Naar e Ishq part 37
তুরঙ্গনা
—“ওয়াইফি! ডু ইউ লাইক ইট,হাহ?”
—“ছিহ্ এটা কি?”
—“উচ্চবংশীয় মোমবাত্তি!”
সুহিন দাঁতমুখ খিঁচিয়ে চিৎকার করে উঠল,
‘আস্তাগফিরুল্লাহ! জাহান্নামী! জাহান্নামী! জাহান্নামী!’
বলেই সে হাত-পা গুটিয়ে পালাতে চাইল। কিন্তু তার আগেই পেছন থেকে কেকে তার পা-টা টেনে ধরে বলল,
—“কোথায় পালাচ্ছিস?”
—“নির্লজ্জ পুরুষ! কি চাই আপনার?”
সুহিন চোখ-মুখ খিঁচে চেঁচিয়ে বলল। অথচ অত্যন্ত নির্লিপ্ততার সাথে কেকে তার পা-টা আচমকা নিজের দিকে হেঁচকা টান দিয়ে আওড়াল,
“তোকে!”
একটানেই সুহিনকে আবারও হুড়মুড়িয়ে নিজের বলিষ্ঠ বুকের উপর আছড়ে ফেলল কেকে। রমণীর বাহুজোড়া দুহাতে শক্ত করে চেপে ধরে নিজের দিকে আরেকটু টেনে নিল। সুহিন নিজেকে সামলাতে না পেরে ভয়ে কুঁকড়ে গেল। মিনমিন করে কাপা কাঁপা গলায় বলল,
“দেখুন…আপনি আমার কথাটা শুনুন একবার…”
—“হু,বল। কি বলবি তুই?” কেকের সংক্ষিপ্ত জিজ্ঞাসা।
—“বলছিলাম যে…”
—“এখনই এতো কাঁপছিস কেন? খেয়ে ফেলেছি আমি তোকে?”
আচমকা কেকের ধমকে সুহিন শুষ্ক ঢোক গিলল। কাঁপা কাঁপা স্বরে আওড়াল,
—“আপনি যা চাচ্ছেন, আমি তা করতে পারব না। আমি কখনো ঐসব করিনি, বিশ্বাস করুন!”
বলতে বলতেই সুহিন বাচ্চাদের মতো ঠোঁট উল্টে কেঁপে ফেলল। রমণীর এরূপ আকস্মিক কান্না দেখে,কেকে কিঞ্চিৎ বিরক্ত হয়ে মনে মনে বিড়বিড় করল,
“গাধা!”
অথচ মুখে সে রমণীকে আশ্বস্ত করার ছলে কিছুটা নরম সুরে বলল,
“ডোন্ট ওয়ারি, ওয়াইফি! ভালো মেয়েরা কখনো আগে থেকে এসব করে না।”
সুহিন কেকের কোলের উপর কাচুমাচু হয়ে বসে আবারও মাথা এপাশ-ওপাশ নেড়ে বলতে লাগল,
“কিন্তু… আমি…আমি সত্যিই ঐসব করতে পারব না… অ্যায়য়য়য়য়য়!”
আবারও কান্নার তীব্রতা বেড়ে গেল। কেকে মনে মনে চরম বিরক্তি নিয়ে নিজের ওষ্ঠদ্বয় কামড়ে ধরল। কপালে ফুটে উঠল বেশ কয়েকটা বিরক্তির ভাজ। কেকে দাঁতে দাঁত পিষে মনে মনে বিড়বিড় করল,
“কিভাবে ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে যাচ্ছে , গাধা কোথাকার!”
মনে মনে বউকে ‘গাধা’ বলে হাজারটা গালি দিলেও, রমণীকে থামাতে আচমকা কেকে ধমক দিয়ে বসল,
“চুপ কর গাধা! নয়তো থাপ্পড়ে কানের পর্দা ফাটিয়ে দেবো।”
সুহিন তার এক ধমকেই পুরোপুরি চমকে উঠে স্তব্ধ হয়ে গেল। কেকে রমণীর কোমড়ে বাম হাতটা শক্ত করে পেঁচিয়ে রেখেই, ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে নিজের ভ্রু চুলকে, তীব্র বিরক্তির সাথে বিড়বিড় করল,
“আমারই ভুল হয়েছে, যখন বিয়ে করেছিলাম, তখনই কাজ সেরে ফেলতে হতো। সেই ভুলের মাশুল এখন দিতে হচ্ছে!”
কেকের বিড়বিড়ানো শুনে সুহিনের গলা শুকিয়ে এল। দুচোখের পানিতে গাল-গলা এমনিতেই ভিজে একাকার হয়ে আছে।কেকের এই গভীর ভাবনার অন্তরালে সুহিন অত্যন্ত সন্তর্পণে একবার চারপাশটা একনজরে দেখে নিল; কোনো চোরাপথে এখান থেকে ভেগে যাওয়া যায় কিনা, তা বোঝার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল।
পরমুহূর্তেই রমণীর এই কৌশলী ও চতুর চিন্তাভাবনাও যেন কেকের তীক্ষ্ণ নজরে বিদ্ধ হলো। মানুষের মস্তিষ্ক পড়ে ফেলার মতো কৌশলে, সে ভ্রু উঁচিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,
“তুই কি পালানোর পথ খুঁজছিস?”
সুহিন কন্ঠস্বর শুনে কেকের দিকে নজর ফেরাল। নীল চোখদুটো পিটপিট করে আওড়াল,
“না মানে…”
সুহিন নিজের কথা সম্পূর্ণ করতে পারল না। ভুলবশত নজরটা আবার নিচের দিকে চলে যেতেই সব তালগোল হারিয়ে ফেলল। এক নিমিষেই গলাটা শুঁকিয়ে চৌচির হয়ে গেল।এদিকে নিজের বোকা বউটাকে বারবার একই স্থানে নজর ফেলে চরম বিস্ময়ে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকতে দেখে কেকের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বক্র হাসি ফুটে উঠল। সে রমণীর কোমরে অকস্মাৎ সজোরে এক টান দিয়ে তাকে নিজের আরও নিকটে ঘেঁষে নিল। অতঃপর ভ্রু উঁচিয়ে, সুহিনের মুখের অতি সন্নিকটে নিজের মুখটা নামিয়ে এনে ফিসফিস করে সুধাল,
“বারবার এদিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে কি দেখছিস?”
সুহিন বলার মতো কোনো ভাষা বা শব্দ খুঁজে পেল না। কেকে আবারও তির্যক হেসে বলল,
“একটু বেশিই পছন্দ হয়েছে নাকি? নজরই সরছে না দেখি!”
সুহিনের কন্ঠনালী দিয়ে কোনো স্বরই বের হচ্ছে না। অথচ কেকে তার মুখে লাগামও টানছে না। সে সিটে আয়েশের ভঙ্গিতে গা-টা এলিয়ে দিয়ে আওড়াল,
“আই নো, আই নো, আই’ম বিট বিগ।”
কেকে থামতে না থামতেই,কিছুটা দ্বিধা কাটিয়ে আবারও বলল,
“নট অ্যা বিট, ইট’স ভেরিইইইইই!”
—“দোহাই লাগে আপনার, মুখে লাগাম টানুন। নির্লজ্জের মতো কথা বলা বন্ধ করুন; মাথা ভনভন করছে আমার।”
সুহিন দুই কানে হাত চাপা দেওয়ার চেষ্টা করল। কেকে এক চিলতে তির্যক হাসল। বলল,
—“তো এবার শুরু করা যাক?”
—“নাআআআআ! সম্ভব না, আমি পারব না।”
—“আবার কি হলো? কেনো পারবি না?”
—“কারণটা বলেছি তো আপনাকে… আমাকে দিয়ে হবে না এসব।”
—“গাধা! তুই কি আমায় বলতে পারিস, তোকে দিয়ে আমি জীবনে ঠিক কি করব?”
দাঁতে দাঁত পিষে আওড়াল কেকে। সুহিন নির্বিকার মনস্তাপ নিয়ে অকপটে বলল,
—“আমি কি জানি, প্রয়োজনে মাঠে গিয়ে ঘাস খাবো; তবুও এইসব করতে পারব না।”
—“হানি, তুই কিন্তু আমার মেজাজ খারাপ করছিস।”
—“করলে করছি, তবুও পারব না।”
বলতে বলতেই সুহিন আবারও ফুপিয়ে কেঁদে উঠল। কেকে নিজের সকল সহ্যসীমা হারিয়ে, দাঁতে দাঁত পিষে ধমক ছুঁড়ল,
—“জাস্ট শাটআপ ইডিয়ট, আরেকবার ভ্যা ভ্যা করে কাঁদলে গাল ফাটিয়ে লাল করে দেবো।”
সুহিন পুরোপুরি নিজের কান্না থামাতে পারল না। নিজের ওষ্ঠদ্বয় দাঁত দিয়ে চেপে ধরে অবরুদ্ধ ফোঁপানির মাঝেই আওড়াল,
—“প্লিজ, আমায় ছেড়ে দিন। আমি আর কখনো আপনার কাছে আসব না। তবুও না, পারব না…. অ্যায়য়য়য়য়য়!”
আবারও সেই একই ঢঙে অবোধ শিশুর মতো কান্না। কেকে ভারী শ্বাস ত্যাগ করে,মুখগহ্বরের এককোণে জিহ্বার অগ্রভাগ ঠেকিয়ে, কাঁধটা কিঞ্চিৎ কাত করে সুহিনকে আপাদমস্তক খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। কিছুক্ষণ পর কেকে আরও একটি দীর্ঘ, তপ্ত শ্বাস ত্যাগ করে আচমকা অত্যন্ত শান্ত সুরে ডাকল,
“হানি!”
সুহিন সেই ডাকে কর্ণপাত করল না। সে কেকের কোলের ওপর কাচুমাচু হয়ে বসে আপনমনে কেঁদেই চলল। কেকে আর সময় নষ্ট না করে নিজের হাত বাড়িয়ে তার কান্নাভেজা ফর্সা গালটা শক্ত করে ছুঁল। গ্রীবা ও গলার সংযোগস্থলে হাতের সুদৃঢ় বেড় বাড়াতে বাড়াতে সুহিনের মুখটা নিজের একদম কাছাকাছি টেনে আনল সে। অতঃপর রমণীকে আশ্বস্ত করার ছলে ভগ্ন স্বরে, মাদকতাভরা কণ্ঠে আওড়াল,
“ওয়াইফি! এটা তো একটা স্বাভাবিক বিষয়। আই প্রমিজ, আমি বেশি কিছু করব না। আর তুই কি জানিস, প্রতিবছর প্রায় কতশত ছোট ছোট বউ’রা মারা যায় ঠিক এইসবের জন্য। কিন্তু তাতে কি? এটা তো প্রকৃতির স্বাভাবিক সিস্টেম, তাই নয়?”
সুহিনের কান্না নিমিষেই থেমে গেল। বিস্ময় আর ভয় একত্রে তাকে গ্রাস করল। শুকনো মুখে ভাবতে লাগল, কেকে কি তাকে আশ্বস্ত করছে নাকি ভয় দেখাচ্ছে?
সুহিন আমতা-আমতা সুরে মিনমিন করে শুধালো,
“আপনি কি আমায় ভয় দেখাচ্ছেন?”
এবার কেকে আবারও নিজের ক্ষিপ্ত রূপে ফিরে গিয়ে, ধমক দিল,
“তো তুই ভয় পাচ্ছিস কেন,গাধা!”
ধমক খেয়ে সুহিন কাঁদতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিল। মিনমিন করে বলল,
—“আপনি আমার কথা বুঝতে পারছেন না…আমি এখনো এসবের জন্য প্রস্তুত না!”
—“বয়স কত তোর?”
কেকে আচমকা তির্যক ভঙ্গিতে ভ্রু উঁচিয়ে গমগমে সুরে প্রশ্ন ছুঁড়ল। যার জবাব দিতে গিয়ে সুহিন থতমত খেয়ে গেল,
—“আ…না মানে, এখন উনিশই আছে; আর কিছুদিন পর বিশ হবে।”
—“তো এই বয়সে আর কিসের প্রিপারেশন চাস তুই?চৌদ্দ-পনেরো বছরের মেয়েরা ধুমধাম বিয়ে করে বাচ্চার মা হয়ে যাচ্ছে। তোর বয়সী মেয়েরা তো কোথাও কোথাও আবার নানী-দাদী হয়ে বসে আছে! এরপরও তোর ড্রামা শেষ হয় না? কানের নিচে দেবো একটা,গাধা কোথাকার!”
—“আমি প্রস্তুত না কারণ আপনি ভালো মানুষ না। আমি জানি, আপনি আস্ত একটা শয়তান। এখন ভুলভাল বুঝিয়ে, পরে ঠিকই আমাকে দিয়ে উল্টোপাল্টা কাজ করাবেন।”
—“তোকে দিয়ে কেনো করাবো, যা করার তো নিজেই করব।”
সুহিন দুদণ্ড ড্যাবড্যাব করে কেকে’র দিকে হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকার পর, আচমকা কেকের গায়ে-গলায় এলোপাতাড়ি ঘুষি মারতে শুরু করল। একইসাথে চেঁচিয়ে বলতে লাগল,
“আস্তাগফিরুল্লাহ্! আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম…শয়তানের আছর আছে আপনার উপর। সরি, আপনি নিজেই তো আস্ত এক, মস্ত বড় শয়তান। জাহান্নামে যান আপনি!”
সুহিন নিজের ভয় কাটিয়ে একযোগে সকল ক্ষোভ উগরে দিল।কেকে দাঁতে দাঁত পিষে হুংকার ছাঁড়ল,
—“ওয়াইফির বাচ্চাআআআ! তুই ভাবতেও পারছিস না, তোকে আমি আজ কি করব!”
সুহিন কিছুটা শান্ত হয়েই ত্যাছড়া সুরে হাসল,
—“এই তো দেখেছেন, এবার ঠিকই নিজে স্বীকার করলেন!”
কেকে এই মেয়ের কান্ডকারখানা আর সহ্য করতে পারছে না। কিন্তু এখন জোর করে কিছু করতে গেলেও, মুখের উপর কসম খেয়ে আরেক কথা বলে বসবে। কি এক মুসিবত!
সে নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত রাখার চেষ্টা করে, সুহিনকে নিজের মাঝে দুহাতে আগলে নিল। গলার কন্ঠস্বর অত্যন্ত নরম করে বলল,
—“জান, জান বাচ্চা আমার। শোন একটু, আই প্রমিজ আমি….”
কেকের কথা শেষ হবার আগেই, সুহিন নিজের জেদ বজায় রেখেই বলল,
—“বলছি তো আমি এসব পারি না, আর পারবও না।”
কেকের ইচ্ছে করছে, ঠাস ঠাস করে অবাধ্য বউটার গালে চারটে চড় বসিয়ে দিতে। কিন্তু এটা করলে শিকারির শিকার হাতছাড়া হয়ে যাবে। তাই যতটা সম্ভব নিজের মাথা ঠান্ডা রাখতেই হবে। যথারীতি সেই মনোভাব নিয়েই,সুহিনের কথার যুক্তিতে কেকে বলতে লাগল,
—“কারণ তুই তো ভালো মেয়ে, এইজন্য এসব পারিস না। বাট ট্রাস্ট মি, আমি তোকে স্টেপ বাই স্টেপ সবটা শিখিয়ে দেবো। তখন দেখবি সবটাই একদম ইজিইইই।”
কেকের মুখে এমন সাবলীল আশ্বাস শুনে সুহিন মনে মনে বিড়বিড় করল,
“এমনভাবে বলছে না জানি আজ কতভালো বিদ্যা শেখাবে আমায়!”
—“কি হলো? কিছু বলছিস না কেনো?”
—“দুনিয়া উল্টে গেলেও আমি আপনাকে বিশ্বাস করতে পারব না। আপনি সেকেন্ডে সেকেন্ডে গিরগিটির মতো রঙ বদলান।”
মুখের উপর নিজের ব্যক্তিত্বের বিষয়ে, অবাধ্য বউয়ের কাছে সপাটে এইটুকু মন্তব্য শোনামাত্রই কেকে ঠোঁট চেপে মনে মনে আওড়াল,
“ট্রাস্ট মি বেইবি, তোর কসমের চক্করে আজ উপায় না পেয়ে সবটা সহ্য করে নিচ্ছি। সম্ভব হলে আমি তোকে এখনই জ্যান্ত চিবিয়ে খেতাম।”
এদিকে ক্ষিপ্ত হরিণী নিজেকে কিছুটা শান্ত করে, আবারও নরম সুরে অনুনয় করল,
—“দেখুন অনেক রাত হয়ে গেছে, আর আপনি অনেক ভালো মানুষ; তাই প্লিজ আমাকে ছেড়ে দিন,আমি বাড়ি চলে যাচ্ছি।”
সুহিনের মুখে নিজের এমন কৃত্রিম প্রশংসা শুনে কেকে এক চিলতে বাঁকা হাসল। আচমকা বিশেষ কিছু একটা করে বসবে, তার আগেই রমণী ছ্যাত করে উঠল। সুহিন তাকে পুনরায় কোনো কিছু করার সুযোগ না দিয়ে বলতে লাগল,
—“এই নাহহহহ! আমি কিন্তু বলেছি আপনি যদি আমায় জোর করেন তবে…”
সুহিনের মুখ থেকে কথাটা কেঁড়ে নিয়ে কেকে বলল,
—“গাধা! জোর কোথায় করছি?…”
সুহিন চোখদুটো পিটপিট করে ক্ষিপ্ত কেকের আপাদমস্তক দেখে নিল। সে কিছু বলার আগেই, কেকে আবারও নিজের কন্ঠস্বর নমনীয় করে বলল,
—“আমি তো জাস্ট তোকে বুঝাচ্ছি ব্যাপারটা।”
সুহিন প্রত্ত্যুত্তর করতে বিলম্ব করল না,
—“আমার এতো কিছু বুঝে কাজ নেই, আমি বরং…আআআআহ!”
সুহিন কথা শেষ করার সুযোগ পেল না। তার অবাধ্য ওষ্ঠাধরের ওপর নেমে এল দীর্ঘ মূহুর্তের বিধ্বংসী চুম্বনের তাণ্ডব। এক ঝটকায় কেকে সুহিনকে নিজের কোল থেকে ধীরলয়ে নামিয়ে পাশের সিটে নিজের দিকে মুখ করিয়ে বসিয়ে দিল। রমণীর কোমরের একপাশের সিটের উপর নিজের ডান হাতখানা চেপে রেখে তাকে নিজের শরীরের বেড়াজালে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে দিল সে; অন্য হাত দিয়ে সুহিনের বাদামি চুলের গোছা পেছন থেকে শক্ত মুঠোর ভেতর চেপে ধরল।কিন্তু এত কিছুর মাঝেও একটিবারের জন্যও সুহিনের ঠোঁট থেকে নিজের রুক্ষ-তৃষ্ণার্ত ওষ্ঠাধর আলগা করল না সে।
বেশ খানিকটা সময় পর সুহিন নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য পুরোদমে হাঁপিয়ে উঠতেই কেকে তাকে সামান্য ছেড়ে দিল। কিছুক্ষণ আগেও যে রমণী ছটফট করে তার খাঁচা থেকে পালাতে চাচ্ছিল, সেই মেয়েটাই পুরোটা সময়ই কেকের মোহাবিষ্ট পাশবিক সম্মোহনের অতল গহ্বরে ডুবে ছিল। তবে ওষ্ঠের বাঁধন ছাড়া পাওয়ার মাত্রই সে আবারও আগের মতো কাঁদো কাঁদো গলায় আর্তি জানাল,
“প্লিজ আর নয়…আজ বরং এইটুকুই থাক…”
কিন্তু কে শোনে কার কথা! কেকে ততক্ষণে নিজের চূড়ান্ত প্রস্তুতির অংশ হিসেবে নিজের গা থেকে ভারী লেদার জ্যাকেটটা খুলে এক ঝটকায় ড্যাশবোর্ডের দিকে ছুড়ে মারল। নিমিষেই উন্মুক্ত হলো টি-শার্টের হাতা গলে বেরিয়ে আসা তার সুগঠিত, পেশিবহুল বলিষ্ঠ হাতদুটো। তার এমন আকস্মিক, ভয়াবহ তোরজোড়ের ভাবভঙ্গি দেখে সুহিনের শুকনো ঢোক গিলতেও যেন বুক কেঁপে উঠল; তৃষ্ণায় ও আতঙ্কে তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে পুরো।
সুহিন ভারী ভারী শ্বাস ফেলে অস্থির ভঙ্গিতে অনবরত বলতে লাগল,
“প্লিজ না… সত্যি বলছি, আমি এইসবের কিচ্ছু জানি না, কিচ্ছু পারি না!”
নির্লিপ্ত ভাবমূর্তি নিয়ে কেকে তাকে আশ্বস্ত করার ছলে অকপটে বলল,
—❝ডোন্ট ওয়ারি, ওয়াইফি! প্র্যাকটিস মেকস্ পারফেক্ট!❞
—-“না, না, হবে না আমাকে দিয়ে এসব। অসম্ভব, একদমই সম্ভব না! আমি কিচ্ছু জানি না।”
সুহিন মরিয়া হয়ে পেছাতে চাইল। কেকে তার লতানো কোমড়ে হাতের চাপ দৃঢ় করে বলল,
—“ইফ ইউ রিয়েলি ডোন্ট নো, জাস্ট ট্রাস্ট অন ইউর হাবি,ওকে বেইবি?”
বলামাত্রই কেকে অত্যন্ত ক্ষিপ্র হাতে সুহিনের গাউনের পিঠের লম্বা চেইনটা ধরে এক হ্যাঁচকা টানে সম্পূর্ণটা নিচে নামিয়ে দিল। পিঠের আবরণ এক নিমেষে উন্মুক্ত হতেই রমণী তীব্র বন্য আশঙ্কায় ও ভয়ে চোখ-মুখ খিঁচে চিৎকার করে উঠল—
“অ্যাই, নাআআআআআহ্…!”
রমণীর চিলচিৎকারের ফাঁকে, কেকে আচমকা চরম বিরক্তিতে দাঁতে দাঁত পিষে ধমকের সুরে আদেশ ছুঁড়ল,
—“ফোকাস অন মি, গাধাআআআহ্!”
তার কথা শেষ হওয়া মাত্রই ফেরারির নিকষ আঁধারে শুরু হলো দুই মানব-মানবীর তীব্র অনুভূতির এক বন্য, উন্মাতাল তাণ্ডব। শুরুর দিকে সুহিন নিজেকে মুক্ত করার জন্য নানান উপায়ে পালানোর পথ খুঁজে অবিরত ছটফট করতে থাকলেও, খানিকক্ষণ পরই সে জগতের সমস্ত নিয়ম, শালীনতা ও দ্বিধা ভুলে বসল। কোরালে সুঘ্রাণ ও বলিষ্ঠ পুরুষালির উন্মাদনার সম্মোহনে সে এক নিমিষেই নিজের সমস্ত ধ্যান, জ্ঞান ও সত্তা হারিয়ে তার বুকে নিজেকে সমর্পণ করল।
ঘড়ির কাঁটায় রাত তখন ঠিক সাড়ে এগারোটা। ব্ল্যাকভেইনের এসেস্টের চারজন সদস্যই সেজেগুজে তৈরি হয়ে কেকের জন্য অপেক্ষা করছে। আজ বারোটার পর আন্ডারগ্রাউন্ডের রেসিং ক্লাবে একটা পার্টি আছে। রাতভর সেখানে উচ্ছ্বাস আয়োজন চলবে। যথারীতি সেই ইভেন্টে ব্ল্যাকভেইন টিমকে স্পেশাল গেস্ট হিসেবে ইনভাইট করা হলেও, টিমের লিডারের কোনো হদিস না পেয়ে সকলেই কিছুটা চিন্তিত, বিভ্রান্ত।
মূলত তালহা,সাদা,জায়ান আর ফারিস—চারজন মিলে সকালেই একটা কাজে একসাথে বাড়ি ছেড়েছিল। তখন আবার কেকে তাদের সাথে যায়নি। কথা ছিল রাতের ইভেন্টে তারা একসাথে যাবে। কিন্তু চারজন সারাদিনের কাজ সেড়ে বাড়িতে ফিরে কোথাও কেকে-কে না পেয়ে ভ্রু কুঁচকে ফেলল। সারাবাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজেও তার কোনো হদিশ নেই। ফোন করলে ফোনও ধরছে না। ওদিকে সেই সন্ধ্যা রাত থেকে মেঘের তীব্র ঘনঘটার পর রাত নয়টা নাগাদ থেকে তুমুল ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়েছে; যা এখনো থামার কোনো নামগন্ধ নেই। ফলে চারজন বাড়িতে এসেই যেন এই ঝড়ের মাঝে ফেঁসে গিয়েছে। কিন্তু কেকের কোনো হদিশ না পেয়ে মোটামুটি সবাই এখন চিন্তিত।
এই বেটা কখন কি করে বসে কে জানে।
সাদ রোজির সাথে ফোনে কথা বলতে বলতে নিজের রুমের বারান্দায় পায়চারি করতে লাগল। রোজিও নিজের এপার্টমেন্টে, সেও কেকের কোনো খোঁজ জানে না; এ বাড়িতেও আজ সে আসেনি। সম্ভবত কাল আসতে পারে। কিন্তু কেকে বান্দা কোথায়?
আকাশ কাঁপিয়ে তীব্র বিদ্যুৎ চমকানোর আর ঝড়-বৃষ্টির মাঝেই, বারান্দা হতে সাদের নজর পড়ল বাড়ির সামনেই পার্কের সাইডে একটা কালো ফেরারির দিকে। একমুহূর্তও লাগল না তার সেই গাড়িটাকে চিনে ফেলতে। সে বিস্ময়ে বিড়বিড় করে বলল,
“আশ্চর্যজনক ব্যাপার তো! কেকের ফেরারি এভাবে গ্যারেজে না রেখে ঝড়বৃষ্টির মাঝে রাস্তায় ফেলে রেখেছে? এ-ও কি বিশ্বাস যোগ্য? এই ফেরারি পাগলু গেছে কোথায়? গাড়ি বাড়ির সামনে অথচ বেটা নিজে বাড়িতে নেই।”
সাদ গভীর ভাবনার আবর্তে ক্রমশ অস্থির হয়ে উঠল। এরিমধ্যে গাড়ির দিকে তাকিয়ে আরও একটি অদ্ভুত জিনিস লক্ষ করতেই তার ধ্যানজ্ঞান যেন এক নিমেষে উবে যাওয়ার দশা হলো! বিস্ময়ে চোখ দুটো ছানাবড়া করে সে বারান্দার রেলিংয়ে দু-হাত শক্ত করে ঠেকিয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করল—আদতে ওখানে কী ঘটছে। তার মুখ থেকে অত্যন্ত অস্ফুটে, রুদ্ধশ্বাসে নির্গত হলো,
—“হোয়াট দ্য হেল! গাড়ি এভাবে নড়ে কেন?”
সাদের চিন্তাভাবনা করার ক্ষমতা যেন এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে গেল। এই তো মাত্র মাস দুয়েক হলো কেকে তার পুরোনো মডেলের ফেরারিটা চেঞ্জ করে সম্পূর্ণ নতুন এই গাড়িটা নিয়েছে। অথচ এখনই এটার সিস্টেমে এমন ভয়াবহ গড়বড় শুরু হয়ে গেল? এই ঝড়বৃষ্টি আর নিঝুম রাতের মাঝে গাড়িটা থেমে থেমে এমন অদ্ভুত ও ছন্দোবদ্ধ উপায়ে দুলছে যেন, গাড়ির ওপর আস্ত কোনো জ্বীন-পরী ভর করেছে!
Naar e Ishq part 36
এরিমধ্যে আকাশ চিরে আচমকা এক বিকট শব্দে বজ্রপাত হতেই সাদ চমকে উঠে, ছিটকে বারান্দা হতে দূরে নিজের রুমের ভেতর সরে গেল। সে শুষ্ক ঢোক গিলে বারান্দার কাচের দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে তড়িঘড়ি করে আবারও কেকের নাম্বারে ডায়াল করল। কিন্তু ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ হওয়ার কোনো লক্ষণই দেখা গেল না। সে চরম বিরক্ত ও ত্যক্ত হয়ে নিজের মনে মনে বিড়বিড় করতে লাগল,
“ভাই তুই ফোন ধর—তোর গাড়ির উপর জ্বীনের আছর পড়ছে।”
