দুইজনাতেই পর্ব ২৩
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
সাক্ষ্য এবারে দ্বিতীর কানের কাছে মুখ নিয়েই ফিসফিস করে বলে উঠল,
“ হ্যাঁ বলতে বুঝে শুনে হ্যাঁ বলা উচিত ছিল ম্যাম। পরে যদি পস্তান? সাক্ষ্য এহসান আবার সবার সামনে অতিভদ্র পুরুষ হলেও আম্মুর পুত্রবধূর সামনে খুব একটা ভদ্র রূপ দেখাবে না। ”
দ্বিতী একদম দেওয়ালের সাথে সিঁটিয়ে রইল। যেন আরেকটু হলেই দেওয়াল পেরিয়ে যেতে পারলেই বেঁচে যাবে। বলল,
“ এমনিতেও কিই বা ভদ্র রূপ দেখিয়েছেন হ্যাঁ বলার আগ অব্দি? ”
সাক্ষ্য চাইল। নিজের পুরু ঠোঁটজোড়া এবারে দ্বিতীর কানে ছুঁইয়ে বলে উঠল,
“ অভদ্রই বা কি দেখালাম ম্যাম? ”
দ্বিতী যেন শিরশিরে এক অনুভূতির শিহরনে কেঁপে উঠল কেমন। এত কাছে আসলে তো দ্বিতী এমনিতেই মরে টরে যেতে পারে। এই যে কলিজা কেমন লাফাচ্ছে। দ্বিতী প্রায় দেওয়ালের সাথে সিঁটে গিয়েই বলল,
“ একা পেলেই এমন গা ছুঁইছুঁই স্বভাব দেখিয়ে কি বুঝাতে চান? ”
ভ্রু নাচিয়ে বলল সাক্ষ্য,
“ অনেককিছু। আপনি বুঝতে চান? ”
“ না। ”
সাক্ষ্য হেসে ফেলল। এবারে বাম হাতের তর্জনীতে দ্বিতীর কপালে আসা চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে কানে গুঁজে দিল খুব যত্ন করে। ঠোঁটজোড়া দ্বিতীর হলদে ফর্সা কপালে ছুঁইয়ে দিয়ে চুম্বন আঁকল সময়ে নিয়ে। অতঃপর ওভাবেই বলল,
“ বুঝতে হবে না। আমার ওয়াইফ এমনিতেই বুঝে যায় সব। শুধু একাডেমিক রেজাল্টটা একটু কাঁচা আর নয়তো সবদিকেই খুব ট্যালেন্ট। ”
“ তো? একাডেমিক রেজাল্ট কাঁচা হলে আপনার কি?রেজাল্ট তো আমার। ”
দ্বিতী রাগ রাগ ভাবটা ধরে রাখতে পারল। সাক্ষ্যর ঠোঁটজোড়া তখন দ্বিতীর মসৃন কপালে দীর্ঘ চুম্বনে আবদ্ধ। দ্বিতী সম্ভবত রেগে থাকলেও কোন এক ভালো লাগার আবেশে সে নিজের রাগটা তখন দেখাতেই পারল না। কপালের গভীর চুম্বনটায় সময় পের হতে হতেই চোখ বুঝে ফেলে।রাগ ভুলে বুকের ভেতর দ্রুত হৃদস্পন্দন জুড়ে দেওয়া হৃৎপিন্ডকে বারবার যেন বলছে শান্ত হতে। তবুও শুনছে না। দ্বিতীর কাছে স্পর্শটা খারাপ লাগেনি। বরং ভালো লাগছে। আর এই ভালো লাগার জানানেই বোধহয় হাত পা অব্দি কেমন কাঁপছে। দ্বিতী চোখ খুলল একটু পর। ভালো লাগার জানানটা সাক্ষ্যকে না দিয়ে বলল,
“ আমার কপালটা ক্ষয়ে যাবে আপনার দাঁড়ির জন্য। সরুন। ”
সাক্ষ্য এবারেও নিঃশব্দে হাসে। বলে উঠল,
“ ক্ষয়ে যাক। ক্ষতি কি? ”
এইটুকু বলেই সাক্ষ্য দ্বিতীর নাকে নামিয়ে আনল ঠোঁটজোড়া।নিঃশব্দে হেসে চুমু আঁকল দ্বিতীর নাকে। দ্বিতীর নাকটা কি ভীষণ আকর্ষণীয় ।যাতে জ্বলজ্বল করছে একটা চকচকে নাকফুল। কত মিষ্টি লাগে।সাক্ষ্য এবারে বলল,
“ দ্বিতী? ”
দ্বিতীর কেমন যেন লাগল এই ডাকটা শুনে। দ্বিতীকা তাসনিম, মিসেস সাক্ষ্য এহসান সব শোনা হলেও এমন কাতর স্বরে দ্বিতী ডাকটা সে এর আগে কখনো শুনেনি। দ্বিতী তাকাল সাক্ষ্যর চেহারায়। চাহনি তার ঠোঁটজোড়ার দিকেই। কেমন যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ে আছে। দ্বিতী সে চাহনি পরখ করেই উষ্ণ শ্বাস প্রশ্বাসে বেসামাল অনুভূতিকে সামলাতে হিমশিম খেয়ে বলে উঠল,
“ কি?”
“ আপনাকে জ্বালাতে মন চাইছে হুট করে। বেশি না, একটু। ”
এইটুকু বলেই সাক্ষ্য যখন ঠোঁট এগিয়ে আনছিল দ্বিতীর বুকের ভেতর কেমন যেন করল। এক মুহূর্তে পাশে সরে গিয়ে বলল,
“ শুনুন? বিয়েতে হ্যাঁ বলেছি মানে কি আপনার জোরজবরদস্তি মেনে নিব? হ্যাঁ বলাতেই এমন করছেন, আপনার বাসায় গেলে তো…শুনুন,দ্বিতীর কিন্তু হাত চলে খুব বলে দিলাম।”
সাক্ষ্য হেসে তাকায়। ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“ জোরজবরদস্তি? ছিহ! আমি জোরজবরদস্তি ছাড়াই ওয়াইফকে কাছে টানতে জানি। ”
দ্বিতী ভ্রু বাঁকাল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বলল,
“ এর আগে কয়জন ওয়াইফ ছিল আপনার? যেভাবে বলছেন মনে হচ্ছে হাজারজনকে কাছে টেনেছেন। ”
সাক্ষ্যর চোখ ছোটছোট হয়ে এল যেন। বলল,
“ একজনকে আম্মু গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছে। এরপর থেকে আর শান্তি পাচ্ছি না। বুক জ্বালাপোড়া শুরু হয়ে গিয়েছে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যার মতো। বোধহয় আলসারও হয়ে যাচ্ছে এতদিনে। আবার হাজারজন!”
“ হাজারজনের জন্য খুব আফসোস? চলুন আপনাকে হাজারটা বিয়ে করিয়ে দেই তাহলে। সমস্যা সলভড।”
“ নো প্রবলেম। আপনার মাথায় ঝুলিয়ে দিব ঐ হাজারজনকে। ”
দ্বিতী ছটফট করেই বলে উঠল,
“ আপনার বউ আমি কেন পালব? ”
সাক্ষ্য মাথা নাড়াল। বলে উঠল,
“ এক্চুয়েলি! আমিও এটাই বলতে চাইছি। আমার বউতো আমিই পালব। কিন্তু সুযোগ দিচ্ছেন কোথায়? জলদি আসুন আমার বাড়িতে। বউ পালা তো প্রত্যেক স্বামীর দায়িত্ব, তাই না?”
দ্বিতী নিজের কথার প্রেক্ষিতেই এমন উত্তর পেয়ে গাল বাঁকাল। এখন দায়িত্ব দেখাচ্ছে? ঢং এসব!
সাক্ষ্যরা বাইরেই কথা বলছিল। একটা রুম দ্বিতী আর সাক্ষ্যর জন্য ছেড়ে দিয়ে বাকি একটা রুমে ছেলে চারজন আর একটা রুমে মেয়ে তিনজন থাকবে। শামিমের বাসায় তিনটেই রুম। দ্বিতী তখন বেলকনিতে। মিহু সাথে কথা বলছিল। আচমকাই মিহু বলে উঠল,
” দ্বিতী জানিস? নিধি নাকি সাক্ষ্য স্যারের সাথে ঘুরতে গিয়েছে। এইজন্যই নাকি সাক্ষ্য স্যার ছুটি নিয়েছে। এদের নিশ্চয় বিয়ে টিয়ে হয়ে গিয়েছে বুঝলি? নয়তো এত কি মেলামেশার কারণ? ”
দ্বিতী শুনল। নিজেরই বরের সাথে অন্য মেয়েকে জড়াচ্ছে শুনে কিঞ্চিৎ রাগও হলো। কবে গেল নিধি সাক্ষ্যর সাথে ঘুরতে? এই দুটো দিন তো সেও সাক্ষ্যর সাথে ছিল। দ্বিতী নিরব রাগ নিয়ে বলল,
“ কে বলেছে তোকে ঘুরতে গিয়েছে? ”
“ আরেহ নিধিই দুইদিন আগে বলেছে ঘুরতে যাবে সাক্ষ্য স্যারের সাথে। দুইদিন নাকি সাক্ষ্য স্যার ভার্সিটিতে আসবে না। এখন তো সত্যি সত্যিই দুইজনে আসেনি। ডিপার্টমেন্টের গ্রুপে এই নিয়ে আলোচনাও চলেছে। দেখিসনি? ”
দ্বিতী তপ্ত মেজাজ নিয়ে বলল,
“ তো? দুইদিন আসেনি মানেই একসঙ্গে ঘুরতে যাবে নাকি? তোদের এসব গুজব ছড়াতে বলে টা কে?”
“ দুইজনই একসঙ্গে দুইদিন আসেনি ছাগল। নিধি কি এমনি এমনি মিথ্যে বলবে নাকি? ”
আসলেই তো! নিধি শুধু শুধু মিথ্যে বলল কেন? ঘুরতে তো আসেনি তারা। বিয়ের ইনভাইটেশনে এসেছে। তাও দুইজন একসাথে। তাহলে কি আগেও নিধি এমন মিথ্যে বলে বলে ডিপার্টমেন্টে সবার কাছে নিজেকে আলোচনার বিষয়বস্তু হিসেবে রাখত? দ্বিতী বুঝল না। তবে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“ ছাগল, আমিও তো দুইদিন আসিনি। তো আমিও কি ঘুরতে গিয়েছি ওদের সঙ্গে? এসব ছ্যাবলামো করিস কি করে?”
এইটুকু বলেই দ্বিতী রেগে ফোন রাখল। রাগ হচ্ছে। মিথ্যে জেনেও রাগ হচ্ছে তার। অতঃপর ওভাবেই বেলকনিতে বসে রইল সে। অন্ধকারে বসে থাকল আলো না জ্বালিয়েই। কিছুটা সময় আগেই কথা কয়েল দিয়ে দিয়েছে যাতে মশা না কামড়ায়।দ্বিতী ওভাবেই বসে থাকার মাঝে সাক্ষ্য এল। বুকে হাত জোড় করে পিছনে দাঁড়াতেই দ্বিতী বুঝে উঠল এটা সাক্ষ্য। সাক্ষ্যর গায়ে একটা সুভাস আছে। যা এই দুইদিনে স্পষ্টই আয়ত্ত্বে নিয়ে নিয়েছে সে। দ্বিতী তা বুঝে উঠেই ডিপার্টমেন্টের গ্রুপটায় ডুকল। অতঃপর গলা উঁচিয়ে উঁচিয়ে শুনিয়ে বলে উঠল একেকটা বাক্য।
“ কিরে! সাক্ষ্য স্যার আর নিধি তো একসাথে মিসিং! এদের দুইজনের মধ্যে নির্ঘাত কিছু আছে। আ’ম শিওর। ”
“ এই দুইজনকে আসলেই সুন্দর মানায়। সেদিন যে অনুষ্ঠানে গান গাইল? আসলেই দারুণ মানিয়েছে দুইজনকে।”
“ নিধি তো বলেছিল, সাক্ষ্য স্যার সহ একসঙ্গে ঘুরতে যাবে। তার মানে সত্যিই ঘুরতে গেছে? বাহ বাহ!”
দ্বিতী এরকম আরো কয়েকটা বাক্য বলে তারপরই থামল। সাক্ষ্য শুধু শুনে আসন্ন ঝড় বুঝে উঠেই এগিয়ে এসে ফোনটা নিল নিজের হাতে। গাঢ় স্বরে বলল,
“ সারাক্ষণ এসবের মধ্যেই পড়ে থাকেন কেন? এসব কথোপকোতন দেখতে হয় কেন? ”
“ দেখতে মন চায় তাই। ”
” দেখতে মন চাইলেও দেখবেন না। সংসারে আগুন লাগবে তো আমার তাই না? জেনেবুঝে কি করে লাগতে দেই আগুন? ”
দ্বিতী থমথমে মুখ করেই দাঁড়িয়ে থাকল। সাক্ষ্য ফের বলল,
“ রেগে থাকার কারণ কি? আমি কাকে নিয়ে ঘুরতে এসেছি তা তো আপনার জানার কথা। ”
দ্বিতী জানে। তবুও রাগ হচ্ছে।আর রাগ হচ্ছে বলেই ফোনটা নিয়ে চলে যেতে যেতে বলল,
“ ঘুমাব। হ্যাঁ বলেছি বলে ঘুমের মধ্যে সুযোগ নিতে চাইলে কিন্তু সোজা নিধির সাথে বিয়ে দিয়ে দিব।”
অতঃপর রুমে এসে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে গত দুইদিনের গ্রুপের সমস্ত ম্যাসেজই পড়ল সে। চোখে ঘুমঘুম তবুও পড়ল। যতক্ষন না শেষ হলো ততক্ষনই দেখে গেল। অতঃপর এক পর্যায়ে চোখে ঘুম নামতেই মোবাইলটা আঁছড়ে পড়ল দ্বিতীর মুখের উঠর। ঠোঁটের এককোণে ঠপাস করে পড়াতেও ব্যথাটা ঠোঁটেই পেল। অতঃপর চোখে ঘুম ছুটিয়ে মোবাইলটা একপাশে রেখে আবারও ঘুমাল।
সাক্ষ্য রুমে এল একটু পর। দ্বিতী ততক্ষনে ঘুমে অচেতন। একটু আগেও রাগে থমথমে করে রাখা মুখটা এখন কি নিষ্পাপ দেখছে। কি ভীষণ বাচ্চা বাচ্চা। সাক্ষ্য হাসে নিঃশব্দে। অতঃপর বৃদ্ধাআঙ্গুলিতে দ্বিতী নাকে বুলিয়ে হেসে বলল,
“ আম্মু বোধহয় আমার কপালে একটা পাখির ছানা জুটিয়ে দিয়েছে। দেখলেই আরাম আরাম লাগে কেমন। ”
এইটুকু বলেই সাক্ষ্য আলো নিভিয়ে ড্রিম লাইট জ্বালিয়েই পাশের জায়গাটুকুই দখল করল। অতঃপর মৃদু আলোতে দ্বিতীর মুখটা দেখতেই দেখতেই বাহুডোরে আগলে নিল দ্বিতীকে। পাখির ছানার ন্যায আদর আদর মুখটা বুকে জড়িয়ে আলতো করেই টুপটাপ কয়েকটা চুমু দিল দ্বিতীর চোখেমুখে। শেষ চুমুটা দ্বিতীর নাকে দিতেই দ্বিতভ নড়েচড়ে উঠল যেন। চোখজোড়া হালকা মেলে খেয়াল করার চেষ্টা করল কি হচ্ছিল। নাকে ভীড়ল কেমন সাক্ষ্যময় ঘ্রাণটা।তারপরই চোখে পড়ল সর্বপ্রথম সাক্ষ্যর চোখ বুঝে রাখা নিষ্পাপ মুখ। দ্বিতী চেয়ে থাকল। ভাবল সাক্ষ্য ঘুমিয়েই গিয়েছে। অথচ সজাগ সাক্ষ্য তখনও ঘুমের ভান ধরেই দ্বিতীকে ওভাবেই বুকে জড়িয়ে পড়ে রইল।আর ঘাড়ত্যাড়া দ্বিতী তখনও ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে ঘুমন্ত মুখটার দিকে। একটু আগের রাগ ভুলে সাক্ষ্যর চোখে, মুখে,ঠোঁটে আঙ্গুল বুলাতে বুলাতেই সাক্ষ্যময় সুভাসটা খুব করে নিতে চাইল। এত সুন্দর কেন সুভাসটা? দ্বিতীর তো খুব ভালো লাগে সাক্ষ্যময় এই খুশবুটা। দ্বিতী হুট করেই ঠোঁট ছোঁয়াল সাক্ষ্যর গলার দিকটায়। আওড়াল,
দুইজনাতেই পর্ব ২২
“ সাজি আম্মুর এত সুন্দর ছেলে আল্লাহ কেন দিল? সবাই কেমন তাকিয়ে থাকে৷ আমারও তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে হয়। শুধু দেখতেই ইচ্ছে হয়। ”
সজাগ সাক্ষ্য বউয়ের কান্ড দেখে মনে মনেই হাসল। মনে মনে বিড়বিড় করল,
“ ঘুমন্ত অবস্থায় আমাকে সুযোগ নিতে না করে এখন নিজেই সুযোগ নিচ্ছেন ম্যাম। নো প্রবলেম, নিন। আমি সময়
মতো উশুল করে নিব। ”
