Home এক মুঠো চাঁদের আলো এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৩৪

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৩৪

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৩৪
নুসরাত ফারিয়া

সময়ের স্রোতের সাথে বয়ে চলেছে সবার জীবন। আজ রহিত ও মেঘলার মৃ ত্যুর একবছর পূর্ণ হলো। এমনই একটা দিনে দুজন নর-নারী এ পৃথিবী ছেড়ে ওই দূর আকাশের বাসিন্দা হয়েছে। সময় কখনো থেমে থাকে না, আর না কারোর জীবন আঁটকে থাকে। সময়ের সাথে সাথে সবাই নিজ নিজ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে। তবে মনের গহীনে এখনো ছেলে-মেয়ে দুটো জীবিত আছে। হয়তো সারাজীবন থাকবে।
আজ দাদা-নাতি মিলে সেলুনে এসেছে। মূলত সোবহান খানই বড় নাতিকে টেনেটুনে নিয়ে এলেন। ছেলেটা দিন দিন অগোছালো হয়ে যাচ্ছে। চুল, দাঁড়ি বড় বড় হয়ে গেছে। অথচ ছেলেটার কাটার নাম নেই! আধার চুপচাপ ভদ্র ছেলের মতো চুল, দাঁড়ি কেটে নিল। আয়নায় নিজেকে দেখতে দেখতে দাদাজানের উদ্দেশ্যে বলল,

-“এখন শান্তি হয়েছে তোমার?”
সোবহান খান পাশের চেয়ারে বসে ছিলেন। নাতিকে দেখতে দেখতে বললেন,
-“মাত্র এক বছরেই নিজের এই হাল করেছো! আর বাকীগুলো বছরে কী করবে? তখন তো তোমাকে খুঁজেই পাওয়া যাবে না।”
-“খু্ঁজে না পেলে, হারিকেন দিয়ে খুঁজে নিও।”
-“তা আজও কী হাসপাতালে থাকবে?”
-“এর আগে বাড়িতে থেকেছি?”
-“হাসপাতালে থাকলে তুমি ঘুমাতে চাও না। নার্সরা আমাকে বলেছে, তুমি বেশিরভাগই রাত জেগে বসে থাকো।”
-“ঘুমাতে ভালো লাগে না, তাই ঘুমাই না।”
-“তোমার কষ্টটা বুঝতে পারছি, দাদুভাই! কিন্তু…তুমি যদি নিজের খেয়াল না রাখো, তাহলে কীভাবে চলবে বলো তো? নিজে অসুস্থ হয়ে পড়লে, নিজের বউয়ের সেবা করবে কীভাবে?”
-“ঠিক আছে, নিজের খেয়াল রাখার চেষ্টা করব। এখন জ্ঞান না দিয়ে চলো। তোমাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আমি আমার বউয়ের কাছে যাবো।”

-“বাড়িতে গিয়ে আগে গোসল করবে, খাওয়াদাওয়া করবে, তারপর বউয়ের কাছে যাবে। এর আগে নয়!”
আধার বিল পে করে, সেলুন থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে বিরবির করে বলল,
-“আগে যখন বউয়ের কাছে যেতাম না, তখন আমাকে বলতে বউয়ের কাছে যেতে। আর এখন যখন বউয়ের কাছে যেতে চাচ্ছি, তখন এই বুড়ো তুমিটাই আমাকে বাঁধা দিচ্ছো। দিজ ইজ নট ফেয়ার, দাদাজান!”
সোবহান খান হেঁসে নাতির কাঁধ চাপড়িয়ে বললেন,
-“এইজন্যই বলে—সময় থাকতে প্রিয় মানুষটিকে মূল দিতে শেখো।”
আধার আর কিছু না বলে দাদাজানকে নিয়ে গাড়িতে উঠে পড়ল। গাড়ি স্টার্ট দিতে যাবে, তখনই তার নজরে এল একটা কসমেটিকের দোকান। যেখানে ছোট থেকে বড় অনেকগুলো পুতুল রয়েছে৷ সাথে আরো অনেক কিছু আছে।
-“একটু ওয়েট করো দাদাজান, আমি আসছি।”
আধার গাড়ি থেকে নেমে সোজা দোকানের ভেতর ঢুকে গেল। একটু সময় নিয়ে একটা পান্ডা, ডোরেমান, বাঁদর ও আকাশি রঙা একটা বড় পুতুল নিল। টাকা দিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে গাড়ির ব্যাক সিটের ওপর রেখে দিয়ে, ড্রাইভিং সিটে বসল।

-“এখনো বাপই হতে পারলে না, এর আগেই খেলনা নিতে শুরু করেছো?”
দাদাজানের কথা শুনে আধার ড্রাইভ করতে করতে বলল,
-“ওগুলো আমার বেবিদের জন্য নয়, আমার বউয়ের জন্য।”
দাদাজান মনে মনে হাসলেন। তারপর হেয়ালি কণ্ঠে বললেন,
-“আমি আবার কাকে কি বলছি? তুমি তো আগেই বলে দিয়েছো, আমাকে তোমার সন্তানদের মুখ দেখাবে না। আর না নিজে বাচ্চা পয়দা করবে! সারাজীবন এই সিঙ্গেলদের মতোই থাকো। শুধু শুধু মেয়েটাকে তোমার মতো নিরামিষের সাথে বিয়ে দিয়ে জীবনটা নষ্ট করেছি। আমার নাতবউ ফিরে এলে, তাকে সুন্দর দেখে একটা রাজপুত্রের সাথে বিয়ে দিবো। তখন তুমি থাইকো, দেবদাস হয়ে!”
আধারের কিছু একটা বলতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু বলল না! শুধু বিরবির করে এইটুকু বলল,
-“আমার বউকে সুস্থ হয়ে ফিরতে দাও। তারপর খান বাড়িতে বাচ্চা দিয়ে ভরিয়ে দিবো৷ তখন আমিও দেখব, তুমি এই বুইড়া বয়সে কত বাচ্চাদের পালতে পারো।”

সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। আধার বাড়ি থেকে গোসল নিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছে। সোবহান খান খাবার খেতে বললেও সে খায়নি। কোনোমতে নিজেকে ঠিকঠাক করে বউয়ের কাছে ছুটেছে। সে প্রতিদিনই যাওয়ার পথে একগুচ্ছ করে হরেকরকমের ফুল নিয়ে যায়। আজও সেটার ব্যতিক্রম হলো না। সে ফুল হাতে নিয়ে কেবিনের দরজা খুলে ভেতর প্রবেশ করতেই স্তব্ধ হয়ে গেল। অবহেলিত ভাবে হাত থেকে সুন্দর, তাজা গোলাপগুলো মেঝেতে পড়ল। মূহুর্তেই চিৎকার করে উঠে নার্সদের ডাকতে শুরু করল।
একজন নার্স হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলে আধার রক্তিম চোখে তাকিয়ে গর্জে উঠল,
-“আমার বউ কোথায়? ওর সাথে কী করেছিস তোরা?”
নার্স একপলক গুছিয়ে রাখা, খালি বেডের দিকে তাকিয়ে নজর সরিয়ে নিয়ে বলল,
-“ম্যামকে, উনার পরিবারের লোকজন নিয়ে গেছে। উনার…!”
-“মানেহ কী? ওই মেয়েটা কোমায় আছে, ও অসুস্থ! তাহলে ওকে কেন নিয়ে যাবে?”
নার্স নিজের কপাল চেপে ধরে বিরবির করল,
-“আগে তো আমার সম্পূর্ণ কথাটা শুনুন, তারপর না-হয় রাগারাগি করবেন।”
আধার দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
-“আমার বউয়ের যদি কিছু হয়, তাহলে এই হাসপাতালে আগুন ধরিয়ে দেবো।”
মেয়েটা হতাশ কণ্ঠে বলল,
-“আপনার বউ ভালো আছে, একদম সুস্থ আছে। আর উনার জ্ঞানও ফিরে এসেছে! শুধু শারীরিকভাবে দূর্বল।”
আলো কোমা থেকে বেরিয়ে এসেছে, এটা উপলব্ধি করতে পেরে আধারের চোখদুটো চিকচিক করে উঠল। সে তড়িঘড়ি করে জিজ্ঞেস করল,

-“ক…কখন জ্ঞান ফিরিয়েছে? আর আমাকে বলেননি কেন?”
-“আপনি সকালে যখন চলে গেলেন, তার কয়েক মিনিটের পরই ম্যামের শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা হয় এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই উনার জ্ঞান ফিরে আসে। আমরা এই খবরটা আপনাকে জানাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু উনি নিষেধ করেন। শুধু নিজের বাবাকে খবরটা জানাতে বলেন। তারপর উনার পরিবারের সবাই এলে, ম্যাম উনাদের সাথে বিকেলেই চলে গিয়েছে। ডক্টর এক-দুই দিন এখানে থেকে রেস্ট নিতে বলেছিলেন, কিন্তু ম্যাম শোনেন নি! উনার নাকি এখানে থাকতে দম বন্ধ হয়ে আসছে। তাই তিনি নিজের বাড়িতে চলে গিয়েছেন এবং ওখানে থেকেই রেস্ট নিবে বলেছেন।”
নার্সের বলা প্রতিটা কথা শুনে এক মূহুর্তের মধ্যে সব খুশি গায়েব হয়ে গেল। মেয়েটা তাকে এত বড় একটা খবর জানানোর প্রয়োজন মনে করল না? সে এই দিনটার জন্য এক বছর ধরে অপেক্ষা করছিল। অথচ…সেই কাঙ্ক্ষিত মূহুর্তটা এলেও সে জানতে পারল না। বরং, সারাটাদিন মনের কষ্টে ছটফট করে কাটিয়েছে। আচ্ছা? মেয়েটা কী আর চায় না তাকে? নাকি ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছে?
কোনো প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেল না আধার। পরপর চোখের পল্লব ঝাপটিয়ে অশ্রু লুকিয়ে রাখার বৃথা চেষ্টা করল। কোনোমতে নিজের ইমোশানকে দমিয়ে রেখে জানতে চাইল,

-“আমার ওয়াইফ ঠিক আছে তো? মাথায় কোনোরকম সমস্যা বা অন্যকিছু দেখা গিয়েছে?”
-“চিন্তা করবেন না স্যার। ম্যাম একদম ঠিক আছে। শুধু উনাকে কিছুদিন আরাম করতে বলবেন এবং পুষ্টিকর খাবার খাওয়াবেন, সাথে ডক্টর যেগুলো ঔষধ দিয়েছে, ওইগুলো নিয়মিত খেতে বলবেন। তাহলে আশা করছি, কোনো সমস্যা হবে না ইনশাআল্লাহ!”
একটু থেমে মুচকি হেঁসে পুনরায় বলল,
-“ম্যাম অনেক ভাগ্যবতী, আপনাকে নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়ে। আপনি এই এক বছরে যতটা কষ্ট করেছেন, তেমন কষ্ট হয়তো আর কেউ করতে পারবে না। আপনি সত্যিই একজন বেস্ট হাসব্যান্ড! দোয়া করি, আপনারা সারাজীবন এইভাবেই একে অপরের পাশে থাকুন।”
নার্স কথাগুলো বলে বিদায় নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। আর আধার শূন্য চোখে ফাঁকা বেডের দিকে তাকিয়ে থেকে অস্ফুটস্বরে বলে উঠল,
-“আপনি ভুল! আমি বেস্ট হাসব্যান্ড নই। আমি খুব, খুউউব খারাপ হাসব্যান্ড। যাকে কখনোই ভালোবাসা যায় না, বরং দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করে। ঠিক আজ যেমনটা হয়েছে।”

পুরো একটা বছর পর নিজ বাড়িতে ফিরে আলো কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে ছিল। তার জীবন থেকে যে এইভাবে এক বছর চলে যাবে, সেটা কখনোই কল্পনাও করেনি। সাথে এটাও ভাবতে পারেনি, তাদের মাঝে আর রহিত, মেঘলা নেই।
বাড়িতে পা রাখতে না রাখতেই আলোর সর্বপ্রথম চোখ যায় বাগানে থাকা দুটো কবরের দিকে৷ সে অবাক করে মা, বাবাকে জিজ্ঞেস করে ওইগুলো কার কবর। মতিউর রহমান বলতে চাননি, কিন্তু মেয়ের জেদের কাছে একপ্রকার হেরে গিয়ে সবকিছু বলে দেয়। সবটা শোনার পর আলো ছুটে এসে কবর জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। এমনটা কেন হলো? এমন হওয়ার তো কথা ছিল না? তাদের দুজনের তো সুখে, শান্তিতে সংসার করার কথা ছিল! তাহলে কেন আজ তারা এইভাবে দূর আকাশে পালিয়ে গেল? তার মতোই না-হয় কোমায় যেত, তবুও কেন তাদেরকে ছেড়ে সারাজীবনের জন্য চলে গেল? তাদের ভালোবাসা পূর্ণতা পেয়েও অপূর্ণই রয়ে গেল! মেয়েটার কত স্বপ্ন ছিল, প্রিয় মানুষটির সাথে ছোট্ট একটা সংসার করার। অথচ তাদের নিয়তি অন্য কিছুই ছিল। তাদের দুজনের পথচলা এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেল।

কাঁদতে কাঁদতে আলোর শরীর খারাপ হয়ে যায়। সবে মাত্র কোমা থেকে ফিরে মাথায় এত চাপ নেওয়ার ফলে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে ওখানেই। এতে সবাই ভীষণ ভয় পেয়ে যায়, তড়িঘড়ি করে মেয়েটাকে ভেতরে নিয়ে গিয়ে মতিউর রহমান ডাক্তারকে কল দেন। তারপর ডাক্তার এসে চেক-আপ করে একটা ইনজেকশন ও স্যালাইন দিয়ে গিয়েছেন।
আলোর জ্ঞান ফিরে আসার পর নিজের পেটের ওপর দুটো খরগোশকে দেখে চমকে ওঠে। ভালো করে তাকিয়ে দেখে, এরা আর কেউ নয়! বরং তারই টুনা, টুনি। আলোর চোখদুটো ছলছল করে উঠল। সে কোনমতে উঠে বসে একহাতে জড়িয়ে ধরে আদর করে দেয়। এক বছরে অনেকটাই বড় হয়ে গেছে, সাথে গোলুমোলুও!

-“এরা এখানে কীভাবে এল?”
আলো ছোট বোনের উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করল। ছায়া ধীর কণ্ঠে বলল,
-“তোমার শশুর বাড়িতে তো এদেরকে দেখার মতো কেউ নেই। দুলাভাই সারাদিন ভার্সিটিতে থাকে এবং সন্ধ্যা হলে তোমার কাছে যেত, তারপর ওখানেই সারারাত থাকত। তাই তোমার শখের জিনিসগুলোর দেখাশোনা করার জন্য আমাকে দেয়। কারণ উনি চাননি, তোমার প্রিয় জিনিসের কিছু হোক। এদেরকে আমি দেখলেও সব খরচ তোমার বরই দিয়েছে। সাথে আমারগুলোর জন্যও!”
আলো কিছু বলল না। ছায়া বিছানায় হামাগুড়ি দিয়ে উঠে এসে আপুকে জড়িয়ে ধরে বুকের মাঝে মুখ গুঁজে, কান্নারত কণ্ঠে বলল,
-“তোমাকে খুব মিস করেছি আপু। খুউউউব!”
আলোর চোখদুটো ছলছল করে উঠল। সে বোনকে জড়িয়ে ধরে আদর করে দিল। তখন খেয়াল করল, দরজায় মায়া দাঁড়িয়ে আছে। আলো হেঁসে একহাত বাড়িয়ে ধরে, কাছে আসতে ইশারা করল। মায়া ছুটে এসে বোনের বুকের মাঝে ঝাপিয়ে পড়ল। আলো দুজনের মাথায় চুমু খেয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“কষ্ট পাস না বোন আমার। ভাইয়া, আপু যেখানেই থাক, তারা ভালো আছে। আর আমাদেরকে ওই দূর আকাশ থেকে দেখছে। তোরা যদি কষ্টে থাকিস, তাহলে তারাও কষ্ট পাবে। আমরা এই দুনিয়ায় কেউই চিরস্থায়ী নই! আজ হোক বা কাল, আমাদের সবাইকেই ওই আকাশের বুকে যেতে হবে। শুধু আগে আর পরে!”

আলোর মনটা ভালো নেই। সে হালকাপাতলা খাবার খেয়ে বাগানে এসে বসেছে। পশ্চিমের দিকে সূর্যটা হেলে পড়েছে। হয়তো আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আঁধার নেমে আসবে। মেয়েটা অপলক নয়নে দুটো পাশাপাশি থাকা কবরের দিকে তাকিয়ে আছে। ঠিক তখনই খেয়াল করল, গেইট দিয়ে একটা গাড়ি প্রবেশ করছে। গাড়িটা চিনতে একটুও অসুবিধা হলো না আলোর। সে চট করে দোলনা থেকে নেমে, গাছের আড়ালে গিয়ে লুকিয়ে পড়ল। একটু মাথা বের করে সামনে উঁকি দিয়ে দেখে, আধার স্যার নেমেই এক দৌড়ে ভেতরে চলে গেল। ফলস্বরূপ সে একটু মুখটাও দেখতে পারল না।
আধার ভেতরে এসো আলোর খোঁজ করলে, জানতে পারে মেয়েটা বাগানে আছে। এটা শুনেই সে আবার ছুটে বাগানে চলে এসেছে। কিন্তু কোথাও মেয়েটাকে দেখতে পেল না। সে পুরো বাগানই খুঁজে দেখল, এমনকি প্রতিটা গাছের পিছনেও চেক করল। অথচ, মেয়েটাকে খুঁজে পেল না। আধার হাঁপাতে হাঁপাতে চেঁচিয়ে বলে উঠল,
-“আমি জানি, তুমি ইচ্ছে করে লুকিয়ে আছো। আমার সামনে, আমার কাছে আসতে চাচ্ছো না! কিন্তু কেন? কেন এই লুকোচুরি করছো? আমার যে, তোমাকে একটু দেখার জন্য মনটা তৃষ্ণায় ছটফট করছে। তোমার ওই মিষ্টি কণ্ঠস্বর শুনতে বড্ড ইচ্ছে করছে৷ তুমি কী আমার কষ্টটা বুঝতে পারছ না? নাকি বুঝেশুনেই আরো কষ্ট দিচ্ছো? প্লিজ আলো, একবার শুধু আমার সামনে এসো। আমি তোমাকে দেখব! একটু দেখব।”
আধার এলোমেলো দৃষ্টিতে আশেপাশে তাকায়। কোথাও মেয়েটা নেই! সে চোখ বুজে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে গাড়ির কাছে এসে হেলান দিয়ে বিরবির করে বলল,

-“আপনি বড়োই নিষ্ঠুর, মিসেস খান!”
কিছুটা সময় অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পর, আধার কিছু একটা অনুভব করে সে ঝড়ের বেগে ব্যাক সিটের ডোর খুলে ভিতরে প্রবেশ করল। আচমকা মানুষটাকে দেখে আলো নিচে ধপ করে বসে পড়ল। সে মূলত গাড়ির ভেতর লুকিয়ে ছিল। তাও সিটের পাশে ফাঁকা জায়গায়!
আধার কিছু না বলে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ওই মাসুম চেহারার দিকে। নিজের চোখের তৃষ্ণা মেটানোর পর সিটে মাথা ঠেকিয়ে, ঘাড় কাত করে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলল,
-“ভেবেছিলাম কোমা থেকে ফিরে এসে ভদ্র মেয়ে হয়ে যাবা, কিন্তু আমি ভুল ছিলাম। তুমি কখনোই ভালো হবে না। আর না আমাকে জ্বালানো বন্ধ করবে! এই লুকোচুরি খেলে কী পেলে, বলো তো? শুধু শুধু আমাকে হয়রানি করে নিলে। আর জ্ঞান ফেরার পর আমাকে জানাওনি কেন? আমার কি এতটুকু জানানোরও কোনো অধিকার নেই?”
আলো কিছুক্ষণ চুপ থেকে কপাল কুঁচকে বলল,
-“কে আপনি? আমি আপনাকে চিনি না!”
আধার হেঁসে বলল,

-“ওহ হ্যাঁ, আমি তো ভুলেই গেছিলাম যে, কোমা থেকে ফিরে আসার পর স্মৃতিশক্তী হারিয়ে ফেলে। তোমার সাথেও নিশ্চয়ই এমনটাই হয়েছে! যাইহোক, আমি তো এখানে তোমার মতো দেখতে আমার পাগল বউটাকে দেখতে এসেছিলাম। ও তোমার জমজ বোন, বুঝলে? সেই সুবাদে আমি তোমার দুলাভাই হই। আর তুমি আমার শালী! তা শালী সাহেবা? আপনি কী আপনার জমজ বোন, মানে আমার বউকে দেখেছেন?”
আলো অদ্ভুত চোখে মানুষটার দিকে তাকিয়ে থাকল। এই লোকটা কখনোই ভালো হবে না। সে উঠে ডোর খুলতে খুলতে বলল,
-“আপনার বউকে আপনি নিজেই খুঁজে নিন, দুলাভাই!”
একথা বলে নামার সময় অনুভব করল লোকটা তার বিনুনি চেপে ধরেছে। একই সাথে একটি বাক্য শুনতে পেল,
-“জান….?”

আলোর হৃদয় থমকালো! সে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকাতেই আধার চোখে চোখ রেখে বলে উঠল,
-“এবার যদি আমাকে ছেড়ে যাওয়ার একটুও চেষ্টা করো, তাহলে আই সোয়ার মিসেস খান! আমি ম’রে যাবো!”
আলো নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। মূহুর্তেই ছুটে এসে স্বামীর বুকের মাঝে ঝাপিয়ে পড়ল এবং দু’হাতে জড়িয়ে ধরে গলায় মুখ গুঁজে ফুপিয়ে কেঁদে উঠল। আধার যেন এতক্ষণ এটারই অপেক্ষায় ছিল। সে নিজেও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল প্রিয়তমাকে। গলায় মুখ ডুবিয়ে প্রাণভরে শ্বাস নেওয়ার সময় শুনতে পেল,
-“স…সরি! আপনি আপনাকে ইচ্ছে করে কষ্ট দিতে চাইনি। এই আমার জন্য আপনি একটা বছর ধরে অনেক কষ্ট করেছেন। তাই আপনাকে আর কষ্ট দিতে চাইনি!”
-“হুঁশশশ….আমার একটুও কষ্ট হয়নি। আর নিজের বউয়ের সেবা করতে কিসের কষ্ট হুহ্?”
আলো কিছু না বলল না। আধার কিছু একটা ভেবে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“তুমি চাইলে এখন আমার সব কষ্ট মূহুর্তেই দূর করতে পারো।”
আলো কান্না থামিয়ে চোখমুখ মুছে, মাথা সোজা করে জানতে চাইল,
-“কীভাবে?”
আধার বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে আলোর ঠোঁট ছুঁয়ে অস্ফুটস্বরে বলল,
-“তোমার বেয়াদব ঠোঁট জোড়া দিয়ে আমাকে ছুঁয়ে।”

আলো হাসল। অতঃপর এগিয়ে এসে স্বামীর পুরো চেহারায় ঠোঁট ছুঁয়ে দিল। ঠোঁটে চুমু খেয়ে সরে আসতে চাইলে, অনুভব করল লোকটা তার ঠোঁট জোড়া নিজের দখলে নিয়ে নিয়েছে৷ আলোর চোখদুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে যায়। সে ছটফট করলে, আধার একহাতে তার ঘাড় ও অন্য হাতে কোমর চেপে ধরে ঘনিষ্ঠ করে সফটলি চুম্বন করতে থাকল। আলো বাঙের মতো তিড়িংবিড়িং করতে করতে একসময় হাল ছেড়ে দিয়ে চুপ হয়ে গেল এবং আবেশে চোখদুটো বুঁজে নিয়ে মানুষটার মাথার পিছনের চুলগুলো শক্ত করে খামচে ধরল।
দীর্ঘ এক চুম্বনের পর আধার ঠোঁট ছেড়ে দিয়ে কপালে কপাল ঠেকিয়ে জোরে জোরে শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে থাকল। আলো তো নাকমুখ দিয়ে নিশ্বাস নিচ্ছে! তার মনে হচ্ছিল, এই বুঝি এক্ষুনি দমটা আঁটকে যাবে। বেশ কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে আলো কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে যাবে, তখনই আধার আবারো রক্তিম ঠোঁটের মাঝে হামলে পড়ল। এবার আলো কিল-ঘুষি যা যা পারছে, সবকিছু মা’রতে মা’রতে লোকটাকে সরানোর চেষ্টা করল। কিন্তু আধার উল্টো তার হাতদুটো ধরে পিছনে নিয়ে গিয়ে
আলতো করে চেপে ধরল। এবং হুঁশ জ্ঞান হারিয়ে ঠোঁটের মাঝে মত্ত হলো।
আলো যখন অনুভব করল, অসভ্য লোকটা তার জামার জিপার খুলে ফেলেছে, তখন চমকে উঠে ঠোঁটে কামড় বসিয়ে দিল৷ আধার বিরক্তিতে ঠোঁট ছেড়ে জিজ্ঞেস করল,

-“কী সমস্যা? এইভাবে ইঁদুরের মতো কামড়াকামড়ি করছো কেন?”
আলো ঠোঁট মুছে জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে হিসহিসিয়ে বলল,
-“আ…আপনি! আপনি আমার জামার জিপার খুললেন কেন?”
আধার সোজাসাপ্টা জবাব দিল,
-“তোমাকে আদর করব তাই।”
একথা শুনে আলো আঁতকে উঠে তড়িঘড়ি করে বলল,
-“আপনার অসভ্য আদর চাই না! আমাকে ছাড়ুন।”
আলো ছটফট করতে করতে কোল থেকে নামতে চাইল। সে এগুলোর জন্য এখন মোটেও প্রস্তুত নয়! আর এই অসভ্য লোকটার মতিগতিও ভালো লাগছে না। নিশ্চয়ই নেশা-টেশা করে এসেছে।
আধার আলোর দু’হাত নিজের কাঁধের ওপর তুলে দিয়ে, গ্রীবাদেশে মুখ ডুবিয়ে চুমু খেতে খেতে ফিসফিসিয়ে বলল,

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৩৩

-“একটু….একটু আদর করব। প্লিজ জান, বাঁধা দিও না!”
বাঁধা দেওয়া মানে? লজ্জা, ভয়ে, আতঙ্কে এবং অতিরিক্ত টেনশনে মূহুর্তেই জ্ঞান হারিয়ে ফেললো আলো। সঙ্গে সঙ্গে আধারের মুডের বারোটা বেজে গেল। সে থমথমে মুখে অচেতন মেয়েটার লালচে চেহারার দিকে তাকিয়ে থেকে অস্ফুটস্বরে বলে উঠল,
-“এ কোন পাগলের পাল্লায় পড়লাম রে বাবা!”

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৩৫