এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ২৫
নুসরাত ফারিয়া
সূর্যের আলো ফুটতেই খাসিয়া বৃদ্ধার প্রতি অনেক কৃতজ্ঞতা জানিয়ে, বিদায় নিয়ে আলোকে নিয়ে রওনা দিয়েছে আধার। জ্বরে মেয়েটার শরীর পু’ড়ে যাচ্ছে। জ্ঞান হারিয়ে তার কাঁধের ওপর পড়ে আছে। হাসপাতালে না নেওয়া অবধি সে শান্তি পাবে না। পায়ে হেঁটে সর্তকতার সাথে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হেঁটে চলেছে। আসার সময় লোকটা বেরোনোর রাস্তা দেখিয়ে দিয়েছে। তাই খুব সহজেই জঙ্গল ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারল এবং দেখল—তূর্ণ কয়েকজন মানুষজনকে নিয়ে এদিকেই আসছে। হয়তো তাদেরকে খোঁজার জন্য এসেছে।
-“কী হয়েছে মেয়েটার?”
তূর্ণ আলোকে খেয়াল করে চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করল। আধার কপালে স্লাইড করতে করতে বলল,
-“পাহাড় থেকে পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছে আর অনেক জ্বর এসেছে। ওকে ইমিডিয়েটলি হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে!”
তূর্ণ আর কথা বাড়াল না। নিজের সঙ্গে করে নিয়ে যেতে যেতে কিছু একটা দেখে বলল,
-“তোর ঠোঁটে কী হয়েছে?”
আধার তপ্ত শ্বাস ফেলে বিরবির করে বলল,
-“বেয়াদব পোকা কামড়েছে।”
-“পোকা নাকি তোর বউ কামড়েছে?”
আধার বিরক্তিতে চোখমুখ কুঁচকে কিছু না বলে হনহনিয়ে চলে গেল। এই বেয়াদব মেয়েটার জন্য তার মানইজ্জত শেষ। তূর্ণ পিছনে আসতে আসতে নিঃশব্দে হাসল।
আলোকে নিয়ে সোজা হাসপাতালে এসেছে আধার। তারপর সবকিছু কমপ্লিট করে মেয়েটাকে ভর্তি করিয়ে দিয়েছে। আপাতত এখানেই চিকিৎসা চলবে।
পুরো একটা দিন এবং একটা রাত হাসপাতালে থেকে পরেরদিন সকালে রিসোর্টে ফিরে এসেছে। এখানে তারা একদিন থাকবে। তারপর ঢাকায় ফিরে যাবে। গতকালই সকল স্টুডেন্টকে নিয়ে তূর্ণ ও অন্য শিক্ষক চলে গিয়েছে। যেহেতু এখানে আসার আগে দিন নিধারিত করা ছিল, তাই তারা সময়ের মধ্যেই চলে গিয়েছে। নয়তো এটা নিয়ে আবার সবার পরিবারকে কৈফিয়ত দিতে হতো। আর সে ঝামেলা চায়নি। আলোর বন্ধুমহলকে ভুজুংভাজুং বুঝিয়ে, সুঝিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে। বিচ্ছুগুলা মেয়েটাকে ছেড়ে যাবেই না। সে কোনোমতে সবাইকে বুঝিয়েছে!
আলোর শরীর আগের থেকে কিছুটা ভালো হলেও হাঁটতে একটু সমস্যা হচ্ছে। গোড়ালিতে এবং হাঁটুতে বেশ ভালোই আঘাত পেয়েছিল। জ্বরটা আগের চেয়ে কমে এসেছে। মানুষটা বলেছিল, আরো কিছুদিন হাসপাতালে থাকতে। কিন্তু সে শোনেনি। তার হাসপাতালে থাকলে দম বন্ধ লাগে। তাই মানুষটাকে কোনোমতে বুঝিয়ে চলে এসেছে৷
-“স…স্যার?”
আধার শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে এসে তোয়ালে দিয়ে ভেজা চুলগুলো মুছছিল। তখন আলো ধীর কণ্ঠে ডেকে উঠল৷ আধার কাছে এগিয়ে এসে বলল,
-“বলো?”
আলো বিছানায় আধশোয়া হয়ে শুয়ে ছিল। এবং তারা ভিলায় রয়েছে। সে স্যারের নিচের ঠোঁটের দিকে ইশারা করে জিজ্ঞেস করল,
-“ওখানে কী হয়েছে?”
আধার বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে নিজের ঠোঁট স্পর্শ করে বলল,
-“আমার সঙ্গে একটা নেংটি ইঁদুর রয়েছে, তিনিই এই আকামটা করেছেন।”
-“আপনার কাছে ইঁদুর আছে? কই আগে তো কখনো বলেননি।”
-“আমিও জানতাম না, কিন্তু গত পরশু রাতে জেনেছি।”
আলো বিছানার হেড বোর্ডে মাথা ঠেকিয়ে বলল,
-“সত্যি করে বলুন না? আপনার ঠোঁটে কে কামড় দিয়েছে?”
-“তুমি বর্তিত আধার খানকে ছোঁয়ার সাহস অন্য মেয়ে রাখে না।”
স্যারের কথা শুনে আলো খুব বেশি অবাক হলো না। কারণ তার সেইদিন রাতের আবছা আবছা কিছু মূহুর্ত মনে আছে৷ সে তো দেখতে চেয়েছিল, লোকটা কী বলে!
আধার চুপচাপ রুম থেকে বেরিয়ে গিয়ে দুপুরের খাবার নিয়ে এসে মেয়েটাকে খাইয়ে দিয়ে ঔষধ খাইয়ে দিল। তারপর নিজেও খাবার খেয়ে নিল! দুই রাত থেকে তার একটুও ঘুম হয়নি। তাই সিদ্ধান্ত নিল, এখন একটু ঘুমাবে। যেই ভাবা সেই কাজ, রুমের বাতি নিভিয়ে আলোর পাশে এসে বালিশে মুখ গুঁজে উবুড় হয়ে শুয়ে পড়ল৷ কিন্তু তার ঘুম ধরছে না, উল্টো মাথা ব্যথা করছে। কিছুক্ষণ দাঁতে দাঁত চেপে ঘুমানোর চেষ্টা করেও যখন চোখের পাতায় ঘুম ধরা দিল না তখন উঠে বসল।
-“মাথা ব্যথা করছে?”
আলোর কথা শুনে আধার ছোট্ট করে জবাব দিল,
-“হু!”
-“আপনি চাইলে ওইদিনের মতো আমার কোলে মাথা রাখতে পারেন। আমি হেড ম্যাসাজ করে দিচ্ছি!”
আধার কিছু সময় চোখ বুজে চুপ থাকল। তারপর ভদ্র ছেলের মতো মেয়েটার কোলে মাথা রাখল। আলো মুচকি হেঁসে দু’হাতে যত্নসহকারে কপাল ম্যাসাজ করে দিতে লাগল। আধার আরাম পেয়ে নাকেমুখে শব্দ করে নিঃশ্বাস ছাড়ল। তারপর হঠাৎই পাশে ঘুরে দু’হাতে মেয়েটার পাতলা কোমর জড়িয়ে ধরে নরম পেটের মাঝে মুখ গুঁজে দিল। মাঝেমধ্যে এমন একটু অবাধ্য হলে মন্দ হয় না!
আলো ঠোঁট কামড়ে হেঁসে স্বামীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকল। তারপর ভাবল—এই পঁচা স্যারটা একটু হলেও তার! উমম…হয়তো বেশিইই।
দীর্ঘ ছয়-সাত ঘন্টা জার্নি করার পর অবশেষে খান বাড়িতে পৌঁছাল আধার এবং আলো। গ্রাম থেকে তাহমিনা খান, রাত ফিরে এসেছে। তিথি এসে একদিন থেকে আবার চট্টগ্রামে ফিরে গেছে। নাতবউয়ের অসুস্থতার কথা শুনে সোবহান খান এসে দেখে গিয়েছে মেয়েটাকে। লম্বা জার্নি করে আসার ফলে মেয়েটা ভীষণ ক্লান্ত। তাই আজ পুরো দিনটাই শুয়ে থেকে কাটিয়ে দিয়েছে। এমনিতেই হাঁটলে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হচ্ছে, তাই আর সে খুব একটা হাটাহাটি করছে না।
বাড়িতে ফেরার পর আধার দাদাজানের কাছে একদফা বকাবকি খেয়েছে। উনার মতে, সে ইচ্ছে করেই মেয়েটাকে জঙ্গলে রেখে এসেছিল। ফলস্বরূপ মেয়েটার এখন এই অবস্থা! আধার চুপচাপ সব কথা হজম করে নিয়েছে। বলতে গেলে—এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে অন্য কান দিয়ে বের করে দিয়েছে। কারণ সে জানে, এই বুইড়াটা ওই পাঁজি মেয়েটাকে একটু বেশিই ভালোবাসে। তাই অহেতুক কথা বাড়াতে চায়নি। কিছু বললেও কানে তুলবে না। উল্টো আরো তাকেই কথা শোনাবে!
-“শুনলাম ওই মেয়ে এখানে থাকছে?”
সন্ধ্যার দিকে রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে থেকে হালিম রাঁধছিল আধার। এই ক’টা দিনে জ্বরের জন্য মেয়েটা কিছু খেতে পারছে না। ভাত তো মুখেই তুলতে চাচ্ছে না। সে কোনোমতে ধমকে-ধামকে জোর করে খাইয়ে দেয়! মেয়েটা আবার বাইরের জিনিস খেতে পছন্দ করে, আর তার অপছন্দ। তাই বাড়িতেই একটু ঝাল ঝাল করে হালিম তৈরি করছে। ঠিক তখনই পাশ থেকে তাহমিনা খানের কথা শুনে ফিরে তাকায় এবং শান্ত গলায় বলল,
-“এখানে থাকবে না তো কোথায় থাকবে? আমার জানা মতে এটাই তার বাড়ি! উমমম….শশুর বাড়ি।”
-“তুমি তো মেয়েটাকে বউ হিসেবে মানো না, তাহলে?”
আধার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
-“আমি মানি বা না মানি, এতে কী আমাদের সম্পর্ক মিথ্যে হয়ে যাবে? আর ওই মেয়েটা আমার বউ হয়ে থাকলেও আমার কোনো অসুবিধা নেই।”
তাহমিনা খানের চেহারায় গাম্ভীর্য ফুটে উঠল। আধার মনোযোগ সহকারে হালিম নাড়তে নাড়তে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“এখানে থাকতে আমি বলেছি মেয়েটাকে। আশা করছি এ বিষয়ে আপনি ওকে কিছু বলবেন না!”
তাহমিনা খান পাল্টে প্রশ্ন করলেন,
-“ওই মেয়েটার জন্য এইভাবে কাজকাম ছেড়ে দিয়ে আর কতদিন বসে থেকে রান্না করবে?”
-“কী আর করব বলুন? কপাল করে পেয়েছিলাম একটা পরিবার, যেখানে আমার বউকে দেখার মতো কেউ নেই। দাদাজান বৃদ্ধ মানুষ, তিনি তো আর কিছু করতে পারবেন না। তাই আমিই আমার বউয়ের সেবা করছি। আর এতে যদি বাড়িতে একমাসও বসে থেকে রান্না করতে হয়, তাহলেও প্রস্তুত এই আধার খান!”
-“তুমি তো আগে এমন ছিলে না?”
-“সময়, পরিস্থিতি মানুষকে পাল্টে দেয়। আর আমি কখনোই নিজের দায়িত্ব থেকে পিছপা হইনি।”
তাহমিনা খান আর কিছু বললেন না। ওখান থেকে হনহনিয়ে চলে গেলেন। আধার আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। হঠাৎই সে মনে মনে নিজের মা’কে একটা প্রশ্ন করল,
-“আচ্ছা মা? তুমি থাকলেও কী এমন করে ওই মেয়েটাকে অবহেলা করতে?”
পরক্ষণেই আবার বলল,
-“উঁহু, কখনোই না। তুমি তো আমার বেস্ট মা ছিলে। যার কাছে শুধুই আদর আর ভালোবাসা পাওয়া যেত। আজ তুমি যদি থাকতে তাহলে নিশ্চয়ই মেয়েটাকে আমার থেকেও বেশি ভালোবাসতে, আদর করতে! কারণ ওই পাঁজি মেয়েটাই এমন।”
আধার আনমনে হেঁসে গ্যাস বন্ধ করে দিল। তারপর কাঁচের দুইটা বো-লে গরম গরম হালিম তুলে নিয়ে প্রথমে দাদাজানের রুমে গেল। দাদাজানকে হালিম দিয়ে নিজের রুমে এসে দেখে আলো বিছানার উল্টো দিকে শুয়ে আছে, যার অর্ধেক শরীরই বাইরে ঝুলছে।
-“ঝুলে থাকতে যদি এতোই ভালো লাগে তাহলে বাগানের গাছে গিয়ে ঝুলে থাকো৷ তোমাকে তো আর এমনি এমনি বাঁদর বলি না!”
আলো হতাশ কণ্ঠে বলল,
-“কিছু ভালো লাগছে না স্যার।”
-“পাহাড় থেকে আরেকবার ঝাপ দাও, তাহলে দেখবে ভালো লাগবে।”
একথা বলে এগিয়ে এসে টি-টেবিলের ওপর ট্রে রাখল। আলো সুস্বাদু খাবারের ঘ্রাণ পেয়ে চট করে উঠে বসল। তারপর উঁকি দিয়ে দেখে জানতে চাইল,
-“আপনি রেঁধেছেন?”
আধার তোয়ালে নিয়ে ওয়াশরুমে যেতে যেতে বিরবির করে বলল,
-“আমার এত ঠেকা পড়েনি।”
আলো প্রচুর বিরক্ত হয়। এই শ্লার ব্যাডার ত্যাড়ামি আর ভালো হলো না। সে ফোঁস করে শ্বাস ফেলে হালিমের বাটি নিয়ে ফু দিয়ে দিয়ে খেতে শুরু করল। তারপর একটু গলা উঁচিয়ে বলল,
-“পাহাড় থেকে পড়ার পর যদি এমন মজাদার খাবার পাওয়া যায়, তাহলে আমি প্রতিবার পড়তে রাজি আছি।”
কথার বিপরীতে শোনা গেল,
-“এবার খাবার তোমার পেটে নয় বরংচ তুমিই খাবার হয়ে যাবে কুমিরের পেটে।”
আলোর শরীরটা ভালো। তাই আজ ভার্সিটিতে গিয়েছে আধার। যাওয়ার সময় মেয়েটাকে বলে গিয়েছে, অহেতুক টইটই করে যেন না ঘুরে এবং রেস্ট নিতে। কিন্তু আলো শুনলে তো সে কথা? বিকেল হতে না হতেই বাগানে এসে ফুলের গাছে পানি দিতে শুরু করেছে। খুড়িয়ে খুড়িয়ে হেঁটে হলেও তার এখন ফুলের গাছে পানি দেওয়া চাই!
-“একি নাতবউ? তুমি এখানে?”
সোবহান খান বাগানে হাঁটতে এসেছিলেন, তখন মেয়েটাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন। আলো ঘাড় ঘুরিয়ে একগাল হেঁসে বলল,
-“গাছে পানি দিচ্ছি দাদাজান।”
-“সেটা নাহয় বুঝলাম, কিন্তু তুমি তো অসুস্থ।”
-“অসুস্থ ছিলাম দাদাজান, কিন্তু এখন সুস্থ। শুধু একটু পায়ে ব্যথা এই। সারাদিন রুমের ভেতর থাকতে ভালো লাগে না।”
সোবহান খান আর কিছু বললেন না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে মেয়েটার কর্মকাণ্ড দেখতে লাগলেন। আলো একটু সময় নিয়ে সবগুলো গাছে পানি দিয়ে দোলনায় এসে বসে দাদাজানকে হাতের ইশারা দিয়ে ডেকে, পাশে বসতে বলল। সোবহান খান পাশে এসে বসতেই মেয়েটা বকবক করতে শুরু করল। এতদিনের না বলা কথাগুলো সব বলতে থাকল, ট্যুরে গিয়ে কী কী করেছে, কোথায় কোথায় গিয়েছে সবকিছুর গল্পের ঝুড়ি খুলে বসল। আর সোবহান খান খুবই মনোযোগ সহকারে মেয়েটার গল্প শুনতে লাগলেন।
আলো বাগানে এখন একা দোল খাচ্ছে। একটু আগে সোবহান খান বাহিরে গিয়েছে। সন্ধ্যা প্রায় হয়ে এসেছে। আর একটুপর স্যারও চলে আসবে। মানুষটার কথা মনে হতেই আলো উঠে দাঁড়ায়। এখন রুমে গিয়ে ভদ্র মেয়ের মতো শুয়ে থাকবে। একটু বেশি হাটাহাটি করার জন্য বাম পা টা টনটন করছে। সে আর না দাঁড়িয়ে থেকে আস্তে আস্তে হেঁটে সামনে এগোতে লাগল।
বাগান থেকে বেরিয়ে আসতেই আলোর চোখদুটো ইয়া বড় বড় হয়ে গেল। কারণ তার দিকেই একটা বাইক ছুটে আসছে। বাইকটা একদম তার গা ঘেঁষে থামল। আচমকা এমন হওয়ায় সে ভয় পেয়ে পিছিয়ে যেতেই ধপাস করে নিচে পড়ে গেল। হাতে ব্যথা পেয়ে লোকটার ওপর খেঁকিয়ে উঠল,
-“ওই কানা! চোখের মাথা খেয়েছেন? নাকি কম দেখেন?”
বাইকের ওপর বসা যুবকটা এক টানে মাথার হেলমেট খুলে ফেললো। আলো কিছু বলতে চেয়েও চমকে উঠল। বড় বড় চোখে তাকিয়ে থেকে অবাক কণ্ঠে শুধাল,
-“আ…আপনি?”
রাত হেঁসে বলল,
-“যাক ভুলে যাওনি তাহলে?”
আলোর ভীষণ রাগ হলো। এই শয়তানটার জন্য আর একটু হলেই সে হার্ট অ্যাটার্ক করত! রাগে গজগজ করতে করতে উঠে দাঁড়িয়ে জামাকাপড় ঝেড়ে ঝাঁঝাল কণ্ঠে বলল,
-“আমি আপনাকে বাঁচিয়েছিলাম, আর আপনি কি-না আজ আমাকেই মা’রতে চেয়েছেন? এইজন্য বলে অন্যের ভালো করতে নেই। ইচ্ছে তো করছে, এই বাইক তুলে এখন আপনার মাথায় আছাড় মা’রি।”
-“তুমি কথায় কথায় এত হাইপার হও কেন বলো তো, বোম্বাই মরিচ?”
-“যে যেমন, তার সাথে আমিও তেমন। এই ওয়েট…ওয়েট… একটু আগে কী বললেন? বোম্বাই মরিচ? এ্যাই…কাকে আপনি বোম্বাই মরিচ বললেন?”
-“অবিয়েসলি তোমাকে।”
-“আমি বোম্বাই মরিচ হলে আপনি একটা গন্ডার!”
রাত হেঁসে মেয়েটার দিকে মাথা এগিয়ে নিয়ে এসে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“এখানে কী করছো?”
-“আপনি কে যে, আপনাকে কৈফিয়ত দিবো।”
-“এখন কেউ না হলেও ভবিষ্যতে হবো।”
আলো কপাল কুঁচকে কিছু বলতে যাবে তখনই গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
-“কী হচ্ছে এখানে?”
আলো চট করে মাথা ঘুরিয়ে পাশে তাকাতেই দেখতে পেল গাড়ি থেকে নেমে আধার স্যার এসে দাঁড়িয়েছে। আধার দু’হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে এগিয়ে আসতে আসতে খেয়াল করল, রাত আলোকে দেখতে ব্যস্ত!
-“তুমি বাহিরে কেন?”
আলো কথার বিপরীতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে স্যারের কাছে এসে নালিশ দিল,
-“দেখুন না স্যার, ওই বজ্জাত ব্যাডা আর একটু হলেই আমার গায়ের উপর বাইক তুলে দিত। এই যে দেখুন, আমি হাতে ব্যথা পেয়েছি!”
একথা বলে নিজের বাম হাতের উল্টো পিঠ সামনে বাড়িয়ে দিল। আধার কপাল কুঁচকে সেদিকে তাকায়। মেয়েটার ফর্সা হাতটা ছিঁলে লাল হয়ে আছে। এটা দেখে চোয়াল শক্ত হলো। রাতের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“এটা বাড়ি নাকি পার্ক মনে হয় তোর?”
রাত হামি তুলে বলল,
-“দুটোই।”
আধার দাঁতে দাঁত পিষলো,
-“নেক্সট টাইম যদি তোর বাইকের জন্য মেয়েটা ব্যথা পায়, তাহলে আমি ওই বাইকের আস্ত রাখব না। মাইন্ড ইট!”
রাত কপাল কুঁচকে তাকায়। এর আবার কবে থেকে মেয়েদের প্রতি এত দরদ হলো?
আধার আলোর দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
-“ওর তরফ থেকে আমি সরি!”
আলো তো কিছু বুঝতে না পেরে শুধু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে। এতক্ষণ যা হলো, সবটাই মাথার ওপর দিয়ে গেছে। আধার আবারো বলল,
-“এসো।”
একথা বলে মেয়েটার হাত ধরে আস্তেধীরে ভেতরে নিয়ে যেতে লাগল। আর রাত বাইকের ওপর বসে থেকে তীক্ষ্ণ চোখে ওই হাত ধরে থাকার দৃশ্যটা দেখল। তারপর কিছু একটা ভেবে মনে মনে বিরবির করল,
-“তাহলে বোম্বাই মরিচই আধার খানের ওয়াইফ?”
কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব? তাদের না ডিভোর্স হলো? তাহলে? রাত ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ চুপ থাকল। তারপর বাইক থেকে নেমে বড় বড় পা ফেলে ভেতরে যেতে লাগল। তার সকল প্রশ্নের উত্তর এখন একজনের কাছেই পাওয়া যাবে। আর সেটা হলো তার মা!
আধার আলোকে রুমে নিয়ে এসে হাতে মলম লাগিয়ে দিল। আলো কিছুটা সময় থম মে’রে বসে থেকে ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইল,
-“ওই লোকটা কে?”
আধার শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে ধীর কণ্ঠে জবাব দিল,
-“রাত! এ বাড়ির ছোট ছেলে।”
আলো অবাক হলো। তারমানে সে দেবরের সাথে ঝগড়া করছিল? ঠিকই করেছে, ওই লোকটা বকাবকি শোনা ডিজার্ভ করত। শুধু শুধু তার হার্টবিট বাড়িয়ে দিয়েছিল।
-“তুমি ওকে চেনো?”
স্যারের কথা শুনে আলো মাথা নাড়িয়ে বলল,
-“হুম! ওই যে বলেছিলাম না, একজন ঠসাকে বাঁচিয়েছিলাম? ওইটাই আপনার ভাই, মানে আমার ঠসা দেবর।”
বলেই হাসল আলো। আধার কিছু না বলে টি-শার্ট, ট্রাউজার নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। গোসল করে বেরিয়ে এসে আলোকে দেখতে না পেয়ে বিরক্ত হলো। এই লেংড়ু মেয়ে আবার কই গেল!
-“হাই!”
আলো রান্নাঘরে স্যারের জন্য খাবার রেডি করছিল। তখন পাশ থেকে বাক্যটি শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। রাত শাওয়ার নিয়ে শুধু ট্রাউজার পরে দাঁড়িয়ে আছে। আলো নজর সরিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“বাই।”
রাত হাসল। এগিয়ে এসে কাউন্টারের সাথে হেলান দিয়ে বলল,
-“তুমি এমন কেন?”
-“আমি যেমনই হই, তাতে আপনার কী!”
রাত উদাস কণ্ঠে বলল,
-“তোমার মতো বোকা মেয়ে আর দুটো দেখিনি।”
আলো কিছু বলল না। রাত ফের বলল,
-“স্যারের জন্য কফি বানাচ্ছো?”
-“হু!”
-“আমার জন্য হবে?”
-“অবশ্যই।”
আলো কফি বানিয়ে আগে রাতকেই দিল। হাজার হোক, দেবর বলে কথা৷ রাত কফিতে চুমুক দিয়ে নাকমুখ কুঁচকে বলল,
-“তোমার স্যারের মতো আমাকেও বেরসিক মনে হয়?”
আলো কিছুক্ষণ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থেকে চিনি এগিয়ে দিল৷ রাত এক চামচ চিনি নিয়ে বলল,
-“আধার খানের মতো সবাই তিতা না!”
আলো ভেংচি কেটে অমলেট বানাতে ব্যস্ত হলো। রাত কফি খেতে খেতে বলল,
-“ওমন গুরুগম্ভীর লোকের কাছে কেন আছো? সুযোগ পেয়েছিলে তো মুক্ত হতে, তাহলে চলে গেলে না কেন? তুমি কী জানো? তুমি এর থেকেও ভালো কাউকে ডিজার্ভ করতে।”
আলো আনমনে হেঁসে বলল,
-“আপনি ভুল বললেন ভাইয়া। স্যার গুরুগম্ভীর হলেও উনি আমার কাছে আলাদা৷ আর আমি কখনোই মুক্ত হতে চাইনি, ছোট বেলা থেকে তো মুক্ত পাখিই ছিলাম। এখন না-হয় আপনার ভাইয়ার খাঁচায় বন্দী হয়ে থাকলাম! আর উনিই আমার কাছে বেস্ট অপশন৷ বিকজ….আমাকে উনি ছাড়া আর কেউ সামলাতে পারবে না!”
রাত আরো কিছু বলতে যাবে কিছু পিছনে কারোর অস্তিত্ব অনুভব করে ঘুরে তাকায়। আধার গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে৷ রাত কফির মগে লম্বা চুমুক দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে যেতে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“তোমার স্টুডেন্টের হাতের কফি মারাত্মক! আই লাভ ইট।”
আধার প্রতিত্তোরে কিছু না বলে আলোর দিকে তাকায়। রাত হেঁসে চলে যায়৷
-“কফি চেয়েছি?”
আলো কফি নিয়ে এগিয়ে আসতেই আধার গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল। মেয়েটা মাথা তুলে তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“আপনি এসময়ে তো কফি খেতে পছন্দ করেন।”
-“সো হোয়াট?”
আলো কি বলবে বুঝতে পারল না। কফির মগ নিয়ে সরে আসতে চাইলে খেয়াল করল, লোকটা কফি নিয়েছে৷
-“ত্যাড়ামি না করলে আপনার শান্তি হয় না?”
আধার কফির মগে চুমুক দিতে দিতে বলল,
-“উঁহু।”
আলো বিরক্তিতে চোখমুখ কুঁচকে প্লেটে নাস্তা সাজাতে লাগল। আধার কফি খেতে খেতে মেয়েটার মুখের দিকে তাকায়। রাতের বলা কথাগুলো তার কানে এসেছিল, সাথে মেয়েটার বলা জবাবও। হঠাৎই তার মনের গহীনে একটা প্রশ্ন জাগলো! আচ্ছা, সে কী সত্যিই মেয়েটার জন্য বেস্ট অপশন? কিন্তু….তার তো সেটা মনে হয় না।
আধার আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তার কেন জানি সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
-“ওই মাস্টারমশাই….কই হারালেন?”
মেয়েটার ডাকে ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে এল আধার। কখন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করেনি। সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
-“বলো?”
-“ডাইনিংয়ে বসুন, আমি খাবার নিয়ে যাচ্ছি।”
-“উঁহু, রুমে নিয়ে এসো।”
বলেই আধার কফি শেষ করে মগ কাউন্টারের ওপর রেখে চলে গেল। আর আলো প্লেট নিয়ে পিছু পিছু ছুটল!
-“খাবার নিয়ে আসতে বলে, এখন আপনি ল্যাপটপ নিয়ে বসলেন কেন?”
আলো রুমে এসে দেখে মানুষটা ল্যাপটপ নিয়ে সোফায় বসেছে। এটা দেখে অবাক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল। কিন্তু আধার কিছু বলল না। আলো কিছুক্ষণ থম মে’রে দাঁড়িয়ে থেকে হঠাৎই হেঁসে উঠে বিরবির করে বলল,
-“এত নাটক না করে বললেই তো হয়, আমার হাতে খেতে চান।”
-“টেবিলের ওপর রাখো, কাজ শেষে খেয়ে নিবো।”
-“থাক, খাবারগুলোকে আর কষ্ট দিতে হবে না। তারা জলদি যেতে চায় আপনার পেটের ভেতর!”
একথা বলে আলো হাত ধুয়ে এসে স্যারের পাশে বসল। পরোটা ছিঁড়ে ডিম নিয়ে মুখের সামনে ধরে বলল,
-“আজ যদি আপনি আবার কামড় দেন, তাহলে আমিও আবার কামড় দিবো।”
আধার খাবার মুখে নিয়ে বলল,
এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ২৪
-“শুকরিয়া আদায় করো, এখনো তোমার দাঁত ভেঙে দেইনি।”
-“দাঁত ভেঙে দিলেও কী? নখ আছে তো? আপনার ওই কিউট জায়গায় চিমটি কাটতাম।”
বলেই খিলখিল করে হেঁসে উঠল আলো। হাসিমাখা মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে একসময় আধার অস্ফুটস্বরে বলে উঠল,
-“যেদিন আমার সমস্ত ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে যাবে, ওইদিন দেখব তুমি কোথায় পালাও মিস. কালো!”

অনেক ধন্যবাদ আপু গল্পটা দেওয়ার জন্য ♥️
please 26 number part part🥹
Aj ki new episode upload korben na?
Next episode kobe diben???