Naar e Ishq part 39
তুরঙ্গনা
রাত একটা বেজে পনেরো মিনিট।
প্রকৃতির উন্মাতাল প্রলয়ঙ্করী ঝড়-বৃষ্টির বেগ এখন অনেকটাই কমে এসেছে। আকাশ ভেঙে অবিরাম ঝরে পড়া জলধারা স্তিমিত হলেও, মেঘেদের গর্জন এখনো পুরোপুরি থামেনি। কেবল মাঝে মাঝে নিকষ কালচে অন্ধকারের বুক চিরে তীব্র বিদ্যুৎ চমকে উঠছে, আর সেই ক্ষণিক আলোয় চারপাশটা এক ভৌতিক রূপ ধারণ করছে।
ব্ল্যাকভেইন এস্টেট থেকে একে একে প্রায় সকলেই বেরিয়ে আসছে। নিস্তব্ধ প্রাঙ্গণে জুতো আর বুটের খটখট শব্দ চারপাশে প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করছে। চার বন্ধু মিলে পার্কিং জোনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে নিজেদের গাড়িতে চড়ার প্রস্তুতি নিয়ে। কিন্তু প্রতিবারই সাদের আচরণে এক অদ্ভুত ও ভিন্ন কিছু লক্ষ করা যাচ্ছে। সে বন্ধুদের সাথে এক পা দু পা করে সামনের দিকে এগোচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তার মন পড়ে আছে পেছনে। সে বারবার ঘাড় ঘুরিয়ে অতিশয় ব্যাকুলতায় পেছনে ফিরে তাকাচ্ছে—ঐ দূরপ্রান্তে নিস্প্রাণ পাথরের মতো স্থির অবস্থান করা কালো ফেরারিটার দিকে।
সাদের মনের ভেতর থেকে আশঙ্কার মেঘ তখনো বিন্দুমাত্র কমেনি। বিজ্ঞান আর যুক্তির এই যুগে দাঁড়িয়েও সে এখনো নানান অলৌকিক ঘটনা আর জ্বীন-পরীর আছরের কথা ভেবে চলেছে। তার অবচেতন মন বারবার বলছে, চোখের সামনে দেখা সেই গাড়ির তীব্র নড়াচড়া কোনো স্বাভাবিক ঘটনা হতেই পারে না!
এদিকে তাকে এভাবে বারবার থমকে যেতে আর আড়চোখে পেছনে তাকাতে দেখে, পাশ থেকে ফারিস হঠাৎ তীব্র সন্দেহের দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল। ফারিস নিজের গাড়ির চাবিটা আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে কিঞ্চিৎ ধমকের সুরে বলল,
“এ্যাই সাদ! তোর কী হয়েছে বলতো? কখন থেকে দেখছি তুই কেমন যেন করছিস। বারবার পেছনে কী দেখছিস ওভাবে?”
ফারিসের আকস্মিক প্রশ্নে সাদ আচমকা যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে নিজের ভেতরের অস্থিরতা ঢাকতে তড়িঘড়ি করে ইতস্তত ভঙ্গিতে প্রত্যুত্তর করল,
“কই… কই না তো! আমি কিছু দেখছি না। ধুর, চল তো!”
কথাটা বলতে বলতেই সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। ফারিসের তীক্ষ্ণ নজর থেকে বাঁচতে দ্রুত পা চালিয়ে গাড়ির ভেতরে গিয়ে চড়ে বসল। সাদের এমন চঞ্চলতায় বাকি বন্ধুরা কিছুটা অবাক হলেও, আর সামান্যও বিলম্ব না করে তারা নিজেদের গাড়ির স্টার্ট দিল এবং অতি দ্রুত নিজেদের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। হেডলাইটের তীব্র আলো আঁধারিকে চিরে দিয়ে গাড়িগুলো এস্টেটের সীমানা পেরিয়ে গেল।
ঠিক আধ-ঘণ্টা পরের দৃশ্য—চারপাশের আবহাওয়া যেন নতুন করে আরও বেশি বৈরী ও গা ছমছমে হয়ে উঠেছে। বিস্তৃত আকাশ জুড়ে এখন প্রকাণ্ড বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, আর সেই রূপোলি আলোর তীব্র ছটায় পুরো আসমান ভয়ানক ও অপার্থিব এক আলোতে ছেয়ে যাচ্ছে। চারপাশের দমকা হাওয়ায় গাছের ডালপালাগুলো মড়া মানুষের আঙুলের ন্যায় ডানা ঝাপটাচ্ছে, যা পুরো পরিবেশকে চরম ভুতুরে আবহে রূপান্তর করেছে।
আর এমন এক রোমাঞ্চকর ও ভুতুরে আবহের মাঝেই, নিজের দুই বলিষ্ঠ বাহুতে এক রূপবতী রমণীকে কোলে করে তুলে নিয়ে বাড়ির ভেতরের দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে কেকে। সুহিন তখন লজ্জায়, যন্ত্রণায় আর এক চরম নিস্তেজতায় নিজের দু-হাতে কেকের চওড়া ঘাড় ও গলা শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছে। তার সমস্ত শরীর যেন শক্তিহীন, অবশ। সে একরাশ জড়তা নিয়ে কেকের গলার ভাঁজে নিজের তপ্ত মুখখানা বেশ নিশ্চিন্তেই গুঁজে দিয়েছে।
সুহিনের সিক্ত ও অবাধ্য পা দুটো কেকের কোমর জড়িয়ে আছে সুদৃঢ় বন্ধনে; আর কেকে নিজের দুই হাতের শক্ত তালু দিয়ে সুহিনের উন্মুক্ত পিঠ ও কটিদেশ আষ্টেপৃষ্টে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। সুহিনের একগোছা এলোমেলো, রেশমি বাদামি চুল সম্পূর্ণভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে তার ফর্সা পিঠটাকে ঢেকে রেখেছে; যেন এক মায়াবী পর্দার অন্তরালে লুকিয়ে আছে কোনো নিষিদ্ধ উপত্যকা।
কেকে সুহিনকে বুকে চেপে ধরে নিজের ছান্দিক গতিতে সামনের দিকে এগোতে এগোতে তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে চিরচেনা তির্যক মদমত্ত হাসি ফুটিয়ে তুলল। সে ঘাড়টা সামান্য কাত করে সুহিনের কানের কাছে নিজের তপ্ত নিশ্বাস ফেলে নিচু স্বরে বলল,
“ফিলিং গুড, ওয়াইফি?”
সুহিন কেকের গলার ভাঁজে মুখ গুঁজে থাকা অবস্থাতেই নিজের চরম নিস্তেজতার মাঝেও, একরাশ জেদ আর সামান্য রাগ নিয়ে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল,
“এখনই ছেড়ে দিন আমায়, নামিয়ে দিন নিচে! আপনার সাথে আর কোথাও যাবো না আমি।”
সুহিনের এই অবাধ্য ও দুর্বল প্রতিরোধে কেকে আবারও এক চিলতে তির্যক হাসল। তার সেই হাসিতে একাধারে যেমন তাচ্ছিল্য ছিল, অন্যধারে ছিল একচ্ছত্র বিজয়ের আনন্দ। সে নিজের কণ্ঠস্বর আরও কিছুটা ক্ষীণ করে, অত্যন্ত গম্ভীর্যপূর্ণ সুরে বলল,
“ঠিকমতো কথাও বলতে পারছিস না; তবুও তো দেখি তোর তেজ কমে না, ইডিয়ট!”
—“চুপচাপ নামিয়ে দিন বলছি, আমার রাগ হচ্ছে আপনার উপর…”
—“তাই নাকি…”
বলতে বলতেই কেকে তার চলার গতি আরও কিছুটা ধীর করল। সে সুহিনের কানের লতি স্পর্শ করে আবারও অত্যন্ত নিরেট স্বরে ফিসফিস করে আওড়াল,
“আই নো বেইবি, ইট’স ডেফিনিটলি হার্ট… বাট… ইট’স… থ্রিলিং!”
কেকের এহেন পাশবিক ও নেশাতুর স্বীকারোক্তিতে সুহিনের পুরো শরীর আবারও এক অজানা শিহরনে কেঁপে উঠল। সে কেকের ঘাড়ের চামড়াটা নিজের নখ দিয়ে আরও শক্ত করে খামচে ধরল, ঘাড় থেকে মুখ তুলে সে কেকের চোখের সাথে চোখ মিলিয়ে ভয়ার্ত সুরে শুধালো,
“আপনি কি আবারও…”
কেকে তার কথা শেষ করতে না দিয়ে, আচমকা বা-চোখ টিপে বলল,
“অবশ্যই!”
নিজের প্রকাণ্ড আকৃতির মাস্টার বেডরুমের, সফেদ বিছানার এককোণে রমণীকে বসিয়ে দিয়ে, গায়ে ব্ল্যাঙ্কেট টেনে দিল কেকে। কোনোপ্রকার বাক্য ব্যায় না করে, সে একটা সিগারেট ধরিয়ে বারান্দায় চলে গেল। সুহিন বিছানার কোণে চুপচাপ বসে বসে ভাবতে লাগল, তার এই মূহুর্তে কি করা উচিত।
আঁড়চোখে কেকে’র রুমটাকেও খুব ভালোমতো পরখ করে দেখল। সবকিছু কত ছিমছাম, গোছানো।কিন্তু পুরো ঘরটাই সাজানো সাদা-কালো কিংবা চারকোলের ইন্টেরিয়র ডিজাইনে। সুহিনের কাছে বিষয়টা খুব একটা নতুনত্ব আনতে পারল না। তার জানামতে কেকে’র রুচিবোধ এমনই।
কিন্তু এইমূহূর্তে বাহ্যিক সকল বিষয়াবাদি ব্যতীতও তার মাথায় যে প্রশ্ন আর সংশয়গুলো তাড়া করছে, সেসবের ঠিক কি করা যায় তাই সুহিন বুঝে উঠতে পারছে না। অনেকভাবে চেষ্টা করেছে, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে বেঁচে ফেরার। কিন্তু কেকে তো তা হতে দেয়নি। টুপ করে তাকে নিজের জালে ফাঁসিয়েই দিয়েছে। কিন্তু এই সম্পর্কের পরিণতি কি? ঐ লোকটা তো বলল, ঠিকই তাকে সাতদিন পর ডিভোর্স দিয়ে দিবে। আর যদি তাদের সত্যিই ডিভোর্স হয়ে যায় তখন…
সুহিন ভাবতে ভাবতেই অনেকটা দমে গেল। প্রশ্নগুলো ঠিক কেমন হওয়া উচিত? সে এতোটাই অপদার্থ যে কেকে’র আসল উদ্দেশ্য জানার পরও সে তার জালে পা দিয়েছে? যে লোকটার সাথে সাতদিন পর সকল সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে, তার সাথেই এখানে ফাঁকা বাড়িতে রাত কাটাচ্ছে। অথচ সাতদিন পর তাদের মাঝে আর কোনো কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। এভাবে কি করে সব জটলা পেকে যাচ্ছে?
গভীর ভাবনায় চোখ-মুখ শুঁকিয়ে ফেলা সুহিন নিজেকে আর স্থির রাখতে পারল না। ভ্রু কুঁচকে বারান্দার দিকে মুখ ফেরাতেই দেখল, কেকে’র অবয়ব দৃশ্যমান না রইলেও চাঁদেরআলোয় ফ্লোরে তার ছায়া স্পষ্ট। যা দেখে স্পষ্টত আন্দাজ করা যাচ্ছে, সে একহাতে সিগারেট টানার পাশাপাশি ফোনে কারো সাথে টাইপ করা কিংবা চ্যাটিং এ ব্যস্ত।
ফলে রমণী পারল না সাথে সাথে তাকে ডেকে বিরক্ত করতে। সুহিন অপেক্ষা করতে লাগল, কেকে’র কাজ শেষ করে ফিরে আসার। কিছুক্ষণের মধ্যে সে এলোও বটে। কিন্তু সুহিন কিছু বলে ওঠার আগেই, কেকে আচমকা তাকে অদ্ভুত পূর্বক এক অবজ্ঞার ভাবমূর্তি নিয়ে এড়িয়ে, রুম থেকে বেরিয়ে গেল। সুহিন সবটাই নিস্পৃহে চেয়ে চেয়ে দেখল। তবে কি সে যেটা ভাবছে, কেকে শেষ পর্যন্ত তাই করবে?
রমণীর সমীকরণ সমাধানের আগেই, কেকে আবারও ফিরে এলো। হয়তো এইমূহূর্তে তার ফ্রেশ হওয়া প্রয়োজন, কিন্তু সে মোটেও এমন কোনো কিছুই করছে না৷ বরং হাতে একটা ব্ল্যাক মনস্টার ডিংঙ্কস্ এর ক্যান নিয়ে, সে তার নিশ্চিন্তে খেতে খেতে রুমে ঢুকেছে। এবার আর সুহিন বিলম্ব না করে, সহসাই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,
—“শুনুন, আমার আপনার সাথে দুটো জরুরি কথা আছে।”
রুক্ষ এক কন্ঠস্বরে কেকে’র ধ্যান ভাঙল। সামনের দিকে মুখ তুলতেই দেখল, তারই বিছানায় একটা মেয়ে কাচুমাচু হয়ে বসে গম্ভীরমুখে তার দিকে চেয়ে আছে।
কেকে সাথে সাথে প্রত্যুত্তর করল না। দূর হতে সুহিনকে এমনভাবে পরখ করল যেন, কিছুক্ষণ আগেই যে সে নিজের ঘরে বউটাকে নিয়ে এলো—এটা যেন সে প্রায় ভুলতেই বসেছিল।
দাম্ভিক পুরুষের আচরণে সামান্য বিভ্রান্তি দেখে সুহিনের ললাটে ভাজ পড়ল।তবে সে ভ্রু-কুটি করে আরো কিছু একটা বলার জন্য মুখ খুলবে, ঠিক তার আগেই কেকে সংক্ষেপে প্রত্যুত্তর করল,
—“হুম,বল…”
কেকে ক্রমশই সুহিনের দিকে পা অগ্রসর করতেই, রমণী যেন একমুহূর্তেই সবকিছু ভুলতে বসল। তবুও নিজেকে যথাসম্ভব স্থির রেখে বলল,
—“আপনি কি সত্যিই আমায় সাতদিন পর ডিভোর্স দিবেন?”
কথাগুলো আওড়িয়ে সুহিন জড়তায় আড়ষ্ট হয়ে রইল। তবে নীলাভ চোখদুটো উৎসুক হয়ে রইল উত্তরের অপেক্ষায়।
অন্যদিকে তার এহেন প্রশ্নে কেকে’র মাঝে বিশেষ কোনো ভাবান্তর হলো না। সে অত্যন্ত নির্বিকার ভঙ্গিতে সুহিনের ঠিক সামনেই বেশ আমোদ নিয়ে গা এলিয়ে শুয়ে পড়ল। মাথার নিচে একহাতের ভর দিয়ে, অন্যহাতে ক্যান চেপে তাতে চুমুক দিল। ঢোক-ঢোক করে দুবার তরল গিলে নিয়ে অকপটে বলল,
“কি যেন বলছিলি, ওহ হ্যা…ডিভোর্স…”
কিছুটা ভণিতা করেই কথাটা আওড়াল কেকে। সুহিন তার এসকল ভাবগতিকে আরো বেশি বিভ্রান্ত। চোখের সামনে নিজের এতো কাছে লোকটাকে পেয়েও, তার মতিগতি কোনোটাই সে সঠিক করে আন্দাজ করতে পারছে না। ততক্ষণে কেকে তার কন্ঠস্বরে আরেকটু জোর দিয়ে, সুহিনের আপাদমস্তক একঝলক তীব্র ঔদাসিন্যে দেখে নিয়ে বলল,
—“অফকোর্স মাই ডিয়ার ওয়াইফি, সাতদিন পর যে তোকে ডিভোর্স দেবো এটা কি আমি আগেই বলিনি? তোকে তো ডেকেছিই আমি এই উদ্দেশ্যে, তাহলে এখন আবার এই কথা কেনো উঠছে?”
সুহিন একমুহূর্তের জন্য হতবিহ্বল হয়ে বসে রইল। লোকটা কি এখনো মজা করছে নাকি সে-ই বারবার বোকার স্বর্গে হারিয়ে যাচ্ছে।
সুহিন তার কন্ঠস্বর গম্ভীর করে, ব্ল্যাঙ্কেটটা হালকা টেনেটুনে গায়ের সাথে আরেকটু জড়িয়ে নিল। কপালে ভাজ ফেলে, ওষ্ঠদ্বয় জিভ দিয়ে কিছুটা ভিজিয়ে নিয়ে শুধালো,
—“দেখুন, আমি কিন্তু মজা করছি না…”
—“তো তোর কি মনে হয়, এই মাঝরাতে অকারণে আমি তোর সাথে মজা করছি?”
কেকে সাথে সাথে ধমকে প্রত্যুত্তর করল, অথচ কন্ঠস্বর আগের চেয়েও বেশি তীক্ষ্ণ ও নিরেট শোনাল। সুহিন পারল না কেবল, এক্ষুনি হুড়মুড়িয়ে কেঁদে ফেলতে। দুর্ধর্ষ পুরুষের ধমকে নাকি এক শয়তানের ফাঁদে পা দেওয়ার আফসোসের বিলাপ করে সে কাঁদবে—তা তৎক্ষনাৎ নির্ধারণ করতে পারল না এই অবোধ রমণী।
তবুও সুহিন নিজেকে ভেঙে পড়তে না দিয়ে, ঠোঁট চেপে অভিযোগ করল,
—“যদি ডিভোর্সই দিবেন, তাহলে এইসব কেনো করলেন?”
—“বিয়ের পর এইসব সবাই করে, তাই আমিও করেছি।”
সুহিন স্তব্ধ হলো তার উত্তরে। কেকে ওষ্ঠদ্বয় খানিকটা চৌকস করে, ক্যানে দীর্ঘ চুমুক দিল। জিভের অগ্রভাগ মুখের অভ্যন্তরীণ দন্তে ঠেকাতেই, ওষ্ঠকোণে এক চিলতে তির্যক হাসির দেখা মিলল। বোকা রমণীর দিক থেকে একপলকের জন্যও দৃষ্টি না সরিয়ে আবারও সে বা’ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
—“এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন? এমন ভাব করছিস যেন আমি মহাপাপ করেছি। বিয়ে করে তো সবাই এইসবই করে তাই না? তাহলে আমি কেন আবার বাদ যাব? এমনিতেও বাকিদের চেয়ে আমার একটু লেট হয়ে গেছে।”
—“চুপ করবেন আপনি!”
সুহিন ঠোঁটদুটো চেপে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। কেকে খানিকটা নড়েচড়ে ভ্রু উঁচিয়ে প্রশ্ন ছুড়ল,
—“তোর সমস্যা কি, আমায় বলতো?”
সুহিন সাথে সাথে প্রত্যুত্তর করতে পারল না। তার চোখ বেয়ে অঝোরে জল পড়ছে, কিন্তু সে সঠিকভাবে নিজের কান্নার কারণটাও খুঁজে পাচ্ছে না। মন-মস্তিক কেবল এটাই জানান দিচ্ছে যে—তার সমগ্র জীবনটা এভাবেই শেষ হলো। অথচ সে এতোটাই অধম যে, সবটা জেনেবুঝেও শেষঅব্দি কিছুই করতে পারল না।
—“আমার জীবনটা কেনো এভাবে ধ্বংস করলেন?’
নিঃশব্দে ফোঁপাতে ফোপাঁতে আওড়াল রমণী। তবে প্রশ্নটা শুনে, কেকে তার চোখমুখে খানিকটা বিরক্তির ছাপ ফেলে, নিরেট স্বরে বলল,
—“ওয়েট,ওয়েট, আমি তোর জীবন ধ্বংস করেছি? কিভাবে? আমি কি একবারও তোর সাথে জোড়াজুড়ি করেছি? একদমই না। আমি পুরো ব্যাপারটাই তোর উপর ছেড়ে দিয়েছিলাম। তুই না চাইলে এইসবের কিছুই হতো না। তোর সম্মতি ছিল বলেই যা হওয়ার হয়েছে। তাহলে সব দোষ আমার একার হলো কি করে? হাহ?”
—“আপনি…আপনি…
সুহিন আক্রোশে তোতলাতে শুরু করল। অপমানের তীব্রতায় তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসছে। চোখের সামনে যেন কোনো মানুষ নয়, স্বয়ং এক নিস্পৃহ শয়তানকে বসে থেকে তার অসহায়ত্ব নিয়ে উপহাস করতে দেখছে সে। কিন্তু তার তো পালটা যুক্তি দেওয়ারও কিছুই নেই। অবশ্য সে বলবেই বা কী?
নিজের আবেগের কাছে নিজের এই পরাজয়ের গ্লানি সে ঢাকবে কোন অজুহাতে?
অন্যদিকে কেকের কাছে দৃশ্যপটটি বেশ উপভোগ্য ঠেকল। সে ক্যানে চুমুক দিচ্ছে অলস ভঙ্গিতে, আর চোখের কোণ দিয়ে সুহিনের ভেঙে পড়া অবয়বটা মেপে নিচ্ছে। অধরের কোণে তার এক চিলতে কুটিল, মুচকি হাসির রেখা।
প্রায় অনেকক্ষণ কেটে যাওয়ার পরও, সুহিন যখন কেবলই কান্না চেপে রইল এবং নতুন কোনো প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পেল না, তখন কেকে নিজেই নীরবতা ভাঙল,
—“আমি কি, হ্যা? কী বলে ব্লেম করবি আমায়, তাই ভাবছিস তো? সরি টু সে ওয়াইফি, তোর মতো গাধাদের শেষমেশ কান্না করা ছাড়া আর কোনো অপশন থাকে না। সামান্য লজিকও নেই যে তা দিয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করবি। সো স্যাড!”
সুহিন নিজের কান্নার বেগ টেনে ধরল। অপমানের খড়কুটো আঁকড়ে ধরে সে ক্ষিপ্ত, অগ্নিগর্ভ দৃষ্টিতে তাকাল কেকের দিকে। আচমকা সাপের মতো হিসহিসিয়ে উঠে বলল,
—“ধ্বংস হয়ে যাবেন, একদিন চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাবেন আপনি।”
—“কে ধ্বংস করবে আমায়, তুই? রিয়েলি? তাহলে দেরি কিসের, কর আমায় ধ্বংস। তোর হাতে ধ্বংস হওয়ার জন্য আমি সব এ্যাঙ্গেলেই প্রস্তুত আছি।”
আবারও নির্লিপ্ত এক গা-ছাড়া ভাবমূর্তি। সুহিন আর কোনো প্রত্যুত্তর করল না। তার সারাশরীর ক্ষিপ্ততায় জ্বলছে যেন। অথচ একটা শব্দ না করলেও, সে লাগাতার চোখের জল ফেলে নিজের পরাজয়ের জানান দিচ্ছে । শুরুতে গা ছাড়া কেকের কাছে রমণীর এই অসহায়ত্ব উপভোগ্য মনে হলেও,সময় গড়ানোর সাথে সাথে একটা নিরেট একঘেয়েমি তাকে গ্রাস করল; নিজের এই নিষ্ঠুরতার প্রতিই যেন সে কিছুটা বিরক্ত বোধ করল।
সে গুটিয়ে বসে থাকা সুহিনের গায়ে, আচমকা উদাসীন ভঙ্গিতে ক্যান দিয়ে মৃদু টোকা দিয়ে বলল,
“হেই ওয়াইফি! আর কত কাঁদবি?”
—“………
সুহিন পাথর বনে রইল। উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না। কেকে কিছুটা অধৈর্য হয়ে গলা চড়াল,
—“ওই, কাঁদছিস কেন এতো? থাম না গাধা…!”
—“…..”
সুহিনের নিথরতা কেকের ভেতরে এক অদ্ভুত অস্বস্তি তৈরি করল। সে নড়েচড়ে উঠে বসল। বিছানার ওপর হাঁটু মুড়ে সুহিনের দিকে আরও একটু ঝুঁকে এলো; কণ্ঠে এবার অদ্ভুত এক উসকানি মিশিয়ে বলল,
—“আরে আশ্চর্য তো! এতো কাঁদার কি আছে? ডিভোর্স দিয়ে দেবো তো, আমি মিথ্যে বলিনি। আমি সত্যি সত্যি ডিভোর্স দিয়ে দেবো, সাতদিন পরই দেবো। তোর বেশি তাড়া থাকলে না হয় ডেটটাকে আরো একদিন এগিয়ে আনব। তবুও এই কান্নাকাটি বন্ধ কর।”
—“……..
—“বেইবি, বললাম তো ডিভোর্স দেবো, তবুও কাঁদছিস কেন বলতো? নাকি তুই চাইছিস…”
কেকে সুহিনের ক্রন্দনরত মুখপানে নিজের মুখটা আরেকটুখানি ঝুকিয়ে আনল; কন্ঠস্বর নীচু করে ফিসফিস করে বলল,
—“ওয়াইফি, ডিভোর্স দিবি না আমায়?”
সুহিন নিরুত্তর। সে দু’হাতে কাপড় কচলে নিজের রাগ-ক্ষোভ, ঘৃণা কিংবা অসহায়-পরাজয়কে আড়ালের চেষ্টা করছে। কখনো বা ক্ষণে ক্ষণে মৃদু কম্পনের সাথে কেঁদে উঠছে। সবটাই ধরা পড়ছে, কেকের তীক্ষ্ণ নজরে।
সুহিন চোখের জল ফেলা ব্যতীত, আর কিছুই বলছে না দেখে, কেকে নিজেই রমণীর দিকে আরেকটু ঝুঁকে পড়ল। আরেকটু নড়েচড়ে গায়ের সাথে গা ঘেঁসে বসল। মুখের কাছে মুখটা নামিয়ে, হাস্কিস্বরে ফিসফিস করল,
—“ডিভোর্স দিবি না তো কি করবি,বউ? আমার সংসার করবি?”
অকস্মাৎ ‘বউ’ সম্মোধন রমণীর মাঝে অদ্ভুত এক কম্পনের সৃষ্টি করল। সে জলে ভেজা নীলাভ চোখদুটো তুলে, নিস্পৃহতায় কেকের তীক্ষ্ণ নিকষিত চোখদুটোর সাথে মেলাল। কেকে তার চোখের ভাষা আর কেঁদে বেহাল দশা করা মুখপানে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে সামান্য মুচকি হাসল। পরক্ষণেই অত্যন্ত অবোধ হওয়ার ভঙ্গিতে শুধালো,
—“কিন্তু তুই তো আমায় পছন্দ করিস না। তাহলে কিভাবে কি করি….”
বলতে না বলতেই সুহিন আবারও ঘৃণ্যতায় মুখ ফিরিয়ে নিল। আবারও ডুকরে কেঁদে ওঠার আগেই কেকে ডাকল,
—“ঐ ওয়াফইফি….”
বলেই সে আলতো করে তার চিবুক ছুঁতে গেল। ওমনি সুহিন বিষধর নীল চোখের সর্পের ন্যায় হিসহিসিয়ে উঠল,
—“ছোঁবেন না আমায়….”
—“ওকে ওকে, ছোঁবো না তোকে।”
কেকে বিছানার মাঝখানে বসেই দু-হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গি ধরল; তবে তার চোখেমুখে তখনও স্পষ্টত চপলতা,
—“কিন্তু শুধু শুধু বসে থেকে কী করব বল? চল ঐসব আরেকবার করি!”
—“নির্লজ্জ বেটাছেলে, বললাম না চুপ থাকুন….’
এমন মূহুর্তে কেকের অশোভন ইঙ্গিতে সুহিনের রাগ-ক্ষোভ গ্রহণযোগ্য হলেও, আচমকা কেকের গায়ের বিশেষ কোনো অংশ লক্ষ করে পা ছুঁড়ে লাথি মা’রার ব্যর্থ চেষ্টাটা নিমিষেই কেকে’র মেজাজকে ক্ষেপিয়ে তুলল।
—“এবার একটু বেশিই হয়ে যাচ্ছে না? তুই কিন্তু তোর লিমিট ক্রস করছিস!”
কেকে তৎক্ষনাৎ রাশভারী গম্ভীর কন্ঠে প্রশ্ন ছুড়ল। সুহিন সাথে সাথে তেজ নিয়ে প্রত্যুত্তর করল,
—“করলে করছি, কি করবেন আপনি হ্যাঁ?”
কেকে প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে ভ্রুকুটি করে প্রশ্ন করল,
—“কি হয়েছে তোর, বলতো আমায়? সাত দিন পর ডিভোর্স দিবি না তো সংসার করবি আমার? বল তুই কি চাস?”
—“কিচ্ছু চাই না, নিজের প্রেমিকাদের নিয়ে সুখে থাকুন৷ আমি আর কে….যাচ্ছি আমি!”
বলতে না বলতেই, সেই একই জেদ ধরে সুহিন বিছানা থেকে নেমে যেতে উদ্যত হলো। কেকে তৎক্ষনাৎ পাশ থেকে শক্তহাতে তার বাহু চেপে ধরল,
—“এতো রাতে কোথায় যাচ্ছিস?”
—“….জানিনা…!”
—“জেদ করিস না, আজ রাতটা থেকে যা।”
—“প্রয়োজন নেই, আপনি থাকুন আপনার প্রেমিকাদের নিয়ে।”
—“বারবার প্রেমিকা’র কথা বলে কি বোঝাতে চাইছিস? অপবাদ যখন দিয়ে যাচ্ছিস তবে প্রেমিকার নামটাও তো বলে যা।”
—“কত ভালো অভিনয় পারেন আপনি, প্রশংসা না করে পারছি না।”
তাচ্ছিল্যের সহিত কথাটা বলেই রমণী তার গায়ের জোর দেখিয়ে, কেকে’র হাতটা সরাতে চাইল। কিন্তু কেকে তৎক্ষনাৎ হেঁচকা টানে তাকে সোজা বিছানার মাঝবরাবর শুইয়ে দিয়ে, অকস্মাৎ তার উপর চেপে বসল। প্রায় খালি হয়ে যাওয়া ক্যানটা বিছানার উপর থেকে নিচে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, সুহিনের দিকে ঝুঁকে পড়ল। ললাটে ভাজ ফেলে, রমণীর দু-হাত শক্ত করে বিছানার সাথে চেপে ধরে বলল,
—“থাপ্পড় না খেতে চাইলে সোজা কথায় লাইনে আয়।”
কিন্তু সুহিনও আজ আর দমে গেল না। সাথে সাথে গলা চড়িয়ে বলল,
—“ফালতু কথা বলবেন না, সবসময় আপনার মনমর্জি আমি চলতে পারব না। নিজের প্রেমিকাদের মতো…”
—“আবার একই কথা?”
—“ভুল কি বলেছি আমি হ্যা?”
—“হ্যা, আমিও তো তাই জানতে চাচ্ছি কে আমার প্রেমিকা।”
সুহিন এবার কেকের বাম হাতের দিকে ইশারা করল। যেখানে একটি ব্ল্যাক ম্যাটালের আংটি চাঁদের আলোর প্রতিফলনে চকচক করছে। সুহিনের ঠোঁটের কোণে তৎক্ষনাৎ বিষাক্ত হাসির রেখা ফুটে উঠল,
—“আপনার প্রেমিকা কে বা কয়জন, তা আমি কি করে জানব? যার দেওয়া আংটি পড়ে আছেন, সে-ই হবে হয়তো।”
কেকে নিজের হাতের আংটিটার দিকে তাকাল, তারপর আবার সুহিনের চোখের দিকে। তার ঠোঁটে এক রহস্যময় হাসির আভাস,
—“এটার কথা বলছিস?”
সুহিন আর সেই চতুর হাসির মুখোমুখি হতে চাইল না। নিজেকে মুক্ত করার জন্য হাত-জোড়া মোচড় দিয়ে বলল,
—“আমাকে যেতে দিন…”
—“হানিই….”
কেকে এক ঝটকায় সুহিনকে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে ধরল। আচমকা এই বাঁধনে সুহিন শিউরে উঠল, তার সমস্ত শরীর দৃঢ়-অবশ হয়ে গেল। সে সর্বশক্তি দিয়ে কেকের বুকে ধাক্কা দিতে দিতে বলল,
—“ছুঁতে নিষেধ করেছি, ছাড়ুন আমার দমবন্ধ….”
সুহিন নিজের জেদ-রাগের উর্ধ্বে গিয়ে, অকস্মাৎ অঝোরে কেঁদে উঠল। কেকে তার বউটাকে আরেকটু নিবিড়ভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিয়ে বলল,
—“হুঁশশশশ, একদম কাঁদবি না।”
কেকে এক হাত দিয়ে সুহিনের কোমর জড়িয়ে ধরে অন্য হাত দিয়ে তার মুখটা চেপে ধরল নিজের বুকের মাঝে। তার কণ্ঠস্বর এখন গভীর, শান্ত এবং অকাট্য। সুহিন আর নড়াচড়া করতে পারল না, শুধু তার তপ্ত অশ্রু কেকের সিক্ত টি-শার্টের সুতো ভেদ করে চামড়ায় গিয়ে বিঁধল। সে অস্ফুটে, শেষবারের মতো তার সমস্ত শক্তি বিলীন করে দিয়ে বলল,
—“ছাড়ুন আমায়, ঘৃণা করি আপনাকে।”
কেকে তার অভিব্যক্তিতে অতিসামান্য মুচকি হাসল। সুহিনের বাদামী চুলে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। গভীর স্বরে টেনে ভগ্নকণ্ঠে আওড়াল,
—“আমি তো তোর ঘৃণাকেই ভালোবাসি, মাই পার্সিয়ান পুসিক্যাট।”
সুহিনের কান্নার বেগ এবার বাঁধ ভাঙল। সে মাথা তুলে কেকের চোখের দিকে তাকাল। জলে ছলছলে নীল চোখদুটোতে এক বুক শূন্যতা আর অব্যক্ত আর্তি নিয়ে সে বলল,
—“আমাকে তো আর ভালোবাসেন না!”
কেকে আর কোনো উত্তর দিল না। তার সেই চিরচেনা বিদ্রূপের ভাষা যেন এই একটা প্রশ্নের কাছে এসে স্তব্ধ হয়ে গেল। সে শুধু অপলক চোখে সুহিনের জলভারাক্রান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, যার গভীরতা পরিমাপ করা কোনো সাধারণ মানুষের সাধ্যে নেই।
ততক্ষণে রমণী তার স্বামীর প্রতি অবাধ তাচ্ছিল্য নিয়ে বিদ্রুপের সাথে প্রশ্ন ছুঁড়ল,
—“কি হলো, ঠিকই তো বলেছি আমি তাই না?”
সুহিন জানত এই প্রশ্নের কোনো উত্তর বোধহয় সে কেকে’র কাছে পাবে না। হয়তো সে বোকা, নিছকই এক অবোধ মেয়ে। কিন্তু এই কয়েকদিনে একটু হলেও তো এই দুর্ধর্ষ পুরুষকে চিনেছে সে।
সুহিন অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু তার আগেই কেকে অত্যন্ত নির্লিপ্তে বলে উঠল,
—“আই অ্যাম নট ইন লাভ উইথ ইউ, ব্লু-বেরি। আই অ্যাম জাস্ট অবসেসড উইথ এভরি সিঙ্গেল ইঞ্চ অফ ইয়োর বডি অ্যান্ড সোল। ইউ আর মাইন, অনলি ফা-কিং মাইন…দ্যাটস ইট!”
সুহিন বিধ্বস্ত মুখপানে কিছুক্ষণ কেকে’র দিকে তাকিয়ে রইল। পরমুহূর্তেই এক চিলতে তাচ্ছিল্যের সহিত ক্ষীণ হেসে, নিজেকেই যেন আশ্বস্ত করতে বলল,
—“সব মিথ্যে, সবটাই মিথ্যে…. ”
কেকে ভ্রু-ললাট কুঁচকে ফেলল তার আচরণে। ত্যাছড়া সুরে বলল,
—“কি চাস তুই বলতো?”
—“আমার চাওয়া-পাওয়ায় কি এসে যায়, আপনি কি চান তাই বলুন।”
—“আমার তো তোকে লাগবে।”
কেকে নির্দ্বিধায় প্রত্যুত্তর করল। সুহিন শুরুতে কিছুটা অপ্রস্তুত হলেও, সাথে সাথে আবার ক্ষিপ্ততা মিশিয়ে প্রশ্ন করল,
—“যদি তাই হয়, তবে বলুন আপনার হাতের এই আংটিটা আপনাকে কে পড়িয়েছে? কার নামে আংটি পড়েন আপনি, হ্যাঁ?”
রমণীর ক্ষিপ্ততায় নূন্যতম বিচলিত না হয়ে,কেকে শুধালো,
—“সত্যি বলবো?
—“আমি নিশ্চয় আপনার কাছে মিথ্যে গল্প শুনতে চাইনি!”
—“এই আংটি…আমার বউ পড়িয়েছে।”
—“কয়টা বিয়ে করেছেন আপনি? কয়টা বউ আছে আপনার?’
—“এখন অব্দি তো একটাই, বউও তো একটাই।”
অবোধ শিশুর ন্যায় অত্যন্ত নির্লিপ্ত অভিব্যক্তি তার। এতে করেই যেন সুহিন সাথে সাথে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল,
—“মিথ্যে কথা, এই আংটি আমি কখনোই আপনাকে পড়াইনি।”
—“উঁহু পড়িয়েছিস, একবছর আগেই এই আংটি তুই নিজের হাতে আমাকে পড়িয়েছিলি।
বলেই সে গতবছরের সেই রাতের ঘটনার কিছু অংশ সুহিনকে বলতে লাগল,
“ইতালিতে ব্যাক করার আগে আমি গিয়েছিলাম তোর কাছে। তুই তখন নিস্তেজ শরীরে চুপচাপ ঘুমিয়ে। রাতও তখন অনেক,ঘুমিয়ে পড়াটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু কিছু জিনিস তখনও অপূর্ণ রয়ে গিয়েছিল।”
বলেই সে আচমকা নিজের প্যান্টের পকেট থেকে হীরের আংটিটা বের করল। বারান্দা গলিয়ে ভেতরে আসা চাঁদের আলোয় জ্বলজ্বলে হীরের রিং-টা সুহিনের হাতে ধীরস্থিরে পড়িয়ে দিয়ে, তাতে আলতোকরে একটা চুমু খেল। তাতে সামান্য কিছুটা অদ্ভুতপূর্বক শিহরণে সুহিন কেঁপে উঠলেও নিজেকে তৎক্ষনাৎ সামলে নিল।
ততক্ষণে কেকে তার ভাবগতিক সম্পূর্ণরূপে পর্যবেক্ষণ করে নিয়ে, কিছুটা ত্যাছড়া সুরে বলল,
“সবাই ভাবে আমি তোকে এতো কষ্ট দেই কেনো, একবারও কি কেউ ভেবে দেখেছে তুই ঠিক কি পরিমাণে ত্যাড়ামি করিস?”
আচমকা এহেন প্রসঙ্গ তোলার কারণটা সুহিনের বোধগম্য হলো না। ততক্ষণে কেকে আবারও বলতে শুরু করল,
“এই আংটিটা কম করে হলেও কয়েকবার পড়িয়েছি আমি তোকে। পছন্দ না হলে বলতেই পারিস, ডিজাইন চেঞ্জ করে নিবি। কিন্তু না, প্রতিবারই তুই এটাকে খুলে যেখানে-সেখানে ফেলে রেখে দিবি।
গতবারও ঠিক এটাই করেছিলি। রুমে গিয়ে দেখি,তোর হাতে আংটি নেই। পরক্ষণেই নজরে এলো এটা ডাস্টবিনের পাশে পড়ে আছে। হয়তো আমার উপর রাগ করেই, ছুঁড়ে ফেলেছিলি। কিন্তু ঐরাতে আমি তোকে এটা আবারও পড়িয়ে দিয়েছিলাম,যদিও পরবর্তীতে খুব একটা লাভ হয়নি। ঘুরেফিরে এটার কোনো মূল্যই হয়তো তোর কাছে নেই।
সে যাই হোক, তোর ঘুমের ঘোরে আমি যেমন তোকে আংটি পড়িয়েছিলাম, মাথায় ব্যান্ডেজ করে দিয়েছিলাম আর তুই কিছু জানতেও পারিসনি—ঠিক তেমনি করে তোর হাত দিয়ে আমি সে-রাতে নিজেও এটা পড়ে নিয়েছিলাম। দ্যাটস মিন, এই রিংটা আমার প্রেমিকা-টেমিকা নয়, বরং তুই-ই পড়িয়েছিলি!”
সুহিন সবটা শুনে হতভম্বের ন্যায় কেকের দিকে তাকিয়ে রইল। সেভাবে কিছু একদমই মনে না পড়ায়, কেকে-ই আবার প্রশ্ন ছুড়ল,
—“কি, কিচ্ছু মনে পড়ছে না তাই তো?”
সুহিন আর এই প্রসঙ্গে কথা বাড়াতে চাইল না। সে প্রসঙ্গ বদলে হঠাৎ অভিমানী স্বরে জানতে চাইল,
—“কেনো করলেন এইসব? কেনো সে-রাতে আমাকে ছেড়ে গেলেন। আপনি জানেন, আমার পৃথিবীতে আপনি ছাড়া…”
সুহিন কথা সম্পূর্ণ না করেই থেমে গেল। আবারও নতুন শব্দ যোগ করে বলতে লাগল,
—“…একটা কি সুযোগ দেওয়া যেতো না আমায়?”
—“আমি ছেড়ে আসায় খুব কষ্ট হয়েছিল, তাই না?”
কেকের অতিনিষ্প্রাণ অভিব্যক্তিতে, সুহিনের ইচ্ছে হলে তীব্র অভিমানে এখানেই ডুকরে কেঁদে উঠতে। কিন্তু সে একটুও না কেঁদে, উল্টো চাপা স্বরে ঘৃণ্যতা নিয়ে বলল,
—“কথা বলবেন না আমার সাথে…!”
কেকে তার ঘৃণ্যতার মাঝে কেবল অভিমানটুকুই খুঁজে পেল। সে রমণীর কান্নার তীব্রতায় লালচে রাঙা ফর্সা গালটায় আলতোকরে দুটো চুমু খেয়ে বলল,
—“ওয়াইফি,আই’ম সরি।”
সুহিন যেন এবার তার বাঁধ ভাঙা কান্নার আসল উপযোগ খুঁজে পেল। মুখটা পাশে ফিরিয়ে, ঠোঁট চেপে হুড়মুড়িয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল সে। দুহাতে কেকের টিশার্টের কাঁধ আর বুকের অংশ খিঁচে চেপে ধরল।
কেকে তৎক্ষনাৎ তাকে আরেকটু শক্তকরে জড়িয়ে ধরে, গলার ভাঁজে মুখ গুঁজে দিল।রমণীর সরু কলারবোনের উপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা রেশমি চুলগুলোর উপর তীব্র আসক্তি নিয়ে, একযোগে আদুরে ভঙ্গিতে অনবরত নাক-গাল ঘষতে লাগল কেকে।
—“জান, আর কখনো ছেড়ে যাবো না। আই প্রমিজ…”
রমণীর কান্না থামানোর প্রয়াসে, বখাটে পুরুষের মতোই নিজের ছোটোখাটো স্পর্শেই কেকে সুহিনকে একপ্রকার উত্যক্ত করে তুলল। মূহুর্তের মাঝেই সুহিন অস্থির হয়ে উঠল; যদিও সে একটিবারের জন্যও কেকে’ক টিশার্টটা অব্দি হাতের মুষ্টি হতে আলগা করল না,
—“বললাম তো, আর একটাও কথা বলবেন না আমার সাথে। দূরে সরুন,আমায় যেতে দিন, আমি আর কখনো আপনার কাছে আসব না।”
—“রিভেঞ্জ নিবি? আমায় ছেড়ে চলে যাবি? আমাকে কষ্ট দিবি?”
কেকে সাথে সাথে প্রশ্ন ছুঁড়ল এক অদ্ভুত উপহাস নিয়ে। সুহিন কিছুই বলল না বিধায়, সে কেবল তার ছটফটানি উপভোগ করতে লাগল। নিজের ত্যক্ত স্পর্শের প্রকোপ আরো কিছুটা বাড়িয়ে সে সুহিনের কানের কাছে মুখটা এগিয়ে, রমণীর রাগ-অভিমান ভাঙার প্রয়াসে আওড়াতে লাগল,
“হানি!”
“বউ!”
“এই বউ!”
“আমার ওয়াইফি!”
“চশমিশ!”
“বেইবি!”
“জান,আমার হামস্টার!”
“আমার পার্সিয়ান!”
“এই পুসিক্যাট, কান্না থামা প্লিজজ…!”
স্পর্শের গভীরতা অধিক হতেই, সুহিনের অস্থিরতা কিংবা ছটফটানির সর্বচ্চতা অতিক্রম করে অকস্মাৎ কাঁপা গলায় উচ্চস্বরে চিৎকার করে উঠল,
—“আপনি থামবেন!”
—“তাহলে তুই কান্না থামা। যে-হারে কাঁদছিস, ডিহাইড্রেশন হয়ে যাবে তো।”
—“মজা করেন আমার সাথে? কাঁদলে মানুষের পানিশূন্যতা হয়?”
—“অন্যদের হয়না কিন্তু তোর তো হতেও পারে, পানি যেহেতু…. ”
—“নির্লজ্জ পুরুষ, মুখ বন্ধ রাখুন।”
সুহিনের কথায় কেকে মুখটা তো বন্ধ করল ঠিকই, কিন্তু তার অবাধ্য হাতদুটো ঠিকই নতুন কিছুর প্রয়াসে বিচরণ শুরু করল। যা আন্দাজ করে সুহিন রীতিমতো শিউরে উঠল,
—“এটা কি করছেন?”
কেকে তার ব্যস্ততার মাঝেই উল্টো প্রশ্ন ছুঁড়ল,
—“কান্নাকাটি শেষ না তোর?”
—“দেখুন, আপনি কি আপনার কথা রাখছেন না। আপনি বলেছিলেন…”
—“হুম, কি বলেছিলাম আমি?”
—“আপনি বলেছিলেন আপনি আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কোনো জোরজবরদস্তি করবেন না, তাহলে আমি…”
—“তাহলে তুই অকালে মরবি, তাই তো?’
—“……..
—“তো মর, যা! না করেছে কে? তুই সেঁধে মরলে তুই-ই নরকে যাবি, তাতে আমার কি?”
—“আপনি কিন্ত… ”
—“কি আমি,কি? ছাড় দেই বলে ছেড়ে দেবো তোকে?”
—“…….”
—“পুরো একটা বছর ছেড়ে দিয়ে রেখেছিলাম। ফলাফল? এখনও তুই ড্রামা করে যাচ্ছিস।”
—“…….
—“কি হলো কিছু বলছিস না কেনো, আমাকে কি তোর মানুষ মনে হয়না, হ্যা? তুই-ই বল, বিয়ে করেছি কি আমি বউকে শোকেসে সাজিয়ে রাখার জন্য?”
—“………
কথার ফাঁকে ফাঁকে কেকে’র সকল তোরজোর কিংবা প্রস্তুতি এবার সম্পূর্ণ হয়েছে। এবার শুধু আসল কাজের পালা। অন্যদিকে সবটা দেখে সুহিন গলা শুঁকিয়ে হয়েছে কাঠ। বিপদসীমা যে পৃথিবীর সকল সংকেতকে ইতিমধ্যেই অতিক্রম করেছে তা আর বুঝতে বাকি নেই।
কিন্তু এভাবেই চুপ থাকলেও তো হবে না। বাড়িতে তো বোধহয় কেউ-ই নেই। এই উন্মাদ যদি আজ বড়সড় একটা অঘটন ঘটিয়ে ফেলে, তখন তো তার কপালেই সকল দূর্ভোগ! এই ভাবনায় সুহিন মনে মনে খোদার কাছে বিলাপ করল—
“ওহ খোদা! সব ফাঁড়া কেন আমার উপর দিয়েই যায়। পালাবো তো পালাবো, কোন দিক দিয়ে পালাবো?”
পালানোর রাস্তা হিসেবে অজান্তেই মনে মনে হাজারটা দোয়া-দরুদ পড়লেও, মুখে সে অনেকটা রয়েসয়ে বলল,
—“দেখুন আমি ড্রামা করছি না, আমার আপনাকে ঠিকঠাক লাগছে না। আপনি…তখন যেমন ছিলেন, এখন ওমন নেই।”
—“ঠিকই ধরেছিস, এখন যা যা করব; ফুল-মুডে করব।”
—“উল্টোপাল্টা কথা না বললে হয়না? আমি তো আ….আ…..এ্যাই না, না…!”
—“হানি, এবার কোনো ডিস্টার্ব করবি না। নয়তো একদম শেষ করে ফেলব। ”
—“দেখুন, আপনি অনেক… অনেক ভালোমানুষ।”
—“আই নো, আই নো দ্যাট….”
—“তাহলে…তাহলে একটু ভালো…ভালো…না…মানে…সবাধানে…ভালোভাবে…”
কেকে তার কথার উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে সামান্য হাসল। রমণীকে আকারে-ইঙ্গিতে নিজের দিকটাও স্পষ্ট করতে আচমকা তারই ব্যক্তিত্বের ন্যায় উগ্র এক গানের দুটো লাইন বিড়বিড় করল,
‘Baby, I’m preying on you tonight
Hunt you down, eat you alive
Just like animals, animals, like animals, —mals
সুহিনের আর বুঝতে বাকি রইল না, সকাল হতে হতে তার কয়েকবার অক্কা পাবার সময়কাল চলে এসেছে। ততক্ষণে কেকে নিজেই আবারও বলে বসল,
—“আই টোল্ড ইউ, বেইবি…”
কেকে হঠাৎ তার বা-হাতে পড়ে থাকা রমণীর চুলের কালো গাডারটা একটানে খুলে ফেলল। অতঃপর অতিসুক্ষ্ণ হাতের কৌশলে তা নিজের হাত থেকে সরাসরি সুহিনের দুহাতের কব্জিতে পেঁচিয়ে হাতদুটো বেঁধে ফেলল; রমনীর মাথার উপর হাতদুটো একত্রে একহাতেই চেপে ধরল এক লহমায়। যা দেখে সুহিন রীতিমতো আরো বেশি ঘাবড়ে গেল। সে কিছু বলার আগেই, রমণীর ঠোঁটের কোণে নিজের দাঁতের সাহায্যে একটা কড়া চাপ দিয়ে, কেকে হাস্কিস্বরে চাপাকন্ঠে বলল,
“আই টোল্ড ইউ, বেইবি…দিস ইজ নট আ ফেয়ারিটেল—আই ওন্ট বি জেন্টল উইথ ইউ।”
বলেই সে তার ওষ্ঠদ্বয় আঁকড়ে ধরল। দমবন্ধকর কিছু মূহুর্তের পর,সে তার গলার ভাজে মুখ গুঁজে দিল। রমণীকে উত্তাল ঢেউয়ের মাঝে তলিয়ে নিয়ে, কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“হ্যাপি অ্যানিভার্সারি, ওয়াইফি!”
চোখ-মুখ খিঁচে ছটফট করতে থাকা সুহিন হঠাৎ বিস্ময়ের সাথে চোখ মেলল। শুষ্ক গলায় বলল,
“আজ?”
কেকে এক চিলতে তির্যক হেসে মাথা ঝাঁকাল। কিন্তু ততক্ষণে সে বোধহয় আরো কিছু করে বসেছে। যার আকস্মিকতায় সুহিন তৎক্ষনাৎ বিস্ময় ছাড়িয়ে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল,
—“আপনাকে…আপনাকে তো আমি…”
—“হু,হু, বল কি করবি?”
কেকে বলতে না বলতেই সুহিন আবারও চিৎকার করে উঠল। কেকে এবার কিছুটা বিরক্ত হয়ে, তৎক্ষনাৎ তার মুখ চেপে ধরল। চাপাস্বরে হিসহিসিয়ে উঠল,
“এতো চেঁচাচ্ছিস কেন গাধা, বাড়িতে কেউ নেই।”
রমণীর নীলাভ চোখ বেয়ে,জেদের তোপে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।
Naar e Ishq part 38
“শয়তান… আই উইল… ডাই…” সুহিন ভাঙা গলায় কোনোমতে ফিসফিস করল। কেকে তার অভিব্যক্তিতে যেন ভীষণ মজা পেল। সামান্য ত্যাছড়া হেসে তাকে আশ্বস্ত করে বলল,
”ইউ ওন্ট ডাই, বেইবি…”
কেকে সুহিনের মুখ থেকে হাতটা সরিয়ে, তার সিক্ত কপালে নিজের ওষ্ঠাধর ছুঁইয়ে হাস্কিস্বরে আওড়াল,
“আই ওন্ট লেট ইউ ডাই—আনটিল আই অ্যাম ডান উইথ ইউ।”
