Home নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৫৬

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৫৬

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৫৬
নাজনীন নেছা নাবিলা

বাইরে বেলা গড়িয়ে ঘড়ির কাঁটা তখন এগারোটার ঘর ছুঁয়েছে। ঘরের নরম আলো-ছায়ার মাঝে নীলা অর্ধশয়ান অবস্থায় বিছানায় হেলান দিয়ে আছে, আর তার উদরে মাথা রেখে এক পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে মিহাল। নীলা আলতো করে, পরম মমতায় মিহালের অবিন্যস্ত চুলে আঙুল চালিয়ে দিচ্ছে। মাত্র কিছুক্ষণ আগে তাদের মাঝে বয়ে যাওয়া সেই ঝড়ো ভালোবাসার কথা মনে পড়তেই নীলা বারবার লজ্জায় নিজের মাঝেই গুটিয়ে যাচ্ছে। এক অদ্ভুত ভালো লাগা আর শিহরণ তার পুরো শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠছে। নিজেকে আজ পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী আর ভাগ্যবতী নারী মনে হচ্ছে তার। মনে হচ্ছে, অতীতের সব মেঘ কেটে গেছে, জীবনে আর কোনো দুঃখের ছায়া কখনো তাকে স্পর্শ করতে পারবে না।

মিহাল আজ তাকে সত্যিই এক অতল সুখের সাগরে ভাসিয়ে দিয়েছে। নিজের পেটের দিকে তাকাতেই নীলার চোখে ভেসে উঠল মিহালের বড্ড নিষ্পাপ মুখখানি। পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তি ভুলে পুরুষটি কত নিশ্চিন্তে, কত অধিকার নিয়ে তার শরীরের ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে। দৃশ্যটা দেখে নীলার বুকটা ভালোবাসায় ভরে উঠল। তবে পরক্ষণেই তার বাস্তব জ্ঞান ফিরে এলো। মিহালের এভাবে ঘুমালে তো চলবে না। মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে একটা ধন্যবাদ দিল সে। ভাগ্যিস আজ উইকেন্ড, ইউনিভার্সিটি বন্ধ। নয়তো আজ নিশ্চিত দুজনেরই ক্লাসে যাওয়া মিস হয়ে যেত। কিন্তু আর এভাবে অলসভাবে শুয়ে থাকার উপায় নেই। যেকোনো মুহূর্তে তার ফুফু চলে আসতে পারেন। ফুফু এলে এই অবস্থা সে দরজা কি করে খুলবে? তা ছাড়া এখনো সকালের নাস্তা পর্যন্ত খাওয়া হয়নি। নিজেকে গোসল সেরে পবিত্র হতে হবে, তারপর দুপুরের রান্নার তোড়জোড় করতে হবে। কিন্তু মিহালের এই গাঢ় ঘুম ভাঙাতেও নীলার বড্ড মায়া হচ্ছে। লোকটি কাল সারারাত এক ফোঁটাও ঘুমায়নি। মাঝরাত থেকে ফ্রিজের সামনে তার জন্য জলের বোতল হাতে নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকার পাগলামিটাও তো এই পুরুষটিই করেছে। কিন্তু আর দেরি করা সম্ভব নয়। এখন যদি সে মিহালের ঘুম না ভাঙায়, তবে রান্না-বান্না সব ভেস্তে যাবে, আর মিহালও ফ্রেশ হতে পারবে না।
বাস্তবতার তাগিদে আর কোনো উপায় না পেয়ে, নীলা আলতো করে মিহালের চওড়া কাঁধ দুটো ধরে মৃদু ঝাঁকুনি দিল। নিজের কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে ফিসফিসিয়ে বলল,

“শুনছেন? প্লিজ এবার একটু আমাকে ছাড়ুন। বেলা অনেক হয়েছে, আমাকে উঠে একটু শাওয়ার নিতে হবে।”
মিহাল যেন এক গভীর ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে আছে। নীলার ডাকে সাড়া তো দিলই না, উল্টো ঘুমের ঘোরেই অবুঝ বালকের মতো এক অদ্ভুত শব্দ করে উঠল,
“হুম, উঁহু…”
অর্থাৎ, সে কোনোমতেই এই ওমে ভরা বুক ছেড়ে নড়বে না। নীলা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারও বোঝানোর চেষ্টা করল,
“প্লিজ, একটু কষ্ট করে উঠে বিছানার এই পাশটায় এসে ঘুমান না। যেকোনো মুহূর্তে ফুফু চলে আসতে পারেন। আমার শাওয়ার নেওয়াটা খুব প্রয়োজন। তারপর আবার দুপুরের রান্নাও করতে হবে।”
নীলার এত সব যুক্তির কথা মিহালের কানে আদৌ পৌঁছাল কিনা। সে নীলার কথা তো শুনলই না, উল্টো তার উদরের ওপর থেকে চট করে উঠে নিজের পুরো শরীরের ভারী ভরটা একদম নীলার নরম শরীরের ওপর সঁপে দিল। শুধু তাই নয়, মুখটা নামিয়ে নীলার গলার ভাঁজে গভীর করে গুঁজে দিল। মিহালের শরীরের এই আকস্মিক উষ্ণতায় আর ভারী নিশ্বাসের ছোঁয়ায় নীলার সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠল। দুজনের পরনেই কিছু নেই। বুকের ভেতর ধড়ফড়ানি বেড়ে যাওয়ায় ক্ষণিকের জন্য দম নিতেও কষ্ট হলো তার। তবুও নিজের কাঁপতে থাকা কণ্ঠস্বরকে কোনোমতে জোড়া দিয়ে বলল,

“প্লিজ, এই অসময়ে এমন অবাধ্যতা করবেন না। আমাকে শাওয়ার নিতে দিন। আপনি লক্ষ্মী ছেলের মতো বিছানায় সরে গিয়ে ঘুমান।”
নীলার শত অনুনয়ে মিহাল এবার তার নিভু নিভু জোড়া চোখ মেলে তাকাল। ঘুমের ঘোরেই ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টুমি ভরা হাসি ফুটিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“মা আসলে বড়জোর বলবে,আপনার ছেলের সাথে রোমান্স করতে যেহেতু ব্যস্ত আছেন, তাই আপনি যেখান দিয়ে এসেছেন, কষ্ট করে সেখান দিয়েই আবার চলে যান।”
মিহালের এই চরম রসিকতায় নীলা আর নিজের শাসন ধরে রাখতে পারল না। সে হালকা করে মিহালের চওড়া পিঠে একটা চড় বসিয়ে কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বলল,
“থাপ্পড় চেনেন আপনি?”
নীলার এই আদুরে শাসনে মিহাল মোটেও দমে গেল না। সে উল্টো নীলার গলার নরম ভাঁজে ঠোঁট ছুঁইয়ে, আরও একটু ওপরে উঠে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে গেল। একদম গাঢ়, আদুরে আর তৃষ্ণার্ত কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে বলল,

“নীলা, আমি সত্যিই তোমাকে বড্ড বেশি ভালোবাসি।”
মিহালের এই আচমকা ও গভীর স্বীকারোক্তিতে নীলার মনের সব রাগ এক পলকে গলে জল হয়ে গেল। সে নিজের ঠোঁট কামড়ে মৃদু হেসে আত্মবিশ্বাসের সাথে জবাব দিল,
“গুড! ভালোবাসতে থাকেন আমাকে। আমি সত্যিই অনেক ভালোবাসা ডিজার্ভ করি। কারণ, আমি নিজেও কিন্তু নিজেকে বড্ড ভালোবাসি।”
নীলার এই চটপটে আর চতুর উত্তর শুনে মিহাল এবার আর চেপে রাখতে পারল না, শব্দ করে হেসে উঠল। সে মনে মনে ভাবল এই মেয়েটি আসলেই অদ্ভুত, সে কখনো কারও কাছে হার মানবে না। হাসির এই রেশটুকুর সুযোগ নিয়েই নীলা এবার দুহাতে আলতো ধাক্কা দিয়ে মিহালকে নিজের ওপর থেকে সরিয়ে দিল। তারপর বিছানার চাদরটা পরম যত্নে শরীরের সাথে পেঁচিয়ে নিয়ে ধীরে ধীরে উঠে বসল। দীর্ঘক্ষণের সেই মধুর ঝড়ে তার পুরো শরীরজুড়ে এখন এক হালকা ব্যথার রেশ। নীলাকে উঠে দাঁড়াতে দেখে মিহাল বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলল,

“নীলাঞ্জনা, ঘুমে চোখ মেলতেই পারছি না। নয়তো আজ তোমাকে কোলে তুলে আমি নিজেই ওয়াশরুমে দিয়ে আসতাম।
মিহালের এই অলস অথচ ভালোবাসায় মাখামাখি কথা শুনে নীলার ঠোঁটে ফুটে উঠল এক মায়াবী হাসি। সে পরম মমতায় মিহালের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
“অনেক হয়েছে, এবার আপনি চুপচাপ ঘুমান।”
নীলার কথায় মিহাল আর কথা বাড়াল না, চোখের পাতা দুটো যেন ভারী হয়ে নেমে এলো আর সে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। নীলা চাদরটা শরীরে জড়িয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পা ফেলে ধীরে ধীরে ওয়াশরুমে চলে গেল। দীর্ঘক্ষণের সেই ক্লান্তির পর বেশ অনেকটা সময় নিয়ে শাওয়ার নিল সে। শীতল জলের স্পর্শে তার শরীরের ক্লান্তি কিছুটা কমলেও ওয়াশরুম থেকে বের হওয়ার সময় বাধল এক চরম বিপত্তি। তাড়াহুড়োয় ভেতরে যাওয়ার সময় সে নিজের পরনের কাপড় নিতে একদম ভুলে গেছে। উপায়ান্তর না পেয়ে কেবল একটা তোয়ালে জড়িয়েই তাকে অত্যন্ত ভয়ার্ত ও দ্বিধান্বিত পায়ে ওয়াশরুম থেকে বাইরে বের হতে হলো। এক বুক দুরুদুরু ভয় নিয়ে সে চারপাশটা দেখল। তবে ঘরে পা রাখতেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল তার সেই পাগল পুরুষটি এখনো ঠিক আগের মতোই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। নীলার উৎসুক নজর গিয়ে পড়ল বিছানায় উপুড় হয়ে ঘুমিয়ে থাকা মিহালের ওপর। মিহাল বিছানায় পিঠ সোজা করে, এক হাত ছড়িয়ে ঘুমাচ্ছে। তার সেই অনাবৃত, বলিষ্ঠ ও চওড়া পিঠের দিকে তাকাতেই আচমকা নীলার গলার ভেতরটা শুকিয়ে এলো। লজ্জায় আর অনুশোচনায় তার বুকটা কেঁপে উঠল। মিহালের পুরো পিঠ জুড়ে স্পষ্ট হয়ে আছে নীলার নখের আঁচড়ের গভীর দাগ। কিছু কিছু জায়গায় তো রক্ত জমাট বেঁধে কালচে লাল হয়ে রয়েছে। নীলা এবার নিজের হাতের নখগুলোর দিকে তাকাল। সত্যিই তো, নখগুলো বেশ বড় বড় হয়ে উঠেছে! মনে মনে নিজেকে একটু বকা দিয়ে সে ভাবল,

“আজকে প্রথম কাজই হলো এই অবাধ্য নখগুলো কেটে ফেলা।”
একটা অপরাধবোধ মাখানো দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে আলতো পায়ে ঘরের ড্রয়ারের দিকে এগিয়ে গেল। সেখান থেকে একটা নিরাময়কারী মলম হাতে নিয়ে অত্যন্ত সাবধানে বিছানার পাশে এসে বসল। মিহালের ঘুমের যাতে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে, সেদিকে তীক্ষ্ণ নজর রেখে সে মিহালের পিঠে থাকা চাদরটুকু টেনে কোমর পর্যন্ত নামিয়ে দিল। তারপর নিজের আঙুলের ডগায় সামান্য মলম নিয়ে পরম মমতায়, অত্যন্ত আলতো ছোঁয়ায় মিহালের পিঠের সেই ক্ষত স্থান গুলোতে আলতো করে মালিশ করতে লাগল। প্রতিটি ছোঁয়ায় মিশে রইল এক চরম ভালোবাসা, যত্ন আর মৌন ক্ষমা প্রার্থনা।

দুপুরের সোনালী রোদ যখন ঘরের জানলা গলে মেঝেতে এসে পড়েছে, ঠিক তখন মিহালের ঘুম ভাঙল। চোখের পাতা দুটো এখনো বড্ড ভারী। সে কপালে হাত দিয়ে আলতো চেপে ধরে ধীরে ধীরে বিছানায় উঠে বসল। দেয়াল ঘড়ির দিকে নজর যেতেই তার চোখ ছানাবড়া, একটা পার হয়ে গেছে! পুরো ঘর ফাঁকা, নীলা কোথাও নেই। বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াতেই মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল তার। কাল রাতের অনিদ্রা আর দুপুরের এই অসময়ের ঘুমের কারণে শরীরটা বড্ড ম্যাজম্যাজ করছে। এই মুহূর্তে শীতল জলের স্পর্শ খুব প্রয়োজন। আর কোনো দিকে না তাকিয়ে সে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। মিনিট দশেকের মধ্যে শাওয়ার শেষ করে যখন সে বের হলো, তখন তার পরনে কেবল একটা ক্যাজুয়াল ট্রাউজার। ভেজা চুলগুলো হাত দিয়ে ঝাড়তে ঝাড়তে সে নীলাকে খুঁজতে সোজা রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। রান্নাঘরের চৌকাঠে পা রাখতেই মিহালের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে চওড়া হাসি ফুটে উঠল। পাশের একটি চেয়ারের ওপর নীলার ওড়নাটা অবহেলায় পড়ে আছে। আর পিঠ খাড়া করে, নিজের লম্বা রেশমি চুলগুলো খোঁপা করে পরম মগ্নতায় রান্না করছে নীলা। মিহাল বিড়ালের মতো নিঃশব্দ পায়ে এগিয়ে গিয়ে পেছন থেকে নীলাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। নিজের অনাবৃত চওড়া বুকটা নীলার পিঠে লেপ্টে দিয়ে সে মুখ নামিয়ে নীলার উন্মুক্ত ঘাড়ে এক উষ্ণ চুমু আঁকল। পেছন থেকে এই আচমকা আকর্ষণে নীলা চমকে উঠলেও, বুঝতে বাকি রইল না যে এই চপল অবাধ্যতা কার। সে একটু নড়েচড়ে উঠে মিহালকে তাড়া দিয়ে বলে উঠল,

“সকালের ব্রেকফাস্ট তো করা হয়নি আমাদের। এখন আর একদম দেরি না করে লক্ষ্মী ছেলের মতো ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসুন, আমি লাঞ্চ দিচ্ছি। আমার নিজেরও কিন্তু ভীষণ খিদে পেয়েছে।”
মিহাল নীলার ঘাড়ের নরম চামড়ায় হালকা কামড় বসিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
“কে বলল সকালের ব্রেকফাস্ট করা হয়নি? তুমি আর আমি দুজনেই তো বেশ রাজকীয় ব্রেকফাস্ট করেছি।”
নীলা মিহালের এই হেঁয়ালিপূর্ণ কথার গূঢ় অর্থ ধরতে না পেরে কপালে ভাঁজ ফেলে জিজ্ঞেস করল,
“কখন?”
মিহাল এক অদ্ভুত বাঁকা হাসি হাসল। নীলার ঘাড়ের ভাঁজে নিজের নাক ঘষতে ঘষতে অত্যন্ত মাদকতাময় কণ্ঠে বলল,
“মনে নেই বলছো? তাহলে কি আবার নতুন করে মনে করিয়ে দিতে হবে সকালের সেই মিষ্টি ব্রেকফাস্টের কথা?”

মিহালের এই চূড়ান্ত রসিকতা আর দ্বিঅর্থক কথা শুনে নীলার কান দুটো লজ্জায় একেবারে লাল হয়ে উঠল। মনে হলো, লজ্জার চোটে কান দিয়ে বুঝি এখনই ধোঁয়া বের হবে! সে নিজের ডান হাতের কনুই দিয়ে মিহালের পেটে একটা মৃদু ধাক্কা মারল। মিহাল নীলার এই লাজুক রাগ দেখে শব্দ করে হাসতে হাসতে দু-কদম পিছিয়ে গেল। নীলা এবার কৃত্রিমভাবে নিজের ডাগর ডাগর চোখ দুটো পাকিয়ে, খুন্তি উঁচিয়ে বলল,
“অনেক দুষ্টুমি হয়েছে, এবার চুপচাপ খেতে বসুন তো! আমি খাবার বেড়ে দিচ্ছি।”
মিহাল আর কথা না বাড়িয়ে বাধ্য ছেলের মতো ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। এদিকে রান্নাঘরের পাট চুকিয়ে নীলাও খুব দ্রুত গরম গরম খাবারের পাত্রগুলো নিয়ে ড্রয়িং রুমের টেবিলটায় সুন্দর করে সাজিয়ে দিল। মিহাল ততক্ষণে বেশ আরাম করে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে নীলার কাণ্ডকারখানা দেখছিল। খাবার সাজানো শেষ করে নীলা যেই না নিজের বসার জন্য পাশের চেয়ারটা টানতে যাবে, অমনি মিহাল এক ঝটকায় তার হাত ধরে এক টানে তাকে নিজের কোলের ওপর বসিয়ে দিল। আকস্মিক এই ঘটনায় নীলা একেবারে থ বনে গেল। অথচ মিহাল এমন একটা নির্বিকার ভাব করে বসে আছে যেন সে কিছুই করেনি‌। নীলা মিহালের দিকে কৃত্রিম রাগী চোখে তাকিয়ে অভিমানের সুরে বলল,

“এখন কিন্তু দিন দিন আপনার আবদার বড্ড বেশি হয়ে যাচ্ছে, মিস্টার মিহাল!”
মিহাল নীলার কোমরে নিজের হাতটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে, চোখের কোণে এক চিলতে রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে বলল,
“সেদিন খাবার টেবিলে সবার সামনে তুমি আমার সাথে যে কাণ্ডটা করেছিলে নীলাঞ্জনা, সেই তুলনায় তো আজ আমি কিছুই করিনি।”
পুরোনো সেই মধুর অথচ লজ্জাজনক স্মৃতির কথা মনে পড়তেই নীলার গলার ভেতরটা শুকিয়ে এলো, সে আলতো করে একটা শুকনো ঢোক গিলল। মিহাল তার মুখের এই ভয়ার্ত ও লাজুক ভাব দেখে বাঁকা হেসে বলল,

“তাই আর কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ বসে থাকো। আজ আমি তোমাকে নিজের হাতে খাইয়ে দেব।”
নীলা নিজের নাকটা একটু ফুলিয়ে আদুরে গলায় প্রতিবাদ করল,
“আমি কোনো ছোট বাচ্চা নই যে আমাকে খাইয়ে দিতে হবে!”
মিহাল ভাতের প্রথম লোকমাটা নীলার ঠোঁটের কাছে তুলে ধরে চোখের ইশারায় বলল,
“বাচ্চা নও ঠিকই,কিন্তু আমার বাচ্চার হবু মা তো বটেই।”

কথাটি শোনা মাত্রই নীলা একেবারে বিষম খেল, তার জোর কাশি উঠে গেল। মিহাল ঠোঁট কামড়ে হেসে অত্যন্ত যত্নের সাথে নীলার পিঠে হাত বুলিয়ে দিল এবং পানির গ্লাসটা তার ঠোঁটে ধরল। নীলা পানি খেয়ে শান্ত হওয়ার পর মিহাল আর কোনো দুষ্টুমি না করে পরম মমতায় ও ভালোবাসায় তাকে পুরো খাবারটা খাইয়ে দিল। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে দুজনে মিলে শোবার রুমে চলে এলো। মিহাল তার ফোনটা হাতে নিয়ে বারান্দার দিকে চলে গেল।

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৫৫

মুনভিকে একটা জরুরি কল দেওয়া দরকার। তার খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি তাদের আসল প্ল্যানটা কতদূর এগোল, সেই বিষয়ে বিস্তারিত জানতে হবে। এদিকে নীলা তখন বিছানা আর রুমের এলোমেলো জিনিসপত্র গোছাতে ব্যস্ত। ঠিক তখনই পুরো বাড়িটা কাঁপিয়ে মেইন দরজার কলিংবেলটা বেজে উঠল। নীলা হাতের কাজ ফেলে রেখে দরজা খোলার জন্য এগিয়ে গেল। তার পূর্ব অনুমান অনুযায়ী, ফুফুরা হয়তো চলে এসেছেন।
নীলা দরজা খুলতেই থমকে গেল।

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৫৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here