নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৫৮
নাজনীন নেছা নাবিলা
ইরফান আর মিহাল একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির পেছনের বাগানে। দুজনের চোখ দিয়েই যেন ঠিকরে বেরোচ্ছে তপ্ত লাভা। তবে সেই আগুনের উৎস আলাদা। ইরফানের চোখে জ্বলছে তীব্র হিংসা আর পরাজয়ের আগুন, আর মিহালের চোখে ধিকধিক করছে বছরের পর বছর ধরে জমিয়ে রাখা প্রতিশোধের দাবানল। তার ওপর ইরফান যেই কথাটি বলল তা শুনে মিহাল আর একটি মুহূর্তও নষ্ট করতে চাইল না। কোনো প্রকার বাদানুবাদ বা বাক্যব্যয় না করে সে সমস্ত শক্তি একত্রিত করে সোজা ইরফানের চোয়াল বরাবর এক শক্ত নিখুঁত ঘুষি বসিয়ে দিল। এমন অতর্কিত এবং মারাত্মক আক্রমণের জন্য ইরফান মোটেও প্রস্তুত ছিল না। ফলে ঘুষির তীব্র আঘাতে সে টাল সামলাতে না পেরে ছিটকে মাটিতে পড়ে গেল। তবে দমে যাওয়ার পাত্র সেও নয়। অপমানের চোটে দাঁত কিড়মিড় করে সে ঝটপট মাটি ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। এবার নিজেকে পুরোপুরি প্রস্তুত করে নিয়ে সে মিহালকে পাল্টা আঘাত করার জন্য তেড়ে এলো। শুরু হয়ে গেল দুজনের মাঝে এক তুমুল, হিংস্র মারামারি।
ঠিক তখনই বাড়ি থেকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো নীলা, ইকরা এবং মুনভি। আর তাদের ঠিক পেছন পেছন অপরাধীর মতো গুটিগুটি পায়ে হাজির হলো আরশিও। কিন্তু সেখানে এসে তারা যা দেখল, তাতে তাদের চোখ কপালে ওঠার কথা থাকলেও ঘটল ঠিক উল্টোটা। তারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পরম শান্তিতে মিহাল আর ইরফানের সেই মল্লযুদ্ধ উপভোগ করতে লাগল। পুরো লড়াইয়ে আসলে মিহালই একতরফাভাবে ইরফানকে পিটিয়ে অবস্থা খারাপ করছিল। আর সেই দৃশ্য দেখে নীলা, ইকরা আর মুনভির ভেতরে যেন এক পৈশাচিক আনন্দ খেলা করে গেল। তারা রীতিমতো মজা নিতে শুরু করল। নীলা তো দূর থেকে হাততালি দিয়ে চিৎকার করে বলতে লাগল,
“আরে প্যারেলাল আরও মারেন এই ইঁদুরটাকে। এই চিটার, ধোঁকাবাজটাকে আরও জোরে মারেন। মেরে এই ইঁদুরের সবকটা দাঁত একদম ভেঙে গুড়ো করে দেন।”
নীলার এমন রসাত্মক আর ক্ষ্যাপানো উক্তি শুনে ইকরা আর মুনভি হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যাওয়ার জোগাড়। মাটিতে লুটিয়ে পড়ার মতো অবস্থা তাদের। এদিকে মার খেতে খেতে কোণঠাসা হয়ে পড়া ইরফান যখনই সমস্ত রাগ ঝেড়ে মিহালের ওপর পাল্টা হাত তুলতে যাবে, ঠিক তখনই দূর থেকে চিতার মতো চটপটে গতিতে ছুটে এলো নীলা। সে সোজা তাদের দুজনের ঝগড়ার মাঝখানে ঢুকে পড়ল এবং কোনো কিছু চিন্তা না করে ইরফানকে এলোপাতাড়ি মারতে মারতে তীব্র আক্রোশে চেঁচিয়ে বলল,
“ওরে বান্দর, হনুমান, ইতর, চরিত্রহীন, কাপুরুষ কোথাকার, তোর এত বড় সাহস কীভাবে হয় যে তুই আমার স্বামীর গায়ে হাত তোলার দুঃসাহস দেখাস?”
নীলার এমন অনবরত কিল-চাপড়ের তোড়ে মিহাল এবং ইরফান দুজনেই হঠাৎ মারামারি থামিয়ে থমকে গেল। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা আরশিও এই দৃশ্য দেখে চরম অবাক। সে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। নীলা নিজে দাঁড়িয়ে ইরফানের গায়ে হাত তুলছে? অথচ বিগত এতগুলো বছর ধরে ইরফানের যত রকমের কু-কাজ আর অন্যায় করেছে, একমাত্র নীলার কারণে কেউ কখনো ইরফানের গায়ে হাত তোলার সাহস করেনি।
কিন্তু মিহাল যখন ইরফানকে একতরফাভাবে পিটিয়ে ঘায়েল করছিল, নীলা তখন মোক্ষম সুযোগ পেয়ে গেল। সে আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে নিজের পুরো শক্তি দিয়ে ইরফানের পায়ে সজোরে এক লাথি বসিয়ে দিল। অতর্কিত এই লাথির চোটে ইরফান সামলাতে না পেরে ছিটকে মাটিতে পড়ে গেল। কিন্তু ইরফানও সহজে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। পড়ে গিয়েও সে নিজের ভেতরের সবটুকু ক্ষোভ উগরে দিল। সে মাটিতে শুয়েই মিহালের পা দুটো শক্ত করে ধরে হ্যাঁচকা টান মারল। পা হড়কে মিহালও সটান তার গায়ের ওপর গিয়ে আছড়ে পড়ল। এবার মাটিতে গড়াগড়ি খেতে খেতে দুজন দুজনের শার্টের কলার ধরে টানাটানি আর ধস্তাধস্তি করতে লাগল। দুজনে শরীরে, মুখে মাটি ভরা। এই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মাঝেও দৃশ্যটা এতটাই হাস্যকর রূপ নিল যে, মুনভি হাসতে হাসতে শেষমেশ মাটিতেই বসে পড়ল। ইকরাও পেটে হাত দিয়ে অনবরত হেসেই চলেছে। কেবল আরশি কোনো কথা না বলে ড্যাবড্যাব করে এই আজব কাণ্ডকারখানার দিকে তাকিয়ে রইল।
এদিকে নীলারা অনেকক্ষণ ধরে বাইরে থাকায় এবং ভেতরে আসতে দেরি করায়, ছোট ভাই ইবাদ তাদের খুঁজতে খুঁজতে বাইরে চলে এসেছিল। কিন্তু বাড়ির পেছনের বাগানে এসে সে যখন এই এলাহী কাণ্ড দেখল, তার চোখ তো ছানাবড়া! সে এক সেকেন্ডও সেখানে না দাঁড়িয়ে উল্টো ঘুরে দৌড়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেল। ড্রয়িংরুমে ঢুকেই হন্তদন্ত হয়ে বাড়ির সবাইকে বলল,
“তোমরা সবাই তাড়াতাড়ি বাইরে এসো। বাইরে এক বিশাল কাণ্ড ঘটে যাচ্ছে!”
ইবাদের এমন আতঙ্কিত ও উত্তেজিত ডাক শুনে বড়রা সবাই নাস্তার টেবিল ছেড়ে হুড়মুড় করে বাইরে বাগানের দিকে দৌড়াতে লাগলেন। পেছনের বাগানে দাঁড়িয়ে থাকা ইকরা হঠাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, বাড়ির বড়রা সবাই দলবেঁধে এই দিকেই ছুটে আসছেন। অবস্থা বেগতিক দেখে সে নীলার দিকে তাকিয়ে জোরে চিৎকার করে বলল,
“নীলা! সর্বনাশ হয়েছে, বাড়ির সবাই এই দিকেই আসছে।”
ইকরার এই সতর্কবার্তা শোনামাত্রই নীলা ধড়ফড় করে উঠল। সে জলদি মিহাল আর ইরফানের কাছাকাছি গিয়ে দুজনকে থামার জন্য তাগাদা দিতে লাগল,
“আরে ছাড়েন, আপনারা দুজন দুজনকে ছাড়েন। বাড়ির সবাই চলে আসছে।”
কিন্তু ক্ষোভের বশে অন্ধ হয়ে যাওয়া মিহাল কিংবা ইরফান কেউই তখন নীলার কোনো কথাই কানে তুলছিল না। তারা আপনমনে মাটিতে গড়াগড়ি খেয়ে একে অপরকে ঘায়েল করতে ব্যস্ত রইল।
নীলা কোনো বাছবিচার না করে মাটিতে গড়াগড়ি খেতে থাকা মিহাল আর ইরফান দুজনকেই এলোপাথাড়ি কিল, ঘুষি আর লাথি মারতে শুরু করল। পরিস্থিতি সামলাতে গিয়ে নীলার এই মারকুটে আর পাগলাটে কাণ্ড দেখে মুনভি নিজের হাসি আর কোনোভাবেই চেপে রাখতে পারল না। সে আক্ষরিক অর্থেই হাসতে হাসতে ঘাসের ওপর শুয়ে পড়ে গড়াগড়ি খেতে লাগল। নীলার এই অনবদ্য ও আক্রমণাত্মক মধ্যস্থতায় অবশেষে মিহাল এবং ইরফান দুজনেই মারামারি থামিয়ে শান্ত হলো। নীলা ক্ষিপ্রতার সাথে নিজের পা দিয়ে ঠেলে ইরফানকে কিছুটা দূরের দিকে সরিয়ে দিল। তারপর মিহালের শার্টের কলারটা শক্ত করে ধরে এক হ্যাঁচকা টানে তাকে শোয়া থেকে টেনে বসালো। ঠিক এই মোক্ষম মুহূর্তেই বাড়ির বড়রা সবাই হন্তদন্ত হয়ে বাগানের সেই নির্দিষ্ট জায়গায় এসে হাজির হলেন। সেখানে এসে সবার চোখ তো চড়কগাছ। উপস্থিত সবার দৃষ্টি একবার মাটিতে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাওয়া মুনভির দিকে যাচ্ছে, তো পরক্ষণেই তা গিয়ে থমকাচ্ছে নীলার দুপাশেৎযেখানে একদিকে মাটিতে বিধ্বস্ত অবস্থায় বসে আছে মিহাল, আর অন্যদিকে প্রায় আধমরা হয়ে শুয়ে আছে ইরফান। দুজনেই শরীর কাপড়ে এবং মুখে মাটি। মিনা মির্জা ভ্রু কুঁচকে তাঁদের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“কী রে, তোদের সবার এই অবস্থা কেন? তোরা এভাবে মাটিতে কেন পড়ে আছিস?”
মিনা মির্জার এই বাজখাঁই প্রশ্ন শুনে মিহাল এবং ইরফান দুজনেই ভয়ে একসাথ শুকনো ঢোক গিলল। নীলার তখন ভেতরে ভেতরে এতটাই রাগ উঠছিল যে, তার ইচ্ছে করছিল সবার সামনেই মিহালের কান দুটো ধরে ওকে উবুড় হয়ে দাঁড় করিয়ে রাখতে। কিন্তু এই ভরা মজলিশে স্বামীর সম্মানহানি করা তো আর সম্ভব নয়। তাই সে নিজের রাগটা কোনোমতে চেপে রেখে মিহালের হাত ধরে টেনে তাকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে সাহায্য করল। মিহাল কোনোমতে দাঁড়িয়ে কাঁচুমাচু মুখে নিজের শার্ট-প্যান্টের ধুলোবালি ঝেড়ে মাটি সরাতে লাগল। এদিকে ইরফান তখনও মাটিতেই শুয়ে ছিল। সে ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়ে আবলার মতো নীলার দিকে নিজের একটা হাত বাড়িয়ে দিল, আর অত্যন্ত কাতর কণ্ঠে বলল,
“নীলা প্লিজ, একটু হাতটা ধর তো আমার। আমি উঠতে পারছি না।”
বড়দের সামনে দৃশ্যটা যেন বেশি দৃষ্টিকটু না ঠেকে, তাই নীলা বাধ্য হয়ে যেই না ইরফানের দিকে নিজের হাতটা বাড়াতে গেল, অমনি চিতার মতো ক্ষিপ্রতায় মিহাল মাঝখান থেকে নীলার হাতটা খপ করে চেপে ধরল। নিজের স্ত্রীর ওপর অন্য পুরুষের এই অধিকার খাটানো সে কোনোভাবেই সহ্য করতে পারল না। মিহাল নীলার হাতটা নিজের শক্ত মুঠোয় পুরে, ইরফানের দিকে এক চরম তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি হেনে বলল,
“নীলাঞ্জনা, তুমি আমাকে ধরো। আর তোমার এই ভাইয়ের তো নিজের ঘরেই লক্ষ্মী বউ আছে। তাকে উঠতে তার নিজের বউ-ই সাহায্য করবে।”
মিহালের এমন অধিকারবোধে জড়ানো কাণ্ড দেখে নীলা পুরো হাঁ হয়ে গেল। ক্ষণিকের জন্য তার মুখের কথা যেন স্রেফ হারিয়ে গেল। অন্যদিকে, যুবকদের এই নীরব মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ দেখে মুনভি এবং নীলার বাবা, চাচা, জ্যাঠা আড়ালে নিজেদের মুখ টিপে মুচকি মুচকি হাসতে লাগলেন। বড়রা সবাই পরিস্থিতির গভীরতা কিছুটা হলেও আন্দাজ করতে পেরেছিলেন। ইরফানকে সাহায্য করতে এবার আরশি নিজেই গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এলো। নিরুপায় ইরফান আর কোনো পথ না পেয়ে বাধ্য হয়ে আরশির বাড়ানো হাতটাই আঁকড়ে ধরে মাটি থেকে উঠে দাঁড়াল।
ঠিক তখনই মিনা মির্জা আবার জেরা করার ভঙ্গিতে জাঁদরেল গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“তা মিহাল, তোর এই বিধ্বস্ত অবস্থাটা হলো কী করে শুনি? কাপড়-চোপড়ের এই দশা কেন?”
এখন পুরো মজলিশের উৎসুক চোখজোড়া গিয়ে স্থির হলো মিহালের ওপর। মিহাল এতটুকুও না ঘাবড়ে নিজের স্বভাবসুলভ একটা বোকা বোকা চোর-হাসি দিল। তারপর অত্যন্ত চতুরতার সাথে বলল,
“আসলে মম, খেয়াল করে দেখলাম বাগানে আজকাল বড্ড বড় বড় ইঁদুর ঢুকেছে। ওই নোংরা ইঁদুরের থেকে আমার নিজের একটা ব্যক্তিগত অতি মূল্যবান ফুলকে বাঁচাতে গিয়েই একটু ধস্তাধস্তি হয়েছে। আর তাতেই গায়ে সামান্য ধুলোবালি আর মাটি লেগে গেছে, এই যা।”
মিহালের মুখে এমন অপমানজনক কথা শুনে ইরফান রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে এক তপ্ত ও হিংস্র দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল। সে খুব ভালো করেই জানে, এখানে ইঁদুর বলতে তাকে আর ফুল বলতে নীলাকেই বোঝানো হয়েছে। অন্যদিকে, নিজের স্বামীকে এভাবে পরোক্ষভাবে অধিকার জাহির করতে দেখে নীলা লজ্জায় লাল হয়ে লাজুক হাসতে লাগল।
মিনা মির্জা কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,
“ধুর! তোদের এই আধুনিক জেনারেশনের কথার আগা-মাথা আমি কিছুই বুঝলাম না। আমার বাড়িতে আগে কখনো ইঁদুর ছিল না এখন হঠাৎ কি করি ইঁদুর এলো? যা-ই হোক, এখন আর বাইরে দাঁড়িয়ে না থেকে চটপট রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আয়। আর ইরফান, বাবা তুমিও ভেতরে আসো।”
ফুফুর নির্দেশ পাওয়া মাত্রই নীলা আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না। সে মিহালের হাত ধরে টানতে টানতে সোজা বাড়ির ভেতরের দিকে চলে এলো। তাদের দেখাদেখি বাকি সবাইও একে একে ড্রয়িংরুমের ফিরে এলেন। নীলা এবং মিহাল কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা দোতলায় নিজেদের শোবার ঘরে চলে গেল। রুমে ঢুকেই নীলা ঘুরে দাঁড়িয়ে মিহালের সামনে গিয়ে রাগে আর অভিমানে মিহালের চওড়া বুকে ছোট ছোট দুহাতে উপর্যুপরি চাপড় দিতে দিতে বলতে লাগল,
“আপনার কি একটু বেশি বেশি না করলেই নয়, হ্যাঁ? আমি তখন অত করে চিৎকার করে বললাম যে বাড়ির সবাই এই দিকেই আসছে। একটু তো কান খাড়া করে শুনবেন। মাঝখান থেকে তো আর একটু হলেই আজ বড়সড় একটা বাঁশ খেতেন সবার সামনে। তখন কী হতো?”
নিজের মিষ্টি স্ত্রীর এই শাসন আর ভালোবাসামাখা ক্ষোভের বিপরীতে মিহাল কোনো প্রতিউত্তর করল না। সে কেবল নীলার কোমরে দুহাত জড়িয়ে ধরে পরম তৃপ্তির এক চিলতে হাসল। স্বামীর এমন নির্বিকার হাসি দেখে নীলা তপ্ত এক নিঃশ্বাস ফেলে চরম বিরক্ত হওয়ার ভান করে মুখটা ঘুরিয়ে নিল। মিহালের ঠোঁটের কোণে আবারও সেই মায়াবী হাসিটা ফিরে এলো। সে আর এক মুহূর্তের দূরত্ব সহ্য করতে পারল না। নীলার কোমরটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের বুকের সাথে একদম মিশিয়ে নিল। নীলার কানের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
“আমার এই ছোঁয়া যেমন তোমার অতীতের সব ক্ষতস্থানে মলম লাগিয়ে দেবে, ঠিক তেমনি আমারই ছোঁয়ায় তোমার সারা শরীরে প্রতিদিন ভালোবাসার নতুন নতুন ক্ষত তৈরি হবে নীলাঞ্জনা।”
মিহাল আর কোনো কথা বলে এই সোনালী সময়টুকু নষ্ট করতে চাইল না। সে পরম মমতায় নীলার চিবুকটা আলতো করে ওপরে তুলল এবং নিজের ঠোঁটের সাথে নীলার নরম ঠোঁট জোড়া মিলিয়ে দিল। নীলাও সমস্ত দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে গভীর অনুরাগে মিহালের সাথে সমানভাবে সাড়া দিতে লাগল। কিন্তু অসাবধানতাবশত তাদের রুমের দরজাটা কিছুটা খোলাই রয়ে গিয়েছিল। ঠিক তখনই নিচে ফ্রেশ হওয়ার জন্য ইরফান আর আরশি উপরে আসছিল। দোতলার একদম শেষ প্রান্তের ঘরটা তাদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল। তারা পুরো বাড়িটার নান্দনিকতা দেখতে দেখতে করিডোর দিয়ে সামনের দিকে এগোচ্ছিল। কিন্তু মিহালের রুমের সামনে আসতেই আচমকা তাদের পা দুটো থমকে গেল। ইরফান আর আরশির নজর সোজা চলে গেল ঘরের ভেতরের খোলা অংশের দিকে।
সেখানে তখন নীলা আর মিহাল একে অপরের মাঝে পুরোপুরি মগ্ন হয়ে আছে। নিজের প্রাক্তন প্রেমিকাকে অন্য পুরুষের বাহুডোরে এভাবে হারিয়ে যেতে দেখে ইরফানের ভেতরের হিংস্রতা আবার চাড়া দিয়ে উঠল। সে রাগে অন্ধ হয়ে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়তে গেল। কিন্তু ঠিক মোক্ষম সময়ে আরশি শক্ত করে তার হাতটা চেপে ধরল। সে ইরফানের হাত ধরে টেনে তাকে ভেতরে যেতে বাধা দিল এবং কোনোভাবেই আর কোনো নতুন ঝামেলা তৈরি করতে দিল না। ঠিক এই মুহূর্তেই ঘরের ভেতরের দৃশ্যপটটা বদলে গেল। মিহাল যখন তৃপ্তির সাথে নীলার ঠোঁট জোড়া আলতো করে ছেড়ে দিল, নীলা ধীরলয়ে নিজের চোখ দুটো মেলল। চোখ খুলতেই তার দৃষ্টি চলে গেল দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ইরফান আর আরশির ওপর। তাদের দুজনকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নীলার মাথায় মুহূর্তের মধ্যে এক দারুণ দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল। সে ইরফানকে আরও একটু জ্বালানোর সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাইল না। নীলা মিহালের কলারটা আলতো করে টেনে সরাসরি তার চোখের দিকে তাকাল। চোখে এক অদ্ভুত মাদকতা আর দুষ্টুমি মেখে ফিসফিসিয়ে বলল,
“চলুন, আমরা ওয়াশরুমে যাই।”
নীলার মুখ থেকে এমন প্রস্তাব শুনে মিহালের মনে হলো সে যেন এক ঝটকায় হাতে আকাশ ছোঁয়া চাঁদ পেয়ে গেছে। এমন সোনালী সুযোগের অপেক্ষাতেই তো সে চাতক পাখির মতো প্রহর গুনছিল। সে আর কোনো মৌখিক উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করল না। এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে, ক্ষিপ্রতার সাথে নীলাকে পাজাকোলা তুলে নিল এবং সোজা ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল।
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৫৭
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ইরফানের চোখের সামনেই পুরো দৃশ্যটা ঘটে গেল। নিজের প্রাক্তন প্রেমিকাকে অন্য পুরুষের কোলে এভাবে সঁপে দিতে দেখে তার ভেতরের হিংসার আগুন দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। সে রাগে, ক্ষোভে আর গজগজ করতে করতে ঝড়ের বেগে করিডোর পেরিয়ে তাদের জন্য বরাদ্দ করা ঘরের দিকে চলে গেল। আর আরশি সেই শূন্য করিডোরে দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে ভাবল, ‘নীলা সত্যিই কত ভাগ্যবতী! কত গভীর আর নিখাদ ভালোবাসা পেয়েছে সে নিজের জীবনে।
