মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪৫ (২)
jannatul firdaus mithila
“ নিরুপমার সাথে অধীরের কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই বাবা! শঙ্কর রায়ের একমাত্র সন্তান ছিলো জমিদার পুত্রী শ্যামৌপ্তী রায়। আর তার সন্তানই হচ্ছে — অধীর রায়। আমি শ্যামৌপ্তীর আপন দাদা নই। আমি শঙ্কর রায়ের বিশ্বস্ত সঙ্গী দেব মল্লিকের সন্তান! যে কি-না বড় হয়েছে — রায় বাড়ির সন্তান হিসেবে।”
থমকালেন মনিষী! তার বিস্ফোরিত নেত্রদ্বয় একযোগে নিক্ষিপ্ত হলো সম্মুখে নত ঘাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা হিমাংশু রায়ের পানে। হতভম্বতায় অধরযুগলে দুরত্ব বেড়েছে বৃদ্ধের। তিনি কেমন কালবিলম্ব না করে তক্ষুনি হিমাংশু রায়ের এগিয়ে দেয়া কুন্ডলীপত্রখানা ছো মে’রে নিয়ে নিলেন হাতে। অতঃপর ব্যস্ত স্বভাবে তড়িঘড়ি করে কাগজখণ্ড খুলে, সেথায় চোখ বুলাতেই ফের আকাশ ভেঙে পড়লেন মনিষী! আশ্চর্যান্বিত কন্ঠ ফুঁড়ে অস্ফুটে আওড়ালেন,
“ এটা কি করে সম্ভব? অধীরের পিতা…. ”
সহসা মাথা তুললেন হিমাংশু রায়। মনিষীর বাক্যে আচানক বাহাত ঢুকিয়ে অপ্রসন্ন কন্ঠে বলে বসলেন,
“ জ্বি বাবা! আপনি যা দেখছেন তাই সত্যি। অধীরের পিতা মুসলিম হলেও শ্যামৌপ্তী ছিল আমাদের মতো সনাতনী। সে হিসেবে অধীর তার মায়ের ধর্মে বিশ্বাসী।”
কপাল কুঁচকে গেল মনিষীর। মুখাবয়বে ফুটল খানিক চিন্তার ছাপ। লম্বাটে সফেদ রঙা দাঁড়ির আবরণে লুকায়িত অধরযুগল ধারালো দাঁতের সাহচর্যে পিষে গেল আনমনে। কুর্তার আড়ালে ঢেকে থাকা বুকটা সামান্য ফুলিয়ে, লম্বা এক নিশ্বাস টানলেন মনিষী! রয়েসয়ে ভ্রু উঁচিয়ে সন্দিগ্ধ গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“ তুই নিশ্চিত অধীর সনাতনী ধর্মে বিশ্বাসী?”
শক্ত দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন হিমাংশু রায়। মাথাটা খানিক দুলিয়ে পা উল্টালেন মন্দিরের পথে। হাতে থাকা পুরাতন বাক্সটা শক্ত করে চেপে রেখে, আনমনে এগোতে এগোতে শুধালেন,
“ জ্বি! আমি নিশ্চিত।”
তৎক্ষনাৎ স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরুলো মনিষীর বুক চিঁড়ে। এতক্ষণের উপচে পড়া রাগগুলো তার, মুহুর্তেই মিলিয়ে গেল হাওয়ায়। তিনি এবার গম্ভীর আরোপে বুক ফুলিয়ে সটান হলেন। গলার স্বরে গাম্ভীর্যের ছাপ ফুটিয়ে গমগমে গলায় আওড়ালেন,
“ ঠিক আছে। অধীর যদি সত্যিই সনাতনী ধর্মে বিশ্বাসী হয়ে থাকে তবে আমি নিজে ওদের বিবাহের মন্ত্রজপ করব। আর যদি তোর বলা কথা মিথ্যে প্রমাণিত হয়, তাহলে মনে রাখিস। আমার অভিশাপের অনলে জ্যান্ত পুড়বি তুই এবং তোর গোটা পরিবার।”
তক্ষুনি আঁতকে ওঠেন হিমাংশু রায়। ভয়াল আবহে তড়িঘড়ি করে পেছনে ঘুরতেই যাবেন ওমনি মন্দিরের সম্মুখে পড়ে থাকা তেলের ছিটায় পা পিছলে গেল মধ্যবয়স্কের। এহেন ঘটনার আকস্মিকতায় ভড়কানোর পূর্বে তার হাত থেকে আচমকা সম্মুখে ছিটকে পড়ল পুরাতন কাঠের বাক্সটা। অমঙ্গলের প্রথম দর্শন হিসেবে সে বাক্স উড়ে গিয়ে পড়ল — নিরুপমার এতগুলো বছরের অপেক্ষার সাক্ষী হিসেবে জ্বালানো প্রদীপের ওপর! যা দীর্ঘ ৮ বছর ধরে অক্লান্ত ভঙ্গিমায় আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে অধীর রায়ের প্রতীক্ষায়। মাত্র কয়েক সেকেন্ডে ঘটে গেল সম্পূর্ণ অমঙ্গলে কান্ডখানা। হিমাংশু রায়ের বিস্ফোরিত দৃষ্টির সম্মুখে তক্ষুনি ধপ করে নিভে গেল প্রদীপের বাতি! মুহুর্তেই চিৎকার করে ওঠেন মনিষী। তার বিকট চিৎকারে কেঁপে ওঠে রায় জমিদার বাড়ির বিশাল মন্দিরের প্রতিটি দেয়াল। এক ঘোর অমঙ্গলের শঙ্কায় মানুষটা কেমন চেঁচিয়ে ওঠা কন্ঠে বলে ওঠেন,
“ অনর্থ! এ যে ঘোর অনর্থ।”
রায় বাড়ির পেছনে বেশ পুরনো জঙ্গল! বড়ো বড়ো বট গাছের ছায়ায় জঙ্গলের স্যাতস্যাতে জমিনের গায়ে সূর্যের কিরণ যেন পড়ছেই না! জঙ্গল পেরিয়ে খানিকটা দূরে পদ্ম বিল। জমিদার বাড়ির তিনতলার কয়েকটা ঘর থেকে এ বিলের দৃশ্য বড্ড স্পষ্ট দেখা যায়। পদ্ম বিলের দু’পাশে ইট-পাথরের সিঁড়ি! একদম উঁচু সিঁড়িতে বসে আছে নিরু। কাঞ্চা সোনার ন্যায় মসৃণ পাদু’টো রাঙাচ্ছে আলতার লেপনে! তার পরনে একখানা সাদার ভেতর লাল পাড় মিশেলের শাড়ী, হাঁটু সমান দীঘল কালো কেশ গুচ্ছ উম্মুক্ত! হাওয়ার দোলে দুলছে তারা। মেয়েটা কেমন মনের সুখে গুনগুনিয়ে যাচ্ছে! এক পায়ে আলতা রাঙানো শেষে, অন্যপায়ে আঙুল ছোঁয়াতে গেলেই হঠাৎ বুক মুচড়ে উঠে সপ্তদশীর! অজানা কারণে কেঁপে ওঠে সর্বাঙ্গ। এহেন উদ্ভট অনুভুতিতে থমকায় নিরু। চটজলদি দু’হাত উঁচিয়ে আলগোছ চেপে ধরে নিজ বুকের বাঁপাশ। জায়গাটা কেমন ধড়াস ধড়াস শব্দ তুলছে! সর্বাঙ্গে বাড়ছে অস্থিরতা। নিরু জানেনা এর কারণ, জানে না এই হুটহাট অনুভূতি কিসের লক্ষ্মন। মেয়েটা কেমন হাসফাস করছে। মুখ হা করে নিশ্বাস ফেলছে অনবরত। আশ্চর্য! হঠাৎ নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে কেনো তার? হৃদয়টা ওমন মোচড়াচ্ছে কেনো? যেন মনে হচ্ছে কেউ বুঝি জোরপূর্বক তার হৃদয়টা খুবলে বের করে আনছে। এহেন চিন্তায় ডুব দিয়েছে নিরুর অবচেতন মন। ঠিক তখনি মাথার ওপর খোলা আকাশটা কেমন গর্জে উঠল অবলীলায়! সে কি হিং স্র গর্জন তার! যে গর্জনে কেঁপে উঠল রায় জমিদার পুত্রী। সে তৎক্ষনাৎ অস্থির বদনে ঘাড় উঁচিয়ে তাকাল আকাশপটে। ঘন কালো মেঘেদের দলবল উঁকি দিয়েছে ইতোমধ্যে। দিচ্ছে বিদ্যুৎ ঝলকানি! নিরুর অবচেতন মন এপর্যায়ে বিচলিত হলো। প্রিয় মানুষটার তিতিক্ষার অনলে জ্বলে আনমনে বিড়বিড় করে শুধালো,
“ আমার এমন লাগছে কেনো? কেনো মনে হচ্ছে আপনি…আপনি দূরে যাচ্ছেন অধীর দা। কেনো মনে হচ্ছে আমি… আমি আমার আপনিটাকে হারাতে যাচ্ছি! আমার…”
থামল নিরু। অস্থিরতায় হাসফাস করতে করতে তক্ষুনি ভর দিলো দু’পায়ে। ব্যস্ত ভঙ্গিতে কদম বাড়াল বাড়ির পথে। সপ্তদশীর লম্বা চুলগুলো হাওয়ার সঙ্গে তাল মেলাচ্ছে এবার! বাঁধনহারা হয়েছে তার আদুরে শাড়ির আঁচল। সপ্তদশীর ছুটন্ত পদযুগল এলোমেলো! শাড়ির আঁচল ছুঁয়ে দিচ্ছে জমিনের গা। এ যেন রায় জমিদার পুত্রীর সর্বস্ব হারানোর পূর্বাভাস।
কাঁদায় মাখোঁ মাখোঁ সপ্তদশী নিরুপমার আলতা রাঙা দুপা! জমিদার বাড়ির অন্দরমহলের তকতকে মেঝেতে ধুপধাপ পা ফেলে ছুটছে সে। এহেন ছোটাছুটির শব্দ পেয়ে তক্ষুনি রসুইঘর থেকে খানিক উঁকি দিয়ে বসলেন সুদীপা রায়। পরক্ষণে মেয়েকে ওমন উদ্ভ্রান্তের ন্যায় ছুটতে দেখে ভড়কালেন তিনি। সহসা কন্ঠ উঁচিয়ে বলে উঠলেন,
“ নিরু? কি হয়েছে তোর?”
থামল না নিরু! থামল না তার ছুটন্ত পদযুগল। মেয়েটা কেমন অস্থির হয়ে মন্দিরের পথ ধরেছে দেখো। এদিকে তার ওমন উন্মত্ততা দেখে বিচলিত হলেন সুদীপা। তক্ষুনি হাতের কাজকর্ম একপাশে তুলে রেখে, নিজেও ছুট লাগালেন মেয়ের পিছুপিছু।
হন্তদন্ত হয়ে মন্দিরের সম্মুখ দুয়ারে এসে পদযুগল থামালো নিরু। সম্মুখে বাবা এবং মনিষীকে বিচলিত কায়দায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে খানিক সন্দিগ্ধ হলো সপ্তদশী। কাঁপা কাঁপা বদনে পা ঠেলে এগোলো দু-কদম। অস্থির চোখদুটো তার, প্রতিমার সম্মুখে নিবদ্ধ! ঘোলাটে দৃষ্টিযুগল খানিকটা সরু করতেই আচমকা তার পথ আগলে দাঁড়ালেন হিমাংশু রায়। এক অদ্ভুত উচাটনে ঠোঁটের কোণে মিথ্যে আবেগি হাসি টেনে মেয়েকে শুধালেন,
“ এভাবে কোত্থেকে ছুটে এলি মা? পায়ে এতো কাঁদা লাগলো কি করে?”
মৌন নিরুপমা! একহাতে আলতো করে ঠেলে সরিয়ে দিলো বাবার বিশাল দেহ। পরক্ষণে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করল প্রতিমার পদযুগলের সম্মুখে। আর ওমনি দৃষ্টে তার ধরা পড়ল — সদ্য নিভে যাওয়া প্রদীপ খানা। মুহুর্তেই সর্বাঙ্গ সমেত কেঁপে ওঠে সপ্তদশী। টলটলে পদযুগলে পাতলা দেহখানি খুব একটা ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে, তক্ষুনি হাঁটু ভেঙে ধপ করে বসে পড়ল মেঝেতে। এহেন কান্ডে আঁতকে ওঠেন হিমাংশু রায়। তড়িঘড়ি করে হাঁটু গেঁড়ে বসলেন মেয়ের সম্মুখে। দু’হাতে মেয়ের দু-কাঁধ চেপে বিচলিত সত্তায় আওড়ালেন,
“ কি হয়েছে মা? ও মা! মা..তাকাও আমার দিকে।”
স্থবির হয়েছে নিরু! তার ছলছলে চোখদুটো একদৃষ্টে আঁটকে আছে নিভে যাওয়া প্রদীপের দিকে। এরইমধ্যে আকাশের বুক চিঁড়ে নেমে এলো বারিধারা। এক নিমিষেই নিজেদের আগ্রাসী উপস্থিতির কথা জানান দিতে ভিজিয়ে দিলো সপ্তদশীকে। সপ্তদশীর ভেজা ললাট! সিঁথি ভর্তি সিঁদুরটুকু ধীরে ধীরে ধুয়ে যাচ্ছে বৃষ্টির প্রকোপে। লেপ্টে যাচ্ছে সফেদ রঙা শাড়ির গায়ে! অদূরে থমকে দাঁড়িয়ে থাকা সুদীপা রায় তক্ষুনি চেপে ধরলেন নিজ বুক! মেয়ের এহেন দূরাবস্থায় হাহাকার করছে তার অন্তর! হিমাংশু রায়েরও যে একই হাল। তিনি তৎক্ষনাৎ উচাটনে দু’হাতে চেপে ধরলেন মেয়ের সিঁথি। এরইমধ্যে মেয়েটা তার অস্ফুটে বলে উঠল,
“ আমার এমন কেনো মনে হচ্ছে বাবা, আমি বুঝি অধীর দা -কে হারিয়ে ফেলছি! আমার বুকটা ওমন ব্যথা করছে কেনো বাবা? আমার এমন লাগছে কেনো? অধীর দা আমার রইলেন তো?”
শীতল পানির স্বচ্ছ আবরণে ডুবে আছে দু’টো উষ্ণ দেহ! একখানা বলিষ্ঠদেহ সটান দাঁড়িয়ে রইলেও অন্য ক্ষুদ্রকায় দেহটি ঝুলে আছে মানবের দু’হাতের বাঁধনে। রাতের শেষ প্রহর! অন্ধকারের ঘনঘটার রেশ ক্রমশঃ কমছে। বলিষ্ঠ পুরুষ একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে তারই বুকের মধ্যিখানে পেঁজা তুলোর ন্যায় লুটিয়ে থাকা সপ্তদশীর পানে। তার দ্বিধাগ্রস্থ মন! না পারছে মেয়েটাকে বুক থেকে সরাতে, আর না পারছে তাকে আরেকটু নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নিতে! সপ্তদশীর পেল্লব মুখখানা ক্রমশঃ ফ্যাকাশে হচ্ছে। তার তুলতুলে অধরযুগলের অবস্থা বড্ড বেগতিক। রূঢ় মানবের রুক্ষ দাঁতের রুষ্ট স্পর্শে কেটেকুটে এককার অবস্থা হয়েছে বেচারির ওষ্ঠপুটের! জায়গায় জায়গায় দেখা দিয়েছে কালসিটে দাগ। কোথাও আবার ক্ষত হয়েছে বেশ। লিপ ফিলারের ন্যায় একেকটা অধর ফুলে হয়েছে দ্বিগুণ। কি যে বিশ্রী দেখাচ্ছে! অথচ যুবক কেমন একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে সেদিকে। তার দৃষ্টিযুগলে এক অবাধ টান পরিলক্ষিত। তবুও কোথাও যেন বাঁধ মেনেছে তারা। নিজেদের প্রকাশ করতে জানিয়েছে অনিহা। যুবক স্থির হলো! গম্ভীর মুখে দু’হাতে আলতো করে পাঁজা কোলে তুলে নিলো অচেতন সপ্তদশীকে। অতঃপর নির্বিঘ্নে পুল থেকে উঠে এসে পা বাড়ালো নিজ রেস্ট রুমের দিকে!
শূন্য কক্ষ! যার দুয়ারের গায়ে গোটা গোটা হরফে লিখে রাখা — ব্ল্যাক চেম্বার। কক্ষটি মাঝেমধ্যে ব্যবহৃত হয় মনস্টারের সেবায়। তবে আজ সে কক্ষে প্রবেশ ঘটল অচেতন মাহি’র! মুগ্ধ কেমন নির্বিকারে মেয়েটাকে আলগোছে এনে রাখল মখমলি গোলাকার বিছানার কোলে। মুহুর্তেই সপ্তদশীর সিক্ত বদনখানি দেবে গেল নরম তুলতুলে তোশকের মধ্যিখানে। যুবক নিস্তব্ধ! গম্ভীর মুখে উল্টো ঘুরে পা বাড়াতে গেলেই হঠাৎ টনক নড়ল তার। মেয়েটার গা ভেজা, জবুথবু হয়েছে গায়ের কাপড়! এমতাবস্থায় পড়ে থাকলে নিশ্চয়ই অসুখ বাঁধবে তার। যুবক আনমনে কথাগুলো ভাবল কিয়তক্ষন। তবে পরক্ষণেই নিজ চিরায়ত স্বভাবের বশিভূত হয়ে বিরক্ত মুখে বিড়বিড়িয়ে আওড়াল,
“ অসুখ হলে হোক! হু কেয়ারস?”
বলেই গটগটিয়ে দরজার পানে এগোয় মুগ্ধ। বিরক্ত মুখে প্রশস্ত নিরব করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ করেই তার কল্পনার মানসপটে ভেসে উঠল — মাহি’র নির্মল মুখখানা! আর ওমনি থমকে দাঁড়াল রূঢ় মানব। বুকের মধ্যিখানে লুকায়িত অঙ্গটা তক্ষুনি মুচড়ে উঠল তার অবাধ্যে। বেহায়া অবচেতন মনটা পারছেনা ফের দৌড়ে যেতে মেয়েটার কাছে। পাদু’টোও যেন আজ বিশ্বাসঘাতকতায় মত্ত। নিজে নিজেই ঘুরে দাঁড়াল উল্টোপথে। যুবক অতিষ্ঠ! তৎক্ষনাৎ দাঁত চাপলো অধর কোণে। রাগে গজগজ করতে করতে অবশেষে হার মানল হৃদয়ের কাছে। বিড়বিড় করে শুধালো,
“ জানোয়ারের বাচ্চাটা জ্ঞান হারিয়েও শান্তি দিবে না আমায়! অসভ্য মেয়েছেলে একটা!”
বলতে বলতেই পা ছুটলো মুগ্ধের। ফের লেজ গুটিয়ে চলে এলো মেয়েটার কক্ষে। ধুপধাপ পায়ে জোরালো শব্দ তুলে এগোলো বিছানার ধারে। তবুও মেয়েটার গভীর নিদ্রায় ভাটি পড়ল না একফোঁটাও! মুগ্ধ কিয়তক্ষন বাঁকা চোখে চেয়ে রইল মেয়েটার ঘুমন্ত মুখশ্রীর পানে। পরপরই দাঁত খিঁচে আওড়াল,
“ আর কতো জ্বালাবি আমায়? এভাবে না জ্বালিয়ে একেবারে মে’রে ফেল বান্দীর মেয়ে। তাতে যদি তোর আর তোর বাপের শান্তি হয়!”
ঘুমন্ত মেয়েটা থোড়াই শুনল সে বাক্য! সে-তো ডুবে আছে দীর্ঘ নিদ্রায়। অন্যদিকে, রূঢ় মানব ব্যস্ত। ব্যস্ত ভঙ্গিতে পায়চারি চালাচ্ছে পুরো ঘরময়। যত দ্রুত সম্ভব মেয়েটার গা থেকে ভেজা কাপড়গুলো সরাতে হবে। নয়তো ঠান্ডা লেগে হাল হবে বেগতিক! তবে এ মহৎ কান্ডখানা করবে কে? পুরো পেন্টহাউজ জুড়ে সপ্তদশী বিনে একখানা মেয়েমানুষ নেই। তাহলে এবার? মুগ্ধ কেমন বিরক্ত হচ্ছে। সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলছে অনবরত। প্রায় বেশকিছুক্ষণ পায়চারি চালিয়ে যুবক অবশেষে স্থির হয়েছেন। কোমরের দুপাশে হাত ঠেকিয়ে আলতো করে ঘাড় কাত করে তাকিয়েছেন মেয়েটার পানে। মনে মনে ভাবতে লাগল,
“ তোকে যদি একটু ছুঁয়ে দিই, তাহলে কি খুব রাগ করবি সিগনোরা?”
মনের কথাটুকু মনের কোণেই সীমাবদ্ধ রইল রূঢ় মানবের। বুক ফুলিয়ে একখানা তপ্ত নিশ্বাস ফেলে, সে অবশেষে পা বাড়াল কাবার্ডের দিকে। সেথায় দাঁড়িয়ে স্লাইডিং দরজাটা একটানে খুলে নিয়ে, কাবার্ড হাতড়ে একখানা তোয়ালে নিলো হাতে। অতঃপর কোনরূপ বাড়তি উপায়ন্তর না পেয়ে যুবক কেমন গম্ভীর মুখে তোয়ালেটা সম্পূর্ণ পেঁচালো নিজ মুখমন্ডলে। পরপরই দক্ষ পায়ে গুনে গুনে এসে দাঁড়াল বিছানার কাছে। কাঁপা কাঁপা হাতদুটো তার ধীরে ধীরে স্পর্শ করল বিছানার দ্বার। অন্ধের ন্যায় হাতড়ে হাতড়ে ব্ল্যাঙ্কেটটা খুঁজে এনে তক্ষুনি তা একটানে ছড়িয়ে দিলো মেয়েটার গায়ে। পরক্ষণে ধীরে ধীরে হাত ছোঁয়াল অচেতন সপ্তদশীর উষ্ণ বদনে। মুহুর্তেই সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠল মাফিয়া বিস্টের। দ্বিধায় জর্জরিত হয়ে সে কেমন আলগোছে গুটিয়ে নিলো নিজ হাতদুটো। একবার চাইলো — সরে যাবে এক্ষুণি! তবে পরমুহূর্তেই ভাবল — মেয়েটা দূর্বল। অসুস্থ হয়ে গেলে তখন? এহেন দোলাচালে আটকে কিয়তক্ষন ঠায় দাঁড়িয়ে রইল মুগ্ধ। মিনিট দুয়েক পেরুতেই সে মুখ ঘোরালো অন্যত্র। অতঃপর বুক ফুলিয়ে একখানা লম্বা নিশ্বাস টেনে, একটানে মেয়েটার গা থেকে ছিঁড়ে ফেলল কুর্তাটা। পরপরই সঙ্গে সঙ্গে ফের ব্ল্যাঙ্কেট জড়িয়ে দিলো সপ্তদশীর অনাবৃত গায়ে। বাকিটুকু করবার আর সাধ্যিতে কুলোয়নি নির্দয় মানবের। বুকটা এমনিতেই যা ধড়াস ধড়াস করছে তার! বাকিটা করতে গেলে নির্ঘাত হার্ট অ্যাটাক হবে বেচারার। মুগ্ধ তক্ষুনি উল্টোপথ ধরল। অন্ধের ন্যায় ছুটে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। করিডর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটানে মুখমণ্ডল থেকে খুলে নিলো তোয়ালেটা। বুক ফুলিয়ে হাঁপাচ্ছে মুগ্ধ! মনে হচ্ছে এই বুঝি কোনো এক যুদ্ধ থেকে বেঁচে ফিরেছে মানব। তার হাতদুটো কাঁপছে ভীষণ। পাহাড়সম দেহটা মাতালের ন্যায় ঢুলছে! যুবক কেমন আলগোছে নিজ হাতদুটো এগিয়ে আনলো অক্ষিপুটের সম্মুখে। রুক্ষ হাতদুটোর পৃষ্ঠতলে বোধহয় এখনো লেপ্টে আছে মেয়েটার নরম তুলতুলে বদনের পরশ। মুগ্ধের তখন কি হলো কে জানে! সে কেমন নিজ অজান্তেই হাতদুটো এগিয়ে আনতে লাগল নিজ মুখের কাছে। তার রুক্ষ অধরযুগল প্রায় ছুঁই ছুঁই তার হাত। আর ওমনি তার বিচক্ষণ মস্তিষ্ক তড়াক করে জ্বলে উঠল যেন। আবদ্ধ অক্ষিপুটের পর্দায় ভাসমান হলো — মায়ের লোহুতে লেপ্টানো শরীর! তক্ষুনি থমকে দাঁড়ায় রূঢ় মানব। সহসা নিজ হাতদুটো নামিয়ে নিলো কঠোরতায়। অস্থির কদমে পা বাড়ায় সম্মুখে।
“ সপাং!” “ সপাং”
আবদ্ধ কামরার অভ্যন্তরীণ বাতাস কেটে শিস তুলছে চাবুক! সপাং সপাং শব্দের জোরালো আঘাত বলিষ্ঠ সুদর্শন দেহে পড়তেই কাটছে কক্ষের নিস্তব্ধতা। অদূরের সামনের দেয়ালে ঝুলছে অপ্সরা শ্যামৌপ্তী রায়ের তৈলচিত্র! তার ঠিক মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে মাফিয়া বিস্ট। চাবুকের একের পর এক রুষ্ট আঘাতে পিষ্ট করছে নিজ সুদর্শন দেহখানা! যুবকের ভাবভঙ্গি নিরুত্তাপ। মাথাভর্তি বাবরিছাঁটা বাদামী চুলগুলো এলোমেলো ভঙ্গিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ললাটের চারপাশে। তার উম্মুক্ত ফর্সা দেহে চাবুকের তীক্ষ্ম আঘাতে লালচে দাগ বসেছে ইতোমধ্যে! কোথাও কোথাও ফেটে গিয়েছে চামড়া। দৃশ্যমান হয়েছে গায়ের হাড়। পেটানো বক্ষের কিছু অংশ হতে নির্বিকারে গড়িয়ে পড়ছে উষ্ণ তাজা লহু। তবুও থামছেনা যুবক! বসাচ্ছে চাবুকের ঘাঁ। ঠিক তখনি, নিরব কামরার নিস্তব্ধতা ভেঙে আচানক শোনা গেল এক অতিপরিচিত কন্ঠ!
“ নিজেকে আর কতভাবে শাসাবে অধীর রায়? গায়ে আঘাত করলেই কি হৃদয় বাঁধ মানবে?”
মুহুর্তেই থমকায় মুগ্ধের ব্যস্ত হাত। ললাটতটে ছেয়ে থাকা বাদামী চুলগুলোর ফাঁকফোঁকর দিয়ে আলগোছে দৃষ্টি উঁচিয়ে তাকাল মায়ের ছবির পানে। সেথায় চকচকে কাঁচের দেয়ালে প্রতিবিম্বিত হচ্ছে — তারই আরেক প্রতিচ্ছবি। যুবক দাঁত খিঁচল! আবারও নিজ গায়ে চাবুক চালাতে চালাতে বিরক্ত কন্ঠে শুধালো,
“ আবার কেনো এলি তুই? চলে যা আমার সামনে থেকে।”
প্রতিবিম্বটি কেমন হো হো করে হেসে উঠল। ধীরেসুস্থে মুগ্ধের পেছন থেকে সরে এসে দাঁড়াল দৃষ্টিপটের সম্মুখে। প্রতিবিম্বটি দেখতে হুবহু মুগ্ধের মতো! তবে সে বেশ পরিপাটি। গায়ে জড়ানো একখানা ধূতি-কুর্তা। সে কেমন দু’হাত ভাঁজ করল বুকের কাছে। কন্ঠে সন্দিষ্ট ভাব ঢেলে আওড়াল,
“ তুই আর আমিতো একই অধীর! গত ২৪টা বছর ধরে আমি-ই তো তোর একমাত্র সঙ্গী হিসেবে বড় হয়েছি তাই না? তাহলে আজ আমায় চলে যেতে বলছিস যে?”
মুগ্ধ শক্ত করেছে চোয়াল! ব্যস্ত হাতে নিজ গায়ে চাবুক চালাতে চালাতে চোখদুটো খিঁচে আওড়াল,
“ আ’ম জাস্ট ফেড আপ উইথ দ্যাট ফা’কিং হ্যালুসিনেশনস। জাস্ট গো টু হেল বাস্টা’র্ড!”
আবারও হেসে ওঠে প্রতিবিম্বটি। হাসতে হাসতে দৃষ্টি সরু করে চাইলো মুগ্ধের পানে। অতঃপর কেমন বিজ্ঞের ন্যায় বলে উঠল,
“ নিজেকে এতো আঘাত করে কোনো লাভ নেই অধীর রায়! তুই তোর পিচ্চির প্রতি দূর্বল হয়েছিস, তা আজকে থেকে নয় সেই প্রথম দিন থেকেই। এন্ড দিস ইজ দ্য আলটিমেট ট্রুথ!”
থমকায় মুগ্ধ! চাবুক চালানো হাতদুটো তার থেমে গেল মুহুর্তেই। সে কেমন চোরের ন্যায় দৃষ্টি লুকলো নিজের। মেঝেতে অবিন্যস্ত ভাবে দৃষ্টি ছুঁইয়ে অনড় কন্ঠে বলে ওঠে,
“ না না! তুই মিথ্যে বলছিস। আমার কোনো দূর্বলতা নেই। ওর প্রতি আমার কোনো আবেগ নেই!”
“ ওহ রিয়েলি? তাহলে এপর্যন্ত যতবার মেয়েটাকে যতবার আঘাত করেছিস, ঠিক ততোবার নিজেকে পাল্টা আঘাত করেছিস কেনো? যতবার পিচ্চির গায়ে হাত তুলেছিস, ততবার নিজের গায়ে চাবুক চালিয়েছিস কেনো? যতবার ও কেঁদেছে, ততবার আড়াল থেকে ওকে একমনে দেখে গিয়েছিস কেনো? ও একবেলা না খেলে, তুই সারাদিন না খেয়ে থাকতি কেনো? তোর পুরো ঘরজুড়ে ওর বাংলাদেশে থাকাকালীন দৈনন্দিনের ছবি ঝুলছে কেনো? আজ ওর অনুমতি ছাড়া ওকে ছুঁয়েছিস বলে, নিজের গায়ে ওভাবে পাগলের মতো আঘাত করছিস কেনো? কেনো, কেনো, কেনো? উত্তর দে অধীর রায়! ও তো তোর কেউ না। তোর ভাষ্যমতে ও শুধুমাত্র তোর নেশা। নেশার জন্য কেউ এমন করে? দূর্বলতা না থাকলেই কেউ এমন করে?”
সহসা ঘাড় তুলল মুগ্ধ। অস্থির নেত্রে তাকাল মায়ের ছবির পানে। শুষ্ক কঠিন ঢোক গিলে তক্ষুনি কদম বাড়িয়ে এগিয়ে এলো মায়ের তৈলচিত্রের মুখোমুখি। উম্মাদের ন্যায় মায়ের পদযুগল স্পর্শ করে ভয়ার্ত কন্ঠে আওড়াল,
“ না না! আম্মা, আপনি ওর কথা বিশ্বাস করবেন না। আ..আমি এমন করিনি। আমি সত্যি প্রতিশোধ নিচ্ছি। আমি ঐ বান্দীর মেয়েকে ঘৃ…. আমি হ্যাঁ, ওকে ঘৃ..”
আশ্চর্য! আজ যে ঘৃণা শব্দটুকু জিভ খসে বেরুচ্ছে না যুবকের। তা দেখে ফের হেসে ওঠে প্রতিবিম্বটি। শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে বলে ওঠে,
“ যার জন্য ঘৃণা শব্দটুকু উচ্চারিত হচ্ছে না, তার প্রতি মাফিয়া বিস্ট কতটা অবসেসড, তা কি আলাদা করে বলে বোঝাতে হবে?”
তৎক্ষনাৎ শক্ত চোখে ঘাড় বাকিয়ে তাকায় মুগ্ধ। বেপরোয়ার ন্যায় হুংকার ছুঁড়ে প্রতিবিম্বের পানে এগিয়ে আসতেই হাওয়ায় মিলিয়ে গেল প্রতিবিম্বটি। পরক্ষণে তা ফের দেখা গেল পেছনে। সে এবার বলে ওঠে,
“ তুই মানিস বা না মানিস অধীর রায়, বাট ইট’স ট্রু দ্যাট ইউ্য আর ডিপলি অবসেসড উইথ হার।”
এহেন কথায় সহসা দু’হাতে নিজ মাথাটা চেপে ধরে মুগ্ধ। রাগে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে হিসহিসিয়ে গর্জন তুলে আওড়াল,
“ না না! আমি ওর প্রতি আসক্ত না। ওর বাপ একটা খুনি। একটা রেপিস্ট! ঐ জানোয়ারের বাচ্চা আমার মা’কে কেঁড়ে নিয়েছে আমার কাছ থেকে। আমি নির্দোষ হওয়া স্বত্বেও আমাকে ভোগ করিয়েছে নারকীয় শাস্তি! আমি… আমি ওকে মে’রে ফেলব। ওর পুরো বংশকে ধ্বংস করে ফেলব।”
“ আজ থেকে ২৪ বছর আগে তায়েফ এহসান যে-ই ভুলটা করেছিল, আজ সে-ই একই ভুল তুইও করছিস না তো? দোষ করলে তায়েফ এহসান করেছে, ওর মেয়ে না। তাহলে ওর প্রতি তোর এতো বিতৃষ্ণার আদৌও কোনো মূল্য আছে?”
থামল মুগ্ধ! কথাটা বুঝি হুট করেই অন্তরে গিয়ে লাগল তার। সত্যিই কি সে ভুল করছে? সত্যিই? ওদিকে প্রতিবিম্বটি এবার পা বাড়াল। মুগ্ধের পাশ ঘেঁষে এসে দাঁড়িয়ে আচমকা বলে উঠল,
“ এখনো সময় আছে নিজের অনুভুতিকে বুঝে নে অধীর রায়। বুঝে নে তুই ওর প্রতি কতটা আসক্ত, কতটা দূর্বল। পরে না আবার সময় চলে যায়।”
সহসা দু’ধারে মাথা নাড়ায় মুগ্ধ। শুকনো ফাঁকা ঢোক গিলে ফের তাকাল মায়ের ছবির পানে। নিজেকে শুধরে বলল,
“ আম্মা! আম্মা। আমি এমন কিছু করিনি আম্মা। আপনাকে দেওয়া কষ্ট ভুলে আমি আমার শত্রুর মেয়ের প্রতি দূর্বল হইনি আম্মা! আপনি বিশ্বাস করেন আম্মা! আমি আসলে…”
“ ঠিক আছে! তুই ওর প্রতি দূর্বল না তাই তো? তাহলে উঠা বন্দুক। যা, এক্ষুণি গু লি করে আয় ওকে। আর যদি ওকে আজ না মা’রতে পারিস, তাহলে তুই মানতে বাধ্য হবি — তুই তোর শত্রুর মেয়ের প্রতি কঠিনভাবে দূর্বল!”
কথাটা বোধহয় বড্ড গায়ে লাগল মাফিয়া বিস্টের। সে কেমন হন্তদন্ত পায়ে তক্ষুনি এগিয়ে এসে টেবিলের ওপর থেকে একখানা কড়া হুইস্কির বোতল তুলে নিলো হাতে। অতঃপর একনাগাড়ে কয়েক ঢোকে সম্পূর্ণ তরল টুকু গিলে খেয়েও বিন্দুমাত্র নেশা ধরল না রূঢ় মানবের। সে ফের আরেকখানা বোতল তুলল হাতে। পরপর দুটো বোতলের কড়া এলকোহল গেলা শেষেও যখন নেশা ধরেনি তার, ঠিক তখনি পেছন থেকে প্রতিবিম্বটি কেমন তাচ্ছিল্যের সুরে বলে ওঠে,
“ ধরবে না ধরবে না! কোনোকিছুতেই আজ নেশা ধরবে না। তোর নেশা আজ স্থানান্তরিত হয়েছে! গিয়ে মেয়েটাকে দেখ। দেখবি নেশা বলে কাকে!”
মুগ্ধ তাই করল। সহসা টেবিলের ওপর পড়ে থাকা রিভলবারটা হাতে তুলে গটগটিয়ে পা বাড়াল কক্ষের বাইরে।
ভোর হতে চললো প্রায়! রূঢ় মানবের গটগট পাদুকা তখনই এসে প্রবেশ করল মেয়েটার কক্ষে। সে কি রাগ তার! হিসহিসিয়ে যাচ্ছে ফণা তোলা সাপের ন্যায়। একহাতে বন্দুকের চাবি উঠিয়ে, বিছানার দ্বার ঘেঁষে এসে দাঁড়াল সে। পরক্ষণে অন্যত্র নজর বসিয়ে রিভলবার উঁচিয়ে তাক করল মেয়েটার দিকে। তার তর্জনী ইতোমধ্যেই প্রবেশ করেছে রিভলবারের চাবিতে! তর্জনী যে-ই না বাঁকা হবে ওমনি রূঢ় মানব ঘুরে তাকাল ঘুমন্ত মেয়েটার মুখপানে। আর তক্ষুনি থমকাল সে! আবারও আগের ন্যায় হারালো নিজেকে। নড়বড়ে হলো তার শক্ত হাত। হৃদয়ে ঝড় উঠেছে প্রবল! ঘুমন্ত মাহি’র নির্মল মুখের জ্যোতিতে চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে মুগ্ধের। সে স্পষ্ট টের পেল তার বন্দুক ধরে রাখা হাতটা বড্ড ভারী ঠেকছে এমুহূর্তে। একটা সময় বন্দুক হাত থেকে খসানোর পূর্বে, হাঁটু ভেঙে এলো রূঢ় মানবের। প্রতিশোধ — দূর্বলতার দোলাচলে অবশেষে নিজ অজান্তেই হার মানল মুগ্ধ! ধপ করে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ল মেঝেতে। আজ বড্ড দূর্বল হচ্ছে নির্দয় মানব। হৃদয়টা ভেঙে চৌচির হয়ে যাচ্ছে তার। বুকের ওঠানামার গতি বেড়েছে প্রবল। যুবক তক্ষুনি পিঠ ঠেকিয়ে বসল বিছানার সঙ্গে। দু’হাত বিছানায় তুলে মাথাটা সামান্য উঁচিয়ে দৃষ্টি তাক করল সিলিংয়ের পানে। অতঃপর বড্ড ভঙ্গুর কন্ঠে আওড়াল,
“ কি করলি আমায় বান্দীর মেয়ে? কেনো করলি এটা? এবার আমি কোন মুখে দাঁড়াব আমার মায়ের সামনে? কোন মুখে তাকে বলব — আমি আমার শত্রুর মেয়ের.. ”
থামল মুগ্ধ। পাশে পড়ে থাকা রিভলবারটার পানে তাকিয়ে রইল একদৃষ্টে। পরক্ষণে যুবক বোধহয় হারালো নিজ বোধবুদ্ধি! তক্ষুনি রিভলবারটা তুলে আনল। দুপা মেঝেতে ছড়িয়ে চোখদুটো বুঁজে রেখে অত্যন্ত করুণ সুরে গাইতে লাগল,
মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪৫
“ আমার আকাশে আজ বরিসরন
কালো মেঘে ঢাকা এ মন,
ফিরে তো পাবো না,
তোমাকে কভু আর,
হবে না তুমি তো আমার…!
খুলে মনোদ্বার
ভাঙ্গা মন-আমার
খুঁজে তোমাকেই বারে-বার”
গাইতে গাইতেই যুবক আচানক বন্দুক ঠেকাল নিজ মাথার বাঁপাশে। চোখদুটো বুঁজে রেখে আনমনে বলল,
“ তোকে মা-রার চেয়ে, ম’রা সহজ পিচ্চি!”
