Home নীরব উন্মাদনা দ্বিতীয় খন্ড নীরব উন্মাদনা দ্বিতীয় খন্ড পর্ব ২০

নীরব উন্মাদনা দ্বিতীয় খন্ড পর্ব ২০

নীরব উন্মাদনা দ্বিতীয় খন্ড পর্ব ২০
সুরাইয়া জিয়াসমিন

আরহামের কোলে থাকা আয়রা ভয়ে চম্কে উঠলো,নুবা হতভম্ব হয়ে গেলো সাথে পরি আশ্চর্য হয়ে নাবিলের দিকে তাকালো।সে বুঝতেই পারলো না কি হলো।আশে পাশের মানুষ চোখ বড় বড় করে তাদের দিকে তাকালো।
ভাগ্য ক্রমে নাবিলের বন্ধুকের গুলি আরহামের শরীর নয় বরং শার্ট ভেদ করলো।আরহামের শরীরের শার্টের ফেপে থাকা অংশ ছেদ করে অন্য পাশ দিয়ে গুলি বেড় হয়ে গেলো।আর এই দূর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়ার কারণ হলো,সে শেষ মূহুর্তে সেই স্থান থেকে সরার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলো ফল স্বরুপ শরীর ছুঁয়ে গুলি গেলো তার।আরহামের কমড়ের বাম পাশ ছুঁয়ে গেলো সেই ছোট্ট ধাতুর জিনিস।সাথে সাথে কিছুটা রক্তে শার্ট ভিজে উঠলো। আরহাম চোখ মুখ খিচে মেয়েকে বুকে চেপে নিলো।
এদিকে নুবা যখনি খেয়াল করলো,সেই বন্ধুকের গুলি আরহামের শরীর ভেদ করেছে তখনি সে চম্কে উঠলো।নুবার ভাবনা আরহামের শরীর দিয়ে গুলি ঢুকেছে তবে ভাগ্যক্রমে এমন কিছুই হয়নি।
নাবিল যখন দ্বিতীয় বার সুট করতেই নিবে তখনি পরি আরহামের সামনে এসে দাঁড়ালো। হতভম্ব হয়ে চেঁচিয়ে উঠে সুধালো

_”এই সব কি করছেন আপনি?”
পরিকে সামনে দাঁড়াতে দেখে নাবিল অনেকটা রেগে গেলো।তবে থেমে গেলো না,পরির থেকে আরহাম যেহেতু অনেকটাই লাম্বা তাই তার মাথা দেখা যাচ্ছে।নাবিল সেই সুযোগ আরহামের মাথা বরাবর সুট করলো।পরি ভয়ে চোখ মুখ খিচে নিলো।নাবিলের উপরোক্ত ভাবনা টের পেয়েই নুবা দুই কদম এগিয়ে এসে দুই হাত বাড়িয়ে আরহামকে ধাক্কা দিয়ে নিজের স্থান থেকে সরিয়ে দিলো। এদিকে আয়রা বেশ ভয় পেয়ে আরহামের গলা জরিয়ে ধরে কেঁদে উঠলো।
আরহাম যেনো কিছু সময়ের জন্য স্তব হয়ে গিয়েছিলো নাবিলের আক্রমনে।যখন নাবিল আরহামকে সরিতে দিতে দেখে নুবার দিকে ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে তাকালো তখনি পরি পেটে হাত চেপে কোনো মতে ছুটে আসতে চাইলো নাবিলের কাছে। কারণ সে বুঝতেই পারছে না।”নাবিল কেনো আরহামের উপর হামলা করছে।”
দ্বিতীয় বারের মতো আরহামকে না মারতে পারায় নাবিল বেশ রেগে নুবার দিকে বন্ধুক ত্যাগ কারলো।তখনি পরি ছুটে এসে এক ধাক্কায় নাবিলের হাত থেকে বন্ধুক ফেলে দিলো পরপর চেঁচিয়ে উঠে অনুনয় করে বললো

_”কি করছেন কি আপনি।কেনো উঠে পড়ে ওদের পিছনে লেগেছেন।কি করেছে ওরা,কেনো মারতে চাইছেন।দয়া করে ওদের ক্ষতি করবেন না?”
পরি যেনো বাক্যে হারিয়ে ফেলেছে এই অবস্থা দেখে।সে কি রেখে কি বলবে বুঝতে পারছে না।
এদিকে নুবা যখন বুঝতে পারলো আরহাম ঠিক আছে তখনি ছুটে গেলো তার কাছে পরপর আরহামের হালকা খতো স্থানে চোখ বুলিয়ে কম্পিত কন্ঠে বললো
_”আপনি ঠিক আছেন তো?”
আরহাম এতো সময়ে হুসে ফিরলো।সে যেনো কোনো অন্য জগতে হারিয়ে গিয়েছিলো। হয়তোবা সে পরিস্থিতি মাপতে চাইছিলো তবে তার ভাবনার ভিতরেই নাবিল সুট করে বসলো তাও দুই দুইবার।
নুবার কন্ঠে আরহাম বর্তমানে ফিরে আসলো পরপর সে নুবার গালে হাত রেখে উল্টা প্রশ্ন করে বললো
_”তুমি ঠিক আছো?”
নুবা হাঁসফাঁস করে উঠলো, বিচলিত কন্ঠে বললো
_”হ্যাঁ ,আমি ঠিক আছি। আপনার কি বেশি লেগেছে। রক্ত বেড় হচ্ছে, হসপিটালে যেতে হবে।খুব ব্যাথা হচ্ছে আপনার?”

নুবা বেশ অস্থির হয়ে পড়লো। আরহাম উত্তর দেওয়ার বদলে আয়রাকে নুবার কাছে দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললো
_”ওকে থামাও।এই b*** টাকে জনমের শিক্ষা দিতে হবে।কৈ মাছের জান,সেদিন গুলি খেয়েও মরেনি শালা।”
আসলে আরহাম এতো সময় নাবিল জীবিত আছে এই নিয়েই ভাবছিলো। কারণ সে যেভাবে নাবিলকে গুলি করেছিলো,এতে করে নাবিলের মরে যাওয়ার কাথা ছিলো তবে নাবিল বেঁচে আছে এটা নিয়েই আশ্চর্য হলো সে।মানে দুইজনি ভাবছে একি কথা।দুইজনের কাছে দুইজন মৃত থেকে জীবিত হয়েছে।
আরহাম যেতে নিলে নুবা আরহামের এক হাত আঁকড়ে ধরে কাতর কন্ঠে বললো
_”যাবেন না,ওই লোকটার কাছে বন্দুক আছে।আমি আপনাকে হারাতে চাই না।”
এদিকে পরি ক্ষিপ্ত নাবিলকে কোনো মতেই সমাল দিতে পারছে না। ক্রমাগত নাবিল আরহামের দিকে তেরে যাচ্ছে।হাত থেকে যে বন্দুক পড়ে গেছে এটাও তার হুস নেই।সে শুধু ভাবছে আরহামকে সে মারবেই।
নাবিল আরহামের দিকে যেতে নিলে পরি পরি পিছন থেকে নাবিলকে টেনে ধরলো।তবে নাবিল পরিকে ঝাড়া মেরে সরিয়ে দিলো।তখনি ভুলক্রমে পরি হোচোট খেয়ে পড়ে গেলো। একদম উল্টো হয়ে।সাথে সাথে পরির করুন আর্তনাদ ভেসে আসলো।আশে পাশের মানুষ চম্কে উঠলো।অন্য দিকে নুবা পিছন থেকে আরহামের শার্ট শক্ত চেপে ধরে বারবার বলছে

_”এখান থেকে চলুন। please ।”
নুবার একটাই ভয়,নাবিলের কাছে বন্দুক আছে।আর আজ আরহাম খালি হাতে।যদি নাবিল আরহামকে মেরে ফেলে তখন কি করবে নুবা।তার তো কুল কিনারা থাকবে না।এই ভেবেই সে আরহামকে চেপে ধরে পিছন দিকে সরে যেতে চাইছে।
নাবিল ক্ষিপ্ত মেজাজ নিয়ে আরহামের দিকে এগিয়ে আসলেও, হঠাৎ করেই পরির আর্তনাদ শুনে সে চম্কে উঠে পিছনে তাকালো।সেই আর্তনাদে নুবা আর চোখে আরহামো তাকালো।পরিকে পড়ে যেতে দেখে নুবা হতভম্ব হয়ে গেলো। ভীষণ ভয় পেয়ে গেলো নুবা।
আশে পাশের মানুষ এগিয়ে এসে যে পরিকে সাহায্য করবে তাও পারছে না। কারণ সবার প্রনের ভয় আছে। নাবিলাকে সুট করতে দেখে সবাই ভীত হয়ে আছে।তাই কেউ এগিয়ে আসছে না।

পরির বেদনাদায়ক কন্ঠ শুনে নাবিল নিজের উদ্দেশ্য ভ্রষ্ট হলো।সে আরহামের দিকে এগিয়ে যাওয়ার বদলে পিছন ঘুরে তাকালো।পরপর পরিকে উল্টো হয়ে পড়ে ছটফট করতে দেখে তার কলিজা কেমন ছ্যাত করে উঠলো।নাবিল জীবনের প্রথমবার নিজের উদ্দেশ্য,নিজের লক্ষ ভুলে পরির কাছে ছুটে আসলো।নাবিল জানে এই সব পেশায় থাকলে,মায়া, ভালোবাসা,রাখতে নেই।তবে পরাজয় নিশ্চিত।তাই তো নাবিল খুব পাষান। কিন্তু এবার নাবিল নিজের কাছেই হেরে গেলো। লক্ষ্যভ্রষ্ট করে পরির দিকে ছুটে এসে হাঁটু গেড়ে বসলো।
পরপর পরির ছটফট করতে থাকা বদনটাকে বুকে টেনে নিয়ে রাগে হাঁসফাঁস করে বললো
_”খা** বাচ্চা,পড়লি কেমনে।”
তবে পরি উত্তর দিতে পারলো না। চোখের কার্নিশ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো তার। আস্তে করে চোখ বুজে নিলো সে,পরপর কেমন করে লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে নিস্তেজ হয়ে গেলো।পরিকে নিস্তেজ হয়ে যেতে দেখে নাবিল স্তব হয়ে গেলো।বুকটা কেমন কেঁপে উঠলো তার।
এদিকে পরির অবস্থা দেখার পড়ে নুবার প্রচন্ড খারাপ লাগলো তবে সে এগিয়ে গেলো না বরং কান্নাকাটি করে আরহামকে ওখান থেকে সরিয়ে আনলো। কারণ সে কোনো মতেই নিজের স্বামীকে হারাতে পারবে না।আরহামো সেখান থেকে সরে আসলো কারণ একটাই,নুবা আর আয়রা।তার জন্য সে নিজের স্ত্রী আর সন্তানের ক্ষতি করতে পারবে না।
নুবা আরহামকে নিয়ে কিছুটা দূরে সরে আসতেই, আরহাম বলে উঠলো

_”তখন ধাক্কা কেনো দিলে? যদি গুলিটা তোমার শরীরে লাগতো।কোনো common sense আছে তোমার? কোন আন্দাজে তখন ধাক্কা দিলে।”
আরহাম কেনো জেনো হঠাৎ করেই নুবার উপর রাগ দেখাতে শুরু করলো।তবে নুবা একটুও রাগলো না। বরং মেয়েকে নিয়ে আরহামকে শক্ত করে জরিয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে উঠলো,কাতর কন্ঠে বললো
_”আপনি কেনো হুস হারার মতো ওখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আপনার কিছু হয়ে গেলে আমার আর আয়রার কি হতো।”
আরহাম শুকনো ঢোক গিললো।আজ নুবা ধাক্কা না দিলে তার শেষ দিন হতো তবে সে খুবি মর্মাহত এটা নিয়ে যে “নুবার যদি কিছু হয়ে যেতো?”
বিষয়টা ভেবেই আরহাম শক্ত করে নুবাকে জরিয়ে নিলো নিজের সাথে।নুবা আরহামের শার্ট খামচে ধরে ফুঁপিয়ে উঠে বললো

_”আমি আপনাকে আবারো হারাতে পারবো না।আপনি দয়া করে এই বিষয়টা ভুলে যান।ওই লোকটার থেকে দূরে থাকুন।”
নুবা ভালো মতোই জানে এই ঘটনার পর নিশ্চয় আরহাম নাবিলকে শায়েস্তা করতে চাইবে।তাই নুবা এই কথা বললো। আরহাম চোখের পলক ফেললো,
কারণ সে যা ভাবার ভেবে নিয়েছে।এবার শুরু করার পালা।
নাবিল পরিকে কোলে তুলে গাড়িতে তুললো। কেমন হাত পা কাঁপছে তার। কারণ পরির হুস নেই। উল্টো হয়ে পড়েছে পরি ‌।এই জন্য নাবিলের আরো ভয় লাগছে।

আরহাম চোখ মুখ খিচে নিলো।নুবা কম্পিত হাতে আরহামের খতো স্থানে ব্যান্ডেজ করে দিলো। আরহাম হসপিটালে যায়নি। কারণ সে কিছুতেই চায় না তার পরিবার এই বিষয়ে কিছু জানুক আর চিন্তিত হয়ে পড়ুক।তাই তখনি ওখান থেকে চলে এসেছে তারা।
নুবা নিজের কাজ শেষ করে আরহামের দিকে মলিন চোখে তাকালো, আরহাম নুবার শুকনো মুখ দেখে শান্ত কন্ঠে বললো
_”তেমন কিছুই হয়নি। Relax !”
তবে নুবা শান্ত হতে পারলো না।নুবার মনে হচ্ছে নাবিল আবারো আসবে,আরহামকে মারতে চাইবে। এদিকে আরহামো নুবার মতোই ভাবছে।নাবিল আসবে তবে এবার নুবা আর আয়ারকে মারার চেষ্টা করবে। কারণ নাবিলের পরের টার্গেট নুবা ছিলো।সে আরহাম কে নয় বরং নুবাকে মারার জন্য এগিয়ে আসছিলো।নুবা আরহামকে ধাক্কা দেওয়ার ফলে আরহাম বেঁচে গেলো যার কারনে নাবিল হয়তোবা ক্ষেপে গিয়েছিলো।তাই আরহাম যতটুকু আন্দাজ করতে পারলো, নাবিল যেহেতু বেঁচে আছে এবার সে শুধু আরহামকে নয় বরং তার পুরো পরিবারকে টার্গেট করবে।
আরহাম নুবাকে শান্ত কন্ঠে নিজের বুকে টেনে নিলো।নুবা তখনকার কাহিনি ভুলতেই পারলো না। কারণ একটু হলেই আরহাম না ফিরার দুনিয়ায় চলে যেতো।এটা ভেবেই নুবা ফুঁপিয়ে উঠলো। আরহাম নুবার মাথায় হাত বুলিয়ে কপালে চুমু খেয়ে বললো

_”কিচ্ছু হয়নি। কান্না করিস না।মেয়ে ভয় পাবে।”
তবে নুবা কিছুতেই ভয় কাটিয়ে উঠতে পারলো না।আরহামের বুকে মুখ গুজে মলিন কন্ঠে প্রশ্ন করে বললো
_”অনেক লেগেছে আপনার? চলুন ডাক্তারের কাছে যাই।না হলে মনে হয় না এই খতো সারবে।”
আরহাম নুবার পিঠে হাত বুলিয়ে শান্ত কন্ঠে। আরহাম তো শুধু চিন্তা করছে এই গুলি এসে যদি আয়রা বা নুবার শরীর লাগতো তখন তার কি হতো।সে তো বেঁচে থাকতেও মৃত হয়ে যেতো।
নুবা অনেকটা সময় পার হতে শান্ত হয়। আরহাম নুবাকে শান্ত হতে দেখে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলে উঠে
_”এই বিষয়ে কাউকে বলবে না।আমি চাই না কেউ এই সব জানুক আর এমন একটা সময়ে টেনশন করুক। কাউকে কিছু বলবে না ওকে?”
নুবা মাথা ঝুকায়,তবে মনে মনে তার আরহামকে নিয়ে ভয় রয়েই যায়।

নাবিল কিছুটা চেঁচিয়ে উঠে বলে
_”তুই না কইলি ও মইরা গেছে।তাইলে বাঁচলো কেমনে?”
ওপাশ থেকে সাগর ভীতু কন্ঠে বলে উঠে
_”ভাই আমরা তো খোঁজ খবর নিয়া তাই জানছিলাম।আর পুলিশেও তো আপনেরে জিগ্গেসা বাদ কইরা গেছিলো।তাইলে ওই ছেমরা কেমনে বাইচা আছে।আপনে নিশ্চিত ভুল দেখছেন!”
সাগরের কথায় নাবিল গর্জে উঠে সুধালো
_”খানির পোলা,সামনে আয় তুই আমার। সর্বপ্রথম তোরে আমি খুন করমু।আমি ভুল দেখছি,না?শালা আমার চোখের সামনে আছিলো।ও বাইচা আছে।”
কথাটা জেনে সাগর অবাক হলো যে আরহাম বেঁচে আছে। কারণ অনেক মাস আগেই তো তারা জেনেছিলো আরহাম মারা গেছে।আর এর পর তো আর খবর নেওয়া হয়নি তার ব্যপারে।নাবিল সাগরের ভাবনার ভিতরে ওপাশ থেকে চেঁচিয়ে উঠে বলে

_”২৪ ঘন্টার ভিতরে,ওই নডির পোলার সব খবর আইনা আমারে দিবি।না দিলে তোরে আগে আমি কুপামু। কি থাইকা কি হইবে সব খোঁজ নিবি,বুঝলি?”
সাগর নাবিলের কথায় ভীতু কন্ঠে বলে
_”আইচ্ছা ভাই।”
বলেই সাগর কল কেটে দিলো। তবে সে অবাক হলো। কারণ আরহাম বেঁচে আছে।এটা তার বিশ্বাসি হচ্ছে না। সাগর পাশে বসে থাকা ইমনের দিকে তাকিয়ে আফসোস করে বললো
_”ওই হারামজাদা বাইচা আছে। কিন্তু এইবার আগমো হাতের থাইকা বাঁচবো না।ভাই বলছে ডিরেক্ট ওরে কুপাইবো।”

পরি হসপিটালের বেডে শুয়ে আছে।বেচারির জীবনটাই যেনো হসপিটালের নামে হয়ে গেছে।নাবিল তার জীবনে আসার পর থেকে শত বার সে হসপিটালে এসেছে। অথবা হসপিটালের ডাক্তার তাকে চিকিৎসা করতে বাড়ি গিয়েছে। আপাতত পরি বিপদ মুক্ত আছে।পেটে চোট পেয়েছে পরি তবে বাচ্চার তেমন ক্ষতি হয়নি। বাচ্চা আসার পর থেকে ভাগ্য বরাবরই পরির সঙ্গ দেয় ,তাই তো নাবিলের এতো অত্যাচার সহ্য করেও এখনো বাচ্চাটা ঠিকে আছে সাথে পরিও।তবে তাকে ভর্তি থাকতে বলা হয়েছে।
পরি হসপিটালের দেওয়াল গুলোর দিকে তাকিয়ে চিন্তিত হলো। কারণ সে এখন নিজের বা বাচ্চার কথা ভাবছে না।সে তো ভাবছে,নাবিল কেনো আরহামকে মারতে চাইলো।আর নুবাই বা কেনো,নাবিলকে দেখে তখন ওই সব বললো।পরির মাথায় কিছুই ঢুকছে না তবে কি আরহাম কোনো ভাবে নাবিলের শত্রু।কোনো ভাবে কি তাদের ভিতরে কোনো ঝামেলা বেঁধেছে? হাজারটা প্রশ্ন পরির মাথায় ঘুরতে লাগলো।

এমন একটা সময় নাবিল কথা বার্তা শেষ করে রাগে হাঁসফাঁস করতে করতে ,পরির কেবিনে প্রবেশ করলো।পরি নাবিলকে আস্তে দেখে ক্লান্ত চোখে সেদিকে তাকালো।তখনি নাবিল এগিয়ে এসে হঠাৎ করেই পরির গলা চেপে ধরবো। হঠাৎ এমন হওয়ায় পরি বড়ো বড়ো চোখ করে নাবিলের দিকে তাকালো।
নাবিল আরো শক্ত করে পরির গলা চেপে ধরতেই পরি নিজের ক্লান্ত দুই হাত দিয়ে নাবিলের হাত সরানোর চেষ্টা করলো। তবে নাবিল কেমন লাল বর্ন চোখ নিয়ে পরিকে মেরে ফেলার চেষ্টা করলো।পরি ছটফট করে উঠলো।কথা বলতে পারলো না সে, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসলো তার।নাবিলের চোখে দিকে তাকিয়ে সে কোনো নম্রতা দেখতে পেলো না বরং রাগ, ক্ষোপ, জেদ,দেখতে পেলো।পরির চোখের কার্নিশ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো।চোখ উল্টে আসলো।হাতের নক দিয়ে নাবিলের হাত খামচে ধরলো। ফর্সা মুখটা কেমন সাদা কাগজের মতো রক্তহীন হয়ে গেলো।
নাবিল পরির এই অবস্থা দেখেও একটুও মায়া করলো না। ঠিক আগের মতো আসল রুপে ফিরে এলো সে।এতো দিনে পরির প্রতি জমা অনুভূতি গুলো যেনো ধূলোই মিশে গেলো।নাবিল পরির মুখের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বললো

_”ওই মির্জা পরিবার কি হয় তোর। ওদের সাথে এতো কিসের আলাপ তোর।কেনো ওদের বাঁচাতে চাইলি? আমার সামনে কেন আসলি?”
নাবিল সবটা জানে না, কারণ একটাই সে ভেবেছিলো আরহাম মারা গেছে তাই কোনো প্রকার খবর সে রাখেনি অবশ্য পরি না বললেও সাগর নিশ্চয় সবটা খবর তাকে পরেই দিয়ে দিতে পারে।
নাবিল প্রশ্ন টুকু করে পরিকে ছেড়ে দিতে নিলেই তখনি পিছন থেকে হাবিব চেঁচিয়ে উঠে বললো
_”কি করতাছেন ভাই,মইরা যাইবো তো!”
হঠাৎ হাবিবের কন্ঠ শুনে নাবিল পরিকে ছেড়ে দিলো।পরপর হাবিবের দিকে তাকিয়ে রাগি কন্ঠে বললো
_”তোরে আমি হেনে আইতে কইছি। চোখের সামনে থেইকা দূর হ।না হইলে কইট্টা রাইখা দিমু।”

নাবিলের কথায় হাবিব বেশ ভয় পেয়ে কেবিন থেকে বেড় হয়ে গেলো। এদিকে নাবিলের থেকে ছাড়া পেয়ে পরি খু খু শব্দ করে কেশে উঠলো।এতো সময় হা করে থাকার ফলে মুখ দিয়ে লালা বেড় হয়ে আসলো তার।এক হাত দিয়ে নিজের গলায় ধরে অন্য হাত দিয়ে পানি খুঁজলো সে।তবে হাতাহাতি করতে যেয়ে পাশ থেকে পানির গ্লাস পড়ে ভেঙ্গে গেলো।নাবিল সেই শব্দে ফিরে তাকালো।তবে এবারো একটুও মায়া হলো না তার।
পরি এগিয়ে যেয়ে পানির বোতল নেওয়ার চেষ্টা করলো,তবে নাবিল বোতল নিয়ে দেওয়ালে ছুরে মারলো,সাথে সাথে বোতলের পানি আশে পাশে ছিটিয়ে পড়লো।পরপর হুংকার ছেড়ে বললো
_”মরে যাবি তুই,তাও একটা পানির ফোঁটা তুই পাবি না।এটাই আমার কাজে বেগরা দেওয়ার শাস্তি। তুই মাঝখানে না আসলে নিশ্চয় ওই বাইনচো”*** কে মাইরা ফালাইতে পারতাম। শুধু তোর জন্য,,!”
বলেই পরির দিকে আঙ্গুল তুলে শাশালো সে।পরি শুকনো গলা নিয়ে কাঁদতে পারলো না।মনে হচ্ছে পানি না পেলে সে মরেই যাবে।পরি কেমন হাঁসফাঁস করে উঠলো তবে তার বরাতে একটুও পানি জুটলো না।
পরি হাত থেকে ক্যানুলা খুলে হাত থেকে রক্তের ঝড়না বয়ে গেলো।সেই রক্তে পরির গলা আর বুক ভেসে গেলো।পরির মনে হলো দুনিয়ায় নিজের শেষ সময় টুকু অনুভব করছে সে।

নাবিল যখন বুঝতে পারে পরির প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে ততসময়ে অনেক দেরি হয়ে গেছে, কারণ কেবিনে আর কোনো পানির বোতল নেই।নাবিল নিজের উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ না রাখতে পেরে সেই নিচে পড়ে থাকা পানির বোতলের দিকে এগিয়ে গেলো।যাতে অবশিষ্ট একটু পানি কোনো মতে বেঁধে আছে।
নাবিল রাগে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে সেই বোতল এনে পরির কাছে দিলো।পরি তৃষ্ণার্ত পাখির ন্যায় সেই পানি টুকু ঢকঢক করে গিলে নিলো তবে তৃষ্ণা মিটলো না তার।নাবিল দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে পানি আনতে কেবিন থেকে বেড় হয়ে গেলো ‌।তবে হঠাৎ করেই তার মনে হলো”সে যদি এসে দেখে পরি মারা গেছে তখন? তখন তো তার বাচ্চাটাও সাথে মারা যাবে।” এই সব ভেবে নাবিল আরো তাড়াতাড়ি পানি আনতে ছুটলো।

আয়রা কিছু কিছু শব্দ উচ্চারণ করছে।যা শুনে আরহাম প্রচন্ড আবেগে প্রফুল্ল হয়ে যাচ্ছে। কারণ আয়রা “মা,বা””বাবা” উচ্চারণ করছে।আবার বিছানার উপর এক দু পা হেঁটে বারবার আরহামের কাছে আসছে।
আয়রা বিছানার এক কোনায় উঠে দাঁড়িয়েছে,তা দেখে আরহাম মুচকি হাসলো।দুই হাতে তালি দিয়ে মেয়েকে নিজের দিকে ডাকতে লাগলো।সে আয়ারকে হাঁটতে উৎসাহিত করতে লাগলো।
_”এদিকে, এদিকে আসো আম্মু,পাপার কাছে আসো।”
আয়রা আরহামের হাতের ইশারা দেখে এগিয়ে আসতে চাইলো তবে স্বাস্থ্যবান আয়রা ৪/ ৫ কদম এগোতেই ধপাস করে পড়ে গেলো। আরহাম বেশ ভয় পেলো তবে তাও মেয়েকে উৎসাহ দিয়ে বললো
_”কিচ্ছু হয়নি আরু, তুমি অনেক স্ট্রং, তুমি একদমি তোমার আম্মুর মতো লেতুর না মামুনি ,উঠো,come on!”
আয়রা বাবার হাস্যোজ্জ্বল কন্ঠস্বর শুনে এবার হাঁটার বদলে হামাগুড়ি দিয়ে ছুটে চলে আসলো আরহামের কাছে। আরহাম মেয়ের কান্ড দেখে মুচকি হাসলো তবে তাও মেয়ের পক্ষ নিয়ে বললো

নীরব উন্মাদনা দ্বিতীয় খন্ড পর্ব ১৯

_”it’s ok আম্মু, তুমি যে হেঁটে আসতে পারোনি তাতে পাপা একটুও নারাজ হয়নি। বরং তুমি পাপাকে শিখিয়েছো ‘যে যেভাবেই,বা যেরকম পরিস্থিতিতেই থাকুক না কেনো ,তার ওভাবেই সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া উচিত” am i right?”
আয়রা মুখ দিয়ে শব্দ বের করে হাসে।এর ভিতরে সামনে থেকে নুবা বলে উঠে
_”আপনি কাকে লেতুর বললেন?”

নীরব উন্মাদনা দ্বিতীয় খন্ড পর্ব ২১