Home রাগে অনুরাগে রাগে অনুরাগে পর্ব ১৯

রাগে অনুরাগে পর্ব ১৯

রাগে অনুরাগে পর্ব ১৯
সুহাসিনি ফাতেহা

বনভোজনে পুরো সময়টা সবার ভালোই কাটলো। নন্দন পার্কের সৌন্দর্য কলেজের সকল স্টুডেন্টের মন কেড়ে নেওয়ার মতো ছিলো। সকাল এগারোটা ত্রিশ মিনিট থেকে বিকেল পাঁচটা ত্রিশ মিনিট পর্যন্ত তিতলি পুরোটা সময় নিজের সবটুকু আনন্দ উজাড় করে উপভোগ করেছে বন্ধু-বান্ধব নিয়ে।
এখন সময় প্রায় সন্ধ্যা সাতটা। অবশেষে নন্দন পার্ক থেকে বাড়ি ফিরছে তিতলি। বাড়িতে চলে আসলেও মনটা যেন ওখানেই পড়ে আছে। এই স্মৃতি সে কখনো ভুলবে না। তিতলিকে এতক্ষণ তুষার কিছু বলে নি। তিতলি যে গাছে উঠেছে ওই খবর তার কানেও এসেছে। বাড়ির গেইট দিয়ে ঢুকার সময় বোনকে শাসনের সুরে একনাগাড়ে বলল,

“তুই ওখানে গিয়ে গাছে উঠেছিস কেন? শাড়ি পড়ে কেউ গাছে উঠে কোনোদিন শুনছিস? যদি পড়ে গিয়ে হাত-পা ভেঙে যেতো তখন কি করতি? তুই কোনদিন মানুষ হবি হ্যাঁ?”
ভাইয়ের কথা শুনে তিতলি চোরা চোখে তাকালো। সত্যি তো সে গাছে উঠেছে। এখন কি ভাইয়ের কাছে স্বীকার করবে নাকি স্বীকার করবে না? না স্বীকার করা যাবে না। পরে তাকে আর কোথায়ও নিয়ে যাবে না। তাই অবাক হওয়ার মতো করে বলল,
“বিশ্বাস করো ভাইয়া! আমি কোনো গাছে উঠিনি। সব ডাহামিথ্যে!”
তুষার তৎক্ষণাৎ বোনের মাথায় টোকা মেরে বলল,
“একদম মিথ্যা বলবি না। আমি সব দেখেছি তুই গাছে উঠে বাঁদরের মতো পা ঝুলিয়ে বসে ছিলি।”
তিতলি ধরা পড়ে গিয়ে আর ঘুরিয়ে মিথ্যা বলার সাহস পেলো না। তাই অসহায় মুখ করে বলল,
“আব্বুকে বলিয়ো না প্লিজ ভাইয়া ! আর কখনো গাছে উঠবো না।”
তুষার বোনের কথা শুনে গম্ভীর মুখে হেসে ফেলল। তার বোনটা কি অবুঝ! সে দেখেছে বলছে আর সেটা কি সুন্দর করে বিশ্বাস করে নিয়েছে। তুষার জানে কিভাবে বোনের মুখ থেকে সত্য কথা বের করতে হয়। তাই বলল,

“বলবো না যা!”
তিতলি খুশি হয়ে ভাইকে চিত্তপ্রফুল্লে বলল,
“আমার ভালো ভাইয়া!”
তুষার খোঁচা মেরে বলল,
“আমার ভালো বোন এবার হয়ছে? ”
“হুমম একদম হয়ছে!”
কথা বলতে বলতে সদর দরজার সামনে এসে কলিংবেল বাজালো তুষার।
তৌসিফ শেখ মোবাইল হাতে নেন তুষারকে কল দেওয়ার জন্য তখনি কলিংবেলের আওয়াজ শুনে উঠে এসে দরজা খুলে দিয়ে ছেলে-মেয়েকে দেখে বললেন,
“আমি আরো এখন কল দিতে যাচ্ছিলাম।”
তিতলি খুশি মনে বলল,

“এইতো চলে এসেছি আব্বু!”
“ বনভোজন কেমন কেটেছে আম্মু! কোনো সমস্যা হয়নি তো?”
“অনেক ভালো লেগেছে আব্বু। তুমি গেলে কিন্তু আরো বেশি ভালো লাগতো।”
তৌসিফ শেখ হেসে বললেন,
“এখন রুমে গিয়ে তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নাও আম্মু!”
“জ্বি আব্বু!”
তিতলি চলে যেতেই তৌসিফ শেখ তুষারকে বললেন,
“তোর সাথে জরুরী কথা আছে !”
তুষার ভ্রু কুঁচকে চিন্তা করলো,কি এমন জরুরী কথা। পরক্ষনেই সোফায় বসতে বসতে বলল,
“কি এমন জরুরী কথা আব্বু?”
তৌসিফ শেখ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
আফজাল খান আজ আমার অফিসে গিয়ে তাদের ছেলের জন্য আমাদের তিতলির হাত চাইছে…”
তুষার চমকে উঠলো সহসা। বসা থেকে নড়চড়ে অবাক হয়ে বলল,
কি বলছো আব্বু! ফারাজ ভাইয়ের জন্য ? ভাই কি জানে এসব?
সেটা তো জানি না। কিন্তু খুব জোর করে বলে গেলেন বিষয়টা ভেবে দেখতে। তাই তোকে বললাম।
ফরিদা বানু পান চিবাচ্ছেন। কিছুটা দূরে বসে এই কথা শুনে বললেন,
পোলা ভালা হইলে দেইখা শুইনা দিয়ে দাও বাপ! মাইয়া মাইনষেরে যত তাড়াতাড়ি বিয়া দন যাইবো ততই মঙ্গল!

কিন্তু আম্মা তিতলি তো এখনো ছোট! এ বয়সে বিয়ে দেওয়া কি ঠিক হইবো।
তোর বাপে আমারে ১৩ বছরে বিয়া করছে। তখন আমি তোর দাদার গো সব কাজ কাম কইরা তুদেরও সামলাইছি।
তখনকার দিন আর এখনকার দিন এক না আম্মা। এখন যোগ বদলাইছে।
তাও ভাইবা খোঁজ খবর লই দেখ পোলা যদি ভালা হয় তাইলে তো হইলো।
তুষার কিছু ভেবে বলল,
আব্বু আমি কি ফারাজ ভাইয়ের সাথে এ বিষয়ে কথা বলে দেখবো।
না এখন বলার দরকার নেই। আগে আমি ভেবে দেখি। এখন তুই যা!
তুষার উঠে চলে যেতে যেতে কিচেনে উঁকি দিয়ে মায়ের উদ্দেশ্য বলল,
আম্মু মাথা একগ্লাস লেবুর পানি বানাও।
আলেয়া শেখ কিচেনে চা বানাচ্ছিলেন। ছেলের কথা শুনে বলেন,
তুই যা আমি আনতেছি।
তুষারের রোদে সমস্যা আছে। বেশিক্ষণ রোদে থেকে আসলে মাথা ব্যাথা ধরে। মায়ের কথায় রুমে চলে গেলো।

ঘড়ির কাঁটায় রাত প্রায় নয়টার কাছাকাছি। ফারাজ খান বনভোজনের বিভিন্ন দায়িত্ববহন করে ভীষন ক্লান্ত। বনভোজন থেকে আরো পূর্বে আসলেও কলেজে বিভিন্ন কাজ ছিলে বিধায় নয়টা বেজে গেছে। যুবক বাইক থামিয়ে সদর দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকছেন সবে। আফজাল খান বসে বসে ছেলের আসার প্রহর গুনছিলেন। ছেলেকে ড্রয়িংরুমে ঢুকতে দেখে দাড়িয়ে সোজা বললেন,
তোর বিয়ে ঠিক করেছি!
ফারাজের চলন্ত পা হুট করেই থেমে যায়। এমনিতেই অনেক টায়ার্ড ফিল করছে। আর এসেই এ কথা শুনতে হলে মন মেজাজ কি ভালো থাকে? তাও বাবাকে ভদ্রতায় বলল,
বিয়ে ঠিক করেছো মানে কি ড্যাড?
বিয়ে ঠিক করেছি মানে কথা বলে এসেছি! মেয়ে আমার তোর মার সবার পছন্দ হয়ছে।
ফারাজ রেগে গিয়ে বলল,
তোমাদের তো যাকে দেখো তাকেই পছন্দ হয়। কোন মেয়েকে পছন্দ হয় না ওটা বলো? বিয়ে কি তোমাদের আমি করবো না বলছিলাম?
ফারিন বেগম ও যোগ দিলেন সাথে। রুমে শুয়ে ছিলেন। স্বামী, ছেলের কথা শুনে বেরিয়ে আসলেন। এসেই বললেন,
আমার জানামতে এবার যাকে পছন্দ করেছি তোরও পছন্দ হবে! মেয়েটা খুব মিষ্টি আমাদের অয়ন আছে না ওর বন্ধু…”

মায়ের কথার শেষ হওয়ার আগেই ফারাজ বলল,
আমি এখন বিয়ের জন্য প্রস্তুত নয় আম্মু! আমাকে প্রেসার দিয়ো না প্লিজ!
ফারাজ খানের ছোট ভাই ফরহাদ খান। বয়সে ফারাজের চার বছরের ছোট হয়েও আকদ করা। ২৩ বছর আর ওদিকে ফারাজ খানের ২৭ বছর। শুধু বড় ভাইকে ভীষন সম্মান করে বলে এখনো বউ বাড়িতে আনছে না। শুধুমাত্র ফারাজের বিয়ে করতে দেরি তার বউ আনতে দেরি হবে না। বউ থেকেও না থাকার মতো রাত পাড় করছে এর জ্বালা কতটা কষ্টদায়ক তা শুধু সে জানে। তার ভাইতো আর জানেনা। তাই ভাইয়ের বিয়ের জন্য সেও এসে বলল,
“এবার কিন্তু তোমাকে বিয়ে করতেই হবে ভাইয়া! পরে তোমার আগে আমি বাবা হয়ে গেলে তুমি মানুষজনকে মুখ দেখাতে পারবে না।”
ফারাজ আশেপাশে তাকিয়ে কিছুু খুঁজতে যায়। ফরহাদ তাও ভয় না পেয়ে বলল,
“এবার বিয়ে না করলে আমি বড় হয়ে যাবো, আর তুমি ছোট!”
ফারাজ নিজের রাগ শান্ত করতে চেয়ে বলল,

“তো হয়ে যা না বড়! তোর মন চাইলে তোর বউকে নিয়ে আয়! আমি কি নিষেধ করেছি। ”
“তুমি বিয়ে না করে থাকা মানেই নিষেধ করা মুখে বলতে হয় না বুঝে নিতে হয়। ”
আফজাল খান ফরহাদ কে ইশরায় চুপ থাকতে বলে বললেন,
“আমি এতকিছু জানতে চাই না। তোকে বিয়ে করতেই হবে আর এটাই আমার শেষ কথা।”
ফারাজ খান রেগেমেগে শক্ত মেজাজে বলে থামল,
“তোমাদের যা খুশি তাই করো। আমাকে আর এসব বিষয়ে বিরক্ত করো না! বিয়ে করতে বলছো? করবো! এবার খুশি! বলে হনহনিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে চলে গেলো।
আফজাল খান ফারিন বেগম, ফরহাদ সবাই একসাথে বলে উঠলো,
আলহামদুলিল্লাহ্‌!
ফারিন বেগম আবার স্বামীর উদ্দেশ্য বললেন,
কিন্তু ওনারা কি রাজি হবে ? ছেলেটাকে তো অনেক কষ্টে রাজি করিয়েছি! কার সাথে বিয়ে সেটাও জানতে চাইলো না। পরে যদি কোনো সমস্যা হয়?
তুমি এসব নিয়ে চিন্তা করো না ফারিন! আমি তৌসিফ শেখকে বুঝাবো। আর আমাদের ফারাজের তো কোনোদিক দিয়ে কম নেই। না করার মানেই হয় না।
আপনি যা ভালো বুঝেন। ছেলেটা রাগের বশে হে বলেছে কিন্তু আমাদের এই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। পরে মত বদলাতে দেরি হবে না।
আফজাল খান স্ত্রীর কথায় সায় জানালেন।

ফারাজ রুমে এসে দরজা লাগিয়ে পরনের শার্ট খুলে ফেলল। বিয়ে বিয়ে শব্দটা যেন বিদ্যুৎয়ের ন্যায় ঘুরপাক খাচ্ছে যুবকের মস্তিষ্ক জোড়ে। ফারাজ তোয়ালে নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলো। পৌনেরো মিনিট সময় নিয়ে গোসল করে বেরিয়ে এসে সোফায় বসলো। মাথার ভেজা চুল গুলো কপালে লেপ্টে টপটপ পানি পড়ছে। সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। চুলের পানি গুলো মুছতেও কেন জানি বিরক্ত লাগছে । ট্রাউজার, স্যান্ডোগেঞ্জি পড়ে কিছুক্ষণ কপালে হাত দিয়ে সোফাতেই শুয়ে থাকলো। সহসা চোখের সামনে বেয়াদব এক মেয়ের মুখখানা ভেসে উঠলো। আজকাল এই বেয়াদব মেয়েটা তাকে ভীষন জ্বালায়। পিচ্চি একটা মেয়ে তার সাথে রাগ, জেদ দেখায় ভাবা যায়? সে কিছু বুঝে না ভাবে মেয়েটা? মেয়েটার মতলব সে ঠিকই বুঝে কিন্তু পাত্তা দেয় না। তার সাথে কি এসব যায়?

দেয়াল ঘড়িতে নজর বুলিয়ে তিতলি বাহিরে বেরিয়ে আসল। খিদে পেয়েছে। পার্ক থেকে আসার পর গোসল করে ক্লান্ত শরীর নিয়ে এক ঘন্টা ঘুমিয়ে ছিলো। ড্রয়িংরুমে আসতেই ফরিদা বানু নাতিনকে দেখে ডাকলেন,
এইদিকে আয়!
তিতলি দাদুর কথা শুনে এগিয়ে গিয়ে বলল,
কিছু বলবা দাদু?
কইতাম তো বহুত কথা!
বলো দাদু!
ফরিদা বানু নাতিনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন,
তোর উপর মনে হইতাছে বিয়ার রঙ লাইগবো ছেমরি!
তিতলি অবুঝ ভঙ্গিতে না বুঝে বলল,
কার বিয়ে দাদু ?
তোর ছাড়া আর কে?
তিতলি ভাবলো তার দাদু মজা করছে তাই বলল,
ছেলে কেমন? ঘোষখোর? নাকি মেয়েখোর?
আরে ঘোষখোর মেয়েখোর থেইকা কি নাতিন বিয়া দুমু নে?
সপ্তদশী উজ্জল মুখে বলল,

তাহলে কেমন ছেলে থেকে দিবা দাদু? গম্ভীর রাগী থেকে?
তাদের থেইকা ও দুমু না। আমার নাতিন জামাইরে হইতো অইবো আমার নাতিনের মতো যাতে মোর লগে বসে দুইকান গল্প করে!
তিতলি মনে মনে ভাবে তার গম্ভীর ফারাজ তো মোটেও তার মতো না। সে তো চটচটে, চঞ্চল, বাঁচাল, এলোমেলো, উষ্কখুষ্ক এবং বৈরাগী স্বভাবের। তাহলে কি..আর ভাবতে পারছে না মেয়েটা আঁখিযুগল পিটপিট করে কিছু বলতে নিচ্ছিলো,
তখনি আলেয়া শেখ তিতলির জন্য খাবার বেড়ে ডেকে বললেন,
খেতে আয় তিতলি!

রাগে অনুরাগে পর্ব ১৮

তিতলি কথা না বাড়িয়ে ডাইনিং টেবিলের চেয়ার টেনে বসে বললো,
আব্বু ভাইয়া কই আম্মু?
বাজারে গেছে কার সাথে দেখা করতে!
তিতলি জেদ ধরে বলল,
তাহলে আমি আব্বু ভাইয়া আসলে তখন খাবো।
বেশি কথা না বলে চুপচাপ খা। তাদের আসতে দেরি হবে বলছে।
তিতলি বাধ্য মেয়ের মতো চুপচাপ খেয়ে রুমে চলে গেলো। মনটা ভীষন খারাপ! “মনে মনে চিকন সুরে গান গায়, বুঝেনা সে বুঝেনা!” টুনাটুনিদের বাপ আমারে বুঝে না।”

রাগে অনুরাগে পর্ব ২০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here