দুইজনাতেই পর্ব ১৭
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
“ ফোনটা ঐভাবে ছিনিয়ে নিলেন কেন? কার কার ছবি রেখেছেন? নির্ঘাত অনেক মেয়ের ছবি তাই না? ”
সাক্ষ্য হতাশ চাহনিতেই তাকাল। তাকে কি ভাবে দ্বিতী? চরিত্রহীন? নাকি অন্যকিছু? সাক্ষ্য কপাল কুঁচকে চাইল। ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ আপনার কি মনে হয়? ”
“ মনে হওয়ার কি আছে? অবশ্যই আছে। আ’ম শিওর। ”
সাক্ষ্যর শীতল চোখে তাকাল। সত্যিই? তাকে দেখে মনে হয় সে ফোনে অনেকগুলো মেয়ের ছবি রাখবে? এই মেয়ে তাকে কি কি বানিয়ে দিচ্ছে আল্লাহ! সাক্ষ্য ওভাবেই বলল,
“ আমি আপনার ঈশানের মতো মেয়েদের ফটোগ্রাফি করি না মিসেস দ্বিতীকা তাসনিম। আমার ফোনে মেয়েদের ছবি থাকার প্রশ্নই উঠে না। ”
দ্বিতী কপাল কুঁচকায়। মেয়েদের ছবি নেই? অথচ সে মাত্রই দেখেছে তার ছবি আছে। তাহলে কি সে মেয়ে নয়? মুহূর্তেই বলল,
“ মাত্রই দেখলাম, আমার ছবি আছে।আমি কি মেয়ে নই? ”
গম্ভীর কন্ঠে ভেসে এল,
“ আপনার কি মনে হয় নিজেকে? ”
“ অবশ্যই মেয়ে। ”
দ্বিতী বেশ আত্মবিশ্বাসের সহিতই উত্তরটা দিল। বিনিময়ে সাক্ষ্য কেবল ভ্রু নাচিয়ে শুধাল,
“ তো? ”
“ তো আমি মেয়ে নই? আমার ছবি আমার ফোনে থাকবে। আপনার ফোনে কেন? ”
সাক্ষ্য এবার পা এগোল। একদম দ্বিতীর সামনে এসে আচমকা তর্জনী আঙ্গুল ছুঁইয়ে নিল কপালে পড়ে থাকা চুলগুলোতে। অতঃপর সে চুলগুলো আলগোছে কানে গুঁজে দিতে দিতেই মুখ নামিয়ে কানের সামনে আনল। গম্ভীর গলায় জানাল,
“ কারণ আপনি আমার নামে কবুল পড়েছেন মিসেস দ্বিতীকা তাসনিম। দিনরাত আড়ালে-আবড়ালে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থেকে দেখেছেন আমাকে অনেকবছর যাবৎ। এবং আমি ভুল না হলে, আপনার মোবাইলে আমার এরচাইতেও বেশি ছবি আছে। চ্যাক করব? ”
দ্বিতী ভ্রু বাঁকাল৷ সাক্ষ্যর এহেন হুটহাট সামনে এসে দাঁড়ানোর কারণ বুঝে না সে । বেচারা কি বুঝাতে চায়? দ্বিতী এতে ভয় পাবে? বোধহয় তাই বুঝাতে চায়। তাই তো দ্বিতী তাকানো মাত্রই বলল,
” কি? পা পিছাবেন এখন? একটা ছেলের সামনে দাঁড়ানোর ও সাহস নেই দ্বিতীকা তাসনিমের? ”
দ্বিতী একটুও সরল না এই কথা শুনে। স্থির একইভাবেই দাঁড়িয়ে থাকল। রাগে চোখমুখ লাল করে জানাল,
“ আগে আমার মোবাইল দিন। আমার মোবাইল আপনার কাছে থাকবে কেন হুহ? ”
সাক্ষ্যর মনে পড়ল যেন দ্বিতীর মোবাইলটা তার কাছেই। তাই তো হেসে মোবাইলটা বাড়িয়ে ধরল। যেন এখন কোন সমস্যাই নাই দিতে। বলল,
“ অবশ্যই। আমার কাছে থাকবে কেন? আপনার কাছেই থাকুক। ”
দ্বিতীর সহ্য হলো না হাসিটা। হাসবেই বা কেন এমন? ভ্রু কুঁচকে বলল শুধু,
“ এমন হাসছেন কেন? আশ্চর্য। ”
সাক্ষ্য তখনও হাসল। নিজের চুলগুলো পেছনের দিকে ঠেলে দিয়ে বলল,
“ বুঝবেন না আপনি।”
দ্বিতীর সাথে সাক্ষ্যর দু দুটো বন্ধুর পরিচয় হয়েছে। এবং বেশ ভালোভাবে তারা জানিয়েছেও যে তাদের মুখের উপর এভাবে দরজা বন্ধ করে দিল?দ্বিতী অবশ্য এতে খুব খারাপ লাগা দেখাল না। না তো লজ্জায় নুঁইয়ে পড়ল। বরং বলল,
“ কিডন্যাপাররাও তো এভাবে দরজা খোলার পর কিছু দিয়ে কিডন্যাপ করে নিয়ে চলে যায়। তাছাড়া, চোর ডাকাতের অভাব আছে এখন? বুঝব কি করে আপনারা কে? ”
দুইজনের মুখ তখন বাংলার পাঁচের মতো। চোর ডাকাত? তাদেরকে কি সত্যিই চোর ডাকাত লাগল? নিষাদই বলল,
“ ভাবী, শুধু চোর, ডাকাত, কিডন্যাপার? আর কিছু লাগেনি? ”
দ্বিতী চাইল। বলল,
“ পকেটমারও ভাবা উচিত ছিল অবশ্য। ভাবতে ভুলে গেছিলাম। ”
নিষাদ শুনল। অতঃপর পাশে বসা শামিমের দিকে চেয়ে চাহনি আর ও হতাশ করল। সাক্ষ্য আসলেই একটা মেয়েকে বিয়ে করছে! বেচারা যে বউ অবাধ্য হচ্ছে বলে আফসোস করে আসলে তা সত্যই আফসোস করার কারণ। নিষাদ নিজে থাকলে দিনরাত আফসোস করত। এবারে শামীমই দাঁত কেলিয়ে হেসে বলল,
“ ভাবী, বাদ দেন। এখন তো জানলেন আমরা সাক্ষ্যর বন্ধু। এখন বলেন, এখন কেমন লাগছে আমাদের? বিশেষ করে আমার দিকে তাকিয়ে বলুন তো। নতুন বরের মতো দেখাচ্ছে তো? ”
দ্বিতী তাকাল। নতুন বর কি দেখে বুঝা যায়। ভ্রু কুুুঁচকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পা থেকে মাথা অব্দি দেখেই একটা কথা ছুড়ে দিবে তখনই সাক্ষ্য এসে দাঁড়াল দ্বিতীর সামনেই। ভ্রু কুঁচকেই শামীমের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,
“ আপনার কল এসেছে। রুমে যান। ”
দ্বিতী ভ্রু কুঁচকায় একবার। পরমুহূর্তে ভাবে সত্যিই বোধহয় কল এসেছে।হয়তো তার আব্বু আম্মু কল দিয়েছে। তাই ধুপধাপ পা বাড়াল। পা বাড়াতে বাড়াতেই বলে গেল,
“ ভাইয়া আপনাকে নতুন বরের মতো একদমই লাগছেনা। বরং দুই তিনটে বিয়ে করেছেন এমন লাগছে। ”
সঙ্গে সঙ্গেই নিষাদ হেসে উঠল আওয়াজ তুলে। সাক্ষ্যও বোধহয় ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। নিষাদ ততক্ষনে কাঁধ চাপড়ে বলে উঠল,
“ ভাবীর জবাব হবে না! ”
শামীম ততক্ষনে বলল,
“ তাই বলে আমার দিকে তাকিয়ে ভাবীর এমন মনে হলো? ঐটুকু মেয়ে আমায় দুই তিনজনের বর বানিয়ে দিল? ”
সাক্ষ্য পিছু ফিরল একবার এবারে। দেখল দ্বিতী চলে গেল কিনা। অতঃপর সামনে ফিরে বলল,
“ তো তুই তাকাতে বললি কেন? তোর দিকে তাকানোর জন্য তোর বউ আছে না? ”
শামীম কপাল কুঁচকায়। বলে,
“ তো কি হইছে? ভাবীরাও তাকাতে পারে। ”
“ তাহলে উত্তর ও পাবি এমনই। ”
.
দ্বিতী এল রুমে। ফোন হাতে নিয়ে দেখল শুধুশুধুই। কোন কল আসেনি। শুধুশুধু তাকে বোকা বানিয়েছে বোধহয় । এই ভেবেই অনেকটা সময় কাটাল।অতঃপর কলিংবেলের আওয়াজ হলো। দ্বিতী কৌতুহল বশতই একটু পর একবার উঁকি দিল। দেখা গেল নিষাদের হাতে গুঁটিকয়েক ফুলের একটা পলিথিন। তিন বন্ধু কথা বলছে কিছু নিয়ে । দ্বিতী ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই অপরপাশে দেখা গেল দুইজন মেয়ের জামার পেছন অংশ। একজন হলুদ এবং অন্যজন সাদা রংয়ের।অথচ মুখ দেখা গেল না। দ্বিতী ভ্রু কুঁচকায়। দুইজন কে বুঝতে পারল না। অথচ না জানা অব্দি শান্তিও লাগিল না। তাইতো সাক্ষ্য আসতেই চেপে ধরল,
“ আপনার বন্ধুরা ফুল এনেছে কেন? আর ঐ মেয়েগুলোই বা কে?সত্যি করে বলুন তো। ”
সাক্ষ্য মেয়ে দুইজনের বিষয়টা বুঝে উঠলেও ফুলের বিষয়টা বুঝে উঠল না যেন। তাই তো বলল,
“ কিসের ফুল? ”
“ মিথ্যে নাটক করবেন না। জানেন আপনি। ”
“ কি জানি?”
দ্বিতী এবারে থম মেরে দাঁড়িয়ে মুখচোখ রাগে লাল করল। জিজ্ঞেস করল,
“ বাসর সাজাতে আপনি বলেছেন তাই না? আপনার বন্ধুদের সাথে এই প্ল্যান করে তারপর আমাকে এনেছেন এখানে? ”
সাক্ষ্য কথা শুনে ভ্রু কুুঁচকে নিল। বলল,
“ কার বাসর? ”
দ্বিতী মিনমিন করে চাইল। চাহনি সরু তার। এই পর্যায়ে ফোঁস করে শ্বাস ছাড়ল। উত্তরটা দিতে পারল না সে। এতো ছটফট করা দ্বিতীও উত্তর দিতে পারল না। বরং কথা ঘুরাতেই বলল,
“ ঐ দুইজন কে ছিল? দুইজনই তো মেয়ে। আপনার বন্ধুদের বউ? ”
সাক্ষ্য ছোটশ্বাস ফেলে। বলল,
“ না, বন্ধুর বোন হয়। মানে আমারও বোন। কথার মতোই। ”
দ্বিতী ভ্রু কুঁচকে নিল। সাক্ষ্যর দিকে চেয়ে কিছু বলতে নিতেই ঠিক দরজার সামনে কেউ একজন এল। বেশ উচ্ছ্বাস নিয়ে বলতে নিল,
“ আপনি কি কয়েকদিন ভার্সিটি থেকে ছুটি নিয়েছেন ভাইয়া? এখানেই থাকবেন তাই ন…”
বাকিটুকু বলতে পারল না, দ্বিতীর কুঁচকে রাখা ভ্রু এবং মুখটা দেখে থমকে গেল সে। আশ্চর্য! দ্বিতি? এখানে কেন? জিজ্ঞেস করল,
“ ও? ও কে? ”
সাক্ষ্য চাইল। দ্বিতীও চাইল। এটা নিধি। মুখচোখ কিছুটা ভেজা। বোধহয় ফ্রেশ হয়েই এসেছে মাত্রই। পরনে ঠিক সাক্ষ্যর কালো টিশার্টের মতোই একটা কালো টিশার্ট পরনে। অথচ একটু আগেও অন্য রংয়ের জামা ছিল গায়ে।দ্বিতী ফোঁস করে শ্বাস ফেলে। বাহ! এখানেও? এখানেও চলে এসেছে? তিক্তবিরক্ত হলো দ্বিতী।সাক্ষ্য তখন ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“ চেনো না ওকে? ”
নিধির তখন মুখ-চোখ কুঁচকে এসেছে। উত্তর করল,
“ ও দ্বিতী। চিনব না কেন?”
সাক্ষ্য এবারে বিনিময়ে উত্তর করল,
“ নিধি, কল হার ভাবী। সি ইজ মাই ওয়াইফ। ”
নিধির মুখটা বোধহয় দেখার মতো হলো । এতোটা হতাশ, এতোটা দুঃখ বোধহয়সে জীবনেও পায়নি। এমনভাবেই চাইল। অস্ফুট স্বরে বলল,
“ ওয়াইফ?রিয়েলি? ”
সাক্ষ্য মৃদু হাসল বোধহয়। জানাল,
“ ইয়েস। আকদটা হুট করে হয়েছে বলেই সবাইকে বলা হয়নি তখন।নিষাদ আর শামীমকেও তখন বলে উঠতে পারিনি।”
নিধি বোধহয় মানতে চাইল না। আবারও বলল,
“ কিসব বলছেন? ”
দ্বিতী নিধির মুখটা চেয়ে এগিয়ে এল এবারে। ফোস করে শ্বাস ছেড়ে জানাল,
“ কাবিননামা দেখাতে হবে? তারপর বিশ্বাস করবি নিধি? ”
নিধি তখনই ঠিক পা ঘুরাল। দ্বিতী তখন মুখ ভেঙিয়ে নিজে নিজেই আওড়াল,
” রিয়েলি? কি সব বলছেন…”
দুইজনাতেই পর্ব ১৬
এইটুকু বলতে বলতেই সাক্ষ্যর সামনে এসে দাঁড়াল সে। অতঃপর মুহূর্তেই দুই আঙ্গুলের মাথায় সাক্ষ্যর টিশার্টের একাংশ উঁচিয়ে ধরল। ভ্রু কুঁচকে পরখ করে বলল
“ বাহ, গুড! এক্সসিলেন্ট। আপনাদের ম্যাচিং ম্যাচিং আসলেই সুন্দর স্যার।এতই সুন্দর যে শুধু তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। ”
