বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৫৭
ইশরাত জাহান
দর্শনের দিকে একনাগাড়ে চেয়ে আছে শোভা।নিজের অবস্থার কথা ভুলেই গেলো দর্শনের মন ভোলানো কথা শুনে।দর্শন চোখ বুলিয়ে শোভার পা থেকে মাথা অব্দি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে আর মনে মনে শোভাকে আরও লজ্জায় ফেলার প্লান করছে।শোভাকে নড়তে চড়তে না দেখে দর্শন নিজ থেকে অঘটন ঘটিয়ে দিলো।আচমকা শোভার ঠোঁট নিজের ঠোঁটের মাঝে আবদ্ধ করে।শোভা এতক্ষণ দর্শনের দিকে মুগ্ধ নয়নে চেয়ে থাকলেও এমন আক্রমণে চোখ বড় বড় করে তাকায়।কিছুক্ষণ পর দর্শন আরও একধাপ এগিয়ে গেলো যেনো।শোভার গলায় আঙুল ছুঁয়ে দিচ্ছে। গলা থেকে ধীরে ধীরে আঙুল নিচের দিকে এগিয়ে নিয়ে আসছে।শোভার শরীর হিম হয়ে এলো।গলার আশপাশ কাটা দিয়ে যাচ্ছে।দর্শন সেদিকে নেশক্ত নয়নে চেয়ে শোভার চোখের দিকে চোখ রাখে।এই মুহূর্তে দর্শনের চোখের কোণা লাল।শোভার বিশ্বাস ভারী।নিশ্বাসের ওঠানামার কারণে শোভার গলার নিচের অংশ আরো বেশি নেশালো দেখা দিলো দর্শনের নিকট।আঙুল ঠিক যেন সেদিকেই যাচ্ছে।আজ শোভাকে ভালোবাসা দিয়ে আরও বেশি লজ্জায় ফেলার ইচ্ছা জাগলো দর্শনের।ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে আঙুল ছোঁয়াতে নেয়।নিজেদের সম্পর্কের ধাপ বাড়িয়ে তুলতে নেয়।ঠিক তখনই কলিং বেল বেজে উঠল।শোভা হুসে ফিরে আসে।দর্শনের দিকে চেয়ে দূরে সরে আসে।নিচে পড়ে থাকা ওড়না বুকে জড়িয়ে বলে, “দিজা এসেছে বোধহয়।”
দর্শন ঠোঁট মুছলো বুড়ো আঙুলের সাহায্যে।কিছুটা বিরক্ত ভাব মুখে ফুটে উঠেছে।শোভাকে স্বাভাবিকভাবে বলে,“হুম।”
শোভা বাইরে বাইরে যেতে যেতে বলে,“আচ্ছা আপনি দরজাটা খুলুন।আমি ওর ঘরে যাচ্ছি।বইগুলো আনতে ভুলেই গেছিলাম।”
দর্শন উত্তর না দিয়ে চলে গেলো নিচে। শোভা চলে এলো দিজার ঘরে।টেবিল থেকে বই হাতে নিয়ে যেই দরজার দিকে ঘুরতে নিবে শোভার কোমরের সাথে টেবিলের ধাক্কা লেগে একটা ডায়েরি নিচে পড়ে যায়।শোভা কোমরে প্রচণ্ড ব্যাথা পায়।বইগুলো টেবিলের উপর রেখে কোমরে হাত রেখে দেখে কোমরের দিকের চামড়া ছিলে গেছে।অল্প রক্ত আছে সেদিকে।ব্যাথা সহ্য করার চেষ্টা করে নিচের দিকে তাকাতেই দেখতে পায় কয়েকটা ছবি ও ডায়েরি নিচে পড়ে আছে।ছবিগুলো দেখে শোভা অবাক।এই ছবির মালিককে শোভা চেনে।খুব ভালো করেই।এ যে দর্শনের বেস্ট ফ্রেন্ড তুহিন।তুহিনের ছবি ফ্লোর থেকে হাতে নিলো শোভা।ছবির পিছনে লাল কলম দিয়ে হার্ট আকানো।তার নিচে লেখা ডি লাভ টি।তুহিনের আরেকটা ছবির সাথে আঠা দিয়ে দিজার ছবি যুক্ত করা।যেগুলো দেখে শোভা যেনো অবাক।এমন কাজকারবারের অনুভূতি কেমন শোভা জানে না। দিজার এসব কর্মের কারণ শোভার কাছে অস্বস্তিকর ঠেকলো। দিজা একটা মেয়ে হয়ে পরপুরুষের ছবি রাখছে নিজের কাছে।তাও কিনা দর্শনের বন্ধুর।দর্শন জানতে পারলে কেলেংকারি হয়ে যাবে।শোভা ডায়েরির উন্মুক্ত পাতায় চোখ মেলে দেখলো।সেখানে লেখা,“আপনাকে দেখার জন্য আমার দু চোখ অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় আছে মিস্টার মাহমুদ।এই চোখের অপেক্ষা আমি শীগ্রই শেষ করব।”
আরেক পাতায় আরও অনেক কিছু লেখা।যেগুলো পড়ে শোভা বুঝলো তার একমাত্র ননদ খুব ভালোভাবে ফেঁসে গেছে তার স্বামীর বন্ধুর প্রতি।শোভা এসব জানতে পেরে দর্শনের বলা কথাগুলো ভাবছে।এই ভালোবাসার মূল্য তো দর্শন দিবে না।তাছাড়া পরপুরুষ নিয়ে এসব ভাবা তো পাপ।শোভার মতো মেয়ের কাছে এসব পাপ।একটা মেয়ের নজরে শুধু তার স্বামীর জন্যই সবকিছু থাকবে।তুহিন যদি দিজার স্বামী হতো তাহলে কথা ছিল কিন্তু ওরা তো অবিবাহিত।দরজায় খট করে শব্দ হওয়ায় শোভা চমকে ওঠে।গা কেঁপে পিছন ফিরতেই দিজাকে দেখে স্তব্ধ হয়ে থাকে।শোভার হাতে ছবি ও ডায়েরি দেখে দিজা নিজেও ঘাবড়ে গেল। ধীর পায়ে কাপতে কাপতে শোভার নিকট এগিয়ে আসছে।শোভার সামনে অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে নিচের দিকে চোখ রেখে ভাবছে কি করবে।শোভাও চুপ করে দেখে যাচ্ছে দিজাকে।শোভা কি বলবে সেও বুঝতে পারছে না।আসলেই কি শোভার এই বিষয়ে মুখ খোলা উচিত?দর্শনের সাথে তার সম্পর্ক সবে ঠিক হলো।এই মুহূর্তে সে কি নতুন অশান্তি শুরু করবে নাকি এগুলো না জানার অভিনয় করে চুপ থাকবে?মাথায় আসছে না।কিছুক্ষণ নীরবতা পালন করে দিজা কাপা কাপা কণ্ঠে বলে,“ভাইজানকে কিছু বলো না প্লীজ।”
শোভা দেখছে দিজার চোখ বেয়ে পানি পড়ছে।হাত পা পুরো কাপছে মেয়েটার।অপরাধীর মতো মুখ করে আছে।শোভা প্রশ্ন করে,“তোমার কি এসব করতে একটুও ভয় করেনি?”
দিজা মাথা নিচু করে।চোখের পানি মুছে বলে,“কাউকে ভালোবাসতে গেলে ভয় কাজ করে না।সেখানে কাজ করে ভালোবাসার ব্যক্তিটিকে নিজের করে পাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টাটা।”
শোভা শক্ত হয়ে প্রশ্ন করলো,“পারবে তো তোমার ভাইয়ের সামনে এগুলো বলতে?”
দিজা দ্রুত মাথা নাড়িয়ে বলে,“একদম না। আর তুমি এই বিষয়ে ভাইজানকে কিছু বলো না।আমি অনুরোধ করছি।”
শোভা বিরক্ত প্রকাশ করে বলে,“এক মুখে দুটো কথা বলছো কেন?একবার বললে ভালোবাসতে ভয় কাজ করেনা আবার বললে এগুলো তোমার ভাইজানকে বলা যাবে না।তাহলে করবে টা কি তুমি?”
দিজা ভাবনায় পড়ল।শোভা অপেক্ষা না করে জিজ্ঞাসা করে,“কি হলো?উত্তর দাও।”
দিজা আসলেই জানে না ও কিভাবে দর্শনের মতো ব্যক্তির সামনে নিজের ভালোবাসার কথা বলবে।তাছাড়া দিজা তো তুহিনের সামনেই এখনও ঠিকভাবে দাঁড়াতে পারেনি।তুহিনকে একপাক্ষিক ভালোবাসে।তুহিনের মনের কথা তো জানে না।এক প্রকার আবেগ কাজ করছে দিজার মধ্যে।সেই আবেগে আছে তুহিনকে না পেলে তিলে তিলে মারা যাবার চেষ্টা।শোভা চলে যেতে নিলে দিজা ওর হাত ধরে আটকে দিলো।শোভা হাত ছাড়িয়ে নেয়। দিজা কাপতে কাপতে বলে,“ভাইজানকে বলে দিবে নাকি?”
“এছাড়া কোনো উপায় আছে কি?”
“নাহ,না প্লীজ বলো না।”
“তাহলে কি করবে তুমি?”
“আমি কোনো একটা উপায় বের করব।”
“তোমার ভাইয়ের সাথে আমার সংসারটা দিনদিন উন্নতির দিকে যাচ্ছে।এমন কিছু করতে যেওনা যে কারণে সংসার ভেঙে যায়।”
দিজা মাথা নাড়িয়ে বলে,“আমার কারণে তোমার কিছুই হবে না।”
“তোমার ভাই এই সম্পর্ক কোনোদিন মানবে না।”
দিজা একটু ভেবে বলে,“তুমি ভাইজানকে মানিয়ে দিতে পারবে?”
শোভা চোখ বড় করে বলে,“পাগল নাকি?যেখানে আমি স্পষ্ট জানি যে লোকটা এই সম্পর্ক মানবে না সেখানে আমি তারপরও লোকটার সাথে এই নিয়ে কথা বলব?তার সম্পর্কে তো তুমি জানো।রেগে গেলে নিজের বাবা মাকেও চেনে না।এমন লোককে আমি কিভাবে মানাবো?”
“তাহলে তুমি ব্যাপারটা আমার উপর ছেড়ে দেও।আমি দেখছি কিভাবে আমি মিস্টার মাহমুদকে নিজের করে পেতে পারি।
শোভা সাহসের সাথে বলে,“কখনোই পাবে না।কারণ যাকে পেতে চেও সে নিজেও তোমাকে দূরে সরিয়ে দিবে।তার কাছে বন্ধুত্বের মূল্য অনেক।এটা নিশ্চয়ই জানো?”
দিজা আবারও হার মানলো।ভাবনায় পড়ল।কিছুক্ষণ ভেবে বলল,“ইচ্ছা যখন আছে উপায় তখন হবেই।তুমি দেখে নিও আমি আমার উদ্দেশ্য সফল করবই।”
শোভা বিরক্ত হলো।বলল,“এগুলো পাপ কাজ।জন্ম বিয়ে মৃত্যু আল্লাহর রহমতে হয়।এটাতে আমাদের হাত থাকে না।তুমি সেখানে কার সাথে তোমার বিয়ে হবে না জেনে না বুঝে একটা পুরুষের দিকে নজর রাখছো !কাল যদি ওই পুরুষের জীবনে অন্য নারী আসে সেই পুরুষ তো তোমার জন্য হারাম হয়ে যাবে।তোমার গুনাহ হবে।মাফ করতে পারবে তো নিজেকে তখন?”
দিজা নিজেও এবার বিরক্ত হলো। এতবার বলছে সে চেষ্টা করবে তুহিনকে পাবার তারপরও শোভা শুনছে না।তাই রেগে গিয়েই বলে,“চুপ করো তুমি।কি বোঝো তুমি ভালোবাসার?আমি ভালোবাসি তাকে।ভালো যখন বেসেছি একটা উপায় তো খুঁজে পাবো তাকে নিজের করবার জন্য।”
শোভা অবাক হয়ে বলে,“এটা কেমন আচরণ!”
“তোমার কথার সাথে এমন আচরণ না করে পারলাম না।ভালো করেই বুঝেছো আমি তাকে ভালোবাসি।তারপরও কেন আমাকে আঘাত দিতে চাইছো?”
“কাউকে ভালোবাসলে তাকে পাবার জন্য বুঝি মানুষ এমন পাগলামি করে?”
“এর থেকেও বেশি পাগলামি করবো আমি।যদি তুমি বাড়াবাড়ি করো আমি কিন্তু পাগলামি বাড়িয়ে দিবো।”
শোভা মনে মনে বলে,“ভাইবোন কি শুরু করলো!ভালোবাসার নামে পাগলামি করতে থাকে।আসলে ভালোবাসা জিনিসটাই কি পাগলামির!”
শোভা প্রশ্ন করে,“এটা শুধু পাগলামি না এটা…
বাকিটা বলার আগেই দিজা বলে,“তুমি যদি আমার ভালোবাসার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করো আমি কিন্তু নিজেকে শেষ করে দিবো।আমার জীবন শেষ হয়েগেলে এর দায়ী তুমি থাকবে।”
“কি করবে তুমি?”
“নিজেকে শেষ করে দিবো।এক কথায় যাকে বলে আত্মহত্যা করব আমি।”
শোভার আর সহ্য হলো না। ঠাস করে থাপ্পড় বসিয়ে দিলো দিজার গালে।কষ্ট পেয়েই বলে,“আমি নিজেকে ভাগ্যবতী ভাবতাম।তোমার মতো ননদ পেয়ে নিজেকে অভাগী থেকে দূরেই ভাবতাম।ভাবতাম যে আমার স্বামী দূরে আছে তো কি হয়েছে।আমি নাহয় অপেক্ষাতেই থাকি।তবুও শশুর বাড়ি থেকে সম্মান ভালোবাসা তো পাচ্ছি।মা,বাবা,দাদাজান,দেবর আর ননদ।সবাই কত ভালো।আমাকে ভালোবাসে।আমিও তাদের ভালোবাসি।কিন্তু নাহ।লোকের কথাটাই ঠিক।সম্পর্ক আমরা যতই মনে করি মজবুত থাকে আসলে সেটা মজবুত থাকে না।ঝড় হাওয়া এসে সম্পর্কের ফাটল সৃষ্টি করে।ঠিক যেমন তোমার আমার সম্পর্ক।ননদ ভাবির মিষ্টি সম্পর্ক আজ নষ্ট হলো এই ভালোবাসা নামক শব্দের কারণে।”
দিজা গালে হাত দিয়ে চুপ করে শুনছে সবকিছু।শোভা টেবিল থেকে বইগুলো নিয়ে দিজার দিকে চেয়ে বলে,“তোমার ভালোবাসার মধ্যে আমার কোনো অংশ থাকবে না।তুমি তাকে পেলে বা না পেলে এটা তোমার ব্যক্তিগত ব্যাপার।আমি এসব থেকে দূরে থাকবো।তোমার ভাইজান আর তুমি নিজেরা বোঝাপড়া করে নিও।আমি কাউকে আগ বাড়িয়ে কিছুই বলব না।কারণ দিনশেষে দোষ শুধু বাড়ির বউদের হয়।সেই দোষ নিজের ঘাড়ে না নিয়ে শান্তিতে সংসার করতে চাই আমি। এতে যদি আমাকে স্বার্থপর মনে হয় তবে আমি তাই।একটু সুখের সন্ধান করতে হলে স্বার্থপর হওয়া খুব জরুরি।”
শোভা চলে গেলো। দিজা চোখের পানি মুছে ছবি ও ডায়েরি লুকিয়ে রাখলো।এই ডায়েরিতে ছবিগুলো রাখা থাকে।ডায়েরি আজকে ব্যাগ থেকে বের করে আবার ব্যাগে রাখতে ভুলে যায় দিজা।তাই টেবিলের কোণায় রেখেই চলে যাওয়া হয়।আজ এই ভুলের জন্য দিজার এমন বিপদে পড়তে হলো।মন চাচ্ছে নিজের গালে নিজেকে থাপড়াতে।শোভার সাথে তর্ক করে নিজেকেই অপরাধী মনে করছে দিজা।কিন্তু তুহিনকে নিজে করবার জন্য শোভাকে কিছুই বলল না।
বইগুলো টেবিলের উপর রাখতেই দর্শনের উপস্থিতি বুঝলো শোভা।দরজার দিকে চোখ রাখতেই দেখলো দর্শন খাবার নিয়ে এসেছে।শোভা মৃদু হেসে প্রশ্ন করে,“আজকেও কি ভালোবাসা দিয়ে খাওয়া হবে?”
দর্শন কথা না বলে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিয়ে টেবিলের উপর থালা রাখলো।শোভা আবারও বলে, “দিজা আছে তো বাসায়।”
“তো?”
“একা একা খেতে ভালো লাগে কারো?”
“একা একা খাবে না তো স্বামী স্ত্রীর মাঝে কাবাব মে হাড্ডি হয়ে খাবে?”
“এটা কেমন কথা!”
“আমার ভালোবাসায় ব্যাঘাত ঘটাতে আসলে কথা এমন তো হবেই।”
“আপনি খুবই শক্ত মনের।
শোভার কথা শুনে দর্শন হেঁয়ালি হাসলো।এই শক্ত মন তো তাকে গড়ে দিয়েছে।শোভার দিকে এগিয়ে এসে শোভার কোমর জড়িয়ে ধরে বলে,“আমার শক্ত মনের সাথে যে নরম মনটা গড়ে উঠছে এটা দেখতে পাচ্ছো না ওয়াইফি?”
শোভা দর্শনের দিকে চোখ রেখে প্রশ্ন করে,“নরম মন!গড়ে উঠছে?”
“হ্যাঁ।”
“কোথায়?”
দর্শন আফসোস করে বলে,“এই পৃথিবীতে সবার ক্ষেত্রে আমি শক্ত থাকলেও একজন ব্যক্তির ক্ষেত্রে আমি নরম।আফসোস যার প্রতি নরম হয়ে উঠছি সেই বুঝলো না আমাকে।”
শোভা চোখ আওড়ালো দর্শনের মুখের দিকে।নিজেকে ইঙ্গিত করে যে দর্শন কথা বলছে খুব ভালোভাবে বুঝতে পারল।শোভা ভাবলো দিজার সাথে তুহিনের ব্যাপারটা নিয়ে।দর্শনকে বলে দুজনের বিয়ে দিলে একেবারে মন্দ হয়না। দিজা একজনকে ভালোবাসে আর ভবিষ্যতে আরেকজনকে বিয়ে করলে তো দিজার গুনাহ বাড়বে।স্বামী ব্যতীত অন্যজনকে নিয়ে ভাবাটা পাপের। যা করেছে দিজা তার শাস্তি শোভা দিতে পারে না কিন্তু উপায় তো আছে।শোভা আমতা আমতা করে বলে,“একটা কথা বলি?”
দর্শন শোভার নাকে নিজের নাক ছুঁয়ে বলে,“একটা না তুমি হাজারটা কথা বলো ওয়াইফি।আমি তোমার সবগুলো কথা মন দিয়ে শুনবো।”
শোভা চোখ বড় করে মুখ ভেংচি দিলো।বিরক্তির সাথে বলে,“আপনার এই ভালোবাসা ভালোবাসা পাগলামি বন্ধ করুন।”
“এটাই কি তোমার সেই একটা কথা।”
“না।”
“তাহলে ওই একটা কথাটাই বলো।”
“আপনি না বললেন হাজারটা কথা বলতে!”
“হাজারটা কথার মধ্যে আমার ভালোবাসা বন্ধ করতে বলার অধিকার আমি দেইনি তোমাকে,ওয়াইফি।”
“আপনার পাগলামির কারণে আমি নিজেই কবে জানি পাগল হই।”
দর্শন বাকা হেসে বলে,“ভালই হবে।দুই পাগলা পাগলীর সংসার।তুমি পাগলি আমি পাগল।এই পাগলীর সাথে পাগলের সংসার হবে ভালোবাসায় ভরা সংসার।”
শোভা নিজেকে দূরে সরিয়ে মাথায় হাত দিয়ে মুখ ফুলিয়ে নিশ্বাস ছেড়ে বলে,“আমি আসলেই পাগল হয়ে যাব।এমন করতে থাকলে কবে জানি আমি এখান থেকে দূরে কোথাও চলেই যাবো।”
শোভা কথাটা স্বাভাবিকভাবে বললেও দর্শনের হিংস্র রাগী মস্তিষ্ক এগুলো মানতে নারাজ। রাগে মাথা যেনো ফেটে যাচ্ছে দর্শনের।শোভার হাত ধরে টেনে নিজের নিকটে এনে শোভার কোমরে খামচে ধরে।এমনিতেই শোভার কোমরে ব্যথা ছিল এখন আবার খামচে ধরেছে দর্শন।ব্যথায় শোভা সরে যেতে চাইলে দর্শন আরও বেশি শক্ত করে চেপে ধরে।শোভা চোখ খিচে বলে,“ছাড়ুন আমাকে।”
“বারবার বলেছি আমি একবার যখন তোমাকে ধরেছি আর ছাড়ছি না।কথা কি কানে যায়না?”
শোভা কেঁপে উঠল দর্শনের হুংকারে।কোমরের ব্যথায় চোখে পানিও জমতে থাকে।এখনই টুপ করে চোখ দিয়ে পড়বে পড়বে ভাব।শোভা দূরে সরে যেতে চায়।চোখের পানি আড়ালে ফেলবে।দর্শনকে দেখাবে না।আর দর্শনের সাথে একটাও কথা বলবে না।মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলেও শোভার নীরবতা ক্ষেপিয়ে দিচ্ছে দর্শনকে।শোভার কোমরের ক্ষত স্থানে না জেনেই করে চেপে অন্য প্রান্তের কাধ ছুঁয়ে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দেয়।শোভার থুতনি চেপে ধরে বলে,“কি হলো উত্তর দেও?”
শোভা নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে।অযথা চেষ্টা।মেয়েটা যেনো বুদ্ধি হারিয়ে ফেলেছে।সেও রেগে আছে।এই সময় দর্শনকে ঠান্ডা রাখতে হবে এটা মাথায় নেই।ব্যাথা পেলে এতকিছু মাথায় থাকেনা।শোভা নিজেকে ছাড়াতে চাইলে দর্শন হাত শক্ত রেখেই শোভার দিকে হিংস্র চাহনির সাথে বলে,“আমার থেকে পালাবার চেষ্টা করলে তার ফল কিন্তু ভালো হবে না ওয়াইফি।তুমি এখন সম্পূর্ণ আমার।যেটা এই দর্শন ফরাজির রেজিস্ট্রিতে আছে সেটা কখনোই দর্শন ফরাজির জীবন থেকে হারিয়ে যেতে পারবে না।যদি হারিয়ে যায় তবে পাতাল থেকে হলেও নিজের সম্মুখে প্রস্তুত করবে।”
শোভার চোখ বেয়ে পানি এবার দর্শনের সম্মুখেই বেরিয়ে এলো।বেহায়া পানিগুলো শোভার কথা শুনল না।দর্শনের সামনে বের হতেই হলো।শোভার চোখে পানি দেখে দর্শন একটু নরম হলো।শোভার চোখের পানি মুছে দিয়ে বলে,“আমার বাধ্য বউ হয়ে চলবে।নাহলে আমার ভালবাসা রূপ বাদেও যে ভয়ংকর রূপ আছে সেটা দেখতে পাবে।”
শোভা ভয়ে দুর্বল হয়ে পড়ছে দর্শনের হুমকিতে।কোন কথা থেকে কোন কথা আসলো!কেমন পরিস্থিতিতে দুজনে ছিল আর কেমন পরিস্থিতি তৈরি হলো!শোভার মাথা কাজ করছে না।মন চাচ্ছে এই লোকের থেকে পাঁচশত হাত দূরে থাকতে।এই লোকের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতে।যার থেকে ভালোবাসা চেয়েছিল তার ভালোবাসা পেয়ে এবার পালাতে চায় শোভা।এতটাই ভয় পেয়েছে মেয়েটা।শোভার মুখে আলতো ছুঁয়ে অদূরে কণ্ঠে দর্শন প্রশ্ন করে,“বুঝেছো?”
শোভা কাপতে কাপতে উত্তর দেয়, “হ্ হ্যাঁ।”
“গুড,ভেরি গুড।তো কি বলতে চেয়েছিলে,বলো?”
শোভা ঘাবড়ে গিয়ে বলে, “ভু ভুলে গেছি।”
দর্শন এমনভাবে শোভার দিকে তাকালো যেনো দর্শন শোভাকে চুরি করতে গিয়ে ধরে ফেলেছে।শোভা ভয়ে সোজা হয়ে বলে,“মনে পড়ছে না।”
বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৫৬
“তাহলে মনে করে পরে বলো।এখন ল্যানস করে নেই।আমাকে আবার অফিসে যেতে হবে।”
শোভা দ্রুত খেতে বসলো। খাবারে হাত দিয়ে আড়চোখে দর্শনকে দেখে নিলো।ভাত নিয়ে নিজের মুখের সামনে আনতেই সেই খাবার দর্শন নিজের মুখে নিয়ে নেয়।শোভা নীরবে দেখলো শুধু।দর্শন নিজের হাতে ভাত নিয়ে শোভার মুখের সামনে ধরলো।শোভাকে ইঙ্গিত করতেই শোভা মুখে নিয়ে নেয়।মনে মনে দর্শনের গুষ্টি উদ্ধার করে মুখ দিয়ে দর্শনের হাতেই ভাত খাচ্ছে।
