Home নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৫৩

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৫৩

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৫৩
নাজনীন নেছা নাবিলা

নীলা হন্তদন্ত হয়ে নিজের ক্লাসরুমে ফিরে গেল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, কিছুক্ষণ আগেও যে সহপাঠীরা তাকে নিয়ে বিষোদগার করছিল, কুৎসিত মন্তব্য ছুড়ে দিচ্ছিল, এখন তারাই সুর বদলে তার সাথে ভীষণ মিষ্টি ব্যবহার করছে। সবাই একবাক্যে তাকে ‘ভাগ্যবতী’ বলে মাথায় তুলছে। তাদের এই দ্বিমুখী আচরণ দেখে নীলার ঠোঁটে এক চরম তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। আসলেই, এই সমাজের মানুষ কত দ্রুত, কোনো কিছু না জেনেই কাউকে অপরাধী বানিয়ে ফেলে, আবার মুহূর্তেই তাকে মাথায় তুলে নাচে। ক্লাসে আর এক মুহূর্তও থাকার ইচ্ছে ছিল না তার। নিজের ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিয়ে সে সোজা ছুটে গেল ইকরার ক্লাসরুমের দিকে। ইকরাকে ক্লাসের বাইরে ডেকে নিয়ে দুজন মিলে হাঁটতে হাঁটতে ইউনিভার্সিটির মেইন গেটের দিকে রওনা হলো। পথে যেতে যেতেই নীলা লিসা আর প্রিন্সিপালের কেবিনে ঘটে যাওয়া পুরো রুদ্ধশ্বাস কাহিনী খুলে বলল। সব শুনে ইকরা তো খুশিতে প্রায় লাফিয়ে উঠল। সে জানাল, ক্লাসে বসে সে মুনভিকে ফোন করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু মুনভি কল ধরেনি। হয়তো কোনো কাজে ব্যস্ত আছে ভেবে ইকরা আর বেশি বিরক্ত করেনি। হাঁটতে হাঁটতে দুই বান্ধবী যখন ইউনিভার্সিটির মেইন গেটের একদম কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, ঠিক তখনই নীলার মাথায় একটা তীব্র ঝটকা লাগল। সে আচমকা থমকে দাঁড়াল। ইকরার দিকে তাকিয়ে তাড়াহুড়ো করে বলল,

“তুই আমার ব্যাগটা নিয়ে এখানেই একটু দাঁড়া, আমি এক্ষুনি যাচ্ছি আর এক্ষুনি আসছি‌।”
ইকরাকে কোনো প্রশ্ন বা উত্তর দেওয়ার সুযোগ না দিয়েই নিজের ব্যাগটা তার হাতে সঁপে দিয়ে নীলা আবার এক ছুটে ইউনিভার্সিটির ভেতরে চলে গেল। সে ভালো করেই জানে, মিহালকে সে তার নিজের কসম দিয়ে কেবিনে আটকে রেখে এসেছে, নীলা না বলা পর্যন্ত মিহাল নিজে থেকে লক খুলবে না বা বের হবে না। নীলা সোজা চলে গেল সেই দপ্তরির কাছে, যে প্রতিদিন ইউনিভার্সিটি ছুটি হওয়ার পর সব রুম লক করার দায়িত্ব পালন করে। তাকে গিয়ে বলল, সে যেন এক্ষুনি গিয়ে প্রফেসর মিহালের কেবিনের দরজাটা খুলে দিয়ে আসে। কাজটা সেরেই নীলা আবার এক দৌড়ে মেইন গেটে ইকরার কাছে ফিরে এলো। ইকরার কাছ থেকে নিজের ব্যাগটা টেনে নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

“এখানে আর এক সেকেন্ডও থাকা যাবে না, চল জলদি বাড়ি চলে যাই।”
এরপর আর কোনো দিকে না তাকিয়ে, দুই বান্ধবী মিলে দ্রুত ক্যাম্পাস ছেড়ে নিজেদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল। এদিকে দপ্তরি যখন মিহালের কেবিনের লক খুলতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই হয়তো প্রিন্সিপাল মাঠের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন নিজের করা ভুলের ঘোষণা দিতে।
দরজা খোলার শব্দ হতেই মিহাল এক বুক আশা নিয়ে চেয়ার ছেড়ে ঝড়ের বেগে দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। সে ভেবেছিল তার তেজী নীলাঞ্জনা বুঝি নিজের রাগ ভুলে ফিরে এসেছে। কিন্তু দরজার ওপাশে নীলার পরিবর্তে দপ্তরিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মুহূর্তের মধ্যে তার মনের ভেতর এক চরম হতাশা আর ক্ষোভ দানা বেঁধে উঠল। তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই দপ্তরি বিনীতভাবে ফরাসি ভাষায় বলল,

“স্যার, প্রিন্সিপাল স্যার আপনাকে এখনই অ্যানাউন্সমেন্ট স্টেজের সামনে যেতে বলেছেন।”
মিহাল চরম বিরক্ত হলো। তাকে আবার কেন স্টেজের সামনে ডাকা হচ্ছে, সে কিছুই মাথায় মেলাতে পারল না। সবচেয়ে বড় কথা, নীলা এই মুহূর্তে কোথায় আছে, সে কেমন আছে তার কিছুই সে জানে না। এতক্ষণ কসমের বেড়াজালে তাকে এই চার দেয়ালের মাঝে বন্দি রেখে বাইরে বাইরে নীলা কী ঝড় বইয়ে দিয়েছে, তারও কোনো হদিস নেই মিহালের কাছে। মাঠের দিকে এগোতে এগোতে সে পকেট থেকে ফোন বের করে নীলাকে কয়েকবার কল করল। কিন্তু প্রতিবারই ওপাশ থেকে রিং হয়ে কেটে গেল, নীলা তার একটি কলও ধরল না। মিহালের মেজাজ এবার একদম সপ্তমে চড়ে গেল। সে যখন মাঠের সেই বিশাল স্টেজের সামনে গিয়ে পৌঁছাল, দেখল সেখানে পুরো ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট আর টিচারদের উপচে পড়া ভিড়। আর স্টেজের ওপর গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং প্রিন্সিপাল। মিহাল প্রথমে কিছুটা দ্বিধায় পড়লেও, তার চেনা নীলাঞ্জনার বুদ্ধির ওপর তার অগাধ ভরসা ছিল। সে মনে মনে নিশ্চিত হয়ে গেল তার চাকরিটা আর যাই হোক, অন্তত হাতছাড়া হচ্ছে না। তার সেই ভাবনা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি প্রমাণিত হলো। প্রিন্সিপাল মাইকটা হাতে নিয়ে পুরো মাঠ কাঁপিয়ে ঘোষণা করলেন,

“কিছুক্ষণ আগে আবেগের বশে নেওয়া আমার সিদ্ধান্তটি আমি প্রত্যাহার করছি। প্রফেসর মিহাল খানের চাকরি এই ইউনিভার্সিটি থেকে যাচ্ছে না। তিনি শুধু একজন দক্ষ শিক্ষকই নন, একজন অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। নিজের চাকরি চলে যাওয়ার চরম ঝুঁকি থাকার পরও তিনি লোকলজ্জার ভয়ে নিজের স্ত্রীকে অস্বীকার করেননি, সবার সামনে তাকে অসম্মানিত হতে দেননি। যে পুরুষ নিজের স্ত্রীকে এতটা আগলে রাখতে পারে, সে অবশ্যই এই ইউনিভার্সিটির সকল ছাত্র-ছাত্রীকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসবে এবং প্রতিষ্ঠানের সাফল্যে দিনরাত পরিশ্রম করবে। এমন একজন অমূল্য প্রফেসরকে কোনোভাবেই এই ইউনিভার্সিটি হারাতে পারে না। এই কারণেই মিহাল খানকে বরখাস্ত করা তো হচ্ছেই না, বরং তাঁর সততা ও নিষ্ঠার পুরস্কার স্বরূপ তাঁর সেলারি আগের চেয়ে আরও ৫% বাড়িয়ে দেওয়া হলো।”

প্রিন্সিপালের এই ঘোষণা শুনে পুরো মাঠজুড়ে করতালির রোল উঠল। সবাই মিহালের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠল। কিন্তু মিহালের চোখ তখন ভিড়ের মাঝে শুধু একজনকেই খুঁজছিল, যার কারণে আজ তার এই রাজকীয় প্রত্যাবর্তন। কিন্তু পুরো মাঠ হন্যে হয়ে খুঁজেও নীলাকে কোথাও দেখতে পেল না মিহাল অবশেষে যে দপ্তরি তার কেবিনের লক খুলে দিয়েছিল, তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করতেই জানতে পারল, নীলা অনেক আগেই ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে গেছে। ব্যাস, এই কথা শোনা মাত্রই মিহালের মাথায় রাগের পারদ চড়চড় করে একদম সপ্তমে চড়ে গেল। প্রথমত, ওই মেয়েটা তাকে নিজের কসম দিয়ে একটা ঘরের ভেতর বন্দি করে রাখল। দ্বিতীয়ত, এই বন্দিদশার সুযোগ নিয়ে বাইরে সে একা একা কী মারাত্মক ঝড় বইয়ে দিল, তার কোনো ধারণাই তাকে দিল না। আর এখন, সবকিছু ওলটপালট করে দিয়ে তাকে একটা কথা না জানিয়েই বাড়ি চলে গেল। এমন পরিস্থিতিতে যেকোনো স্বামীর মাথা গরম হওয়াটাই স্বাভাবিক। তার ওপর মিহাল চাইলেই এখন ইউনিভার্সিটি ছেড়ে নীলার পেছনে ছুটতে পারছে না। গত দুই-তিন দিন এমনিতেই তার বেশ কিছু ক্লাস মিস হয়েছে। আজকের বাকি ক্লাসগুলো শেষ না করে কোনোভাবেই ক্যাম্পাস ছাড়ার উপায় নেই। তীব্র রাগ আর চরম বিরক্তিতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে আবার নিজের কেবিনের দিকে পা বাড়াল। তবে মনে মনে একটা বিষয় সে একদম নিশ্চিত হয়ে গেল আজ বাড়ি ফেরার পর কপালে বড় সড় ঝগড়া আছে।
এদিকে নীলা আর ইকরা বাসে করে বেশ নির্বিঘ্নেই বাড়ি ফিরে এলো। কলিং বেল বাজাতেই নীলার ফুফু দরজা খুলে দিলেন। উনি মুখ খোলার আগেই নীলা নিজে থেকে বলে উঠল,

“আসলে ফুফু, আজ আমাদের তেমন একটা ক্লাস হচ্ছিল না, তাই একটু জলদিই চলে এলাম। আর আসার সময় ইকরাকেও সাথে করে নিয়ে এসেছি।”
মিনা মির্জা তাদের দুজনকে ভেতরে ঢোকার জায়গা করে দিয়ে ড্রয়িংরুমের দিকে যেতে যেতে বললেন,
“খুব ভালো কাজ করেছিস তোরা দুজন একসাথে চলে এসেছিস। আর বলিস না, এদিকে মুনভি আর মিনু মা-ছেলে দুজনেরই খুব কড়া জ্বর এসেছে। তাই আমাকে এখনই ওদের ওখানে যেতে হবে। ইকরা মা, তুমি কি আমাদের সাথে যাবে?”
মুনভির তীব্র জ্বরের কথা শোনা মাত্রই ইকরার বুকের ভেতর এক অজানা ও তীব্র ভয়ের জন্ম নিল। সে ভীষণ চিন্তিত হয়ে ব্যাকুল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

“উনি, উনি এখন কেমন আছেন ফুফু?”
মিনা মির্জা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“জ্বর এখনো একদম কমেনি রে মা। আমি আর মিহালের বাবা এখনই রওনা হচ্ছি। ইকরা, তুমিও চলো আমাদের সাথে। আর নীলা না হয় বাড়িতেই থাকুক, মিহাল ফিরলে ও একাই সামলে নিতে পারবে।”
মুনভির অসুস্থতার কথা শুনে ইকরা আর একটা সেকেন্ডও দেরি না করে যাওয়ার জন্য রাজি হয়ে গেল। সে দ্রুত নিজের ঘরের দিকে ছুটল তৈরি হয়ে নেওয়ার জন্য। নীলাও একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল। মনে মনে ভাবল, একদিক দিয়ে বেশ ভালোই হয়েছে বাড়িতে বড়রা কেউ থাকছে না। আজ মিহাল ক্যাম্পাস থেকে ফিরলেই লিসার বিষয় নিয়ে আর তাকে না জানিয়ে এত বড় ঝুঁকি নেওয়ার অপরাধে এক চোট মন কষাকষি আর ঝগড়া করে নেওয়া যাবে।

মিহালের বাড়ি ফিরতে ফিরতে একদম সন্ধ্যা হয়ে গেল। সাধারণত দুপুরের পরপরই ক্যাম্পাস থেকে বিদায় নিলেও, আজ সেই উপায় ছিল না। গত কয়েকদিনের জমে থাকা ক্লাস আর অফিশিয়াল ফাইলের স্তূপ শেষ করতে করতেই দিনের আলো ফুরিয়ে এলো। তার ওপর আজ ভাগ্যটাও যেন চরম বৈরিতা করল। ফোনের চার্জ শেষ হয়ে বন্ধ হয়ে গেল মাঝপথেই, আর নিজের অফিশিয়াল কেবিনের ল্যান্ডফোনটাও আগে থেকেই নষ্ট। ফলে সারাদিনে নীলার সাথে একটা বারও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এক বুক ক্লান্তি আর চরম মেজাজ গরম নিয়ে অবশেষে সে বাড়ির সদর দরজায় এসে দাঁড়াল। কলিং বেল বাজাতেই বাড়ির কাজের লোক এসে দরজা খুলে দিল। তার কাজের সময়ও তখন শেষ, তাই মিহালকে ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়েই সে বিদায় নিয়ে চলে গেল। মিহাল ধপধপ পায়ে ভেতরে ঢুকে মূল দরজাটা শক্ত করে আটকে দিয়ে সোজা নিজের বেডরুমের দিকে চলে এলো। কিন্তু ঘরে পা রাখতেই তার মেজাজের পারদ যেন এক লাফে একশো ডিগ্রিতে চড়ে গেল। তার সাধের ‘নীলাঞ্জনা’ ঘরে নেই! চারদিক একদম খাঁ খাঁ করছে। এমনিতেই সকালের সেই রুদ্ধশ্বাস কাণ্ড, তার ওপর সারাদিনের এই তীব্র যোগাযোগহীনতা সব মিলিয়ে মিহালের ভেতরের ধৈর্যের বাঁধ এবার পুরোপুরি ভেঙে গেল। সে রাগে মুখ চোয়াল শক্ত করে গলার টাইটা এক হেঁচকায় ঢিলে করল। তারপর গায়ের কোটটা খুলে বিছানার ওপর ছুঁড়ে মারল। একই ভাবে শার্ট আর প্যান্টটাও গা থেকে দূর করে দিয়ে, স্রেফ একটা বক্সার পরা অবস্থায় হনহন করে চলে গেল ওয়াশরুমের দিকে। এই জ্বলন্ত গরম মাথায় এখন যতক্ষণ না পর্যন্ত ঠান্ডা জলের ধারা আছড়ে পড়ছে, ততক্ষণ তার ভেতরের এই আক্রোশ আর রাগ কোনোভাবেই শান্ত হওয়ার নয়।

নীলা এতক্ষণ ছাদেই ছিল। চারপাশটা সাঁঝের অন্ধকারে ঢেকে যেতেই সে ছাদ থেকে নিচে নিজের ঘরে নেমে এলো। কিন্তু ঘরে পা রাখতেই ভেতরের নাজেহাল দশা দেখে তার মাথায় রক্ত চড়ে গেল। এমনিতেই লিসার ওপর জমে থাকা রাগ, তার ওপর এই লোকটা সারাদিন একটা ফোন দিয়ে তার খোঁজ নেওয়ার পর্যন্ত প্রয়োজন বোধ করেনি। আর এখন ঘরে ফিরে পুরো রুমটাকে এক্কেবারে যুদ্ধক্ষেত্র বানিয়ে রেখেছে। রাগে নীলার পুরো শরীর কাঁপতে লাগল। সে বিছানার ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মিহালের কাপড়গুলো এক ঝটকায় হাতে তুলে নিল মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলার জন্য। ঠিক তখনই ওয়াশরুমের দরজা খুলে শাওয়ার নিয়ে বের হলো মিহাল। তার পরনে তখন একটা ঢিলেঢালা ট্রাউজার আর শার্ট। মিহাল কিছু বুঝে ওঠার আগেই নীলা হাতের শার্ট, প্যান্ট আর কোট সরাসরি মিহালের মুখ লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারল। ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটল যে মিহাল তা লুফে নিতে পুরোপুরি ব্যর্থ হলো। সবগুলো কাপড় সপাটে এসে লাগল তার মুখে। নীলার পরনে তখন একটা সাদার্ন থ্রি-পিস। সে এক ঝটকায় গলার ওড়নাটা বাম কাঁধে এনে, দুই পাশ থেকে টেনে ডান পাশের কোমরে শক্ত করে বেঁধে নিল যেন এক রণক্ষেত্রের যোদ্ধা সে। এরপর কোমরে দুই হাত রেখে, চোখ দুটো বড় বড় করে মিহালের দিকে তাকিয়ে সিংহীর মতো গর্জে উঠল,

“সমস্যাটা কী আপনার, হ্যাঁ? নিজের এই সাধের চাকরির প্রতি একটুও মায়াদয়া নেই আপনার? আজকে যদি আমার কাছে লিসার ওইসব নোংরা চক্রান্তের অকাট্য প্রমাণ না থাকত, তাহলে আমি কীভাবে আপনার চাকরিটা বাঁচাতাম? একটা বারও কি নিজের ক্যারিয়ারের কথা ভাবলেন না? এই ইউনিভার্সিটির প্রফেসরের চাকরিটা তো আপনার ছোটবেলার স্বপ্ন ছিল। আর সেই স্বপ্নটাই আজ আপনার হাত থেকে চিরতরে চলে যাচ্ছিল।”
নীলার এই রুদ্ররূপ আর ভালোবাসার তীব্র আক্রোশ দেখে মিহাল স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মুখের ওপর এসে পড়া কাপড়গুলো সরিয়ে সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার এই চিরচেনা, তেজী নীলাঞ্জনার দিকে।
মিহাল কিছু বলতে যাবে তার আগেই নীলা বলে উঠলো,

“এবং সারাদিন একটিবারও আমার খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলেন না। ঠিক মত বাড়ি ফিরেছি কিনা কোনো কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না।”
মিহাল হতাশার শ্বাস ছেড়ে বলল,
“প্রথমত আমি মাকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করেছি তোমরা বাড়ি ঠিকমতো পৌঁছেছো কিনা। আর দ্বিতীয়ত যদি কেউ আমার ফোন না ধরে তাহলে আমি কি করে জানবো সে ঠিক আছে কি আছে না। এবং সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ কথা আমার ফোনে চার্জ শেষ হয়ে গিয়েছিল। এবং আমাকে প্রশ্ন না করে তুমি আগে এটা জবাব দাও, আমাকে যতক্ষণ জ্ঞান দিলে আমি নিজের চাকরি নিয়ে কোন চিন্তা করি না। অথচ তুমি নিজেই প্রিন্সিপালের রুমে গিয়ে উনার সামনে উনার মেয়েকে ধমকে গেছো এমনকি উনাকেও ধমকি দিয়েছো। এখন যদি তোমাকে ডিসমিসড করে দিত, তোমার স্কলারশিপ বাতিল করতো? তাহলে তুমি কি করতে?”
নীলা মিহালের সামনে সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল,

“প্রথমত আমি আপনার মত কাঁচা খেলোয়াড় না। আমার কাছে প্রমাণ ছিল বলেই আমি এত জোর দেখিয়ে কথা বলতে পেরেছি। যাই হোক আপনার সাথে ঝগড়া করার মত এনার্জি আমার নেই।”
মিহালেরও মাথায় রাগ ছিল। সেও রাগের মাথায় বলল,
“হ্যাঁ আমারও তোমার সাথে কথা বলে এনার্জি নষ্ট করার কোন প্রয়োজন নেই। এমনিতেই ভীষণ ক্লান্ত আমি।”
বলেই মিহাল সোফায় বসে পরল। নীলা চুপচাপ বারান্দায় চলে গেল। সারাদিন পর নিজের চোখের সামনে তেজী নীলাঞ্জনাকে দেখে মিহালের বুকের ভেতরটা যেন জুড়িয়ে গেল, এক অদ্ভুত শান্তি নেমে এলো তার মনে। মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কাপড়গুলো সে পরম যত্নে তুলে নিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় গুছিয়ে রাখল। আজ দুপুরেও তার পেটে এক দানা দানাপানি পড়েনি, তীব্র ক্ষুধায় পেটটা চুইচুই করছে। ঠিক তখনই বারান্দার হাওয়া গায়ে মেখে নীলা আবার ঘরের ভেতর এলো। বিছানার চাদরটা টেনে শুয়ার জন্য প্রস্তুত করতে করতে মিহালকে উদ্দেশ করে বেশ গম্ভীর গলায় বলল,

“যদি কারও ভীষণ খিদে লেগে থাকে, তবে সে যেন দয়া করে নিচে গিয়ে খাবার খেয়ে নেয়। কিছুক্ষণ আগেই সব খাবার গরম করে টেবিলে রাখা হয়েছে। ফুফু যাওয়ার আগে আমার জন্য আমার পছন্দের খাবার রান্না করে দিয়ে গেছেন। তিনি ইকরাকে সাথে নিয়ে কারও একজন ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’-এর বাড়ি গেছেন, আজ রাতে হয়তো তারা আর ফিরবেন না। তাই যার খিদে লেগেছে, সে যেন নিচে গিয়ে সুন্দর করে খেয়ে চলে আসে।”
কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলেই নীলা বিছানায় শুয়ে একপাশে পাশ ফিরে ল্যাপটপ বা ফোনের দিকে মনোযোগ দেওয়ার ভান করল। নীলার কথা শুনে মিহাল কপালে ভাঁজ ফেলে একা একাই ফিসফিসিয়ে বিড়বিড় করতে লাগল,

“মুনভিদের বাড়ি আবার কেন গেল মা? আর নীলাঞ্জনা কি নিজে খাবার খেয়েছে?”
মিহালের নিচু স্বরের পুরো কথাটা নীলার কানে ঠিকই পৌঁছে গেল। সে বিছানা থেকেই আগের মতোই কড়া শ্লেষ মিশিয়ে উত্তর দিল,
“আমার চিন্তা অন্য কেউ না করলেও আমার ফুফু ঠিকই করেন। তিনি আমাকে নিজের হাতে খাইয়ে দিয়ে তবেই বাড়ি থেকে বের হয়েছেন। আবার কিছুক্ষণ আগে ফোন দিয়ে মনে করিয়ে দিয়েছেন খাবারটা যেন গরম করে নিই, তাই আমার খাওয়া শেষ। আর হ্যাঁ, কেউ আমার চিন্তা না করলেও, নিজের বন্ধুর চিন্তা তো অন্তত করা উচিত! তার বন্ধুর যে এত কড়া জ্বর, অথচ সে এই সম্পর্কে কিছুই জানে না!”

নীলা যে পেট পুরে খেয়েছে, এই সত্যটা জেনে মিহালের মনটা শান্ত হলেও, মুনভির হঠাৎ অসুস্থতার কথা শুনে সে বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ল। কারণ, ইদানীং সে আর মুনভি মিলে গোপনে একটা বড় প্ল্যান সাজাচ্ছিল কীভাবে নীলা আর ইকরাকে একটা দারুণ সারপ্রাইজ দেওয়া যায়। এখন মুনভিই যদি এভাবে জ্বরে পড়ে থাকে, তবে তো বেশ সমস্যা। তাছাড়া, নীলা যেভাবে বাঁকা ত্যাড়া কথা বলছে, তাতেই স্পষ্ট যে মেয়েটার রাগ এখনো বিন্দুমাত্র কমেনি, আজ রাতে সে এভাবেই হুল ফোটানো কথা বলে যাবে।

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৫২

কিন্তু এই মুহূর্তে মিহালের পেটের ক্ষুধাটা বড় বেশি জানান দিচ্ছে। এখানে দাঁড়িয়ে মান-অভিমানের জবাব দিয়ে সময় নষ্ট করলে পেটের ভেতরের ইঁদুরগুলো আরও বেশি লাফালাফি করবে। ঘড়ির কাঁটায় তখন সন্ধ্যা সাতটা বেজে গেছে। মিহাল আর কথা না বাড়িয়ে সোজা নিচের তলার ডাইনিং রুমের দিকে পা বাড়াল। আগে পেটপুজো হোক, তারপর নিজের বেগতিক নীলাঞ্জনার মান ভাঙানোর ব্যবস্থা করা যাবে।

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৫৪