মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪৩ (২)
jannatul firdaus mithila
“ জাস্ট লাইক ইউ্য নাহ?”
যুবকের এহেন পাল্টা উত্তরে দাঁত কিড়মিড়ানোর শব্দ বাড়ল তায়েফ সাহেবের। মলিন মুখখানায় তার মুহুর্তেই লেপ্টে গেল অদৃশ্য আগুন! খোঁচা খোঁচা আধপাকা দাঁড়িতে আবৃত চোয়ালখানা শক্ত হলো তৎক্ষনাৎ। চিড়বিড় কন্ঠে ফোনের ওপাশে থাকা রূঢ় মানবকে বলে উঠলেন,
“ বাস্টা’র্ড! তোমার শেষ দেখে ছাড়ব আমি। ভুলে যেও না, পিপীলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে।”
বাঁকা হাসল মুগ্ধ। তার সুদর্শন মুখখানায় আচমকা লেপ্টে গেল একরাশ কুটিলতার ছাপ! বাহাতে থাকা ফোনটা আলগোছে ঘুরিয়ে আনল ডান হাতের মুঠোয়। অতঃপর ফোনটা ফের কানে ঠেকিয়ে, নিজ বলিষ্ঠ দেহখানা খানিক নাড়িয়ে চাড়িয়ে কুটিল কন্ঠে আওড়াল :
“ উমমম! আই নো দ্যাট! বাট ইন মা’ই কেস, পিপীলিকা হচ্ছেন আপনিই ডিসি সাহেব। যার একটা একটা পাখা আমি রোজ একটু একটু করে কাটছি! গত ২৫ বছর ধরে বড্ড উড়েছেন আপনি। এবার সময় এসেছে একটু রেস্ট নেবার। চিন্তা করবেন না, আপনাকে আমি অতি শীঘ্রই কবরের নিচে রেস্টে পাঠাব। টিল দ্যাট, আমার কথা মনে করে প্রেশার বাড়াতে থাকুন। ওকে?”
থামল মুগ্ধ! কন্ঠে শ্লেষাত্মক হাসি টেনে কানের ওপর থেকে ফোনখানা আলগোছে নামাতে উদ্যোত হলো। ঠিক তখনি ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এলো তায়েফ সাহেবের অস্থির সন্দিগ্ধ কন্ঠ!
“ আমা-আমার মেয়ে কেমন আছে অধীর?”
থমকায় রূঢ় মানবের শক্তপোক্ত হাত! তামাকে পোড়া বাদামী ঠোঁটজোড়ায় আচানক দেখা মিললো এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি। তার গমগমে গলার স্বর পরিবর্তন হয়ে সেথায় এবার শোনা গেল শ্লেষাত্মক ভাবভঙ্গি! সে কেমন সময় নিয়ে গা দুলিয়ে হাসল দেখো। হাসতে হাসতে হুট করেই থেমে গিয়ে রাশভারী কন্ঠে প্রতিত্তোর করল,
“ ক্ষুধার্ত হিং স্র বাঘের কাছে শিকার যেমন অবস্থায় থাকে, ঠিক তেমন অবস্থাতেই অধীর রায়ের কাছে তার তুলতুলে শিকার মাহি এহসান রয়েছে। আশা করি আপনাকে আর ভেঙে বোঝাতে হবে না!”
সহসা বুকের খাঁচায় লুকায়িত হৃদয়টা দুমড়েমুচড়ে গেল তায়েফ এহসানের। মস্তিষ্ক হলো ফাঁকা! ওপাশ থেকে মুখের ওপর কল কেটেছে রূঢ় মানব। ইচ্ছেকৃত বিষাদে ডুবিয়েছে মধ্যবয়স্ক তায়েফ এহসানকে। এদিকে চোখদুটো আজ বাঁধ ভেঙেছে মধ্যবয়স্কের। অতীতের করা অনিচ্ছাকৃত অপরাধে ফের কুণ্ঠিত হয়েছে তার দাম্ভিক মস্তক! বুকের জোরালো ওঠানামার গতি যেন স্পষ্ট বলে দিচ্ছে —
“ এই বুঝি নিয়তি! নিজের করা পাপকর্মের ভোগান্তি পোহাচ্ছে আমার সন্তান! অধীর কি তবে সত্যিই বলল? আমি-ই কি সে-ই পিপীলিকা, যার পাখা কাটছে শ্যামৌপ্তী দেবীর ছেলে!”
রাশিয়া, সেইন্ট পিটার্সবার্গ!
ভোরের ম্লানতায় ডুবে আছে সেইন্ট পিটার্সবার্গের আকাশ। গহীন জঙ্গলের মধ্যিখানে নির্মিত ❝ মনস্টার প্যারাডাইস ❞ এ তখন এক অদ্ভুত শান্তি বিরাজমান! প্যালেসের নিচতলার একদম কর্ণারের কক্ষে ঠাঁই হয়েছে পারস্য সুন্দরী ডক্টর হায়া’র। স্বাস্থ্য সচেতন সুন্দরী সদ্য ঘুম ছেড়ে উঠেছে। ঘুম ঘুম চোখে মখমলি বিছানার নরম গদি হতে শরীর নামিয়ে পা রেখেছে শীতল মেঝেতে! সুন্দরীর পরনে রয়েছে একখানা ঘিয়ে রঙা স্যাটিন কাপড়ের পাতলা নাইটি। কিওপ্লেট্রার ন্যায় নিখাঁদ সৌন্দর্যের প্রতীকি বদনখানি তার, যেন বড্ড আঁটসাঁট হয়ে আঁটকে আছে স্যাটিন কাপড়ের আড়ালে। মাথাভর্তি এলোমেলো ব্লন্ড হেয়ার, বেয়াদবি দেখিয়ে আছড়ে পড়ছে যুবতীর সুশ্রী গৌরবর্ণা মুখখানার ওপর। অথচ যুবতীকে দেখো! সে কেমন বসে বসে ঝিমুচ্ছে! বিছানার একদম কাছ ঘেঁষে বসে থাকার দরুন তার মসৃণ পাদু’টো স্থান পেয়েছে মার্বেলের তকতকে মেঝের কোলে। সদ্য ঘুম বিচ্ছিন্ন মস্তিষ্কের অসারতায় প্রায় মিনিট পাঁচেক একই ভঙ্গিমায় বসে রইল হায়া। ধীরে ধীরে মস্তিষ্ক সচল হতেই বদনখানি নড়ল তার। উঠে দাঁড়াল বসা ছেড়ে! ঘুমের রেশে টলতে থাকা পাদু’টোয় ভর দিয়ে যুবতী অবশেষে এসে দাঁড়াল ড্রেসিং ভ্যানিটির বিশালাকার গোলাকৃতি আয়নার সম্মুখে। নিবু নিবু চোখদুটো তার ক্রমশ নিজেদের উম্মুক্ত করতে ব্যস্ত। তবে এরইমধ্যে হুট করেই সুন্দরীর কর্ণকুহরে ভেসে এলো কারো দাম্ভিক কদমের শব্দ! শান্ত, নির্জন কক্ষে বড্ড স্পষ্ট শোনাচ্ছে সে আওয়াজ। মুহুর্তেই স্থির হলো হায়া। তার চোখদুটোর পর্দা থেকে নিমিষেই কেটে গেল সকল তন্দ্রা। যুবতী ভয়ার্ত ঢোক গিলে যেই না ঘাড় বাকিয়ে পিছু ঘুরবে ঠিক তখনি একজোড়া শক্তপোক্ত হাতের মালিক তার রুক্ষ বাঁধন পেছন থেকে খপ করে আঁকড়ে ধরল সুন্দরীকে। সাথে নিজ লম্বাটে নাকখানা আলগোছে ডোবালো সুন্দরীর মসৃণ ঘাড়ে! এহেন অতর্কিত আক্রমণে ভড়কায় হায়া। ত্বরিত বিস্ফোরিত নেত্রে দৃষ্টিপাত করল সম্মুখের আয়নায়। পরক্ষণে আয়নার স্বচ্ছ কাঁচে অতিপরিচিত একখানা গম্ভীর মুখ দৃশ্যমান হতেই শান্ত হলো হায়া। বুক ফুলিয়ে একখানা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আওড়াল,
“ ওহ এলেক্স! কতবার বলেছি তোমায়, এভাবে হুটহাট পেছন থেকে এসে জড়িয়ে ধরবেনা! দেখলে তো, আবারও ভয় পেয়ে গেলাম। ভাবলাম কে না কে…”
মুখ ফসকে কথাটুকু অর্ধেক আওড়ালেও বাকিটুকু পূর্ণ করবার ফুরসত পেল না পারস্য সুন্দরী। তার আগেই যুবকের শক্তপোক্ত হাতের হেঁচকা টানে সর্বাঙ্গ সমেত ঘুরে দাঁড়াল পেছনমুখী হয়ে। হতবাক হায়া! হতচকিত নেত্রে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা গম্ভীর পুরুষের পানে তাকাতেই দেখল — ভ্রু-দ্বয় কুঁচকে রেখেছে এলেক্স। মুখখানায় তার চাপা ক্ষোভের ভাঁজ স্পষ্ট! তক্ষুণি আমতা আমতা করে ওঠে হায়া। জিভের ডগায় বাক সাজানোর কার্যে মত্ত সে। এরইমধ্যে গম্ভীর মুখো মানব কোনরূপ বলাকওয়া ছাড়াই নিজ রুক্ষ ঠোঁটের আশ্লেষী কায়দায় আলগোছে টেনে নিলো যুবতীর তিরতির করে কাপত্রয়ী গোলাপি আভায় ছেয়ে থাকা অধরযুগল। থমকায় হায়া! শুকনো ফাঁকা ঢোক গিলে একমুহূর্ত দাঁড়িয়ে রয় পাথুরে মুর্তির ন্যায়। ওদিকে যুবক অস্থির! নিজ অস্তিত্বের জানান দিতে বেপরোয়া সে। পারস্য সুন্দরী হাসল খানিক! বেপরোয়া,গম্ভীর মুখো উম্মাদ যুবককে বাগে আনতে নিজেও পরিশেষে তাল মেলাল তার সনে।
কিয়তক্ষনের গভীর উন্মত্ততায় মত্ত থেকে অবশেষে যুবতীর ওষ্ঠপুট ছাড়ল এলেক্স। হাঁপাতে হাঁপাতে তক্ষুনি এক ঝটকায় মেয়েটাকে তুলে নিলো পাঁজা কোলে। অতঃপর সিক্ত অধর কোণে দুষ্ট হাসির রেশ টেনে, পা টানল বিছানার দিকে। হায়া হাসছে! লাজুকলতার ন্যায় চোখদুটো গুটিয়ে হাসছে মানবী। তবে কান্ড দেখো! লাজুকলতার সে হাসির স্থায়িত্ব ছিল ক্ষনিকের। বিছানার দ্বারে এসে পৌঁছাতেই আচমকা তাকে মখমলি বিছানার কোলে ছুঁড়ে ফেলল এলেক্স। এহেন অতর্কিত কান্ডে ভড়কায় হায়া! বিচক্ষণে মস্তিষ্ক আগাম কিছুর টের পেয়ে তড়িঘড়ি করে সজাগ হলো যেন। এলেক্সের পানে হতচকিত দৃষ্টে তাকিয়ে থেকে মেয়েটা কেমন হতবাক কন্ঠে বলে ওঠে,
“ কি করতে চাচ্ছো তুমি এলেক্স? আজ এসব নয় প্লিজ। আ’ম অন মা’ই ডে!”
নির্দয় পাষন্ড পুরুষ থোড়াই শুনল সুন্দরীর সে বাক্য! সে কেমন নিজ উদ্যোগে এগিয়ে আসছে ভয়ার্ত রমণীর পানে। দু’হাতে নিরবে খুলছে শার্টের সবগুলো বোতাম! হায়া ভড়কায়! ভীতসন্ত্রস্ত ভঙ্গিতে পেছাতে লাগল একটু একটু করে। এলেক্স বাঁকা হাসল তা দেখে। তক্ষুনি বিছানায় ভর দিয়ে, ভয়ার্ত রমণীর দু’পা ধরে টেনে নিয়ে এলো নিজের কাছে। হায়া কাঁদছে এবার। দু’হাত জোর করে অনুনয় জুড়ে বলে ওঠে,
“ তুমি যখন যা বলো, যেভাবে বলো আমি তা-ই করি এলেক্স। তবে প্লিজ আজকে আমায় রেহাই দাও। আমি অসুস্থ!”
ক্রন্দনরত মেয়েটার ওপর সর্বাঙ্গের ভর ছাড়ল এলেক্স। রমণীর লালাভ আবরণে ছেয়ে থাকা বক্ষ বিভাজিকার সুডৌল আস্তরণের ভাঁজে একমুহূর্ত তীক্ষ্ণ দৃষ্টে তাকিয়ে থেকে, পরক্ষণেই সুন্দরী’র বাঁকান কায়া উম্মুক্ত করতে মত্ত হলো সে। কন্ঠে তাচ্ছিল্যের ছাপ ফুটিয়ে আওড়াল,
“ আই ডোন্ট কেয়ার সুইটহার্ট!”
সকালের ফুটফুটে আলোয় ছেয়ে গিয়েছে আবদ্ধ কামরা! সুনশান ঘুমন্ত কক্ষটিতে মাঝেমধ্যে শোনা যাচ্ছে কারো ব্যথাতুর ফোঁপানোর শব্দ। কক্ষের একমাত্র মখমলি বিছানাটার অবস্থা একেবারে বেগতিক! চাদরের গায়ে লেপ্টে আছে ছোপ ছোপ র ক্তে র উপস্থিতি। ন গ্ন গায়ের ওপর ব্ল্যাঙ্কেট পেঁচিয়ে অদূরেই বিছানার এককোণ ঘেঁষে ফোঁপাচ্ছে হায়া। চোখদুটো তার অবাধে ঝরাচ্ছে অশ্রু। সুশ্রী গৌরবর্ণা মুখখানায় তার হিং স্র আঁচড়ের দাগগুলি স্পষ্ট! যেন কোনো ক্ষুধার্ত প শু খুবলে খেয়েছে তার মসৃণ ত্বক। বিছানার অন্যপাশের হেড বোর্ডের সনে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে ঘর্মাক্ত এলেক্স। তার ডানহাতের তর্জনী এবং মধ্যমার ভাঁজে আঁটকে আছে একখানা মোটা সিগার। পাষণ্ড পুরুষ চোখবুঁজে হাঁপাচ্ছে! তার লোমহীন পেটানো দেহখানা হতে চুইয়ে পড়ছে ঘামের কণা। নাভিকমলের বড্ড নিচে ঠেকে আছে প্যান্টের কাঁধ! যুবকের একপা ঝুলছে মেঝেতে, অন্যপা উঁচিয়ে রাখা বিছানার কোলে। সিগারের শেষভাগে লম্বা একটা টান বসিয়ে যুবক কেমন গমগমে গলায় বলল,
“ দুপুরের দিকে প্যালেসের সকল মেইডদের নিয়ে ছাঁদে যাবে সুইটহার্ট! সঙ্গে নতুন মেয়েটাকেও নিবে। তারপর যেভাবেই হোক বক্সে গান বাজিয়ে ওকে বাধ্য করবে নাচতে।”
সহসা থমকায় হায়া। কান্না ভুলে হতবাক চোখে তাকিয়ে রইল কেমন। শুকনো ফাঁকা ঢোক গিলে বিস্ময়াহত কন্ঠে অস্ফুটে আওড়াল,
“ কিন্তু… কিন্তু প্যালেসে তো গান বাজানো অথবা নাচা নিষিদ্ধ! মনস্তার জানলে মৃ ত্যু নিশ্চিত এলেক্স।”
তৎক্ষনাৎ কুটিল হাসল এলেক্স। বদ্ধ চোখদুটোর পর্দা সরিয়ে ঘাড় কাত করে তাকাল মেয়েটার বিস্মিত মুখপানে। রয়েসয়ে রহস্যময় বাঁকা কন্ঠে শুধালো,
“ আমি তো তাই চাই ডার্লিং! যেভাবেই হোক গুড গার্লের মতো কাজটা করে ফেলবে ওকে?”
বলেই একলাফে বিছানা থেকে নেমে আসে এলেক্স। হাতে থাকা সিগারটা ঠোঁটের ফাঁকে গুঁজে রেখে গটগটিয়ে পা বাড়াল দরজার পানে। ঠিক তখনি পেছন থেকে ভেসে এলো হায়া’র নির্মল পরিশুদ্ধ কন্ঠ!
“ আমাকে বিয়ে করবে কবে এলেক্স?”
থামল যুবকের ব্যস্ত পদযুগল। অলক্ষ্যে ঠোঁটের কোণে অদ্ভুতভাবে ফুটে উঠল এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি। যুবক প্রতিত্তোরে কিছু না বলেই গটগটিয়ে চলে গেল ঘর ছেড়ে। এদিকে তার যাওয়ার পথে ছলছলে চোখে তাকিয়ে রইল হায়া। মিনিট খানেক যেতে না যেতেই বাঁধ ভাঙা কান্নায় লুটিয়ে পড়ে নিজ মুখটা ঢেকে নিলো দু’হাতের ভাঁজে। মোটা কন্ঠে বিড়বিড় করে বলল,
“ তোমাকে ভালোবাসাটা আমার এক জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল এলেক্স!”
সাউথ কোরিয়া ; জিজু আইল্যান্ড!
বালুময় পাড়ের কোল ছুঁয়ে দিচ্ছে নীলাভ সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ। ঢেউয়ের গর্জনে মুখরিত চারপাশ। ব্যস্ত পর্যটনময় আইল্যান্ডের চারপাশে গড়ে উঠেছে রিসোর্টসহ ধনীদের ব্যক্তিগত বাগানবাড়ি। তন্মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত বাগানবাড়ি হিসেবে পরিচিতি পাওয়া ডুপ্লেক্স বাড়িটার নাম হচ্ছে — হোয়াইট ভিলা। সাউথ কোরিয়ার অন্যতম ড্রা গ ডিলার লিউ ইয়াংয়ের বাড়ি বলে কথা! প্রায়শই পর্যটকরা দূর থেকে অবলোকন করে যান বাড়িটি।
হোয়াইট ভিলা’র টপ ফ্লোর! সম্পূর্ণ ফ্লোর জুড়ে সুইমিংপুল। মাথার ওপর ছাঁদ নেই! অদূরে দৃষ্টিপাত করলে সমুদ্রের নীলাভ কোল স্পষ্ট চক্ষুগোচর হবে যে কারো। উত্তপ্ত গরমে সুইমিংপুলের শীতল পানির নিচে গা ডুবিয়ে সাঁতরাচ্ছেন লিউ। তার সঙ্গী হিসেবে একঝাঁক নাট্যরমণী উপস্থিত সেথায়। মধ্যবয়স্কের প্রতি বড্ড নিবেদিত তারা। মানব যখন নিজ খুশিতে মত্ত ঠিক তখনি টপ ফ্লোরের মূখ্য দরজা দিয়ে হনহনিয়ে ছুটে এলো একঝাঁক সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষী। তারা এসেই কেমন বন্দুক উঁচাল লিউ’র পানে। এহেন অতর্কিত কান্ডে ভড়কায় লিউসহ তার নিবেদিতরা। কেউ কেউ ভয়ার্ত আবহে চেঁচাচ্ছে ভীষণ! লিউ কেমন ঢোক গিলে কন্ঠ উঁচাল। ভয়ার্ত কন্ঠে ডাক পাড়ল;
“ গ-গার্ডস!”
শোনেনি কেউ! শুনলে নিশ্চয়ই মনীবের ডাক অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা হতো না কারো। লিউ কাঁপছেন এবার। ভয়ে ভয়ে আমতা আমতা করে রক্ষীদের জিজ্ঞেস করলেন,
“ কে তোমরা? আমার বাড়িতে ঢুকলে কি করে?”
প্রতিত্তোরে কারো মুখে রা নেই তেমন! সকলের বন্দুকের নল হয়েছে আরও তীক্ষ্ণ। এরই মাঝে হুট করে সম্মুখের গার্ডেরা ভাগ হলেন দুপাশে। লিউ অবাক হলেন। হতবাক নেত্রে সম্মুখে তাকাতেই দেখলেন — সফেদ রঙা দামী স্যুট-ব্যুট পরিহিত এক বলিষ্ঠ পুরুষ এগিয়ে আসছে সগৌরবে। তার মাথার ওপর একখানা সফেদ রঙা গোলাকার টুপি। মাথাটা নুইয়ে থাকার দরুন যুবকের মুখাবয়ব স্পষ্ট নয়। মিনিট দুয়েক পার হতেই বলিষ্ঠ পুরুষের পায়ের গতিতে রুখ পড়ল। সে কদম থামাল সুইমিংপুলের একদম সন্নিকটে। অতঃপর ধীরে ধীরে নিজ নুইয়ে রাখা ঘাড়টা সামান্য উঁচিয়ে, ডানহাতে আলগোছে মাথার ওপর থেকে টুপিখানা নামিয়ে দৃশ্যমান করল নিজেকে। লিউ কেমন ভ্রু কুঁচকায় অপরিচিতকে দেখে। বিভ্রমে ডুবে আছে তার ঘোলাটে চোখদুটো! ওদিকে যুবক তীক্ষ্ণ হাসলেন। টুপিটা আলতো করে পেটের ধারে ঠেকিয়ে, নিজের ইন্ট্রো দেয়ার কায়দায় বলতে লাগলেন,
“ হেলো বাস্টা’র্ড! লেমমি ইন্ট্রোডিউস মাইসেল্ফ। আই এম এডউইন উইলসন! দ্য রাইট হ্যান্ড অফ দ্য গ্রেট রুশদী কিং। নাম তো সুনা হি হোগা?”
রুশদী কিং — নামটুকু কর্ণকুহরের ছেদঁ অতিক্রম করতেই সর্বাঙ্গে ঝংকার দিয়ে উঠল লিউ’য়ের। অসারতায় ডুব দিলো মস্তিষ্ক। শীতল পানির নিচে গা ডুবিয়ে রেখেও খরা নামল মানবের কন্ঠায়। চোখদুটো হয়েছে বিস্ফোরিত। লিউ তক্ষুনি সাঁতরে উঠে গেল পুলের অন্যপাশে। অতঃপর সকলের সম্মুখেই প্রাণভয়ে ছুট লাগাল নেক্সট ডোর দিয়ে। অথচ তার ওমন চলে যাওয়া দেখেও স্থির এডউইন। বাঁকা চোখে তাকিয়ে আছে কেবল। রুক্ষ দাঁতের চাপায় রুষ্টতার সাথে নিজ নিম্নাংশের ঠোঁটখানা খানিক পিষ্ট করে শ্লেষাত্মক কন্ঠে বলল,
“ প্রাণের ভয়ে শেষে কি-না নিজেই যমের কাছে দৌড়াচ্ছে। নট ব্যাড!”
প্রাণপনে দৌড়াচ্ছে লিউ! থামাথামির নাম নেই আজ। তার পায়ের গতি মাত্রই অতিক্রম করল বাড়ির সদর চৌকাঠ! সম্মুখের ওয়াক ওয়ে দিয়ে ছুটছে সে। বারবার ঘাড় বাকিয়ে তাকাচ্ছে পেছনে। খেয়াল করছে — সশস্ত্র রক্ষীরা আসছে কি-না। মানব যখন অন্যত্র তাকিয়ে থেকে দৌড়াতে মশগুল ঠিক তখনি একখানা ল্যাম্বরগিনী এসে আচমকা ঠুকে বসল মানবের পায়ের হাড়ে। সহসা ছিটকে পড়ল লিউ! ছিটকে গিয়ে তার কোমর ঠেকল কনক্রিটের জমিনে। মুহুর্তেই কোমরের ব্যথায় চিৎকার দিয়ে ওঠে বেচারা লিউ। একহাতে কোমর ডলতে ডলতে আঁতকা দৃষ্টি তাক করল সম্মুখে। অপরিচিত এক গাড়ি, তাও ঢুকেছে তার ব্যক্তিগত বাড়িতে! এ নিয়ে চিন্তায় মুদেছে লিউ। কপাল গুছিয়ে খেক খেক করে গাড়ির মালিককে জিজ্ঞেস করল,
“ কে আপনি? আমার বাড়িতে কি করছেন?”
তৎক্ষনাৎ জবাব আসেনি গাড়ির ভেতর থেকে। তবে মিনিট দুয়েক পেরুতেই গাড়ির ড্রাইভার কেমন হন্তদন্ত পায়ে বেরিয়ে এলেন ভেতর থেকে। ভীষণ বাধ্যতায় ঘাড় নুইয়ে আলগোছে খুলে দিলেন ব্যাকসিটের দরজা। তক্ষুনি দেখা মিলল এক দাম্ভিক পুরুষের। গায়ে তার বিদঘুটে কালো রঙা ওভারকোট, ভেতরের কালো রঙা শার্টের বেশক’টা বোতাম হা করে খুলে রাখা! ফলাফল স্বরুপ উম্মুক্ত হয়েছে রূঢ় মানবের লোমহীন পেটানো বক্ষ। মানবের গলায় ঝুলছে একখানা তীক্ষ্ণ প্রতীকী লকেট। মাথার ওপর ভর করেছে গোলাকার ফেডোরা টুপি! মুখ ঢাকা কালো রঙা মাস্কে। যুবকের ডানহাতের বৃদ্ধা এবং তর্জনীর চাপায় জ্বলন্ত সিগার। ব্যুট পরিহিত শক্ত দাম্ভিক পদযুগল সগৌরবে বেরিয়ে এলো গাড়ি থেকে। হতবাক লিউ কেমন হা করে তাকিয়ে আছে দেখো! অপরিচিত মানবের পানে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে হতভম্বতায় জিজ্ঞেস করে বসল,
“ ক-কে?”
মাস্কের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বাদামী ঠোঁটজোড়া বাঁকা হাসল বোধহয়। আঙুলের চাপায় আঁটকে রাখা সিগারটা খানিক নাড়িয়ে চাড়িয়ে ফের উঠে এলো মাস্কের ওপর দিয়ে ঠোঁটের ফাঁকে। সেথায় এক টান বসিয়ে রূঢ় মানব কেমন দাম্ভিক স্বরে আওড়াল,
“ ইউ্যর ড্যাডি ইজ হোম! ওয়েলকাম করবি না?”
ভড়কায় লিউ! আজকে তার ভড়কানোর দিন। মানবের হতবিহ্বল চোখদুটো সামনে তাকিয়ে আছে বোকার ন্যায়, ওদিকে ততক্ষণে এডউইন সহ বাকিরা এসে হাজির। ঘাড় নুইয়ে দাম্ভিক পুরুষকে কুর্নিশ জানিয়ে সকলে একযোগে বলে ওঠে,
“ হোলা মনস্তার!”
তক্ষুনি কেঁপে ওঠে লিউ। চক্ষু ছানাবড়া হয়ে ছুঁয়ে নিলো তার ললাট। বিস্ময়ে দুরত্ব বাড়ল ঠোঁটের ফাঁকে। হতভম্ব বেচারা ভুলেই গেল চোখ নোয়ানোর কথা। রূঢ় মানব ঘাড় কাত করে দেখল তা। তৎক্ষনাৎ গম্ভীর মুখে আদেশ ছুঁড়ল,
“ ওকে বেঁধে রাখ ওর বাড়িতে!”
হুকুম তামিলে মত্ত হলো এডউইন। সহসা এগিয়ে এসে শক্ত থাবায় আঁকড়ে ধরল লিউ’র মাথার তালুর চুল। অতঃপর বেচারাকে সেভাবেই টানতে টানতে নিয়ে গেল বাড়ি অব্ধি। লিউ কাঁদছে! শত অনুনয় জুড়ে নিজেকে ছাড়তে বলছে। তবে বালাইষাট! সে কাঁদা কি আর কাজে দেয়? অবশেষে মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই বেচারার মুখে কচটেপ, হাত-পা দু’টো পিছমোড়া করে বেঁধে রাখা সম্পন্ন হলো। কাজ শেষে চলে গেল এডউইন! বাইরে থেকে মোটাসোটা পাইপ লাইন দিয়ে কিসব উটকো গন্ধযুক্ত তরল ছিটচ্ছে বাকিরা। আবদ্ধ লিউ তৎক্ষনাৎ বোঝেনি এ তরল আসলে কি। তবে মুহুর্ত ব্যয়েই তার টনক নড়ল বুঝি! বুঝে গেল এ তরল আসলে পেট্রোল!
উচ্চমাত্রার দাহ্য তরলে গোসল সেরেছে লিউ’য়ের বাগানবাড়ি। বাড়ির সদর দরজার সম্মুখে সটানভাবে দাঁড়িয়ে আছে মনস্টার। ফুঁকছে পাঁচ নম্বর সিগার! দরজার ওপারে বসে আছে লিউ। তড়পাচ্ছে প্রাণভয়ে। মনস্টার দেখল সব! তবুও নির্দয় মানব চোখের পলকে ঠোঁটের ফাঁকে জ্বলতে থাকা সিগারটা এক টোকায় ছুঁড়ে ফেলল তরলে লেপ্টে থাকা বাড়িতে। মুহুর্তেই দাউদাউ করে জ্বলে উঠল হিং স্র দাবানল। আবদ্ধ কন্ঠে ব্যাপক গোঙানির শব্দে ভারী হলো চারপাশ। মনস্টার নির্বিকার! পকেট হাতড়ে আরেকখানা সিগার তুলে ঠোঁটের ফাঁকে বসিয়েছে সে। লাইটার বের করে যেই না সিগারের শেষ ভাগে আ গু ন ধরাবে ওমনি কানের ফাঁকে গুঁজে রাখা এয়ারপোডে শব্দ হলো রূঢ় মানবের। কেউ একজন ওপাশ থেকে অস্থির কন্ঠে বলল,
“ মনস্তার! ম্যাম ছাঁদ থেকে পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছে।”
থমকায় মুগ্ধ! থমকায় তার লাইটার ধরে রাখা হাত। লাইটারের আগুনটুকু বাতাসের ঝাপ্টায় দোল খেতে খেতে অবশেষে নিভে গেল একপর্যায়ে। আর ওমনি ধপ করে জ্বলে উঠল রূঢ় মানবের মস্তিষ্ক! অন্তরটা মুচড়ে উঠল অজানা কারণে। যুবক কেমন অস্থির হয়ে তক্ষুনি পা ঘোরালো উল্টোপথে। গটগটিয়ে এগোতে এগোতে হুংকার ছুঁড়ে বলল,
“ এডউইন! জেট রেডি কর। প্যালেসে যাব।”
আকাশ থেকে পড়ল এডউইন! তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এসে তাল মেলালো মনস্টারের দ্রুত পদের সঙ্গে। কন্ঠে ভড়কানো ভাব লেপ্টে আওড়াল,
“ কিন্তু মনস্তার! এখনো দু’শো মিলিয়ন পাউন্ডসের ডিল… ”
“ জাস্ট ফা’ক অফ এভরিথিং!”
বিকেল হবার যোগাড়! খোলা আকাশের নিচে কতগুলো প্রাণোচ্ছল প্রাণ বসে আছে গোলাকার ভঙ্গিতে। মধ্যকার ফাঁকা অংশে ঘুরছে একখানা কাঁচের বোতল। খেলা হচ্ছে ট্রুথ এন্ড ডেয়ার। সবসময় নিজেকে গুটিয়ে রাখা সপ্তদশী আজ বড্ড হাস্যজ্জল। এখানে আসার পর আজ প্রথমবার সকলের সঙ্গে মিশবার সুযোগ হলো তার। মেয়ে মেইডগুলো বড্ড মিশুকে। কি সুন্দর মিশেছে মেয়েটার সাথে! অথচ পুরুষ মেইডরা আসেইনি ছাঁদে! যদিওবা প্রথম প্রথম ডঃ হায়া’র উদ্যোগে সবাই রাজি হয়েছিল একযোগে টাইম স্পেন্ড করবে তবে পরক্ষণেই যখন জানল নতুন মেয়েটাও তাদের সাথে থাকবে, ওমনি লেজ গুটিয়ে পগারপার সব। হায়া অবশ্য জোর করেনি ওদের। একখানা বিশালকার গান বাজানোর বক্স নিয়ে উঠে এসেছে ছাঁদে।
মিলা আজ বড্ড গম্ভীর! তার শঙ্কিত দৃষ্টি অদূরে বসে থাকা হায়া’র পানে নিবদ্ধ। মেয়েটা কেমন ঘেঁষাঘেঁষি করছে মাহি’র সঙ্গে। মিলা ভাবুক হয়েছে বেশ। বিচক্ষণ মস্তিষ্কে বাজছে,
“ হায়া আজ এতো সুইট বিহেভ করছে কেনো? যে মেয়ে আগ বাড়িয়ে কারো সাথে কথা অব্ধি বলেনা, সে কি-না মুনলাইটের সঙ্গে নিজে থেকে খাতির জমাচ্ছে! এর পেছনে কোনো কারণ নেই তো?”
মিলার ভাবুক ভাবখানা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলোনা। তার আগেই বোতলের নল এসে ঠেকল তার দিকে। আর ওমনি পাশ থেকে হৈ হৈ করে উঠে সবাই। মিলা ভড়কায়! হতচকিত দৃষ্টিতে বোতলের পানে তাকাতেই বিরক্তিতে কুঁচকে যায় তার নাক-মুখ। সম্মুখ থেকে হায়া তখন তড়িঘড়ি করে বসা ছেড়ে দাঁড়িয়ে বলে ওঠে,
“ ইয়েএ! এবার তোমার পালা মিলা। এখন জলদি বলো, তুমি ট্রুথ নিবে নাকি ডেয়ার?”
কপাল গোছালো মিলা। নাখোশ ভঙ্গিতে জবাবে বলল,
“ ডেয়ার!”
অলক্ষ্যে বাঁকা হাসল পারস্য সুন্দরী। তক্ষুনি কুটিল বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগিয়ে বলে বসল,
“ তাহলে এক্ষুণি আমাদের সবার জন্য পাস্তা রেঁধে নিয়ে এসো।”
সহসা ভ্রু গোটায় মিলা। তিতিবিরক্ত মেজাজে বলে ওঠে,
“ অন্যকিছু বলো।”
নাছোড়বান্দা পারস্য সুন্দরী। ওতো সহজে হার মানার পাত্রী নয় সে। তৎক্ষনাৎ নিজ স্থানে বসে মাহি’কে শুনিয়ে শুনিয়ে ভাব নিয়ে গাল ফুলিয়ে বলে,
“ তাহলে আর কি করার! মানতে না চাইলে খেলা বাদ দিতে হবে।”
এহেন কথায় তক্ষুনি নড়েচড়ে উঠে মাহি। বোকা মানবী হায়া’র হয়ে মিলার নিকট প্রস্তাবিত কন্ঠে বলে ওঠে,
“ যাও না মিলা। তুমি তো ভালো রান্না পারো। আশা করি তোমার খুব একটা সমস্যা হবে না।”
কথাটুকু পূর্ণ হবার সঙ্গে সঙ্গে পাশ থেকে আরেক মেইড কেমন স্বদ্যোগে বলে ওঠে,
“ চলো মিলা! আমিও তোমাকে হেল্প করব।”
সকলের এহেন জোরাজোরিতে অবশেষে বাধ্য হয়ে রাঁধতে যেতে সায় জানালো মিলা। নাখোশ ভঙ্গিতে গটগট পায়ে চলে গেল ছাঁদ থেকে। সে যেতেই ফের বোতলে ঘূর্ণন বসালো হায়া। প্রতিটি মানুষের মনে আবারও বাড়ল উদ্যোগ। তবে এবার বোতলের নল এসে ঠেকল মাহি’র পানে। ওমনি খুশিতে আত্মহারা হায়া! ভীতু মাহি কেমন গুটিয়ে বসল। চশমাপরা মায়াবী চোখদুটো আড়াল হলো সকলের অলক্ষ্যে। হায়া কেমন অস্থির কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“ কি নিবে বলো? ট্রুথ অর ডেয়ার?”
কিছুক্ষণ সময় নিলো সপ্তদশী। দাঁতের রুষ্ট স্পর্শে ঠোঁট ছুঁইয়ে ভাবল কিয়তক্ষন। পরিশেষে জানালো,
“ ডেয়ার!”
বাঁকা হাসল হায়া। আচমকা মাহি’কে ডেয়ার দিয়ে বলল,
“ ওকে দ্যান! আমাদের সবাইকে নেচে দেখাও। উঁহুম, তুমি ‘ না ‘ বললে কিন্তু হবে না। যেমনই পারো, নাচতে হবে।”
এহেন কথায় বিপাকে পড়ল মাহি। ইতস্ততায় ছেয়ে গেল লাজুকলতার সর্বাঙ্গ। চিবুক নামল গলার কাছে। মেয়েটাকে কেমন মিনমিনে স্বরে বলল,
“ আমি আসলে তেমন ভালো নাচতে পারিনা।”
মুচকি হাসল হায়া। আলতো করে সপ্তদশীর কাঁধ চাপড়ে বলল,
“ যতটুকুই পারো! নাচো। নাচলে মন ভালো হয় জানো তো?”
সহসা দৃষ্টি উঁচায় মাহি। সন্দিগ্ধতায় ডুবে থেকে আমতা আমতা করে বলে,
“ কিন্তু গান ছাড়া নাচবো কিভাবে?”
এহেন কথা শেষ হবার পূর্বেই পাশ থেকে একখানা ছোট পেনড্রাইভ বের করে আনে হায়া। তা মাহি’র পানে এগিয়ে দিয়ে বলে বসে,
“ এই নাও! এখানে বাংলাদেশি অনেক গান আছে। তোমার পছন্দের প্লেলিস্ট থেকে একটা অন করে নেচে ফেলো!”
আনমনেই হেসে ওঠে মাহি। তক্ষুনি হায়া’র হাত থেকে পেনড্রাইভটা হাতে নিয়ে খুশি মনে বলল,
“ ওকে!”
হাওয়ার বেগে ছুটছে মনস্টারের গাড়ি! প্যারাডাইসের লোহার গেইট পেরিয়ে মাত্রই প্রবেশ করল প্যালেসে। দুর্বার গতিতে গাড়িটা অবশেষে এসে থামল প্যালেসের সদর দরজার পানে। যেথায় আগে থেকেই দাঁড়িয়ে আছে এলেক্স! গম্ভীর মুখে কপট ভাব ধরেছে হতভম্বতার। হন্যে হয়ে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো মুগ্ধ। পায়ের গতিতে টান বসিয়ে রূঢ় মানব কেমন গটগটিয়ে ঢুকল প্যালেসের ভেতরে। পেছন পেছন একপাশে এডউইন এবং অন্যপাশে এলেক্সও হাঁটা ধরল মানবের সঙ্গে। মুগ্ধ হাটতে হাটতেই কেমন কটমট কন্ঠে হুংকার ছুঁড়ে আওড়াল,
“ কোথায় বান্দীর মেয়ে?”
কথাটুকু আওড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই প্যালেসের গোলাকার ছাউনির ওপর থেকে ভেসে এলো গানের সুর। ওমনি থমকায় মুগ্ধের পদযুগল। মুহুর্তেই অগ্নিরূপ ধারণ করল মানবের মুখাবয়ব। হাতদুটো হলো মুষ্টিবদ্ধ! দৃঢ় চোয়ালটা কটমট করছে মুগ্ধের। বজ্রকঠিন কন্ঠে তক্ষুনি গর্জন তুলে আওড়াল,
“ প্যালেসে গান বাজানোর মতো এতবড় দুঃসাহস কোন জানোয়ারের বাচ্চার হয়েছে? গার্ড! আমার তলোয়ার দে!”
আঁতকে উঠে এডউইন। ভয়ার্ত আবহে আগ বাড়িয়ে যেইনা মনস্টারকে থামাতে যাবে ওমনি তার দৃষ্টি গিয়ে আটকাল এলেক্সের পানে। গম্ভীর মুখো এলেক্স কেমন বাঁকা হাসছে দেখো। ঘাড় কাত করে এডউইনকে আচমকা চোখ টিপে বসল সে। বিচক্ষণে এডউইন একে একে দুই মিলিয়ে বুঝে নিলো অনেককিছু। রূঢ় মানব চলে গিয়েছে বহুদূর। এডউইন মুহুর্তেই মনস্টারের পিছু ছুটতে চাইলে তার পথ এসে আটকাল এলেক্স। অলক্ষ্যে এডউইনের পেট বরাবর চেপে ধরল রিভলবারের ঠান্ডা নল। গম্ভীর মুখে বাঁকা কন্ঠে বলল,
“ রিল্যাক্স এডউইন! এতো ছোটাছুটি করছো কেনো? থামো একটু।”
একহাতে ধারালো তকতকে তলোয়ার! মুখাবয়ব রঙ ধরেছে হিং স্র তার। ক্ষিপ্রতায় ছাঁদের দিকে এগোচ্ছে রূঢ় মানব। তার ব্যস্ত পদযুগল ছাঁদের চৌকাঠে পা রাখতেই, তার ক্ষুব্ধ দৃষ্টি গিয়ে আটকালো অদূরে নৃত্যরত সপ্তদশী’র পানে। মুহুর্তেই থমকায় নির্দয় পুরুষ। তার চোখদুটোর আগুনে নিমিষেই নামল এক পশলা বৃষ্টি। শক্ত চোয়াল ছেড়েছে হাড়ের অংশ! হতবাক হয়েছে ক্রুদ্ধ মস্তিষ্ক। অদূরে মনের সুখে দক্ষ কায়দায় নাচছে মাহি। বক্সে তখন গান বাজছে,
“ হাতে চুরি ছাম ছাম বাজে। বসে না মন কোনো কাজে!
প্রেম আসে যায় এ মনে, তোকে না পাওয়ার কারণে!”
থমকানো রূঢ় মানবের কন্ঠায় নেমেছে একরাশ হতবাকতা। চোখেমুখে লেপ্টেছে অবাধ টান! তার হতবাক কন্ঠফুড়েঁ অস্ফুটে বেরুলো,
“ আমার পিচ্চি এতবড় হয়ে গেল কবে থেকে? শেষে কি-না আমাকে নাচাতে নাচাতে নিজেও এখন নাচছে?”
মাহি পায়ের তাল বাড়িয়েছে। পরনের গোলাকার জামার ভাঁজে হুট করে পা আঁটকে গেল সপ্তদশী’র। গায়ের ভরে দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে যেই না মুখ থুবড়ে উল্টে পড়বে ওমনি একজোড়া শক্তপোক্ত হাতের শক্ত বাঁধনে মুহুর্তেই আবদ্ধ হলো সপ্তদশী। তক্ষুনি তটস্থ সকলে! মনস্টারের উপস্থিতি দেখে লেজ গুটিয়ে পালালেন সকলে। এদিকে কাপত্রয়ী মাহি! দোদুল্যমান ক্ষুদ্র বদনখানি তার মেঝে থেকে বড্ড উঁচুতে। আঁটকে আছে কারো শক্ত বাঁধনে! ধীরে ধীরে কাঁপা কাঁপা চোখদুটো পর্দা সরালো মানবীর। ঘাড়ের মাংসল পেশী কুঁচকে মাথা উঁচু করে তাকাল সম্মুখে। আর ওমনি তার মায়াবী চোখদুটো ডুব দিলো সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়সম মানুষটার বাদামী চোখদুটোর মাঝে। মুহুর্তেই আকাশ থেকে পড়ল মাহি! শুকনো জিভের ডগা খানিক নাড়িয়ে চাড়িয়ে যেই না কিছু আওড়াবে তার আগেই শোনা গেল রূঢ় মানবের বাজখাঁই কন্ঠ!
“ যখন-তখন উড়ে এসে আমার গায়ে পড়িস কেন বান্দীর মেয়ে? হ্যান্ডসাম ছেলে দেখলে কাবু থাকে না নিজের ওপর। তাই না?”
হতভম্বতার আকাশ ভেঙে পড়ল মেয়েটার ওপর। কন্ঠে নামল চাপা ক্ষোভ। সে কেমন তিরতির মেজাজে বলল,
“ আমি আবার কখন আপনার গায়ে পড়লাম? আপনি তো নিজেই এগিয়ে এসে ধরলেন আমায়!”
রূঢ় মানব চোয়াল শক্ত করল এবার। দাঁত কিড়মিড় করে ফের ধমকের গলায় শুধালো,
“ তা নাহলে কি করতাম বান্দীর মেয়ে? যেভাবে বাঁদরের মতো লাফাচ্ছিলি! এক্ষুণি না ধরলে নির্ঘাত পড়ে গিয়ে হাত-পা ভাঙতি।”
“ ভাঙলে ভাঙতাম! তাতে আপনার কি?”
মেয়েটার এহেন পাল্টা উত্তরে রাগ বাড়ল মানবের। তিতিবিরক্তিতায় ছেয়ে গেল মুখ। কন্ঠে তেজ ঢেলে ফের আওড়াল,
“ মুখে দেখছি খই ফুটেছে! আমার গায়ে পড়ে, আমাকেই প্রশ্ন করা হচ্ছে? চাল নাম আমার গা থেকে!”
নাক ফোলায় মাহি! মুখটা অন্যত্র ঘুরিয়ে নিয়ে তেজ দেখিয়ে বলল,
“ আপনি ছাড়লে তবেই না নামতাম। আগে গা থেকে হাতটা সরান।”
এপর্যায়ে বাঁকা হাসল মুগ্ধ। যুবকের মাথায় চাপল এক অদ্ভুত দুষ্ট বুদ্ধি! সে কেমন চট করে জোর বাড়াল হাতের। রুক্ষ আঙুলগুলো দাবিয়ে দিল সপ্তদশীর কোমল বাঁকান কোমরে। মুহুর্তেই ঝংকার দিয়ে ওঠে মাহি’র সর্বাঙ্গে। মেয়েটা মোচড়াতে লাগল ভীষণ। কন্ঠে বিরক্তির ভাঁজ ফেলে বলল,
“ আ..আপনি কিন্তু এখন বেশি বেশি করছেন বিস্ট!”
ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসুর রেশ বাড়ল মুগ্ধের। আঙুলগুলো হয়ে উঠল বেপরোয়া। যুবক কেমন আলগোছে মুখ নামিয়ে আনল মেয়েটার মুখের ওপর। সেথায় আলতো করে ফুঁ দিয়ে দুষ্ট কন্ঠে বলল,
“ ওহ কাম অন বিউটি! আমি এখনো কিছুই করা শুরু করিনি!”
গলায় শুষ্কতা নামল মাহি’র। গায়ে নামল অসারতা। সে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে আবারও বলল,
“ আপনি হা–হাত নামান আমার গা থেকে!”
যুবক এবার আরেকটু বাড়ল। ধীরে ধীরে নাক ডোবাল মাহি’র নরম মসৃণ গালে। সেথায় শান্তভাবে পড়ে থেকে বলল,
“ খারাপ লাগছে?”
“ অসহ্য লাগছে! ”
মাহি’র এহেন ঝাঁঝাল কন্ঠে হাসল মুগ্ধ। মেয়েটার গালে নাক ঘষে বলল,
“ হু দ্য ফা’ক কেয়ার’স এবাউট দ্যাট?”
দম আঁটকে গেল মাহি’র। শুকনো হলো কন্ঠা! মেয়েটা কেমন তেজ দেখিয়ে ফের বলল,
“ ইয়া আল্লাহ! কবে আপনার কাছ থেকে একটু শান্তি পাব আমি!”
বাঁকা হাসল রূঢ় মানব। মেয়েটার গাল থেকে নাক সরিয়ে তাকাল মুখপানে। চোখদুটো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র করে নিয়ে শ্লেষাত্মক কন্ঠে বলল,
মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪৩
“ যার মাথার ওপর আমি নামক আস্ত এক অশান্তি ঘুরপাক খাচ্ছে, তার আবার শান্তি! অকাদের বাইরের কথাবার্তা কেনো বলছিস বান্দীর মেয়ে?”
নাক ফোলায় মাহি! মুখ ঝামটি দিয়ে বলে,
“ অসহ্য! আপনি আমায় কবে মুক্তি দিবেন বলুন তো?”
“ পরপারে ফের দেখা না হওয়া অব্ধি, এই আমি নামক অভিশাপের কাছ থেকে তোর কোনো মুক্তি নেই পিচ্চি!”
