Home দুইজনাতেই দুইজনাতেই পর্ব ৩৩

দুইজনাতেই পর্ব ৩৩

দুইজনাতেই পর্ব ৩৩
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

দ্বিতীর হাতে ঝলঝলে দুটো ফোসকা। লাল টকটকে হয়ে উঠা ফোস্কা দুটোর দিকে চেয়ে সাক্ষ্য ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। বলল,
“ হাতের এই অবস্থা করে লাভ কি হলো? রান্নাটা আগ বাড়িয়ে না করলেই কি হতো না? ”
দ্বিতী চাইল। সাক্ষ্যর মুখের দিকে চেয়ে প্রশ্ন করল,
“ কেন? বদনাম হবে আপনার এখন? ”
“ নাম বদনাম নিয়ে ভাবার হলে তো এখনই স্টুডেন্ট বিয়ে করে বসে থাকতাম না৷ ”
দ্বিতী ফোড়ন কেঁটে শুধাল,
” স্টুডেন্ট বিয়ে করলে বদনাম হয় নাকি? জানতাম না তো? ”
সাক্ষ্য চাইল। দ্বিতীর হাতটা টেনে নিয়ে বলল,

“ স্টুডেন্ট বিয়ে করলে পুরো জীবনেরই বদনাম হয়ে যায় ম্যাম। জেনেশুনেই বদনামটা কাঁধে নিয়েছি আর আপনি বলছেন জানতেনই না? আশ্চর্য! ”
দ্বিতী ভ্রু কুঁচকে চাইল। সরু চাহনিতে চেয়ে থেকেই ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন ছুড়ল,
“তো কার জন্য এই বদনামটা কাঁধে তুললেন স্যার? আমি কি আপনাকে জোর করেছিলাম?”
সাক্ষ্য আড়ালে হাসল এবারে। জোর করে নি? বোধহয় জোরও করেছে। ওভাবে চেয়ে থেকে থেকে সাক্ষ্যকে তার নিজস্ব জালে আটকিয়েছে আর এখন বলছে জোর করেনি? সাক্ষ্য উত্তর করল,
“ সাক্ষ্য এহসান না চাইলে আপনি শত জোর করলেএ বদনামটা কাঁধে তুলে পারতেন না মিসেন এহসান। চেয়েছে বলেই পেরেছে। ”
দ্বিতী বাঁকা হাসল এবারে। ওর খুব ইচ্ছা সাক্ষ্যকে মুখ দিয়ে দুর্বলতাটা স্বীকার করানোর। এই যে দ্বিতীর দুর্বলতা নিয়ে মজা লুটে তখন দ্বিতীও লুটত। দ্বিতী হেসেই প্রশ্ন ছুড়ল,

“ চেয়েছেন স্বীকার করছেন তাহলে মিস্টার এহসান? স্টুডেন্ট বিয়ে করে বদনামে জড়াতে চেয়েছেন? সিরিয়াসলি? ”
“ আপনি বোধহয় টিচার বিয়ে করে খুব সুনাম অর্জন করতে চেয়েছেন? লাজলজ্জা ভুলে বদনামই তো মাথায় তুললেন। ”
“ তবুও ভালো। আপনার মতো তো আর মুখে এক, মনে এক নয় আমার। দুটোতেই এক। আপনার মতো রংঢং আমার সয় না। ”
“ না সইলেও কি করার? না চাইলেও আজীবন সইতে হবে। সয়ে নিন বরং। ”
“ সইব না। ভেবেছি আপনাকে বুড়িগঙ্গা নদীতে বস্তায় করে ফেলে দিয়ে আসব। এত সুন্দর পুরুষ মানুষ তো আর টিকিয়ে রাখা যায় না। ”
“ আপনার কি হিংসে হচ্ছে আমি সুন্দর দেখে? নাকি ঈর্ষা? ”
“ আপনি সুন্দর না। আপনি আসলে ইচ্ছে করেই মেয়ে গুলোকে আকৃষ্ট করেন। ইচ্ছে করেই।”
সাক্ষ্য ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। শেষমেষ যত দোষ সে সাক্ষ্য ঘোষই যে এসে দাঁড়াবে তা সে জানত। জেনেশুনেই বলল,
“হু। আপনারা নেচে নেচে আকৃষ্ট হবেন। এখন সে দোষটাও আমার।”

দ্বিতীর রান্না করা বিরিয়ানিটা যখন টেবিলে সবার প্লেটে দেওয়া হলো দ্বিতীর মুখটা তখন বেশ রকমের উৎসুক হয়ে চেয়ে আছে। একপাশেই সাম্য,কণা আর সাক্ষ্যর বাবা। অপর পাশটায় কথা, আর সাক্ষ্যর নানু। আরো একটা চেয়ার খালি। যাতে সাক্ষ্য বসবে। দ্বিতী উৎসুত হয়ে চেয়ে উত্তরের অপেক্ষা করতেই কণা হেসে উঠল। মুখে খাবার তুলার কয়েক সেকেন্ড পরই বলল,
“ তুমি তো সে ভালো রান্না করতে পারো ভাবি। কিন্তু নুনটা? আর চালটাও তো কেমন যেন আধসিদ্ধ লাগছে। ভালোই বলো? ”
দ্বিতী বোধহয় অন্য সময় হলে প্রতিবাদ করত। কিন্তু আজকে মুখটক চুপসে গেল। এটা ঠিক যে সে বিরিয়ানি ভালোই রান্না করতে পারে তবে তা যদি হয় অল্প মানুষের জন্য। কিন্তু এত জনের জন্য রান্না বসিয়ে আন্দাজটা বোধহয় দ্বিতী নিজেও করতে পারেনি। তবুও এতো কষ্ট করে, হাত পুড়িয়ে রান্নাটা যখন স্বাদ হলো না শুনল তখন মুখটা চুপসে এল। সাক্ষ্যর আব্বু বোধহয় সে চুপসে যাওয়াটা লক্ষ্য করেই বলল,
“ নাহ রে আম্মু। একদম ঠিক হয়েছে। আমার তো খুব ভালো লেগেছে। ”
সাম্য বাবার এই প্রশংসাকে ছাপিয়ে গিয়ে মুহূর্তেই বলল,

“ দ্বিতু, মন খারাপ করিস না। সত্যিটা হলো যে তুই এই কথার হেল্প নিয়েছিস বলেই রান্নাটা এতো বিস্বাদ হয়েছে। ওই নির্ঘাত তোকে ভুলবাল সব বলেছে। এর থেকে তুই আমার হেল্প নিতি নাহয়। তারপর দেখতি কি ভালো রান্না হতো। তুই কিনা এই কথার হেল্প নিলি?ছিহ! ”
দ্বিতী এবারে নিরাশ স্বরেই বলল,
“বিচ্ছিরি? একটুও ভালো হয়নি?”
দ্বিতীর কন্ঠটা কেমন যেন শোনাল। সাম্য মুহূর্তেই চাইল এবারে। মুখটা চুপসে আছে। একটু আগেই নিজের মজা করে বলা কথা গুলো মুহূর্তেই ফিরিয়ে নিল সাম্য। ছিহ ছিহ! না চাইতেও দ্বিতীকে আঘাত করে ফেলেছে ভেবেই দ্রুত বলল,
“ না না। হয়েছে তো। দুর মজা করছিলাম বোকা। ”
“তোমার কথা শুনে তো মনে হচ্ছিল না সাম্য ভাই। মজা হয়নি। আমি জানি। ”
“ না পাগল, সত্যিই মজা হয়েছে। আব্বুও সত্যিই বলেছে। ”
দ্বিতী একটু হাসল। বলে,
“ সাম্য ভাই? কতটুকু সান্ত্বনা দিবে আর? ”
সাম্য হতাশ কন্ঠেই শুধাল,

“ সান্ত্বনা না। সত্যিই মজা হয়েছে। আরেক চামচ দে দ্বিতী। ’
ঠিক তখনই সাক্ষ্য এসে চেয়ার টেনে বসল কথার পাশাপাশি। গলা ঝেড়ে এক নজর সাম্যর দিকে চাইল শীতল চাহনিতে। ফের পরমুহূর্তেই হাত ধুঁতে নিয়ে কানে এল নানুর গলা,
“ ও যতই বলুা সান্ত্বনা না কিন্তু তোমার তো মাইয়া রান্নার হাত ভালো না। সামান্য এইটুকুও ঠিক কইরা রান্না করতে পারো নাই? কি শেখাইছে তোমার আম্মায়? ”
সাক্ষ্য বোধহয় ঠিক তখনই নানুর দিকে চাইল একপলক। দ্বিতী উত্তর করবে তার অপেক্ষা না করেই শুধাল,
“ উনার আম্মা ইনাকে যাই শেখাক তোমার তো জানার প্রয়োজন দেখছি না নানু। নাকি তুমিও উনার আম্মুকে টিউটর হিসেবে রাখবা? ”
সাক্ষ্যর নানু মুখ ভেঙ্গাল। উত্তরে বলল,
“ চুপ করো তো। তোমার বউ কি রানছে আগে খাইয়া দেখো। এতই শিক্ষা পাইয়া থাকলে রান্নাটা স্বাদ হইল না কেন? ”
সাক্ষ্য ফোঁস করে শ্বাস তুলে। নিজের প্লেটট্য় পরপর দু চামচ বিরিয়ানি তুলে মুখে ফুরল মুহূর্তেই। অতঃপর নানুর দিকে চেয়েই উত্তর করল,

“ কে বলল স্বাদ হয়নি? নানু, তোমার সম্ভবত রুচি কমেছে। কালই আমার সাথে ডক্টরের কাছে যেও তো। রুচি বাড়ার ঔষধ দিবে অবশ্যই। ”
সাক্ষ্যর বাবা হেসে ফেলল এবারে। ছেলের উত্তর পেয়ে হাসি আটকাতে না পেরে মাথা দুলালেন তিনি। সহমত জানিয়ে বললেন,
“ আসলেই। আম্মা, কাল সাক্ষ্যে সাথে গিয়ে ডক্টরটা দেখিয়েই আসুন বরং। খাবারে অনীহা দেখা দেওয়া তো ভালো নয়। ”
দূর থেকে এক ঝলক সাক্ষ্যর মাও হাসল বাপ ছেলের কথা শুনে। এই যে দ্বিতীর হয়ে সাক্ষ্য কথা বলল এতেও বোধহয় কোথাও না কোথাও ভালো লাগল উনার। সবাই তো ভেবেছিল ওদের সম্পর্কটা ছন্নছাড়া হয়েই কেঁটে যাবে। দুইজন বুঝি দুইজনকে ভালো টালো বাসবে না কখনো। সাক্ষ্যর মা এসব ভেবেই হাসে। খাবার খাওয়া শেষে সাক্ষ্য যখন হাত ধুঁতে বেসিনে এল ঠিক তখনই বলল,
“ আম্মা থেকে একদিক দিয়েই ভালোই হলো বল সাক্ষ্য? তুই যে দ্বিতীকে কখনো সাপোর্ট করতে পারিস তা তো আমার ভাবনায়ও ছিল না। ”
সাক্ষ্য দাঁড়াল। গম্ভীর স্বরে উত্তর করল,
“ আম্মু, তোমার বান্ধবীর মেয়ে আর যায় হোক আমার চেয়ে বয়সে ছোট। পিচ্চি একটা মেয়ে যাকে বছর কয়েক আগেও আমি ফ্যা ফ্যা করে কাঁদতে দেখেছি। আর সে পিচ্চি মেয়েটাই এত কষ্ট করে, হাত পুড়িয়ে রান্না করেছে! ভাবতে পারছো? আমি তোমার আম্মার মতো এতোটা বিবেকহীন নই যে ওকে সাপোর্ট করতাম না। ”

“ বলছিস যে শুধু এমনি এমনিই সাপোর্ট করেছিস? ”
“ বলতে চাইছি যে, হু। এমনি এমনিই সাপোর্ট করেছি। তবে তোমার আম্মাকে বিবেক দিয়ে কথা বলতে বলবা। নয়তো তোমার ভাইয়ের পিচ্চি মেয়ের মতো তোমার আম্মাকেও অপমান করতে বাধ্য হবো। ”
‘বাদ দে। দুদিন বাদে তো চলেই যাবে।”
সাক্ষ্য শুনল। মাথা দুলিয়ে পা বাড়াল এবারে। এই যে মুখে বেশ গম্ভীর ভাব ধরে দিন রাত মা বাবার সামনে ঢং দেখায় যে তাকে জোর করে বিয়ে দিয়েছে আসল সত্যটা হলো সাক্ষ্য নিজেই খুশি মনে বিয়ে করেছে। বরং একটু বেশিই খুশিমনে। অথচ বেচারা এখনো পরিবারের সামনে ঢংটা দেখায় এমন যে, সে দ্বিতীকে বউ হিসেবে এক্সপেক্টই করেনি।

দ্বিতী বেলকনিতে বসে আছে প্রায় এক ঘন্টা যাবৎ। সবাই তাকে বিভিন্ন কিছু বলে উৎসাহ দিলেও সে জানে যে রান্নাটা ভালো হয়নি। আসলেই ভালো হয়নি। দ্বিতী খেয়েছে তো। সে বুঝি স্বাদ বুঝবে না? অথচ এই খাবারটুকুতেই সবাই ওর প্রশংসা করেছে। সাক্ষ্যর বাবা ভালোবেসে রান্নার জন্য উপহার দিয়েছে। অথচ দ্বিতী জানে এতোটক মাতামাতি করার মতো রান্না সে করেনি। দ্বিতী যখন অন্ধকারে বেলকনিতে বসা তখনই সাক্ষ্য বেলকনির দ্বারে দাঁড়ানো। বুকে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন ছুড়ল,
“ আপনাকে কি বললাম? তৈরি হতে বললাম তো। ওভাবে বসে আছেন কেন মিসেস এহসান? ”
দ্বিতী উত্তর করল না। সাক্ষ্য এবারে সামনে গিয়েই বলল,
‘ মিসেস এহসান, ভূতের মতো বসে থেকে করছেন টা কি হুহ? ”
ঠিক এর পরমুহূর্তেই সাক্ষ্য অনুভব করল এই দ্বিতীকে সে চেনে না। এটা সবসময়ের চঞ্চল দ্বিতী নয়। সাক্ষ্য ফোস করে শ্বাস ছেড়েই নিজের হাতটক গলিয়ে দিল দ্বিতীর হাতে। বলল,
“ আপনার এমন থমথমে রূপ বড্ড বাজে ম্যাম। এর চেয়ে বকবক করুন, ঝগড়া করুন, চুল ছিড়ুন, চামগা ছিলুন সব করুন। কিন্তু এমন থমথমে রূপ খুব বিশ্রী দেখাচ্ছে। ”
“ হাত ছাড়ুন। এখন ঝগড়া করতে ইচ্ছে হচ্ছে না আমার।”
“ ওকে ফাইন। ঝগড়া না করুন, তবে ছোটখাটো জার্নির সঙ্গী তো হতে পারবেন? তাই হোন বরং। ”
“ কিসের জার্নি? ”
“ আপনাকে পাচার করে দেওয়ার জার্নি। একদম ঝুটঝামেলা বিহীন পাচার করে দিয়ে চলে আসব। ”
“ বলুন যে, পাচার করে দিয়ে ঝুটঝামেলা বিদায় করতে চাইছেন। তার চেয়েও বড় কথা, আমি কি বলেছিলাম আমাকে আপনাদের বাড়িতে তুলুন? এতই যখন ঝুটঝামেলা তখন পার্মানেন্টলি ঘরের তোলার আর্জি করেছেন কেন? ”

সাক্ষ্য হেসে ফেলল আঁধারে। বলল,
“ এইজন্যই এখন চাইছি ফেরত দিয়ে আসতে। চলুন, ফেরত দিয়ে আসি। ”
দ্বিতীও নিজের দিকটা শক্ত রেখে মুহূর্তেই শুধাল,
“ তো আপনার এখানে পড়ে থাকতে চাইছেটা কে? জলদি দিয়ে আসুন। আমি আরো বেঁচে যাব। ”
সাক্ষ্য ফের হাসে। এই যে বাঁকা ভাবে দ্বিতীকে রাজি করাল এই ভেবেই হাসল। এই একই কথাটাই যদি সোজা ভাষায় বলত দ্বিতী মোটেও রাজি হতো না। কখনো না। সাক্ষ্য হেসেই বলল,
“ তাহলে চলেন, দিয়েই আসি। ”
দ্বিতী কেমন যেন রেগে চাইল। পরমুহূর্তেই রাগ জেত সব নিয়ে পা বাড়াল। যেন তার কিছুই যায় আসে না।
.
সাক্ষ্য এতরাতে কথাকেই ম্যাসেজ করে বলল দরজাটা লাগাতে। অতঃপর সাম্যর বাইকটা নিচ থেকে নিয়ে বেরিয়ে দ্বিতীর সামনে দাঁড়াল। বলল,
“ উঠুন। দিয়ে আসি এবারে। ”
দ্বিতী বাঁকা ভাবে চাইল। বাইকে উঠেনি তেমন কখনে সে। বলা চলে অভ্যেস নেই, ভয় হয় বরং। টানটান গলায় বলল,
“ উঠব না। ”
“ তার মানে যেতে চাইছেন না তাই তো? থেকে যেতে চাইছেন বলুন? ”
দ্বিতী ফের রাগল। কপাল কুঁচকে এবারে ভয়ডর সব নিয়েই উঠে বসল বাইকে। রাগে দুঃখে নাকের সামনের অংশ ইতোমধ্যেই ফুলে উঠেছে মেয়েটার। গলা শক্ত করে বলল,
“বাইক জোরে চালাবেন তো সোজা কবরে পাঠিয়ে দিব বুঝেছেন? ”
সাক্ষ্য হেসে ফেলল বোধহয়। আয়নায় দ্বিতীর মুখটা পরখ করেই বলল,
“ ওকে পাঠিয়ে দিয়েন। কিন্তু এখন শক্ত করে ধরুন আমায়। নয়তো অল্প বয়সেই বউ হারা হয়ে যাব। ”
“ ধরব না। করবেন কি হুহ? ”

সাক্ষ্য আর কথা বলল না। উত্তর না দিয়ে ঠিক তখনই বাইক স্টার্ট দিল। আচমকা জোরেই বাইক চলতে শুরু করাতেই দ্বিতী হুমড়ি খেয়ে পড়তে নিল। মুহূর্তেই নিজের দুইহাত দিয়ে খামচে ধরল সাক্ষ্যর কাঁধ। সাক্ষ্য ঠিক তখনই বাঁকা হাসল। রাতের আকাশে বাইক চালাতে চালাতেই বলল,
“ চাইলে আরেকটু জড়িয়েই ধরতে পারেন মিসেস এহসান। আমি তো আপনার হালাল পুরুষই। ”
দ্বিতী না পারতেই ধরে থাকল। কারণ বাইকে সে কখনো চড়ে নি। ভয় পায়। এই যে এখন চড়ছে এখনো তার কলিজা লাফাচ্ছে। মনে হচ্ছে, এইতো রাস্তায় আঁছড়ে পড়বে বুঝি!

দ্বিতীরা এল তাদের বাসার সামনেই। রাত তখন প্রায় বারোটা বলা চলে। বাসার কোন বাসাতে তেমন একটা আলো জ্বলছে। সাক্ষ্য রাস্তায় দাঁড়িয়েই একবার পুরো বিল্ডিংটায় চোখ বুলাল। অতঃপর ঘড়ি দেখে আওড়াল,
“ জাস্ট টুয়েন্টি মিনিটস পাবেন মিসেস। এর মধ্যে গিয়ে অদিতি আন্টিকে একবার জড়িয়ে ধরবেন, যা ইচ্ছে হয় বলবেন। প্রয়োজন বিশ মিনিটই জড়িয়ো ধরে বসে থাকবেন। তারপর বিশ মিনিট শেষ হতেই ফের ফিরে আসবেন। বুঝেছেন? আমি এখানে অপেক্ষা করছি। ”
দ্বিতী শুনল। সবই শুনল। তারপর পা বাড়িয়ে দ্রুত মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য রওনা হলো। ইশশ! একটা দিন। একটা দিন সে মা ছাড়া ছিল। এর মাঝেইনে হচ্ছে সে কতগুলো দিন মাকে দেখেনি। কতগুলো দিন মায়ের সাথে কথা বলেনি। দ্বিতীর বুক ভার হয়ে আসে। চাপা এক দুঃখের সাখে আনন্দএ হচ্ছিল। দ্বিতী সে আনন্দ নিয়েই মায়ের কাছে পৌঁছাল।

সাক্ষ্য বিশ মিনিট নয় শুধু প্রায় চল্লিশটা মিনিট দাঁড়িয়ে আছে ফাঁকা রাস্তায়। শূণ্য রাস্তায় আলো আঁধারিতে মশার কাঁমড়ও খেয়েছে অসংখ্য। তার চেয়েও বড় কথক, তার থেকেই একটু দূরে দু দুটো কুকুর ফ্যালফ্যাল করে তার দিকেই চেয়ে আছে বহুক্ষণ। সাক্ষ্যও এই দুইজনের সাথে কথা বলে সময় কাঁটিয়েছে। কিন্তু এতোটা সময় করছে টা কি? সাক্ষ্য এইনিয়ে তিনবার কল দিয়েছে। তিনবারই মেয়েটা কল তোলেনি। না পেরে আরো একবার কল দিল সে। অতঃপর ওপাশ খেকে রিসিভড হতেই বলে উঠল সে,
“ দ্বিতী, এসব কি শুরু করেছেন? বিশ মিনিট সময় দিলাম আপনি দেখি চল্লিশ মিনিট নিয়ে নিয়েছেন। তাড়াতাড়ি নামুন। আমার ঘুম আসছে। বাসায় ফিরে ঘুম দিব। আমার আবার আপনাকে ছাড়া ঘুম নাও আসতে পারে। ”
সাক্ষ্য ঠিক এইটুকু বলার পরপরই ওপাশ থেকে কেউ একজন গলা ঝাড়লেন। কেঁশেও উঠলেন। পরমুহূর্তেই বলে উঠল,

দুইজনাতেই পর্ব ৩২

“সাক্ষ্য, দ্বিতীটা তো ঘুমিয়ে গেছে আমাকে এইসেই বলতে বলতে। তুমি কি নিচেই আছো? একটু কষ্ট করে চলে আসো বাসায় বাবা। ওর ঘুমটা আর ভাঙ্গাতে ইচ্ছে করছে না যে।”
সাক্ষ্যর ঠিক ঐ মুহূর্তেই মন চাইল দ্বিতী নামক গর্দভ মেয়েটাকে ঘুম থেকে তুলে ধরেই বেলকনি দিয়ে ছুড়ে মারতে। বেআক্কেল মেয়ে ! কল করে বলা যেত না ও ঘুমিয়ে যাচ্ছে? এখন সাক্ষ্যর যে নাক কাঁটা গেল এর মাশুল কি দ্বিতী দিবে? ছিহ! সবসময় ভাব ধরে বসে থাকা সাক্ষ্য এখন মুখ দেখাবে কি করে?

দুইজনাতেই পর্ব ৩৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here