বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৬৫
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
মানুষকে ভোলার জন্য প্রথম ধাপ হলো তার থেকে একটু একটু করে দূরে আসা৷ যোগাযোগ বন্ধ করা। অথচ হিয়া এমন এক জটিল মানুষকে ভুলতে চাইছে যে কিনা তারই বেস্টফ্রেন্ড। এমন একটা জটিল যোগাযোগ বন্ধ করা যায়? যেখানে হিয়া কখনো প্রকাশই করে উঠতে পারেনি যে সেও দীপ্রকে একটু একটু করে ভালোবেসে ফেলেছে। আবার অপর বন্ধুত্বের জন্য রোজ যোগাযোগটাও রাখতে হচ্ছিল। ভুলার চেষ্টা করেও ভুলা হয়ে উঠছিল কোথায়? বরং হাসিমুখে বুকের ভেতর দহন রেখে সহ্য করে যেতে হচ্ছিল সব। বুঝাতে হচ্ছিল, বন্ধুর সুখে সেও সুখী। হিয়া ছোটশ্বাস ফেলে। দীপ্রর সাথে যোগাযোগটা শেষ করার জন্যই সে এই মিথ্যেটা বলেছে যে তার আকদ হয়েছে। অন্তত যোগাযোগ কমে আসলে তো সে এই মানুষটার প্রতি অনুভূতি গুলো ও ধীরে ধীরে ভুলে থাকতে পারবে। এভাবে অন্য একজনের জন্য কষ্ট পেয়ে কি পথ চলা যায় জীবনের পথে? যায় না। যে পথে পা বাড়িয়ে লাভ নেই সে অনুভূতিদের ঝাপিয়ে রেখে মূর্ছা যাওয়ারও মানে নেই। হিয়া বাস্ততবাদী মেয়ে। অন্তত কিশোরীদের মতো প্রেমিকের জন্য মরে যাওয়াটাকে সে জীবনের স্বার্থকতা ভেবে উঠতে পারে না। হিয়া ছোটশ্বাস ফেলল। পিছু ঘুরতেই কানে এল মিথির মৃদু স্বর,
“ আকদ হলো তোর? মিথ্যে বললি কেন দীপ্রকে? ”
হিয়া এবারে মৃদু হাসল। বলল,
“ দূরে সরতে চাই ওর থেকে। বিনা কারণে তো বন্ধুত্বও ভাঙ্গতে পারছিলাম না। আর না তো আমি চাই, ওর সাথে আমার বন্ধুত্বটা ভাঙ্গুক। থাকুক সবসময়, যোগাযোগ না থেকেও বন্ধুত্বটা থাকুক। সুন্দর একটা সমাপ্তি থাকুক ওর আর আমার। ”
মিথি তাকাল। হিয়া আবারও হেসে বলল,
“ আমি কি বোকা তাই না মিথি? বোকার মতো কি করে ভেবে বসলাম যে দীপ্র আমাকে ভালোবাসে? কি করে ভাবলাম যে ও আমার জন্য ভাবে। কি পাগল আমি মিথি। নিজের এই বোকামোতে কি লজ্জা লাগে আমার। ”
মিথির কেমন দুঃখ হলো। দীপ্র কেন ভালোবাসল না হিয়াকে? বাসলে কি এমন ক্ষতি হতো? প্রথম প্রথম তো ঠিকই মনে হতো, দীপ্র হিয়াকে ভালোবাসে। মিথি মৃদু গলাতে বলল,
“ ও হয়তো সত্যিই তোকে ভালোবাসত হিয়া। এতসব এফোর্ট মিথ্যে ছিল বল?”
হিয়া হাসল তাচ্ছিল্য নিয়ে৷ আকাশের দিকে চেয়ে বলল,
“ সত্যি ছিল। কিন্তু এফোর্টগুলো শুধু বন্ধু হিসেবেই ছিল। ”
“ নাহ, আমার এখনো মনে হয় ও শুরুর দিকে তোকে ভালোবাসত হিয়া। আমার প্রেগনেন্সি টাইমটাতে দীপ্রকে যতবার দেখেছি আমার কেবল মনে হয়েছিল ও তোকে ভালোবাসে। কিন্তু এখন কেমন বদলে গেছে ছেলেটা। হয়তো পুরুষ মানুষের ভালোবাসা বদলে যায় সময়ে সময়ে।পুরুষ মানুষ বদলায়, তাদের অনুভূতিও বদলায়। ”
হিয়া এবারে হাসল। কেমন ম্লান হাসি। উত্তরে বলল,
“ হয়তো। হয়তো, ওখানে গিয়ে বেটার অপশন পেয়ে আমার কথা আর মনেই থাকেনি ওর। আমাকে বলেওনি ওর বেটার অপশনের কথা। জানিস মিথি? কিছু জিনিস বোধহয় না পাওয়াই ভালো। তাই না? প্রাপ্তিতেই যদি সুখ থাকত তাহলে অপ্রাপ্তি নিয়ে কেউ বাঁচত? ও থাকুক না, আমার না পাওয়া অনুভূতি হিসেবে। ”
হিয়া যখন এইটুকু বলেই ছোটশ্বাস ফেলল ঠিক তখনই হিমেল এল। কোলে মিষ্টি। একটু আগেই মিষ্টি কোলে করে নিয়ে গেছিল সে৷ আবার ফের এদিকে আসতেই মিথিদের কথার একাংশও শুনতে পেল স্পষ্টই। পুরুষ বদলায়? পুরুষের অনুভূতি বদলায়? মিথি কি ভাবে যে হিমেল ও বদলাবে? হিমেল এইটুকু ভাবল৷ অতঃপর হিয়াকে উদ্দেশ্য করে গলা ঝেড়ে বলল,
“ কিছু জিনিস সরাসরি পেয়ে গেলেই আমরা তার সুখটা পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারি না হিয়া। কিন্তু না পাওয়ার পর সে কষ্টটা বুঝে উঠার পর যখন সে জিনিসটা আমার পাই তখন ঐ সুখটা অন্যরকম হয়। অপেক্ষা করো৷ দেখবে,এর চাইতেও বেশি সুখ অপেক্ষা করছে। ”
হিমেল নিজের জীবন থেকেই বুঝেছে না পাওয়ার যন্ত্রণার পর ঐ জিনিসটা পেলে কেমন সুখ অনুভব হয়৷ তাই তো বলল মৃদু হেসে। পরপরই মিথিকে বলল,
“ মিষ্টির কানে একটা গোলাপ দিব মিথি। কিভাবে লাগাব? ”
মিথি চাইল। হিমেলের হাতে দু দুটো সাদা গোলাপ। মিথি চাইতেই মিষ্টি বলল,
“ আন্ তি চককেট ইয়েছে। ”
মিথি শুনল। মিষ্টির হাতের দু দুটো চকলেট দেখে বুঝল কেউ তাকে চকলেট দিয়েছে আর এতে সে ভীষণ খুশি। বলল,
“ কোন আন্টি আম্মু? ”
মিষ্টি ঘাড় ঘুরাল হিমেলের কোলে ওভাবেই থেকে। অতঃপর এককোণে সাবিহাকে দেখে হাত বাড়িয়ে দেখাল,
“ ঐ.. ”
মিথি ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল। দেখল সাবিহা, বসে আছে। কানে গুঁজেছে সাদা গোলাপ। ঠিক হিমেলের হাতে থাকা সাদা গোলাপের মতো। আচ্ছা হিমেল কেন এতোটা সময় পর সাদা গোলাপ নিয়ে এল কানে গুঁজবার জন্য? সাবিহাকে গোলাপে দেখে ভালো লাগছিল বলে? মিথি চেয়ে আবার নজর ফেরাল। বলল,
“ ওহ। গোলাপও কি আন্টি দিয়েছে? ”
হিমেল কথাটা শুনল। মিথির চাহনিও লক্ষ্য করল। গোলাপের দিকেই। অথচ গোলাপগুলো সাবিহা দেয়নি। হিমেল নিজেই আয়মানের গায়ে হলুদের স্টেজ সাজানোর সময় সরিয়ে রেখেছিল মিথি আর মিষ্টির কানে গুঁজে দিবে বলে। অথচ ব্যস্ততায় ওদের কাছ ঘেষতেই পারেনি ও। অবশেষে যখন দুইজনকে শাড়িতে দেখেছিল তখন হৃদয় শান্ত হয়ে গিয়েছিল। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করছিল কেবল। অন্যদিকে গোলাপগুলো থেকেই রাদিফ অনেক আগেই একটা গোলাপ নিয়ে গুঁজে দিয়েছিল সাবিহার কানে। এখন মিথি কি ভাবছে, কি বুঝাবে হিমেল? হিমেল ছোটশ্বাস ফেলে বলল,
“ গোলাপগুলো মিষ্টির হিম এনেছে। কোন আন্টি টান্টি দেয় নি। ”
হিয়া হেসে ফেলল কথাটা শুনে। হাত বাড়িয়ে মিষ্টিকে কোলে তুলতে তুলতেই বলল,
“ ফুলগুলো মিষ্টির হিম পাপা দিয়েছে। তাই না মাম্মা? বলো, হিম পাপা। ”
মিষ্টিও ঝাপটে ধরল হিয়াকে। ঠোঁট আওড়িয়ে বলার চেষ্টা করল,
“ হিম পা পা। ”
হিমেল শান্ত চোখে চাইল। কি সুন্দর শোনাল ডাকটা। কি সুন্দর! পাপা? হিমেলের চাহনি কেমন শীতল হয়ে এল। সুখ সুখ লাগছে বোধহয়। যদি মিষ্টি সত্যিই তাকে পাপা ডাকত? কত সুখ লাগত! হিমেল চোখ বুঝে। পরমুহূর্তেই চোখ মেলে একবার চাইল মিথির দিকেও। ওর প্রতিক্রিয়া বুঝার চেষ্টা করল নিরব চেয়ে থেকেই। কারণ মিথি প্রথমেই জানিয়েছির মিষ্টির মা এবং বাবা উভয়ই সে। কাউকে দয়া করতে হবে না। কাউকে মিষ্টির বাবাও হতে হবে না। এই কারণে হিমেল কখনো এই দুঃসাহস করেও নি যদি মিথির মতো আত্মসম্মানী মেয়ের আত্মসম্মানে লাগে? ভেবে বসে যদি হিমেল দয়া করছে। হিমেল ছোট শ্বাস ফেলে। তাকিয়েই গম্ভীর স্বরে বলল,
“ ও আমায় পাপা ডাকলে তুই কি অন্যকিছু ভাববি মিথি? তুই কি নিষেধ করবি ডাকতে ওকে? নাকি ভাববি যে, আমি পাপা ডাকতে বলে দয়া করছি?বিশ্বাস কর, আমার অনেকদিনের ইচ্ছে যে.. ”
বাকিটুকু বলতে গিয়ে হিমেল কেমন থেমে গেল যেন। মিথি শুধু স্থির ভাবে তাকাল। হিমেল সে চাহনি পরখ করে আবারও গম্ভীর স্বরে বলল,
“ যদি তোর তেমন কিছু মনে হয় তো থাক। মিষ্টি আমায় পাপা না ডাকলেও সমস্যা নেই। ওর হিম সবসময় ওর বন্ধু হয়েও ওর পাশে থাকতে পারবে। হিম এবং মিষ্টির বন্ধুত্ব বরাবরই একই থাকবে। ”
মিথি বিস্ময় নিয়ে তাকাল। হিমেল ভাই কি ভাবছেন ও উল্টো প্রতিক্রিয়া করবে? নিষেধ করবে? বলল,
“ মিষ্টির বন্ধুও থাকবেন, পাপাও থাকবেন। সবসময়! বুঝেছেন? ”
হিমেল চাইল। গম্ভীর থমথমে মুখটা এবার চকচক করল যেন। পরপরই কিছু না বলেই মিষ্টিকে আবার কোলে নিল হিয়ার থেকে। মিথি বিনিময়ে আর একটা কথাও না বলে দ্রুত পা বাড়াল বিপরীত দিকে। যেতে যেতে মিষ্টিকে বলল,
“ মিষ্টি? হিম তো তোমার পাপাও,শুনেছো তুমি? আমার কি খুশি হওয়া উচিত মিষ্টি? আমার এতোটা শান্তি শান্তি লাগছে! ”
এইটুকু বলতে বলতেই পা বাড়াল হিমেল। তার সত্যিই সুখ সুখ লাগছেে।
আয়মানের হলুদ অনুষ্ঠানের সময়েই ধরনী জুড়ে নেমেছে ঝুম বৃষ্টির ধারা। পুরোটা ছাদ প্রায় বৃষ্টিতে ভিজে একাকার। মিথিরা অবশ্য ছাদের কিনারাটা থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। তবুও প্রায় ভিজে গিয়েছে বললেই চলে মিথি। মিষ্টি অবশ্য তখন মিথির কাছে নেই। হিয়া নিয়ে গিয়েছে ঘুম পাড়াবে বলে। মিথি ভেবেছিল ঘুমানোর সময় নিয়ে যাবে মিষ্টিকে। কিন্তু এমন বৃষ্টিতে মিথি প্রায় পুরোটাই ভিজে গেল। হিমেল তখন ছাদের অন্যপ্রান্তে। মিথিরা বৃষ্টিতে ভিজে যাবে ভেবেই দ্রুত এপাশটায় আসতে নিতেই দেখা গেল পিছু পিছু এসে দাঁড়াল সাবিহা ও। হিমেলকে ডেকেই বলল,
“ হিমেল, চলে যাচ্ছো নাকি? রাদিফ কোথায় দেখেছো? অনেকক্ষন খুঁজছি। এখানে তেমন কাউকে তো চিনি ও না। কল দিচ্ছি, তাও পাচ্ছি না। একটু দেখবে? আমায় আবার ফিরতে হতো যে। ”
হিমেল শুনল। একপাশে দাঁড়িয়ে এবার ছোটস্বরে বলল,
“ দেখছি কল করে। ”
এইটুকু বলেই এক কিনারায় দাঁড়াল। পাশাপাশি দাঁড়াল সাবিহাও। এবং দূর থেকেই তা দেখতে পেল মিথি। ছোটছোট চোখ করে দেখল দুইজনকেই। কি এত কথা বলছে দুইজন? মিথির কেন জানি হিমেলের পাশে সাবিহাকে দেখলে অনিশ্চায়তা তৈরি হয়। এতোটা ভালোবাসে বলে যদি কখনো সাবিহার প্রতি হিমেলের অনুভূতি জন্মায়? আজকাল তো সবাই বদলায়। দীপ্র তো উদাহরণ। যদি দীপ্রর মতো করে কখনো হিমেলের ও অনুভূতি বদলায়? মিথি অবশ্যই সরে যাবে এমনটা কখনো হলে। কোন রকম কোন অভিযোগ করবে না। কিন্তু অপরদিকে, এ চমৎকার মানুষটিকে সে হারাতেও চায় না। মিথি এইটুকু ভেবেই পরমুহূর্তেই নজর সরাল। পা ঘুরিয়ে ধীর পায়ে পা বাড়াল সিঁড়ির দিকে। আর তা অদূর থেকে একপলক দেখল হিমেলও। ওভাবে চলে গেল কেন? সাবিহাকে তার পাশে দেখেই?
হিমেল প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ভিজে কাকভেজা হয়ে গেল। বন্ধুর বিয়েতে এসে বৃষ্টিতে ভিজে বৃষ্টিবিলাস করা হয়ে গেছে যেন। পাঞ্জাবীটা ভিজে লেপ্টে আছে বুকের সাথেই। চুলগুলো ও ভিজে ঝুঁকে এসেছে কপালে। হিমেল সে ভেজা অবস্থা নিয়েই নামল। বিয়ে বাড়ির এত ভীড় এবং মানুষজনের মধ্যে হিমেলদের জন্য আলাদা একটা ঘর ব্যবস্থা করে দিয়েছে আয়মান। যেহেতু মিষ্টি ছোট আবার এতদূর থেকে এসেছে অন্যদের সাথে একসাথে ঘুমোতে পারবে না বলেই করেছিল ব্যবস্থা। হিমেল এসে সে ভেজা অবস্থাতেই নির্দিষ্ট ঘরটার সামনে দাঁড়াল। হিমেল দরজার সামনে দাঁড়িয়েই টোকা দিল। অতঃপর দরজা খুলল মিথি। মিথি তখন সবেই ঘরে ভেজা পোশাক পাল্টাতে নিচ্ছিল। কিন্তু হিমেলের কন্ঠস্বর পেয়েই ওভাবে ভেজা শাড়িতেই এগোল। দরজা খুলে পাশে দেওয়ালের সামনে দাঁড়াল । হিমেলকেও ভেজা অবস্থাতে পরখ করে বলল,
“ এতোটা ভিজেছেন যে? ভেজার কি কারণ ছিল নির্দিষ্ট? থাকতেও পারে। ”
হিমেল প্রশ্ন শুনে হাসে। কারণ? কারণ বলতে কি সাবিহাকে বুঝিয়েছে? মিথি আবারও চুপ থেকে বলল,
“ মানুষ বদলায় জানেন? মানুষের অনুভূতিও বদলায়। যদি কখনো মনে হয় আপনার অনুভূতি বদলাচ্ছে…”
বাকিটুকু মিথির বলা হলো না। হিমেল একটু একটু করে এগিয়ে এল। তারপর দরজা আটকাল। আবারও এগোতে এগোতে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“ তারপর? অনুভূতি বদলালে? ”
হিমেলের মন ফুরফুরে ছিল। সুখ সুখ লাগছিল তার কেবল। কিন্তু এই মুহূর্তে তা লোপ পেল। হিমেলের নিজেরই মাথা ঠুকাতে মন চাইল। কেন বারবার সাবিহার সাথে কথা বলতে যায়? না বললেই তো পারে। এই মেয়েটার মনেও আর কিছু তৈরি হতো না। হয়তো মিথির মনে শুরু থেকেই সাবিহা আর হিমেলের একটা জোড় বাঁধার ছাপ ছিল বলেই এমন করে প্রত্যেকবার। হিমেল ছোটশ্বাস ফেলল। এই মেয়েটা তাকে সাবিহার সাথে দেখে চলে এসেছে? ভাবছে অনুভূতি বদলাচ্ছে? অবশ্য বাস্তব জীবনের কারণে এমন ভাবনা অহেতুক ও নয়। কিন্তু মেলের সবটুকুই তার।বোকা! মিথিকে চুপ থাকতে দেখে হিমেল হাসল চাপা। বৃষ্টির ফোঁটা ফোঁটা পানি এসে জমে আছে মেয়েটার মুখে, চোখে গলায় ও। হিমেল চাইল কেবএ স্থির চোখে। অতঃপর এক পা এক পা করে এগিয়ে একদম মিথির সামনেই এল। এতটা কাছে দাঁড়াল যে দুইজনের মাঝে হয়তো ইঞ্চিখানেক দূরত্ব। মিথি কিছুটা ঘাবড়াল এবারে। দু পা পিছিয়ে একদম দেওয়ালের সাথে সিটকে গেল। হিমেল হাসল মৃদু। আবারো দু পা বাড়িয়ে আবারো ইঞ্চিখানেক দূরত্ব রেখে দুই হাত দেওয়ালেই মিথির দুপাশে রাখল। পরপরই মাথাটা ঝুঁকিয়ে এক হাত দিয়ে মিথির মুখ তুলল। ভ্রু জোড়া কিঞ্চিৎ আঁকাবাঁকা করে মিথির নজরে নজর ফেলে বলল,
“ তো মিসেস সারফারাজ, চলে এলেন কেন ওখান থেকে? জ্বেলাস আপনি? ”
মিথির শরীর তখনও ভেজা। হিমেলের দৃষ্টি, কন্ঠ এবং এতোটা কাছাকাছি উপস্থিতি সবই তার বুক ধুকফুক করার জন্য যথেষ্ট। মিথির হৃদয় কাঁপছে সত্যিই। শুকনো ঢোক গিলল প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। হিমেল হাসল আড়ালেই। মুখটা আরেকটু কাছে নিয়ে দেওয়ালে লেপ্টে থাকা মিথির কানের সামনে এসে থামল। পুরুষালি উষ্ণ নিঃশ্বাস মিথির ঘাড়ে উপছে পড়তেই যখন মিথির হাঁসফাঁস লাগল ঠিক তখনই হিমেল আবারও গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“ পুরুষমানুষ বদলায় তাই না? পুরুষ মানুষের ভালোবাসাও বদলায়, তাই না? গুড। এখন আমার বদলানো ভালোবাসার রূপটুকুও অনুভব করুন। ”
এইটুকু বলেই নিজের ঠোঁটজোড়া মিথির কানের লতিতে ছুঁয়ে দিয়েই দূরত্ব নিয়ে দাঁড়াল। চোখে হেসে মিথিকে ফের বলল,
“ বিশ্বাস করুন, আপনি সেদিন আমায় প্রাধান্য না দিলে আমিও বদলাতাম না। আপনি প্রাধান্য দিয়েছেন বলেই আমার এই অবনতি ঘটেছে।”
এইটুকু বলেই আলতো করে ঠোঁট স্পর্শ করাল মিথির গলায়। ফের পরমুহুর্তেই ওভাবেই বলল,
“ আপনি চাইলে আমি সাবিহার সাথে পুনরায় আর কথা ও বলব না। বদলানোর তো প্রশ্নই আসে না। ”
উষ্ণ নিঃশ্বাসের স্পর্শে ব্যাকুল হয়ে মিথি চোখ বুঝল কেবলই। হিমেল সে রূপটা দেখেই মৃদু হাসল। গলা থেকে মুখ সরিয়ে ঠোঁট ছোঁয়াল মিথির কপালে। পরমুহূর্তেই ডান গালে চুম্বন এঁকে কপালে কপাল ঠেকাল। দুইহাতে গাল আঁকড়ে ধরে ধীর কন্ঠে বলল,
“ ভয় নেই, আমি অতোটাও বেপরোয়া প্রেমিক নই। আবার আপনি চাইলে খুব রকমের বেপরোয়াও। শুধু আপনার জন্য। ”
মিথি তখনও চোখ বুঝে রাখা৷ কপালে টের পেল হিমেল উষ্ণ শ্বাস, ঠোঁটের স্পর্শ। এর ঠিক পরমুহূর্তেই হিমেল সরে গেল একমুহূর্তেই। বিড়বিড় করে বলল,
“ কন্ট্রোল হিমেল..”
মিথি চাইল এবারে। হিমেল ঠিক তখনই জিজ্ঞেস করল,
“ মিষ্টি কোথায়? কার কাছে দিয়েছিস ওকে? ”
উত্তর এল,
“ হিয়ার কাছে। ”
“ যা নিয়ে আয় ওকে। আমি গোসল করতে যাচ্ছি। ”
মিথি প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই প্রশ্ন করল,
“ বৃষ্টিতে, এই ঠান্ডায় এখন গোসল করবেন? ”
“ হু। ”
“ ঠান্ডা লাগবে। এরচেয়ে বরং পোশাক পাল্টে নিন। ”
হিমেল ছোটশ্বাস ফেলে। মিথিকে কি করে বুঝাবে বুকের ভেতর চলছে তখনও এক অস্থিরতা। বেপরোয়া একটা অনুভূতি তখনও রক্তকণিকায় বহমান।এই বেপরোয়া অনুভূতিটা শুধু নিয়ন্ত্রনে আনল হুট করে মিষ্টি কোথায় আছে তা ভেবেই। তাই তো আবারও গম্ভীর স্বরে বলল,
“ তুই ওকে নিয়ে আয়। কি করছে কিজানি।নিয়ে আয়, আমি চেঞ্জ করে আসছি। ”
মিথি মাথা নাড়াল। সরু চোখে চেয়ে থাকতেই দেখা গেল হিমেল ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়িয়েছের।ঠিা এর পরমুহুর্তেই আবার ঘুরে এসে মিথিকে আরো একটা চুম্বন উপহার দিয়ে দ্রুত যেতে যেতে বলল,
বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৬৪
“ এমন শাড়ি পরে, বৃষ্টিতে ভিজেই প্রথমবার আমার দেহ-মন লুট করলি। আজ আবারও একইভাবে শাড়ি পরে বৃষ্টিতে ভেজার দরকার ছিল খুব মিথিফুল? ”
মিথি আহাম্মকের মতো তাকিয়ে থাকল শুধু৷ হিমেল ততক্ষন একপলক তার দিকে ঘাড় ঘুরিয়েছে। আর মিথি ওভাবে চেয়ে বিড়বিড় করল,
“ আমি লুট করলাম? নাকি উনি? ”
