Home রাগে অনুরাগে রাগে অনুরাগে পর্ব ২১

রাগে অনুরাগে পর্ব ২১

রাগে অনুরাগে পর্ব ২১
সুহাসিনি ফাতেহা

স্বামীর ফোন বেজে উঠতেই ফারিন বেগম ব্যস্ত হয়ে বললেন, “কে ফোন করেছে? একটু তাড়াতাড়ি দেখেন তো।”
আফজাল খান পকেট থেকে ফোন বের করে স্ক্রিনে তাকালেন। ভাই আমরুল খানের নামটা ভেসে উঠছে। অয়নও কৌতূহলী চোখে চেয়ে আছে। ছেলেটার প্রথম ভালোলাগা শুরু হয়েছিলো চঞ্চল তিতলিকে ঘিরে। কিন্তু মুখ ফুটে বলার সাহস কোনোদিন হয় নি। সে চাই তুষারের সাথে ওর বন্ধুত্বটা সবসময় অটুট থাকুক। আর তিতলি? ওকে দেখে তো মনেই হয়না যে তাকে অন্য নজরে দেখে। সবসময় দেখা হলেই ভাইয়া.ও..ভাইয়া বলেই কান পচিয়ে ফেলে। সেখানে ওসব বলার মুখও হয়নি অয়নের।
আফজাল খান ফোন রিসিভ করে কানে ধরে বললেন,

“হ্যালো!”
আমরুল খান অপর পাশ থেকে চিন্তিত গলায় বললেন,
“অয়ন কি আপনাদের বাড়ি গেছে ভাই?”
আফজাল খান অয়নের দিকে তাকিয়ে থেকেই বললেন,
“আসছে তো, আমার সামনেই বসে আছে।”
“আয়েশাকে আনতে যাওয়ার কথা ছিল । ওখানে গিয়ে বসে আছে? একটু পাঠায় দেন। ওর মোবাইলে কল ঢুকছে না কেন বলেন।”
আফজাল খান ভ্রু কুঁচকে অয়নকে বললেন,
“কিরে তোর মোবাইলে কি হয়ছে তোর বাপে ফোন দিছে মোবাইল কই রাখিস?”
অয়ন পকেট থেকে মোবাইল বের করে দেখে আসলে বাবা অনেক গুলো ফোন করেছে। কিন্তু মোবাইল সাইলেন্ট থাকায় আওয়াজ হয়নি।
তাই বলল,

“আসলে চাচ্চু ফোন তো সাইলেন্ট করা তাই শুনি নাই। তাহলে আমি যায়।”
ফারিন বেগম বললেন,
“নাস্তা তো ধরেই দেখিস নি।”
“অন্য একদিন আসবো চাচিমনি। বলে অয়ন চলে গেলো।
অয়ন চলে যেতেই ফারিন বেগম স্বামীকে বললেন,
“ আমি ভাবছিলাম তৌসিফ শেখ ফোন দিয়েছেন। ছেলেটার মত ঘুরে যাওয়ার আগেই আমাদের সব কথা পাকা করতে হবে। আপনি আরেকবার ফোন করে দেখেন না।”
“কয়বার ফোন দিবো ফারিন। সকাল থেকে দশবার দেওয়া হয়ে গেছে। এতবার ফোন দেওয়া কেমন যেন দেখাচ্ছে। বিয়ে না দিলে নেই আমরা অন্য মেয়ে দেখি। আর আমাদের ঝিলিকের কথা ও তো ভেবে দেখা যায়।”
“আরেকবার কথা বলে দেখেন না। এবার না বললে তাহলে আমরা ঝিলিকের কথা ভেবে দেখবো।”
আফজাল খান শেষ পর্যন্ত স্ত্রীর কথায় সায় জানালেন।

ঘড়ির কাঁটায় রাত সাত টা বাজে। তৌসিফ শেখ আর তুষার সহ আফজাল খানের সাথে সরাসরি কথা বলে এসেছেন। ড্রয়িংরুমে আলেয়া শেখ শাশুড়ির সাথে বসে বসে গরম গরম চা খাচ্ছেন আর কথা বলছেন। স্বামীকে আসতে দেখেই উঠে দাড়িয়ে বললেন,
“তুষার কই?”
“তুষার বন্ধুবান্ধব নিয়ে আড্ডা দিচ্ছে। ফিরতে রাত হবে বলছে।”
আলেয়া শেখ স্বামীর কথা শুনে বললেন,
“ওনাদের হ্যাঁ বলে দিয়েছেন? নাকি এখনো দুশ্চিন্তায় ভুগছেন?”
“অনেক খোঁজ খবর নিয়েছি আলেয়া। ছেলে ভালো পরিবার ও ভালো। না করার মানেই দেখলাম না।”
ফরিদা বানু হেসে বললেন,
“আলহামদুলিল্লাহ্‌! ভালা করছিস বাপ। পোলার গো রে আমগো বাড়িত আই মাইয়ারে দেইখা যাইতি কস নাই?”

“বলছি আম্মা। তারা তিতলিকে আগে দেখছে। এখন শুধু তিনদিনের ভেতরে বিয়েটা হয়ে যাক এটাই চাইতেছে। আর আমাদের তিতলি রাজি আছে কিনা সেটা ও তো দেখতে হবে।”
ফরিদা বানু ছেলেকে বললেন,
“তিতলি রাজি থাকন আর নো থাকন দি কি অইবো। আমরা রাজি থাকলেই অইবো।”
তৌসিফ শেখ ভেবেচিন্তে কিছুক্ষণ পর বললেন,
“আমার একটা মেয়ে ধুমধাম করে বিয়ের অনুষ্ঠান করে সবাইরে দাওয়াত দিবো আম্মা। কিন্তু তিতলির ও তো মতামতের দরকার আছে।”
আলেয়া শেখ স্বামীর কথায় বড় গলায় বললেন,
“তিতলির মতামতের দরকার নাই। তিতলিকে আমি বুঝাবো। আপনাকে চিন্তা করতে হবে না ওই বিষয়ে।”
তৌসিফ শেখ স্ত্রীর কথার উত্তর না দিয়ে রুমে চলে গেলেন।

রুমে বসে নিজের পার্সোনাল ডায়েরীতে আঁকাআঁকি করছে তিতলি। এক পেইজে দুটো ছেলেমেয়ে এঁকেছে৷ মেয়েটাকে শাড়ি পড়িয়েছে, ছেলেটাকে পাঞ্জাবি। উপরে সুন্দর ভাবে লিখেছে, জামাই-বউ। ছেলেটার মাথার উপর লিখেছে ফারাজ আর মেয়েটির মাথার উপরে লিখেছে তিতলি। তারপর মোবাইলে কয়েকটা পিক তুলে নিধিকে পাঠিয়ে বলল,
“আমাদের অনেক মানিয়েছে তাই না বল?”
লিখে সেন্ড করে দিলো। অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলো তার বানানো গম্ভীর ফারাজের পানে। পরিক্ষা সহ বনভোজনের পর থেকে কলেজ এক সাপ্তাহর জন্য বন্ধ। আজকে কয়দিন তার ভাল্লুক টাকে দেখে না। কখন কলেজ খুলবে আর সে গম্ভীর হওয়ার ভান করে ফারাজের সামনে নিজেকে উপস্থিত করবে। ভ্রু কুঁচকে রাখবে,কপাল কুঁচকে রাখবে। এসব চিন্তায় মেয়েটার রীতিমত
চিন্তা-ভাবনার শেষ নেই।
সহসা তিতলির ফোন বেজে উঠলো। মেয়েটা নিজের ভাবনা থেকে বেরিয়ে স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখে সিয়াম ফোন করেছে। তিতলি এখন কারো ফোন ধরবে না। তাই রেখে দিলো। আবার ও বেজে উঠলো এবার তিতলি বিরক্ত হয়ে রিসিভ করলো। সে কিছু বলার আগেই সিয়াম বলল,

“এতবার ফোন দিচ্ছি ধরিস না কেন? তোর জন্য একটা সুখবর আছে রে পাঙ্গাশ মাছ।”
তিতলি রেগে গিয়ে বলল,
“পাঙ্গাশ মাছ কাকে বলিস সিয়ামের বা*চ্চা। তোর সব চুল ছি’ড়ে আমি যদি তোকে যদি টাক না বানায় তাহলে আমি সত্যি মেনে নিবো আমি পাঙ্গাশ মাছ দেখে নিস।।”
“আরে থাম। এত রেগে যাইস না পরে কাঁদবি। সুখবর টা তো আগে শোন।”
তিতলি সিরিয়াস হওয়ার ভান করে বললো,
“কি সুখবর?”
ওপাশ থেকে সিয়াম বেশ সময় নিয়ে একনাগাড়ে বলল,
“ফারাজ স্যারের নাকি বিয়ে ঠিক হয়ছে। তোর কি হবে রে এখন ? আগেই বলেছিলাম স্যারের পেছন হাঁটা বাদ দে। এখন কি পাইলি স্যার তো বিয়ে করে পেলতেছে।”
তিতলি বিশ্বাস করে না এই সিয়ামের কথা। তার ফারাজ শুধু তার। আর কারো না। তাও সপ্তদশীর মনটায় কু ডাকছে। সে বিশ্বাস না করে বললো,

“মিথ্যা কথা কেন বলিস।”
সিয়াম এবার গম্ভীর হয়ে বলল,
“একটা ও মিথ্যা কথা বলছি না বিশ্বাস কর। আজ ফারাজ স্যারের ভাই ফরহাদ আছে না? ফারাজ স্যারের বাপেরে ও দেখছি দোকানে বাপ ছেলে স্যারের বিয়ে নিয়ে কথা বলছে। মেয়েরা রাজী হয়ছে এসব ও বলছে। বিয়ের কথা নাকি পাকা হয়ে গেছে।”
সিয়ামের কথা তিতলি বিশ্বাস হবে হবে করেও হলোনা। সে ফারাজের মুখে শুনা ছাড়া বিশ্বাস করবে না এ কথা। একদম বিশ্বাস করবে না। মেয়েটা ফুঁপানোর জন্য কথা বলতে পারছে না। বিশ্বাস করবে না তাও আঁখিযুগল বারবার ভিজে উঠছে। নাক টানতে টানতে ফোন কেটে দিলো।

তুষার অয়নের সাথে বাজারের দোকানের পেছনে বসে আড্ডা দিচ্ছে। অয়ন সিগারেট টানছে। তুষার অনেকক্ষণ অয়নের হাবভাব খেয়াল করছে।
এবার সন্দেহের গলায় বলল,
“কিরে শালা আজ এত সিগারেট টানছিস কেন?”
অয়ন সিগারেটে শেষের টান দিয়ে পেলে দিয়ে তুষারের দিকে তাকালো। আজ চাচার থেকেও আবার শুনেছে বিয়ে নাকি পাকাপোক্ত হয়েছে। সে খুশি এ বিয়েতে। তার ফারাজ ভাই বিয়ে করবে আর সেটা যদি তিতলি হয় তাহলে সেটাই বেস্ট। শুধু ফারাজ ভাই বিয়েটা করলেই হলো। অয়ন নিজের অযাচিত ভাবনা একপাশে রেখে বলল,

“এমনি খেতে ইচ্ছে করলো। তোর মন চাইলে তুইও খা।”
তুষার কখনো সিগারেট খায় না। তবে আজ প্রাণের বন্ধুকে খেতে দেখে কৌতূহল হলো। তাই বলল,
“একটা দে খেয়ে দেখি।”
অয়ন সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা নিয়ে আগুন ধরিয়ে তুষারেকে দিলো। তুষার দু টান দিতেই কেশে উঠলো। চেঁচিয়ে বলল,
“এসব ছাঁইপোড়া মুরুব্বি মানুষ খায় কিভাবে?সেদিন মতিন চাচারে দেখি দোকানে বসে সিগারেট খাচ্ছে। আমি বললাম এই এ বয়সে সিগারেট খান কেন চাচা?” ব্যাটা হেসে হেসে বলল, সিগারেট খেলে নাকি মন মেজাজ ভালে থাকে। সবসময় খায় না। তোর চাচির লগে ঝগড়া হলে তখন খায়। শুনে আমিতো কয়েক সেকেন্ড হা করে ছিলাম। বুড়া বয়সে ব্যাটা চাচির লগে ঝগড়া করে।”
তুষার কথা ঘুরিয়ে আবার ফারাজের প্রসঙ্গ টেনে বলল
ফারাজ ভাইর সাথে তিতলির বিয়ের কথা চলছে শুনিস নি?
অয়ন ছোট করে বলল,

হুমম!
তুই খুশি না?
অয়ন হেসে বলল, “খুশি হবো না কেন? শুনে আমি খুব খুশি হয়েছিলাম।”
তুষার সহসা কপাল কুঁচকে বলল,
আচ্ছা ফারাজ ভাই কি বিয়েতে রাজি মানে তিতলিকে কি পছন্দ করে এমন টাইপ কিছু?
অয়নের মনে পড়লো ফারাজ ভাই তাকে নিজের মুখে হুমম বলেছে তার মানে সত্যি পছন্দ করে। তাই বলল,
ফারাজ ভাই নিজেই তিতলিকে পছন্দ করছে।
তুষার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
তোর ফুপাতো বোন একটা আছে না ঝিলিক নাকি মিলিক নাম তার কি খবর রে?
ভালো। হঠাৎ ওর কথা জিজ্ঞেস করলি কেন?
তুষারের মুখে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন দেখা গেলো না। বরং মুখটা আরো গম্ভীর করে বলল,
এমনি। আচ্ছা বাড়ি চলে যা আজ। কাল দেখা হবে। আব্বু বলছে তাড়াতাড়ি বাসায় যেতে।
আচ্ছা।
তুষার অয়নকে বিদায় দিয়ে বাড়ির পথে চলে গেলো।

ডিনার করে এসে তিতলি রুমে এপাশ -ওপাশ পায়চারি শুরু করল। সত্যি কি ভাল্লুকটা তাকে রেখে বিয়ে করে নিচ্ছে? কি হবে এখন? কী করবে সে? না কোনো বুদ্ধিই মাথায় আসছে না।
মেয়েটা হতাশ ভঙ্গিতে দুহাত মেলে শুয়ে পড়ল বিছানায়। বালিশে মুখ গুঁজে কিছুক্ষণ কাঁদলো। বাড়ির সবাইকে কেমন রহস্যময় লাগছে। আড়ালে আবড়ালে ফিসফিসস করছে তাকে দেখলেই চুপ হয়ে যায়।
না জীবনে এত অশান্তি আর নেওয়া যায় না।
ঘুম ও আসছে না অভিমানী মেয়েটা ফারাজের কণ্ঠে একবার শুনতে চাই। না হলে আজ রাতে ঘুম হবে না। সিয়ামের কথা গুলো যাচাই করতে হলেও ওই লোকের সাথে কথা বলার দরকার আছে।
তিতলি আর দেরি না করে ফোন হাতে নিল। মেসেন্জারে ঢুকে সব ইগনোর ভুলে ফারাজকে সরাসরি রিয়েল আইডি মেসেজ দিলো,
আপনি নাকি বিয়ে করে নিবেন স্যার?
মেসেজটা দিয়ে ভাবলো হয়তো কোনো রিপ্লাই আসবে না। তাই পাশে রেখে চোখের পানি নাকের পানি এক করলো।

ফারাজ খান রাতের খাবার খেয়ে সবে রুমে এসেছেন। পরনের টাশার্ট টা খুলে উন্মুক্ত শরীর নিয়ে বিছানায় বসেছেন। ইতিমধ্যে জেনেছেন পাত্রী স্বয়ং তার চেনাজানা বেয়াদব মেয়েটা। প্রথমে না না বলে দিবে ভেবেও পরে কিছু একটা ভেবে চুপচাপ শুনে এসেছেন। কিন্তু মোবাইল হাতে নিতেই এমন মেসেজ দেখে যুবক কপাল কুঁচকে ভাবলো,তবে কি ওই মেয়ে জানে না। না জানলে না জানুক।
যুবক নিজ অজান্তেই তার বাদামী ঠোঁট দুটো কেমন আনমনে বিড়বিড় করে বলল,
“আপনার এই অধৈর্যহীন বেয়াদবি কমানোর জন্য হলেও আপনাকে বিয়ে করার প্রয়োজন আছে বেয়াদব মেয়ে।”
অতপঃর ভাবলেন এখন জ্বালাতে পারলে খারাপ না। তাই হুমম লিখে যুবক মোবাইলটা রেখে দিলেন।”

তিতলি এখনো মেসেঞ্জারে ফারাজের আইডিতে ঢুকে আছে। মেয়েটার ভাবনা এই যে একটা কিছু জানাক। সে সত্যি টা জানতে চাই।
কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে পরপরই টুংটাং মেসেজের আওয়াজ আসলো,
হুমম!
ফারাজের সরল তম জবাবে তিতলি বাকরুদ্ধ হয়ে গেল৷ চোখজোড়া লাল হয়ে পিটপিট করছে তার,কাঁপা হাতে লিখলো,
কাকে… কাকে বিয়ে করবেন ?
সিন হলো তবে উত্তর আসলো না। আবার লিখল,
কিছু. বলছেন না কেন?

রাগে অনুরাগে পর্ব ২০

তিতলির নাক ফুলে উঠছে। চোখের কোণ ভিজে গাল বেয়ে পানি পড়ছে। এবার আর বিশ্বাস না করে উপায় নেই। তার এত আশা ভালোবাসা সব বিফলে গেলো। কান্নায় চোখে দেখে না এমন ভাবে লিখলো,
– আপনি..
সম্পুর্ন বাক্য লিখতে পারলো না,কাঁদতে কাঁদতে মোবাইল ছু’ড়ে মারলো। সে এই বিয়ে হতে দিবে না। বিয়ের দিন ওই বাড়ি গিয়ে বিয়ে ভেঙে দিয়ে আসবে একদম হতে দিবে না। তারপর দেখবে ওই লোক কিভাবে বিয়ে করে।

রাগে অনুরাগে পর্ব ২২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here