Home বিষাদ ও বসন্ত বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৭০

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৭০

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৭০
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

একটা পিচ্চিমতো মেয়ে এক যুবকের গলা জড়িয়ে ধরে আছে। মেয়েটার গায়ের রং ধবধবে ফর্সা। চোখজোড়া বড়বড়। কাজলকালো ঘন পাঁপড়িতে ঢাকা চোখ নিয়ে একটু পরপরই এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরে দেখছে সে। আদ্র দূর থেকেই তাকিয়ে থাকল মুগ্ধ হয়ে। অদ্ভুত ভালো লাগা এবং কান্না আসা এক অনুভূতি নিয়ে দেখল পেছন পেছন মিথিও এল। যুবকটির কোল থেকে পিচ্চিমতো মেয়েটার নাক টেনে কিছু যেন বলছে হেসে হেসে। ইশশ! মিথির চোখেমুখে আজ আলাদা দীপ্তি, সুখ এবং উজ্জ্বলতা। আগের থেকে শতগুণ হাসিখুশি এক মিথিকে দেখতে পেল যেন। আদ্র শুধু ছোট ছোট চোখেই চেয়ে থাকে। কেন জানি সাহস হলো না মিথির সামনে যাওয়ার। সাহস হলো না একটাবার গিয়ে ক্ষমাটা অব্দি চাইতে। লজ্জা হচ্ছে আদ্রর। আদ্র অনেকটা সময় চেয়ে থেকেই টের পেল মিথি আর মেয়েটার চেহারায় অসম্ভব মিল। হুবুহু চোখ, নাক, ঠোঁট এমনকি চুলও মিথির মতোই ঘন। কাঁধ অব্দি চুলগুলোতে সে যেন খুব বিরক্তই হচ্ছে। আদ্রর লোভ হলো। ইচ্ছে হলো একটাবার কোলে তুলতে। একটাবার আঙ্গুল চুলগুলো সরিয়ে কানে গুঁজে দিতে। ইচ্ছে হলো ঐ যুবকটির মতোই কোলে তুলতে। অথচ পারল না। কিছুটা দূরে এক চা দোকানে বসেই বলে উঠল,

“ ছোট্ট মেয়েটার আম্মু ঐ মেয়েটাই তাই না?আর ঐ ছেলেটা? কে হয়? ”
দোকানদার হাসলেন। চায়ের লীকারে দুধ, চিনি ঢালতে ঢালতেই ব্যস্ত হয়ে দেখে বললেন,
“ আরেহ কি যে সুন্দর পরিবার ভাই। দেখতেও ভাল্লাগে। পোলাডা ঐ ছোট্ট মাইয়াডার বাপ হয়। ”
“পরিবার?”
আদ্র এক মুহূর্ত থমকাল। ফেল আবারও আওড়াল,
“ বাপ? ঐ ছোট্ট মেয়েটার বাবা হয় ঐ ছেলে? ”
“ হু। মাইয়ারে যে কি পরিমাণ যত্ন করে ভাই। মাইয়া কানরেই কোলে কইরা নিচে আইসা হাজির হয়। ঘুরেফিরে। মাইয়া যেমনে কয় কইতে গেলে বাপ ওমনেই চলে। মাইয়াডাও দেখতে মাশাল্লাহ! পুতুলের মতো। ”
“ আসলেই বাবা হয়? আপনি জানেন শিওর? ”
“ জানুম না কেন? এহানেই তো আছে তিন চার বছর যাবৎ। রোজই দেহি। মেয়ের মায়েও চাকরী করে। চাকরী শেষে অনেক সময় তিনজন একসাথেই ফিরে। তিনজনের সুখেরই সংসার! ”
“ ওহ।”

আদ্র যেন আশাহত এক যুবকের ন্যায়ই হতাশা নয়নে তাকাল। মিথি নতুন করে সংসার গড়েছে বিষয়টা একটু হলেও মানতে যেন কষ্ট হলো। আচ্ছা, মিথির এবারের জীবনসঙ্গী নিশ্চয় অনেক ভালো? নিশ্চয় এবার আল্লাহ মিথিকর সঠিক মানুষই উপহার দিয়েছে। সঠিক মানুষ বলেই তো মিথির চোখমুখে এতোটা হাসি, উচ্ছ্বাস। অথচ তার সাথে থাকাকালীস তো ছিল চোখের নিচে কালি, ক্লান্তি, আঘাতের চিহ্ন আর দুঃখের স্পষ্ট ছাপ। কথা আছে না? মেয়েদের জীবনসঙ্গী ভালো হলে চেহারায় এমনিতেই গ্লো আসে। মিথির ক্ষেত্রেও বোধহয় তাই হলো। আদ্র চাপাশ্বাস ফেলে। বুকের কোথাও একটা কষ্ট হচ্ছে। নিঃশ্বাস নিতেও যেন কষ্ট হচ্ছে। আদ্র উঠে দাঁড়ায়।বুকের ভেতর মোচড় দেওয়া সে গভীর কষ্টটা নিয়ে পা চালায়। অতঃপর আরো একবার বুকের গভীরের ক্ষতটা নিয়ে চাইল মিথিদের দিকে। চোখে নিরব কষ্ট বয়ে বিড়বিড় করল,
“ অন্যের হয়ে গেলি তাই না মিথি? এভাবে অন্যের না হলেও তো পারতি। আমার মানতে কষ্ট হচ্ছে। দেখ,আমার সত্যিই কষ্ট হচ্ছে নিজের বউ বাচ্চাকে অন্য কারোর অধীনে দেখে। আমার তো অধিকারও নেই যে একটাবার তোকে গিয়ে বলব, এটা কেন করেছিস। সে অধিকার তো নিজেই হারিয়েছি। নিজেই ভুগছি দেখ। তোর প্রতি করা অন্যায় গুলোর জন্য তিলে তিলে ক্ষয়ে শেষ হচ্ছি। ”
আদ্র এটুকুই বলেই ফের আবারও বলে,

“ ইশশ! আমি যদি তোকে তখন যত্নে রাখতাম মিথি? যদি তখন তোকে ভালোবাসতাম? মিথি, কেন ভালোবাসলাম না তখন তোকে? কেন আল্লাহ সে সুবুদ্ধিটা আমায় তখন দিল না? তাহলে আমায় আজ সব হারাতে হতো না। আমার অন্তত একটা মিথি থাকত, একটা বাটারফ্লাই থাকত। এখন তো কিছুই রইল না আমার। ”
” খুব কষ্ট দিয়েছিলাম না মিথি? কত আঘাত করেছি তোকে! কখনো ভালোবাসার নজরে দেখিইনি। আর আজ সে আমি দেখ, তোর দিকে বারবার তাকাচ্ছি বেহায়ার মতো। তুই এখন অন্যের জেনেও তাকাচ্ছি। দেখ মিথি, আজ এই আদ্রও আঘাতে জর্জরিত। নিজের স্ত্রী, সন্তান, মা সব হারিয়ে একা হয়ে পড়ে আছি। আল্লাহর বিচার বোধহয় এটাকেই বলে তাই না? ”
আদ্র দাঁড়াতে পারে না আর। ধীরে ধীরে পা চালায় সে। মায়ের কবরে যাবে আবার। গিয়ে বলতে হবে তো তার এই কষ্টের কথাটা। নাহলে যে বুক ভীষণ ভার লাগছে। নিঃশ্বাম নিতে কষ্ট হচ্ছে। মাকে বলে অন্তত বুক যদি হালকা হয়?

বাইরর আজও ঝিরঝিরে বৃষ্টির সাথে বাতাস বইছে। হিমেল এতোটা সময় মিষ্টিকে কোলে তুলেই সিঁড়ি বেয়ে উঠেছে উপরে। পিছুপিছু এল মিথিও। মৃদু গলায় দরজা খুলতে খুলতে বলল,
“ এই আবহাওয়ায় বের হবেন? বেশি দরকার নাকি? ”
“ চলে আসব আয়মানের সাথে কথা বলেই। ”
মিথি আর কিছু বলল না। বন্ধুর সাথে দেখা করতে নিষেধ করবে না অবশ্যই সে। শুধু বৃষ্টি নামবে বলেই চিন্তা করছে। মিথি দরজা খুলেই ভেতরে এল। পিছু পিছু হিমেলও মিষ্টিকে নিয়ে এল। কোল থেকে নামিয়ে বলল,
“ পাপা আসি? একটু পর চলে আসব। ”
“ এখনই আসলে , আবার এখনই যাবে? ”
“ চলে আসব তো আবার আম্মু। ”
“ আচ্ছা যাও। ”
হিমেল হাসল। হাত দিয়ে এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করে দিয়ে হেসে দিল। অতঃপর চলে গেল মিষ্টির সাথে কয়েকটা কথা বলে। মিথি মেয়ের দিকে চাইতেই মিষ্টি বলে উঠল,

“ পাপা কি ভাই-বোন আনতে গেছে আম্মু? ”
“ ভাইবোন? ”
“ তুমি যে বললে পাপা এনে দিবে। ”
মিথি হতাশ হয়ে তাকায় মেয়ের দিকে। পাশের বাসায় মিষ্টির বয়সীই একটা ছেলে আছে এই তো মাস ছয়েক আগে তার একটা বোন হয়েছে। অতঃপর তারপর থেকেই মিষ্টির এই রোজরোজ পাগলামো আছেই। ভাইবোন লাগবে। আর এই পাগলামোতে সাঁই দিয়ে মিথিও পাগলামো করেছে। দ্বিতীয়বার মা হওয়ার মতো লোভ সামলাতে না পেরে তিনজন থেকে চারজন হওয়ার প্ল্যান করে নিয়েছিল আরো মাস তিনেক আগেই। এইতো এক সপ্তাহ আগেই প্র্যাগনেন্সি রিপোর্টে স্পষ্ট দেখেছে পজেটিভ। মিথি এই খুশির সংবাদটাই কতভাবে হিমেলকে দিতে চাচ্ছে। অথচ পারছে না। আটকাচ্ছে কেবল। মিথি আলগোছে মিষ্টির হাতটা রাখল নিজের পেটেই। অতঃপর হেসে ফিসফিস করে বলে উঠল,
“ এখানে একটা ভাইবোন আছে আম্মু। তুমি রোজ রোজ আদর দিলে খুব তাত্তারি চলে আসবে সে। ”
মিষ্টি চকচকে চোখে চাইল মুহূর্তেই। সে মাকে খুব বেশি বিশ্বাস করে। এবং পাশের বাসার রাহানের যখন বোন হয়েছিল রাহানও বলেছিল তার বোন নাকি মায়ের পেট থেকেই এসেছে। মিষ্টি প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বলল,

“ সত্যি? তোমার পেটে ভাইবোন আছে আম্মু? ”
“ হু। ছোট্ট একটা আদর আছে। ”
“পাপার পেটেও কি আছে? ”
প্রশ্নটায় মিথি হকচকাল। চোখ ছোট ছোট করে চেয়ে হতাশ গলায় বলল,
“ পাপার পেটে কেন থাকবে? মায়ের পেটে থাকে। ”
“ কেন? পাপাদের পেটে কেন থাকে না আম্মু? শুধু আম্মুদের পেটেই কেন ভাইবোন থাকে? ”
মিথি বলেও মুসিবতে পড়ল। মেয়ে আজকাল যত যত প্রশ্ন করে তার আগেই বোঝা উচিত ছিল এমন প্রশ্ন মিষ্টি করবেই। মিথিও না! বলার আর মানুষ পেল না। মিষ্টি আবার ও বলল,
“ রাহানের বাবার পেটটা মোটা হয়েছে আম্মু। ওর আম্মুর মতোই। রাহান বলেছে পেট মোটা হলে ভাইবোন থাকে। তোমার পেট তো মোটা হয়নি। ”
মিথি উঠে দাঁড়াল এবারে। বলল,

“ আর কি কি জেনেছো আম্মাজান? ”
“ অনেককিছু। ”
মিষ্টি ফের ভাবুক হয়ে বলে উঠল,
“আচ্ছা আম্মু? পেটে কিভাবে ভাইবোর আসে? পেট কেটে ডুকানো হয়? ”
মিথি চোখ খিচে নিল।নিজেকে একশো একবার বোকা বলল। কোন দুঃখে সে খুশি খুশি মনে মেয়েকে বলতে গেল? উত্তর করল,
“ ম্যাজিক করে আম্মু। ”
“ কি ম্যাজিক? পাপাকেও ম্যাজিকটা করব। তাহলে দুইজনের থেকে দুইটা ভাইবোন পাব। ”
“পাপার ক্ষেত্রে ম্যাজিক কার্যকর হবে না। ”
“ কেন?”
“ পাপা তো ছেলে। শুধু মেয়েদের পেটেই বাচ্চা থাকে।”
“ কেন? শুধু মেয়েদের পেটেই কেন?”
মিথি না পেরে উত্তর করল,
“ছেলেদেরকে বাচ্চারা পছন্দ করে না, তাই তাদের পেটে থাকে না। ”
“ কেন পছন্দ করবে না? আমার পাপা কত ভালো। ওর আমার পাপাকে পছন্দ করা উচিত। ওকে বলো পছন্দ করতে। ”

এইটুকু বলতে বলতেই মিথির পেটের সামনে আঙ্গুল উঁচিয়ে ধরল। বলল,
“ শোনো? আমাদের আব্বুকেও পছন্দ করবে তুমি। তুমি বোকা। তুমি যদি আব্বুর পেটে থাকতে তাহলে তোমাকে আরো বেশি আদর দিত। ”
মিথি শুনল। হেসে ফেলল কেমন। মিষ্টির এর পরবর্তীত চিন্তাটা হলো ভাই হবে নাকি বোন? মিথির পেটে যে আছে সে কি মেয়ে? নাকি ছেলে? এই চিন্তা করতেই করতেই সে হাজারবার প্রশ্ন করেছে। হাজার বার জিজ্ঞেস করেছে। অতঃপর এই চিন্তা নিয়েই পড়েছে। এই চিন্তা নিয়েই খেয়েছে। এরপর অপেক্ষা করল পাপা আসার। কখন আসবে কখন আসবো করতে করতে মিনিট কয়েক পরই হিমেল আসল। শার্টটক প্রায় ভিজে গিয়েছে বাইরের বৃষ্টিতে। মিষ্টি প্রথমেই চাইল প্রশ্নটা করতে। কিন্তু বাবার এই অবস্থা দেখে প্রথমেই বলল,
“ এমন ভিজেছো কেন? জ্বর এলে? যাও চেঞ্জ করো।”
হিমেল হাসে শাসন দেখে। মাথা নেড়ে রুমে গিয়ে ভেজা মাথা মুঁছে নিয়ে শার্ট পাল্টাল। অতঃপর ওয়াশরুমে গিয়ে মুখ চোখ ধুঁয়ে এসে বসতেই মিষ্টি রুমে হাজির হলো। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই হিমেলের কানের কাছে উচ্ছাস নিয়ে বলল,

“ পাপা? জানো, আম্মুর পেটে সত্য সত্যিই একটা ভাই-বোন আছে। আম্মু বলেছে আমায়।”
হিমেল থামল। ভ্রু কুঁচকে বলল,“ হুহ? তোমায় বলেছে? ”
“ হ্যাঁ। আমি তার সাথে খেলব। ভালো হয়েছে না বলো? ”
“ খু্ব ভালো হয়েছে। তুমি খুশি আম্মু? ”
“ অন্নেক। আমি ওকে কোলে তুলব পাপা। ”
“ আচ্ছা। ”
“ চুমু দিব। ”
“ আচ্ছা। ”
“ ওকে গানও শোনাবো পাপা।”
“ শুনিও।”
“ পাপা, আমরা ওকে সাজাব ও হুহ? ও মেয়ে হবে নাকি ছেলে পাপা বলো তো? মেয়ে হলে শাড়ি কিনতে হবে তো। ”
“ সেটা তো জানি না আম্মু। ”
মিষ্টি ফের প্রশ্ন করল,

“ আম্মু জানে?”
“ জিজ্ঞেস করে আসি? ”
“আচ্ছা। ”
হিমেল উঠে গেল। নিঃশব্দ পায়ে মিথির কাছে গিয়ে নিশ্চুপ দাঁড়াল কতোটা সময়। অতঃপর মিথির তেল চটচটে চুলে হুট করেই চুমু বসিয়ে একদম মিথির পিছনে দাঁড়িয়েই বিড়বিড় করল,“ তিনজন থেকে চারজন হচ্ছি আমরা? বলিসনি কেন আমায়? ”
মিথি আচমকা কাঁপল। মিষ্টিটা বলে দিয়েছে নিশ্চয়? এই মেয়ে এমন ভক্ত কেন এই লোকের? মিথি মৃদু স্বরেই বলল,

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৬৯

“ আপনি রাগ করলে? ”
“ রাগ করতাম না অবশ্যই। তবে যার জন্য চারজন হতে চাইনি সে নিজেই তো খুশিতে নাচ করছে।”
“ আর আপনি? ”
“ আমার বুকের ভেতর কেমন যেন থমকে আছে। বুঝেই উঠছি না কেমন অনুভূতি প্রকাশ করা উচিত। সুখ, দুঃখ নাকি মিষ্টির মতো খুশিতে পাগল হওয়া অনুভূতি। ”

বিষাদ ও বসন্ত শেষ পর্ব