Home দুইজনাতেই দুইজনাতেই পর্ব ১৯

দুইজনাতেই পর্ব ১৯

দুইজনাতেই পর্ব ১৯
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

“ এখন তো জেগে আছেন। এখন কিছু করলে খবর করার চান্স নেই বলছেন?”
দ্বিতীর ভ্রু জোড়া কুঁচকানো ছিল কিছুটা। কথাটা শুনে সে কুঁচকানে ভ্রুই শিথীল হয়ে এল। মুহুর্তেই ভালো করে চাইল সাক্ষ্যর মুখপানে। ঠোঁটে ঝুলছে বাঁকা হাসির রেশ। দুই হাত রেখেছে দ্বিতীর দুই পাশেই। দ্বিতী মুহুর্তেই বিছানার সাথে সিটিয়ে যাওয়ার মতো করে সাক্ষ্যর থেকে দূরত্ব টানতে চাইল। যেন বিছানা দাবিয়ে নিচে পড়ে গেলেও বাঁচে। বলল,
“ ছিহ! এইসব প্ল্যান করে এনেছেন আমাকে? ”
সাক্ষ্যর হাসি এল যেন। অথচ দ্বিতীর সামনে হাসলই না। ঠোঁট বাকিয়ে মুখটা আরেকটু নিচু করে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“ প্ল্যান তো অনেককিছু আছে ম্যাম। মারামারি, খু”নাখু’নি ইত্যাদি ইত্যাদি…”
দ্বিতী তর্জনী আঙ্গুল তুলে ধরল প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। সরু চোখে চেয়েই বলল,
“ আর একটু এগোলেই এখন সত্যি সত্যিই খু’নাখু’নি হয়ে যাবে কিন্তু। সরুন। আমার দমবন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ”
সাক্ষ্য হেসে ফেলবে যেন। অতঃপর বহু কষ্টে হাসি আটকিয়ে রেখেই সে সত্যিই আরেকটু এগোল। পরমুহূর্তেই নিজের ঠোঁটজোড়া দ্বিতীর ফুলো গালে ছুঁয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“ নিন, আপনি জেগে থাকা অবস্থাতেই কিছু করে ফেললাম। এবার প্লিজ আমার কি করার করুন। ”
দ্বিতী তখনও ওভাবেই সিঁটিয়ে ছিল বিছানায়। আকস্মিক ঠোঁটজোড়ার স্পর্শে এক মুহূর্তেই চোখ খিচে বন্ধ করতে নিতেই কানে এল,

“ অদিতি আন্টির মেয়েটকে ঘুমালে একটা বিড়ালছানার মতো লাগে। ভাগ্যিস এক রুমে থাকার প্ল্যান করেছিলাম। নয়তো এহেন দৃশ্য তো দেখতেই পেতাম না। ”
দ্বিতী এবারে বাম হাতে ঠেলে ধরল সাক্ষ্যর মুখটা। চোখেমুখে ফুটে উঠা হাসিটা পরখ করেই বলল,
“ অদিতি আন্টির মেয়েকে আবার তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা কবে থেকে শুরু করেছেন? একটুখানি ঘুমাতেই না ঘুমাতেই… ”
“ঐ যে, বউ হন। বউ হওয়ার আগে খেয়াল থাকা উচিত ছিল তাকালে কি হবে না হবে। ”
দ্বিতী যেন উত্তর পেয়ে খুশিই হলো। ঠিক এমন একটা উত্তর তো সে ও দিতে পারত যেদিন ক্লাসরুম থেকে বের করে দিয়েছিল। প্রায় ফুঁসে উঠেই বলল,
“ তাই নাকি? তো বর হওয়ার আগে খেয়াল ছিল না মিস্টার সাক্ষ্য এহসান? যে বউ তাকালে আপনার সমস্যা হবে? নাকি ভুলে গিয়েছিলেন? ”
সাক্ষ্য মুখটা আবারও এগোল। একদম দ্বিতীর নাক ছুঁইছুঁই মতো নাকটা ঠেকিয়ে চোখে হেসে বলল,
“ বউ তাকাতেই পারে, কিন্তু স্টুডেন্টদের তাকানো নিষেধ। স্টুডেন্টরা টিচারদের দিকে ওভাবে ড্যাবড্যাব করে তাকায় না। বরের দিকে তাকাতে হয় ৷”
দ্বিতী মৃহূর্তেই চোখ সরু করে তাকিয়ে ভ্রু নাচাল। বলল,

“ তাই নাকি? তো কোন টিচার তার স্টুডেন্টের সাথে এমন আচরণ করে? এই জনমে তো কাউকে দেখি নাই এমন। ”
সাক্ষ্য হাসল বোধহয় এবারে। ডানহাতের তর্জনী আঙ্গুলটা দ্বিতীর নাকে ছুঁইয়ে হুট করেই নাক পরমুহূর্তেই বৃদ্ধা আঙ্গুলের সাহায্যে মৃদু টান দিয়ে বলল,
“ টিচারকে দেখার দরকার নেই। তবে এই জনমে যদি কোন হাজব্যান্ডকে এমন আচরণ করতে না দেখে থাকেন তো দেখে নিতে পারেন।”
এইটুকু বলেই গা ঝাড়া দিয়ে বসল সাক্ষ্য। এক পা দুই পা করে ঘরের আলো নিভিয়ে দিয়ে এসে সোজা শুঁয়ে পড়ল দ্বিতীর পাশটাতেই। গম্ভীর গলায় বলল,
“ ডিয়ার ঘুমকাতুরে দ্বিতী, ঘুমিয়ে পড়ুন। কাল ভোর ভোর উঠতে হবে। ”
দ্বিতী ভ্রু কুঁচকে বলল,

“ কেন? ”
সাক্ষ্য চোখ বুঝল তখন। বলল,
“ আপনাকে পাচার করে দিব তাই। ”
“ এতো সাহস হবে না আপনার। ”
“ কে বলল হবে না?”
“ আমি বলছি।”
সাক্ষ্য ওভাবেই চোখ বুঝে রেখে হাসল কেমন ঠোঁট বাঁকিয়ে। বলল,
“ অলরেডি পাচার হয়ে গেছেন ম্যাম। সেই কবে থেকেই নিজেকে অন্যজনের কাছে পাচার করে দিয়েছেন। ”
দ্বিতী ফুঁসে উঠল। বলল,
“ মানুষের দুর্বলতা বুঝেই সুযোগ নিন খুব তাই না? আপনাকে কে বলল যে আমি এখনও পাচার হয়েই আছি? এমনও হতে পারে আপনাকে আমার আর পছন্দই হয় না। মানুষের পছন্দ পাল্টাতে পারে সময়ে-অসময়ে। ”
সাক্ষ্য এতক্ষণ চিৎ হয়ে চোখ বুঝে শুঁয়ে থাকলেও প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই চোখ মেলে কাত হয়ে গেল। দুই হাতে দ্বিতীকে একদম টেনে নিয়ে নিজের মুখোমুখি করেই বলল,
“ মানুষের পছন্দ বদলাতেই পারে। নো প্রবলেম! কিন্তু আপনার পছন্দ কেবল একবার বদলাক দ্বিতী, তারপর দেখবেন পছন্দ কি করে স্থায়ী করতে হয়। ”
দ্বিতী ভ্রু নাচাল। বলল,

“ কি করবেন? ”
“ কিছুই করব না। শুধু নিজের জিনিস নিজের করে রাখব। ”
“ কি করে? ”
সাক্ষ্য ওভাবেই উত্তর করল,
“ পার্মানেন্ট ভাবে আমার বাড়ি আসুন। তারপর দেখবেন। ”
দ্বিতী চেয়ে থাকল আগের মতোই। সাক্ষ্যর কথার বিনিময়ে বলে উঠে,
“ ভার্সিটি লাইফ শেষ হোক। স্টুডেন্ট বিয়ে করেছেন এটা সবাই জানলে মান সম্মান যাবে না আপনার? ”
সাক্ষ্য বুঝল দ্বিতী যে খুব সূক্ষ্মভাবেই খোঁচা দিল। সে যে আকদের সময় স্টুডেন্ট বিয়ে করবে না বলে নিরাশ মুখ দেখিয়েছিল? বলেছিল দ্বিতীর ভার্সিটি লাইফ শেষ হলেই আনুষ্ঠানিক বিয়ে করবে তারই খোঁচা? বলল
“ আমার মান সম্মান নিয়ে আপনাকে ভাবতে বলল কে? ”
“ স্যার বলে কথা। ভাবব না? তাছাড়া নিধিকেও তো বললেন আজ। যদি ও বলে দেয় সবাইকে? আপনার কি হবে? ”
সাক্ষ্য ভ্রু নাচিয়ে বলল,

“ হওয়ার বাকি কি রেখেছেন? ”
“ আমি? মিথ্যে দোষ দেওয়া বন্ধ করুন।”
“ কারণ দোষটা আর কারোর নয়, আপনারই। ঘুমান এবার দয়া করে। আর ঘুম না এলে আমায় ড্যাবড্যাব করে দেখতে পারেন। আই হ্যাভ নো প্রবলেম। ”
দ্বিতী নাক মুখ কুঁচকে নিয়ে বলল,
“ইয়াকক! কুকুরে কামড় দিয়েছে আমায়? ”
সাক্ষ্য হাসল যেন। বলল,
“এত ভয়ংকর মেয়েকে সম্ভবত কুকুর ও ভয় পায়। কাজেই কামড় দেওয়ার চান্স নেই। এবার ঘুমান দয়া করে। ”
এইটুকু বলেই সাক্ষ্য দুই হাত সরিয়ে আরেকটু এগিয়ে এক হাত রাখল দ্বিতীর পেটের উপরই। অতঃপর চোখ বুঝল ঠোঁটে হাসি রেখে। আর অপরদিকে দ্বিতী সাক্ষ্যর মিনিটে মিনিটে রূপ দেখে বিস্ময় নিয়ে বলল,
“ হাত রাখলেন কেন? হাত সরান। ”
সাক্ষ্য ওভাবেই চোখ বুঝে রেখে বাঁকা হেসে বলল
“ দেখতে চাইছি। আসলেই খু’নাখু’নি হয় কিনা। এবার ঘুমাচ্ছি। ইচ্ছে হলেই ঘুমেরে মধ্যেই মে’রে ফেলুন। নিষেধ নেই। ”

দ্বিতী আর উত্তরই করল না। সাক্ষ্য ওভাবে হাত রেখে চোখ বুঝে নিলেও দ্বিতী এভাবে অভ্যস্ত নয়। ঘুমকাতুরে হলেও এভাবে ঘুমানো সম্ভব হচ্ছে না তার দ্বারা। এতোটা কাছে কোন পুরুষ, তাও যে পুরুষকে সে পছন্দ করে এসেছে কিশোরী কাল থেকেই সে পুরুষটার এত কাছ থেকে ঘুমানো সম্ভব? উপরে উপরে দ্বিতী বেশ উড়ন্ত রমণী হলেও ভেতরে ভেতরে আসলেই এই পুরুষটার সামান্য তাকানো, হাসি, স্পর্শতেই তার বুক ধকুপুক করে। এই যে এখনো করছে। গালের যে অংশটায় সাক্ষ্য ঠোঁট ছুঁইয়েছে ঐ অংশটায় এখনো অদ্ভুত এক অনুভব হচ্ছে। যেন মনে হচ্ছে ঠোঁটজোড়ার স্পর্শ এখনো বর্তমান। দ্বিতী চোখ বুঝার চেষ্টা করল খুব করে। অথচ পারল না। না পেরে চোখ বুঝে থাকা সাক্ষ্যর দিকেই চেয়ে থাকল অনেকটা সময়। খোঁচা দাঁড়ি, খাড়া নাক, চোখের ঘন পাঁপড়ি আর কপালে পড়া চুল। দ্বিতী ওভাবেই চেয়ে চেয়ে দেখল অনেকটা সময়ই। অতঃপর অনেকটা সময় পরই হুট করে চোখে পড়ল সাক্ষ্যর বালিশের কাছে থাকা ফোনটার দিকে। দ্বিতী ভ্রু কুঁচকায়। মনে পড়ে ফোন কেড়ে নেওয়ার বিষয়টা। কৌতুহল দমাতে না পেরে ফোনে কি আছে দেখার জন্যই ফোনটা হাতে নিতে নিল সে। আর ঠিক তখনই সাক্ষ্য আচমকাই চোখ খুলল। এক হাতেই ফোনটা দ্রুত কেড়ে নিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

“ কি আশ্চর্য! ফোন নিচ্ছেন কেন?”
দ্বিতী আচমকা থতমত খেল। পরমুহুর্তেই বলল,
“আপনার ফোনটা দিন তো। দরকার আছে একটু। ”
গম্ভীর স্বরে উত্তর এল,
“ কোন দরকার নেই। আপনার ফোনে রিচার্জ করা হয়েছে। ব্যালেন্স শেষ হওয়ার প্রশ্নই নেই। চার্জও দিয়েছি।ফুলই আছে। ভালো করেই দেখুন। ”
“কি আজব! ফোনে আছেটা কি আপনার?”
সাক্ষ্য ততক্ষনে ফোনটা বালিশের তলায় চাপিয়ে রেখে বলল,
“বলতে বাধ্য নই। আর, অন্যের ফোন ধরতে নেই অনুমতি ছাড়া। বুঝলেন?”
দ্বিতী কোন উত্তরই করল না এবারে। এই ছেলেকে বুঝাই যায় না। একবার একরূপ তার। কখনো গম্ভীর, কখনো চিনেই না এমন, আবার কখনো কি প্রেমিক রূপ দেখাতে আসে! দ্বিতী শুধু মনে মনে রাগই ফুসল।

পরদিন সকালে প্রথম সাক্ষ্যই ঘুম থেকে উঠল বোধহয়। দ্বিতী তখনও ঘুমে। ঘুমে থেকেই শুনতে পেল,
“ একটু পরই শামীম ডাক দিবে। উঠে পড়ুন। উঠুন।”
দ্বিতী উঠল না। ঘুমে চোখ বন্ধ তার। সাক্ষ্য আবারও ডাকল। বলল,
“ উঠবেন নাকি উঠবেন না? না উঠলে রেখে যাবই আপনাকে। ”
দ্বিতী এরপরও আরেকটু ডাকাডাকির পর চোখ মেলল। ঘুমঘুম চোখে একটু তাকিয়েই পরমুহূর্তেই উঠে বসল৷ সাক্ষ্য তার ঘুম ভাঙ্গিয়েছে এই জন্য সকাল সকাল রাগটা সাক্ষ্যর উপরই গেল। বলল,
“ আপনাকে আসলেই অসহ্য লাগছে এখন। ঘুম ভাঙ্গানোর শাস্তি ইচ্ছে করছে আপনাকে খু’ন করে দেই।”
সাক্ষ্য তাকাল। হুট করেই কিছু মনে পড়েছে এমন ভঙ্গিতে বলল,
“ কি আশ্চর্য! একই রুমে আছি, একই বাসায় আছি, একই বিছানায় ঘুমিয়ে সকালও হয়ে গেল। অথচ আপনার কথা অনুযায়ী তো খু’নাখু’নি, মা’রামা’রি কিছুই হলো না। ভেরি ফ্রাস্টেটিং বিষয় মিসেস দ্বিতীকা তাসনিম! ”
এইটুকু বলেই ফের দ্বিতীর সামনে দাঁড়িয়েই দ্বিতীর নাকে টোকা দিয়ে সত্যতা যাচাইয়ের ভঙ্গিতে বলল,

“ আসলেই আপনি দ্বিতীকা তাসনিম তো? নাকি অন্য কেউ? ”
দ্বিতী যেন রাগে ফেটে পড়েই চাইল৷ সাক্ষ্য ততক্ষনে চাপা হাসল৷ বলল,
“ যাক! এই চাহনি দ্বারা শিওর হলাম আপনিই দ্বিতীকা তাসনিম। ”
দ্বিতী কিছুই বলল। শুধু অলস পায়ে গিয়ে মুখে পানি দিল। ব্রাশ করল৷ এরপরই সাক্ষ্য ওয়াশরুমে গেল। দ্বিতী ততোটা সময়ে রুমের বাইরে এল কি হচ্ছে দেখার জন্য। সম্ভবত আজ সবাই শামীমের গ্রামের বাড়িতে যাবে। তারপর বোধহয় ওখান থেকে তার বউয়ের বাড়িতে। এখান থেকে বোধহয় খুব একটা দূরে নয়। জানামতে, শামীমের কেউ নেই বলেই সে আর তার বোন এখানে ভাড়া বাসায় একাই থাকে। সামনে বউ আসবে। দ্বিতী চাইল। অতঃপর দেখা মিলল নিধি আর অন্য মেয়েটি। অন্য মেয়েটি সম্ভবত শামীমের বোন। দ্বিতীর সাথে পরিচয় হয়নি। দ্বিতী যখন নিধিকে দেখে নিয়ে আবার চলে আসবে ঠিক তখনই কানে এল,

“দ্বিতী? সত্যিই সাক্ষ্য ভাইয়ার সাথে তোর বিয়ে হয়েছে? ভাইয়াও তো বলেনি আমায়। তাহলে? কখন হলো? হলে বুঝি আমরা জানতাম না? ”
দ্বিতী ফিরল।এটা কেমন প্রশ্ন? বিয়ে ছাড়া একই ঘরে কেন থাকবে তাহলে? ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ ভাইয়া? ”
“আমার ভাইয়ার বন্ধু। আমি ছোট থেকেই চিনি উনাকে বুঝলি? ”
এমন ভাবে বলছে যেন ও একাই সাক্ষ্যকে ছোট থেকে চেনে। দ্বিতী যেন ছোট থেকে চেনে না এই ছেলেকে। দ্বিতী তবুও উত্তর করল,
“ ওহ, ওহ।ভালো তো। ”
নিধি আবারও জানতে চাইল,
“কবে হয়েছে তোদের বিয়ে? ”
“এত আগ্রহ? ”
“ হু, আগ্রহ বলেই তো জিজ্ঞেস করছি। তুই নিশ্চয় জানিস আমার আর সাক্ষ্য স্যারের সম্পর্কটা কতোটা সুন্দর? ডিপার্টমেন্টের সবাই তো জানে৷ জেনেবুঝে বিয়ে করলি কেন? ”
দ্বিতী হেসে বলল,

“কিজানি। নিজেও আসলে বুঝতে পারছি না কেন করলাম বিয়ে। ”
উত্তর না পেয়ে নিধির রাগই লাগল যেন। বলল,
“ দ্বিতী, তোকে একটা প্রশ্ন করছি। উত্তর দিচ্ছিস না কেন? ”
“ কেন? তোর আর সাক্ষ্য স্যারের সম্পর্ক তো খুব সুন্দর। তো তোর সাক্ষ্য ভাইয়াআআআ কে জিজ্ঞেস করলেই তো হয় নিধি। ”
ভাইয়া শব্দটা দ্বিতী ইচ্ছে করেই টেনে বলল। নিধি বলল
“আমি তোকে জিজ্ঞেস করেছি।”
“আমার ঠিক মনে নেই। জানিস তো আমি ঘুমকাতুরে। মেবি ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই বিয়েটা করেছিলাম। ”
এইটুকু বলেই দ্বিতী ফের রুমে এল। রাগ লাগছে তার? নাকি জ্বেলাসি? দ্বিতী ফোঁস করে শ্বাস ছাড়ল। ফোনটা হাতে নিতেই দেখল সাম্য কল করেছিল। দ্বিতী ফোনটা তুলেই টাইপ করল সাম্য কে,
“ সাম্য ভাই, নিধিকে চেনো তুমি নিশ্চয়? কথা তো চেনে না৷ তাই তোমাকেই জিজ্ঞেস করছি। বলো, নিধির সাথে তোমার ভাইয়র কি সম্পর্ক? জানো তুমি? আচ্ছা, উনি আকদে রাজি ছিলেন না কি নিধির জন্যই? ”
এইটুকু টাইপ করেই ফোনটা রাখল সে। উঠে যেতেই হুট করে কানে এল,

“ তৈরি হচ্ছেন না কেন?একটু পরই বের হবে সবাই। ”
দ্বিতীর ভালো লাগল না। একটা সূক্ষ্ম রাগ বয়ে যাচ্ছে শরীরময়। বলল,
“ আমি গেলে সুবিধা হবে আপনার? ”
“ অসুবিধা কেন হবে? ”
“ সত্যিই হবে না? ”
“ আই থিংক আপনার অসুবিধা হবে। ”
সাক্ষ্য ভ্রু কুঁচকাল। এবারে গম্ভীর স্বরে বলল,
“ যাবেন না? ওকে। আমরা এই বাসাতেই থেকে যাব নাহয়। ”
দ্বিতীর গা জ্বালা করল যেন। বলল,
“ না, আপনারা যান। আপনি আর নিধি এক সাথে ঘুরবেন, ফিরবেন কিন্তু হুহ? একসাথে ছবিও তুলবেন। আর প্লিজ খয়েরি কালারের কোন জামা পরুন। ব্ল্যাক কালারটা ম্যাচ হচ্ছে না তো নিধির জামার সাথে। ”
সাক্ষ্যর এবার সত্যিই রাগ লাগল। মুখচোখ শক্ত হয়ে এল কেমন। বিছানায় পড়ে থাকা ফোনটায় চেয়েই হঠাৎ ই গম্ভীর শক্ত কন্ঠে বলল,

“আমার ফোনটা দিন। আম্মুকে কল করে বলব। আমরা আজকেই ফিরছি। ”
দ্বিতী ধরল না সাক্ষ্যর ফোন। নিজের ত্যাড়ামো বজায় রেখে বলল,
“আমি অন্যের ফোন অনুমতি ছাড়া ধরি না। যদি ভুলক্রমে আপনাদের ছবিটবি দেখে ফেলি। ”
সাক্ষ্যর শুধু ইচ্ছে রাগে দুখে নিজের চুল নিজে টেনে ধরুক। মনে মনে বিড়বিড় করল,
“ হায় খোদা। আম্মু আমার কপালে একটা ঘাড়ত্যাড়, সন্দেহী মেয়ে জুটিয়ে দিয়েছে।”
এইটুকু বলে নিজেই ফোনটা দিল। কল দিল তার মাকে। অতঃপর গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“ আম্মু? আজ ফিরব আমরা। যাব না শামীমের আকদে। সাম্য আর কথাকেও আসতে বারণ করে দাও। ”
ওদিক থেকে বলা হলো,
“ একি! ওদিকে কোন ঝামেলা নাকি? কেন যাবি না? ”
“ তোমার বান্ধবীর মেয়ে যাবে না। এখন তোমার বান্ধবীকে আমি কোথায় রেখে যাব ?”
“ সেকি৷ কেন যাব না? কি করেছিস তুই ওর সাথে? ”
“ আমি কি করব? ”
“ দে, ওকে ফোনটা দে তো। কথা বলি আমি। ”
সাক্ষ্য ফোনটা বাড়িয়ে ধরল এবারে। দ্বিতীর দিকে ফোনটা দিয়েই বলল,
“ নিন আম্মুর সাথে কথা বলুন।”

ফোনটা দিতেই ঠিক তখনই শামীম আর নিষাদ ডাকল সাক্ষ্যকে। সাক্ষ্যও না পারতেই গেল। নিজের ফোনটা এই মেয়ের হাতে দিয়ে চলে গিয়ে এত তাড়াতাড়ি নিজের সবকিছু জানাতে দিতে সে একেবারেই নারাজ। অথচ দ্বিতীর সময় লাগল না জানতে। কথা বলা শেষ হতেই তীব্র কৌতুহল, আগ্রহ নিয়ে সাক্ষ্যর ফোন ঘাটতেই দেখা গেল তার অনেক অনেক ছবি৷ কিছু ছবি তার সজ্ঞানেই তোলা, আবার কিছু ছবি তার অগোচরে তোলা। দ্বিতী শুধু ভ্রু কুঁচকে সেসব ছবি দেখেই যাচ্ছিল একের পর এক। বিড়বিড় করল,
“ এত ছবি! আমারই? আমারই? এই লোক ও কি আমার মতো লুকিয়ে চুরিয়ে ছবি তুলে তুলে গ্যালারি জমা করে রেখেছে? কিন্তু কখনো টের পাইনি কেন? কখন তুলেছে? ”
তারপর দেখতেই দেখতেই দেখা মিলল তার আকদের একটা ছবিও। যাতে সে টুকটুকে লাল একটা শাড়ি পরেছেে।কাঁপা হাতে সই করছে কাবিননামাতে।দ্বিতী বেশ কিছুটা সময়ই চেয়ে থাকল ঐ ছবিটার দিকে। বিড়বিড় করল,
“ এটা? আকদের ছবি? আল্লাহ! আকদের ছবিও রেখেছে? অথচ আমার এত ইচ্ছে নিয়ে হওয়া আকদে ও আমার ফোনে একটা ছবি নেই। তোলাই হয়নি। ”
অতঃপর আরো অনেক অনেক ছবির ভীড়ে দেখা গেল তার কলেজ লাইফের অনেকগুলো ছবিও। দ্বিতী অবিশ্বাস নিয়েই বিড়বিড় করল,

“ আমার কলেজ লাইফের ছবিও আছে? এত ছবি! আমারই! কেন রেখেছে? মেরে টেরে ফেলার জন্য নাকি? নাকি আমার মতোই… ”
এইটুকু ভাবতে গিয়েই থেমে গেল সে। তাহলে কি? দ্বিতী ভাবতে পারে না যেন। বুক কাঁপছে। কেমন একটা অনুভব হচ্ছে। আর ঠিক তখনই নিজের ফোনে ম্যাসেজ টোন শোনা গেল। দ্বিতী ভদ্র বাচ্চার মতোই সাক্ষ্যর ফোনে সব ঠিক করে একপাশে রেখেই নিজের ফোনটা হাতে নিল৷ আর ঠিক তখনই ভেসে এল সাম্যর ম্যাসেজ,
“খোদা! তুই আবার ভাইয়াকে সন্দেহ টন্দেহ করছিস নাকি? ভাইয়া গম্ভীর মানুষ দ্বিতী। আর তুই অবুঝ মানুষ। একজন বুঝতে দিবে না। আর অন্যজন বুঝবে ও না। কি যে আশ্চর্যরকম এর সম্পর্ক তোদের। ”
দ্বিতী প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই টাইপ করল,

“ কি বুঝাতে চাইছো সাম্য ভাই? কি বুঝানোর কথা বলছো? ”
“তুই যা ভাবছিস তাই দ্বিতু। ”
দ্বিতী যা ভাবছে? দ্বিতী তো ভাবছে অনেককিছুই। কিন্তু? লিখল,
“কিন্তু তা হওয়ার সম্ভাবনা জিরো পার্সেন্ট সাম্য ভাই। ”

দুইজনাতেই পর্ব ১৮

“যদি বলি তা হওয়ার সম্ভাবনা হান্ড্রেড পার্সেন্ট? ”
দ্বিতী আর কিছুই লিখতে পারল না। আর না তো কিছু তখন মাথায় এল। শুধু তাকিয়ে থাকল ফোনের স্ক্রিনে।আর টের পেল আর হাত কাঁপছে কেমন। শরীর কাঁপছে।আঙ্গুল গুলো কেমন স্পষ্টই কাঁপছে। অথচ তারপর? তারপর সাক্ষ্য এহসানের কপালে কি থাকবে?

দুইজনাতেই পর্ব ২০