বিষাদ ও বসন্ত শেষ পর্ব
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
মিথির গর্ভাবস্থার পঞ্চম মাস। পরনে একটা লাল আর কালোর মিশ্রনে শাড়ি। কাঁধে ঝুলছে একটা ব্যাগ। চুলগুলো ক্লিপ দিয়ে বেঁধে ছেড়ে রেখেছে। পেটটা একটি ফুলো দেখাচ্ছে দূর হতে। ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে দূরের ঐ নারীটিকে খুব সূক্ষ্মভাবেই দেখে যাচ্ছিল আদ্র। ইশশ! কতোটা আত্মবিশ্বাসী, প্রাণবন্ত নারী লাগছে মিথিকে। আদ্র দূর হতেই চাইল। দূর হতেই অনুভব করল এই মায়াভরা মুখটাকেই সে একদিন কি ভীষণ অবহেলা করেছিল। আঘাতে আঘাতে কি করুণভাবে ক্ষত বসিয়েছিল। অথচ এই মিথিকেই এখন তার দেখতে মন চাইছে। তাকিয়ে থাকতে মন চাইছে।কিন্তু সামনে এগেনোর সে সাহসটা আর নেই। যা করেছে তাতে সামনে যাওয়ার সাহসও বা কি করে করে উঠবে? মিথি কি ক্ষমা করবে তাকে? উল্টো ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিবে। আদ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
মিথিকে আড়াল হতে চাইতে চাইতেই দেখা মিলল মাত্রই আসা আরো দুইজনকেও। ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে কোলে রাখা লম্বা, চওড়া শ্যামবর্ণের ফর্মাল শার্ট পরা ছেলেটিই মিথির বর্তমান স্বামী ভাবতেই আদ্রর বুকের বা পাশটা ব্যথা হলো। মনে হলো যন্ত্রনায় জ্বালা করছে। অথচ দূর থেকে এই তিনজনকে দেখলে যে কারোরই চোখ জুড়িয়ে আসার কথা৷ একটা সুখী পরিবারের স্পষ্ট চিত্র দেখে ভালো লাগার আবেশে চোখ বুঝে আসার কথা। আদ্ররও চোখ বুঝে এল তবে যন্ত্রণায়, কষ্টে, নিঃসঙ্গতায়। কি হতো যদি মিথি অন্য কারোর না হতো? কি হতো যদি মিথি অন্য কারোর সাথে জীবন না সাঁজাত? আচ্ছা? এই ছেলেটা নিশ্চয় মিথিকে খুব বেশি যত্ন করে? নিশ্চয় তার রক্তের মেয়েটিকেও খুব বেশি ভালোবাসে? নয়তো মিথি কেনই বা এই ছেলেটাকে পছন্দ করবে? কেনই বা সংসার বাঁধবে? আদ্র বুকের ভেতর চাপা দুঃখটা নিয়েই চেয়ে থাকে। বোবা কষ্টদের জানান দিতেই বোধহয় তার চোখজোড়া হয়ে উঠল লাল। আদ্র চাপাশ্বাস ফেলল।ওভাবেই বিড়বিড় করল,
“ মিথি? আমিই তোর যোগ্য ছিলাম না। তোকে কতোটা কষ্ট দিয়েছিলাম। কত আঘাত করেছিলাম। তোর হৃদয়টাও নিশ্চয় তখন আমার বুকের মতো চাপা কষ্ট বইত মিথি? মিথি, আমি কেন তোকে ভালোবাসলাম না তখন? কেন? কেন তোকে একটু ভালোবাসলাম না? যাও বাসলাম…
এখন দেখি তুই অন্য কারোর। আমার ছোট্ট বাটারফ্লাই অন্য কারোর। তোদের উপর অধিকার এখন অন্য পুরুষের। আমার নয়। আমি তো নিজেই অধিকার হারালাম রে মিথি। নিজের সন্তানের জন্য একটা বার সাহস করে সামনে যেতে পারছি না। এতোটা ভীতু আমি। আমার সাহসই হচ্ছে তোর সামনে একটাবার দাঁড়াতে।একটাবার আর্জি জানাতে পারছিনা তোর কাছে, যে আমার মেয়েটাকে একটাবার কোলে নিতে দে। একটা বার জড়িয়ো ধরতে দেই। বিশ্বাস কর, এরপর আর কোন আফসোস থাকবে না মিথি। শুধু একটাবার যদি পৃথিবীতে আমার একমাত্র আপন মানুষটাকে একটাবার কোলে নিতাম, জড়িয়ে ধরতাম! ইশশ! ”
আদ্র বুক ভরে চাপাশ্বাস গুলো দীর্ঘশ্বাস হয়ে বের হয়ে আসে যেন। দূরের ঐ ছেলেটা ততক্ষনে এক হাতে ছাতা মেলে ধরেছে মিথির মাথার উপরে। একই ছাতার নিচেই তিনজন। কি সুন্দর দৃশ্য! অথচ এই দৃশ্যটাই আদ্রর বুকের ভেতরটা জ্বলে পুড়ে ক্ষতবিক্ষত করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট!
আরেকটু সময় যেতেই হিমেল আর মিথি দুইজনেই রিক্সায় উঠল। হিমেল উঠার আগ মুহূর্তে মিষ্টির মুখে চুমু দিয়ে কিছু বলল বোধহয়। মিষ্টিটাও মানিয়ে গেল। আয়েশা খালার কোলে থেকে পিটপিট করে আলতো তুলতুলে হাত নাড়িয়ে টাটা দিল কি সুন্দর করে।ইশশ! কি সুন্দর!
আদ্র চেয়ে আচমকা হাসল একটু। তাকে যদি বাবা হিসেবে জানত তাহলে নিশ্চয় তাকেও এভাবেই হাত নাড়িয়ে টাটা দিত? ইশশ!আদ্র লোভ সামলাতে পারে না। গত একদিন যাবৎ সে শুধু এই বিল্ডিংয়ের আশপাশেই ঘুরঘুর করছে শুধু মাত্র একটাবার মেয়েকে কোলে নেওয়ার জন্য। চোখে ভরে দেখার জন্য দূর থেকে হলেও। আদ্র আজও পা বাড়াল মিথির যেতেই। ভাবল ঐ মহিলাকে বুঝিয়ে বুঝি কোলে নিবে মিষ্টিকে। অথচ পারল না। আদ্র যখন খুব কাছেই, দুয়েক কদমের দূরত্ব ঠিক তখনই আয়েশা খালা উল্টো ঘুরলেন। মিষ্টিকে কোলে তুলে নিয়ে যেতেই আদ্র এই প্রথম সাহস নিয়ে ডাকল,
“ শুনুন.. ”
আয়েশা খালা ঘাড় ফিরিয়ে তাকালেন। লম্বা মতো, ফর্সা গড়নের একটা ছেলে। আদ্র এতকাল জেলে থাকলেও রূপ কোন অংশে কমেনি। দেখতে এখনো কি ভীষণ সুদর্শন লাগছে ছেলেটাকে। আয়েশা খালা বোধহয় এই কারণেই ভাবলেন ছেলেটা ভদ্র। দাঁড়িয়ে প্রশ্ন ছুড়তেই আদ্র এবারে বলে ফেলল,
“ ও..ওকে একটু দিবেন? ”
আয়েশা খালা এবার ভ্রু বাঁকালেন। চেনা নেই, জানা নেই কোন ছেলে এসে বললেই দিয়ে দিব? এতোটাও বোকা নয় উনি। আজকাল কত মানুষের মনে কত কি! কাকেই বা বিশ্বাস করা যায়। অমন রাজপুত্রের মতো দেখতে সুন্দর তে কি হয়েছে? মন যে সুন্দর তার গ্যারান্টি? আয়েশা খালা দ্রুতই প্রস্তাবটা নাকোচ করে পা বাড়ালেন। আদ্র শুধু চেয়ে দেখল মেয়ের ড্যাবড্যাব করে তার দিকে তাকিয়ে থাকাটা। ইশশ। কেমন ভাবে তাকিয়ে আছে বড়বড় চোখজোড়ায়। এই চেখজোড়াটাও একদম হুবহু মিথির চেখজোড়াই যেন। আবার কোথাএ বোধহয় আদ্র নিজের মায়ের চোখজোড়ার সাদৃশ্যতাও দেখল স্পষ্টই! আদ্র খুব করে চেয়েও একটাবার নিজের মেয়েকে কোলে তুলতে পারল না, জড়িয়ে ধরতে পারল না। অথচ তার মেয়েটা তার থেকে ঠিক কয়েক কদম দূরত্বেই ছিল। কিন্তু ঐ যে, অধিকার? অধিকারই যে তার নেই। ইশশ! এমন অসহায়তা বুঝি হয়?
আদ্র বিধ্বস্ত এক সৈন্যর মতোই মায়ের কবরে ফিরল। বৃষ্টির কর্দমাক্ত ঘ্রাণটা তখনএ নাসারন্ধ্রে এসে ভীড়ছে। আদ্র একদম আশাহত, মুখ থুবড়ে পড়া সৈনিকের ন্যায়ই হাঁটি গেড়ে বসল। মায়ের কবরে সামনে বসেই আদ্র হঠাৎ ছোট্ট বাচ্চাটার মতোই কেঁদে ফেলল। লাল রক্তিম চোখজোড়ায় কাঁদতে কাঁদতেই মায়ের কবরটা সে জড়িয়ে ধরল। ভাঙা স্বরে বলল,
“ আম্মু? এই আম্মু? আমার এত অসহায় লাগছে কেন আম্মু? আমার বুক ভার লাগছে আম্মু। জানো আম্মু?জানো? ও না আমার কতোটা সামনে ছিল। কত কাছে ছিল আম্মু। তবুও আমি একটাবার ওকে কোলে তুলতে পারিনি। একটাবার ছুঁতে পারিনি আম্মু। একটাবার বলতে পারিন, আমি এর অপরাধী, অধম পিতা…”
আদ্র কেমন উদ্ভ্রান্তের মতোই মায়ের কবরটা জড়িয়ে এসব বলে যাচ্ছিল। বলতে বলতেই ধরণী জুড়ে নামল ঝুম বৃষ্টির ধারা। বৃষ্টির বেগ প্রবল। অথচ এই প্রবল বর্ষনেও আদ্র ওভাবেই বসে থাকল। জানাল,
“ আম্মু? জানো? আমার বাটারফ্লাই এর চোখজোড়া তোমার মতোই হয়েছে। তোমার সাথে মিথির চোখের মিল ছিল না আম্মু? এখন আমার মেয়ের চোখের সাথেও মিল আছে আম্মু। জানো আম্মু? ও না হুবুহু মিথির মতো। চোখ মুখ ঠোঁট সব আম্মি। কি ভীষণ আদুরে হয়েছে আমার মেয়েটা! আমার শুধু তাকিয়ে থাকতেই ইচ্ছে হয় আম্মু। আল্লাহ..আল্লাহ আমায় এত সুন্দর একটা পুতুল উপহার দিয়েছিল অথচ আমি? আমি ঐ পুতুলটাকে একটা সময় স্বীকারই করিনি আম্মু। কি পাপাী দেখো আমি। অমন ফুলকে বুঝি কেউ অস্বীকার করতে পারে আম্মু? ”
“ তুমি জানো? তোমার মিথি নতুন সংসার শুরু করেছে আম্মু। ওর জীবনে এখন নতুন কেউ আম্মু। ও এখন অন্যকারোর। ও, বাটারফ্লাই সবই এখন অন্যের। আমি শুধুই দর্শক।অথচ একদিন সব আমার ছিল আম্মু…”
আদ্র আহাজারি করেই কেঁদে উঠল। এই তুমুল বর্ষনের মধ্যেই শরীরটা থেকে থেকেই কেঁপে উঠল কান্নার বেগে। আদ্র কাঁদল। হৃদয়ের সবটুকু দুঃখ বিসর্জন দিয়ে কাঁদতে কাঁদতেই বলল,
“ আম্মু? আম্মু? আমার তো আর কিচ্ছু নেই আম্মু। আমি নিঃস্ব, নিঃস্ব আম্মু। তোমার আদ্রর এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই আম্মু। না তুমি, না মিথি, না আমার ছোট্ট বাটারফ্লাই। তুমি তো চলে গেলে৷ আর ওরা….. ওরা অন্য কারোর হয়ে গেল। আমার ঐটুকু পুতুলটাও অন্য কারোর হয়ে গেল। আমায় তো আমার মেয়েটা কখনো বাবা হিসেবে জানবেই না আম্মু। কখনো আমায় বাবা হিসেবে ভালোও বাসবে না, তাই না আম্মু? বাসবে না তো। আমি তো অপরাধী। অপরাধীদের ক্ষমা মিলে নাকি আম্মু? মিলে না তো। এই আম্মু? আমায়ও তোমার কাছে নিয়ে নাও না… ”
আদ্র চোখজোড়া লাল টকটকে। অনেকটা সময় ও ওভাবেই থাকল। তারপর অনেকটা সময় পর শেষবারে বলল,
“ আম্মু জানো? আমি যদি এখন মরেও যাই না একটা আফসোস থেকে যাবে। আমি আমার বাটারফ্লাইকে কোলে তুলতে পারিনি। এই আফসোস নিয়ে মরতে পারব বলো? পারব না তো। আম্মু, আল্লাহকে বলো না একবার। যাতে আমি একটা সুযোগ পাই বাটারফ্লাইকে কোলে নেওয়ার। একটাই তে সুযোগ। এরপর মরে গেলেও আমার আর আফসেোস থাকবে না আম্মু। আমি তো বাঁচতেই চাই না, তোমার কাছে যেতে চাই আম্মু। তোমার আদর পাই না কতদিন আম্মু….”
হিমেল ফেরার পথে একদম ভেজা কাক হয়েই ফিরল আজ। ভারী বর্ষনে শার্টটা ভিজে চুপসে আছে। জুতা জোড়াও পানিতে ভরপুর। এমন ভিজে চিপচিপে হয়েই যখন বাসায় ফিরল তখন সর্বপ্রথম মা মেয়ের দেখা পেল। মিথি দরজা খুলেই প্রথমে আওড়াল,
“ এমন ভিজেছেন কেন? ছাতা তো নিয়েছিলেন সঙ্গে। ”
হিমেল ভেজা শার্টটা ঝেড়ে নিতে নিতেই বাসায় ডুকল। নিজের শরীরের সমস্ত জল যেন ফ্লোরে গড়াবে এইটুকু ভেবেই জলদি নিজেন পরনের শার্টটা খুলে ওয়াশরুমে যেতে যেতেই বলল,
“ নিয়েছিলাম। এক মহিলা কলিগ ছাতা আনেনি। আমার কাছে চাওয়াতে সরাসরি নাও করতে পারিনি। ”
মিথি শুনল।মিষ্টিকে কোলে নিয়ে দরজা বন্ধ করে আসতে আসতেই ভ্রি কুঁচকে বলল,
“ ম ছাতা চাইল আর দিয়ে দিলেন? তাও আবার মহিলা কলিগকে? ”
হিমেল যেতে নিয়েও থামল। ঘাড় ফিরিয়ে মিথির মুখের দিকে চাইতেই মিথি ফের টেনে টেনে বলল,
“ মহিলা কলিগগগ! বাহ!”
হিমেল নিজের শার্টটা এক জায়গায় রেখে উত্তর করল,
“ এমন ভাবে বাহ বলছিস মনে হচ্ছে তার জন্য আমি দেওয়ানা। বয়সে ছয়বছরের বড় হয় আমার। আপাই ডাকি। ”
মিথি শুনল। এবারে আর ফিরতি কিছু বলার মতে না পেয়ে শুধাল
“ জামা কাপড় পাল্টে আসুন। চা করছি আমি।”
হিমেল হাসে শুধু। যেতে যেতে হেসেই মিষ্টিকে বলল,
“ আম্মু? তেমার আম্মুকে বলে দিও বিনা কারণে আমায় সন্দেহ না করতে।
তেমার পাপা তোমার আম্মুর সন্দেহের জন্য বিন্দুমাত্র জায়গাও অবশিষ্ট রাখবে না।”
এই বৃষ্টিতে ভিজে কাক হয়ে চুপসে যাওয়ার কারণেই হিমেলের বেশ ভালো রকমের জ্বর নামল। গা ভর্তি জ্বর। চোখজোড়া জ্বলছে অল্পস্বল্প। মাথাটাও ব্যথা করছে কি ভীষণ! আর এই জ্বরটুকু দেখেই মিষ্টি বেশ চিন্তিত। তার আব্বু ওভাবে অসুখে নেতিয়ে আছে মানা যায়? মিষ্টি বাচ্চা বাচ্চা ফুলো হাতে কাপড় আর এক বাটি জল নিয়ে বসেছে। ফুলো নরম মুখটা এগিয়ে হিমেলের কপালে দু দুটো চুমু দিয়ে দ্রুতই বলল,
“ আদর দিলাম। দেখবে জ্বর চলে যাবে পাপা। ”
হিমেল মেয়ের বাচ্চা কথায় হেসে ফেলল। কপালে আদুরে হাতের স্পর্শ পেয়ে চোখ বুঝে আসে যেন। তবুও চোখ না বুঝে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“ তাই? ”
“ হু। ”
অতঃপর হাতের কাপড়টা পানিতে ভিজিয়ে নিয়ে হিমেলের কপালে রাখল। চুলগুলোতে ছোট্ট হাতে বুলিয়ে দিতে দিতে আদুরে গলায় বলল,
“ পাপা? জ্বর গেল? ”
এত তাড়াতাড়ি? হিমেল মেয়ের ধৈর্য্য দেখে ফের হাসল। চোখ বুঝে উত্তর দিল,
“ না তো আম্মু। আরেকটু পর যাবে। ”
“ কখন? তোমার তো কষ্ট হচ্ছে। ”
“ তোমার সেবায় সুস্থ হয়ে যাচ্ছি তো। ”
মিষ্টিকে তবুও চিন্তিত দেখাল। সে পারলে বোধহয় হিমেলের অসুখটা এক্ষুনিই দূর করে দিত। কিন্তু পারছে না বলে দুঃখবোধ স্পষ্টই ফুটল চোখেমুখে। মিথি পেছনে দাঁড়িয়েই মেয়ের কাজ দেখে যাচ্ছিল। তাকে সেবা করতে না দিয়ে বাটির পানি আর কাপড়টা ছিনিয়ে নিয়েছে। যেন সে খুব পারবে অসুখটা এক মিনিটেই দূর করতে।
মিথি পাশে বসল। চিন্তিত ভাবখানা দেখে বলে উঠল, “ চলে যাবে জ্বর। তোমার পাপাকে বলো আরো বৃষ্টিতে ভিজতে। ”
মিষ্টি মায়ের গলার স্বর শুনে কি যেন বুঝে গেল। অতঃপর হিমেলের দিকে চেয়েই বলল,
“ আব্বু? বৃষ্টিতে ভিজেছো কেন? আর ভিজবে না। বুঝেছো? ”
মিষ্টি আজকাল প্রায়সই আব্বু ডাকে। পাশের বাসার পিচ্চি ছেলেটা তার বাবাকে আব্বুই ডাকে। আর সে ডাকটা সম্ভবত মিষ্টির ভালো লেগেছে বলেই কখনো পাপা, কখনো আব্বু ডাকে। হিমেল মেনে নিল ওর কথা। মাথা নাড়িয়ে জানাল আর ভিজবে না। অতঃপর জ্বর নিয়ে সে ঘুমাবে কি, ঐটুকু মিষ্টিই তার পাশে বসে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে গেল। হিমেল উঠে একপাশে শোয়াল ওকে। পাশে বালিশ রাখতেই মিথি এবারে বলে উঠল,
“ কমেছে জ্বর? ”
“ বাসায় দুটো মেডিসিন থাকতে না কমে কিভাবে? ”
মিথি হাসল। বিছানার একপাশে বসেই হিমেলের মাথাটা রাখতে বলল তার কোলে। অতঃপর বলল,
“ দুটো না, তিনটে। ”
হিমেল মাথা রাখল সবেই। কথা শোনা মাত্রই মিথির পেটের দিকে ঘুরে মাথাটা রেখে বলল,
“ তাই তো। আরেকজনের কথা ভুলে গিয়ে বড্ড অন্যায় করে ফেলেছি। ”
মিথির পরনে শাড়ি। একদম নরম সুতি একটা শাড়ি। যার আড়ালে আলগোছে দৃশ্যমান হলো উদরের মেদহীন ত্বক। হিমেল ওভাবেই আলগোছে দুইহাতে জড়িয়ে নিল। উত্তাপময় শরীরটা মিথির কোলে ছেড়ে ওভাবেই বলল,
“ স্রষ্টা আমায় এমন তিনজনকে উপহার দিয়েছেন যা আমি কখনো কল্পনাও করিনি। তিন তিনটে সুখ! ”
মিথির ঠোঁটজোড়ায় হাসির রেখা। হিমেল তখন বাচ্চাদের মতোই আঁকড়ে নিয়েছে তার কোমড়। মাথা গুঁজেছে কোলে। মিথি আলগোছে এলোমেলো ভাবে হাত বুলাল হিমেলের চুলে। আনমনে ভাবল,“ আমার রব আমায় এত সুখ দিবেন তা তো আমি ও কল্পনা করিনি। ”
হিমেলের ঘুম ভাঙ্গল প্রায় মধ্যরাতে। মিথি তখনও ওভাবেই বসা ছিল। হিমেলকে হঠাৎ চোখ মেলতে দেখে বলে উঠল,
“ জ্বর কমেছে? ”
হিমেল উত্তরের বিনিময়ে প্রশ্ন ছুড়ল। বলল,
” ঘুমোসনি? ”
“ না, দুটো বাচ্চার ঘুমন্ত মুখ দেখছিলাম। ”
“ দুটো বাচ্চা? আরেকজনের মুখ কিভাবে দেখলি তুই? ”
মিথি হেসে ফেলল। বলল,
“ আপনি এমনভাবে ছিলেন যে বাচ্চাই লাগছিল। ঘরে তিন তিনটে বাচ্চা থাকা মন্দ নয় বলুন? ”
হিমেল ওভাবে চেয়েই বলল,
“ নিজেই ঘুমে থাকলে দুই বছরের বাচ্চা লাগে আবার সে আমাকে আসে বাচ্চা বলতে। ”
“ বাচ্চাদের মতোই জড়িয়ে রেখেছিলেন। ”
“ রাখব না? আমারই তো। ”
মিথি এবারে নজর সরাল। কেমন যেন অনুভূতিতে শিহরিত হলো মন। ভালো লাগারা ছুুঁয়ে গেল মনপ্রাণ।হিমেল তখনও ওভাবেই মিথির কোলে মাথা গুঁজে রাখা। আর ঠিক তার কিছুটা সময় পরই মিথি অনুভব করল পেটের ভেতর থাকা ছোট্ট প্রাণটার অস্তিত্ব। উদরের চামড়াটা নড়চড় করল যেন। মিথি হাসে। আচমকা হিমেলের হাতটা নিজের পেটে রেখে বলল,
“ কিছু টের পাচ্ছেন? ”
“ কি..”
হিমেল বলতে নিয়েও থেমে গেল আচমকা হাতের তালুতে কিছুর স্পর্শ বুঝে উঠে। মিথির দিকে কৌতুহল নিয়ে চাইতেই মিথি বলল,
“ পেটের সামনেই এমন ভাবে কথা বলে যাচ্ছেন যে সেও বোধহয় নিজের নড়াচড়ার আভাস দিতে বাধ্য হয়েছে। ”
হিমেলের মুখটা চুপসে গেল। মিথি তাকে বহুবার এই নড়চড়টা দেখানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু তার ভেতরে থাকা প্রাণটা বোধহয় বাবার থেকে লুকোচুরি খেলছিল। তাই তো প্রতিবারই হিমেলকে ডাক দিলেই শান্ত হয়ে যেত। বেচারার হিমেলের আর এভ অনুভূতি অনুভবের সুযোগই হয়নি। কিন্তু প্রথমবারের মতো এহেন অনুভূতি পেয়ে কি অনুভূতি প্রকাশ করবে তাই বুঝে উঠল না যেন হিমেল। শুধু চুমু খেল সঙ্গে সঙ্গেই। বিড়বিড় করে বলল,
“ পাপা সরি। আপনার ঘুমে বিরক্ত করে ফেলেছি কি? ”
মিথি হতাশ হয়ে শুধাল
“ এটা ওর উপস্থিতির জানান দিচ্ছে। ”
হিমেল সে রাতটা আর ঘুমালই না। মিথির কামিজটা একটু উঁচু করে নিরবে দেখে গেল উদরের চামড়ার নড়চড় ভাবটা। প্রথম দিকে ধীর ভাবে বুঝা গেলেও পরবর্তী সে বেশ সক্রিয়ভাবেই নিজের নড়চড়ের জানান দিচ্ছিল।
হিমেল শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছিল।চোখজোড়া ফ্যালফ্যাল করে তাকানো। মিথির পেটের চামড়ায় স্পষ্টই একটা গোল অবয়ব ফুটে উঠল যেন। চামড়াটা গোল কিছুর অবয়ব ফুটিয়ে নড়চড় করছে স্পষ্টভাবেই। পরমুহূর্তেই মিথি চোখ খিচে নিল পেটের চামড়ায় মৃদৃ ব্যথার কারণে। হিমেল এতক্ষন পেটের দিকে চেয়ে থাকলেও মুহূর্তেই মিথির দিকে চেয়ে চিন্তায় পড়ে গেল। ব্যথা পাচ্ছে নিশ্চয় খুব? ওভাবে নড়ছে কেন ? সে কথা বলাতেই? হিমেলের মধ্যে এতক্ষন বিস্ময় কাজ করলেও এই মুহূর্তে বাচ্চাদের মতো করে বলে ফেলল,
“ ব্যথা পাচ্ছিস তো। কি করব? ওকে থামাব কি করে?”
মিথি হাসল কেবল। হিমেল পুণরায় পেটের দিকে চাইল। আলতো করে হাত বুলিয়ে চেষ্টা করল নিজের ঐটুকু বাচ্চাকে আদরে পোষ মানানোর। তবুও যখন থামল না তখন চুমু খেল। ফিসফিস করে বলে উঠল,
“ থেমে যাও আদর। আম্মু ব্যথা পায় তো। ”
অথচ থামল না পেটের চামড়াটার নড়চড় ভাব। হিমেল অসহায়ের মতোই বলে উঠল,
“তোমায় অনেক ভালোবাসব পাপা। এবার শান্ত হও প্লিজ। একটু শান্ত হও..”
আদ্র প্রায় চার পাঁচটা মাস মিথিদের বিল্ডিংয়ের আশপাশেই কাটিয়েছে। শুধু মাত্র দূর হতে ওদের দেখে হলেও চোখ জুড়ানোর জন্য। একটাবার নিজের মেয়ে অব্দি পৌঁছানোর জন্য। একটাবার মেয়েকে কোলে তোলার জন্য।অথচ ভাগ্যে মিলেনি তা এখনো। আবার কৃতকর্মের লজ্জায় কখনো মিথির সামনে যাওয়ার সাহসও হয়ে উঠেনি। মিথির পেটটা আজকাল ফুলে দেখায়। ওড়না দিয়ে ডাকা থাকলেও বুঝতে অসুবিধে হয় না যে মিথি সন্তানসম্ভাবা। আদ্র নিরবেই দেখে হিমেল নামক মানুষটার যত্ন, ভালোবাসা, সম্মান। হিমেল নামটাও আদ্র এতদিনে এখানকার মানুষদের থেকেই শুনেছে। অথচ এই নামের মানুষটিই কি ভীষণ যত্ন নিতে জানে। এই যে যত্ন করে রিক্সায় উঠিয়ে, রিক্সা থেকে নামতে সাহায্য, রাস্তা পার হতে সাহায্য করা আরে কত কি। এই একই যত্নটা আদ্রও চাইলে করতে পারত। পারত না নিজের সন্তানের আগমণী সময়টা সুন্দরভাবে যত্ন ভালোবাসা দিয়ে কাঁটাতে? কিন্তু কাঁটাল না তো। বরং এমন সব কান্ড করল যে নিজের সন্তানকে দুনিয়াতে না আনারই ব্যবস্থা করছিল। মিথি এই প্র্যাগনেন্সি সময়টায় স্পষ্টই তফাৎটা লক্ষ্য করে, তাই না? স্পষ্টই বুঝে হয়তো এক পুরুষ তাকে দিয়েছিল অত্যাচার, আঘাত,যন্ত্রনা। অন্য পুরুষ দিচ্ছে যত্ন, ভালোবাসা আর সম্মান।এক পুরুষ বাবা হয়েও সন্তানকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল, অপর পুরুষের চোখে মুখে সদা সর্বদাই বাবা হওয়ার আনন্দ। আদ্র চোখ বুঝে শুধু। ঠিক পরমুহূর্তেই দেখা গেল তার ছোট্ট বাটারফ্লাইকে। একটা মেয়ের সাথে নামছে। আদ্র আবারও লোভীর মতো কাছাকাছি গেল। শুধু ছুঁতে পারল না, একটা বার কোলে নিতে পারল না।
মিষ্টি যে মেয়েটার সাথে নামল সে হিয়া। মিষ্টির সাথে বেশ রকমের সখ্যতা থাকাতে প্রায়সই ছুটে আসে সে। হিয়া আর দীপ্রর আনুষ্ঠানিক বিয়েটা বছর খানেক হলো হয়েছে। এই তো মাস তিনেক হলো কনসিভ করেছে মেয়েটা। অথচ এখনো ওর দীপ্রর সেসময়ের অমন অভিনয়ের কথা মনে পড়লেই রকগে। কি কান্নাটা করেছিল হিয়া। আর এখন সে দীপ্রর বাচ্চার মা হচ্ছে।ভাবা যায়? মিষ্টি হুট করেই হিয়ার হাত ধরে বলল,
“ মামনি? তুমি কি জানো আম্মুর পেটে আমার ভাই-বোন আছে? ”
হিয়া মিনমিনে চোখে চেয়ে জানাল,
“ না রে আম্মা, জানব কেমনে বল? তোর আম্মা কি আমারে বলছে বল? ”
“ না বললে কি হইছে? তুমি দেখো না আম্মুর পেটটা বড়? ওখানে আমার ভাইবোন আছে। ”
“ বাহ বাহ! ভালো জানিস। এখন বল, আমার পেটে কি ভাইবোন আছে? ”
“ তোমার পেটে কেমনে থাকবে? তোমার পেট কি বড় নাকি? ঐটুকু পেটে বাচ্চা থাকে নাকি? ”
পেছন থেকে দীপ্র হেসে ফেলল কথাটা শুনে। হাসতে হাসতেই মিষ্টির সাথে তাল মিলিয়ে বলল,
“ ঠিকই তো। ঐটুকু পেটে আবার বাচ্চা থাকে নাকি? কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমার বাচ্চাটাকে ঐটুকু পেটেই থাকতে হবে। কত কষ্ট হবে আমার বাচ্চাটার।”
হিয়া রেগেই তাকাল। মিষ্টি ততক্ষণে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে বলে উঠল,
“ তোমারও বাচ্চা আছে? কিন্তু তোমার পেট ও তো ছোট। বাচ্চা কি করে থাকবে? ”
দীপ্র ফোঁস করে শ্বাস তুলল। বলল,
“ আমার বাচ্চাটা ভুল করে তোমার মামনির পেটে চলে গেছে আম্মু। এখন ওই আমার বাচ্চা। ”
“ ভুল করে? ভুল করে কিভাবে যাবে? তেমার পেট থেকে মামনির পেটে চলে গেছে বাচ্চাটা? অসম্ভব। ”
দীপ্র কপাল ঘষে। কি মহা মুসিবত! কপাল ঘেষেই শ্বাস তুলে বিড়বিড় করে বলল,
” পেট থেকে না যাক কিন্তু গেছেই তো।”
হিয়া মুহূর্তেই চোখ রাঙাল। গলা শক্ত করে বলল,
“ দীপ্রর বাচ্চা! কিসব বলছিস তুই? ”
বেচারা দীপ্র চুলে হাত উশখুশ করল। যেন কিছু বলেনি। মিষ্টি দুইজনকে ওমন বিড়বিড় করতে দেখে ভ্রু জেড়া কুঁচকে বলল,
“ কি বিড়বিড় করছো? ”
দীপ্র ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে বলল,
“ তোমার মামনির পেটটা সুন্দর তো। আর নরম ও বালিশের মতো। তাই বাচ্চাটা আমার শক্তপোক্ত পেট রেখে ওর পেটে চলে গিয়েছে মামনি। আমি কত করে বললাম থাকতে, থাকলই না। ”
হিয়া সঙ্গে সঙ্গেই চিমটি কাটল দীপ্র হাতে। কটমট করে চেয়ে বলল,
“ ওর সামনে কিসব বলিস ছাগলের মতো? ”
“ সত্যিই তো বললাম। খারাপ কি বলেছি? ”
হিয়া কথাই বলল না এবারে। মিষ্টিকে কোলে নিয়ে অন্যপাশটায় গেল। আর বেচারা দীপ্র ওভাবেই চেয়ে থাকল। করেছেটা কি সে?
আমজাদ সাহেবের দ্বিতীয় স্ত্রী বেশ আমোদ করেই দেশের বাইরে গেলেও ফেরার সপ্তাহ খানেক পরই একটা এক্সিডেন্টের সম্মুখীন হয়েছিল। এবং তাতেই তার এক পা ক্ষতবিক্ষত হয়েছে বিশ্রী ভাবে। আরেক পায়ের হাড় ভেঙ্গেছে। শুধু এইটুকুতেই ভোগান্তি থামল না। কেউই তার চিকিৎসার খরচ বহন করল না এই মুহূর্তে। কারণটা অবশ্যই আদ্রর। সহায় সম্পত্তির প্রতি আর কোন আকর্ষণ না থাকলেও এই মুহূর্তের সুযোগটা সে অবশ্যই নিল। নিজের অধীনে সবটা রেখেই জানাল,
“ ঐ নর্দমার কীটের জন্য এক পয়সাও খরচ হবে না। আমার আম্মুকে তিলে তিলে মেরেছিল না? ওই জানো’য়ারকেও আমি তিলে তিলে মরতে দেখতে চাই। ”
ফলস্বরূপ আদ্র সত্যি সত্যিই মাস তিনেক হলো চোখের সামনে দুই দুইজন মানুষকে তিলে তিলে শেষ হতে দেখছে। একজন আমজাদ সাহেব। অপর জন তার দ্বিতীয় স্ত্রী। যে সৌন্দর্যের জন্য আমজাদ সাহেবকে পেয়েছিল সে সৌন্দর্য আজকাল শারিরীক যন্ত্রনা আর কষ্টের কাছে চাপা পড়েছে। ভাঙা পায়ের যন্ত্রনায় এখনো ছটফট করে সে। ক্ষতবিক্ষত হওয়া পা টায় পচন ধরেছে কি বিভৎস ভাবে। ডায়বেটিস থাকার দরুনই বোধহয় এই পচন ধরা। কাছাকাছি গেলেই নাক চেপে ধরতে হয় তীব্র বিদ্ঘুটে গন্ধে। আদ্র তবুও যায়। ভালো লাগে তার। এই যে যন্ত্রনায় কাঁতরাচ্ছে, ছটফট করছে আদ্রর যে কি শান্তি লাগে। আদ্র আজও শান্তি পেল। প্রায় অনেকটা সময় যাবৎ নিজের আম্মুে জায়গা কাড়তে চাওয়া মেয়েটিকে দেখেই হাসল সে। বলল,
“ ইশশ! কষ্ট হয় না? তোর চিকিৎসা করানো উচিত বল জা’নোয়ার ? কিন্তু আমি যে জা’নোয়রদের চিকিৎসার জন্য এক টাকাও খরচ করি না। এই যে মরছিস একটু একটি করে? আমার ভালো লাগছে। আনন্দ হচ্ছে। আমার আম্মুও এভাবে মরেছিল। এভাবেই তো। তোর মতো জানোয়ারের জন্য আমার আম্মুর সংসারটা ভেঙেছে। তোকে ছেড়ে দিবে আল্লাহ? দেখ, তুই জীবন্তই পঁচে যাচ্ছিস। জীবন্তই মরছিস। এর চেয়ে দুঃখের হয় বল? যে শু’য়োরের টাকা দেখে বিয়ে করেছিলি সে শু’য়োরকে সেবা করার জন্য তাও তার আম্মা আছে। কিন্তু তোর কে আছে? তোর সেবা করার কেউ নাই। এর চেয়ে দুঃখের কিছু হয় বল তো? ”
দুঃখটা আমজাদ সাহেবের দ্বিতীর স্ত্রীর জন্য হলেও আদ্রর সুখ লাগল। পা বাড়িয়ে চলে যেতে যেতেই বাইরে দেখল সাইয়ারা মেহজাবীন। মুখে বেশ হাসি নিয়েই আদ্রদের বাসার কোণে দাঁড়িয়ে আছে। আদ্র বের হতেই এক পলক চাইল। হেসে বলল,
“ জেলখানার আদ্রর থেকে পরিপাটি আদ্র হয়ে গেলেন? কিন্তু বিনা চিকিৎসায় একজনকে কষ্ট দেওয়ার মানে কি আদ্র? বাবার যত্নটাও তো করতে পারেন।”
আদ্র এগোতে এগোতেই বলল,
“ আপনার মতো এত ভালো মানুষি আমার মধ্যে আসে না যে অপরাধীর প্রতিও সহানুভূতি দেখাব মিস। ”
“ সহানুভূতি? ”
আদ্র কঠিন গলাতেই বলল,
“ তাহলে? আমার এত খোঁজ খবর নিচ্ছেন কেন? কেন প্রয়োজনে ? ”
সাইয়ারা মেহজাবীন মৃদু হাসল। উত্তরে বলল,
“ পৃথিবীতে যাদের খোঁজখবর নেওয়ার মতো কেউ নেই তাদের খোঁজখবর নেওয়ার জন্য আল্লাহ কাউকে না কাউকে পাঠান। ধরে নিন, আমিও তেমনই। ”
“ প্রয়োজন নেই। যার কেউ নেই তার কেউ না থাকাই ভালো। মিথ্যে দুনিয়ায় মিথ্যে খোঁজখবর নেওয়ার দরকার নেই মিস। ”
“ কে বলল মিথ্যে? ”
“ আজ মরলে কাল দুদিন মিস। দেখবেন তখন আর মনেই রাখবেন না। এই সহানুভূতি দেখানোর মানুষ খুঁজবেন না। মিথ্যে খোঁজখবর নিবেন না। পৃথিবীতে যাদের কেউ নেই তাদের মনে রাখার মতোও কেউ নেই। তারা নিরবে, নিভৃতে পৃথিবী থেকে মুঁছে যায়..”
আদ্র এইটুকু বলে চলেই যাচ্ছিল। তারপর হুট করেই সাইয়ারার কল এল। মৃদু গলায় শুনতে পেল,
“ মোহনা বিনতে মুহু। এহসান সাহেবের প্রাক্তন প্রেমিকা। যার সাথে বিয়ে অব্দি সম্পর্ক এগোনোর আগেই মেয়েটা গ্যাং রেইপড হয়েছিল এবং খু’ন হয়েছিল। কেইসটা ঠিক তিন বছর আগের। ”
আদ্র ঘাড় বাঁকায়। নামটা চেনা। আবার বোধহয় চিনে না। হুট করেই ভ্রি কুঁচকে নিল সে। পা থামিয়ে সাইয়ারার দিকে চাইল। সাইয়ারা তখন কথা বলা শেষে প্রশ্ন করল,
“ কি? ”
আদ্র হাসে। বেঈমানদের মনে রাখতে নেই। চরিত্রহীনদের তো আরো নয়। বলল,
“ চরিত্রহীনদের মনে রাখতে নেই। ”
সাইয়ারা মেহজাবীন ভ্রু কুঁচকাল শুধু। বলল,
“ আমি এখানে শুধু আপনার খোঁজ নিতে আসিনি আদ্র। আপনাদের কোম্পানির সাথে এহসান সাহেবের কোম্পানির সম্পর্ক ভালো ছিল তো। আপনার সৎ মা জানবে রাইট? ”
“ এসব কথা একজন ক্রিমিনালের সাথে শেয়ার করে লাভ কি মিস? আপনার কাজ আপনি করুন। নিষেধ নেই। ”
সাইয়ারা বাদ দিল এবারে। তারপর আবারো হুট করেই কেমন নিষ্পলক তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ মোহনার সাথে আপনার সম্পর্ক ছিল রাইট? মুহু আপনার প্রথম ভালোবাসা রাইট? ”
“ ধুরররর, প্রথম নয়। ভুল অনুভূতি। ভুল সিদ্ধান্ত। বলা চলে, নিজের জীবনটাই শেষ করলাম ওর মোহে পড়ে। ”
সাইয়ারা হুট করেই বলল,
“ আপনার ভুল অনুভূতিময় মানুষটা ও অন্য একজনের মোহে পড়ে ঠকেছে। এহসান সাহেব খুব চালাক আর ধূর্ত মানুষ। মুহুর সাথে এহসান সাহেবের বিয়ের কথা ছিল। জানেন? কিন্তু শেষে বিয়ে হয়নি। সে গ্যাং রেইপ এর স্বীকার হয়েছিল। খু’ন ও হলো। এমনকি সে ঘটনার আগেই তার সম্পত্তি সব এহসান সাহেবের নামে হয়ে গেল। কাউকে দেখেছেন বিয়ের আগেই সব হবু স্বামীর নামে লিখে দিতে? কিন্তু দিনশেষে আইন এহসান সাহেবের বিরুদ্ধে যাবে না। আমিও যাব না। কারণ এটাই নিয়ম। ”
আদ্র ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। বলল,
“ আপনি কি আশা করছেন? আমি এসব শুনে কষ্ট পাব? শুনুন, ওকে আমার মনে পড়ে না বহু আগ থেকেই। আর যাকে মনে করি প্রতিমুহূর্তে সে আর আমার নেই। অন্যকারোর। ”
আদ্রর নিজের মেয়েকে কাছে পাওয়ার প্রার্থনা বোধহয় স্রষ্টা ফেলতে পারলেন না৷ তাই তো একটা হলেও সুযোগ তাকে দিল।
মিথি তখন মেয়েকে নিয়ে নিচে নেমেছিল । রাস্তাটা পার হয়ে চা দোকানটার কাছে যেতেই আদ্রর হুট করেই লক্ষ্য হলো তার বুক কাঁপছে। হৃদস্পন্দন বাড়ছে । যেন মিথি সামনে এলেই সে দাঁড়াতে পারবে না। মিথি ততক্ষনে অন্য পাশটায় গেল। পিছু পিছু এল ফিজা আর আয়মানও। অথচ হিমেল এল না দেখেই মিথি ভ্রু বাঁকাল। আয়মানদের কাছে মিষ্টিকে রেখে দু পা বাড়িয়ে আবার গেল। অপরদিকে আয়মান আর ফিজা কথা বলতে বলতেই এক পর্যায়ে মিষ্টি চা দেকানের দোকানদারের সাথে নিজের আজগুবি বকবক শুরু করে দিল।যেহেতু সবাই চেনা আয়মান আর ফিজাও কিছু বলল না। নিজেদের মতো কথা বলছিল। মিষ্টি ততক্ষনে চা দোকানের বেঞ্চিতে বসল। পাশে বসে থাকা আদ্র তখন ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে নিজের মেয়ের দিকে। তার কব কান্না পাচ্ছে? নাকি খুশি লাগছে? হাত পা কাঁপছে কেন এমন ভাবে? হাতে রাখা চায়ের কাপটাও কাঁপছে কেমন যেন। আদ্র তো ভীতু নয়। আদ্র শুকনো ঢোক গিলল। মিষ্টিই ভ্রু জোড়া কুঁচকে নিয়ে প্রশ্ন তুলল,
“ হাত কাঁপছে কেন আপনার? চা পড়ে যাবে না? ”
আদ্রর চোখজোড়া কেমন লাল হয়ে এল অদৃশ্য এক অনুভূতিতে। শুকনো ঢোক গিলে বলার চেষ্টা করল
“ না..পড়বে কেন? ”
মিষ্টি চাইল। উষ্কুখুষ্কু চুল৷ খোঁচা দাঁড়িভর্তি মুখটার দিকে চেয়ে আচমকাই নিজের নরম ফুলো হাতটা এগিয়ে ধরল আদ্রর কপালে। চুলগুলো সরিয়ে ছোট্ট আঙ্গুল গুলো দিয়ে ঠিক করে দিয়ে কপাল ছুঁয়ে বলল,
“ জ্বর আপনার? নাকি খাবার খাননা? আপনার মা আপনাকে খাবার খেতে বকে না? ”
আদ্রর চোখ বুঝে আসল মুহূর্তেই।ইশশ! তার মেয়েটা কি ভীষণ মিষ্টি করে কথা বলে। কেমন মা মা দেখাচ্ছে মেয়েটাকে। কতগুলো দিন হলো তার কপালে এভাবে কেউ হাত রাখেনি।কেই জিজ্ঞেস করেনি এমনভাবে। আদ্রর কান্না পায়। রক্তিম চোখজোড়া বুঝে নিতেই একফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল গালে। আদ্র সঙ্গে সঙ্গেই মুঁছল তা। হেসে বলল,
“ আমার মা তো আমার কাছে নেই আম্মু। আল্লাহর কাছে চলে গেছে। ”,
মিষ্টি চাইল ফ্যালফ্যাল করেই। আদ্র হঠাৎ ই বলল এবারে,
“ তুমি আমার আম্মু হবে ? তোমার চোখগুলো আমার আম্মুর মতোই হুবুহু। হবে? ”
মিষ্টি উত্তর করে না। শুধু আদ্রর ওভাবে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকাটা দেখে। তারপর কপাল থেকে হাত সরিয়ে বেঞ্চ থেকে নেমে পড়ল। দোকানদারকে বলে একটা শুকনো পাউরুটি নিল। তারপরই একহাত বাড়িয়ে আদ্রর চায়ের কাপে শুকনো পাউরুটিটা ভিজিয়ে আদ্রর মুখের সামনে ধরে বলল,
“ খাবার খাবেন নিয়ম করে। নয়তো শরীরে শক্তি পাবেন কি করে? আমার পাপাও মাকে বলে। না খেলে, এভাবেই খাইয়ে দেয়। বুঝলেন? আপনিও খাবারে অনিয়ম করবেন না। ”
আদ্র হেসে ফেলল। আবার বোধহয় কেউ মিথির যত্ন নিচ্ছে ভেবে চাপা কষ্টও হলো। আদ্র তবুও হাসল তার ঐটুকু মেয়ের যত্ন দেখে। আদ্রর হুট করেই এই মুহূর্তটাতে নিজেকে সবচেয়ে সুখী মানুষ মনে হলো। শান্তি অনুভব হচ্ছে ওর। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে সে। এই যে অবিকল মিথির মতে দেখতে মেয়েটা তার সন্তান, তার অংশ ভাবতেই সুখ সুখ অনুভূতিতে হৃদয় শীতল হয়ে আসছে
আদ্রর নিশ্চুপেই পরখ করল তার আদুরে মুখ, ডাগর চোখ, নাক, ঠোঁট!হুবুহু কারোর মুখের আদল। আদ্র বিয়ের পর থেকে মিথির মুখটা কখনো যত্ন নিয়ে না দেখলেও স্পষ্টই টের পেল এটা মিথির মুখের আদল। তারপর হেসেই তার ছোট্ট তুলতুলে হাত থেকে পাউরুটিটা মুখে নিয়ে বলল,
“ আপনি কি আপনার আম্মুর মতোই
হয়েছেন আম্মু? আমি ভুল না করলে
আপনার আম্মুর নাম মিথি রাইট? ”
“ আপনি আম্মুকে চেনেন? ”
“ চিনি তো। আপনি তে দেখতে তারই মতো একটা ছোট্ট বাটারফ্লাই হয়েছেন আম্মু। ”
মিষ্টি বিপরীতে বলল,
“ না, আমার আব্বু বলে আমি আমার আম্মুর মতোই ছোট্ট একটা মিথিফুল হয়েছি। আমি আমার আব্বুর পিচ্চি মিথিফুল। ”
আদ্র শুনল। তারপর হাসিটা মিইয়ে এল কেমন। বলল,
“ তোমার আব্বু তোমায় খুব ভালোবাসে? ”
“ অনেক ভালোবাসে। ”
আদ্র চুপ থাকল। হুট করেই বলল,
“ তোমার আম্মু কি তোমায় কোন খারাপ মানুষের কথা বলেছে আম্মু? বলেছে? ”
মিষ্টি ভ্রু কুঁচকাল। ছোট্ট মুখটা ভ্রু কুঁচকানোতে আদুরে দেখাল। আদ্র এবারে কথা ঘুরিয়েই বলল,
“ তোমার নাম তো জানা হলো না আম্মু? নামটাও নিশ্চয় তোমার মতোই মিষ্টি? ”
“মেহেরিন মাহমুদ প্রাণ। কিন্তু আম্মু, আব্বু, মামনি সবাই আমায় মিষ্টি ডাকে। ”
আদ্র হাসে। ভঙ্গুর হাসি। তারপর তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল,
“ আমি কি আপনাকে একবার কোলে নিতে পারি আম্মু? এই অনুমতিটা দিবেন আমায়? ”
মিষ্টি তাকাল। ছোট বাচ্চা হলেও আম্মি তাকে শিখিয়েছে সবাইকে বিশ্বাস করে না নিতে। যার তার কোলেও না উঠতে। তাই প্রথম কেমন করে চাইলেও পরমুহূর্তেই মায়া থেকেই সম্ভবত আদ্রর সামনে দাঁড়াল। কেন জানি তার এই লোকটার চোখ দেখে মনে হলো এই লোকটা তার আব্বুর মতেই ভালো মানুষ। তাই তো সামনে দাঁড়াল। আত্র হাসে। দুই হাতে আজলা করে মিষ্টির ছোট্ট মুখটা আগলে নিয়ে চুমু দিল কপালে। অতঃপর কোলে তুলল যত্ন করেই। চেয়ে থাকা দোকানদার লোকটাকে বলে উঠল,
“ ভাই? ফোন আছে আপনার কাছে? একটা ছবি তুলে দেন আমাদের। ”
অথচ দোকানদার ভদ্রলোক জানালেন ফোন নেই তার কাছে। আদ্র হতাশ হলো। মেয়েকে প্রথমবার কোলে তোলার আনন্দটা সে কাকে বলে বুঝাবে? কাকে প্রকাশ করবে? এই সুখটুকুর পর মরে গেলেও আফসোস নেই আদ্রর। আদ্রর চোখজোড়া যখন সুখে আনন্দে ভিজে আসল কেমন তখনই মিষ্টি বলে উঠল,
“ কাঁদছেন কেন? কোলে নিলে কাঁদতে হয়? ”
আদ্র কি করে বুঝাবে কাঁদছে কেন৷ গলা রুদ্ধ হয়ে আসে যে। এত সুখ বুঝানো যায়? আদ্র মায়ের কবরে গিয়েই আবার কাঁদবে। নিজের সুখ, আনন্দ, খুশি সব প্রকাশ করতে করতেই কাঁদবে আবারও। আদ্র উত্তর করার আগেই মিষ্টির পড়ল। মিথির গলা। আদ্র তড়িঘড়ি করেই মিষ্টিকে কোল থেকে নামাল। মেয়েকে বিদায় দিয়ে জানাল মায়ের কাছে যেতে। মিষ্টিও তাই করল। যাওয়ার সময় বলে গেল,
“ আপনি কিন্তু আম্মু নেই বলে খাবারে অনিয়ম করবেন না। বুঝলেন? ”
আদ্র মাথা নাড়াল। খুব ইচ্ছে করছিল, একটাবার মিষ্টিকে বলতে যে, “ একটাবার আব্বু বলে ডাকবে আম্মু?” অথছ সাহসই হলো না তার। সুদর্শন, সাহসী আদ্র এতোটাই ভীতি হয়েছে যে একটাবার মিথির সামনেও যেতে পারল না। শুধু মিষ্টির পিছুপিছু গিয়ে দেখল হিমেলের যত্ন। কপোট রাগ নিয়ে শুধাচ্ছে,
“ তোকে আবার উপরে যেতে কে বলেছে এই শরীর নিয়ে? আমব আসতাম না? নাকি থেকে যেতাম? ”
“ তাই বলে কোলে করে নামাতে হবে? সিঁড়িতে দুয়েকজন যারা দেখেছে কি ভেবেছে? ছিঃ!”
“ কি ভাববে? বউ তো আমারই। এতবার উঠানামা করবে আমি মেনে নিব কেন? ভুল ও তো আমারই ছিল। আমিই কেন দেরি করলাম। ”
“ বেশি বুঝেন। ”
অতঃপর বলতে বলতে ওরা পা বাড়াল মিষ্টিকে নিয়ে। আদ্র শুধু দেখল পেছন থেকে। তারপর দেখতে দেখতেই মিথিরা যখন অনেকটা দূরে চলে গেল ঠিক তখনই আচমকা একটা হলুদ রাঙা ভারী যানবাহন এসে ধাক্কা দিল আদ্রর শরীরটাকে। এতোটা জোরেই ধাক্কা দিল যে আদ্রর শরীরটা ছিটকে গিয়ে পড়ল অন্যপাশটাতে। খসখসে ছাঁই রাঙা রাস্তার জমিন মুহূর্তেই রক্তে রাঙা হয়ে লালাভ হয়ে এল। পরনের শার্টটার একটু অংশও অবশিষ্ট রইল না রক্তিম হতে। ভিজে লালচে শার্টটা চুপসে গেছে শরীরে। যন্ত্রনাটা এতোটা তীব্রই যে আদ্রর বোধহয় নিঃশ্বাস আটকে এল। বুকের দিকটা বড্ড বেশি ভারী লাগছিল। তবুও ঐ যে, একটু আগেই মেয়েকেই কোলে তুলেছিল এই সুখটার কাছে যন্ত্রনাটা অবহেলিত। এখন সে পৃথিবী ছেড়ে গেলেও আফসোস থাকবে না। আদ্রর চোখজোড়া বুঝে আসছিল। অথচ চোখের চাহনি তখনও মিথিদের যাওয়ার পথের দিকেই। কি অসহায় করুণ চাহনিতে রাস্তার জমিনে পড়ে থেকে সে চেয়ে ছিল মিথিদের দিকে। ইশশ! মিথি যদি একবার ফিরে চাইত তাহলে বোধহয় একটাবার হলেও লক্ষ্য করত যে এক মুমূর্ষু পুরুষ মরতে বসেও তার দিকেই তাকিয়ে ছিল। আদ্রর বেশি ক্ষন চোখ খুলে রাখতে পারে না। চোখমুখে রক্তের মাখামাখি তখন। একটি আগে মেয়ের হাতে গেছানো চুলগুলোও রক্তে ভিজে চুপসে আছে। পথেরা ধূলোরাও তখন রক্তকে আঁকড়ে ধরে লাল বর্ণ নিয়েছে নিজেদের রূপে। আদ্র নাসারন্ধ্রে বায়ুর উপস্থিতি তখনও ছিল। তখনও মনে মনে আওড়াল,
“ আম্মু? আমার আর কেন আফসোস নেই আ। কোন দুঃখ নেই আম্মু আর। বাটারফ্লাইকে একবার তো আল্লাহ কাছে দিলেন। শুধু একটা ইচ্ছা অপূর্ণ থেকে গেল। বাটারফ্লাই এর মুখে একটাবার আব্বু ডাক শুনতে পারিনি…”
আদ্র সে আফসোসটা নিয়েই পৃথিবী ত্যাগ করল সে রোদেলা দুপুরে। মেয়েকে কোলে নেওয়ার খুশি টুকু আর মায়ের কবরে গিয়ে বলা হলো না একটাবার। বলা হলো না তার মেয়ের সাথে তার এই সুখময় স্মৃতিটা। লম্বা চওড়া মুখ থুবড়ে পড়া সুদর্শন শরীরটা রক্তে মাখামাখি হয়ে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে কি করুণভাবে। অথচ প্রাণহীন,নিথর শরীরটা কেউ একটাবার ছুঁয়েও দেখল না। কেউ এগিয়ে এসে একবার তুলল না তাকে। যতোটা সময়ে আইনের মানুষরা এসে তার শরীরটা নিয়ে গেল ঠিক ততোটা সময়ই শরীরটা পড়ে থাকল খসখসে রাস্তার জমিনে। নিঃসঙ্গতা বোধহয় একেই বলে হুহ?
.
একটা নতুন কবর। কাঁচা মাটিতে ঘেরা কবরটার পাশেই চোখে পড়ছে একটা নামফলক। যাতে স্পষ্টই লেখা আছে আদ্র শাহরিয়ার চৌধুরীর নামটা। এক সুদর্শন যুবকের কবর! যে এখন পৃথিবীতে শুধুই স্মৃতি। কোথাও তার কোন অস্তিত্ব নেই। তার নতুন কবরটার পাশেই আরো একটা কবর চোখে পড়ছে সরাসরিই। আরুনিমা মাহমুদের কবর। মা ছেলে দুইজনই পৃথিবী থেকে মুঁছে গিয়েছে চাপা দুঃখ নিয়ে। সাইয়ারা অনেকটা সময়ই আদ্রর কবরটায় নিষ্পলক চেয়ে থাকে। তারপর আচমকাই শুধাল,
“ বলেছিলেন না ভুলে যাব? মনে রাখব না আপনাকে? বলেছিলেন না পৃথিবীতে যাদের কেউ নেই তারা নিরবে নিভৃতে মুঁছে যায়? অথচ আপনি মুঁছে যান নি আদ্র। আমি এখনো আপনাকে ভাবি। এখনো মনে করি। এই পৃথিবীতে যাদের কেউ নেই তাদেরও মনে রাখার জন্য আল্লাহ কাউকে না কাউকে রাখেন। কারোর না কারোর মনে তার জন্য মায়া জন্মিয়ে দেন। এই যে, আমি সাইয়ারা মেহজাবীন.. আপনি অপরাধী , খারাপ জেনেও আপনার মায়ায় আটকালাম। আপনার প্রতি এই মায়াটাকে আমার জীবনের এক অমীমাংসিত সমীকরণ হিসেবেই আজীবন আগলে রাখব। আজীবন স্মৃতিতে রাখব এক ছন্নছাড়া যুবককে। ”
মিথিকে সাতমাসের ভরাপেট নিয়ে বেশ আদুরেই লাগে আজকাল। মুখটা আগের থেকে গোলগাল হয়েছে। হিমেল অবশ্য আগের মতোই মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকে তার মিথিফুলের দিকে। একটা মেয়ে এত সুন্দর কেন হবে? যে কেবল তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছে হয়। হিমেল একটি আগেই মেয়েকে ঘুম পাড়াল। অতঃপর মিষ্টি ঘুমিয়ে যেতেই মিথির দিকে চাইল। গোলগালটা মুখটায় ক্লান্তি, চুলগুলো কিছুটা এলোমেলো । মিথি তখনও মিষ্টির দিকেই তাকানো। মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। হিমেল দুই চোখে দেখল মা মেয়ের এই দৃশ্যটা। মৃদু হেসে বলল,
“ ঘুমা মিথিফুল। ”
মিথি চাইল। মিথিফুল সম্বোধনে এখনো যেন তাকে লজ্জায় আঁকড়ে ধরে। তবুও লজ্জাটাকে চেপে রেখে বলল,
“ আপনি ঘুমান। ঘুম আসছে না৷ আমি বেলকনিতে বসব একটু। ”
হিমেল শুনল। মিথি ততক্ষনে ধীর পায়ে এগোল বেলকনির দিকে। যাওয়ার সময় আলোটা নিভিয়ে হলদেটে আলোটা জ্বালিয়ে দিয়ে গেল। হিমেলের ঘুমানোর ইচ্ছে থাকলেও হুট করে উঠে দাঁড়াল। মিষ্টির দুই পাশে এখনো ছোট বাচ্চার মতো বালিশ দিয়ে গুঁটি গুঁটি পায়ে বেলকনিতে গেল। মিথির হাতে তখন তেলের বোতল। রাতে তেল দিয়ে সকালে গোসল দিবে। তাই এক হাতে তেলের বোতল থেকে বাটিতে তেল নিতেই হিমেল চিরুনি নিয়ে হাজির হলো।
তখন আকাশে এক ফালি চাঁদ। বেলকনির গ্রিল ভেদ করে আসছে হালকা মৃদু মন্দ হাওয়া। অদূরে কোথাও কেউ সাউন্ডবক্সে গান ছেড়েছে। যা এখানেও বেশ শোনা যাচ্ছে। হিমেলের পাশে রাখা ছোট বাটিতে অল্পকিছু তেল । একটু সময় পরপর তা থেকে তেল নিয়েই মিথির চুলে মাখাচ্ছে হিমেল। ঘন কালো চুলগুলো তেল দেওয়াতে চকচক করছে। চিরুনি চালিয়ে তেল চটচটে চুল গুলোই বেনুনি করল হিমেল। এক সময়ে চুল বাঁধতে না পারা হিমেল এখন বেনুনি বাঁধাতে দক্ষ। হিমেল তা ভেবেই হাসল। মিথির মাথাতেই নিজের মুখটার ভর দিয়ে মৃদু গলায় বলল,
“ আমরা সত্যিই সংসার করছি তাই না মিথি? ”
মিথি কপোট রাগ দেখিয়ে হিমেলের দিকেই মুখ করে বসল। বলল,
“ সন্দেহ আছে কি আপনার? ”
হিমেল হেসে ফেলে। দুই হাত আজলা করে মিথির গোলগাল মুখটা আলতো করে আগলে নিয়ে চুম্বন আঁকল কপালে। অতঃপর ডান গালে, বাম গালে এবং নাকে। মুগ্ধ হয়ে তেল ছিটছিটে ঘামে ভেজা মুখটা দেখতে দেখতেই হঠাৎ অদূরের ভেসে আসা গানটার সাথে তাল মিলিয়েই গেয়ে উঠল ,
“ তোমারি পরশে ভালোবাসা
আসে মনেরই আঙিনায়
নয়ন ভরে দেখি তোমায়
তবু বুঝি দেখার শেষ নাই।”
মিথি নিজেও মৃদু হাসল। পরপরই নিজেও সুরেলা কন্ঠে শোনাল,
“ তোমায় ছেড়ে বহুদূরে যাব কোথায়?
এক জীবনে এত প্রেম পাব কোথায়? ”
হিমেল হাসে। নিজের প্রিয় নারীর দিকে চেয়ে থাকতে থাকতেই হুট করেই আচমকা মিষ্টির গলা শোনা গেল। জেগে গিয়ে খুঁজছে। হিমেল তড়িঘড়ি করেই উঠে পা বাড়াল। পাছে যদি মিষ্টি ভয় পায়? গিয়ে ফের মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে আসতেই দেখা গেল মিথি চেয়ে আছে। চোখাচোখি হতেই শুধু একটিুকরে হাসি উপহার দিল। বলল,
“ ভাগ্যিস আপনি এসেছিলেন। নয়তো আমার জীবনের এই রঙিন বসন্ত কি করে পেতাম বলুন তো? বিষাদ শেষে বসন্তের তো আর দেখাই পেতাম না।”
হিমেল নিজেও হাসল। মিথির গোলগাল মুখটা নিজের দুই হাতের আজলায় নিয়ে বলল,
বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৭০
“ ভাগ্যিস আল্লাহ আমাকে আমার মুনাজাত গুলো কবুল করে আমার মিথিফুলকে দিয়েছিল। নয়তো আমার জীবনের বিষাদ হয়েই যে থেকে যেতেন আপনি৷ না পাওয়া হতো আপনাকে, না পাওয়া হতো পিচ্চি মিথিফুলকে, না পাওয়া হতো এই সুন্দর দিন গুলো আর না পাওয়া হতো আপনার ভালোবাসা। ”
সমাপ্ত
