Home বাবুই পাখির সুখী নীড় বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৬০

বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৬০

বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৬০
ইশরাত জাহান

বটগাছের নিচে বসে থাকতে থাকতে শোভার কান্না থেমে গেছে।চোখ মুছে নিজেকেই বলল, “আর কেঁদে কি হবে?পাকনামি করে ক্ষেপা লোকের সাথে উল্টো ক্ষেপে ছিলাম।শাস্তি তো ভোগ করতেই হবে।”
একটু থেমে চোখের পানি মুছে আশপাশ তাকালো।ভয়ে আরেকটু জড়ো হয়ে বসে বলে,“এভাবে থাকতে থাকতে কখন জানি ভূতগুলো এসে আমার জান নিয়ে চলে যায়!”

কথাটা বলতে গিয়েও গলাটা কেঁপে গেল।শুকনো পাতার মোচড় মোচড় শব্দ হল।শোভা তৎক্ষণাৎ চমকে উঠল।কিন্তু এবার আর কাঁদল না।বসা থেকে দ্রুত দাঁড়িয়ে গেল।গভীর অন্ধকারের মধ্যে পাতার মড়মড় শব্দের ইঙ্গিত বুঝে সেদিক তাকিয়ে বলে,“ভূত কি তবে সত্যি সত্যি আসছে!জীবনে প্রথম ভূতের সাথে দেখা হবে আমার।আল্লাহ আমাকে রক্ষা করো।এমন শক্তি দেও যেনো ভূত আমার কিছুই করতে না পারে।”
কথাটুকু বলেই এক পা দুই পা বাড়াতে থাকে।কোনদিক যাচ্ছে নিজেও জানে না।ভয়ে আয়াতুল কুরসী পড়ে নিজের মত করে এগোচ্ছে।হঠাৎ একটু আলোর ঝলকানি দেখা দিলো।মোবাইলের আলো হাতে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।শোভা দেখলো ভালোভাবে।বুঝলো তার স্বামী দাঁড়িয়ে সেখানে।মুখটা অভিমানে শুকনো করে বলে,“শাস্তি দিচ্ছেন?দেন।কিন্তু আপনি এখানে লুকিয়ে আছেন কেন!”

দর্শন আড়ালেই চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল।শোভা উত্তর না পাওয়ায় ভয়ে চুপসে গেলো।ভাবলো এটা দর্শনের রূপ ধারণ করা কোনো ভূত।ভয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটা বটগাছ থেকে আরেকটা বটগাছের কাছে গেল।সাহস করে যেতে থাকলো কিন্তু হাত কাঁপছে।ওটা যদি দর্শন না হয়!তখন তো আরেক বিপদ।ভূতের কাছে নিজেকে শপে দেওয়া হবে।গাছটার দিকে ভয়ে না তাকিয়ে নিচমুখী আয়াতুল কুরসী ও তিন কুল পড়ে নেয় জোরে জোরে।কয়েকবার পড়ে দর্শনের দিকে ফু দেয়। নাহ! ভূত গেলো না উল্টো দর্শন ঠায় দাঁড়িয়ে।শোভা কয়েকবার ফু দেয়।দিতে দিয়ে দর্শনের নিকটে চলে এসেছে।একদম মুখের সামনে চলে এসে দোয়া পড়ে ফু দিলো আবারও।গেলো না ভূত।অতঃপর শোভা হার মানলো।শুনতে পেলো গম্ভীর কণ্ঠে, “ভূত তাড়ানো হয়েছে তোমার?”

শোভা বুঝলো এটা দর্শন নিজেই।তার রূপে কেউ না।শোভা মিনমিন করে বলে,“আমি বলেছিলাম দূরে থাকতে চাই।তাই বলে এমন দূরে!”
দর্শন চুপ করেই আছে।শোভা চোখ নামিয়ে খুব আস্তে করে আবারও বলল,“একটু পরে এসে আমার লাশ নিয়ে গেলেও পারতেন…”
কথাটা হজম হলো না দর্শনের।রাগ বাড়ল দ্বিগুণ।শোভার দুই কাধ শক্ত করে ধরে।শোভা দুর্বল ছিল তাই পরে যেতে নেয় কিন্তু পরে না।দর্শন সামলে নেয়।শোভা প্রথমে তাকাল না দর্শনের পানে।দর্শন দাঁত চেপে বলে,“তুমি স্বাধীনতা চেয়েছিলে দিয়েছি এখন আবার মরণের শখ প্রকাশ করো?এটাও কি তাহলে পূরণ করতে বলছো?”
শোভা এবার ভয়ে মাথা তুলে তাকাল।বলে,“স্বাধীনতা চেয়েছিলাম কিন্তু আমাকে রাতের বেলা একা ফেলে তো যেতে বলিনি।”

দর্শন থেমে গেল।শোভা ভয়তে ভুলভাল বকছে।আরো বলে,“আপনি জানেন আমি ভূতে কতটা ভয় পাই?আমার তো মনে হচ্ছিলো আমি আজকে মরেই যাবো।”
দর্শন শোভার গালে হাত ছুঁয়ে বলে,“আমি থাকতে তোমার ভূতকে ভয় পাওয়ার সাহস হয় কিভাবে?”
শোভার মাথা ভনভন করছে।দর্শন পাগল হয়েগেলো নাকি!ভূতের ভয় করতে আবার সাহস লাগে!শোভা কান্না করে দিয়ে বলে,“আপনি বুঝতে পারছে না নাকি? ভূত এসে আমার জীবন নিয়ে নিলে আপনি তখন বুঝতেন কেন ভয় পাই।”
দর্শন হুঙ্কার দিয়ে বলে,“কোথায় তোমার ভূত?আজ আমিও দেখব তার সাহস হয় কিভাবে আমার ওয়াইফির জীবন নিয়ে নিবে।”
শোভা আতকে উঠল।দর্শন হাতা গোটাতে গোটাতে বলে,“আজ ভূতের একদিন তো আমার একদিন।”
বলেই বটগাছের নিচে বসে পড়ে।শোভা ভয়ে দর্শনের সামনে বসা অবস্থায় বলে,“প্লীজ ভিতরে চলুন।এখানে থাকা ঠিক না।এই গভীর রাতে অন্ধকারে থাকা বিপদজনক।”

“কিসের বিপদ?আমি আছি যেখানে তোমার ভয় কেন সেখানে?”
“বিষয়টা আপনি থাকাতে নয়।”
“তাহলে?”
“ওরা আসলে কি আপনি পারবেন নাকি ওদের সাথে লড়াই করতে?”
“ওরা!ওরা আদৌ পৃথিবীতে আছে বলে তুমি বিশ্বাস করো?”
“করি।”
দর্শন রেগে গিয়ে বলে, “হোয়াট!”
শোভা কেঁপে উঠে দর্শনের মন গলাতে বলে,“না বিশ্বাস করি না।”
শোভার গালে আগলে রাখার মতো করে ধরে বলে,“ভেরি গুড।”
শোভা অনুরোধ করে,“এবার অন্তত ভিতরে চলুন।”
দর্শন বটগাছে হেলান দিয়ে বলে,“এখানেই ভালো লাগছে।ভিতরে যেতে মন চাইছে না।”
শোভা অজ্ঞান হয়ে যাবে যেনো।এই লোক যা শুরু করেছে।সাথে সাথে বলে,“তাহলে আপনি এখানে থাকুন আমি ভিতরে যাই?”

দর্শন আবারও ক্ষেপে গিয়ে বলে,“তারমানে তুমি নাটক করছিলে?আসলে ভূত বলতে কিছু আছে বলেই বিশ্বাস করো তুমি।”
শোভা দুইহাত নেড়ে না বুঝিয়ে বলে,“ না না,আমি তো এটা বলিনি।”
“মুখে না বললেও তুমি আসলেই বিশ্বাস করো।”
“কেন করছেন এমনটা?”
“তোমার ভ্রান্ত বিশ্বাসকে ভাঙিয়ে দিতে।”
“যা করার অন্য সময় কইরেন এখন চলেন নাহলে আমাকে যেতে দিন।”
“আবার জেদ করছ?”
শোভা ঢোক গিলে বলে, “জেদ কোথায় করলাম?”
“আমার কথা অমান্য করছ।”
“করছি না।”
“মিথ্যে বলবে না ওয়াইফি।তুমি ঠিকভাবে বলতে পারো না।ধরা পড়ে যাও।”

শোভা হতাশ হয়ে বসে পড়ল দর্শনের পাশে।দর্শন কিছুই বলল না।আজকে শোভাকে বোঝাতে চায় ভূত বলে আসলেই কিছু নেই।এগুলো তার ভ্রান্ত ধারণা।
কিছুক্ষণ বসে থাকার পর পরিবেশ শীতল হয়ে এলো।গাছের পাতা নড়ছে।ঠান্ডা পরিবেশে ঘুমঘুম ভাব চলে এলো শোভার চোখে।লম্বা চুলগুলো খোপা করা।ভয়ে ভয়ে বসে থাকা শোভার এখন ঘুমে ঝিমাতে হচ্ছে।ঝিমাতে ঝিমাতে ঢলে পড়ল দর্শনের কাঁধের উপর।
আচমকা শরীরের উপর শোভার ভার পেয়ে দর্শন মৃদু হাসে।শোভার মাথায় হাত রাখে।খোপা খুলে ঢিলে হয়ে আসে।শোভার মাথার উপর নিজের মুখ রাখে।নিশ্বাস নিয়ে শোভার চুলের ঘ্রাণ নিতে থাকে।ঠিক যেনো নেশায় আটকে গেলো এই ঘ্রাণে।
আচমকা বিদ্যুৎ চমকে উঠল।কেঁপে উঠল শোভা।বিদ্যুৎ চমকানোর শব্দে কেঁপে উঠেই জড়িয়ে ধরলো দর্শনকে।নিজে থেকে শোভা এভাবে জড়িয়ে ধরার কারণে দর্শনের যেনো প্রশান্তি অনুভব হলো।ঠান্ডা পরিবেশে বউয়ের মুখটা নিজের বুকের মাঝে পেলো।জায়গাটা কেমন নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে।বিদ্যুৎ চমকানোর সময় কয়েক সেকেন্ডের জন্য আলো ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে।সেই মুহূর্তে শোভার জড়িয়ে ধরা স্পষ্ট চোখে ভাসে দর্শনের।শোভা আবারও অনুরোধ করে,“বৃষ্টি আসবে।এবার অন্তত ভিতরে চলুন।”

“তুমি না বৃষ্টিতে ভিজতে ভালোবাসো?”
“এই অন্ধকার রাতে!কখনোই সম্ভব না।”
“ভিজতে আবার দিনরাত লাগে নাকি?”
“বৃষ্টিতে ভিজতে মন লাগে এখন আমার সেই মন নেই।”
“কেন?”
“পরিবেশ কতটা ভয়ংকর দেখেছেন আপনি?চারপাশে বটগাছগুলো কেমন দেখাচ্ছে।দেখলেই তো গা কেঁপে উঠছে।”
দর্শন এবার ডানহাত শোভার পিঠে রেখে জড়িয়ে ধরে।বলে,“এবার আর ভয় করবে না ওয়াইফি।”
শোভা উত্তেজিত হয়ে বলে,“আপনার তারপরও ভিজতে হবে?”
“হুমম,হবে।”
ঝুম বৃষ্টির মাঝে আবারও বিদ্যুৎ চমকে উঠল।শোভা আরো বেশি শক্ত করে জড়িয়ে ধরে দর্শনকে।দর্শন গ্রহণ করে নেয় আলিঙ্গন।শোভার চুলগুলো এখন এলোমেলো হয়ে আছে।গায়ের ওড়না একপাশ থেকে সরে আসে।এই পরিস্থিতে এসে দর্শনের মধ্যে এতদিনের জমে রাখা স্বামীর অধিকার জাগ্রত হলো।শোভা কাপতে থাকে।দুজনেই ভিজে নাজেহাল।শোভার পিঠের উপর দিয়ে হাত একটু একটু করে নাড়াতে থাকে দর্শন। এতে করে শোভার কম্পন আরো বেশি বোঝা যায়।শোভা মাথা উঁচু করতে নিলে দর্শন হাত দিয়ে চেপে ধরে।মাথা উঁচু করতে না পারলেও চোখ উপড়ে তুলল।অন্ধকারে দর্শনকে দেখা না গেলেও বিদ্যুৎ চমকানোর মাঝে দেখতে পেলো দর্শনকে।শোভা প্রশ্ন করে,“কি হয়েছে আপনার?”

দর্শন গম্ভীরভাবে বলে,“জানি না।”
বলেই শোভাকে আরো বেশি নিজের করার চেষ্টা করে।শোভা শিউরে ওঠে।দুইহাত দর্শনের বুকের মাঝে ছিল।এক হাত দিয়ে হাতড়াতে শুরু করে।দর্শনের পাশে গিয়ে বসার জন্য।কিন্তু অন্ধকারে হাত গেলো দর্শনের মুখের উপর।ঠিক দর্শনের ঠোঁটের কাছে এসে তিনটে আঙুল থেমে যায়। কেঁপে ওঠে শোভা। নিজে থেকে এই প্রথম দর্শনের ঠোঁটে নিজের আঙুল ছোঁয়ালো।লজ্জার সাথে ভালোলাগা কাজ করছে।হাত সরাতে নিলেই দর্শন বামহাত দিয়ে ধরে নেয় সাথে সাথে।শোভার হাতের পাতায় চুম্বন দিতে শুরু করে।শোভা চোখ তুলে তাকাতে নিলেও চোখের পাতায় বৃষ্টির পানি পড়ার কারণে চোখ টিপটিপ করে। যা একটু বিদ্যুৎ চমকানোর মাঝে দেখবার সুযোগ পায় তাও বৃষ্টির পানির কারণে সুযোগ হারিয়ে যায়।
এভাবে কিছুক্ষণ চলার পর আচমকা দর্শন শোভাকে উঁচু করে নিজের সামনে উপস্থিত করে।শোভা বুঝে ওঠার আগে দর্শনের আক্রমণ শুরু শোভার ঠোঁটের উপর।শোভা শিউরে ওঠে আগের থেকেও।কান মাথা ভনভন করতে থাকে এমন সময়।চারপাশ শূন্য শূন্য।
দর্শন যখন শোভার ঠোঁট ছেড়ে দেয় শোভা হাসফাঁস করতে শুরু করে।দমখুলে নিশ্বাস নিচ্ছে এবার।দর্শন যে তার অন্যান্য স্থানে হাত দিয়ে নিজের কাছে আটকে রেখেছে এটা মাথায় কাজ করছে।কয়েকবার নিশ্বাস ছাড়ার পর সেই অনুভূতি জাগ্রত হয়।তখনই বলে, “আ আমরা জঙ্গলে আছি।”
কানে ফিসফিস শব্দ ভেসে আসে,“তো?”

“বটগাছের নিচে।”
“তো?”
“বৃষ্টিতে ভিজছি।”
“তো?”
“এই গভীর রাতে।”
“তো?”
“এই পরিবেশে এগুলো ঠিক না।”
দর্শন শুনল না কথা।শোভাকে নিজের কাছে আটকে রাখতে আরো বেশি শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।শোভা চোখ বড় বড় করে।নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইলে দর্শন ফিসফিস করে বলে,“হুশ,আর কোনো কথা হবে না,ওয়াইফি।”

বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৫৯

বলেই শোভাকে পুরোপুরি নিজের করতে একের পর এক পদ্ধতি অবলম্বন করে।শোভা নিজেকে ছাড়াতে চাইলে দর্শন হাত দুটো নিয়ে এক হাতের ভাজে রেখে শোভার কানের লতিতে কামড়ে ধরে।শোভা ব্যাথা পেলে দর্শন বলে,“বেশি ছোটাছুটি করলে তোমার পুরো শরীরে লাভ বাইটে ভরিয়ে দিবো।ফলস্বরূপ আমার দেওয়া লাভ বাইট নিয়ে ঘরবন্দি থাকতে হবে তোমাকে।এমনটা না চাইলে চুপ থেকে আমাকে আমার কাজে সাহায্য করো।”
শোভা শুকনো ঢোক গিললো। দর্শনকে বাধা দেওয়ার শক্তি আর নেই।দর্শন তার কাজের লাইসেন্স যেনো পেয়ে গেলো।তাই আজ তার স্বামীর অধিকার পুরোপুরি দেখিয়ে দিতে নিজের শার্টের বোতাম খুলতে শুরু করে।

বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৬১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here