বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৬৮
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
চারপাশেই মৃদু ঝড়ো হাওয়া বইছে। ঝিরঝিরে বৃষ্টি আশপাশটায় ভিজিয়ে তুলেছে মুহূর্তেই। বাতাসে ভেসে বেড়ানো কর্দমাক্ত ঘ্রাণটা নাকে লাগছে ভীষণ করে। আর ঠিক এই বৃষ্টির ঝমঝমে ধারার মধ্যেই আদ্র প্রবেশ করল তার আগের বাড়িটায়। যে বাড়িটায় সে ছোট থেকে বেড়ে উঠেছে ঠিক সে বাড়িটাতে। আদ্র চেয়ে চেয়ে দেখল স্থির চাহনিতেই। না, বিশেষ কিছু পাল্টায়নি বাড়ির। সব একই রকম। একই, আগের মতোই আছে। শুধু বদলেছে বাড়ির মানুষগুলো, মানুষগুলোর ভালোবাসা, আদর, স্নেহ।বদলেছে তার মায়ের উপস্থিতি। বদলেছে তার জীবন৷ আদ্র কতগুলো দিন অপেক্ষা করেছে এই দিনটার জন্য। কতগুলো রাত প্রহর গুণেছে কবে তার মায়ের কাছে একটাবার পৌঁছাতে পারবে।
কবে মায়ের সামনে নিজের উগড়ে দিতে পারবে। আদ্র চোখজোড়া বোধহয় লাল হয়ে এল কেমন। পরনের শার্টটা ততক্ষনে ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে ভিজে বসেছে। আদ্র এক পা এক পা করেই পা বাড়াচ্ছিল আর কপাল কুঁচকে দেখছিল আশপাশটা। এই বাড়িটাই, এই বিল্ডিংটাই তো আদ্রর বাসভূমি ছিল। সকাল হোক, রাত্রি হোক ছুটে আসত এই বাড়িটাতেই। কত স্মৃতি তার, কত রাগ-জেদের গল্প, কত স্নেহময় আদর রয়ে গেছে এই বাড়ির আনাচে কানাচে। অথচ আজ সেই রাগ-জেদ মানানোর জন্য আদ্রর পাশে কেউ নেই। স্নেহময় আদর দিতেও আজ কেউ তাকে কাছে টানার মতো নেই। আদ্র একা! দুরিয়ার বুকে নিঃস্ব এক মানুষ সে। যার একটা সময় সব ছিল। সবব! অথচ এখন? কিচ্ছু নেই। সময়ের পরিক্রমায় আদ্র সব হারিয়েছে। আদ্রর দমবন্ধ লাগে কেন যেন। এই বাড়িটাতেই, এই বাড়িটাতেই তার মা ছিল ভাবতেই তার চোখ ফেটে পানি গড়াবে বোধহয়। তার মা তো আর নেই। যে মা তাকে ছোট্ট থেকে একটু একটু করে মানুষ করেছে সে মাকেই ঐ পশুগুলো বাঁচতে দেয়নি।
জেনেশুনে একটু একটু করে শেষ করে। আদ্রকেও ঠিক এইখান থেকেই তো মায়ের মৃত্যুর দিন জেলে নেওয়া হলো নিজের বাবা এবং বাবার দ্বিতীয় স্ত্রীকে হত্যাচেষ্টার দায়ে। মায়ের জানাজায় অব্দি অংশ নিতে দেয় নি ঐ জানোয়ারগুলো। মায়ের কবরে এক মুঠো মাটি দেওয়ার সাধ্যটুকু ও রাখে ঐ পশুগলো। পশুই তো। আদ্র ঐ পুরুষটাকে নিজের বাবা হিসেবে মানেই না আর। যে পুরুষ তার মায়ের মতো নরম মনের নারীকে ঠকিয়েছে, তিলে তিলে একটু একটু করে কষ্ট দিয়ে মেরেছে তাকে সে বাবা মানবে? আদ্র চোখ বুঝল। অতঃপর এক পা এক পা করে গেল ঠিক বাড়ির পেছনের দিকটাতেই। পারিবারিক কবর ঠিক ওখানেই। আদ্র জানে, ঠিক ওখানেই তার আম্মু আছে। তার আম্মুর কবর আছে। আদ্র ক্লান্ত ভঙ্গিতে এগিয়েই মায়ের কবরটার সামনে দাঁগাল স্থির ভঙ্গিতে। কবরটা খুঁজতে তার কষ্ট হলো না। এইতো মাটির কবরটার দুই পাশেই বেলিফুল গাছ। ওখানে থাকা বড় বড় বকুল গাছ গুলোর বকুল ফুল ঝরে পড়েছে কবরটার উপরেই।একটা বকুলময় ঘ্রান নাকে লাগছে। আদ্র চাইল। সিমেন্টে বাঁধানো জায়গাটায় গুঁটি কয়েক অক্ষরে লেখা আছে তার মায়ের নামটিই। “ আরুনিমা মাহমুদ।”
আদ্র কয়েক মুহুর্ত ওভাবেই চেয়ে থাকল। মায়ের মৃত্যুর পর এই প্রথম সে মায়ের কবরে এসে দাঁড়িয়েছে। এই প্রথম সে মায়ের কবরটা দেখতে পারছে। এই প্রথম, মায়ের কবরটা ছোঁয়ার সাহস হচ্ছে তার। কতগুলো রাত যে সে আহাজারি করেছে,আফসোস করেছে। আদ্র দাঁড়াতে পারল না। কেমন ভঙ্গুর বস্তুুর মতোই আচমকাই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল শুকনো পাতা-লতাময় ভিজে স্যাঁতস্যাঁতে জায়গাটায়। অতঃপর কেমন স্থির চোখে চেয়েই আচমকাই আদ্র সে মাটির উচুমতো কবরটা জড়িয়ে ধরল। ভেজা স্যাঁতস্যাথ, কর্দামাক্ত জায়গাটাকে জড়িয়েই সর্বপ্রথম ঠোঁট ছোঁয়াল ছোট্ট বাচ্চার ন্যায়। অতঃপর ছোট্ট বাচ্চারা যেমন মায়ের কোলে গুঁটিশুঁটি মেরে বসে ঠিক তেমনই আদ্রও মায়ের কবরটা জড়িয়ে বাচ্চাদের মতো বিড়বিড় করল,
“ আম্মু? আম্মু, এই আম্মু..তোমার আদ্র এসেছে দেখো। যে ছেলেটা তোমার অবাধ্য ছিল সে অপদার্থ ছেলেটাই তোমার সামনে এসেছে আম্মু। আম্মু? আমি কি বেশিই পাপী? কেন ছেড়ে চলে গেলে আমাকে?দেখো আম্মু, আজ আমার কিচ্ছু নেই। কিচ্ছু না। আমি নিঃস্বআম্মু। জানো?একটাবার তোমার কবর ছোঁয়ার জন্য আমায় কতগুলো দিন অপেক্ষা করতে হয়েছে আম্মু?”
আদ্র কেঁদে ফেলল ততক্ষনে। রক্তলাল চোখজোড়া বেয়ে পানি গড়াচ্ছে। ভেজা মাটির কিছুটা কাঁদা লেগেছে তার মুখে, শার্টে এমনকি চুলেও৷ আবারও বলল,
“ চলে গিয়ে আমাকে শাস্তি দিলে তাই না আম্মু? আদ্র তো খারাপ। খারাপদের শাস্তি পাওয়াই উচিত। আম্মু, তুমিও দিলে সে শাস্তিটা? মনে আছে আম্মু? ছোটবেলায় কোন টিউটর আমার হাতের তালুতে মারলে তুমি আমার সে হাতের তালুতে চুমু দিয়ে দিতে আলতো করে। মনে আছে আম্মু? বলতে না? মায়েরা বাচ্চাদের এতোটাই ভালোবাসে যে শাস্তি দেওয়ার সাহসই হয় না। তাহলে? সে তুমিই কি করে এই সাহসটা করলে আম্মু? জানো আম্মু? লোহার গ্রিলের ভেতর ঐ অন্ধকার রুম গুলোতে আমার একেকটা দিন কেমন গিয়েছে? একেকটা রাত আমি কতোটা ছটফট করেছি? যদি তুমি থাকতে তাহলে তো আমায় ছটফট করতে হতো না আম্মু৷ অন্তত কোন এক দিন তোমার মুখটা দেখতে পাব ভেবে হলেও শান্তি পেতাম আম্মু। তুমি বেঁচে থাকলে তো তুমি আসতে, আমায় দেখতে আসতে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে হয়তো বা কখনো। হয়তো বা কখনো হাত জড়িয়ে চুমু দিতে। তাই না আম্মু?বলো না..”
আদ্র ফের আবারও বলল,
“ আচ্ছা আম্মু? তুমি রাগ করেই চলে গিয়োছো তাই না? আমার প্রতিও তো তোমার রাগ ছিল। তাই তো আমাকে ছেড়েও চলে গেলে তাই না? যেমন মিথি রেগে আমায় ছেড়ে চলে গিয়েছিল। আর ফিরেনি। আচ্ছা আম্মু, তোমার মিথির সাথে আমার আরেকটাবার দেখা হবে কি? দেখা পাব তো ওর আরেকবার? একটাবার আমার বাটারফ্লাইকে কোলে নিতে দিবে তো ও ? একটাবার ক্ষমা করবে তো আমায় আম্মু? ”
আদ্র আবারও বাচ্চাদের মতো করে বলল,
“ জানো? জানো আম্মু? আমি কতগুলো দিন ঘুমাইনি বাটারফ্লাইকে স্বপ্নে দেখে। কতগুলো দিন আমি কল্পনা করেছি, আমার বাটারফ্লাই এমন হবে, আমার বাটারফ্লাই ওমন হবে। আম্মু, তুমি জানো আমি বাটারফ্লাইকে একটাবার দেখার জন্য কতোটা অপেক্ষায় আছি? কতোটা অস্থিরতা এই বুকে? ”
আদ্র ওভাবেই বিড়বিড় করল। বৃষ্টির ঝিরঝিরে ধারাতে ওভাবেই ভিজতে লাগল। ওভাবেই লেপ্টে পড়ে থাকল মায়ের কবরের কর্দমাক্ত মাটিতে। অনেকদিনের কথা জমানো যে। সব মাকে বলতে হবে তো! আদ্রর আর আছেই বা কে কথা শোনার জন্য?
বেলকনির গ্রিলটায় অনাদরেই বেড়ে উঠেছে একটা বাগানবিলাসের ডাল। গোলাপি রং এর সে ফুলগুলোও দূর থেকে বেশ সুন্দর মনে হয়৷ হিমেল সে বেলকনির দিকেই একবার চাইল। অতঃপর ঘড়িতে সময় দেখল। বিকাল চারটার উপরে বেজেছে। এই তিনটা বছরে তার ভালোবাসার গল্পটা আরো মজবুত হয়েছে। গড়ে উঠেছে কত আদরমাখা শতসহস্র স্মৃতি। হিমেল হাসল মৃদু। কোলে থাকা মিষ্টিকে একবার চেয়েই বলল,
“ আম্মু? আজ আমরা আম্মুকে আনতে যাই? চলো সারপ্রাইজ দিব। ”
হিমেল আজ তাড়াতাড়িই ফিরেছিল অফিস থেকে। উদ্দেশ্যই ছিল মিষ্টিকে ড্রয়িং ক্লাস থেকে নিয়ে মিথিকে আনতে যাবে। তারপর একটু আধটু ঘুরঘুর করবে আশপাশ। হিমেলের অবশ্যই এই দুটো ফুলের সাথে ঘুরতে বেশ ভলোই লাগে। হৃদয়ে শান্তি নামে। মিষ্টি ততক্ষনে হিমেলের গলা জড়িয়ে ধরেছে। বলল,
“ আম্মুর স্কুলে যাব পাপা? ”
“ হুহ! ”
এইটুকু বলেই হিমেল হাসল৷ মিথির একটা সারকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জব হয়েছে এই তো মাস ছয়েক হলো। মেয়েটা বরাবরই নিজেকে নিজেই ভেঙ্গেচূড়ে গড়েছে। ঐ কঠিন সময়টাতে পার্টটাইম জব, টিউশনি ইত্যাদি করে নিজেকে নিজেই গড়েছিল। অতঃপর এই যে আজ একটা একটা জায়গায় দাঁড়িয়েছে এটাও তার নিজেরই কৃতিত্ব।হিমেল হাসে৷ রিক্সায় উঠে নির্দিষ্ট ঠিকানায় যাওয়ার সময় মিষ্টি আবারও বলল,
“ আজ আম্মু বকা দিবে না? ”
হিমেল এবারেও হাসল। গত সপ্তাহেই হিমেল আর মিষ্টি স্কুলের সামনে টানা একঘন্টা দাঁড়িয়ে ছিল বলে মিথি রেগেছিল। বকাও দিয়েছিল। মিষ্ট তা মনে রেখেই জিজ্ঞেস করছে? বলল,
“ না, আম্মু বকা দিলে আমরা আম্মুর সাথে আড়ি করে দিব। ”
অতঃপর সত্যি সত্যিই মিথি বকা দিল না। হিমেল শুধু বাইরে থেকে হালকা গোলাপি আর কালো পাড়ের শাড়ি পরা মেয়েটির দিকে চেয়ে থাকল। এগিয়ে আসতেই বলল,
“ ম্যাম এতোটাই পড়িয়েছেন যে নিজের চুল ও এলোমেলো হয়ে গিয়েছে। চোখমুখ ঘেমে একাকার। একটু নিজের দিকেও যত্ন নিন ম্যাম। ”
বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৬৭
মিথি চাইল। মিষ্টিকে নিজের কোলে নেওয়ার জন্য হাত বাড়িয়েই,
“ প্রতি সপ্তাহেই নিতে আসতে হবে কেন? আমি তো যেতে পারি৷ লোক দেখাদেখি হলে যদি নজর লেগে যায়?”
মিষ্টি অবশ্য মিথির কোলে গেল না। হিমেলের কোলেই থাকল। হিমেল শুধু ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“ নজর? তাও সারফারাজ আহমেদ হিমেলের ভালোবাসাতে? লাভ নেই। হাজার জনের নজর পড়লেও হিমেলের ভালোবাসা বদলাবে বলে মনে হয় না। ”
