Home নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা শেষ পর্ব 

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা শেষ পর্ব 

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা শেষ পর্ব 
নাজনীন নেছা নাবিলা

লন্ডনের বুক চিরে বয়ে চলা টেমস নদীর তীরে এখন থমথমে অন্ধকার বিদ্যমান। নদীর ওপারেই দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের সাক্ষী বিগ বেন আর প্যালেস অব ওয়েস্টমিনস্টার। মেঘলা রাতের আবছা আলোয় ক্লক টাওয়ারের বিশাল অবয়বটিকে কোনো এক প্রাচীন দানবের মতো দেখাচ্ছে। শহরের ব্যস্ততা তখন অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছে, কিন্তু ঠিক তার উল্টো দিকের এক উঁচু অ্যাপার্টমেন্টের একটি কক্ষে জমাট বেঁধে আছে এক পৈশাচিক স্তব্ধতা। রুমটি ঘুটঘুটে অন্ধকার। কোনো বাতি জ্বলছে না, কেবল জানালার কাচ গলে বাইরের নিয়ন আলোর সামান্য রেশ এসে পড়েছে ঘরের এক কোণে। সেখানে একটি আরামদায়ক সোফায় স্তব্ধ হয়ে বসে আছে এক মানবমূর্তি। তার অবয়ব স্পষ্ট নয়, কিন্তু অন্ধকারের মাঝেও তার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে ঠিক যেন এক হিংস্র পশুর চোখের মতো, যেখানে দাউদাউ করে জ্বলছে প্রতিহিংসার আগুন। হঠাৎ করেই তার হাতের মুঠোয় থাকা ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। স্ক্রিনের আলোয় তার চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠার অবয়বটা ক্ষণিকের জন্য ভেসে উঠল। যখন সে জানতে পারল যে প্যারিসের পুরো প্ল্যানটি পুরোপুরি ভেস্তে গেছে, তখন রাগে তার পুরো শরীর রি রি করে উঠল। ধমনীতে রক্তের গতি বেড়ে গেল চরম উন্মাদনায়। আর এক মুহূর্তও দেরি না করে সে প্যারিসে থাকা নিজের বিশেষ দলটিকে ডায়াল করল। ফোনটা কানে নিতেই ওপাশ থেকে ভয়ার্ত কণ্ঠ ভেসে আসার আগেই সে ইংরেজিতে গর্জে উঠল,

“কিভাবে তোরা এই সুযোগ মিস করলি? প্রথমে নীলা এবং মিহালকে মারতে পারিস নি সেটার জন্য না হয় আমি মাফ করলাম। কিন্তু মুনভি এবং ইকরা ইকরাও তো ছিল। তাদেরকে কেন মারতে পারলি না?”
ওপাশ থেকে ভয়ার্ত গলায় লোকটা কিছু একটা বলার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, নিজের সাফাই গাইতে চাচ্ছিল। কিন্তু এই অন্ধকার ঘরের ভয়ঙ্কর মানুষটির সেই দুর্বল অজুহাত শোনার মতো বিন্দুমাত্র ধৈর্য ছিল না। রাগে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে সে অনর্গল ইংরেজিতে কিছু নোংরা গালিগালাজ ছুড়ে দিল। তারপর বরফশীতল কণ্ঠে, চরম হুমকির সুরে বলল,
“আমি কাউকে দ্বিতীয়বার সুযোগ দিই না। তোর সুযোগ শেষ।”
কথাটি শেষ হওয়ামাত্রই সে খট করে ফোনটা কেটে দিল। ওপাশের মানুষটির পরিণতি কী হতে যাচ্ছে, তা এই ঘরের তার দেওয়ালের মাঝে বসে থাকা লোকটি জানে। কয়েক সেকেন্ড গভীর শ্বাস নিল সে। নিজের ভেতরের উত্তেজনাকে জোর করে চেপে রেখে সে এবার একদম নতুন একটি নম্বরে কল লাগাল। ওপাশে ফোনটা রিসিভ হতেই তার কণ্ঠ পাল্টে গেল। এবার তার কন্ঠে এক রহস্যময় এবং কুটিল শান্ত ভাব। সে ওপাশের ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আমাকে তুমি চিনবে না। তোমার এবং আমার শত্রু একজন। একসাথে মিলে শত্রু কে আমরা শেষ করতে পারবো। কি বলো ডিল কনফার্ম?”
ফোনের অপর প্রান্তের মানুষটি হয়তো এমন একটা সুযোগেরই অপেক্ষা করছিল। এই সুবর্ণ সুযোগ সে হাতছাড়া করতে চাইল না। ওপাশ থেকে সম্মতি আসতেই অন্ধকার ঘরের লোকটির ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক ক্রূর, তৃপ্তির হাসি। ফোনটা নামিয়ে রেখে সে আবার তাকাল জানালার বাইরে, লন্ডনের সেই প্রাচীন শহরের বুকে। শত্রুর পতনের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে। এবার শুরু হবে এক নতুন, রক্তাক্ত খেলা। এমন সময় তার রুমে একটি মেয়ে আসলো। অন্ধকারের জন্য মেয়েটির অবয় দেখা যাচ্ছে না। মেয়েটি এসে তার পাশে বসে বলল,
“আমি কিন্তু হারতে চাই না।”
লোকটি মেয়ের হাতের মাঝে নিজের হাত রেখে বলল,
” আমি খান এবং মির্জা পরিবার নিজ হাতে ধ্বংস করব। আর তাদের সাথে যারা যুক্ত থাকবে তাদেরকেও ধ্বংস করব।”

পুরো মির্জা ও চৌধুরী পরিবার যেন এখন এক অটুট বন্ধনে রূপ নিয়েছে। ড্রয়িংরুমে সব বড়-ছোট সদস্যরা একসাথে গোল হয়ে বসে পুরনো দিনের গল্প আর আড্ডার এক মায়াবী আসর জমিয়ে তুলেছেন। ঠিক তখনই গল্পের সুতো ধরে এক বিশাল এবং অবিশ্বাস্য সত্য সবার সামনে উন্মোচিত হলো। নীলা, ইকরা, মিহাল এবং মুনভি জানতে পারল যে, ইকরার বাবা আসলে মিহাল ও মুনভির বাবার দীর্ঘদিনের পরম সুহৃদ ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। শুধু তা-ই নয়, অতীতে যখন মিহাল ও মুনভির বাবাকে এক চরম বিপদের মুখে পড়ে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছিল, তখন ইকরার বাবাও নিজের জীবন বাজি রেখে উনাদের নিরাপদে পালিয়ে যেতে সর্বোচ্চ সাহায্য করেছিলেন। এত বছর পর নিজেদের সন্তানদের মাধ্যমে দুই পরিবার যে এভাবে আবার এক সুতোয় বাঁধা পড়বে, এই চরম কাকতালীয় ঘটনাটি দেখে চার তরুণ-তরুণীই সম্পূর্ণ অবাক ও স্তব্ধ হয়ে গেল। প্রকৃতির এই নিখুঁত সমীকরণ তাদের মনে এক অন্যরকম শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করল। পরিবারের এই চরম মিলনমেলায় এবার সবার সম্মতিতে এক মস্ত বড় এবং আনন্দের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। বড়রা সবাই মিলে ঠিক করলেন, ঠিক এক বছর পর মুনভি এবং ইকরার শুভ পরিণয় সম্পন্ন হবে। আর সবচেয়ে বড় ধামাকা হলো এই বিয়েটি প্যারিসে নয়, বরং নিজেদের চেনা মাতৃভূমি বাংলাদেশে সাড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হবে। শুধু তা-ই নয়, সেই একই দিনে অতীতে হুট করে হয়ে যাওয়া নীলা এবং মিহালের বিয়ের অনুষ্ঠানটিও এক বিশাল ও রাজকীয় আয়োজনে পুনরায় উদযাপন করা হবে। অর্থাৎ, এক বছর পর একই দিনে দুই বন্ধুর চার হাত এক হতে চলেছে।

এইভাবেই এক পরম শান্তি আর উৎসবের আমেজে কাটতে লাগল তাদের প্রবাসের দিনগুলো। নীলা এবং ইকরার পরিবারের সবাই আর মাত্র সপ্তাহখানেক প্যারিসে থাকবেন, তারপর উনারা সবাই মিলে আবার দেশের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাবেন। তবে এই সুখানুভূতির মাঝেই একটা বিষয় নিয়ে নীলা একেবারে হাপিয়ে উঠেছিল তা হলো মিহালের সেই চরম পাগলাটে পজেসিভনেস। সেই ঘটনার পর থেকে মিহাল যেন নীলার প্রতি বেশি সিরিয়াস হয়ে গিয়েছিল। মিহালের এই অতিরিক্ত জেলাসি আর অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা দেখে নীলা রীতিমতো ক্লান্ত ও বিরক্ত হওয়ার ভান করলেও, মনে মনে স্বামীর এই তীব্র অধিকারবোধ তাকে এক অদ্ভুত ভালোবাসার চাদরে জড়িয়ে রাখত।
অন্যদিকে, সেই দিনের পর থেকে ইরফান আর আরশি নিজেদের পুরোপুরি গুটিয়ে নিয়েছে। তারা সবসময় মিহাল ও নীলাদের ছায়া থেকেও যথাসম্ভব দূরে দূরে থাকার চেষ্টা করছে, যেন কোনো নতুন ঝামেলার সূত্রপাত না হয়। তবে এই সমস্ত ভালোলাগা আর ব্যস্ততার আড়ালেও একটা কালো মেঘ চারজনের মনেই ধিকধিক করে জ্বলছিল। সেই নির্দিষ্ট দিনে প্যারিসের হাইওয়েতে মুনভি আর ইকরার গাড়িতে অতর্কিত সেই হামলাটি আসলে কে করিয়েছিল তা নীলা, মিহাল, মুনভি কিংবা ইকরা, এখনো কেউই নিশ্চিতভাবে জানতে পারেনি। এবং যাদেরকে দ্বারা সন্দেহ করেছে তাদেরকে সন্দেহ করার কোন আর কারণ দেখছে না এখন। শত্রু যেন কুয়াশার আড়ালে লুকিয়ে থেকে তাদের দেখছে। তবে মিহাল এবং মুনভি কিন্তু এত সহজে হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। তারা দুজনে মিলে পর্দার আড়ালে থেকে, সমস্ত চেনা-অচেনা আন্তর্জাতিক সূত্র কাজে লাগিয়ে সেই অজ্ঞাত শত্রুর আসল চেহারা আর পরিচয় খুঁজে বের করার জন্য নিজেদের সর্বোচ্চ চেষ্টাটুকু চালিয়ে যাচ্ছে।

প্যারিসের এক শান্ত, গোধূলি-ঝরা বিকেলে ইকরা আর মুনভি পাশাপাশি হেঁটে চলেছে। তাদের মাঝে বজায় থাকা ওই সামান্য দূরত্বটুকুর ভেতরেও যেন এক অদ্ভুত নীরব অনুরাগ খেলা করছে। চারপাশের বাতাস তখন এক হালকা শীতল‌। মুনভি আড়চোখে ইকরার চিন্তিত, মায়াবী মুখের দিকে তাকাল। হাইওয়ের সেই রোমহর্ষক হামলার পর থেকেই মেয়েটার মনের ভেতর যে একটা চাপা আতঙ্ক কাজ করছে, তা মুনভি খুব ভালো করেই বোঝে। সে ধীরপায়ে ইকরার আরেকটু কাছাকাছি এগিয়ে এলো, তারপর অত্যন্ত গভীর ও আশ্বস্ত করা কণ্ঠে বলল,

“আমি আছি তো তোমার পাশে, ইকরা। একদম ভয় পাবে না। ওই ঘাতকদের পেছনে কে আছে, তা আমি আর মিহাল মিলে ঠিক খুঁজে বের করব। আর যাই হয়ে যাক না কেন, তোমাকে সবসময় পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে নিরাপদে রাখার দায়িত্ব আমার।”
মুনভির এমন নিখাদ ও পুরুষালি অভয়বাণী শুনে ইকরার মনের কোণে জমে থাকা সবটুকু ভয়ের মেঘ এক পলকে কেটে গেল। সে মুখ তুলে মুনভির চোখের দিকে তাকাল, আর তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে পরম তৃপ্তির মুচকি হাসি। সে অত্যন্ত নরম ও মায়াবী গলায় বলল,
“আপনার প্রতি আমার শতভাগ বিশ্বাস আছে। আমি খুব ভালো করেই জানি, আপনি পাশে থাকা অবস্থায় কোনো অন্যায় শক্তি এসে আমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আমি শুধু আল্লাহর কাছে এতটুকুই দোয়া করব, আল্লাহ যেন আমাদের এই সমস্যাটা খুব তাড়াতাড়ি সমাধান করে দেন। আর আপনিও একদম চিন্তা করবেন না, যেকোনো পরিস্থিতিতে আমি সবসময় ছায়ার মতো আপনার পাশেই থাকব।”

ইকরার মুখে নিজের পাশে থাকার এমন মিষ্টি প্রতিশ্রুতি শুনে মুনভির ঠোঁটের কোণে এক চিলতে স্বস্তির ও বিজয়ী হাসি ফুটে উঠল। তার বুকটা এক অদ্ভুত ভালোলাগায় ভরে গেল। তারা দুজনে গল্প করতে করতে পার্কের রাস্তা ধরে কিছুটা সামনে এগিয়ে যেতেই মুনভির নজর গেল এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা এক লোক কটন ক্যান্ডি বিক্রেতার দিকে। হালকা গোলাপি রঙের তুলতুলে মিষ্টির গোলকগুলো দেখেই মুনভির চোখের মণি দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল‌। তার ঠোঁটের সেই হাসিটা আরও চওড়া হলো। সে আর এক মুহূর্তও ভাবল না। এক ছুটে গিয়ে বিক্রেতার কাছ থেকে দুটো বড় বড় কটন ক্যান্ডি কিনে আনল। একটি নিজের জন্য রাখল, আর অন্যটি পরম মমতায় ইকরার দিকে বাড়িয়ে দিল। ইকরা তো কটন ক্যান্ডি নিজের হাতে পেয়ে খুশিতে এক্কেবারে বাচ্চার মতো চঞ্চল হয়ে উঠল। রাতের লাইটের মৃদু আলোয়, প্যারিসের সুন্দর রাস্তায় দুজন মিলে হাত দোলাতে দোলাতে আর কটন ক্যান্ডি খেতে খেতে সামনের দিকে হাঁটতে থাকল। তাদের একে অপরের দিকে তাকানো, মৃদু হাসির বিনিময় আর ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা কটন ক্যান্ডির মিষ্টি স্বাদ সব মিলিয়ে চারপাশটা যেন এক রূপকথার অবয়ব নিল। পৃথিবীর সব ভালোবাসা হয়তো অনেক বেশি জমকালো হয় না। কিছু কিছু ভালোবাসা ঠিক এই কটন ক্যান্ডির মতোই বড্ড সাধারণ, অথচ ভীষণ মিষ্টি আর মায়াময় হয়।
রাতের আলোয় ঝলমল করতে থাকা আইফেল টাওয়ারের চারপাশটা যেন একদম ফাঁকা। এই একান্তে ঘেরা রাতের আলো-আঁধারিতে নীলা আর মিহাল একে অপরের হাতের আঙুলগুলো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে পরম শান্তিতে হেঁটে চলেছিল। হিমেল হওয়া এসে বারবার নীলার হিজাবের কোণ উড়িয়ে দিচ্ছিল, আর মিহাল অন্য হাত দিয়ে পরম মমতায় তার নীলার হিজাবের অংশ ধরে ফিরিয়ে আনছিল। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ করেই মিহালের মনে এক গভীর ইচ্ছা চাড়া দিয়ে উঠল। সে কোনো আগাম আভাস না দিয়ে, এক ঝটকায় নিচু হয়ে নীলাকে পাজাকোলা করে নিজের শক্ত বুকের ওপর তুলে নিল। আকস্মিক শূন্যে ভেসে ওঠায় নীলা কিছুটা থতমত খেয়ে গেল। সে লজ্জায় ও মৃদু আতঙ্কে চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে মিহালের বুকে আলতো ধাক্কা দিয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল,

“আরে, কী করছেন প্যারেলাল? মানুষ দেখছে তো। নামান আমাকে।”
কিন্তু মিহাল তার সেই অবাধ্য হাসিটা হেসে নীলার চোখের দিকে তাকাল। তার চোখের সেই তীব্র পজেসিভনেস আর ভালোবাসার চাউনি দেখে নীলা আর নিজের আপত্তি ধরে রাখতে পারল না। সে মুচকি হেসে বাধা দেওয়া বন্ধ করে দিল এবং পরম মমতায় নিজের হাত মিহালের দুই কাঁধে জড়িয়ে নিল। কিছুক্ষণ হেঁটে মিহাল আলতো করে নীলাকে তার পাজা কোল থেকে নামিয়ে দিল। তাদের চারপাশ জুড়ে প্যারিসের মায়াবী রাত। ঠিক ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে আছে দুজন। চারপাশের নিয়ন আলো আর ব্রিজের নীল-বেগুনি রশ্মি এসে আছড়ে পড়ছে তাদের শরীরে, এক অপার্থিব আভার সৃষ্টি করে।

মিহাল হাত বাড়িয়ে পকেট থেকে অতি গোপনে কিছু একটা বের করল। নীলা মন্ত্রমুগ্ধের মতো চারপাশটা দেখছে। প্যারিসের এই শীতল পরিবেশ যেন এক জীবন্ত ক্যানভাস। কত যুগল হাতে হাত রেখে হেঁটে চলেছে চারপাশে। শুধু তরুণ-তরুণীই নয়, বয়সের সীমানা পেরিয়ে বহু প্রবীণ মানুষও এই রাতে ভালোবাসার শহর উপভোগ করতে বেরিয়েছেন। নীলার পরনে আজ একটা লং গোল ফ্রক, যা তার হাঁটুর নিচ ছুঁয়ে আছে। তার ওপর জড়িয়ে নিয়েছে একটা নীল রঙের সোয়েটার, যার হাতা দুটো হাতের কব্জি ছাড়িয়ে খানিকটা লম্বা। মাথা হিজাব। আজ প্যারিসের বুকে বড্ড শীত। মেঘলা আকাশ জানান দিচ্ছে, হয়তো খানিক বাদে বরফও পড়তে পারে। নীলার মনে মনে তীব্র আকুতি, আজ যেন সত্যিই বরফ পড়ে‌ সে যে জীবনে কখনো বরফ পড়া দেখেনি। বরফভেজা এক টুকরো প্যারিস দেখার স্বপ্ন তার চোখের কোণে।

মিহালের পরনে ওল্ড মানি ব্র্যান্ডের প্যান্ট আর ছাই রঙের একটি ভারী সোয়েটার। বাতাসে তার চুলগুলো সামান্য উড়ছে। নীলা যখন চারপাশের সৌন্দর্যে বিভোর, ঠিক তখন মিহাল নিঃশব্দে তার সামনে এক হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। হঠাৎ একটা মানুষের ছায়া সামনে নুয়ে পড়তে দেখে নীলার ঘোর কাটল। তৎক্ষণাৎ নিচে তাকাতেই নীলার চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে গেল! মিহাল তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আছে পরম শ্রদ্ধায়, গভীর ভালোবাসায়। তার এক হাতে জ্বলজ্বল করছে একটি নিখুঁত আংটি, আর অন্য হাতে ধরা একটি স্নিগ্ধ নীল জবা ফুলের তোড়া। নীলা পুরোপুরি বাকরুদ্ধ, বিস্ময়ে বিমূঢ়! কিছুক্ষণ আগেও তো মিহালের হাতে কোনো ফুল ছিল না, তবে এই নিমিষেই কোথা থেকে এলো? এই মানুষটা কি তবে কোনো জাদু জানে? নাকি ভালোবাসার টানে শূন্য থেকেও ফুল ফুটিয়ে তুলতে পারে? নীলার অবুঝ মন কোনো হিসাব মেলাতে পারল না। সে শুধু স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইল সেই নীল জবা আর মিহালের চোখের অতলান্তিক ভালোবাসার দিকে। নীলা নীল জবা পছন্দ এইটা কারোর জানার কথা না।
মিহাল আলতো করে মুচকি হাসল। তার সেই হাসিতে যেমন ছিল এক অদ্ভুত মায়া, তেমনই ছিল এক গোপন অপরাধবোধের স্বীকারোক্তি। সে নীলার চোখের দিকে তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে বলতে লাগল,

“নিয়ত ছিল তোমাকে ব্যবহার করার, অথচ…”
মিহাল একটু থামল। তার ঠোঁটের কোণের মুচকি হাসিটা আরও গভীর হলো। চোখের কোণায় জমে উঠল একরাশ শুদ্ধ আবেগ। সে আবার বলতে শুরু করল,
“ভালোবেসে ফেললাম তোমাকে। হৃদয়ের খুব গভীরে আশ্রয় দিলাম তোমায়। কবে, কখন, কোন মুহূর্তে যে এতখানি ভালোবেসে ফেললাম, তা নিজেরই বোঝা বড় দায়! শুধু এতটুকু জানি, তুমি আমার এবং আমি তোমার। আজ থেকে তোমার সমস্ত সমস্যা আমার। তোমার দোষ, তোমার গুণ, তোমার অতীত—সব আমার অস্তিত্বের অংশ। সম্পূর্ণ তুমিই এখন আমার অংশ। হবে কি তোমার এই প্যারেলালের নীলাঞ্জনা? হবে কি… প্রেম আমার নীলাঞ্জনা? অনেক ভালোবাসি তোমাকে, নীলাঞ্জনা!”

মিহালের প্রতিটি শব্দে নীলার চোখের কোণ জোয়ারের জলের মতো চিকচিক করে উঠল। এতখানি আনন্দ, এতখানি প্রাপ্তি সে কোথায় রাখবে, তা তার জানা নেই। একবার জীবনের কঠিনতম ধোঁকা খাওয়ার পর, এত তাড়াতাড়ি কেউ তাকে এভাবে আগলে নেবে, তাকে নতুন করে সামলে তুলবে তা ছিল তার কল্পনারও অতীত। সে তো নিজেকে এক পাথরহৃদয় নারীতে পরিণত করতে চেয়েছিল। অথচ এক পাগল পুরুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার মায়ার জালে যে সে এভাবে আটকে পড়বে, তা কি সে জানত? হয়তো না। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো, নিজেকে এই ভালোবাসার মায়াবী জালে বন্দি দেখতে আজ তার ভীষণ ভালো লাগছে। নীলা পরম সুখে আলতো করে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। মিহাল এক বুক তৃপ্তি নিয়ে নীলার দিকে নীল জবা ফুলের তোড়াটি বাড়িয়ে দিল। নীলা কাঁপা হাতে তা গ্রহণ করল। এরপর মিহাল পরম যত্নে নীলার নরম বাম হাতটি নিজের হাতের তালুর ওপর রাখল। পকেট থেকে বের করা সেই ঝিলমিলে ডায়মন্ডের রিংটি সে ধীরে ধীরে পরিয়ে দিল নীলার অনামিকা আঙুলে। আংটিটি পরানো শেষ হতেই মিহাল সেখানে ঠোঁট ছুঁইয়ে এক গভীর ভালোবাসার পরশ দিল। সেই স্পর্শের তীব্র আবেশে নীলা চোখ দুটো বুজে ফেলল। এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে এলো তার মনে।
মিহাল এবার নীলার সামনে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াল। সে নিজের দুই হাতের মাঝে তুলে নিল নীলার বাম হাতটি। পরম আদরে, আলতো করে সে নীলার হাতটি মালিশ করতে লাগল। বার বার নিজের হাতের উষ্ণ স্পর্শ দিয়ে সে নীলাকে অনুভব করাচ্ছিল তার উপস্থিতি। নীলা ধীরে ধীরে চোখ মেলল। মিহালের চোখের দিকে তাকিয়ে আকুল কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে বলল,

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৬০

“ভালোবাসি প্যারেলাল।”
মুহূর্তের জন্য মিহাল যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। তার পুরো শরীর থমকে দাঁড়াল। এতদিন নীলার ভালোবাসা কেবল তার আচরণে, তার যত্নে আর কাজে প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু আজ? আজ নীলা নিজ মুখে সেই ভালোবাসার কথা স্বীকার করল! আজ মিহালের জীবনের সবচেয়ে বড় খুশির দিন। তর সইলো না তার, বুকের ভেতর জমে থাকা আনন্দকে সে আর চেপে রাখতে পারল না। একরাশ উত্তেজনা আর উন্মাদনা নিয়ে প্যারিসের সেই শীতল বাতাসে জোরে জোরে চিৎকার করে বলে উঠল,
“আমিও তোমাকে অনেক ভালোবাসি নীলাঞ্জনা!
তুমি… #নীভৃতে_প্রেম_আমার_নীলাঞ্জনা।”

প্রথম পরিচ্ছদের সমাপ্তি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here