রাগে অনুরাগে পর্ব ২১ (২)
সুহাসিনি ফাতেহা
সেই রাতটা তিতলির একদম ভালো কাটেনি। ফারাজের বলা “হুমম” শব্দটা সপ্তদশীর রাতের ঘুম ঝলসে দিয়েছে। ছটফট করতে ফজরের সময় চোখ লেগে গেলো। উঠলোও বেলা করে। তখন প্রায় দশটা বাজে ঘড়িতে। আলেয়া শেখ কয়েকবার মেয়েকে ডেকে গেছেন। কিন্তু জেদি মেয়েটা চুপচাপ দরজা লাগিয়ে বসে আছে। কোনো সাড়াশব্দ করছে না। আর বললেও জোর দিয়ে বলছে, “ঘুমাচ্ছি আমি।”
তার চোখ-মুখ ফুলে কলাগাছ হয়ে আছে। এই চেহারা নিয়ে নিচে যাওয়াও সম্ভব নয়। সারারাত কেঁদে এখন আর কাঁদতেও পারছে না। কাঁদলেই শান্তি নাই। চোখের পানি, নাকের পানি এক হয়ে যায়। তারপর আর নিশ্বাস নেওয়া যায় না।
না, এভাবে আর ওই পাষাণ লোকের জন্য কেঁদে নিজেকে কষ্ট দেওয়া যায় না। ওই লোক তাকে কখনো বুঝেনি। ভালোবাসেনি। আর সে কতকিছু ভেবে এসেছে এতদিন। ফারাজ যখন তাকে জোর করে বলতো,
“আমার দিকে তাকাও বলছি? আমি ডাকছি শুনছো না কেন?” —- শাসনের মতো কথাগুলো শুনলে তুলতুলে ভালোলাগায় ভরে যেত বুকটা। কিন্তু ওগুলো সব মিথ্যা ছিলো, সব অভিনয়। নিজের মনকে বুঝাতে শুকনো ঠোঁটজোড়া আনমনেই বিড়বিড় করলো,
“ করুক বিয়ে! একটা বিয়ে করুক নাহলে দশটা। আমার কি? তাতে আমার কিছুই আসবে যাবে না। তার সাথে বউ থাকুক! বাচ্চা থাকুক! ইট ডাজেন্ট ম্যাটার।” কিন্তু মনের কোণে এটা আসলেই ম্যাটার করে। তিতলির বুক চুরমার করে কান্না পাচ্ছে। কেন ওই পাষণ্ড মানুষটার প্রেমে পড়তে গেলো।
আচমকা দরজায় টোকা দিলো কেউ। গলা ছেড়ে দিয়ে উঁচু আওয়াজে ডাকলো,
“তিতলি, রুম থেকে বের হচ্ছিস না কেন?”
ভাইয়ের কণ্ঠ পেয়ে মেয়েটা তৎক্ষণাৎ সোজা হয়ে বসলো। ভাবনায় এলো এতক্ষণ দরজা বন্ধ করে বসে থাকলে নিশ্চিত বাড়িতে বড় কোনো কাণ্ড ঘটবে তাকে নিয়ে। মেয়েটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এমন কষ্ট এই সতেরো বছরের জীবনে কখনো পায়নি। গলা পরিষ্কার করে জোড়ালো গলায় ভাইকে বলল,
“তুমি যাও আমি আসছি ভাইয়া।”
অধৈর্য তুষার বোনের কথা শুনে দরজা ধাক্কা দিয়ে স্রেফ বলল,
“তোর কি হয়ছে বলতো?”
“কিছু না। ঘুম ভাঙছিল না ভাইয়া।”
“আচ্ছা তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আয়।”
আর আওয়াজ আসলো না। ভাই চলে গেছে মনে হয়। তিতলি তাড়াহুড়ো করে ফ্রেশ হয়ে এলো। সিল্কি লম্বা চুল গুলোর ঝাঁটার মতো দশা। রাতে নিজে ইচ্ছে করেই চুল খুলে দিয়ে সামনে পেছনে ছড়িয়ে ভূতের মতো হয়ে কেঁদেছে। ওই লোককে সে কখনো ক্ষমা করবে না। নিজের মনকে বুঝিয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলো তারপর।
তিতলি সিঁড়ির সামনে এসে থেমে গেলো। আলেয়া শেখ আর ফরিদা বানু নিজেদের মধ্যে কথা বলছেন, “বিয়ে পরশুদিন।”
তিতলি আবার দাদুর কথা শুনতে পেলো,
“কালকে তেলের রাত হবে।”
আলেয়া শেখ ভাবুক হয়ে বললেন,
“সবকিছু খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যাচ্ছে না, আম্মা? ছেলেপক্ষ আরেকটু সময় দিলে ভালো হতো।”
“বেশি বুইঝো না বৌমা। বিয়ার মত ফরজ কামে দেরি কইরতে নাই। যত তাড়াতাড়ি দন যাইবো ততই মঙ্গল।”
“তিতলিরেও তো বলা হয় নাই আম্মা। মেয়েটার কি হয়ছে কে জানে। সকাল থেকে ডাকি শুধু বলতেছে ঘুম যায়। আরেকবার ডেকে আসি।”
ইতিমধ্যেই তিতলি হেঁটে একদম মায়ের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। মেয়েটার মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। ভ্রুযুগল কুঁচকে রেখে অভিমানী গলায় বলল,
“আমি এসেছি ডাকা লাগবে না।”
আলেয়া শেখ মেয়ের মুখশ্রী দেখে দাড়িয়ে ঘুরেফিরে দেখতে থাকলেন। ভাবলেন, মেয়ের মতিগতি তো ঠিক লাগছে না। চোখ লাল হয়ে আছে। একবার দেখে আবার সতর্ক চোখে চাইলেন তিনি।
“কী রে, তোর চোখদুইটা ওমন লাল হয়ে আছে কেন?”
“ধরা পড়ে যাওয়ার মতো কথা শুনে তিতলি
আমতা-আমতা করল,
“কই, না তো?”
আলেয়া শেখ মেয়েকে চেনেন। নিশ্চিত তার কাছে কোনো কিছু লুকাচ্ছে। তিনি সন্দেহের চোখে এগাতে নিতেই, ত্রস্ত একপা পিছনে সরল তিতলি। বলল,
“চোখে কি যেন পড়েছে আম্মু। তাই লাল হয়ে গেছে।”
আলেয়া শেখ মেয়ের কথা বিশ্বাস করলেন না। কারণ মেয়ে কিছুক্ষণ পরপর বড়বড় নিশ্বাস পেলছে। ফুঁপানোর মতো করে উঠছে।
মিথ্যা বলছিস কেন?
তিতলি কিছু বলল না।
আলেয়া শেখ ওতকিছু না ভেবে সোজা বললেন,
“নাস্তা করতে বোস।”
তিতলি বাধ্য মেয়ের মতো নাস্তা করতে বসে গেলো। খাবার গলা দিয়ে নামছে না। চোখের সামনে শুধু ফারাজের গম্ভীর চেহারা ভেসে উঠছে। এই গম্ভীর চেহারা, অ্যাটিটিউড, হাঁটাচলা, কথা বলার ভাবভঙ্গিমা দেখেই তো সে ওই লোকের প্রতি শতবার ঘায়েল হয়েছে।
“নাস্তা না করে বসে আছিস কেন?”
তিতলি কোনোমতে ভাবনা থেকে বেরিয়ে একটা ব্রেড খেলো। আর খেতে পারবে না। মূলত সে খাবে না। খিদে পেয়েছে প্রচুর। তাও খাবে না।
তিতলি কিছুক্ষণ সোফায় এসে চুপচাপ বসে থাকলো দাদির পাশে। ফরিদা বানু নাতিনের পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
“তোর বিয়া ঠিক হয়ছে ছেমরি। মনমরা করে বয় রইছিস ক্যান?”
তিতলির ধ্যান ফিরলো কথাটায়। মেয়েটা তটস্থ ভঙ্গিতে দাদুর কথা বুঝার চেষ্টায় নিমগ্ন। তার বিয়ে? সিরিয়াসলি? কই কেউ তো তাকে বলে নি? গোল মুখশ্রী তে হাজারো প্রশ্ন খেলা করছে। সেদিন ও দাদু বলেছে তোর মনে হয় বিয়ার রঙ লাইগবো ছেমরি। মেয়েটা অবুঝ ভঙ্গিতে মাথা নাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“আমার বিয়ে মানে কি দাদু? কি বলছো এসব?”
“ঠিকই কইতাছি। তোর তেলের রাত অইবো কাল। পরেরদিন বিয়া।”
তিতলি বসা থেকে উঠে দাঁড়লো সহসা। গলা ছেড়ে বাবাকে ডাকলো,
“আব্বু! আব্বু! আব্বু!”
আলেয়া শেখ কিচেন থেকে দৌড়ে এসে বললেন,
“তোর আব্বু অফিসে জরুরী মিটিং এ গেছে। চিল্লাচ্ছিস কেন?”
মেয়েটার চেহারা কাঁদোকাঁদো ভাব। কেঁদে দিবে ওমন ভাব নিয়ে বলল,
“আম্মু দাদু এসব কি বলছে? আমার বিয়ে মানে কি?”
আলেয়া শেখ মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে নরম সুরে বললেন,
“তোর দাদু সত্যিটাই বলতেছে। কাল হলুদ হবে পরশু বিয়ে। রাতে আমরা ছেলেপক্ষ সহ শপিং এ যাবো। তুই কি খুশি না?”
তিতলির কান্না আরো বেড়ে গেলো। এসব কি শুনছে সে? তার বিয়ে? এক জ্বালাতে বাঁচে না।আরেক জ্বালা তাকে গ্রাস করে নিচ্ছে। তার তো মনে হয় আর বেঁচে থাকা হবে না।
আলেয়া শেখ মেয়েকে শান্ত করতে বলল,
“কাঁদিস না মা। মেয়েদের একদিন না একদিন তো বিয়ে দিতেই হয়। আর ছেলে খুব ভালো। তুই ভালো থাকবি। পড়াশোনাও করতে পারবি।”
তিতলি নাক টানছে। কথা গলা দিয়ে বের হচ্ছে না। আটকে যাচ্ছে তাও বলতে চাইলো,
“আমি…আমি বিয়ে করবো না আম্মু।”
“তা বললে কি আর হবে। বিয়ের সব কথা পাকাপোক্ত হয়ে গেছে।”
এইমুহূর্তে এসে ফারাজের “হুমম” বলা শব্দটা মনে এলো মেয়েটার। সহসা মেয়েটা নিজেকে শক্ত করে নিলো। ভীষণ শক্ত! আলেয়া শেখ মেয়ের চোখের পানি মুছে দিলেন শাড়ির আঁচল দিয়ে। তিতলির কান্না কিছুটা থামলো। সে রাজি বিয়েতে। ওই লোক বিয়ে করতে পারলে সেও পারবে। তাকে দেখানোর জন্য হলেও সে বিয়ে করবে পরে না হয় ডিভোর্স দিয়ে দিবে। আগে ওই লোককে দেখিয়ে দিবে শুধু তুই বিয়ে করতে পারিস না দেখ আমিও বিয়ে করছি আর তোর থেকেও হ্যান্ডসাম বর পেয়েছি।
তুষারও নিচে নেমে এলো বোনের আব্বু আব্বু ডাক শুনে। সে আপাতত কার্ড নিয়ে সবাইকে ইনভাইটেশন করতে যাবে। হাতে ব্যাগ নিয়ে নেমেছে। সব দ্রুত হওয়ায় রাতের মধ্যে কার্ড বানিয়ে এনেছে। তিতলির চাচা ফুপু খালা নিকটাত্মীয় দের বাড়ি অনেক দূরে দূরে হওয়ায় ফোন করে বলা হবে। এখন শুধু আশেপাশের পাড়া প্রতিবেশীদের কার্ড বিতরন করে দিবে। কিন্তু বোনের চিৎকার পেয়ে নেমে এসেই বলল,
কি হয়ছে তোর? এমন করছিস কেন?
তিতলি ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে কিছু বলল না। মন মেজাজ খারাপ কারো সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে না।
ফরিদা বানু হেসে বললেন,
নাতিন আমার সরম পাইতেছে। তাই কিছু কইতেছেনা।
আলেয়া শেখ ও মেনে নিলেন নীরাবতা সম্মতির লক্ষণ। তিনি ও একটু শাশুড়ির মতো স্বভাব চরিত্র। মেয়েকে ভালোবাসেন, আদর করেন ঠিকই। কিন্তু জন্ম, মৃত্যু,বিয়ে সব তো আল্লাহর হাতে তিনি যার সাথে মেয়ের জোড়া করে রেখেছেন হাজার বিধি-নিয়ম ভেঙে হলেও তার সাথেই বিয়ে হবে।
তুষার বোনের যাওয়ার দিকে চেয়ে থেকে পরক্ষণেই মাকে বলল,
তিতলি কিছু না বলে চলে গেল কেন? আব্বুকে ডাকছে কেন?
আলেয়া শেখ তুষার কে বললেন,
এমনি দেখে নাই যে ডাকছে।
তিতলির কোনোভাবে এই বিয়েতে অমত নেই তো? না হলে সকাল থেকে এমন অদ্ভুত ব্যাবহার করছে কেন?
ফরিদা বানু নাতিকে ধমক দিয়ে বললেন,
ওর অমত, মত দিয়া কি অইবো। সক্কাল থেইকা মন খারাপ কইরা আছে ক্যান জানিস? বিয়া হইবো যে আমাগো ছেড়ে যাইতে অইবো যে তাই।
তুষার কিছু না বলে সদর দরজা দিয়ে বের হওয়ার আগে মাকে বলল,
আমি আমার বন্ধুবান্ধব আশেপাশের আত্মীয় স্বজনদের কার্ড দিতে যায় আম্মু।
আলেয়া শেখ ছেলেকে সাবধানতার হুকুম দিলেন,
আচ্ছা। বাইক সাবধানে চালাবি।
তুষার মায়ের কথা শুনে মাথা দুলিয়ে বাইক নিয়ে চলে গেলো।
বিকেল তিনটা।
খান বাড়িতে তখন আনন্দে মুখরিত পরিবেশ। চাচাতো, ফুপাতো,মামাতো,খালাতো সহ বড়রা সবাই খুশি হয়েছেন ফারাজের বিয়ের কথা শুনে। ফারাজ খান মনে মনে ভাবে, যার বিয়ে তার খবর নাই পরিবারের আনন্দের শেষ নাই। ইতিমধ্যেই হলুদের একদিন আগেই চাচাতো ভাই বোনেরা এসে হাজির। মনে হয় বিয়ে তার না বরং বাড়ির সবার। বেশ সবাই আনন্দ করুক বরং সে আনন্দ করার সুযোগ করে দিয়েছে। তবে যার সাথে তার বিয়ে হতে যাচ্ছে তার আগামী দিনগুলো ধূলিসাৎ হতে যাচ্ছে এটা শিওর। বেয়াদব মেয়েটা তাকে চলে কৌশলে অনেক কিছু বুঝাতে চাই। পিচ্চি মেয়েটা ভাবে সে কিছু বুঝে না। এবার সে বুঝাবে তাকে কি বুঝাতে চাই সেটা এক দুই তিন চার করে বুঝাবে।
ফারাজের ভাবনার ভেতরেই ফারাজ খানের চাচাতো ভাই আলভী ফারাজের রুমে আসলো। সেদিন আয়েশার বিয়ের সময় কম কথা শুনাই নাই তাকে। আজ সেও শুনাতে এসেছে। এসেই খোঁচা মেরে বলল,
অবশেষে তাহলে বিয়েটা করতে যাচ্ছিস?
ফারাজ খান নিজের ম্যাকবুকটা বন্ধ করলো। এতক্ষণ একটা জরুরী কাজ করছিলো ম্যাকবুকে।
কাজও শেষ! ঘুরে বসে আলভীর দিকে ফিরলো যুবক। কেমন বাঁকা হেসে ছোট করে বলল,
রাগে অনুরাগে পর্ব ২১
“হুমম!”
মুখে এটা বলেও যুবক বিড়বিড় করে থামল, “তোর পিচ্চি হবু ভাবির মন ভাঙাতে বিয়ে করছি দেখি আর কত উড়ে, কমতো জ্বালালো না।”
