রুপুর বিয়ে পর্ব ৩৮
Bobita Ray
বীথি রানীর কোন কাজে মন বসছে না। বুকের ভেতর ধড়ফড় করছে। ইচ্ছে করছে, এক ছুটে বিনয়ের ঘরে চলে যেতে। মুশকিল হলো ইতি ঘোর আপত্তি করছে। আর খানিকক্ষণ এখানে থাকলে, নিশ্চিত হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে। বীথি রানী তড়িঘড়ি করে যেতে নিল। ইতি পিছু ডেকে বলল,
“কোথায় যাচ্ছিস দিদি?”
বীথি রানী হাসার চেষ্টা করে বলল,
“ওদের খাওয়ার জন্য ডাকতে যাচ্ছি।”
“তোর যেতে হবে কেন? ময়নার মাকে পাঠিয়ে দে।”
“না না আমিই বরং যাই।”
ইতিকে আর কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বীথি রানী হন্তদন্ত পায়ে চলে গেল।
বীথি রানী সরাসরি বিনয়ের ঘরে এলো। নাক দিয়ে বার কয়েক নিঃশ্বাস টেনে ভ্রু কুঁচকে বিনয়ের দিকে তাকাল। চোখ রাঙিয়ে কড়া কণ্ঠে বিনয়কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তুই..তুই আবারও সিগারেট খেয়েছিস?”
বিনয় হ্যাঁ না কিছু বলল না। তবে পুতুলের প্রচণ্ড বিরক্ত লাগল। দুজন প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়ে একঘরে আছে। ভদ্রমহিলার কী উচিত ছিল না। একবার দরজায় নক করে ঘরে প্রবেশ করা। পুতুলের দিকে চোখ পড়তেই বীথি রানী নিজেকে সামলে নিল। মুখে মেকি হাসি ফুটিয়ে গদগদ কণ্ঠে বলল,
“খাবে চলো।”
“আমি এখন কিছু খাব না আন্টি।”
“সেকি! আমি তোমার জন্য কত কষ্ট করে রান্না করেছি। তুমি না খেলে আমার খুব খারাপ লাগবে মা।”
পুতুল হেসে ফেলল। বলল,
“আমি সরি আন্টি। আমি কাউকে খুশি করার জন্য কিছু করতে পারি না। তাছাড়া আমি কড়া ডায়েটে আছি। এখন মরে গেলেও আমার দ্বারা কিছু খাওয়া সম্ভব না।”
বীথি রানীর মনটাই খারাপ হয়ে গেল। রুপুটা এমন ছিল না। বীথি রানীর মুখে মুখে তর্ক করতো ঠিকই। তবে বীথি রানী যৌক্তিক আবদার করলে কখনো ফেলতে পারত না। হাসিমুখে আবদার মেটাতো। বার বার না চাইতেও এই মেয়েটার সাথে রুপুকে কেন তুলনা করছে। বীথি রানী বুঝতে পারছে না। বীথি রানী বিনয়কে বলল,
“খাবি চল।”
“খাব না।”
“খাবি না কেন?”
“খেতে ইচ্ছে করছে না।”
বিনয় তো কখনো বীথি রানীর কথার অবাধ্য হয় না। তাহলে এই মেয়েটার সামনে এমন করছে কেন? মেয়েটার সামনে জোর গলায় কিছু বলাও যাচ্ছে না। শেষে কি-না কী ভেবে বসবে। বীথি রানী নরম স্বরে বলল,
“খাবি চল বাবা। তুই খুব ভালো করেই জানিস। তুই না খেলে আমি খেতে পারি না। আমার প্রচণ্ড খিদে লেগেছে। তাছাড়া ঔষধও খেতে হবে।”
বিনয় আর দ্বিমত করল না। বীথি রানী পুতুলকে বলল,
“তুমিও চলো আমাদের সাথে। কিছু না খাও বসে থাকবে।”
“আমি খুব সরি আন্টি। অতিরিক্ত তেলমশলা যুক্ত খাবারের গন্ধ আমার অসহ্য লাগে। বসে থাকলে নিশ্চিত বমি হয়ে যাবে। শেষে আপনাদের খাওয়া নষ্ট হবে। আপনারা বরং খেয়েনিন। আমি এখানেই ঠিক আছি।”
এই মেয়েটার কথাবার্তার ছিরি বীথি রানীর মোটেও ভালো লাগছে না। যেভাবে নাক-মুখ কুঁচকে কথাগুলো বলল। এই মেয়ে যে বিয়ের পর রান্নাঘরের চৌকাঠ কখনো মাড়াবে না। বেশ বোঝা যাচ্ছে। এই ননীর পুতুলকে নিয়ে বীথি রানী করবেটা কী?
বীথি রানী খাবার টেবিলে বসে বিনয়কে বলল,
“তুই কী সত্যি সত্যি ওই মেয়েটার সামনে বসে সিগারেট খেয়েছিস?”
“না।”
“না মানে? সারাঘর সিগারেটের কটু গন্ধে ম ম করছে। গন্ধটা এতটাই কড়া ছিল। আমার নিঃশ্বাস নিতে পর্যন্ত কষ্ট হচ্ছিল। আর বলছিস তুই সিগারেট খাসনি।”
ইতি বলল,
“আহা দিদি। খেতে বসে ছেলেটাকে শুধু শুধু এত জেরা করছিস কেন?”
“তুই চুপ থাক। আর কী মেয়ে ধরে এনেছিস আমার সোনার টুকরো ছেলের জন্য। কী নির্লজ্জ মেয়েরে বাবা..আধাল্যাংটা হয়ে হবু শ্বশুরবাড়িতে চলে এসেছে। আবার বলছে অতিরিক্ত মশলাযুক্ত খাবারের গন্ধ সহ্য করতে পারে না। আবার নাকি কী সব ডায়েট-ফায়েট করে। এমন বউ দিয়ে আমি করবটা কী?”
“কী করবি মানে? তোর কী ধারণা দিদি। ওই মেয়ে এই বাড়িতে একা আসবে নাকি। সাথে করে কম করে হলেও তিন-চারটে কাজের লোক নিয়ে আসবে। তোর যত ফুট-ফরমাশ আছে। সব কাজের লোকদের দিয়ে করাবি।”
লোভে বীথি রানীর চোখদুটো চকচক করে উঠল। সত্যি সত্যিই যদি ননীর পুতুল এতগুলো কাজের লোক নিয়ে আসে। তাহলে খুব ভালো হবে। সেখান থেকে একটা কাজের লোক বীথি রানী নিজের সেবাযত্ন করার জন্য রেখে দেবে। তবে একটা ব্যাপার খটকা লাগছে। এতগুলো কাজের লোকের মাইনে দেবে কে? আর খাওয়া খরচাই-বা কে দেবে?
“এ্যাঁই ইতি? ননীর পুতুল যে এতগুলো ঝি নিয়ে আসবে। ওদের মাইনে দেবে কে?”
“কে দেবে আবার পুতুলের বাবা দেবে। সাথে ওদের খাওয়া খরচা বাবদ যতটাকা লাগে সব টাকা দেবে। শুধু তাদের একটাই দাবি। পুতুলকে কখনো কিছু বলা যাবে না। তাকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে।”
ঘরের বউকে এত স্বাধীনতা দেওয়ার ব্যাপারেই তো বীথি রানীর ঘোর আপত্তি।
পুতুলের কীর্তিকলাপ বীথি রানীর মোটেও ভালো লাগছে না। মেয়েটা যে গায়ে পড়া স্বভাবের বীথি রানী প্রথম প্রথম বুঝতে পারেনি। যত দিন যাচ্ছে ততই তার হ্যাংলামি ছ্যাবলামি দেখতে অসহ্য লাগছে। সেদিন ইতির সাথে ছেলের বাড়িঘর দেখতে আসা পর্যন্ত ঠিক ছিল। কিন্তু এখন করছে বাড়াবাড়ির চূড়ান্ত। সময় নেই অসময় নেই। বিনয়ের সাথে দেখা করতে চলে আসে নির্লজ্জ মেয়েটা। বিনয়কে খুব জোড়াজুড়ি করে বাইরে ঘুরতে যাওয়ার ব্যাপারে। বিনয় যখন কিছুতেই যেতে রাজি হয় না। তখন বিনয়ের ঘরে দরজা বন্ধ করে বসে থাকে। বিনয়কেও ঘর থেকে বের হতে দেয় না। দুজন প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়ে বিয়ে ছাড়া একঘরে দরজা বন্ধ করে বসে থাকার ব্যাপারটা বীথি রানীর মোটেও ভালো লাগে না। বীথি রানী পুতুলকে কড়া করে কয়েকটা কথা বলতেও পারে না। একটা ঘটনা জানার পর বীথি রানীর মন পুরোপুরি ভেঙে গেছে। মেয়েটা নাকি বিনয়ের ঘরে বসে বসে সিগারেট খায়। ময়নার মা সেই দৃশ্য নিজের চোখে দেখেছে। ময়নার মায়ের কথাটা উড়িয়েও দেওয়া যাচ্ছে না। এদিকে বিনয়কে তেমন একা পাওয়া যায় না। রুপুটা ঘরছাড়া হতেই তার আদরের ছেলেটা কেমন পাল্টে গেল। ঠিকমতো শো-রুমে যায় না। অনেকক্ষণ ডাকাডাকি করার পরে ভাত খেতে আসে। আগের মতো মায়ের ঘরে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্পও শুনে না। সারাক্ষণ নিজের ঘরে শুয়ে থাকে। মাঝে মাঝে কোথায় যেন দুই চার ঘণ্টার জন্য যায়।
একমন বলে, সিগারেট খাওয়া মেয়েকে বউ করার প্রশ্নই উঠে না। অন্যমন বলে যা হচ্ছে হোক। বীথি রানী দোটানায় পড়েছে খুব। একদিকে পুতুলদের বাড়িতে বিয়ের তোরজোর চলছে পুরোদমে। অন্যদিকে বীথি রানী একবার ভয়ে ভয়ে বিনয়ের বাবাকে বলেছিল, পুতুলের সাথে বিয়ে হলে আমার ছেলেটা সুখী হবে না। কোনভাবে কী বিয়েটা ভেঙে দেওয়া যায় না?
এই ব্যাপারে বিধানবাবু সব দায়-দায়িত্ব বীথি রানীর উপরে ছেড়ে দিয়েছে। বলেছে, তুমি যা ভালো বুঝো। তাই করো। এইসব ব্যাপারে আমি নেই।
সারাজীবন মানুষটা গা বাঁচিয়ে চলল। আশ্চর্য, ছেলেটা কী বীথি রানীর একার নাকি!
একবার ইতিকে আকার ইঙ্গিতে বলেছিল, ইতি যেন আকাশ থেকে পড়ল। বলল,
“তোর কী মাথা খারাপ দিদি। ছেলেকে বিয়ে দিবি না। প্রথমেই বলতি। এখন এতদূর এসে উল্টো সুর ধরেছিস কেন? তাছাড়া পুতুলের বিনয়কে খুব পছন্দ হয়েছে। তোর চাওয়ায় না চাওয়ায় এখন আরকিছু যায় আসে না। তুই চাইলেও পুতুল বিনয়কে বিয়ে করবে। তুই না চাইলেও পুতুল বিনয়কেই বিয়ে করব। ও যে কী জেদি মেয়ে। তোর কোন ধারণাও নেই দিদি।
ইতির কথা শোনার পর থেকেই বীথি রানীর অস্থির লাগছে খুব। এরজন্য গুণী জনেরা বলে, মাথা গরম করে কিংবা রাগের মাথায় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া মোটে উচিত না। বড় বড় সিদ্ধান্ত নিতে হয় ঠাণ্ডা মাথায় অনেক ভাবনাচিন্তা করে।
রুপুকে ফিরে পাওয়ার বিনয়ের মনে যতটুকু আশা ছিল। সব আশা নিশারা হয়ে গেছে৷ রুপুর বাবা-মা খুব চেষ্টা করেছে। মেয়েকে যে করেই হোক। স্বামীর সংসারে ফিরিয়ে দিতে।
কোনভাবেই রুপুকে নিজের সিদ্ধান্ত থেকে টলাতে পারেনি। রুপুটা এত জেদি কেন? কেন বিনয়ের অনুভূতি বুঝল না ও? রুপু মুখ ফুটে বললে, বিনয়ের কষ্ট হতো খুব। তবুও নিজেকে শুধরে নিতো। শেষ একটা সুযোগ ও কেন দিল না বিনয়কে।
বিনয় ভয়াবহ ডিপ্রেশনে পুরোপুরি ডুবে গেছে। ওর এখন আর বাঁচতে ইচ্ছে করে না। মনে হয়, মৃত্যুটা খুব সহজ সমাধান। বিনয়ের মৃত্যুতে হয়তো রুপুর কিছুই যাবে আসবে না। তবে বিনয় নিজের আবেগ অনুভূতির থেকে তো চিরতরে মুক্তি পাবে।
মাকে বিনয় খুব কৌশলে শাস্তি দিচ্ছে। মা অবশ্য বুঝতে পারছে না। মায়ের ধারণা, পুতুল এই বাড়িতে এসে বিনয়কে নিজের সামনে বসে থাকতে বাধ্য করে। বিনয়ের প্রশ্রয়েই পুতুল মায়ের সামনে ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয়। তারপর সিগারেট খেতে খেতে একা একাই বকবক করে। বরাবরই বিনয় খুব দারুণ শ্রোতা। এই কাজটা মাকে কষ্ট দিতেই বিনয় করে।
মা যখন বিনয়ের সুখ কেড়ে নিয়েছে। বিনয়ের কষ্টের ভাগও মাকেই ভাগ করে নিতে হবে। পুতুলকে বিয়ে করলে মা সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাবে। তারপরও পুতুলকে বিয়ে করতে ইচ্ছে করে না। ভীষণভাবে রুপুকে ফিরে পেতে ইচ্ছে করে। তিক্ত সম্পর্কটা আবারও আগের মতো সহজ স্বাভাবিক করে নিতে ইচ্ছে করে খুব।
পুতুলের সাথে বিনয়ের বিয়ের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে। বিনয়ের ডিপ্রেশন ততই যেন বাড়ছে। কোনভাবেই বিনয় আর সহজ স্বাভাবিক থাকতে পারছে না। কষ্টে ওর বুকটা ফেটে যাচ্ছে৷ বিনয়ের বিয়েতে তেমন লোকজন বলেনি বীথি রানী। শুধু খুব কাছের কিছু আত্মীয়কে বলেছে। বিনয়ের বিয়ের মার্কেট থেকে শুরু করে বৌভাবে কী কী মেন্যু হবে সব ঠিক করা হয়ে গেছে।
বিনয়ের বিয়ের আগের দিন রাতে খুব জাঁকজমক করে গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান করল বীথি রানী। বিনয় গায়ে হলুদে তোলা কিছু ছবি রুপুকে পাঠিয়ে দিল। নিষ্ঠুর মেয়েটা সামান্যতম কষ্ট পেল না। বিনয়ের ছবিগুলো দেখে নতুন জীবনের জন্য অভিনন্দন জানাল। সাথে লাভ ইমোজি দিল। এই দৃশ্য দেখে বিনয় পুরোপুরি ভেঙে পড়ল। সারারাত অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করে শেষ রাতের দিকে অতি উত্তেজনায় কিছু কড়া ডোজের ঘুমের ঔষধ খেয়ে ফেলল। ঔষধগুলো আগেই জোগাড় করে রেখেছিল বিনয়। ঔষধ খাওয়ার পর পর অবশ্য কিছু হলো না। একটা চিঠি লিখলে কেমন হয়? ভোর হলেই বিনয়ের বিয়ে। বিয়ের দিন মৃত্যু হলে অনেক ঝামেলা হবে। বেশি ঝামেলায় পড়বে বাবা-মা। বিনয়ের শেষ সময়ে বাবা-মাকে মোটেও ঝামেলায় ফেলতে ইচ্ছে করছে না। একি মাথা চক্কর দিচ্ছে। গা গুলাচ্ছে। সারা দুনিয়া ঘুরছে। বসে থাকতে ইচ্ছে করছে না। বিছানা খুব শরীর টানছে। বিনয় একগ্লাস জল খেয়ে ফেলল। কাঁপা হাতে কিছু লেখার চেষ্টা করছে। শরীর সায় দিচ্ছে না। সমস্ত শরীর ঝিম ধরে আসছে। চোখে গাঢ় ঘুম জড়িয়ে আসছে। বিনয় অনেক চেষ্টা করেও চোখ মেলে থাকতে পারছে না। একটা কাগজে এলোমেলো হাতে গোটা গোটা অক্ষরে লিখল,
রুপুর বিয়ে পর্ব ৩৭
‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী না। পুলিশ ভাইদের কাছে আমার আকুল আবেদন। দয়া করে আমার মরাদেহ নিয়ে আমার বাবা-মাকে হ্যারাস করবেন না। আমি সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছায় মৃত্যুকে বরণ করে নিলাম৷’
বিনয়…
শেষের কিছু লেখা অস্পষ্ট হয়ে রইল৷ হয়তো তার আগেই কলম থেমে গেল।
