দুইজনাতেই পর্ব ৫০
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
দুপুরে যখন দ্বিতী ঘুমে ঠিক ঐ সময়টাতেই সাক্ষ্য বাসায় গিয়েছিল। তাও সবার জোরাজুরিতে। বেশি জোরাজুরিটাই সাম্যই করল। শরীরে ময়লা, দ্বিতীর আশপাশে গেলে জীবাণুর সংক্রমণ হলে তখন?এসব বলেই দুই ভাই মিলে বাসায় হাজির হলো। অতঃপর সাক্ষ্য বেশি সময় নিল। শুধু কয়েক মিনিটেই গোসল সেরে নিয়ে বের হলো দ্রুত৷ অতঃপর ব্যস্ত ভঙ্গিতে পা বাড়াতে বাড়াতে সাম্যকে বলল,
“ হসপিটালে যাচ্ছি সাম্য। তুই পরে গিয়ে আম্মু আর কথাকে নিয়ে আসিস ওকে? ”
সাম্য প্রায় তড়িঘড়ি করেই নিজের ঘর ছেড়ে বের হলো। সাক্ষ্যকে একটা কালো শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে ব্যস্ত ভঙ্গিতে কথা বলতে দেখে সে বিস্ময় নিয়ে বলল,
“ গোসল শেষ তোমার? ”
সাক্ষ্য একপাশে ফিরে ভ্রু কুঁচকে চাইল। বোতাম লাগানো শেষ। হাতাগুলো ফোল্ড করে নিতে নিতেই বলল,
“ হু, শেষ। ”
”চুল থেকে পানি গড়াচ্ছে ভাইয়া।”
সাক্ষ্য পাত্তা না দিয়েই পা বাড়াতে বাড়াতে শুধাল,
” শুকিয়ে যাবে। সমস্যা নেই। ”
অতঃপর সাক্ষ্য আর দেরি করল না। প্রায় তাড়াহুড়ো করেই পা বাড়াল সে। সাম্য কেবল ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থেকেই বিড়বিড় করল,
“ ঐটুকু সময়ে গোসলও শেষ? কি ফাস্ট! ”
হসপিটালে পৌঁছাতে সাক্ষ্যর খুব একটা দেরি হলো না। প্রায় ভেজা চুলগুলো নিয়ে যখন সে হসপিটালে এসে হাজির হলো এবং দ্বিতীর কাছে গেল দ্বিতী তখনও ঘুমে। প্রায় একটুখানি সময় পর যখন চোখ মেলে চাইল তখন সাক্ষ্যর চুল ভেজা দেখে কৌতুহল নিয়ে চাইল সে। কি আশ্চর্য! চুল মোঁছেনি? দ্বিতী নিজের কৌতুহল নিয়ে চাইতেই সাক্ষ্য প্রশ্ন ছুড়ল,
“ কি সমস্যা? ওভাবে চোখ ছোটছোট করে চেয়ে আছেন কেন?”
”গোসল করেছেন সাক্ষ্য? চুল ভেজা কেন? ”
সাক্ষ্য প্রশ্ন শুনেই মাথায় হাত দিল একবার। চুল শুঁকোয়নি এখনও? হাত দিয়ে চুলে হাত বুলিয়েই বুঝার চেষ্টা করে বলল,
“চুল ভেজা থাকলে মাথা ঠান্ডা থাকবে। তাই…”
দ্বিতীর মুখচাহনি নিরস দেখাল। মাথা ঠান্ডা থাকবে?উত্তরটায় সন্তুষ্ট বা খুশি কিছুই হতে না পেরে মৃদুস্বরে উত্তর করল,
“ মিথ্যে বলছেন কেন? চুলগুলো ভেজা। গিয়ে প্লিজ ভালোমতো চুল মুঁছে আসুন৷ ”
” চুল মুঁছে আসতে হবে? ”
” হবে। আর, আপনি বোধহয় খেয়াল করেননি যে… ”
সাক্ষ্য ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন ছুড়ল,
“যে?”
দ্বিতী চাইল তখনো নরম চাহনিতে। সাক্ষ্যর মাথার চুল হতে শার্টের হাতাটা অব্দি শান্ত চাহনিতে পরখ করে নিয়ই উত্তর করল,
” বোতাম লাগানো হয়নি। উপরনিচ বোতাম লাগিয়ে ফেলেছেন।”
সাক্ষ্য এবার নিজেই নিজের বুকের দিকে নজর ফেলল। ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে দেখতেই চোখে পড়ল, হ্যাঁ। বোতাম লাগানো হয়নি। উপর নিচ হয়েছে। সাক্ষ্য ফোঁস করে শ্বাস ফেলে উত্তর করল,
“ এতকিছু ম্যাটার করে না৷ এটা হসপিটাল। এখানে আমার চুল ভেজা, শার্টে বোতাম লাগানো হয়নি এসব ভালো ভাবে কেউ খেয়াল করবে না। ”
”খেয়াল না করলেও চোখে পড়ছে। চুল মুঁছে আসুন। ছোটাছুটি করার সাথে সাথে নিজের যত্ন নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ বুঝেছেন? ”
সাক্ষ্য হেসে ফেলল মৃদু। অদঃপর দ্বিতীর হাতের উপর নিজের হাতটা রেখে খুব সুন্দর করে উত্তর করল,
“আপাতত আপনি গুরুত্বপূর্ণ! সুস্থ হয়ে যান দ্রুত। তারপর নিজ হাতে আমার ভেজা চুল মুঁছিয়ে দিবেন। রোজ রোজ মুঁছিয়ে দিবেন ওকে? ”
দ্বিতী উত্তর করল না। সাক্ষ্য ততক্ষনে ফের জিজ্ঞেস করল,
“ খুব যন্ত্রণা হচ্ছে তাই না? আপনি যতোটা স্বাভাবিক দেখাচ্ছেন আসলেও যে অতোটক স্বাভাবিক নয় জানি আমি। তবে….”
দ্বিতী তাকায়। হু, যন্ত্রণা তো হচ্ছে। শরীরের যন্ত্রণা, কষ্ট খুব করে অনুভূত হলেও সে অতোটা প্রকাশ করতে চাইল না। বরং প্রসঙ্গ বদলে জিজ্ঞেস করল,
“ ভার্সিটি যাননি, গোসল সেরে চুল মোঁছেননি। শার্টের বোতামটাও লাগাননি ঠিকঠাক। জীবনে উচ্ছন্নে নিবেন হুহ?”
সাক্ষ্য নিজের ভেজা চুল চুলকে হেসে ফেলল মৃদু। দ্বিতীর নরম, মিহি স্বরে বলা কথার বিপরীতে উত্তর করল,
“ আপনি সহ গেলে উচ্ছন্নে গেলেও রাজি আছি। ”
“ চাকরি কি খেয়ে বসবেন? ছুটি দিয়েছে আদৌ? ”
” বউয়ের অসুস্থতায় ছুটি না দিলে ঐ চাকরি আমি নিজেই ছেড়ে আসতাম।”
দ্বিতী উত্তর শুনে মিনমিনে চোখে চাইল। উত্তর করল না কেবল। ওভাবেই সাক্ষ্যর দিকে চেয়ে থাকল। ছেলেটা গোসল করেছ৷ তা স্পষ্টই বুঝা যাচ্ছে চুল দেখে। ভেজা, ঝরঝরে হয়ে আছে। চোখজোড়ায় তখনও ক্লান্তি। বোধহয় না ঘুমানোর ফল। শার্টটা..শার্টটার বোতামো ও লাগানো হয়নি। তাকালেই মনে হচ্ছে এই যেন এক উদাসীন পুরুষ। অথচ এই পুরুষটিই এতকাল যাবৎ কি ভীষণ গম্ভীর, ভদ্র রূপ ধারণ করে এসেছে।
সাম্য ছাদে বসা। তার পড়ালেখার প্রতি খুব বেশি আগ্রহ না থাকা সত্ত্বেও মোবাইলের পিডিএফে পড়ছিল সে দোলনায় পা ঝুলিয়ে। এক পাশেই রাখা কফির মগটা। কথাও ঠিক এই দোলনাটায় বসেই পড়ালেখা করে। যেন কি মনোযোগী স্টুডেন্ট। সাম্য বুঝে উঠে না, এত পড়া মানুষ কিভাবে পড়ে? কিভাবে? সাম্য কিন্তু আজ আগে আগেই দোলনা দখল করেছে।শুধু মাত্র কথাও ঐ একই দোলনাটাতেই বসে পড়বে জেনে। অতঃপর এই দখলদারত্বের মাঝপথেই কোথায় থেকে যেন ছাদে এসে হাজির হলো পিকু। কথার আদুরে বিড়ালটা। সাথে অবশ্য দেখা গেল আরো একটা বিড়ালকেও। পিকু ঐ বিড়ালের সাথে রঙ্গলীলা করে অবশেষে বিদায় দিয়ে যখন ছাদের এক কোণে বসল তখন সাম্য ধমকে উঠল। গলা উঁচিয়ে বলল,
“ এসব কি রে বেয়াদব? ছিঃ! তোর আম্মা হসপিটালে কোন সিনিয়রের সাথে আলাপ করছে আর তুই কোন মেয়ে বিড়ালের সাথে ইটিশ পিটিশ করিস? ছিঃ ছিঃ!আমি বেঁচে থাকতে তোর এসব মেনে নিব ভেবেছিস? সোজা ছবি তুলে রেখেছি। তোর আম্মাকে দেখিয়ে আজই কি করে দেখবি বেয়াদব। ”
বিড়ালটা বোধহয় সাম্যর কথার আগামাথা কিছুই বুঝল না। বরং ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থেকে এগিয়ে এল। অতঃপর সাম্যর কাছে এসেই চিৎকার করল,
”মিয়াওওও..”
সাম্য মুহূর্তেই ধমকে উঠল,
” এই বেয়াদব! আস্তে৷ কানের পর্দা ফাটিয়ে ফেলবি নাকি? আস্তে চিল্লা..”
বিড়ালটা শুনল না। বরং ঐ একইভাবেই ডেকে উঠতেই সাম্য বিরক্ত হয়ে বিড়ালটাকে দুই হাতে চেপে ছুড়ে ফেলল সামনের দিকে। আঙ্গুল উঁচিয়ে বলল,
“ কোন মেয়ে বিড়ালের সাথে প্রেম করে তোর দেখছি গলা উঁচু হয়েছে। মনে রাখবি, আমার সাথে কথা বলার সময় গলা নামিয়ে কথা বলবি। রেসপেক্ট করবি। বুঝলি? নয়তো তোর প্রেম করা কাকে বলে দেখিয়ে দিব জা’নোয়ার। ”
কথা মাত্রই এল। ওভাবে নিজের বিড়ালটাকে ছুড়ে ফেলতে দেখে গলায় অভিযোগ টেনে বলল,
” ওভাবে নিরীহ প্রাণীটাকে জা”নোয়ার না বলে, ছুড়ে না ফেলে স্নেহ নিয়েও তো চাইতে পারো। পারো না?”
“ পারি না। ”
ঐ একটা উত্তর দিয়ে সাম্য ত্যাড়া ভাবে চাইল। বলল,
“ ছাদে আসি একটু শান্তির জন্য। হাওয়া বাতাস খাওয়ার জন্য। কিন্তু এখানে এসে কি আমি প্রতিদিন তোর বিলাইয়ের প্রেমকাহিনী দেখব বেয়াদব? সিঙ্গেল মানুষের অন্যের প্রেমকাহিনী দেখলে বুক জ্বলে। ”
” তাহলে চোখ বেঁধে নিও ছাদে আসার আগে। আর দেখতে হবে না তাহলে। ”
“কি জা”নোয়াররে তুই! সোজা ছাদে এনে আমাকে টপকে দেওয়ার প্ল্যাও করে ফেলেছিস? চোখ বেঁধে এসে আমি যদি ছাদ থেকে টপকে পড়ে যাই তার জরিমানা তোর ঐ ভন্ড বাপ দিবে? ”
” চাইলে দিবে। ”
সাম্য মুখ ভেঙ্গিয়ে বলল,
”এ্যাঁ! কত দিবে। মেয়েরেই ঠিকঠাক মতো দেখতে আসতে পারে না সে দিবে জরিমানা। ”
“ তাহলে আমি দিব। হয়েছে শান্তি? ”
“ তুই মনে হয় খুব বড় কিছু হয়ে গিয়েছিস? একটুখানি মেডিকেলে পড়ে তো তোর পাই পড়ে না মাটিতে। অথচ আজকাল ডক্টরের বেতনের হিসেব রাখলে এমন অহংকার দেখাতি না বেয়াদব। ”
কথা আর একটা কথাও বলল না। কথাকে সহ্য করতে পারে না ভালো কিন্তু কথার জন্যই ডক্টরদের পেশাটাকেও এমন খোঁচা দেওয়ার মানে ও বুঝে না। দুই পা বাড়িয়ে যখন চলে যেতে নিবে ঠিক তখনই তার বিড়ালটা লাফ দিয়ে উঠল দোলনাটায়। আর সঙ্গে সঙ্গেই প্রায় সাম্যর কফির মগটা ভেঙ্গে চুরমার হলো। সাম্য প্রায় মুহূর্তেই খেঁকিয়ে উঠল,
”কি করল, কি করল তোর এই পোলাটা! আমার মগটা! আমার এত শখের মগটা ভেঙ্গে দিল। ”
কথা ফিরে চাইল। পরিস্থিতি দেখে বার দুয়েক সরিও বলল পিকুর হয়ে। তবুও সাম্য নারাজ। শেষেও বলল,
”তোর শখের কিছু ভেঙ্গে দিয়ে সরে বললে কি মিটে যেত ব্যাপারটা? আমার বেলায়ও মিটবে না। মগটা আমার শখের ছিল। প্রায় দুইবছর এই মগে কফি খাই আমি। দুইবছরের মায়ামহব্বত ভোলা সম্ভব? ”
সাম্যর যদিও অতো মায়ামহব্বত হচ্ছে তবুও বলল শুধুমাত্র কথার বিড়ালই ভেঙ্গেছে বলে। কথা এর পরিবর্তে আরো দুয়েক সরি বলল। বলল নতুন আরো দশটা মগ সে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দিবে। কিন্তু সাম্য মানল না। দাঁতে দাঁত চেপর বলল,
” ক্ষতিপূরণ তোর প্রিয় কোন জিনিসই এভাবর ভেঙ্গে দেওয়া। তাহলে তুই কষ্ট পাবি, আমিও তোর কষ্ট দেখে খুশি হবো। ”
কথা বিনিময়ে আর উত্তর করে না। একটা উত্তরও না। তবে পরদিন যখন কথা বাসা ছেড়ে বের হলো তখন প্রায় সকাল সাতটা। তাড়াতাড়ি বের হয়েছে কারণ যাওয়ার পথে দ্বিতীর সাথেও দেখা করে যাবে।
অপর দিকে সাম্য ঘুম ছেড়ে উঠল আটটায়। উঠেই ওর মনে পড়ল কফির মগটার কথা!অতঃপর সে দুঃখের কথা জানান দিতেই সে হেলতে দুলতে কথার রুমে গেল। এপাশ ওপাশ নজর বুলিয়ে কথার টেবিলের উপর ছিৎ হয়ে শুয়ে থাকা পিকুকে ভ্রু কুঁচকে বলল,
” তোর মালিক কোথায় রে? রুমে নেই?”
ব্যস এইটুকু বলতে দেরি হলো বোধহয় কিন্তু পিকুর চিৎ হয়ে শোয়া থেকে উঠতে দেরি হলো না। অতঃপর আচমকাই সাম্যর দিকে আক্রমনাত্মক হয়ে ছুচে আসতে নিয়েই বাঁধাল বিপত্তি। কথার অতিপ্রিয় কাঁচের তৈরি মা-মেয়ের অবয়বটা এক মুহূর্তেই পিকুর শরীরের সাথে ধাক্কা খেয়ে আঁছড়ে পড়ল শক্ত ফ্লোরে। মুহূর্তেই ঝনঝন শব্দ করে উঠল। সাম্য তৎক্ষনাৎ চাইল। তৎক্ষনাৎ ঐ কাঁচের অবয়বটার এমন পরিণতি দেখে ও চমকে গেল। এটা কথার প্রিয়!
দুইজনাতেই পর্ব ৪৯
খুব প্রিয়! কথার মায়ের দেওয়া,অর্থ্যাৎ সাম্যর ফুফি এটা কথাকে তার মৃত্যুর আগে শেষ জন্মদিনটায় দিয়েছিল। কথা এতকাল কি ভীষণ যত্ন নিয়ে আগলে রেখেছিল এটা। কত কত দিন এটার সামনে বিড়বিড় করে মনের দুঃখ বলেছে। হ্যাঁ, সাম্য কথার কষ্ট চায়। কিন্তু এতোটাও না। সে মোটেই চায়ি এটা নষ্ট হোক। একটুও না। এবার? এবার কি কথা একটু বেশিই কষ্ট পেয়ে বসবে না?
