Home রাগে অনুরাগে রাগে অনুরাগে পর্ব ২২

রাগে অনুরাগে পর্ব ২২

রাগে অনুরাগে পর্ব ২২
সুহাসিনি ফাতেহা

আজকে সোমবার। তিতলি আর ফারাজের হলুদের রাত। ঘড়িতে প্রায় রাত সাড়ে নয়টা । শেখ বাড়ি জুড়ে উৎসবের তোড়জোড়। সবাই ব্যস্ত হয়ে
এদিক-ওদিক ছুটছে। দুতলা ভবনটা ফেইরী লাইট আর সাদা, লাল গোলাপে সাজানো। গেইট থেকে বাড়ির ভেতর পর্যন্ত ফুলের ডেকোরেশন। উঠানের দুপাশে দুইটা স্টেজ সাজানো হয়েছে। একটা নাচের আরেকটা বিয়ের দিনের। বাবুর্চিরা উঠানের একপাশে রাতের খাবার রাঁধতে ব্যস্ত। আয়োজনটাও বিশাল। একমাত্র মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে তৌসিফ শেখ কোনো কমতি রাখতে চান না।

অথচ এত আয়োজন যাকে ঘিরে তাকে একটুখানি আনন্দও ছুঁতে পারছে না। দুদিনে চঞ্চল মেয়েটা কেমন চুপচাপ হয়ে গেছে। শুধুমাত্র নিজের মনের বিরুদ্ধে গিয়ে বিয়ে করছে। বর কে কি করে কোথায় থাকে কিছুই কারো থেকে জানতে চাই নি। জানতে চাইলেও কেউ বলে নি। ফারাজের কোনো খোঁজ পায় না। এই মুহূর্তে এসে মেয়েটা বুঝতে পেরেছে আসলে সে এতদিন ভুল মানুষের পেছনে দৌড়েছে। সে ভাবতো পাষাণ লোকটা একদিন তাকে বুঝবে। না বোঝেনি। অভিমানে মেয়েটা মোবাইলের সিম কার্ড খুলে মোবাইল সহ ড্রয়ারে ফেলে রেখেছে।
তিতলির বন্ধু-বান্ধব সবাই এসেছে। নিধিরা তিতলির সাথে রুমে বসে আছে। পার্লারের থেকে মেয়েরা হলুদের সাজ সাজাতে আসবে শুনে তিতলি কড়া গলায় বলে দিয়েছে, আমি নিধির হাতে সাজবো। তাছাড়া নিধি অনেক ভালো সাজাতে পারে। তাই কেউ না করেনি।
নিধি, প্রিমা,স্মৃতি সহ বাড়ির সকল মেয়েরা হলুদ,সবুজ রঙের মিশ্রণ শাড়ির সাথে হালকা মেকআপ করেছে। আর ছেলেরা একি রঙের পাঞ্জাবি পরেছে।
নিধি তিতলিকে কখন থেকে এটা-ওটা বুঝাচ্ছে। মেয়েটা শাড়ি পরতে চাচ্ছে না।
শেষমেষ বুঝানোর জন্য বলল,

“মন খারাপ করিস না বেইবি। স্যারের কথা ভুলে যা। তুই স্যারের থেকেও ভালো কাউকে পাচ্ছিস। নে শাড়িটা পরিয়ে দি। আন্টি তাড়া করছে। বরপক্ষ থেকে মানুষ আসার আগেই তোকে রেডি থাকতে হবে।”
তিতলি এখনো একটা সফেদ রঙা গ্রাউন পড়ে আছে। তাকে এখন হলুদের শাড়ি পরানো হবে। চোখের কোণে ভিজে উঠা পানি গুলো মুছে নিয়ে
ভাঙা গলায় নিধিকে বলল,
“আ…আমি কয়েকদিন পরেই ডিভোর্স নিব।
বিয়েটা করছি শুধু ওই লোককে দেখানোর জন্য। কলেজেও আর যাব না। যদি স্যার কখনো আমার কথা জিজ্ঞেস করে, বলে দিস আমার বিয়ে হয়ে গেছে, বাচ্চাও হয়ে গেছে।”
তিতলির কথা শেষ হতেই নিধি-প্রিমা-স্মৃতি তিনজন চোখাচোখি করলো। কারো মুখে কোনো কথা নেই।
পাত্রটা যে তাদেরই ফারাজ স্যার এটা ওরা জানে। কিন্তু তিতলি যেহেতু জানে না তাই ওরাও জানাতে চাচ্ছে না। বললেই সারপ্রাইজ মাটি।

থাক মেয়েটা এখন একটু কাঁদুক। পরে যখন জানবে বরটা ওর ফারাজ স্যার তখন ডিভোর্সের ‘ড’ ও মুখেও আনবে না। বরং খুশিতে দুহাত তুলে লাফাবে এটা নিশ্চিত। এটা ওরা হলফ করে বলতে পারে।
নিধি তিতলির চোখের পানি মুছে দিয়ে আদুরে গলায় বলল,
“আচ্ছা বাবা ডিভোর্স দিস। আগে শাড়িটা তাড়াতাড়ি পর তো। আমরাও তো ফারাজ স্যারকে আজ থেকে দেখতে পারবো না। মানুষটা তোকে বুঝলই না একটুও।”
তিতলি এবার কিছুটা চুপ হলো। কথা না বাড়িয়ে উঠে দাঁড়ালো। প্রিমা ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“মুখটা একটু ধুয়ে আয়। এই অবস্থায় সাজলে পেত্নীর মতো দেখাবে। কেঁদে কেঁদে চেহারার যা হাল করছিস……”

তিতলি ওয়াশরুমে ঢুকল। কাল সারারাত ঘুম হয়নি। দাদুর টেবিল থেকে ঘুমের ট্যাবলেট ভেবে পেট খারাপের ওষুধ খেয়ে ফেলছে। ফলাফল? বিকেল থেতে পাঁচবার ওয়াশরুমে দৌড়। এখন ওষুধ খেয়ে একটু থেমেছে।
ওয়াশরুম থেকে আসতেই নিধি-প্রিমা-স্মৃতি তিনজন মিলে ওকে সাজাতে বসল। হলুদ শাড়ি, মুখে মেকআপ সহ হলুদের জুয়েলারি দিয়ে সাজানো হলো। ত্রিশ মিনিটের মধ্যে কাজ শেষ করলো।
নিধি তিতলিকে আয়নার সামনে দাড় করিয়ে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড।
তারপর বলল,
“মাশাআল্লাহ! আগুন সুন্দরী লাগছে রে তোকে। একদম লাভার মতো।”
প্রিমা দুষ্ট হেসে বলল,
” দুলাভাই যদি এই সাজে এখন তোকে দেখে, কবুল বলার আগেই বাসর ঘরের প্ল্যান করে ফেলবে। গ্যারান্টি।”
নিধি তিতলির গাল টিপে দিয়ে বলল,

“আমাদের দুলাভাই কিন্তু খুব হ্যান্ডসাম। দেখিস প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়ে যাস না। এখন বসে বসে কাঁদছিস, পরশু যেন তোকে হাসতে দেখি বেস্টু।”
তিতলি নাক টেনে শান্ত গলায় বলল,
“আমি কারো দিকে তাকাব না । আমার মন প্রাণ সব একজন না পাওয়া পুরুষের নামে লিখে দিয়েছি তার নামেই থাকবে সারাজীবন।”
“হয়ছে, লেকচার বন্ধ কর । নিধি ফোনের ক্যামরা অন করে বলল, এবার একটু হাসো তো বেস্টু একটা সেলফি তুলি….”
তিতলি ঠোঁটের কোণে জোরপূর্বক এক চিলতে হাসি টানল। যাই হোক একটা পাথর হৃদয়ের ভাল্লুকের জন্য নিজের বান্ধুবিদের মন খারাপ করতে পারি না।
এর মাঝেই সহসা তিতলির কাজিন হিমু বাহির থেকে ডেকে যাচ্ছে,
“আপু দরজা খোলো। বরপক্ষ থেকে ছেলে-মেয়েরা এসে গেছে। তুষার ভাইয়া বলছে তিতলি আপুকে নিয়ে এখনই নিচে যেতে।”

স্মৃতি এসে দরজা টা খুলে দিলো। হিমু মেয়েটা বেশ মিশুক, মিষ্টি। বয়স ১৪ হবে। স্মৃতি হেসে বলল,
“আমরা এখনই নামতাম। তুমি এসেছো ভালো করেছো।”
ওরা সবাই তিতলিকে নিয়ে নিচে নেমে আসলো।
নিচে আলেয়া শেখ সহ তিতলির চাচিরা,খালারা, মামিরা,ফুফুরা,ভাবিরা সবাই কাজে ব্যস্ত। বিয়ে বাড়ির কত কাজ করতে করতে ফজরের আজান দিয়ে দেয় তাও কাজ শেষ হয় না। সবাই তিতলির সৌন্দর্যের প্রশংসা করলো।
বাড়ির সদর দরজা দিয়ে বের করা থেকে স্টেজে আসা পর্যন্ত সবকিছুর ভিডিও করা হলো।

তিতলিকে স্টেজে বসানো হয়ছে অনেকক্ষণ হলো। বরপক্ষ থেকে যারা এসেছে সবাই হলুদ লাগিয়ে, কেক খাওয়াচ্ছে। অতঃপর ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে গেলো। ফটোগ্রাফার ক্যামেরায় ছবি তুলছে,তাও তিতলি কোনোভাবেই চোখ উপরে তুলছে না। কারো কোনো কথা কানে ডুকছে না। তার মস্তিষ্ক অসাড় হয়ে আসছে। এইযে সে মনেপ্রাণে একজনকে ভুলতে চাইছে, বাতিল করতে চাইছে মস্তিষ্ক থেকে। কিন্তু কোনোমতে পারছে না। স্টেজে বসেছে থেকে চোখের পাতায় ভাল্লুক ফারাজ ভাসছে। বায়ুমন্ডলের ন্যায়ে ঘুরছে চারপাশে।
ঝিলিক,রুপসা,আয়েশা,অয়ন,আলভী,ফরহাদ,
নিহাদ, সামিয়া, তাসফি, শাওন,নীলা, সহ আরো বেশ কিছু ছেলে-মেয়ে এসেছে বরপক্ষ থেকে। ঝিলিক তিতলির সাথে ছবি তুলতে এসে কানে কানে মজা করে বললো,
“কি ব্যাপার ভাবি তুমি মন খারাপ করে আছো কেন? একটু হাসো ছবি তুলবো আমরা।”
তিতলির কানে কথাটা আদৌ গেছে কিনা
কে-জানে। সাউন্ড বক্সে ফুল ভলিউমে যেভাবে গান বাজছে,

❝ বন্নো তেরা স্ব্যাগার…. ধুম ধুম…..নখরে তেরে হাজার…. ধুম ধুম….আজ লাগে তু সবসে সুন্দর, লাখো মে এক হাজার….ধুম ধুম….❞
সেখানে ঝিলিকের বলা কথাটা শুনবেও বা কি করে? তিতলি কিছু বলছে না দেখে রুপসা ঝিলিককে টেনে এনে আস্তে করে বললো,
“তিতলি মনে হয় ভাইয়ার কথা ভাবছে ঝিলিক।”
ঝিলিক সন্দেহের গলায় চুপিচুপি বলল,
“আমার কি মনে হয় জানিস? ফারাজ ভাইয়া এতদিন তিতলির সাথে প্রেম করছে।”
“দূর ফারাজ ভাইয়া কি এমন মানুষ নাকি? ”
“এমন মানুষ হতেও কতক্ষণ। তিতলি কি সুন্দরী ভাইয়াকে এমন মানুষ না আরো অনেক ধরনের মানুষ বানাবে দেখিস।”
“আমারও তাই মনে হচ্ছে রে। এই তিতলিই পারবে ভাইয়াকে ভাংজুভাংজু বানাতে। বলে দুজনে হেসে উঠলো।”

অয়ন নিজের মোবাইলে তিতলির কয়টা পিক তুলে সাইডে গিয়ে ফারাজ ভাইয়ের হোয়াটঅ্যাপস এ পাঠিয়ে দিলো। মনে মনে ভাবে, আহারে মেয়েটা মনে হয় বিয়েতে খুশি না। আজকে যদি ফারাজ ভাইয়ের জায়গায় সে থাকতো তাহলে কতই না ভালো হতো। পরক্ষণেই ভাবে, দূর আমি এসব কি ভাবছি। তিতলি এখন ফারাজ ভাইয়ের হবু বউ,রাত পেরোলে সত্যিকারের বউ হবে। অয়নের ভাবনার মাঝেই আচমকা কেউ ধাক্কা দিলো তাকে। ছেলেটার হাত থেকে মোবাইলটা পড়ে যায়। অয়ন তৎক্ষণাৎ চোখ তুলে তাকায় উপরে। তিতলির বান্ধুবি না মেয়েটা? সেদিনও বনভোজনে তিতলির সাথে পিক তুলে দিয়েছে।
নিধির হাতে হলুদের থালা। ইতিমধ্যেই ওর হাতের মাখানো হলুদ অয়নের হাত সহ পুরো মোবাইল হলুদ করে দিয়েছে। মেয়েটা মাথায় ব্যাথা পেয়েছে অস্পষ্ট শব্দে না তাকিয়েই বলল,

“উফফ মাথাটা গেলো রে।”
“এই কে আপনি পথে এভাবে দাঁড়িয়ে আ…..”
অর্ধেক কথা মুখেই আটকে গেলো নিধির। বরপক্ষের মানুষ। আবার তুষার ভাইয়ের কলিজার বন্ধু অয়ন ভাই। আর সে কিনা বড় গলায় কথা বলছে, “কে আপনি” বলে ধমক দিচ্ছে। ইজ্জতের বারোটা।
ভুল যখন করেই ফেলেছে, স্বীকার করাই ভালো।
নিধি একগাল হেসে অপরাধীর মতো বলল,
“সরি সরি ভাইয়া। দেখি নাই। কিভাবে যে ধাক্কা লেগো গেলো বুঝলামই না।”
অয়ন নিচে পড়ে যাওয়া মোবাইলের দিকে তাকালো। মাত্র চারদিন হয়েছে কিনেছে ।
phone 15 Pro।
পুরো স্কিনে কাঁচা হলুদের চাপ। অয়ন চুপচাপ নিচু হলো মোবাইল নিতে।
নিধি, আমিও তুলে দিই, ভেবে নিচু হলো
ফলাফল। ঠাসস!!! দুই কপালের মহা সংঘর্ষ তার উপর অয়নের ঠোঁট ছুঁইছুই নিধির নাকের ডগা সহ ঠোঁটের কাছাকাছি……

অয়ন দ্রুত গতিতে দূরে সরে দাঁতে দাঁত চাপলো।গলা খাঁকারি দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“আপনাকে একবারও বলছিলাম যে আমার মোবাইল তুলে দিন?”
নিধি এখনো নিজের কপাল ঢলছে। লজ্জা পেলো মেয়েটা। কিভাবে যে কি হলো বুঝতেই পারল না। কেন যে এদিকে আসতে গেলো। মেয়েটা হলুদের থালা নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল।
অয়ন ভ্রু কুঁচকে মনে মনে বলল,
“হুমম কার বান্ধুবি দেখতে হবে না।” অনেকটাই তিতলির মতো স্বভাব। অয়নের বুকে মোচর দিয়ে উঠলো সহসা। সে মোবাইল নিয়ে তৎক্ষণাৎ ত্রস্ত পায়ে সে জায়গা ত্যাগ করলো। ভুলবসত ধাক্কা লেগে হয়ে গেছে এতে ভাববার কিছু নাই।

.ঝিলিকের দিকে কয়েকবার ঘুরেফিরে তাকিয়েছে তুষার।
তাকালে আসলেই বা কি হবে? আগ বাড়িয়ে কোনো কথা বলার মতো মানুষ তুষার না। অয়নের সাথে দাড়িয়ে কি নিয়ে যেন কথা বলছে তার মাঝেই তুষার অয়নকে বলল,
“তোর ফুপাতো বোন ঝিলিককে আমার জন্য রাখিস। বিয়ে করবো।”
অয়ন ভ্রু কুঁচকে কৌতুকে বলল,
“বিয়ে দিলেই তো করবি। ওর বিয়ে দিয়ে দিবে। কিছুদিন পরপর পাত্রপক্ষ দেখতে আসে। কোনদিন বিয়ে হয়ে যাবে তখন শুনে বসে বসে নায়ক বাপ্পারাজের মতো কাঁদবি।”
“তোর ফুপিকে বলিস আমার কথা। বলবি এত পাত্র না দেখিয়া আমার বন্ধু তুষারের কথাও তো ভাবতে পারেন।”
তখন সেখানে আলভীও চলে আসে। যার ফলস্বরপ ওদের কথার সেখানেই সমাপ্ত হয়।

ঘড়িতে রাত প্রায় বারোটা। খান বাড়ির পরিবেশ উৎসব আয়োজনে মুখরিত। হলুদের সব কার্যক্রমের আয়োজন করা হয়েছে। কিন্তু ফারাজ এসবের ধারে কাছেও নেই। বাবার কথায় সাদা পাঞ্জাবি পাজামা পড়ে নিচ থেকে কিছুক্ষণ ঘুরে নিজের রুমে চলে এসেছে। বাড়ির প্রায় সব ছেলে মেয়েরা কনেপক্ষের বাড়ি চলে গেছে। আজকে যেন আগুনের গরম পড়ছে। ফারাজ খান নিজের রুমে এসে পাঞ্জাবি টা খুলে ফেলল। ভেতরে সাদা স্যান্ডোগেঞ্জি। সেটাও ঘর্মাক্ত। ওটাও খুলে ফেলল। অতঃপর এসির পাওয়ার বাড়িয়ে বিছানায় বসে চুল গুলো পেছনে ঠেলে দিয়ে মোবাইল হাতে নিলো। নোটিফিকেশন এ অয়নের আইডি থেকে 5 Photos দেখে হোয়াটঅ্যাপস এ ঢুকলো।
চোখের সামনে ভেসে উঠলো এক চেনাজানা রমনী। ফারাজ ভ্র কুঁচকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মেয়েলি চেহারাটা দেখল। পরক্ষণেই ভ্রুজোড়া শিথিল হলো যুবকের। একটাতেও চোখ উপরে তুলা নেই। সবগুলো নিচের দিকে তাকানো। উপরে তাকালে কি হতো? ফারাজের রাগ হলো। অনেকক্ষণ সময় নিয়ে পিক গুলো দেখে যুবক বাঁকা হেসে বিড়বিড় করে থামল,
“তো ফাইনাললি ফারাজ খানের স্ত্রী হতে যাচ্ছেন। আফটার অল আপনার এই নিচের দিকে তাকিয়ে থাকার সময়সীমা আর মাত্র 24 ঘন্টা। আই সোয়্যার, চোখ তুললেই আমাকে দেখতে পাবেন।”

বিয়ের দিন।
সময় দুপুর তিনটার । বরপক্ষ হতে প্রায় তিন হাজার লোকজন গিয়ে খেয়ে এসেছে এ পর্যন্ত। এখন বরযাত্রী গাড়ি যাওয়ার পালা। ফারাজ খান
সাদা রঙা এমব্রয়ডারি কটি পাঞ্জাবি পরেছে। চুলগুলো ব্রাকবাশ করা। যুবকের মুখখানা সে কি গম্ভীর। গালের খোঁচা খোঁচা দাঁড়ির উপস্থিতিতে, লম্বাটে চোয়ালখানা কেমন তীক্ষ্ণ হয়েছে ব্লেডের ন্যায়। কটি পাঞ্জাবিতে সুদর্শন পুরুষটার রূপটা যেন এবারে চোখে ষোলো আনাই ফুটছে। আলভী সহ আজ নিহাদ ও এসেছে ফারাজের রুমে। কালকে হলুদে গিয়ে বউ দেখে এসেছে যদিও আয়েশার বিয়েতেও দেখেছে। আলভী খোঁচা মেরে বলল,

“তুই না সাহসী মেয়ে খুঁজিতেছিলি যে তোরে সামলাবে? ভাবিরে দেখে তো মনে হয় না তোকে সামলাতে পারবে। তোর যে মোটকা বডি।”
ফারাজ নিজের হাতে দামি ব্যান্ড ঘড়ি টা লাগিয়ে কেমন মনে মনে বলে,
“আমার বুকের ধাক্কা খেয়েও পরে যায় আবার নাকি আমাকে সামলাবে। মনে মনে বললেও আলভীকে বলে,
“সেটা তোকে চিন্তা করতে হবে না তুই বরং তোর বউর চিন্তা কর।”
“আমার বউ আলহামদুলিল্লাহ্‌ চার মাসের প্রেগন্যান্ট। কয়দিন পর বাপ হবো।”
ফারাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“তো আমি কি করবো?”
“পারলে দুই মাসের ভেতরে সুখবর দিস।”
আলভী তাও থামলো না,

“মনে হয় মেয়েটাকে জোর করে তোর সাথে বিয়ে দিচ্ছে আহারে। তোর মতো বুইড়ারে বিয়ে করতেছে এটাই অনেক। আমি এতদিন ভাবছি তোকে কেউ বিয়ে করবে না।”
ফারাজ রাগে চোয়াল শক্ত করে নেয়। আলভী ভয় না পেয়ে চিল মুহূর্তে বানিয়ে ফারাজকে সহ নিয়ে গেলো স্টেজে। সব কাজিন মিলে একসাথে অনেক পিক তুললো। এখনই রয়না দিবে কনের বাড়ি। ফারাজ মা বাবাকে সালাম করলো। ফারিন বেগম ছেলেকে দোয়া করে দিয়ে বললেন,
“যা বাবা আল্লাহর নামে যা। আর আজকে অত্যন্ত মুখটা একটু হাসিখুশি রাখ। বৌমাকে বাড়ি নিয়া আসা পর্যন্ত আমি দরজায় দাঁড়ায় অপেক্ষা করতেছি।”
ফারাজ মা-বাবা থেকে দোয়া নিয়ে আরোককিছু বরযাত্রী সহ গাড়ি করে রয়না হলো।

তিতলি বিছানায় জড়সড় হয়ে বসে আছে। তাকে ঘিরে বসে আছে নিধি, প্রিমা, স্মৃতি,তিতলির ছেলে কাজিনদের বউরা সহ চাচাতো বোন ফুপাতো বোনরা। পরনে হোয়াইট-মেরুন রঙা বেনারসি। লেহেঙ্গা পরার কথা ছিলো কিন্তু তিতলির দাদু বলেছে বিয়ের দিন শাড়ি পরতে হবে। মেয়েদের বিয়ের দিন শাড়িতেই মানায়। তাই লেহেঙ্গা পরা হয়নি। পার্লার থেকে মেয়ে দুটো এসে সাজিয়ে দিয়ে গেছে। ঠোঁঠে টকটকে লাল লিপিস্টিক।চোখে গাঢ় কাজল। স্বর্ণের অলঙ্কারে দেহ ঢেকে আছে যেন নিটোল অপ্সরী নেমে এসেছে মর্ত্যলোকে। তিতলির ভাবিরা খানিক পরপর ফিসফিস করে লজ্জা দেওয়ার জন্য কত কী যে বলে চলেছে কানের ধারে। কিন্তু তিতলি চুপচাপ বসে আছে।
ফরিদা বানু এসে নাতিনের পাশে এসে বসলেন।
মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিয়ে রসিকতা করে বললেন,

“জামাই কাছে আইতে চাইলে আসতে দিবি। কাপড় খুলতে চাইলে ডরাইস না আবার বাঁধাও দিস না কইলাম।”
তিতলি তো নিজের চিন্তায় -পাগলপ্রায়। সে খুব করে করে চাইছিলো বিয়েটা ভেঙে যাবে। ফারাজ এসে বলবে,
“এই বিয়ে হবে না।”
কিন্তু না… কিছুই তো হলো না । আসলে সে এসব ভাবে কিভাবে? লোকটা নিশ্চয় শুনছে তার বিয়ে আজ। তাদের তো কোনো প্রেমের সম্পর্ক ছিলো না। তাহলে আসবেই বা কেন। তার উপর আবার দাদু এখন কিসব আজগুবি কথা বলতেছে। সে কেন কাপড় খুলবে?
যেখানে বিয়েটাই মানে না। বাসর রাত আসুক,
সোজা বলে দিবে – “আমার ডিভোর্স চাই।”
তিতলির অযাচিত ভাবনার মাঝেই
নিধি দ্রুত ফরিদা বানুকে থামানোর চেষ্টা করে বলল,
“দাদু এসব কি বলেন? তিতলি লজ্জা পাচ্ছে….”
ফরিদা বানু হো হো করে হেসে উঠলেন। তিতলির গাল টিপে দিয়ে বললেন,

“এগিন সক্কল জামাই-ই বউগোরে করে। তাই নানিত তোরে আগে থেইকে কইয়া দিলাম। শোন, বাসর ঘরে বেশি চিল্লাচিল্লি করিস না মাইনষে সরম দিবো। চুপচাপ সহ্য করিস।”
ফরিদা বানু একটু থেমে আবার বললেন,
“এইবার ক ধরতে চাইলে কি করবি?”
“আমি…আমি আমাকে ধরতে দিবো না, চিল্লাবো।” নাক টেনে বললো তিতলি।
ফরিদা বানু নানিতকে আরো বুঝিয়ে বলেন,
“নানিত জামাইরে টাইট দি রাখবি। কোনো মাইয়া মাইনষের লগে মিশতে দিস না। তোর দাদারে আই বুইড়া হয় গেছে যে টাইট দি রাখতাম। এর লাইগা আমার কথায় উঠতো বইতো।”
ফরিদা বানুর কথার মাঝেই বাইরে হৈচৈ শুরু হলো। বরযাত্রী চলে এসেছে। সবাই সেদিকে দৌড়ালো। শুধু তিতলির বান্ধুবিরা বসে আছে। নিধি তিতলিকে বলল,
“বাসর ঘরে কোনো ঝগড়া করিস না আবার। নতুন দুলাভাইকে মানিয়ে নিস বেইবি।”
তিতলি কোনো উত্তর দেয় না। কেমন যেন অস্বস্তি লাগছে সবকিছু। কার সাথে আসলে তার বিয়ে হচ্ছে এটা জানার দরকার ছিলো। কোন বুইড়ার সাথে বিয়ে দিচ্ছে আল্লাহ জানে। আল্লাহ যেন ভাল্লুকের থেকেও হ্যান্ডসাম হয়। তারপর কলেজে বর কে নিয়ে ঘুরে আসবে ফারাজকে দেখাবে।

ফারাজকে গেটে আটকালো তিতলির গ্রাম থেকে আসা কাজিন স্কোয়াড- হিমু,নিশা,আর,প্রিতি,নীতি। সবার হাতে মিষ্টির প্লেট। মিষ্টির ভেতরে গুরা মরিচ ঢুকিয়ে নিয়ে এসেছে খাওয়াবে বলে। প্রিতি মুচকি হাসি দিয়ে বলল,
“ভাইয়া বউ নিতে আসছেন ? আগে মিষ্টি মুখ করেন।”
ফারাজের সাথে সব কাজিন ও বন্ধুবান্ধব গেইটে দাড়িয়ে। ফরিদা বানুর কথায় গ্রামের মতো লাল ফিতা বেঁধেছে। সেটা কেটে বরকে বরণ করা হবে।
ফারাজ একবার তাকালো প্লেটের দিকে। কিন্তু মেয়েগুলোর দিকে তাকালো না। আসলে সত্যি সে বিয়ে করতে আসছে? কেমন অদ্ভুত সব অনুভূতি হচ্ছে। যদিও বিয়ে নিয়ে ওত সিরিয়াস ছিলো না। ফারাজ গম্ভীর সুরে বলল,

“আমি এসব খায় না। ”
চারজনের মুখ চুপসে গেলো। কই ভাবলো দুলাভাইয়ের সাথে একটু মজা করবে হলো কই? দুলাভাইতো আস্ত এক গম্ভীরান্ধ, হারিচাচা, যাই হোক মিষ্টি না খেলে তারা ছেড়ে দিবে নাকি? তাদের দাদি পাঠাইছে বর থেকে টাকা নিতে।
নীতি মুচকি হাসি দিয়ে বলল,
“মিষ্টি না খেলে তাহলে নগদ ত্রিশ হাজার চাই।
না দিলে ভাগেন। বউ পাবেন না।”

রাগে অনুরাগে পর্ব ২১ (২)

ফারাজ কাদের পাল্লায় পড়লো। এরা তো বেয়াদব মেয়েটার থেকেও দ্বিগুন বেয়াদব। তার এখন শুধু বউ দরকার। বিয়ে করতে এসেছে, যত তাড়াতাড়ি বউ নিয়ে যাবে তত ঝামেলা শেষ। তাই পকেট থেকে মোটা অঙ্কের ত্রিশ হাজার টাকা বের করে দিয়ে দিলো। ওরা খুশি হয়ে ফিতে কেটে দিলো।
আলভী পকেট থেকে রুমাল বের করে ফারাজকে দেওয়ার ভান করে আস্তে করে বলল,
“লজ্জা করে না? নে রুমাল দিয়ে মুখটা ঢাক। মানুষে তাকায় আছে।”

রাগে অনুরাগে পর্ব ২৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here