নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ২৯
নাজনীন নেছা নাবিলা
নীলা আর ইকরা মিলে সবকিছুর গোছগাছ করছে। ইউনিভার্সিটি থেকে এসেই চটজলদি গোসল করে,খাবার খেয়ে ক্লাসের হোমওয়ার্ক শেষ করে ফেলেছে।তাও বিকাল ৩ টার উপর বেজে গিয়েছে।চালের গুঁড়া একটি বড় বক্সে ভরলো। বড় দুটি বোতলে পানি নিল। হাতের গ্লাভস, মাস্ক নিল। ওয়ান টাইম প্লেট নিল।
নীলা আগে থেকেই ক্যাব বুক করে রেখেছিল।এখন একে একে সব কিছু আ্যপার্টমেন্ট থেকে বের করছে।লিফট দিয়ে নিচে নেমে সব কিছু গেটের সামনে নিতেই ক্যাব চলে এলো।নীলা এবং ইকরা সুন্দর করে সবকিছু গাড়িতে তুলল। তারপর দুইজন উঠো পরলো গাড়িতে।
মিহাল অনেকক্ষন যাবৎ আইফেল টাওয়ারের ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে আছে।আজ সুন্দর করে তৈরি হয়ে এসেছে।তার পরনের ধবধবে সাদা শার্ট আর নিখুঁতভাবে ইস্ত্রি করা কালো প্যান্ট যেন এক আভিজাত্যের প্রতিচ্ছবি। গলার টাইটি একদম সঠিল মাপে বাঁধা, যা তার ব্যক্তিত্বে যোগ করেছে বাড়তি গাম্ভীর্য। পায়ের পালিশ করা চামড়ার জুতোর শব্দে আশেপাশে এক দৃঢ় উপস্থিতির জানান দিচ্ছে।মিহাল বার বার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় দেখে নিচ্ছে। এমনিতে ইউনিভার্সিটি থেকে এসে সে এই সময়ে রেস্ট নেয় কিন্তু আজকে আর তা করল না। সময়ের আগেই উপস্থিত হলো যেখানে নীলার আসার কথা ছিল। কিন্তু তাড়াহুড়োতে সে ভর্তার বক্স আনতেই ভুলে গিয়েছে।মুনভিও ততক্ষণে চলে এসেছে।মিহাল কে উপস্থিত দেখেই সে বাঁকা হেসে মনে মনে বলল ____
আহা বন্ধু আমার খুব জোড়ে প্রেমে পরেছে তাই তো উঠে দাঁড়াতে পারছে না।হুমমমম
মিহাল নিজের কাঁধের উপর কারোর হাতের স্পর্শ পেতে বুঝে ফেলল এটি মুভি। সে পেছনে না ফেরেই বলতে শুরু করল____
কষ্ট করে তুই এখানে এলি কেন? আমি তো এসেছিলাম তাই না? আমিই তো ম্যানেজ করে ফেলতাম। তুই হসপিটালে নিজের রোগীদের সাথে থাকতি।
মুনভি বাঁকা হেসে পাশে এসে দাঁড়ালো এবং পকেটে হাত গুঁজে বলতে লাগলো____
আমি তোর জন্য বরং নীলার জন্য এসেছি।
মিহালের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।সে অধিকার দেখিয়ে বলল____
নীলার কথা মস্তিষ্কে কিংবা হৃদয়ে আনবি না। নীলা কেবল আমার।
মুনভি আরেক দফা বাঁকা হেসে নিল। এবার মিহালের দিকে ঘুরে জিজ্ঞেস করল___
কিন্তু নীলা একজন বিবাহিত মেয়ে আর তাছাড়াও তো তুই তাকে ব্যবহার করে ইরফানের কাছে পৌঁছাতে চেয়েছিল। তোর কি মনে হচ্ছে না তুই এই মেয়েটির জন্য নিজের লক্ষ্য থেকে সরে যাচ্ছিস? আমি তো তোর ভালোই করছি। একজন বিবাহিত মেয়েকে ভালবাসতে তোর লজ্জা করল না? নীলা ছাড়া আরও কত মেয়ে আছে। তাদের মধ্যে কোন একজনকে তুই বেছে নে। নীলাকে শুধু ব্যবহার করে নিজের শত্রু পর্যন্ত এগিয়ে যা তাহলেই তো হয় নাকি? শুধু শুধু মেয়েটির পেছনে পড়ে থেকে নিজের লক্ষ্য ভেদ করবি না।
মিহাল কিছুক্ষণ কোন কথা না বলে নীরব থাকলো। তারপর হঠাৎ বলে উঠলো____
তুই কখনো কাউকে ভালোবেসেছিস মুনভি? একদম মন থেকে ভালোবেসেছিস যেখানে মিথ্যের ছিটে ফোঁটা নেই?
মিহালের কথা শুনে মুনভি চোখ বন্ধ করল। চোখ বন্ধ করতেই ইকরার চেহারা ভেসে উঠলো। তার বুকে ধুক ধুকানি শুরু হলো। সঙ্গে সঙ্গে চোখ খুলে ফেলল।
মিহাল আবার বলতে লাগলো ____
নীলা কে যখন আমি প্রথমবার দেখেছিলাম তখন আমার বয়স নয় কি দশ বছর হবে।আমার নীলাঞ্জনা নিতান্তই একটি শিশু ছিল। তখন আর যাই হোক তার প্রতি কোনো ভালোবাসা তৈরি হবার কথা নয়।আর তৈরি হয়ওনি।সেদিন যখন আমরা বাংলাদেশে গিয়েছিলাম এবং নীলা কে আমি অনেক কোলে নিয়েছিলাম তখন বেশ ভালো লেগেছিল।নানা ভাই নাকি মৃত্যুর আগে নানু কে বলে গিয়েছিল আমার মা কখনো ফিরে আসলে যেন তাকে আপন করে না নেয় কেউ তাই নানু সেইদিন যখন জানতে পারলো আমরা এসেছি তখনি মামাদের দিয়ে আমাদের কে চলে যেত বলল। তখন আমার খুব ইচ্ছে করছিল ছোট্ট নীলাঞ্জনা কে আমার সাথে করে নিয়ে আসতে। কিন্তু তা আমি পারিনি তাই ভীষণ রাগ হয়েছিল আমার। কিন্তু এখানে আসার পর সময়ে সাথে সাথে সেই রাগ গলে জল হয়ে যায়। ধীরে ধীরে সবকিছু বদলাতে থাকে, আমি বড় হতে থাকি কিন্তু কেন জানি না নীলাঞ্জনা কে ভুলতে পারিনা।তুই তো জানিসই সব আমি তখন তার নামও জানতাম না। ছোট্ট শিশুটি নীল রঙের টাওয়াল পরাছিল এবং মা বলতো তার নাম নিশ্চয়ই নিলয় মামার নামের সাথে মিলিয়ে রাখা হয়েছে তাই নিজের অজান্তেই তার নাম নীলাঞ্জনা রেখে দিয়েছিলাম। এটাকে আমি ভালোবাসা বলবো না কিন্তু হ্যাঁ আত্মার টান বলা যায়।
তারপর যখন নীলার সাথে আমার ঝগড়া হলো ক্যান্টিনে তখন মেয়েটির চোখ জোড়া আমাকে খুব টানছিল তাই তো মেয়েটিকে পছন্দ না করা সত্ত্বেও বাড়ি গিয়ে মেয়েটির চোখের ছবি এঁকেছিলাম।তারপর যখন জানতে পারলাম মেয়েটি আর কেউই না বরং আমার নীলাঞ্জনা তখন যেন দুনিয়ার সকল খুশি আমার পায়ের কাছে এসে পরলো। মনে হলো হাত দিয়ে যত ইচ্ছে তত কুড়িয়ে নিব। আল্লাহর দেওয়া যেন এক বিশেষ নিয়ামত।এর পর কখন, কিভাবে, কি করে যে আমি নীলাঞ্জনা কে ভালোবেসে ফেলেছি তা আমি নিজেও জানিনা। কিন্তু শুধু এতটুকু জানি নীলাঞ্জনা কেবল আমার। যেকোন ভাবেই হোক তাকে আমি আমার করব। হয়তো আল্লাহ ও এইটা চায়।আর তুই নিজেও জানিস ইরফান ছেলেটা খুব বাজে।তার কাছে আমার নীলাঞ্জনা কখনোই ভালো থাকবে না। আর কেন জানিনা আমার মন বলছে ইরফান আমার নীলাঞ্জনা কে অনেক বাজে ভাবে আঘাত করেছে। নীলাঞ্জনার চোখ দেখে আমি বুঝতে পারি, নীলাঞ্জনা কাছের কারো দ্বারা খুব বেশি ব্যথা পেয়েছে। তাই আমি আর আমার নীলাঞ্জনা কে কোন রকমের কষ্ট দিতে পারবো না। ওকে তো আমি মাথায় না না কলিজার ভেতর ঢুকিয়ে রাখবো। এই নিষ্ঠুর পৃথিবী থেকে অনেক দূরে রাখবো।
কথাগুলো বলেই মিহাল থামলো।মুনভি অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখেছে মিহাল কে।অবাক না হয়ে যাবে কোথায়? ইকরা মুনভি কে বলেছিল নীলার সম্পূর্ন ঘটনা।যে নীলার বেস্ট ফ্রেন্ডের সাথে মিলে ইরফান কতটা বাজে ভাবে নীলা কে ঠকিয়েছে। কিন্তু সে এইটা দেখে অবাক হচ্ছে মিহাল সত্যটা না জেনেও নীলার প্রতি কতটা কেয়ারিং, পজেসিভ, এবং কতটা থর্টফুল।
নীলার চোখ পানি চলে এলো কিন্তু চোখ থেকে গড়িয়ে গাল বেয়ে পরার আগেই নীলা চোখের পানি হাতে আঙুলে সাহায্য মুছে ফেলল।মুনভি যখন মিহালকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো তখনই নীলা কে বল করে বলেছিল___
তোমার পেয়ারে লাল তোমার অপেক্ষায় আছে। তাকে জ্বালিয়ে দেখি সে কি বলে।তুমি ফোন মিউট করে রাখো।
নীলাও তাই করল।নীলা এবং ইকরা দুজন মিলে ফোনের স্পিকার অন করে মিহাল এতক্ষণ যা যা বলেছি সবটা শুনতে পেলো তারা। ইকরা বেশ খুশি হয়েছে কারণ অবশেষে তার প্রাণ প্রিয় বান্ধবীর জন্য আল্লাহ এমন কাউকে পাঠিয়েছে যে নীলা কে মন প্রাণ দিয়ে ভালবাসবে। যার ভালবাসায় কোনো কমতি থাকবে না।
আর নীলা? সে তো ভাষাহীন। বলার কিংবা ভাবার মতোন কিছুই খুঁজে পাচ্ছে না।মিহালের ভালোবাসা থেকে সে যতটা পালাতে চাচ্ছে মিহালের ভালোবাসা যেন ঠিক ততটাই তাকে চুম্বকের মতো নিকটে টানছে।নীলাকে যেন এক অদৃশ্য মায়া জ্বালে বন্দি করছে।
নীলা আর ইকরার হুঁশ ফিরল মিহালের বলা পরবর্তী কথা শুনে।মিহাল দাঁতে দাঁত পিষে বলল___
বুঝি না আমি নীলাঞ্জনার মতো এতটা ইন্টেলিজেন্ট, কিউট, বিউটিফুল ওমেন, স্মার্ট ওমেন কি করে ইরফানের মতোন ইঁদুর, গাঁধা, রাম ছাগল, গরু, অসভ্য,লুচু বেডাকে পছন্দ করল। মানে জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার আগে কি এই মেয়ে বুদ্ধি লোপ পেয়েছিল?
ইকরা হেসে উঠলো। নীলা ইকরার দিকে তাকিয়ে বলল___
উনি আমাকে কমপ্লিমেন্ট দিলেন নাকি ইনসাল্ট করলেন কিছুই বুঝতে পারলাম না।
আইফেল টাওয়ারের সেই বিশালাকায় লৌহমানবী তখন বিকেলের কনে দেখা আলোয় গা ভিজিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সূর্যের তেজ তখন অনেকটাই ম্লান, আকাশজুড়ে আবির আর হলুদের মাখামাখি। ঠিক সেই মুহূর্তে একটি কালো রঙের সেডান গাড়ি এসে থামল টাওয়ারের পাদদেশে।গাড়ির কাচে বিকেলের তীর্যক রোদ এসে পড়তেই এক অদ্ভুত আলোর নাচন শুরু হলো। কাচের প্রতিফলনে চারপাশের ব্যস্ত শহরটা যেন এক মায়াবী ঝিলিক দিয়ে উঠল। গাড়ির ভেতর থেকে তখনো কিছু দেখা যাচ্ছিল না, শুধু রোদের তীব্রতায় কাচটা হিরের মতো চকচক করছিল।ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে মিহাল এবং মুনভি অনেকক্ষণ ধরেই অপেক্ষায় ছিল। মিহাল এবং মুনভির দৃষ্টি আটকে পরলো ঠিক সেই গাড়িটির ওপর। ঠিক তখনই গাড়ির দরজা খুলল। ভেতর থেকে বেরিয়ে এল নীলা এবং ইকরা। দরজা খুলতেই বিকেলের সেই নরম রোদ সরাসরি আছড়ে পড়ল তাদের মুখে।
সেতুর ওপর থেকে মিহাল এবং মুনভির মনে হলো, সময় যেন আচমকা থমকে গেছে। নীলার মুখে রোদের আভা পড়ে এক অদ্ভুত স্বর্গীয় লাবণ্য তৈরি করেছে।ওই অতটা দূর থেকেও মিহাল স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল নীলার চোখের পাতায় বিকেলের সোনালী ছায়া। মনে হচ্ছিল, যেন কোনো এক দক্ষ শিল্পী বহু যত্ন করে এই দৃশ্যটি এঁকেছেন। অন্যদিকে মুনভিরও একই অবস্থা। দুই বন্ধু সুর সুরিয়ে নিচে নেমে এলো।নীলা আর ইকরা মিলে সব কি গাড়ি থেকে একে একে সবকিছু বের করলো।গাড়ি ভাড়া মিটিয়ে পেছনে ফিরতেই দেখলো টাওয়ারের মতোন দাঁড়িয়ে আছে মিহাল এবং মুনভি। নীলা মুনভি কে সালাম দিয়ে কুশল বিনিময় করল। তারপর মুনভি চলে গেলো তার কটন ক্যান্ডির কাছে।নীলা মিহাল কে দেখে সালাম দিল।মিহাল সালামের উত্তর দিল।এইবার মিহাল এক আকাশ সমান আশা নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল যে নীলা তাকেও তার হাল অবস্থা জিজ্ঞেস করবে। কিন্তু মিহালের আশায় এক বালতি পানি ঢেলে নীলা সরাসরি নিজের দুই হাত মিহালের সামনে বাড়িয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল___
আমার ভর্তা কোথায়?
মিহাল যেন আকাশ থেকে পরল। মনে মনে বলল ___
কিসের মধ্যে কি পান্তা ভাতে ঘি।
কথাটি সে তার মার কাছ থেকে শুনেছে।
এইবার ইকরা এবং মুনভিও মিহালের দিকে তাকালো।নীলা আবার হাত নাড়িয়ে বলল____
এইযে আমার ভর্তা কোথায় তাড়াতাড়ি দিন।
মিহাল নড়েচড়ে উঠল। নীলার দিকে তাকানোর সাহস পর্যন্ত পেলো না।ভয়ে এবং নার্ভাসনেসে সে নিজের শার্টের এবং প্যান্টের পকেটে কিছু একটা খুঁজতে লাগলো।নীলা, ইকরা এবং মুনভির যা বোঝার বুঝা হয়ে গেল।ইকরা এবং মুনভি কপালে হাত চাপড়ালো।নীলা নিজের দুই হাত ভাঁজ করে মিহালের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল____
ভর্তার বক্স কি আপনার প্যান্টের পকেটে নাকি শার্টের পকেটে? আর খুঁজে পেলেন কি নিজের পকেটের মাঝে? নাকি টর্চ লাইট জ্বালিয়ে দিতে হবে? বলুন বলুন আমি করছি। আপনার জন্য এতটুকু করাই যায়।
মিহালের হাত থেমে গেল।সে অনেক সাহস নিয়ে নীলার দিকে তাকালো। নীলার চোখে চোখ পড়তেই সে শুকনো ঢোঁক গিলল। কিন্তু তবুও নিজের ভাব বজায় রাখতে বলে উঠলো ___
কেন ভুলে যাও আইম ইউর প্রফেসর। নিজের কাজ নিজে করবে। ভর্তা তোমার প্রয়োজন তাই তুমি নিজে নিয়ে আসবে।
নীলা বাঁকা হাসলো এবং মনে মনে বলল _____
পেয়ারে লাল কত ঢং দেখাবেন? বললেই হতো ভুলে গিয়েছি তা নয় বরং নিজের ইগো আগে।সব কমে গেলেও ভাব কমা যাবে না। একদিন এমন নাকানিচোবানি খাওয়াবো না আপনাকে ভাব একদম ছুটে যাবে।
মুনভি মনে মনে বলছে____
তোর ইগো এত সহজে হার মানে না মিহাল।তাই হয়তো আমাদের বন্ধুত্বের মাঝে আজ দেওয়াল তৈরি হয়েছে। কিন্তু তোর নীলাঞ্জনা হলো জলন্ত আগুন সে তার তাপ দিয়েই তোর ইগো কে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিবে।তখন তোর চেয়ে খুশি এবং ভাগ্যবান আর কেউ হবে না।
নীলা আর বেশি কিছু না ভেবে রাজি হয়ে গেল মিহালের বাড়ি গিয়ে ভর্তা আনতে।এতে করে সে তার ফুপি কেও দেখতে পাবে।এক ঢিলে দুই পাখি মারা যাকে বলে।নীলার রাজি হবার কারণ ইকরা এবং মুনভি ঠিকই বুঝতে পারলো।মিহালও মনে মনে খুশি হলো।এতে করে সে নীলার সাথে অনেকটা কাছাকাছি সময় কাটাতে পারবে আবার মায়ের সাথে নীলার দেখাও করিয়ে দিতে পারবে।তাই সে উৎসাহিত হয়ে বলল___
তাহলে চলো সবাই।
তখনই নীলা বাঁধা দিয়ে বলল___
সবাই মিলে চলে গেলে আমার এইসব জিনিস কে দেখবে?
সবার কপালে চিন্তার ভাঁজ পরলো শুধু ভিসার বাদে।সে শার্টের পকেট থেকে চশমা বের করে বলল____
মিহাল খান যেখানে সমস্যা নাই সেখানে।
নীলা মুখ বাঁকিয়ে বলল___
হ্যাঁ তাই তো ভর্তার বক্স বাড়িতে ভুলে রেখে এসে শার্ট এবং প্যান্টের পকেটে খোঁজা হচ্ছিল।
মিহালের মুখ সঙ্গে সঙ্গে চুপসে গেল।ইকরা এবং মুনভি মিট মিট করে হাসতে লাগলো।মিহাল পাশের কফি শপ থেকে একটা ছেলে কে ডাক দিল। এবং ফরাসি ভাষায় তাকে সব কিছু বুঝিয়ে দিল। তারপর নীলার দিকে তাকিয়ে বলল___
চলো।
নীলাও আর কথা বাড়ালো না।মিহালের পাশে এসে হাঁটতে লাগলো।পেছন কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে ইকরা এবং মুনভি হাঁটছে।নীলা মিহাল কে জিজ্ঞেস করল___
ছেলেটি কে?
মিহাল স্বাভাবিক ভাবেই বলল___
ও আমার মুনাসশাডোর দেখাশোনা করে।
নীলা ধীর কন্ঠে বলল___
মুনাসশাডো কি আপনার বাচ্চা নাকি?
কিন্তু মিহাল তার ধীর কন্ঠে বলা কথাটি শুনে ফেলল। কিন্তু শুনে কোনো প্রতিক্রিয়া করার বদলে অন্যমনস্ক হয়ে বলে ফেলল ___
বাচ্চা তো তোমাকে বিয়ে করার পরে হবে।
নীলার পা থেমে গেল।সে আবাক হয়ে মিহালের দিকে তাকিয়ে বলল___
কী!!!!!
মিহাল নিজেও সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল।কি বলেছে বুঝতে পেরে মুখ হাত দিয়ে চেপে ধরল।মাথা নাড়িয়ে মুখ থেকে হাত সরিয়ে বলল____
না মানে আমি বলেছি তোমার আই আমি বাচ্চা তো আমার বিয়ের পরে হবে তোমার। বুঝলে?আর এই তোমার শব্দটা তো কথার কথা। যেমন আমরা বলি না অনেক সময় মানে বুঝতেই তো পারছো।
মিহাল ধরা পরে কি আবল তাবল বলছে নিজেও জানে না।আর নীলার ইচ্ছে করছে এখন মিহাল কে কোনো পাগলা গারদে দিয়ে আসতে।নিজে কোনো এক কালে নিজের চাচাতো ভাইয়ের জন্য পাগল ছিল।এখন তার কপালে এক ফুফাতো ভাই জুটেছে যে নিজেও তার জন্য পাগল। অবশ্য নীলা একটি জিনিস ভাবলে দূবল না হয়ে পারছে না মিহালের প্রতি।সে ঠিক যতটা নিখুঁত ভাবে,মন প্রাণ দিয়ে, নিশ্বার্থ ভাবে ইরফানকে ভালোবেসেছিল সেভাবেই যদি কেউ তাকে ভালোবাসে তাহলে সে মোটেও ঠকবে না। নিজেকে দূর্বল হতে দেখে নীলা মাথা নাড়িয়ে উঠলো এবং মিহালের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল___
হয়েছে হয়েছে এখন তাড়াতাড়ি চলুন।
মিহাল বোকা হেসে মাথা চুলকে বলল____
হ্যাঁ হ্যাঁ চলো চলো।
হাঁটতে হাঁটতে মিহাল বলল___
মুনাসশাডো আমার ঘোড়ার নাম।
নীলা মিহালের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল___
আপনার ঘোড়াও আছে? ইন্টারেস্টিং।
মিহাল স্মিত হাসলো।নীলা শত জোর করেও নিজের চোখ কে ধরে রাখতে পারলো না।আড় চোখে মিহালের হাসা দেখে ঘায়েল হয়ে যাওয়ার মতোন অবস্থা।
অন্যদিকে পেছনে ইকরা এবং মুনভি হাঁটছিল। হঠাৎ ইকরা বলে উঠলো ____
ওদেরকে কিন্তু বেশ মানিয়েছে।
মুনভি ইকরার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থেকে বলল____
ঠিক যেমন আমাদের কে মানিয়েছে?
ইকরা মুনভির দিকে তাকিয়ে তৎক্ষণাৎ জিজ্ঞেস করল___
সরি কি বললেন?
মুনভির টনক নড়ল।সে মাথা নাড়িয়ে বলে উঠলো ___
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ২৮
না না কিছু না মানে এক লাইন গান গাই?
ইকরা মুচকি হেসে বলল ____
ওমা এতে অনুমতি নেওয়ার কি আছে? আপনার গানের কন্ঠ তো এমনিতেই অনেক সুন্দর। আপনি যখন চান তখন গাইতে পারেন কোন সমস্যা নেই।
মুনভি মুচকি হেসে গান ধরলো_____
এই পথ যদি না শেষ হয়
তবে কেমন হতো তুমি বলতো
যদি পৃথিবীটা স্বপ্নের দেশ হয়
তবে কেমন হতো তুমি বলতো
