Home রাগে অনুরাগে রাগে অনুরাগে পর্ব ২৩

রাগে অনুরাগে পর্ব ২৩

রাগে অনুরাগে পর্ব ২৩
সুহাসিনি ফাতেহা

ফারাজ অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকায় আলভীর দিকে। তার রুঢ় চোখের দৃষ্টি-ই বলে দিচ্ছে আলভীর ব্যবস্থা সে পরে করবে। আগে তার বেয়াদব বউটাকে কবুল বলে বাড়ি নিয়ে যাক। তারপর দুইটার-ই দুইরকম ব্যবস্থা করবে। ফিতা কেটে দেওয়ায় ফারাজ বন্ধু-বান্ধব কাজিন সহ ভেতরে গেল। ক্যামরা ম্যানেরা ভিডিও করতে ব্যস্ত হয়ে গেল।
ফারাজ কিছু না বলে চলে গেলেও ফরহাদ আলভীকে ছাড়ল না। ভাইয়ের পক্ষ টেনে ফিসফিস করে আলভীকে বলল,

“ভাইয়া কি চুরি করতে আসছে নাকি? বিয়ে করতে আসছে আবুল।”
অয়ন ফারাজের যাওয়ার দিকে চেয়ে বলে,
“ওই সে একই কথা চুরি করে নিয়ে যেতে পারে নাই তাই জোর করে বিয়ে করতে আসছে।”
ফরহাদ আগের কথার জবাব দিয়ে বলল,
“তো তোর মন চাইলে তুই নাকে রুমাল পেঁচিয়ে হাঁট! মনে হয় বায়ু দূষণ করছিস। ছিঃ ওদিক থেকে হেঁটে আয়। বাতাসে মিথেন গ্যাস ছাড়িস নাকি?”
আলভীও কথায় হেরে যাওয়ার পাত্র নয়। ফরহাদ আর আলভী প্রায় একই স্বভাবের। কেউ কাউকে কথায় ছাড়ে না। তবে আলভী সবসময় ফারাজকে খোঁচা দেওয়ার জন্য পন্ডিত। এই যেমন এখনও দিলো। ঘুরেফিরে ফরহাদের কথায় ফিরিয়ে দিলো,
“তুই বায়ু দূষণ করে পরিবেশ দূষণ করে ফেলছিস। এখন অন্যের নাম বলছিস! লজ্জা করে না? তোর মুখের সামনে দাঁড়ালেই অক্সিজেন লেভেল 0% হয়ে যায়।” বলে আলভী ভাব নিয়ে ভেতরে চলে গেল।
ফরহাদ কটমট দৃষ্টিতে চেয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“শালা! ভাবিকে বলবো তুই বিয়ে বাড়িত এসে মেয়েদের পেছনে লাইন লাগিয়েছিস। শুধু একবার দেখি সুমি ভাবিরে। তখন বুঝবি কত ধানে কত চাল। ঝাড়ুর বারি একটাও মাটিত পরবে না মিলিয়ে নিস।”

তিতলি এখনো বিছানায় বসে আছে । শাড়ির ভাঁজে আঙুল পেঁচাচ্ছে। নিধিরা বাহিরে গেছে খেতে।মেয়েটার মাথায় সে-কি চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। এইমুহূর্তে এসে তার দাদুর বলা কথাগুলো তাকে ভীষণ ভাবাচ্ছে। সত্যি যদি ওই লোক তাকে কিছু করে। না সে কোনো কিছু করতে দিবে না। একদম দিবে না। তাহলে কি করবে? ছুরি নিয়ে বসে থাকবো? না ওটাও তো করা যাবে না তাহলে….”
তিতলির ভাবনার মাঝেই গ্রাম থেকে আসা কাজিনরা টাকা নিয়ে এসে তিতলিকে ঘিরে ধরল।
প্রিতি মুচকি হেসে বলল,
দুলাভাইর মনে হয় ডায়াবেটিস আছে রে তিতলি। গুঁড়া মরিচ মিশিয়ে মিষ্টি নিয়ে গেছি খাওয়াবো বলে, কিন্তু কেমন গম্ভীর মুখে বলে দিলো,
আমি এসব খায় না।
নীতি দুষ্ঠ হেসে বললো,
“দুলাভাইয়ের মনে হয় অনেক তাড়া তোরে নিয়ে যাওয়ার লাইগা। মুখে একবার কইছি টাকা না দিলে ভাগেন, বউ পাবেন না! আর ওমনি ত্রিশ হাজার টাকা বের করে দিছে। কি ভালা দুলাভাই। আমার কিন্তু খুব পছন্দ হয়ছে।”
তিতলি সহসা নড়েচড়ে উঠল। মস্তিষ্কে নিভে যাওয়া আশার আলো জেগে উঠল। নীতির হাত চেপে ধরে আচমকা কেঁদে বলে উঠে,

“নীতি…. একটা কাজ করবি? প্লিজ না করিস না।”
নীতি আর প্রীতি দুজন চোখাচোখি করল। ওরা দুজন জমজ বোন। গ্রামের হলেও প্রায় শুদ্ধ কথা বলে। নীতি তিতলির অশ্রুসিক্ত চোখের দিকে চেয়ে সন্দেহের গলায় বলে,
“কি কাজ তাড়াতাড়ি বল। দুলাভাইর জুতা চুরি করার কাজ এখনো রয়ে গেছে।”
ভয়ে তটস্থ বোকা মানবী, নাক-মুখ কুঁচকে ফুঁপিয়ে উঠলো। নিজের সর্বাত্মক বুদ্ধি দিয়ে ভাবলো। শেষ আশা এটা। সপ্তদশীর গলা কাঁপতেছে কথাটা বলার জন্য বলতেই হবে। না বললে বোধহয় মরেই যাবে। বলেই মরুক। কাঁদতে কাঁদতে বলল,
” আমার বদলে তুই ঘোমটা দিয়ে এখানে বসে থাক। শুধু কবুল টা বলে দে। আমি খাটের নিচে লুকাবো। সবাই চলে গেলে আমি বের হয়ে যাবো। ওই লোককে আমি বিয়ে করতে পারবো না আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি….”
নীতি প্রীতি চোখদুটো বড়বড় করে ফেলল। এমন চিন্তা কেউ করে? এই মেয়ে কি পাগল হয়ে গেছে? কিসব বলছে। সবাইকে ডাকবে নাকি? নীতি কিছু বলতে যায় এর মাঝেই ফরিদা বানু ভেতরে ঢুকলেন। নাতজামাইকে দেখে এসেছেন তিনি । ওনার খুব পছন্দ হয়েছে।
তাই খুশিতে গদগদকণ্ঠে নাতিনকে বলতে এলেন,
“তিতলিরে নাতজামাই তো একদম তোর দাদার লাহান। মোর খুব ভালা লাগছে। তোর দাদার কথা মনে পড়তেছে।”

তিতলির আশায় জল ঢালার জন্য তার দাদু এসে পড়েছে। এখন কি করবে সে? নাক টেনে বলল,
“তো দা…দাদাভাই বানিয়ে তোমার কাছে রেখে দাও।”
ফরিদা বানু নাতিনের দিকে ভালা করে খেয়াল করে বললেন,
“তোর নাকে নথ কইরে? বিয়ার দিন বউরগো নাকে নথ থাকতে হয়। দেখি আই নাক পুরি দি।”
তিতলি নিজের নাকে হাত দিয়ে ভয় পেয়ে বলল,
“না…না আমি নাক পুরাবো না।”
“নাক না পুরালে স্বামীর অমঙ্গল হয়।”
“আমি কারো জন্য নিজেকে ব্যাথা দিতে পারবো না।”
“বেশি কথা কস। যহন জামাই ব্যাথা দিতে চাইবো তহন কি করবি। আই নাক পুরি দি তেমন ব্যাথা লাগবো না পিপড়ার কামড়ের মতো লাগে।”
তিতলি নাক পুরাবে না। সে অনেক ভয় পায়। মনে মনে বলে, স্বামীর অমঙ্গল হলে হোক। ওই লোকের মঙ্গল চাওয়ার দায়িত্বে আমি নেই নাই। বিয়েটা মানে না। তার দাদু আগের যুগের গ্রামের হওয়ায় কত কিছু খুঁজে বেড়ায়। আরেকটু আগেও কি কতগুলো বলে গেছে।
ফরিদা বানুর কাছে নাতিনের হাবভাব ভালো লাগে না । কানেকানে এসে আস্তে করে বললেন,
“হাচা কইরা ক তো তোর কোনো পোলার লগে পিরিত নাই তো ? নইলে অন বিয়ার দিনে মনমরা অই বই রইছস ক্যান?”
তিতলি নাক মুখ ফুলিয়ে অভিমানি গলায় বলল,
“না।”
ফরিদা বানু খুশি হয়ে বললেন,
“থাক কাঁন্দা বন্ধ কর। আমার বিয়ার সময় ও অনেক কাঁদছিলাম। বাসর রাইতে তোর দাদা অনেক আদর-সোহাগ করছে হেরপরে আর কাঁদি নাই।”
বলে ফরিদা বানু চলে গেলেন। নিধিরাও তখন আসলো।

বরযাত্রীদের খাওয়া-দাওয়ার পাট শেষ হয়েছে সবে। তৌসিফ শেখ কোনো কমতি রাখেন নি বরযাত্রীদের খাবারের পরিবেশনের প্রতি। একমাত্র মেয়ের বিয়েতে কেউ যেন একটা খোঁচা মেরে কথা বলতে না পারে সে জন্য সবকিছু প্রয়োজনের তুলনায় বেশি বেশি করে দিয়েছেন।
ফারাজ খান স্টেজে বসে আছে। কপাল কুঁচকে রেখেছে বিরক্তিতে। হাতের ঘড়ি দিকে তাকাচ্ছে কিছুক্ষণ পরপর। কাজিকে এখন কি বলতে ইচ্ছে করে? বিয়ে পড়াতে কি এতক্ষণ লাগে? এত মানুষের মাঝে যেন সে কোনো মহামূল্যবান পুুরুষ । মেয়ে মানুষ উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখে যাচ্ছে। পিক তোলার ট্রাই করছে কেউ ফিসফিস করে বলতেছে, তিতলির ভাগ্য আছে, সুন্দর , বড়লোক জামাই পাইছে। এসব শুনে ফারাজের ঠোঁঠের কোনো আড়ালে আবড়ালে বাঁক পড়ে। সে প্রায়সময় নিজের অজান্তেই ভেবে বসতো, বেয়াদব মেয়েটাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করার জন্য হলেও এমন অকল্পনীয় সিদ্ধান্ত নিবে। নিজের কন্ট্রোলে এনে তাকে জ্বালানোর শোধ তুলবে তিলেতিলে। তার মন কি চায় তা ভালো করে প্র্যাক্টাকালি বুঝিয়ে দিবে। বুঝাবে তাকে ইগনোর করার ফল।

কিন্তু তার মা বাবা মিরজাফরের বংশধর তার আগেই তাকে কিনা সেই মেয়ের সাথেই বিয়ে করাতে নিয়ে এসেছে ভাবা যায়? ব্যাপার টা কিন্তু মন্দ না। তার মা বাবা আসলেই তার চেয়েও জেন্টলম্যান । তার কাজ আরো সহজ করে দিয়েছে। দুইটা ধন্যবাদ দেওয়ার প্রয়োজন আছে।
খাওয়া-দাওয়া শেষে কাজি সাহেব তাড়া করলেন বিয়ে পড়ানোর জন্য। তৌসিফ শেখ ও আফজাল শেখ দু বেয়াই কথা বলছেন তখন কাজি সাহেব তাড়া দিয়ে বললেন,
“এবার তাহলে বিয়ে পড়ানোর কাজ শুরু করতে হবে। সময় চলে যাইতেছে।”
তৌসিফ শেখ ও আফজাল খান দু বেয়াই সম্মতি জানিয়ে বললেন,
“হ্যাঁ শুরু করা যাক।”
কাজি সাহেব কাগজপত্র নিয়ে বসতে বসতে বললেন,
“মেয়ে কই মেয়েকে নিয়ে আসেন।”
তৌসিফ শেখ বললেন,

মেয়েকে ঘরে কবুল বলে সাইন করা হবে। আসুন আমার সাথে। কথাটা শ্রবণেন্দ্রিয়ে পৌঁছাতেই ফারাজের মস্তিষ্ক জ্বলে উঠল। এতক্ষণ ধরে বেয়াদব বউর মুখে নিজের নামে কবুল শোনার জন্য অপেক্ষা প্রহর গুনছে। আর এখন এসব শুনলে কি মাথা ঠিক থাকে? যুবক চোয়াল শক্ত করে বাবার দিকে তাকালো। আফজাল খান ছেলের দিকে একবার তাকিয়ে কাজি সাহেব ও তৌসিফ শেখকে কানে কানে কি যেন বললেন।
তৌসিফ শেখ তুষারকে ডেকে বললেন,
“তুষার তিতলিকে নিয়ে আসতে বলো।”
তুষার বাবার কথামতো ভেতরে গেলো। ড্রয়িংরুমে আত্মীয়-স্বজনরা সহ বড়রা সবাই বসে আছেন। বাকিরা বাইরে কেউ জামাই দেখে। তুষার ড্রয়িংরুমে গিয়ে আলেয়া শেখকে বললেন,
“আম্মু তিতলিকে নিয়ে আসতে বলো। কাজি সাহেব তাড়া করছেন।”
আলেয়া শেখকে সকাল থেকে কেমন নরম দেখাচ্ছে। মেয়ের কথা ভেবে অজান্তেই চোখ ভিজে উঠছে বারবার। ছেলের কথা শুনে ভাঙা গলায় বললেন,
“নিয়ে আসবে এখন। তুই গিয়ে একবার দেখে আয় তো।”
তুষার মায়ের কথায় উপরে গেল। করিডোরে যেতেই ঝিলিক ও রুপসার সাথে দেখা হলো। তুষার আড়চোখে ঝিলিকের পানে চাইলো। মেয়েটা শাড়ি পরে এসেছে। চোখাচোখি হতেই তুষার চোখ ফিরিয়ে সামনে হাঁটতে থাকে।

রুপসা পরপরই সন্দেহের গলায় বলে,
“তুষার ভাইয়া মনে হয় তোকে পছন্দ করে।”
ঝিলিক ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আজব! উনি আমাকে কেন পছন্দ করবে ? কথাটা একটু জোড়েই বলল।”
তুষারের চলন্ত পা জোড়া এক সেকেন্ডের জন্য থেমে গেল। আবার চলে গেলো।
রুপসা আবারও বলল,
“আমি খেয়াল করছি হলুদের রাতেও দেখছি তোর দিকে তাকিয়ে আছে। এখনও দেখলি না। তাও তোর এমন কিছু মনে হচ্ছে না?”
রুপসা আগের মতো করেই কিছু একটা মনে করে বলল,
“আমি তিতলির থেকে শুনেছি তুষার ভাই নাকি প্রেম করেন। তাহলে আমাকে কোন দুঃখে পছন্দ করবে? ”
“আরে গাঁদি মনে কর প্রেমিকা টা তুই।”
ঝিলিক রুপসাকে ধমক দিয়ে বলল,
“দূর তুই বেশি বেশি ভাবছিস। এমন কিছুই না। ”
ঝিলিকের কথার ভেতরেই গম্ভীর সুর ভেসে এলো,
“হুমম কার কথা বলা হচ্ছে এখানে?”
ঝিলিক চমকাল,থমকাল। কিছু বলতে গিয়েও সামনের মানুষটাকে দেখে আবার থেমে যায়। চোখ নামিয়ে নেয় লজ্জায়। রুপসা বলে,

“কারো কথা না বলা হচ্ছে না ভাইয়া। ”
তুষারের চোখ ভুলবসত হঠাৎ করেই ঝিলিকের কাঁধে পরল। দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নিলো মানব।
ঢোক গিলল অজানা কারণে। মুহূর্তেই সেখান হতে প্রস্থান করল।
তুষার চলে যেতেই ঝিলিক রুপসাকে বলল,
“তোকে পছন্দ করে আমাকে না বুঝলি। আমি দেখছি তোর দিকে তাকিয়েছে।”
রুপসা ঝিলিকের দিকে তাকিয়ে চোখ কপালে তুলে বলল,
“আল্লাহ , তুই আসলেই গাঁদি রে। কাঁধের ব্লাউজ সরে গিয়ে কালো ফিতা দেখা যাচ্ছে ছিঃ। বলেই নিজে হাত বাড়িয়ে ঝিলিকের কাঁধের ব্লাউজ ঠিক করে দিলো।”
ঝিলিক লজ্জায় মরে যায় যায় অবস্থা। ছিঃ সে এভাবে ছিলো? তুষার ভাই কি তাহলে তাকে এভাবে দেখে ফেলেছে? এই মুখ সে আর তুষার ভাইয়ের সামনে দেখাতে পারবে না।
বিষয়টি খুবই লজ্জাজনক।
রুপসা ঝিলিককে বলল,
“মনে হয় তুষার ভাইয়া দেখে গেছে তাই কিছু না বলে চলে গেছে।”
ঝিলিক লজ্জায় কিছু বলার ভাষা খুঁজে ফেলো না।
তিতলিকে নামানো হলো পরপরই। মাথায় লম্বা দোপাট্টা দেওয়া। দুর্বল শরীর নিয়ে হাঁটার মতো শক্তি পাচ্ছে না মেয়েটা। দিন দুনিয়ার কোনো খবর নেই। শুধু ঘোমটার নিচে চোখের পানি ফেলে বন্যা বানিয়ে পেলছে। নিধি প্রিমা দুজন দুপাশ থেকে ধরে বাইরে নিয়ে এলো। ঝিলিক, রুপসা সহ ড্রয়িংরুম থেকে বড়রা সবাই পিছুপিছু চলে এলেন বাইরে।

বউকে আনতে দেখে ফারাজ খান বসা থেকে হুট করে উঠে দাঁড়াল। শীতল নয়নে কতক্ষণ যে তাকিয়ে থাকল কে জানে? যদিও লম্বা দোপাট্টা দিয়ে রমনীর পুরো মুখ ঢাকা। ফারাজ উপর হতে নিচ পর্যন্ত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব দেখল । পিচ্চি লাগছে না একদম। একদম বউ বউ লাগছে। আশেপাশে কিছুই তার নজরে নেয়।
পাশ থেকে আলভী ফিসফিস করে বলে উঠে,
“হয়ছে আর তাকাইস না। তোর চোখের দৃষ্টি ভালো না। যেভাবে কুদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছিস মেয়েটা তোর সামনেই হাওয়া হয়ে যাবে । তখন বাসর ঘরে যাওয়ার আগেই বিয়ে করার শখ মিটে যাবে।”
তৎক্ষণাৎ কাজি সাহেব কাগজপত্র নিয়ে এসে হাজির হয়ে ফারাজের সামনে বসলেন। তিতলিকে ফারাজের পাশাপাশি ঝারবাতির মতো দেখতে ফুলের পর্দার আড়ালে বসানো হয়েছে। বিয়ে বাড়ির সকল মেহমান ও বরযাত্রীরা গোল হয়ে ওখানে একত্র হয়েছে।
কাজী সাহেব সর্বপ্রথম নিকাহ খুতবা পাঠ করলেন। নিকাহ খুতবা শেষে কাজী আর দেরি না করে বিয়ে পড়ানোর কাজ শুরু করলেন,

“তৌসিফ শেখের একমাত্র কন্যা তিতলি তেহেরীন শেখকে এক কোটি এক টাকা দেনমোহর ধার্য করে বিবাহ করতে আপনি রাজী আছেন? রাজী থাকলে বলো বাবা আলহামদুলিল্লাহ্‌ কবুল।”
ফারাজ একটুও সময় নিলো না। কাজী বলার সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো,
“আলহামদুলিল্লাহ্‌ কবুল।”
পাত্রের তিনবার সম্মতি নেওয়ার পর কাজী সাহেব একটা কাগজ এগিয়ে দিয়ে বললেন,
“এইবার কাবিননামায় সাইন করুন।”
ফারাজ তা হাতে নিয়ে ভালো করে পড়ল। তারপর দ্রুত সাইন করে দিলো। তার এখন এক মিনিট দেরি করার সময়ও নেই।
পাত্রের থেকে সাইন নিয়ে কাজী সাহেব সহ সকলে তিতলির সামনে এসে বসল। মেয়েটা আদৌ এখানকার কিছু শুনছে কিনা আল্লাহ ভালো জানেন। হাতের ভাঁজে হাত গুঁজে পাথরের মতো বসে আছে। কাজী সাহেব একই ভাবে নিজের মতো শুরু করলেন,

“আফজাল খানের বড় পুত্র ফারাজ খানের সঙ্গে বিবাহ করতে আপনি রাজী? রাজী থাকলে বলো মা আলহামদুলিল্লাহ্‌ কবুল।
চার মিনিট পেরিয়ে গেল তাও কোনো শব্দ আসলো না। ফরিদা বানু সেখানে উপস্থিত। তিনি নাতিনের কাছে গিয়ে হেসে বললেন,
” যা কইতে কইছে তা কও দাদু। নানিত মনে হয় লজ্জা।”
তিতলি এবার নড়েচড়ে উঠল। এতক্ষণ যেন কোনো জনমানবহীন কোনো মরুভূমিতে চলে গেছিল সে। আশেপাশের সব পরিস্থিতি বুঝতেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল ঘোমটার আড়ালে।
কাজী তাড়া দিচ্ছেন। তৌসিফ শেখ এবার এগিয়ে গেলেন। মেয়ের মাথায় পরম স্নেহে হাত রেখে কোমল স্বরে বললেন,

“বলো আম্মু। মন থেকে বলো আলহামদুলিল্লাহ্‌ কবুল।”
বাবার স্পর্শে ফুঁপিয়ে উঠল তিতলি। সহসা কান্নাজগড়িত কন্ঠে বলে উঠল,
“আমি…আমি বলব.ন!”
সম্পুর্ন শব্দ উচ্চারণ করতে পারলো না কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি উঠে গেছে।
মেয়ের কান্না দেখে তৌসিফ শেখ ভীষণ আশ্বাস দিয়ে ফের বললেন,
“কবুল বলো আম্মু।”
তিতলির কান্নার শব্দরা বাড়ল না। ধীরে ধীরে তা কমে গিয়ে গলার কাছে চেপে গেল। যাকে চেয়েছিল খুব করে তাকে তো পায়নি। এখন কাকে জীবনের সাথে জড়াচ্ছে? কত করে চাইলো বিয়েটা ভেঙে যাক। না আল্লাহ তার কথা শুনলো না। জিভ দিয়ে ঠোঁঠ ভিজিয়ে নেয় মেয়েটা। কান্না থামালেও কান্না আসছে ভীষণ। নত করে রাখা মুুখটা আরো বেশি নত হলো। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে উঠে,
“ক…কবুল।”

তিন শব্দের বাক্যটা উচ্চারণ করতে গিয়ে টকটকে লাল লিপিস্টিক দেওয়া অধরযুগল থিরথির করে কেঁপে উঠল রমনীর।
ফারাজ কখন থেকে অধীর আগ্রহে বসে আছে বেয়াদব মেয়েটা তাকে তত অধৈর্য করে তুলছে। কবুল বলতে কেন দেরি করলো আজ সুদে আসলে উসুল করবে।
এরই মাঝে কাজী সাহেব আবার বললেন,
“তিনবার বলতে হয় মা। আরো দুইবার বলো।”
তিতলি এবার দেরি করল না। সঙ্গে সঙ্গে বসে আসা কণ্ঠনালি ভেঙে বেরিয়ে আসলো
“কবুল, কবুল।”

চারদিকে আলহামদুলিল্লাহ্‌ শব্দে মুখরিত হয়। কাবিননামায় সাইন করতে দেওয়া হয় তিতলিকে। ঘোলাটে চোখে ঠিক পাত্রের নামটা অস্পষ্ট ভাবে দেখল কিনা কে জানে? কাঁপা হাতে অনেক কষ্টে নিজের নামটা লিখল। সবশেষে কাজী নিজের দাড়িতে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
“আলহামদুলিল্লাহ্‌ বিবাহ সম্পূর্ণ হলো। ইসলামিক শরিয়ত মতে আজ থেকে আপনারা স্বামী স্ত্রী।”
স্বামীকে সবসময় সম্মান করবে। কখনো স্বামীর কথার অবাধ্য হবে না।
আরো কিছু বলে নবদম্পতির সুখ শান্তি কামনা করে দীর্ঘ এক দোয়া পাঠ করলেন কাজী সাহেব সহ উপস্থিত সকলে। দোয়া শেষে কাজী উঠে দাড়ালেন।
ফারাজের অদ্ভুত সব অনুভূতি হচ্ছে। বিয়ে নিয়ে ওতটা সিরিয়াস ভাবে কখনো ভেবে দেখা হয়নি। কিন্তু অবশেষে সত্যি তার বিয়ে হয়ে গেছে। আজ থেকে আরো একজনের দায়িত্ব তার কাঁধে। এবার এই পিচ্চি বেয়াদব বউটাকে কাঁধে তুলে মানুষ করতে হবে তার। ভাবা যায়?
ফরিদা বানু ঘর থেকে মিষ্টি এনে সবাইকে মিষ্টি মুখ করালেন। তার যেন খুশিতে তর সইছে না। নাতজামাইকে এসে বললেন,
“বউটার মুখটা একটু চাইয়া লও নাতজামাই। দেহো ক্যান লাগতেছে। তুমি জিতা গেছো আমার নাতিন কিন্তু লাখে একটা।”
ফারাজ ভাবে দেখার জন্য পুরো রাত পরে আছে। এতগুলো মানুষের সামনে দেখাদেখি করা তার ডিকশনারিতে নেই। কেমন যেন দেখায়। তার পার্সোনাল জিনিস সে পার্সোনাল ভাবেই দেখবে।

ছয়টা বেজে গেছে। এবার বরযাত্রীদের বিদায়ের সময় গনিয়ে এলো। তিতলি এখন আর কাঁদছে না। অভিমান করেছে সবার সাথে। কবুল বলার পর থেকে মেয়েটার হুশ নেই। তৌসিফ শেখ আর আলেয়া শেখ এসে মেয়ের হাত শক্ত করে ফারাজের হাতের মুঠোয় আমানত হিসাবে তুলে দিলেন। মা বাবা, ভাই তুষার সহ সবার চোখে পানি। তৌসিফ শেখ ফারাজকে ভাঙা গলায় বললেন,

“আমার মেয়েটারে কখনো কষ্ট দিও না বাবা। অনেক আদরে বড় করেছি। আজ নিজ হাতে তুলে দিলাম তোমার কাছে। যদি কোনোদিন কোনো ভুল করে সোজা আমার কাছে এসে বলবে তাও কোনো কষ্ট দিও না।”
তৌসিফ শেখের কথা শুনে উপস্থিত সবার চোখে পানি জমলো। এমনকি ফারাজের মতো কঠিন হৃদয়ের মানবটারও বুকের ভেতরে কেঁপে উঠল। বাবারা বুঝি এমনই হয়। সন্তানদের জন্য কঠিন হৃদয় ভেঙে চোখে পানি নিয়ে আসেন। আলেয়া শেখ কান্নার জন্য কথাও বলতে পারছেন না। তুষার এগিয়ে এসে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। বড্ড আদরের বোন। অনেক ভালোবাসে। আজকে থেকে বোনকে চোখের সামনে দেখবে না প্রতিদিনের মতো ভাইয়া… ভাইয়া বলে ডাক দিবে না। আগের মতো এটা-সেটা আবদার করবে না। ভাবলেই তুষারের বুকটা কেঁপে উঠে। কিন্তু এতকিছুর মাঝেও তিতলির কোনো হুশ নেই। তবে অর্ধজ্ঞানে যেন ভাইয়ের স্পর্শ অনুভব করল মেয়েটা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
বাবা মা সবার উপর অভিমান করেছে। কারো কাঁধ ভর দিয়ে আছে শুধু এটুকুই বুঝতে পারছে। তার ভালো লাগছে খুব ভালো লাগছে। মানুষটা তার খুব চেনা কেউ মনে হচ্ছে। ঘোমটা তুলে খুব দেখার ইচ্ছে হলো কিন্তু পারলো না।

নিধি, প্রিমা, স্মৃতি,সিয়াম তিতলির বন্ধু-বান্ধবের চোখেও পানি। তিতলিকে ওরা বেস্টফ্রেন্ড কম বোন জানে বেশি। কলিজার বেস্টুর বিয়ে হয়ে গেছে আগের মতো কি আড্ডা দিতে পারবে? যদিও কলেজে একসাথে পড়ে কিন্তু বিয়ে হয়ে গেলে মেয়েদের অনেক নিয়ম বের হয়। স্বামী যা বলে তাই করতে হয়।
ফরিদা বানু নাতিনকে অনেক ভালোবাসেন। নাতিনের জন্য তিনিও অনেক কাঁদলেন। ফারাজকে উপদেশ দিলেন,
আমার নাতিন টারে দেইখা রাইখো নাতজামাই। কোনো ভুল করলে মারধর কইরো না। নাতিন আমার খুব আদরের।
ফারাজ আসার পর থেকে বৃদ্ধ মহিলাটাকে দেখছে। মহিলাটা কিন্তু তার দাদিশাশুড়ি। বাহ একদম দ্বিতীয় তিতলি। চেহারা তেও মিল আছে। হুমম একদম! মনে মনে আওড়াল,
আপনার বেয়াদব নাতিনকে ভালো বানাতে নিয়ে যাচ্ছি।
আফজাল খান তৌসিফ শেখকে আশ্বাস দিয়ে বললেন,
আপনার মেয়ে আজ থেকে আমারও মেয়ে বেয়াই। কোনো চিন্তা করবেন না। আমার মেয়েকে আমি আপনার মতোই আদরে রাখবো বেয়াইসাহেব।

তারপর সবার থেকে বিদায় নিয়ে বরযাত্রী সহ সবাই গাড়ির দিকে রয়না হলো। নিয়ম অনুযায়ী তিতলির সাথে যাবে। তুষার,সিয়াম,নিধি,সহ তিতলির কাজিন হিমু। সবাই এক এক করে গাড়িতে উঠে গেলো। ফারাজ ধীরে ধীরে হেঁটে আসছে তাও বউকে কোলে নিচ্ছে না।
তা দেখে আলভী পাশ থেকে আফসোস করে বলল,
তোর বউ অজ্ঞান হয়ে গেছে দে আমি কোলে নি।
ফারাজ খান আকাশসম রাগ নিয়ে তাকায় আলভীর দিকে। আলভীর উপর রাগ আগে থেকেই। যুবক প্রচন্ড রাগ নিয়ে হিসহিসিয়ে বলল,

রাগে অনুরাগে পর্ব ২২

“আমার বউ কোলে নেওয়ার জন্য আমি একাই যথেষ্ট। তোরে যেন আমার বউর আশেপাশে কখনো না দেখি।”
বলে ফারাজ একমুহূর্ত দেরি না করে অর্ধজ্ঞানে থাকা স্ত্রীকে কোলে তুলে নিলো। জ্ঞান না থাকায় এখন তার জন্য ভালোই হয়েছে।

রাগে অনুরাগে পর্ব ২৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here