“কেনো? আমি চুল খোলা রাখলে আপনার কি সমস্যা?”
কেকে দূরে সরে যেতে যেতে নির্লিপ্তে আওড়াল,
“হুঁশ থাকে না।”
উত্তর শুনে পেছনে সুহিন তাজ্জব বনে দাঁড়িয়ে রইল। বিস্ময়ে আওড়াল,
“কিহ্?”
কেকে তৎক্ষনাৎ পেছনের দিকে ঘাড়টা ফিরিয়ে, কিঞ্চিৎ তির্যক মুচকি হেসে বলল,
~”তোর খোলা চুলে আমার নেশা ধরে যায়। যা আমার ক্ষতিকারক না হলেও তোর জন্য বিপদজনক।”
কেকে সুন্দরমতো কথাটা আওড়িয়ে, ফোনটা নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। পায়ের উপর পায় তুলে হঠাৎ গেইম খেয়াল মত্ত হলো সে।
এদিকে সুহিন দেরিতে হলেও, তার কথার আসল ইঙ্গিত বুঝে নিয়ে দাঁতে দাঁত চিপে বিড়বিড় করল,
“বদমাশ!”

সবটাই ঠিক ছিল। কেকে নিজের মতো বিছানায় গেইম খেলছে,আর অন্যদিকে সুহিন চুলগুলো সুন্দরকরে বিনুনি করছে। কিন্তু হুট করেই একটা পর্যায়ে সুহিনের হটাৎ বিশেষ কারোর কথা মনে পড়ে গেল। এক নিমিষেই সকল বিষন্নতা এসে একত্রিত হলো। সুহিন আনমনা হয়ে কেকের দিকে ফিরে বলল,
“শুনুন, একটা কথা ছিল।”
কেকে ফোনের স্ক্রিণে ঝড় তুলেছে যেন। একটু এদিক-সেদিক হলেই সবটা গন্ডগোল। তবে সুহিনের কথাটা শুনেও অগ্রাহ্য করার উপায় ছিল না তার। সে ব্যস্ত ভঙ্গিতে জবাব দিল,
“হুম, বলতে থাক।”
সুহিন কিছুটা ভেবে নিয়ে বিষন্ন মনে বলল,
“আপনি তো আমায় কিছুই বলেন না, তাই আমি জানিও না আপনার মাথায় কি চলছে। কিন্তু আমাকে তো আর এক সপ্তাহ পর দেশে যেতে হবে।”
কেকে রুক্ষ স্বরে প্রত্যুত্তর করল,
“তোর স্বামী এখানে, তুই দেশে গিয়ে কি করবি?”
সুহিন অপ্রস্তুত হয়ে ইতস্তত করে বলল,
“না মানে, সেটাই বলতে চাচ্ছিলাম যে…”

—“যা বলার ভালো করে বল।”
—“মাফিনকে রেখে এসেছি অনেকদিন হলো। ওকে ছাড়া আমার কোনো জায়গাতেই ভালো লাগে না। ওকে কি এখানে আনার কোনো ব্যবস্তা করা যেতে পারে?”
সুহিন খানিকটা মন খারাপ করেই কথাটা বলল। কিন্তু হঠাৎ করেই কেকের ভাবমূর্তি সম্পূর্ণ বদলে গেল। সে মাঝপথেই গেইমটা থামিয়ে দিয়ে, নড়েচড়ে বসল। তার অদ্ভুত ভাবগম্ভীর্য দেখে সুহিন অবাক সুরে বলল,
“কি হলো?”
কেকে কোনো কথা না বলে সুহিনের দিকে অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে তাকাল। বলল,
“কোন মাফিন?”
সুহিন শুকনো মুখে জবাব দিল,
“মাফিনকে চেনেন না? আমার মাফিন!”
কেকে হঠাৎ কিছু একটা ভাবতে বসল। পরক্ষণেই অস্থির হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে কোথাও যাওয়ার জন্য উদ্যত হলো। তার এমন তড়িঘড়ি অবস্থা আর অস্থিরতা দেখে সুহিন আরো বেশি অবাক হলো,
“কি আশ্চর্য, হঠাৎ করে আপনার কি হলো? এভাবে কোথায় যাচ্ছে?”
—“দুমিনিট ওয়েট কর এখনই আসছি। আর ওর যদি কিছু হয়ে-টয়ে যায় তবে আগেই সরি বলে নিচ্ছি। সত্যি বলছি, আমার একদমই মনে ছিল না।”
সুহিন আরো বেশি হতবাক এলো। লোকটা কার কথা বলছে,
—“কি আজব, কি বলছেন এসব।”
—“আসছি আমি, এখনই আসছি।”

কেকে আর দাঁড়াল না। দরজাটা খুলেই রুম থেকে হন্য হয়ে বেরিয়ে পড়ল। তাকে এমন উদ্বিগ্নতার সাথে সিঁড়ি বেয়ে নামতে দেখে, ড্রইংরুমে থাকা তালহা ভ্রু কুঁচকে নিল। এই মূহুর্তে ড্রইংরুমে তালহা ব্যতীত আর কেউই নেই। রোজি সহ বাকি সবকটা ফারিসের ঘরে। জায়ানের চোখে-মুখে ব্যান্ডেজ করে দেওয়ার পাশাপাশি, ওই ঘরে ঠিক কি চলছে সেসব কেবল তারাই জানে।
তালহা অপেক্ষায় আছে কেকের সাথে আলোচনায় বসতে। সামনে যে খুব একটা ভালো কিছু হবে না তা স্পষ্ট। কিন্তু ঠিক কি হতে চলেছে সেটাই ভাববার৷ কেকের এই অপ্রত্যাশিত পদক্ষেপ তার জীবনে কতটুকু প্রভাব ফেলতে পারে, তা তালহা নিজেও বুঝে উঠতে পারছে না।
আপাতত কেকে’কে বাড়ির বাহিরে যেতে দেখেও তালহা তাকে আটকাতে পারল না। কেকে’র কাছে এইমূহূর্তে আশেপাশের কোনো খেয়ালেই নেই। তালহা যখন অজানা ভবিষ্যতে আশংকায় চিন্তিত, ততক্ষণে কেকে ছুটতে ছুটতে সোজা তার ফেরারির কাছে এসে পৌঁছেছে। দ্রুত গাড়ির দরজা খুঁজে ভেতরে কিছু একটা খুঁজে পেতে মরিয়া হয়ে উঠল সে।

Naar e Ishq part 41

নিচের দিকে এক্সিলারেটরের কোণায় কাঙ্ক্ষিত জিনিসটা খুঁজে পেতেই,কেকের চোখ-মুখ কিছুটা ফ্যাকাসে হলো। ছোট্ট অস্তিত্বটাকে দুহাতের আদলে এই প্রথমবার এতোটা উদ্বিগ্নতা ও যত্ন নিয়ে জাগানোর চেষ্টা করল সে; অস্থির ভঙ্গিতে দাঁতে দাঁত পিষে বলতে লাগল,
“উঠে পড়,গাধার বাচ্চা! তোর কিছু হলে, মাতাব্বরি করে আমার তোকে এখানে নিয়ে আসার ফল হাড়ে হাড়ে মিটে যাবে।”

Naar e Ishq part 43

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here