Home নূর এ সাহাবাদ নূর এ সাহাবাদ পর্ব ২৯

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ২৯

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ২৯
জান্নাতুল ফেরদৌস

দরজার খটর খটর ক্রমশ বেড়েই চলেছে। মেহেরুন্নেসা ভয়ে সিটিয়ে আছে। না জানি কোন বিপদ এসে দাঁড়ালো আবার। মিরানকে অনুরোধ করল দরজা না খুলতে। কিন্তু মিরান খুলবেই। দেওয়ালে ঝোলানো তরবারি কোষ থেকে তলোয়ারটা ছুটিয়ে নিয়ে দাঁড়ালো ভারী দরজার সামনে। কিঞ্চিৎ সময়ের জন্য থামলো দরজার শব্দ। মিরান অপেক্ষা করলো ফের শব্দ হবার। কিছুক্ষণ পর আবার শব্দ, সাথে সাথে ঝনাৎ করে খুলে দিল ভারি দরজাটা। সামনে দৃশ্যমান হলো এক পুরুষ অবয়ব। মেহেরুন্নেসা চমকে তাকালো তার দিকে। সম্পূর্ণ শরীর কালো পোষাকে আবৃত। মুখোশের আড়ালে দৃশ্যমান এক জোড়া শকুন চোখ। যা মিরান কে ছাড়িয়ে সরাসরি দৃষ্টি ফেলল মেহেরুন্নেসার ওপর। মিরান সামান্য ঝুকে তাকে সম্মান জানালো। মেহের বুঝলো এই সেই লোক। ভয়ে গায়ে কাটা দিচ্ছিল তার। লোকটা ভিতরে ঢুকতে গেলে মিরান দরজায় বাঁধা হয়ে দাড়ালো। মিরান এর এমন ব্যাবহারে সে মনঃক্ষুণ্ন। মিরান সটান দাঁড়িয়ে বলল

“তাকে আমি আমার অধীনে এখানে নিয়ে এসেছি। কথা দিয়েছি তার কোনো ক্ষতি হতে দেব না। যেভাবে নিয়ে এসেছি সেভাবেই মহলে পৌঁছে দিয়ে আসবো নির্বিঘ্নে। এতে যদি আমায় প্রাণও দিতে হয়”
লোকটার চোখ দুইটা হেসে উঠলো। গমগমে গলায় বলল
“তাহলে প্রাণ ই আগে দাও”
কোমরে গোজা নুক্তা টা থেকে ধারালো এক বাকা চাকু বের করলো মূহুর্তেই। মিরান এর দিকে তাক করতেই মিরান হেসে ফেলল। মেহেরুন্নেসার আত্না তখন যায় যায়। কেন সে আসতে গেল মিরানের সাথে। মিরান হেসে বলল
“ভুলে যাবেন না নাসিরাবাদ এর পাঁচ টা আসামিই আমার আয়ত্তে। আমায় মারলে তাদের নাগাল জীবনেও পাবেন না জনাব। তাই ভালোয় ভালোয় স্থান ত্যাগ করুন। শাহজাদা স্ত্রী কে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসে। তার দিকে দৃষ্টি দিয়ে মরণ ডেকে আনবেন না”

ক্রোধে সরু হয়ে আসলো লোকটার চোখ। ক্যাচ করে চাকু গেড়ে দিলো মিরান এর বাহুতে। মিরান একবার চমকে গিয়ে খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। চাকু টা হাতে করেই বেড়িয়ে গেল সে। কিছুটা এগিয়ে পিছনে ফিরতেই মিরান মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিলো। লোকটা ক্রোধে খানিক টা এগিয়ে এসে থেমে গেল। তার উদ্দেশ্য ছিল শেষ একবার মেহেরুন্নেসা কে দেখা। তা মিরান হতে দিল না। দরজা বন্ধ করে পুনরায় মেহেরুন্নেসার সামনে গিয়ে বসলো মিরান। মেহের তড়িঘড়ি করে উঠে এসে তার বাহু চেপে ধরলো।
“একি কত রক্ত পড়ছে। তু…তুমি ফিরে চলো। চলো। আবার অন্য একদিন শুনবো সব”
কিন্তু মিরান ভাবলেশ হীন। যেন কিচ্ছু হয়নি তার। এক টুকরো কাপড় বাহুতে বাধতে বাধতে বলল
“এত টুকু আঘাতে আমার কিচ্ছু হয় না বেগম। এর চাইতে ঢের আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা আমার আছে। তোমার সামনে বিপদ। শাহজাদা তোমায় সর্বোচ্চ আগলে রাখবে জানি। তবে তোমারও শত্রু চিনতে হবে।”
মেহেরুন্নেসা স্থির হয়ে বসলো।
“আগে অরণ্যের ব্যাপারে বলো। সে কোথায়?”
“সে মৃত”

মেহেরুন্নেসা খুবই বিরক্ত হয় কথাটা শুনে। মিরান ফের বলল।
“সেদিন ছিল ভরা জোৎস্না। সাহাবাদ এর পাশের রাজ্য নাসিরাবাদ। সেখান কার একজন সুনামধন্য সুফী এসেছিলেন সাহাবাদ এ। আসরের আয়োজন করা হয়েছিল সেখানে। গোটা মহল আমন্ত্রিত ছিলো। তবে গেছিল কেবল শাহজাদা অরণ্য। তখন রত্নপ্রভার সাথে তার পুরো দমে প্রেমের সম্পর্ক। কিশোরী রত্না অপেক্ষায় থাকে অরণ্যের ফেরার। ততদিনে অরণ্য অনেকটাই শুধরে গেছে। ভাইজান এর সাথে কাজ করে রাজ্যের, রাত করে মহলেও ফেরে না, কথাও বেশ সংযত হয়েছে। শোনা যায় মদ্যপান ও ছেড়ে দিয়েছিলো। সবটাই শাহজাদী রত্নপ্রভার জন্যে সম্ভব হয়েছিল। গোটা জমিদার পরিবার তার ভবিষ্যত নিয়ে আশাবাদী হতে শুরু করলো।”
মিরান একটু দম নিলো। কথায় বিরতি দেওয়ায় মেহেরুন্নেসা বড় অধৈর্য। খানিকটা এগিয়ে আসলো মিরান এর দিকে।
“তারপর কি হলো। বলো”
মিরান পা মেলে বসলো। ফের বলতে শুরু করলো
“সে রাতে অরণ্য শাহ্ ফের মদ পান করে মহলে ফেরে। ফিরেই শুরু করে মাতলামো। তখন আমার বয়স ১৩ । আমার মা মহলে রন্ধন এর কাজ করতো।”

বলতে বলতে মিরান এর চোখে ভেসে উঠে সেই দৃশ্য। অরণ্য ঢুলতে ঢুলতে মহলে ঢুকলো। রত্নপ্রভার পায়ের কাছে বসে মিরান। অরণ্য কে দেখা মাত্রই এগিয়ে গেল রত্নপ্রভা। অরণ্য দেহের তাল সামলাতে না পেরে ঢলে পড়লো প্রভার গায়ে। জাপটে ধরলো তাকে বুকের মধ্যে। প্রভা নিজেকে ছাড়ানোর জন্য হাসফাস করতে লাগলো। এ অবস্থায় কেউ দেখে ফেললে সর্বনাশ হয়ে যাবে। লোকে কি না কি ভেবে বসবে। কান্না জড়ানো কন্ঠে বলল
“তুমি আবার নেশা করে এসেছো?”
অরণ্য জড়ানো হাস্কি স্বরে বলল
“চল না আমরা বিবাহ টা সেড়ে ফেলি। রত্না, অ্যাই রত্না। চল না আমরা স্বামী স্ত্রী হয়ে যাই। তোকে যে আমার বড্ড কাছে টানতে মনে চায়”

অরণ্যের শরীরের উগ্র মদের গন্ধে প্রভার বমি আসার যোগার। কোনো রকমে ওকে ঠেলেঠুলে সরানের চেষ্টা করছে। কিন্তু ওমন হ্যাংলা পাতলা মেয়ে এমন হৃষ্টপুষ্ট তাগড়া যুবককে কতটা বল প্রয়োগ করতে পারে? অরণ্য সরলো না আরো জাপটে ধরলো প্রভা কে। সে এখন নিজের বিবেকে নেই। প্রভা জিদে কান্না করতে করতে বলল
“আসরে মেয়েদের সাথে রঙ্গ করেই তো ফিরলে। আজকের পর থেকে আমার মুখও দেখবে না তুমি। কেউ হও না তুমি আমার আমি না করার পরও ফের নেশা করেছো। অন্য নারী ছুয়ে…..”
প্রভা কথাটা শেষ করার আগেই অরণ্য তড়িৎ গতিতে ছাড়িয়ে নিলো নিজেকে। চেপে ধরলো প্রভার গাল। তবে সেটা খুব জোড়ে না। পাছে ব্যাথা পায়। নেশাক্ত হাস্কি স্বরে বলল
“আমি একজন কে ভালোবাসি। একজকেই মন দিয়েছি। দেহের মালিকানাও সেই একজনের। আমি যে আসরে থাকি সেই আসরে নর্তকী ঢোকা নিষিদ্ধ। আমি কাওকে ছুঁই নি। আমি শুধু তোকে ছুঁতে চাই।”

প্রভার বুকটা ধড়ফড় করছিল। অরণ্যের কথাগুলো নেশায় জড়ানো, তবুও কোথাও যেন সত্যির মতো গভীর। তাকে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু এই অবস্থায় তাকে উঠোনে রেখে দিলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।
চারপাশে দাসী-চাকরদের আনাগোনা। কেউ দেখে ফেললে কী না কী রটবে! প্রভা দ্রুত নিজেকে সামলে নিল।
“ চুপ… আর একটা কথাও না…”
ফিসফিস করে বললো সে, কণ্ঠে উৎকণ্ঠা।
অরণ্য তখনও আধা-নেশাগ্রস্ত চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। ঠোঁটে সেই হালকা হাসি, কিন্তু শরীর পুরোপুরি ভার হয়ে আছে। প্রভা কষ্ট করে তার একটা হাত নিজের কাঁধে তুলে নিল।
“চলো… আমার সাথে…”
ধীরে ধীরে তাকে নিয়ে এগোতে লাগলো করিডোরের ভেতর দিয়ে। মিরান কে বলল শুয়ে পড়তে। আর এই ঘটনা যেন কাওকে না বলে। অরণ্যের পা ঠিকমতো চলছে না, বারবার হোঁচট খাচ্ছে। মাঝে মাঝে আবার প্রভাকেই শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে চাইছে।

“সোজা হয়ে হাঁটো… কেউ দেখে ফেলবে…”
চাপা গলায় ধমক দিল প্রভা, কিন্তু সেই ধমকের ভেতরেও উদ্বেগ স্পষ্ট।
কোনোমতে তাকে নিজের কক্ষের দরজার কাছে এনে থামলো। দ্রুত চারপাশে তাকালো। কেউ নেই নিশ্চিত হয়ে দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো।
দরজা বন্ধ করেই একপ্রস্থ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। অরণ্যকে ধীরে ধীরে বসালো মেঝেতে পাতা নরম গালিচার ওপর।
“বসো… নড়াচড়া করো না…”
অরণ্য হালকা হেসে মাথা নেড়ে যেন সম্মতি দিল, কিন্তু চোখ দুটো আধো বন্ধ। প্রভা দ্রুত কলস থেকে পানি এনে একটা পাত্রে ঢাললো। তারপর কাপড় ভিজিয়ে এনে অরণ্যের মুখে, কপালে আলতো করে চাপতে লাগলো।
“এতবার বলি,এই নেশা ছেড়ে দাও। তোমার কানে যায় না তাই না? যেদিন আমি হারিয়ে যাব। সেদিন বুঝবে”
তার কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছিল। অরণ্য কিছু বললো না। শুধু চোখ বুজে সেই স্পর্শটা অনুভব করছিল। কিছুক্ষণ পর বলল

“কোথায় যাবি তুই?”
“কেন বিয়ে করে অন্য…..
প্রভার কথা শেষ হওয়ার আগেই অরণ্য প্রভার চুলের পিছনে ধরে ওকে নিজের দিকে এগিয়ে এনে ঘাড়ে মুখ গুজলো। খোঁচা খোঁচা দাড়ির ঘষায় প্রভার অদ্ভুত একটা অনুভূতি হয়। তার অনুভূতির বারোটা বাজিয়ে অরণ্য কামড় বসিয়ে দিল তার ফর্সা ঘাড়ে। আউচ করে উঠলো রত্না। অরণ্য ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে বসলো।
প্রভা এবার ঘারে হাত ডলতে ডলতে তার হাত ধরে টেনে তুললো।
“ওঠো… ধুতে হবে।”
কষ্ট করে তাকে পাশে রাখা পানির কাছে নিয়ে গেল। হাত ধরে ধরে তার মুখ ধুইয়ে দিল, চোখে পানি দিল। অরণ্য মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছে ঠান্ডা পানিতে, কিন্তু বাধা দিচ্ছে না। তারপর নরম তোয়ালে তে হাত পা মুখ মুছিয়ে দিল। পালঙ্কে বসিয়ে দিল তারপর।
সবশেষে একটা পেয়ালায় লেবু মিশিয়ে টক পানি বানালো প্রভা। তাড়াতাড়ি এসে তার সামনে বসে পড়লো।

“এটা খাও।”
অরণ্য চোখ কুঁচকে তাকালো।
“ তিতা…”
প্রভা বিরক্ত হয়ে বললো
“তিতা না, ভালো হবে তোমার। খাও।”
নিজের হাতে পেয়ালাটা ঠোঁটের কাছে ধরতেই অরণ্য আর কিছু বললো না। ধীরে ধীরে কয়েক চুমুক খেল। পানি শেষ হতেই তার শরীরটা একটু ঢিলে হয়ে এলো। প্রভা নিঃশ্বাস ফেললো।
তারপর আবার কষ্ট করে তাকে উঠিয়ে পালঙ্কের অপর দিকে নিয়ে গেল। ধীরে ধীরে শুইয়ে দিল নরম বিছানার ওপর। অরণ্য এবার একদম চুপ।
চোখ বন্ধ হয়ে আসছে।
প্রভা একটু দূরে বসে তাকিয়ে রইলো তার দিকে।
এই মানুষটাই কিছুক্ষণ আগে এত বেপরোয়া, এত উচ্ছৃঙ্খল আর এখন ঠিক একটা অবুঝ শিশুর মতো ঘুমিয়ে পড়ছে। তার বুকটা কেমন নরম হয়ে এলো। ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে অরণ্যের কপালের চুলগুলো সরিয়ে দিল।
ফিসফিস করে বললো

“আর কতো কষ্ট দিবে নিজেকে? এসব করে সুন্দর চেহারা খানায় কুৎসিত ছাপ ফেলছো? এত চেষ্টা করি তোমার ওপর রেগে থাকার। আমি বার বার ব্যার্থ হই কেন বলোতো?”
কোনো উত্তর এলো না। শুধু অরণ্যের শান্ত নিঃশ্বাসে ভরে উঠলো পুরো কক্ষ। প্রভা অরণ্যের হাতটা নিয়ে ছোট করে চুমু খেল। তারপর হাতের উল্টোপিঠ তার গালে ছোয়ালো।
পালঙ্কে শুয়ে থাকা অরণ্যের নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠছিল। চোখ দুটো আধো খোলা। তবু তাতে যেন এক অচেনা ঘোর। প্রভা উঠে সরে যেতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই হঠাৎ অরণ্যের হাতটা এগিয়ে এলো। তার কবজি শক্ত করে ধরে ফেললো সে। প্রভা চমকে উঠলো
“এই….”
অরণ্য ধীরে ধীরে উঠে বসল। চোখে সেই নেশা-ঢাকা গভীর দৃষ্টি। যেন ঠিকমতো দেখছেও না, আবার সব দেখছে। এক টানে প্রভাকে কাছে টেনে নিল। প্রভা ভারসাম্য হারিয়ে প্রায় তার বুকে পড়ে গেল।
“ছেড়ে দাও… কেউ দেখে ফেলবে…”
তার কণ্ঠে ভয়, লজ্জা আর জড়তা মিশে আছে।
কিন্তু অরণ্য শুনছে না। তার কণ্ঠ ভারী, জড়ানো তবু অদ্ভুত স্পষ্টতায় ভরা

“তোকে ছোঁয়ার জন্য… আমার আর তর সয় না রে, রত্না। বলছি যে চল বিয়ে টা সেরে ফেলি”
প্রভার বুকটা কেঁপে উঠলো। এই কথাটা এই সুরে সে কখনো শোনেনি। সে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে ব্যাস্ত হলো
“এখন বললে আব্বাজান বিয়ে দিবে তো না ই। উল্টো আমাদের বিচ্ছিন্ন করতে লেগে পড়বে”
অরণ্যের চোখে তখন কোনো বেপরোয়া হাসি নেই। বরং একরকম আকুলতা, একধরনের দহন।
সে আরও কাছে টেনে নিল প্রভাকে।
“সবাইকে জানিয়ে বিবাহ করতে বলেছি? ইসলামি শরীয়াহ মোতাবেক তুই আমি দুজনেই প্রাপ্ত বয়স্ক। আমরা গোপনে বিয়ে করে নি। এখনই কাওকে জানাতে হবে না।”
প্রভা একটু চটে গেল
“তাহলে নিকাহ করে লাভ টা কি? কেউ যখন কিছু জানবেই না। আমি তোমার স্ত্রীর মর্যাদা পাবো না। তোমার বেগম সেজে ঘুরে বেড়াতে পারবো না। তাহলে করবো টা কি?”
“কেন আদর! আদর তো করতেই পারবো”
অরণ্যের মুখে এমন লাগাম ছাড়া নির্লজ্জ কথা শুনে প্রভা হা হয়ে গেলো।
“কি সব বলছো? দেখো তুমি ঠিক নেই। ঘুমাও”
অরণ্য নাছড়বান্ধা

“আরে শোন না। বিয়ে টা হয়ে গেলে, রাতে চুপি চুপি তোর ঘরে যাবো। তোকে মন ভরে আদর করবো। ছুঁয়ে দেখবো। তখন তো আর আমায় দূরে সরাতে পারবি না। তোর ঠোঁট জোড়া আমায় বড্ড টানে রে রত্না। বলতে পারিনা ভয়ে, আবার যদি আমায় দোহলোভী ভাবিস? কিন্তু বিশ্বাস কর, আমার অন্য কারও প্রতি এই টান আসে না রে। কেবল তোর জন্য আসে। আমায় একটু কাছে টানবি? চল বিয়ে টা করি”
প্রভা বুঝতে পারছে অরণ্য নিজের মধ্যে নেই। নেশার ঘোরে ডুবে আছে। এই অরণ্য স্বাভাবিক অরণ্য না।
“অরণ্য তুমি এখন ঠিক নেই। ছেড়ে দাও। কাল নেশা কাটলে কথা বলব এ নিয়ে”
সে আস্তে করে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো।
কিন্তু অরণ্যের বাহু আরও শক্ত হয়ে এলো।
“সবাই বলে আমি ছন্নছাড়া, বাউন্ডুলে”
তার কণ্ঠ ফিসফিসে হয়ে গেল।

“কিন্তু তোর কাছে? আমি শুধু, তোর মানুষ হতে চাই। এই রত্না। বল না। আমি অনেক খারাপ? কেন? তোকে তো ভালোবাসি। তোর কাছে খারাপ মনে হবে কেন? তুই ছেড়ে যাওয়ার কথা কেন বলিস। তুই গেলে আমি মরে যাব”
প্রভার চোখ ভিজে উঠলো। সে হাত বাড়িয়ে অরণ্যের কাঁধে রাখলো, খুব আস্তে
“তুমি আছো না আমার কাছে? আছো তো? আমিও আছি চাঁদ আমার। কোথাও যাব না”
অরণ্য তার মুখের খুব কাছে ঝুঁকে এলো।
প্রভা চোখ বন্ধ করে ফেললো এক মুহূর্তের জন্য।
তারপর হঠাৎই নিজেকে সামলে নিয়ে দুহাতে ঠেলে একটু দূরে সরিয়ে দিল অরণ্যকে।
“না… এখন না…”
তার কণ্ঠ কাঁপছে।
“তুমি নিজের মধ্যে নেই এখন…”

অরণ্য কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। তারপর ধীরে ধীরে মাথাটা নুয়ে এলো।
শরীরটা আবার ঢলে পড়লো পালঙ্কে।
নেশা, ক্লান্তি সব মিলিয়ে সে আর টিকতে পারলো না। প্রভা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো।
তার বুকের ভেতরটা কেমন অদ্ভুতভাবে ধুকপুক করছে। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে আবার তাকে ঠিক করে শুইয়ে দিল। চাদরটা টেনে দিল গায়ের ওপর। একটু দূরে বসে ফিসফিস করে বললো
“আমি আছি, তোমাকে গুছিয়ে নিবো”
তার চোখে জল চিকচিক করছিল। প্রভা অরণ্যকে শুইয়ে দিয়ে সরে আসতে যাচ্ছিল। তার বুক এখনও ধড়ফড় করছে একটু আগের মুহূর্তগুলোর জন্য, অরণ্যের কথাগুলোর জন্য।
ঠিক তখনই
হঠাৎ অরণ্যের হাত আবার তার ওড়না টেনে ধরলো। প্রভা ঘুরে তাকানোর আগেই এক টানে তাকে কাছে টেনে নিল সে।
“ অরণ্য…!”

শব্দটা ঠোঁটেই আটকে গেল। অরণ্য কোনো কথা বললো না। তার চোখ আধো বন্ধ, কিন্তু ভেতরে যেন অদ্ভুত এক জেদ, এক আকুলতা।
এক মুহূর্তে সে প্রভার খুব কাছে চলে এলো…
প্রভা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার ঠোঁট ছুঁয়ে গেল প্রভার ঠোঁট। সময়টা যেন থেমে গেল এক নিঃশ্বাসের জন্য। প্রভা স্তব্ধ। হাতদুটো বাতাসের গতিতে থেমে গেল। তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো অজানা এক অনুভূতিতে লজ্জা, ভয়, আর কোথাও লুকিয়ে থাকা এক অস্বীকার করা যায় না এমন টান। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই খট করে একটা শব্দ হলো।
দরজাটা আচমকা খুলে গেল। প্রভা চমকে সরে গেল তড়িঘড়ি করে। দরজার মুখে দাঁড়িয়ে আছে মারজান বেগম।
“বলি শাহেনশাহ কি ফিরল……”
কথা আটকে গেল তার মুখে। তার চোখদুটো স্থির হয়ে আছে সামনে দৃশ্যের ওপর। কয়েক মূহূর্ত … নিঃশব্দ।
তারপর ধীরে ধীরে তার ঠোঁট বাঁকা হয়ে উঠলো।

“ বাহ…”
শব্দটা যেন বিষ মেশানো। প্রভা তড়িঘড়ি এগিয়ে এলো
“দেখুন ছোট আম্মা, আপনি ভুল বুঝছেন! সেরকম কিছু হয়নি। আমি তো…”
প্রভার কথা শেষ হওয়ার আগেই সজোরে এক চড় বসিয়ে দিলো তার গালে। তার গলা কাঁপছে।
মারজান এক পা এগিয়ে এলো। চোখে তীব্র তাচ্ছিল্য।
“আমি যা দেখেছি… সেটা বুঝতে আমার কারো সাহায্য লাগে না।”
প্রভা তবুও আকুতি করলো
“ না! সে… সে নেশায় ছিল… সে বুঝতে পারেনি। আসলে আমি ওনাকে ঘরে দিতে এসেছিলাম”
প্রভা প্রায় কেঁদে ফেললো। কিন্তু মারজান আর শুনলো না। আরেক ঘা চড় প্রভা কে মারতেই অরণ্য ক্ষেপে গেল। এগিয়ে এসে চেপে ধরলো মারজান এর গলা।
“তোর এত্ত বড় সাহস? বদমাশ মহিলা। তুই আমার রত্নার গায়ে হাত দিস?”
প্রভা ছুটে গেল তাকে থামাতে
“অরণ্য কি করছো? অরণ্য ছেড়ে দাও। ছেড়ে দাও দয়া করে”
কোনো রকমে টেনেটুনে অরণ্যকে সরালো হঠাৎ করেই মারজান ঘুরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠলো
“লোকজন! প্রহরী কেউ আছো?”
তার গলা সারা মহলে ছড়িয়ে পড়লো।
প্রভা স্তব্ধ হয়ে গেল। হাত জোড় করে বলল
“ছোট আম্মা থামুন! দয়া করে…”
সে ছুটে গিয়ে তার হাত ধরতে গেল। মারজান ঝটকা মেরে হাত ছাড়িয়ে নিল।

“দূরে থাকো!”
তার চোখে তখন এক অদ্ভুত আগুন।
“নষ্ট মেয়ে ছেলে। নিজের চাচাতো ভাইয়ের সাথে শুতে লজ্জা করলো না? এর তোমরা দুজনেই পাবে।”
অরণ্যও ঝাড়ি মেরে বলল
“যাও গিয়ে বলো সবাইকে ডেকে। আমি রত্না কে ভালোবাসি। আর আজই নিকাহ করবো। যাও বলো সক্কল কে ডেকে। আমরা কি কি করছিলাম”
মারজান বাঁকা হাসলো। এটা বলার ভুল সে কক্ষনো করবে না। দু’একজন দাসী দৌড়ে এসে দরজার কাছে থামলো। তাদের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেছে। মারজান তাদের দিকে ঘুরে দাঁড়ালো। কণ্ঠে নাটকীয় কাঁপন এনে বললো
“দেখেছো? দেখো তোমরা…!”
একটু থামলো, যেন কথা সাজাচ্ছে। তারপর উচ্চস্বরে বললো—
“এই ছেলে… আমার সাথে জোরজবরদস্তি করেছে! আমার সম্ভ্রম হানি করার চেষ্টা করেছে। আমার ইজ্জত নষ্ট করতে চেয়েছে”
ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে এলো।প্রভার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
“কি…?”

তার ঠোঁট কাঁপছে। মারজান এবার চোখ নামিয়ে আনলো, মুখে ভাঙা ভাঙা কষ্টের ছাপ এনে
“আমাকে এমন প্রস্তাব দিয়েছে… যা আমি মুখে আনতেও লজ্জা পাই। আমি অস্বীকার করলে সে আমায় জোর করেছে”
দাসীরা একে অপরের দিকে তাকালো, ফিসফাস শুরু হয়ে গেল। প্রভা হতবিহ্বল।
“না! এটা মিথ্যে! আপনি কেন এমন মিথ্যা বলছেন? এই এই তোমরা বিশ্বাস করো না এসব। এখানে আমি উপস্থিত ছিলাম। এ…এগুলো সব মিথ্যা। ওনার বানানো গল্প”

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ২৮

তার গলা ভেঙে গেল। কিন্তু মারজানের চোখে তখন বিজয়ের ঝিলিক। সে জানে এই এক মুহূর্তেই সবকিছু বদলে যাবে। একে একে মহলের সবার ঘুম ছুটে গেল। বেড়িয়ে এলো যা যার কক্ষ ছেড়ে। এত রাতে কারা হইচই করছে। ডাকাত পড়লো নাকি মহলে। বাকের শাহ অবিলম্বে ছুটে এলো।
আজকের পর্বটা লিখতে গিয়ে নিজেরই বুকটা কেমন ভারী হয়ে আসছিলো। কিছু কিছু সম্পর্ক কত সুন্দর হয়। কিন্তু তা পরিণতি পায় না। গল্পের চরিত্র দের এই চরম দুঃখ জনক বিচ্ছেদে কাঁদে পাঠিকারা। তারা যদি সত্যি সত্যি থাকতো, তাহলে দেখতে পারতো। কতশত পাঠিকারা তাদের বিচ্ছেদের গল্প শুনে চোখ ভেজায়।

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ২৯ (২)