Home দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২ দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২ পর্ব ৮১ (২)

দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২ পর্ব ৮১ (২)

দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২ পর্ব ৮১ (২)
রিক্তা ইসলাম মায়া

মধ্যে রাতের শেষ প্রহর। মায়া রিদের শিরায় বসে গুনগুন শব্দে প্যাচ প্যচ করে ওড়না দিনে নাক মুচ্ছে আর রিদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কাঁদছে। রিদ খালি গায়ে উপুড় হয়ে বালিশে শুয়া। ইতিমধ্যে সে ঘুমিয়ে পড়তো কিন্তু মাথার কাছে মায়ার গুনগুন বিরক্তিকর শব্দে কান্নাকাটিতে ঘুমাতে পারছে না। দু-চোখ পাতায় ঘুমের রেশ জেঁকে আছে। রিদ ঘুমাতে চাই। অনেকটা রাতের অঘুমা সে। বিগত কয়েক দিনের মনস্তাত্ত্বিক অশান্তিতে ঘুম হয়নি। রিদ বালিশ থেকে মুখ উঠিয়ে তাকাল পাশে বসে থাকা মায়ার দিকে। গায়ে রিদের ছিঁড়ে দেওয়া জামাটায় জড়িয়ে রেখেছে। রিদের হঠাৎ তাকানো চোখাচোখি হল দু’জনের। মায়া যেন আরও বেশি কেঁদে উঠল রিদের তাকানোতে। রিদ ধমক দেয়। মায়া ফের কাঁদে। রিদ বিরক্তি নিয়ে রাগে কটমট করে বলে..

—” কি সমস্যা আমার মাথা উপর বসে কাঁদছ কেন? যাও তোমার বাপের কাছে গিয়ে কাঁদো। গিয়ে বলো রিদ খান তোমাকে ধর্ষণ করেছে! তারপর দেখি তোমার বাপের কতোটুকু ক্ষমতা। আমি এখানেই আছি। বাপ-বেটির দু’টোর ব্যবস্হা আজ করে যাব এখান থেকে। যাও গিয়ে বিচার দাও।
রিদের কথায় নড়ে না মায়া। আবার বিরক্তিকর কান্নাটাও অফ করল না। বরং রিদের দিকে তাকিয়ে নাক টেনে ওড়নায় পরিষ্কার করে ঠোঁট ভেঙ্গে বলে…
–” ঐ সাদা মেয়েটা কি সত্যিই আপনার বউ?
আবছা আলোয় মায়া মুখটা আদলে দেখল রিদ। এখনো মায়া সেদিনের মেয়েকে নিয়ে ভেবে বসে থাকবে ভাবেনি রিদ। ভালোবাসা বিশ্বাস থাকতে হয়। রিদের উপর অবিশ্বাস করাটা তার পছন্দ হয়নি। তারপরও মায়ার মনের অবস্থা বুঝে রিদ হাত মেলে ডাকল মায়াকে নিজের কাছে আসতে।

—” বুকে আসো।
মায়া আসল না। বরং খানিকটা বেঁকে বসল আসবে না বলে…
—” না! আগে বলুন ঐ সাদা মেয়েটা কে?
মায়ার নাহুচে চেতে উঠে রিদ। রাগান্বিত গলায় শাসিয়ে বলে…
—” রিত বুকে আয়! ভালো লাগছে না আমার।
রিদের ধমকে মায়া আপোষেই কাছে আসল। কম্বল উঁচিয়ে তার ভিতর ঢুকে রিদের বুকে মাথা রাখতেই রিদ দু’হাতে ঝাপটে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল মায়াকে। তারপর বলতে শুরু করে…
—” আমার রুমের মেয়েটা ডক্টর ছিল।
—” কিছু হয়নি আপনাদের মধ্যে?
—” না!
—” তাহলে আপনার বুক পিঠে দাগ গুলো কিসের ছিল?
—” সেটা তোমার ছিল আগের রাত্রের দেওয়া। মনে নেই?
মায়া মাথা নাড়ালো ওর মনে আছে। রিদ ফের বলল..
—” তুমি যাকে আমার রুমে দেখেছিলে সে মূলত ডক্টর ছিল। সেদিন রাতে পার্টিতে আমাকে ড্রাগস সেবন করানো হয়েছিল তাই তোমাকে পার্টিতে ফেলে এসেছিলাম। কারণ আমি যদি সেদিন না চলে আসতাম তাহলে আরও বিপদ হতো তোমার জন্য।
এতটুকু বলেই রিদ থামে। কৌতূহলে মায়া চমকে চোখ উঁচিয়ে তাকাল রিদের দিকে…

—” আপনি আগে থেকে জানতেন ওরা আমাদের আঘাত করবে?
—” না!
—” তাহলে?
রিদ মায়া মাথাটা ফের নিজের বুকে চেপে ধরলো। আদুরে হাত মায়া মাথায় বুলিয়ে দিতে দিতে বলল..
—” তুমি আয়নের সাথে বাহিরে গিয়েছিলে সেটা আমি
জানতাম না। তাই তোমার খুঁজ করছিলাম সারা পার্টিতে। তখন অলরেডি আমি ড্রাগস সেবন করে পেলেছিলাম। কিন্তু তোমাকে হলরুমে কোথাও খুঁজে না পেয়ে আমি ভয় পেয়েছিলাম। খুঁজতে খুঁজতে একটা রুম ভিতর দুজন মানুষের অন্তরঙ্গ অবস্থায় আওয়াজ শুনতে পায়। এক মূহুর্তের জন্য আমি ভিষণ ভয় পেয়েছিলাম যখন রুমের ভিতর থেকে আয়ন আর তোমার গলার স্বর ভেসে আসে তখন। কিন্তু আমি তার সাথে সাথে বুঝতে পারি নকল করা গলার স্বরটা তোমার হলেও সেই ভয়েস রেকর্ডের মধ্যে যে সকল উত্তেজিত ভঙ্গিতে কথা গুলো ছিল তার কোনোটায় তুমি কখনোই বলতে পারো না। এমনকি রেকর্ডের অর্ধেক ইংলিশের অর্থ তুমি এখনো জানো না। তোমার সাথে আমি থাকি! তাই আমার ধারণা আছে উত্তেজিত অবস্থায় তুমি কতটুকু বলতে পারো। মূলত আমি তখনই শিওর হয়ে যায় রুমের ভিতর তুমি বা আয়ন কেউ নেই। পুরোটায় ফাঁদ! কিন্তু আমি এই ভেবে ভিষণ ভয় পেয়েছিলাম যে যদি সেদিন পার্টিতে ওদের প্ল্যানিং অনুযায়ী রুমের ভিতর তুমি আর আয়ন থাকতে তাহলে কি হতো? আমি কি করতাম? সবটা ভেবে এক মূহুর্তের জন্য থমকে গিয়েছিলাম। এজন্য জুইকে বাঁধা দিয়েছিলাম রুমের ভিতর না তাকাতে। পার্টি থেকে বের হতে হতে বুঝতে পেরেছিলাম আমার চারপাশে বেশ বড়সড় ষড়যন্ত্র জাল ফেলে হয়েছে। মূলত তাদের টার্গেট ছিল আমাকে দূর্বল করে এট্যাক করা।

যদি সেদিন আমি চলে না আসতাম বা তোমাকে সরাসরি প্রটেক্ট করার চেষ্টা করতাম তাহলে হয়তো এমনটায় হতো। আমি নিজেই ড্রাগসে দূর্বল হয়ে ছিলাম তোমাদের সবাইকে প্রটেক্ট করার ক্ষমতা আমার ছিল না। আয়নও আহত ছিল! তাই কৌশল অবলম্বন করে সেদিন তোমার সাথে বাজে ব্যবহার করি আর তাদের ধারণা দেয় তাদের প্ল্যানিং সফল হয়েছে। আমি এমনটা না করলে সবটা আসিফের উপর জোর যেত বেশি। দেখা যেত আসিফ বডিগার্ড দিয়ে সবাইকে হেফাজত করার চেষ্টা করলেও আমার পরিবারের মধ্যে থেকে কেউ না কেউ নিশ্চিত আঘাত পেত। হয়তো মারাও যেত যেটা আমি কখনোই চাই না। আর এসবের পিছনে বড় হাত ছিল আয়নের বাবা নাহিদ চৌধুরী। মূলত উনার সাথে আমার কিছু বিজনেস শত্রুতা ছিল বিদায় তোমাকে টার্গেট বানিয়ে আঘাত করতো আমাকে দূর্বল করতে। আমি উনার বিষয়টা অনেক আগেই ধরতে পেরেছিলাম! কিন্তু কিছু করতে পারেনি দাদাজানের জন্য। এই বিষয়ে দাদাজানও জানতো। কিন্তু ফুপ্পির কথা চিন্তা করে আমাকে সাময়িক সময়ের জন্য চুপ থাকতে হয়। সেদিন পার্টিতে ওদের মাইন্ড ডাইভার্ট করাটা জরুরি ছিল।

তাই তাদের প্ল্যান অনুযায়ী আমি চলি। অহেতুক তোমার উপর রাগারাগি করে চলে আসি। আর আসিফকে ফোন করে জানায় তোমাকে সেইফ রাখতে এবং সর্তক করতে বাকি বডিগার্ডও সিকিউরিটিদের। এর মাঝে নাহিদ চৌধুরী মনে করে ওরা ওদের কাজে সফল হয়েছে। যার জন্য আমার চলে যাওয়াতে তারা হামলা না করে তোমাকে নিরবে মারতে চায়। কিন্তু এতেও সফল হয়নি হঠাৎ আসিফের আগমনে ওরা এক মূহুর্তে জন্য ভয় পেয়ে জানের বাঁচাতে পালিয়ে যায় পাল্টা হামলা না করে। এখানেই আমি জিতে যায় তোমাকে সেইফ করতে। কিন্তু দ্বিতীয় ফাঁদটা হয় আমার রুমে। নেন্সিকা নামে বিদেশি মেয়েটা ছিল ডক্টর। আমার ওর সাথে দীর্ঘ সময়ের পরিচয়। বলতে গেলে আমার পারসোনাল ডক্টরদের মধ্যে একজন। বয়সে আমার থেকে সাত বছরের বড় ছিল। ফিটনেস আর সৌন্দর্যের কারণে তুমি নেন্সিকার বয়সটি ধরতে পারোনি। পার্টি থেকে উনার চেম্বারের গিয়ে আমি এন্টি ডোজের ইনজেকশন নেয় ড্রাগসের জন্য। ফিরার সময় নেন্সিকা আমাকে দূর্বল ভেবে বাসায় ড্রপ করতে আসে। কিন্তু আমার রুম অবধি এসে হয় আরেক ঝামেলা।

নাহিদ চৌধুরী দুজন লোক আমাকে বেহুশ অবস্থা মনে করে নেন্সিকাকেও ড্রাগসের ইনজেকশন পুস করে। এবং আমার রুমে শুইয়ে দিয়ে যায় সাথে হিডেন সিসি ক্যামেরা ফিট করে। ওরা মনে করে আমি হুসে নেই। কিন্তু আমি তখন পুরায় হুসে ছিলাম। আমার ড্রাগসের নেশাও কেটে উঠছিল ততক্ষণে। নাহিদ চৌধুরীর পাঠানো দুজন লোক ছিল খান বাড়ির দুজন সার্ভেন্ড। এজন্য মূলত সকালে তোমার সাথে বাজে আচরণটা করি। কারণ ক্যামেরা পিছনে নাহিদ চৌধুরী ছিল। আর আমি তাদেরকে পালিয়ে যেতে দিতে চাচ্ছিলাম না। কিন্তু তুমি আমার জন্য চারটা দিন ধৈর্য ধরতে পারোনি। সুইসাইড এটেম করলে। এখন আবার বাপের বাড়ি এসে বসে আছো আমাকে ঠেঙ্গিয়ে। আমি বিগত কয়েক দিন ধরে বাসায় পযন্ত যায়নি। আমার রাতে তোমাকে ছাড়া ঘুম আসে না। অনেকটা রাতের অঘুমা আমি রিত! তোমাকে ছাড়া আমার বাড়িতেও ভালো লাগে না।

কিচ্ছু ভালো লাগে না। অসয্য আর বিষাক্ত বিষ লাগে সবকিছু।
রিদ থামে। মায়া রিদকে জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে কেঁদে উঠে সবকিছু শুনে। ভুল বুঝাবুঝি কারণে আজ মায়া নিজের প্রথম সন্তানকে হারিয়েছে। এখন আবার রিদকেও কষ্ট দিচ্ছে অকারণে। মায়া পাপি! ভিষণ অপরাধী। গুমরে কেঁদে উঠে মায়া রিদের কাছে ক্ষমা চাইল। একবার! দুবার! বারবার! কিন্তু রিদ তৎক্ষনাৎ কিছু বললো না চুপ থেকে মায়ার মাথায় আদুরে হাত বুলাল। তার মাথায় এখন অন্য চিন্তা! তার বউ প্রেগনেন্ট হল কিভাবে? হসপিটালের বাচ্চার হঠাৎ সংবাদ পেয়ে সে প্রচুর শকট হয়েছিল! উত্তেজনায় জ্ঞানও হারিয়ে ছিল। কিন্তু নাই জিনিসের প্রতি রিদের বরাবরই মায়া খুব কম লাগে। মায়ার কনসিভ করা বিষয়টিও ঠিক তেমন ছিল। যখন শুনল মায়া কনসিভ করেছে তার সাথে সাথে মিসক্যারেজ বিষয়টিও সে শুনেছিল। তার মনে বাচ্চাটার জন্য ভালোবাসা জন্মানোর আগেই সেটা শেষ হয়ে যায়। সে বরাবরই শক্ত মনের মানুষ। জীবিত মানুষের প্রতিই তার মায়া-দয়া লাগে না। সেখানে অনিশ্চিত বাচ্চার জন্য কি কষ্ট পাবে? হ্যা বাচ্চাটা তার ছিল। সেই জন্য মনে কোথাও হয়তো কিছু খারাপ লাগা অনুভব হয়। হয়তো তার বউ কষ্ট পাচ্ছে বলে এজন্য। কিন্তু সব কথা মূল কথা হলো তার বউ প্রেগনেন্ট হলো কিভাবে? সেতো সর্তক ছিল এসব বিষয়ে। তাহলে কিভাবে কি করল তার বউ তার সাথে? নিশ্চয়ই কোনো কল-কাটি ঘুরিয়ে মিথ্যা বলেছে কোনো কিছু নিয়ে! কিন্তু সেটা কি?
কিছু একটা তো রিদ মিস করছে! যার জন্য তার বউ প্রেগনেন্ট হয়ে গেল কিন্তু সেটা কি? তীব্র কৌতুহল নিয়ে রিদ মায়ার মাথায় আদুরের হাত বুলাতে বুলাতে মিহি স্বরে ডাকল…

‘ রিত?
‘হুম!
‘ একটা কথা সত্যি করে বলবে?
‘ কি?
‘তুমি প্রেগন্যান্ট হলে কি করে? আমি তো সর্তক ছিলাম এসব বিষয়ে। যেদিন ভুল হয়েছিল সেদিন আমি নিজে তোমাকে মেডিসিন খাইয়ে ছিলাম তাহলে?
রিদের কথায় মায়া হাসফাস করলো চুরি ধরা পরা ভয়ে পেল। মায়া জানতো একদিন না একদিন রিদের সম্মোহনী এমন প্রশ্নের মুখমুখি হবে সে। মায়ার মেডিসিন না খাওয়ার সত্যিটা রিদকে বললে যে রাগারাগি করবে তাও মায়া জানে। তাই মায়া সত্যিটা রিদের কাছে চেপে গেল। রিদের বুকে মুখ লুকিয়ে মিথ্যা বলে বলল..

—” আমি কি জানি? মনে হয় মেডিসিনের এক্সপায়ার ডেট ছিল। সেজন্য কাজ করেনি।
মায়ার মনগড়া কথায় রিদ বিশ্বাস করলো না। অবিশ্বাস লাগল। রিদকে কেউ এক্সপায়ার ডেট মেডিসিন বিক্রি করবে? সেটাও সম্ভব? রিদ দ্বি-মনা করে আবার বিশ্বাসও করল। মেডিসিন গুলা রিদ নিজে গিয়ে কিনে আনেনি। হোটেলের স্টাফ দিয়ে আনিয়ে ছিল প্রথম রাতের পর। হয়তো সেই মেডিসিন গুলোর মধ্যে ঝামেলা ছিল বা এক্সপায়ার ডেট ছিল। তারজন্য গোলমিল হয়ে বউটা প্রেগন্যান্ট হয়ে গেল। এবার থেকে তাকে আরও সর্তক থাকতে হবে। এসব সেনসিটিভ বিষয়ের কাজ গুলো রিদ নিজে করবে এরপর থেকে। মনে খচখচ নিয়ে রিদ নিজের কথার সত্যায়িত যাচাই করতে মায়াকে নিজের বুক থেকে টেনে মুখোমুখি করে সন্দেহ গলায় বলে….

—” সত্যি তো তুমি কিছু করনি?
মায়া নাক টেনে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিয়ে বলে…
—” সত্যিই আমি কিছু করেনি! সব দোষ মেডিসিনেরই ছিল! আমি কিছু জানি না।
রিদ বিশ্বাস করল। মায়ার কপালে চুমু খেয়ে উঠে বসল মায়াকে নিয়ে। হাত বাড়িয়ে খাটের কোণায় ল্যামপের আলোয় জ্বালিয়ে মায়া দিকে তাকিয়ে বলল…
—” বারান্দায় দেখ একটা প্যাকেট আছে ঐটা নিয়ে আসো। যাও!
রিদের কথা অনুযায়ী মায়া গেল। বারান্দায় এক কোণায় একটা শপিং ব্যাগ পরে থাকতে দেখে সেটা উঠিয়ে হাতে নিল। রিদের কাছে যেতে যেতে দেখল ব্যাগের ভিতর রিদের একসেট কাপড় আর একটা ছোট প্যাকেট। সেটা কি মায়া জানে না। মায়া রুমে এসে দেখল রিদ ফ্লোরে পা নামিয়ে খাটের বসে আছে। মায়া এগিয়ে গিয়ে রিদের দিকে প্যাকেটটা দিতে দিতে বলল…

—” নেন!
রিদ মায়া থেকে সেটা হাতে নিল। প্যাকেটের ভিতর হাত ঢুকিয়ে কাপড়ের সাথে ছোট আরও একটি প্যাকেট ছিল সেটা হাতে নিল। শপিং ব্যাগটা পাশে রেখে কাগজ ছিঁড়ে সেখান থেকে পিল ট্যাবলেট বের করল। মায়া ঔষধটা দেখে চমকে উঠে। হাসফাস করে রিদের দিকে তাকাল। যদি মায়া ঔষধটা খেতে না করে তাহলে এই মূহুর্তে রুমের ভিতর আরও একবার তান্ডব ঘটে যাবে। মায়ার না করার মতো উপায় নাই। কিন্তু মায়া ঔষধটা খেতে চায় না। ওর আরও একটা বাবু চায়। ঔষধটা খেলে হবে না। মায়া কি করবে? কি করবে? ভেবে মায়া হাতের আঙ্গুলে ওড়না পেঁচাতে লাগল। রিদ প্যাকেট থেকে ঔষধ ছাড়িয়ে মায়ার হাত টেনে নিজের পাশে বসাল। রিদ পানির খুঁজ করতেই মায়া আঙ্গুল দিয়ে ড্রেসিংটেবিলের উপর রাখা পানির জগটা দেখিয়ে দিতেই রিদ সেদিকে এগিয়ে গেল। জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে পুনরায় মায়ার কাছে ফিরে আসল। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মায়ার হাতে মেডিসিন আর পানির গ্লাসটা তুলে দিল খাওয়ার জন্য। মায়া দুটো জিনিস দু’হাতে নিয়ে রিদের দিকে তাকাল অসহায় দৃষ্টিতে। রিদ শান্ত স্বরে বলল…
—” খাও! এবার আর ভুল হবে না। এই মেডিসিন গুলোরও এক্সপায়ার ডেট আছে। আমি নিজে গিয়ে চেক করে এনেছি তোমার জন্য। এবার খাও।

মায়া ভয়ার্ত ভঙ্গিতে হাসফাস করে রিদের সামনে পিল ট্যাবলেটটা মুখে নিল। গ্লাসের পানি মুখে নিয়ে সেটা খেয়ে নিতেই রিদ অবিশ্বাসে মায়াকে বলল ‘ খা করতে! মায়া সত্যি ঔষধটা খেয়েছে কিনা দেখতে। মায়া দুই ঠোঁট ফেরে হা করে রিদকে দেখাল। রিদ দেখল। সন্তুষ্টটি হয়ে মায়ার হাত থেকে পানির গ্লাসটা নিয়ে জায়গায় রাখতে গেলে মায়া সেই ফাঁকে জলদি করে গালের ভিতর থেকে ঔষধটা বের করে নিল। এবং রিদের ফিরে আসার আগে আগে খাটের নিচে সেটা ডিল মেরে ফেলে দিল। মায়ার সত্যি বেবি চায়। একটা না অনেক গুলা চায়। আর তার জন্য মায়ার যা করা লাগে করবে। তারপরও রিদকে পরিবারে সাথে বাঁধতে চায়। রিদ সন্তুষ্টিতে গ্লাস রেখে মায়ার পাশে বসতে বসতে বলল…

—” রুমের ওয়াশরুমটা কই?
মায়া ডাগর ডাগর চোখ তুলে অবুঝ দৃষ্টিতে তাকাল রিদের দিকে। রিদ মায়ার অবুঝ অসহায় দৃষ্টি দেখে চেতে উঠে বলে…
—” ডোন্ট টেল মি রিত! কি এই রুমে ওয়াশরুম নেই। তাহলে আমি তোমাকে ছাঁদ থেকে নিচে ফেলে দিব কিন্তু?
মায়া হাসফাস করে বলে…
—” ওয়াশরুম আছে তো! কিন্তু মেয়েলি ওয়াশরুমে অনেক কিছু থাকে এক্সট্রা। আপনি বসুন আমি সবকিছু সরিয়ে দিচ্ছি।
—” তার দরকার নেই। তোমাকে নতুন দেখছিনা আমি। বিগত তিন বছর ধরে তোমার এই মেয়েলি জিনিসপত্র দেখতে দেখতে অভ্যস্ত আমি। কতোবার যে তুমি আমার সামনে কাপড় চেঞ্জ করেছ তার হিসাব করা দায়। তাই ওয়াশরুমের সবকিছু হজম করতে পারব আমি।
রিদের কথায় মায়া চমকে উঠে বলে…
—” মানে?
রিদ উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল…

—” এতো কিছু শুনে তুমি কি করবা? আমি বললে তোমার হজম হবে না। উল্টো আমাকে খারাপ ভাববে।
রিদের সাথে সাথে মায়াও উঠে দাঁড়াল। অধৈর্যের গলায় বলল…
—” না খারাপ ভাববো না। আপনি বলুন। আমি শুনবো।
রিদ ঠোঁট কামড়িয়ে দুষ্ট হেঁসে চুলে হাত চালিয়ে সেট করতে করতে বলল…
—” তোমার খান বাড়িতে আসার পর আমি তোমার রুমে হিডেন ক্যামেরা সেড করে রেখেছিলাম। দূরে থেকেও আমি সবসময় তোমাকে নজরে রাখতাম। দিন আমার ব্যস্ততায় কাটলেও রাতটা চলতো না তোমাকে না দেখে। মন অচলে সারাদিনের ফুটেজ দেখতাম বসে বসে। সেখানে তুমি রুমের ভিতর যা করতে সবকিছুই দেখতাম। এমনকি তোমার অসংখ্য বার কাপড় চেঞ্জ করা, পুনরায় পড়া সবটায় সেই ফুটেজে থাকতো! এবার মাঝে মধ্যে তোমার টাওয়াল খুলে যাওয়ার বিষয়টাও থাকতো! আমি তোমা…
রিদের কথা শেষ করার আগেই মায়া হামলে পড়ল রিদের উপর। লজ্জায় আষ্টশ হয়ে রিদের বুকে ধাক্কা দিতে দিতে বলল…

—” ছিঃ আপনি এতো খারাপ? বাজে লোক! সবসময় আমার সাথে এমন করেন কেন?
রিদ শব্দ করে হেঁসে উঠে মায়ার দুহাত আটকিয়ে নিজের উম্মুক্ত বুকে চেপে ধরতে ধরতে বলে…
—” এজন্যই বলতে চায়নি। আমি বাজে হলাম কিভাবে? পর নারীকে দেখছিলাম নাকি? বাল্যকালের বউ ছিলে তুমি আমার। হুট করে তোমার বড় হয়ে যাওয়াতে টেনশনে থাকতাম অন্য ছেলের সাথে মিশে না যাও। এজন্য সবসময় কর্ড়া নজরে রাখতাম। কোনো ছেলেকে তোমার আশেপাশে ভিড়তে দিতাম না। তোমার সবকিছু আমার হাতেই থাকতো। কতটা কার সাথে মিশবে সেটা নিয়ে। বাকি রইল তোমার রুমের বিষয়টি। তাহলে বলল তুমি ওয়াশরুমে কাপড় চেঞ্জ না করে রুমে করলে এখানে আমার কি দোষ? আমিতো দেখার জিনিসই দেখছি তাই না? আমাদের বিয়ে না হলে হয়তো এমনটা করতাম না। লিমিটে থাকতাম। কিন্তু বিবাহিত বউ ছিলে বলে লিমিটে ছিল না! বিন্দাস দেখছি সবকিছু!
মায়া লজ্জায় আষ্টশ হয়ে মিইয়ে গেল। ছিঃ! এসব যদি মায়া পূর্ব থেকে জানতো তাহলে কখনোই রুমে ড্রেস চেঞ্জ করতো না। মায়া লজ্জা সিঁটিয়ে গিয়ে রিদের বুকে ধাক্কা দিয়ে নিজেকে সরিয়ে নিতে চেয়ে বলল…

—” ছিঃ আপনি এতো খারাপ।
রিদ বাঁধা দিল। মায়াকে নিজের বুকে জড়িয়ে নিয়েই বলল…
—” হ্যাঁ আমি এতোই খারাপ! বলেছিলাম হজম হবে না তোমার। যাও এবার গোসল করে রেডি হও। আমরা এখন বের হলো। গাড়ি নিচে দাঁড়িয়ে আছে। যাও।
চমকে রিদের বুকে থেকে মুখ উঠিয়ে বলল…
—” এখন?
—” হ্যাঁ!
মায়া হাসফাস করে বলল…
—” আব্বু মানবে নাতো।
—” আমার বউ আমি নিয়ে যাব। তোমার বাপকে কেন জিগ্যেসা করতে যাব?
—” আব্বু কষ্ট পাবে তো!
—” মানে আমি কষ্ট পেলে তোমার চলবে?
—‘ আমি এমনটা বলেনি তো!

—” তাহলে বিনা শব্দ করে চুপচাপ চলো আমার সাথে। আজকে তুমি আমার সাথে না গেলে আমি চিরজীবনের জন্য দেশ ছেড়ে চলে যাব। আর আসবো না তোমার কাছে। বারবার এই মনমালিন্যতা ভালো লাগছে না আমার।
মায়া ভয়ার্ত মুখে চুপ থাকল। মাথা নাড়িয়ে রিদকে সম্মতি দিয়ে বলল ‘ সে রিদের সাথে যাবে। রিদ সন্তুষ্টি হলো। মায়াকে বলল গোসল করতে। মায়া গেল। সময় নিয়ে গোসল করে মাথায় তাওয়াল বেঁধে বের হয়ে রিদের কাপড় গুছিয়ে দিল। রিদক গোসলে পাঠিয়ে মায়া ততক্ষণে রিদের জন্য একটা ব্ল্যাক কফি করে আনল! আসার সময় হাতে শফিকুল ইসলামের একটা লুঙ্গি নিয়েও আসল। মায়া রিদকে কখনো লুঙ্গি পড়তে দেখেনি। এমনকি শট, হাফ প্যান্টও না। মায়া ইচ্ছা রিদ এই লুঙ্গিটা পড়ুক। অন্তত একটা বারের জন্য হলেও পড়ুক। মায়া দেখবে লুঙ্গিতে কেমন দেখায় রিদকে। দুষ্টুমি বুদ্ধিতে মায়া হাতের কফিটা খাটের পাশে ছোট টেবিলে উপর রেখে শপিং ব্যাগের ভিতর রিদের কাপড় গুলো কম্বলের নিচে লুকিয়ে ফেলে হাতের লুঙ্গিটা বিছানার উপর রাখতে রাখতে রিদ ওয়াশরুম থেকে বের হলো কমড়ে সাদা টাওয়াল বেঁধে। মায়া সেদিকে তাকাল। রিদ এগিয়ে এসে নিজের কাপড় খুঁজ করতেই মায়া শফিকুল ইসলামের লুঙ্গিটা হাত বাড়িয়ে এগিয়ে দিল। রিদ সেটা হাতে নিল না। বরং কপাল কুঁচকে লুঙ্গিটা দেখে মায়াকে বলল…

—” এটা কি?
—” লুঙ্গি আপানার জন্য! নিন পড়ুন এটা।
—” এসব আমি পড়িনা। যাও! আমার কাপড় নিয়ে আসো!
মায়া বেঁকে বসে বলল…
—” একটা বার পড়ুন না প্লিজ! আমি দেখি! পড়ুন না!
—” নো!
রিদ বিছানার আশেপাশে নিজের কাপড়ের খুজ করে না পেয়ে বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে এলো আরও। মায়া রিদের হাত টেনে রিদকে নিজের মুখোমুখি করে লুঙ্গিটা হাতে তুলে দিতে দিতে বলে…
—” এমন করছেন কেন? একটা বার পড়লে কি এমন হয় লুঙ্গিটা! সবাই তো পড়ে।
—” সবাই যা করে আমি তা করি না। আবার আমি যা করি সবাই তা করে না। সাধারণ মানুষ গুন্ডামি করে না কিন্তু সেটা আমি করি। সো ডোন্ট এক্সাম্পল আদার্স পারসন! আমি এসব কাপড় পড়তে জানি না। কখনো পড়েনি। তাই নিয়ে যাও এটা! আমার কাপড় বের করো।
অসন্তুষ্টে মায়া অনড় দাঁড়িয়ে রইল। সে রিদকে লুঙ্গি পড়াবেই। রিদের বিরক্তিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠল। বার কয়েক মায়াকে ধমক লাগাল। কিন্তু মায়া লুঙ্গি হাতে দায় দাঁড়িয়ে থাকল। না রিদের কাপড় ফিরত দিচ্ছে আর না নড়ছে। রিদ অতিষ্ঠ হয়ে লুঙ্গিটা হাতে নিল। উল্টিয়ে পাল্টিয়ে কাপড় দেখে বলল..

—” এটা কিভাবে পড়ে? আমি জানিনা এসব পড়তে!
রিদের কথায় মায়া খুশি হয়ে তাড়াহুড়োয় বলল…
—” এটা মাথা ঢুকিয়ে পড়ে নিলে হবে।
রিদ বিরক্তি ভঙ্গিতে সেটা মাথা ঢুকিয়ে উল্টো পড়ে নিল টাওয়ালের উপর দিয়ে। এতো বড় কাপড় কি করে পড়বে সেটা ভেবে না পেয়ে বারবার এটা নড়েচড়ে দেখতে লাগল। তারপরও লুঙ্গিটার গুছাতে পারছে না। সে ছোট থেকেই বিদেশের মাটিতে বড় হয়েছে বাবা-মার সাথে। এমনকি মায়াকে বিয়ে করার সময়ও বিদেশ থেকে দেশে এসেছিল নিজের পরিবারের সাথে। হেনা খান আরাফ খানকে নিয়ে তখনো বাংলাদেশের থাকতো। তাছাড়া তার পরিবারের কোনো পুরুষকে এসব পড়তে দেখেনি সে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে পড়তে দেখেছে। কিন্তু তার কখনোই পড়া হয়নি। এখন বউয়ের প্যারায় পড়ে কতো কিছু না নতুন নতুন করতে হচ্ছে তাঁকে। রিদের এলোমেলো লুঙ্গি গুছানোর চেষ্টাতে মায়া হেসে উঠল। রিদ চোখ তুলে তাকাল মায়া সুন্দর হাসির দিকে। রিদ হয়তো মায়ার এই হাসিটাকে বিগত কয়েক দিন মিস করছিল। বড্ড মিস করছিল বউয়ের আবোল তাবোল পাগলামি গুলোকে। আজ যেন রিদের অস্থির মনটা শান্ত হল। মায়ার বিগত দিনের জেদ গুলো মোটেও পছন্দ হয়নি তার। তার বউ কমল! তাঁকে কমল আচরণেই মানায়। শুধু শুধু জেদ কেন করবে?
রিদ লুঙ্গিটা পড়ল না। সেটা খুলে বিছানায় ফেলে মায়ার নাক টেনে নিজের কাছে আনতে আনতে আদুরে গলায় বলল…

—” এতো জেদ কোথায় থেকে আসে এতো ছোট শরীরে হ্যা?
মায়া নাক ঘষতে ঘষতে হেঁসে রিদকে বলে…
—” আপনার থেকে শিখেছি!
রিদ মায়ার কপালে টুকা মারতে মারতে বলে…
—” আমি তোমাকে রাগ শেখায়? আর কিছু শেখতে পারো না? এতো আদুর করি! সেগুলো শিখতে পারো না। কই একদিন তো আমাকে আদুর করতে দেখি না।
—” ছিঃ সবসময় বাজে কথা কেন বলেন আপনি। ভালো কথা বলতে জানেন না।
—” বউ দেখলে মাথা ঠিক থাকে না তাই এর থেকে ভালো কথা মুখ থেকে বের হয়না আমার। এরপর থেকে এমন আলাদা হওয়ার জেদ করো না বউ কেমন।

দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২ পর্ব ৮১

মায়া মাথা নাড়ালো। দু’হাতে রিদের পেট জড়িয়ে বুকে পরম শান্তিতে মাথা রাখল। মায়া জান রিদ। মায়া নিজেও অপদস্তক নিজের জীবনের আগ্রত একটার পর একটা বিপদের সম্মোহনী হতে হতে। মায়া আর ঝামেলা চায় না। তবে বিগত কয়েক দিনের পরিস্থিতি থেকে মায়া যেটা শিক্ষা পেল সেটা হলো। আর যায় হোক না কেন জীবনে কখনো রিদকে ভুল বুঝে দূরে সরে যাবে না সে। বরং যতকিছুই হোকনা কেন মায়া রিদের সাথেই থাকবে। মায়া ভালোবাসে তো ওর মিস্টার ভিলেনকে। অনেক ভালোবাসে।

দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২ পর্ব ৮২