Home নূর এ সাহাবাদ নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৩৪ (৩)

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৩৪ (৩)

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৩৪ (৩)
জান্নাতুল ফেরদৌস

সন্ধ্যার আগেই রওনা হওয়ার কথা ছিল বাইজিদের। সবকিছু প্রস্তুত ঘোড়া সাজানো, প্রহরীদের নির্দেশ দেওয়া, এমনকি নিজের কক্ষ থেকে বের হওয়ার আগমুহূর্তেও সব ঠিক ছিল।
আজ সে যাবে, সব ভুল বোঝাবুঝির জবাব নেবে, নিজের কষ্টটাও জানাবে।
কিন্তু ঠিক তখনই মহলের ভেতর হঠাৎ হুলস্থুল পড়ে গেল। দৌড়ে এল এক দাসী, মুখ ফ্যাকাসে, কণ্ঠ কাঁপছে
“হুজুর! সিমরান আপা রক্ত বমি করছে!”
বাইজিদের কোনো ভাবান্তর হলো না। বরং কিঞ্চিৎ বিরক্ত হলো
“তাতে আমি কি করবো? বৈদ্য ডাকো”
দাসীটি বলল

“হুজুর, জমিদার বাবু আপনাকে অবিলম্বে তার কক্ষে যেতে বলেছেন”
সে আর এক সেকেন্ডও দেরি করলো না। দ্রুত পা চালিয়ে ছুটে গেল সিমরানের কক্ষে।
ঘরে ঢুকতেই দেখলো মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা লালচে দাগ। সিমরান শয্যার উপর কাঁপছে, ঠোঁটের কোণ বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। দাসীরা আতঙ্কে ছুটোছুটি করছে।
“হাকিম ডাকো! দ্রুত!”
গর্জে উঠলো বাকের শাহ। ঠিক তখনই ঘরে প্রবেশ করলো মারজান। মারজানের চোখে ছিল অন্যরকম এক হিসেবি দৃষ্টি। চারপাশের বিশৃঙ্খলার মাঝেও সে ঠান্ডা মাথায় সব লক্ষ্য করছিল। সে ধীরে ধীরে বাকের শাহ্-এর দিকে ঝুঁকে কিছু বললো। ফিসফিস করে।
কিন্তু সেই কথাগুলোই যেন মুহূর্তে সিদ্ধান্ত বদলে দিলো। বাকের শাহ্ গম্ভীর মুখে সামনে এগিয়ে এলেন।
“বাইজিদ।”
তার কণ্ঠ দৃঢ়। বাইজিদ তাকালো।
“তুমি কোথাও যাচ্ছ না।”
একটা স্পষ্ট নির্দেশ। বাইজিদের ভ্রু কুঁচকে গেলো।
“কিন্তু”
“কোনো কিন্তু নয়,”
থামিয়ে দিলেন তিনি। তার চোখে তখন কঠোরতা
“এই মেয়েটা… আমাদের পরিবারের কেউ না। কিন্তু তার দায়িত্ব আমাদের উপর। এমন অবস্থায় তাকে ফেলে তুমি কোথাও যেতে পারো না।”

মারজান তখন চুপচাপ দাঁড়িয়ে, কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে অদৃশ্য এক সন্তুষ্টির ছাপ। বাইজিদের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো।
কি সব উটকো ঝামেলা এসে তারই কপালে জুটে। সে চোখ বন্ধ করলো এক মুহূর্ত।
বাবার কথা অমান্য করা তার পক্ষে সম্ভব না।
ধীরে ধীরে তার হাত শক্ত হয়ে উঠলো। তার কণ্ঠ নিচু, কিন্তু ভীষণ ভারী
“ঠিক আছে। আমি কোথাও যাচ্ছি না।”
বাকের শাহ্ মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন।
ঘরের ভেতর আবার দাসীদের দৌড়ঝাঁপ শুরু হলো, হাকিম আসার প্রস্তুতি চলছে।
আর বাইজিদ স্থির হয়ে বসে রইলো। চোখের গভীরে তখন অন্য এক অস্থিরতা। ভোর রাতের দিকে ধীরে ধীরে শান্ত হতে থাকে সিমরানের কক্ষ। হাকিমের ওষুধ, দাসীদের যত্ন সব মিলিয়ে অবশেষে তার শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়। কাঁপুনি থামে, চোখ দুটো ভারী হয়ে আসে।
মহলের ভেতর যেন একটা চাপা স্বস্তির ঢেউ বয়ে যায়।
কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ টিকলো না।

সূর্যের প্রথম আলো ওঠার আগেই খবর পাঠানো হলো সবাইকে বৈঠকে ডাকা হয়েছে। মহলের বড় দালানঘরে একে একে জড়ো হলো সবাই। পরিবেশ গম্ভীর, নিস্তব্ধ। কেউ ঠিক বুঝতে পারছে না, এমন হঠাৎ বৈঠকের কারণ কী।
মাঝখানে উঁচু আসনে বসে আছেন বাকের শাহ্। তার মুখে কঠোর স্থিরতা। পাশে দাঁড়িয়ে মারজান, চোখে সেই চেনা হিসেবি দৃষ্টি।
বাইজিদও উপস্থিত, কিন্তু তার মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। সারা রাতের জেগে থাকা, চিন্তা সব মিলিয়ে চোখদুটো ভারী। সিমরানকে ধীরে ধীরে এনে বসানো হলো একপাশে। সে এখনও দুর্বল, তবুও চোখে কৌতূহল আর অজানা ভয়। আরেক পাশে দাঁড়িয়ে আছে নায়েব নেওয়াজে আবিদ।
সবাই যখন চুপ করে বসে, তখন বাকের শাহ্ ধীরে ধীরে কথা শুরু করলেন
“আজকের এই বৈঠক একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত জানানোর জন্য।”
তার কণ্ঠ ভারী, দৃঢ়। সবাই নিঃশ্বাস আটকে শুনছে।

“আমি আমার নায়েব, নেওয়াজে আবিদের সঙ্গে সিমরানের বিবাহ দিতে চাই।”
একটা বাক্য যেন বজ্রপাত হয়ে আছড়ে পড়লো মহলের বৈঠকে। পুরো দালানঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। কয়েক মুহূর্তের জন্য কেউ যেন শব্দ খুঁজে পেল না। সিমরান প্রথমে বুঝতেই পারলো না।
তারপর ধীরে ধীরে কথাটার অর্থ মাথায় ঢুকতেই
তার চোখ বড় হয়ে গেলো। মুখ ফ্যাকাসে। ঠোঁট কাঁপতে লাগলো। বিবাহ…? নেওয়াজের সঙ্গে?
তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ করে মোচড় দিয়ে উঠলো।
শাহজাদা বাইজিদের মুখটা ভেসে উঠলো তার চোখে। সেই মানুষ, যাকে সে কিশোরী বয়স থেকেই নিঃশব্দে ভালোবেসে এসেছে। যার জন্য প্রতিটা দিন অপেক্ষা করেছে।
আজ, তাকে অন্য কারও হাতে তুলে দেওয়া হবে?
তার গলা শুকিয়ে গেলো, কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না।
ওদিকে নেওয়াজে আবিদ, তার মুখের রঙও এক মুহূর্তে পাল্টে গেলো। ফ্যাকাসে হয়ে উঠলো, যেন রক্ত সরে গেছে মুখ থেকে। চোখে এক ঝলক বিস্ময় তারপরই চাপা পড়ে গেলো। কিন্তু সেই বিস্ময়ের পেছনে কী আছে তা বোঝা গেলো না।

সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। কেউ কিছু বলছে না। বাকের শাহ্ নেওয়াজ কে উদ্দেশ্য করে বলল
“কি বলো নায়েব? আমার সিদ্ধান্ত কি তোমার মনে ধরলো?”
আবিদ মাথা নিচু রেখেই বলল
“আপনার সিদ্ধান্তে আমি কখনো দ্বিমত করেছি কি?”
বাকের শাহ্ সন্তুষ্টির হাসি দিয়ে বলল
“তোমার ওপর এই ভরসা টা আমার ছিলো”
বাইজিদও মনে মনে খুশি হলো। এই ঝামেলা টা মহল থেকে বিদায় হবে। সবার দৃষ্টি ঘুরে আছে সিমরানের দিকে সে কী বলে, সেটার অপেক্ষা।
ঠিক তখনই মারজান খুব সূক্ষ্মভাবে সিমরানের দিকে তাকালো। কারও চোখে না পড়ার মতো করে, হালকা করে মাথা নাড়লো সে। চোখের ইশারায় যেন বললো
চিন্তা করো না সব আমি ঠিক করে রেখেছি।
সেই দৃষ্টিতে ছিল অদ্ভুত এক নিশ্চয়তা।
সিমরান এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলো। বুকের ভেতর ঝড় বয়ে যাচ্ছে একদিকে তার বহুদিনের লুকানো ভালোবাসা, অন্যদিকে হঠাৎ করে চাপিয়ে দেওয়া এই সিদ্ধান্ত।
কিন্তু মারজানের সেই আশ্বাস ধীরে ধীরে তার চোখের দোলাচল থামলো। সে ঠোঁট ভিজিয়ে নিলো, তারপর খুব আস্তে করে মাথা তুললো।
“আমিও চাচাজান এর সিদ্ধান্ত কে সম্মান করছি।”
শব্দগুলো বের হলো ধীরে, কিন্তু পরিষ্কার। মুহূর্তেই ঘরের বাতাস যেন বদলে গেলো।
নেওয়াজে আবিদ আবারও মাথা তুললো। তার চোখে এবার স্পষ্ট বিস্ময় এই উত্তরটা সে আশা করেনি। সবাই সমস্বরে বলল

“আলহামদুলিল্লাহ”
বাকের শাহ্ ভীষণ খুশি। প্রহরী দের ডেকে বলল গোটা রাজ্যে ঢ্যারা পিটিয়ে দিতে। এই মহলের মেয়েদের মত জাঁকজমকের সাথেই সিমরান এর বিবাহ সম্পন্ন হবে। বন্ধু কে দেওয়া কথা সে এতকাল রেখেছে। এবার ভালোঘরে মেয়েটাকে পাত্রস্থ করে দায়মুক্ত হবে।
বাইজিদ নিঃশব্দে বসে ছিল এতক্ষণ।
সিমরানের উত্তর শোনার পর তার বুকের ভেতর জমে থাকা এক অদৃশ্য চাপ যেন হালকা হয়ে গেলো।
যাক ঝামেলা ঘার থেকে নামবে। মনে মনে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো সে। অবশেষে এই ঝামেলার একটা শেষ হবে। তার চোখে কোনো আবেগ ফুটে উঠলো না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে যেন নিজেকে মুক্ত মনে করলো। একটা অস্বস্তিকর দায় থেকে, একটা অনিশ্চিত পরিস্থিতি থেকে। মাঝখানে বসে থাকা বাকের শাহ্ ধীরে মাথা নাড়লেন, যেন সবকিছু তার পরিকল্পনা মতোই এগোচ্ছে।
মহলের প্রবেশদ্বারের বিশাল জায়গা দখল করে দাড়িয়ে আছে সেনাপতি বীর মাহাদি। বর্মে আবৃত মুখখানা তার অকপটে হাসলো।

সময় প্রবহমান। কেটে গেছে সাতটা দিন। নদী অঞ্চলের প্রজাদের অবস্থা ভীষণই দুর্বিষহ। টানা পাঁচদিন যাবৎ একটানা ঝড় আর মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। তারা পানিতে নিজেদের আশ্রয় হারিয়েছে। নদী ক্রমশ ফুসে ফুলে উঠছে। সামনে শীত ঋতু। এই সময় শেষ বৃষ্টি একটু ভারি হতে পারে কিন্তু তাই বলে এমন ঝড়ের কারণ কারোরই বোধগম্য হচ্ছে না। রাজ্যের দ্বায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মেহেরুন্নেসার কাছে যেতে পারলো না বাইজিদ।
এই ঝড় বন্যায় বহু মানুষ নিখোঁজ ও নিহত হয়েছে। মেহেরুন্নেসার বাড়ির অবস্থাও খুব একটা ভালো না। কে জানে তারা কি করছে এই ঝড়-বাদলের মধ্যে। সারাক্ষণ স্ত্রীর অনুপস্থিতি পোড়াচ্ছে বাইজিদ কে। কিন্তু যাওয়ার উপায় নেই।
মহলের এক নির্জন অংশে দাঁড়িয়ে আছে নায়েব নেওয়াজে আবিদ। চারপাশে ভোরের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু তার মুখে অদ্ভুত এক চিন্তার ছাপ।
সে প্রহরীকে ইশারা করলো

“মাহাদিকে ডাকো।”
কিছুক্ষণ পরেই সেনাপতি মাহাদি এসে উপস্থিত হলো। তার চলনে আগের মতোই দৃঢ়তা, চোখে সতর্কতা।
“ডেকেছেন?”
সংক্ষেপে জিজ্ঞেস করলো সে।বনেওয়াজ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলো, যেন কথাগুলো গুছিয়ে নিচ্ছে। তারপর ধীরে বললো
“আপনার একটা কাজ আছে।”
মাহাদি ভ্রু তুললো,
“কী কাজ?”
নেওয়াজ একটু এগিয়ে এসে নিচু স্বরে বললো
“আপনি শাহজাদা বাইজিদের কাছে যাবেন… আর তাকে জানাবেন, তার বেগমের দ্বিতীয় বিয়ে দিচ্ছে বাড়ির লোক।”
কথাটা শুনেই মাহাদির মুখ শক্ত হয়ে গেলো।
“কি বললেন?”
কণ্ঠে স্পষ্ট আপত্তি।

“আমি এটা কখনোই করবো না। শাহজাদা কে মিথ্যা বলার মানে জানেন?
সে সোজা হয়ে দাঁড়ালো, চোখে কড়া দৃষ্টি
“মিথ্যা কথা নিয়ে গিয়ে শাহজাদাকে উসকানো আমার কাজ না।”
নেওয়াজ হালকা হাসলো।
“আপনি তো এমনিতেই খুব নীতিবান। তা আমি জানি। তবে এটা না করলে শাহজাদা আর বেগমের দূরত্ব ঘুচবে না। আমাদেরও তো একটা দ্বায়িত্ব আছে, না কি?”
মাহাদি চোখ কুঁচকে তাকালো
“তাহলে কথাটা আপনিই গিয়ে বলুন। আমায় কেন এগিয়ে দিচ্ছেন? আমি কখনোই শাহজাদা কে মিথ্যে বলিনি”
নেওয়াজ একটু কাঁধ ঝাঁকালো।
“মাহাদি, আপনার বলা আর আমার বলা এক নয়। আপনি শাহজাদার বন্ধুর মত। সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ।”
মাহাদির চোখ জোড়া চিকচিক করে উঠলো
“বন্ধু?”
নেওয়াজ ঠোঁট বাঁকালো

“তা নয়তো কি? যে কোনো পরামর্শ, গোপন আলাপ, এমন কি নিজের ব্যাক্তিগত বিষয়ে শাহজাদা সবকিছু যার সাথে আলোচনা করে। সে কি তার বন্ধু নয়?”
মাহাদির কন্ঠ শীতল হয়
“আপনার ধারণা ভুল আবিদ। আমি কেবলই তার কর্মচারী। সে কেবল আমায় দ্বায়িত্ব দেন”
নেওয়াজ ঘামছে এই শীতল পরিবেশেও।
“কিন্তু আপনাকে এই মুহূর্তে দরকার”
“এই ‘দরকার’ এর জন্য যদি মাথা উড়ে যায়, তখন?”
নেওয়াজ মুচকি হেসে বললো
“শাহজাদার কাছে আপনার মাথা এত সস্তা না, মাহাদি। সহজে সে নিতে পারবে না।”
মাহাদি এবার হালকা বিরক্ত হয়ে বললো
“দেখুন, এসব ফাঁদে আমাকে ফেলবেন না। শাহজাদা এমনিতেই রেগে আছে, তার উপর আবার এই খবর! আমি নিজে গিয়ে আগুনে ঘি ঢালবো নাকি?”
নেওয়াজ একটু কাছে এসে দাঁড়ালো, কণ্ঠটা এবার গম্ভীর
“ঠিক সেই কারণেই আপনাকে যেতে হবে। কখনো কখনো আগুন না লাগলে ধোঁয়াও ওঠে না। সত্যটা সামনে আনতে হলে, আগে ওদের নাড়া দিতে হবে।”

মাহাদি চুপ করে রইলো। নেওয়াজ আবার বললো
“যদি আজও বাইজিদ চুপ করে থাকে… তাহলে সে কখনোই ফিরবে না।”
একটু থেমে, নিচু স্বরে যোগ করলো
“আর যদি সে সত্যিই মেহেরুন্নেসাকে ভালোবাসে… তাহলে এই খবর শুনে সে স্থির থাকতে পারবে না।”
কথাগুলো যেন ধীরে ধীরে প্রভাব ফেলতে লাগলো। মাহাদি দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
“আপনি মানুষটা ঠিক না”
নিচু স্বরে বললো সে, কিন্তু কণ্ঠে আগের মতো কঠোরতা নেই। নেওয়াজ হেসে ফেললো
“ঠিক না বলেই তো কাজগুলো করি।”
মাহাদি কিছুক্ষণ চুপ থেকে মাথা নেড়ে বললো
“আচ্ছা… যাবো।”
তার চোখে এবার অন্যরকম এক ভাব
“দেখি, আপনার এই চাল কতদূর যায়।”
নেওয়াজ সন্তুষ্ট হয়ে মাথা নাড়লো।
বর্মে আবৃত মাহাদি ধীর পায়ে এগিয়ে এল শাহজাদা বাইজিদের কক্ষের সামনে। প্রহরীরা তাকে দেখে সরে দাঁড়ালো। দরজা খুলতেই ভেতরের ভারী, স্তব্ধ পরিবেশটা যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠলো।
কক্ষের ভেতর আধো আলো। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে বাইজিদ। মুখে ক্লান্তি, চোখে গভীর দুশ্চিন্তার ছাপ যেন সারা রাত ঘুম তার চোখে আসেনি। মাহাদি ভেতরে ঢুকে মাথা নত করলো।

“হুজুর।”
বাইজিদ ঘুরে তাকালো, চোখে বিরক্তির রেখা।
মাহাদি নিয়ম মেনে বলতে শুরু করলো
“নদী অঞ্চলের প্রজাদের অবস্থা খুব খারাপ, হুজুর। বন্যার পানি নামার নামও নিচ্ছে না। পানি নেমে গেলেও খাদ্যের সংকট এত সহজে যাবে না”
বাইজি গম্ভীর গলায় বলল
“ভান্ডারে যা আছে সর্বস্ব দিয়ে হলেও প্রজাদের রক্ষা করবো আমি। কাল থেকে মজুদ কৃত শস্য তাদের মধ্যে বিলি করা শুরু করো”
মাহাদি নতশিরে বলল

“হুজুর আরেকটা কথা”
অসহায় স্বরে থামিয়ে দিলো বাইজিদ। তার ভ্রু কুঁচকে গেছে, চোখে অস্থিরতা স্পষ্ট।
“আমার আর কিছু শোনার মত মানসিক অবস্থা নেই মাহাদি। তুমি যেতে পারো”
সে মুখ ফিরিয়ে নিলো, কণ্ঠে বিরক্তি
“পরে জানিও।”
মাহাদি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। যেন ভেতরে একটা দ্বিধা কাজ করছে। তারপর ধীরে, খুব নিচু স্বরে বললো
“হুজুর… আরেকটা খবর আছে।”
বাইজিদ আর তাকালো না।

“আমি বলেছি, এখন নয়”
মাহাদি এবার কথাটা কেটে দিয়ে বললো
“খবর পেয়েছি… বেগমের দ্বিতীয় বিবাহ দিচ্ছে তার বাড়ির লোক।”
একটা বাক্য।
কিন্তু সেই বাক্য যেন বজ্রপাত হয়ে আঘাত করলো। বাইজিদ হঠাৎ স্থির হয়ে গেলো।
তার শরীর যেন এক মুহূর্তে শক্ত হয়ে উঠলো। ধীরে ধীরে সে ঘুরে তাকালো মাহাদির দিকে।
চোখ দুটো বিস্ফারিত।
“কি… বললে?”
তার কণ্ঠ কাঁপছে।
মাহাদি মাথা নিচু করে রইলো, আর কিছু বললো না। এক মুহূর্তও স্থির থাকতে পারলো না বাইজিদ। মাথার ভেতর শব্দটা বারি খাচ্ছে যেন।
দ্বিতীয় বিবাহ?

“কি যা তা বলছো তুমি? ওর দ্বিতীয় বিয়ে কি করে হয়? ও এখনো আমার স্ত্রী। আমার সাথে কি তালাক হয়েছে ওর? যে আবার বিয়ে করবে”
মাহাদি চুপচাপ কক্ষ থেকে বেড়িয়ে গেলো।
বাইজিদ টেবিলের ওপর থাকা বড় পিতলের ফুলদানি টা ছুড়ে মারলো কক্ষের বিশাল আয়নায়। কোনো ভাবেই রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। এক ঝটকায় কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলো সে। প্রহরীদের কোনো নির্দেশ দেওয়ার প্রয়োজনই হলো না, তার চোখের ভাষাই সব বলে দিচ্ছিল। দ্রুত আস্তাবলের দিকে এগিয়ে গিয়ে নিজের শ্বেত অশ্ব সিমুর্গ-এর লাগাম হাতে নিলো।
ঘোড়াটা যেন তার উত্তেজনা বুঝতে পারছিল। পা ঠুকছে, হ্রেষাধ্বনি করছে।
বাইজিদ এক লাফে পিঠে উঠে বসল।

“চলো!”
এক টানে লাগাম ছেড়ে দিতেই সিমুর্গ বিদ্যুৎগতিতে ছুটে বেরিয়ে গেলো। পেছনে অল্প সংখ্যক অশ্বারোহী অনুসরণ করলো। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পেলো না।
রাস্তাঘাট এর কাদা পানি সবকিছু পেছনে পড়ে যেতে লাগলো। বাইজিদের চোখে তখন একটাই লক্ষ্য মেহেরুন্নেসার কাছে পৌঁছানো।
সময় যেন তার শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব পৌঁছাতে হবে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ছুটে চলার পর, রাজ্যের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছালো তারা। সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে, আলোটা নরম হয়ে এসেছে। প্রায় বিকেল গড়িয়ে গেছে।
বাইজিদ ঘোড়া থামালো। তার সামনে মেহেরুন্নেসার পিতার বাড়ি। এক মুহূর্ত দেরি না করে সে নেমে পড়লো। বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা যেন কানে বাজছে। ধীরে ধীরে উঠোনের দিকে এগিয়ে গেলো। আর সেখানে দেখলো তাকে।
মেহেরুন্নেসা মাথা নিচু করে ঝাড়ু দিচ্ছে উঠোনে। সাদামাটা পোশাক, মাথায় হিজাব বাধা, চোখে ক্লান্তির ছাপ। এক সময়ের মহলের বেগম আজ সাধারণ এক মেয়ের মতো কাজ করছে।
বাইজিদের পা থেমে গেলো। কই বাড়িতে তো লোকজন দেখছে না। বাড়িটা সাজানোও না। কোনো বিয়ে বাড়ি তো মনে হচ্ছে না।

তার চোখ ধীরে ধীরে নেমে এলো মেহেরুন্নেসার হাতের দিকে। নরম, কোমল সেই হাত আজ ফোসকায় ভরা।
ঝাড়ুর আগার ঘষায় লাল হয়ে উঠেছে চামড়া, কোথাও কোথাও চামড়া উঠে গেছে।
এক মুহূর্তে তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো।
এই দৃশ্য সে কল্পনাও করেনি।
মেহেরুন্নেসা তখনও খেয়াল করেনি তার উপস্থিতি। সে নিজের কাজে ব্যস্ত। ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি হঠাৎই উঠোনের নীরবতা ভেঙে দিল।
মেহেরুন্নেসার হাত থেমে গেল এক মুহূর্তের জন্য। ঝাড়ুটা হাতে নিয়েই সে ধীরে ধীরে মাথা তুললো।
চোখ গিয়ে পড়লো সদর দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা শ্বেত অশ্বের উপর। আর তার পাশে দাড়িয়ে
বাইজিদ।
তার বুকের ভেতরটা যেন ধক করে উঠলো। এতদিনের অপেক্ষা, কষ্ট, অভিমান সব একসাথে মাথা তুলে দাঁড়ালো।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই তার চোখের আলো নিভে গেল। মুখের অভিব্যক্তি কঠিন হয়ে উঠলো। সে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিলো। যেন দেখেইনি তাকে।
ঝাড়ুটা নিয়ে আগের মতোই ঝাড় দিতে শুরু করলো, কিন্তু হাতের গতি বদলে গেছে আরও জোরে, আরও অস্থিরভাবে।

তার বুকের ভেতর তখন তোলপাড়। তার স্বামী এসেছে এতদিন পর কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই অন্য একটা চিন্তা এসে সবকিছু ঢেকে দিল, দ্বিতীয় বিবাহ।
এই খবরটা এখন আর গোপন নেই। জমিদার বাড়ির ঘোষণাটা গোটা রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। চারদিক থেকে একটাই কথা সে শুনেছে, জমিদার মহলে বিবাহ। এইতো কদিন আগে ঢাকি এসে ঢোল পিটিয়ে বাতাসা খেজুর বিলিয়ে বলে গেলো
বাইজিদ নাকি দ্বিতীয় বিয়ে করছে।
আর সেই কথাই বারবার তার কানে ঢুকিয়ে দিয়েছে বাড়ির সবাই।
“তোর স্বামী তোকে রেখে আরেকটা বিয়ে করছে…”
“এখন আর তোর দরকার কী তার কাছে…”
প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেনি সে।
কিন্তু দিন যত গড়িয়েছে খবরটা ততই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আজ সে নিজ চোখে তাকে দেখছে। তবুও তার মনে হচ্ছে, এই মানুষটা আর আগের সেই মানুষ না। তার ঠোঁট কেঁপে উঠলো, কিন্তু সে মাথা নিচু করে রাখলো। চোখের কোণে পানি জমেছে তবুও মুছলো না। এখন কেন এলো…? আমাকে এই অবস্থায় দেখে দয়া করতে? নাকি বিদায় জানাতে? তার ভেতরের ভালোবাসা আর অভিমান লড়াই করছে।
কিন্তু সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সে সহজে ভাঙবে না।
ঝাড়ু দিতে দিতে তার হাতের ফোসকাগুলো আবার ঘষা খেলো। ব্যথায় চোখ বন্ধ হয়ে এলো এক মুহূর্তের জন্য। তবুও থামলো না।

বাইজিদ দাঁড়িয়ে আছে, নিঃশব্দে বুঝতেই পারছে না, কেন তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা তাকে দেখেও না দেখার ভান করছে। দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে ভুল বোঝাবুঝি। আর না বলা অসংখ্য কথা। জমিদার মহলে সিমরান এর বিয়ের ঘোষণা দিয়েছে ঢাকি। কিন্তু তার বাড়ির লোক তার কানে দিয়েছে বাইজিদ এর বিয়ে। নাসিরাবাদ এর বড় শাহজাদা রমলা আর মল্লিকার হতে বড় মাপের মুদ্রার থলি তুলে দিয়ে বলেছে মেহেরুন্নেসা কে যে কোনো মূল্যে বিবাহ করতে চায়। এজন্যই মেয়ের কানে বিষ তুলেছে বাইজিদ এর নামে।
বাইজিদ বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে গেলো মেহেরুন্নেসার কাছে । সটান হয়ে দাড়ালো মেহেরুন্নেসার সামনে। মেহেরুন্নেসা ঝাড়ু ফেলে বাইজিদ এর দিকে তাকালো। কতদিন পর প্রাণপ্রিয় স্বামীকে দুচোখ ভরে দেখলো। ইচ্ছে করছে এক্ষুনি গিয়ে তার বক্ষপটে আছড়ে পড়তে। কিন্তু মাঝে যে এক অদৃশ্য অভিমানের দেওয়াল। মেহেরুন্নেসা ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে।
একি হাল হয়েছে লোকটার। অমন সুদর্শন চেহারা খানায় শোকের ছাপ। নিজের চোখের জল টুকু আড়াল করে বলল
“কেন এসেছেন এখানে? দেখতে আমি বেঁচে আছি কিনা মরে গেছি? ও….ওহহহহ। আমি তো ভুলেই গেছি”
মেহেরুন্নেসার কথায় তাচ্ছিল্য।

“তালাক নামা পাঠিয়ে ছিলেন। সই করিনি, বলেছি আপনি আসলে করবো। সেই জন্যে আসা হয়েছে নিশ্চয়ই? দ্বিতীয় বিবাহ করছেন, এখন তো তালাক প্রয়োজন। তবে আপনি তালাক না দিলেও কখনো স্ত্রীর অধিকার দাবি করে গিয়ে দাঁড়াতাম না আপনার মহলে শাহজাদা”
বাইজিদ নিশ্চুপ নিরুত্তর। মেহেরুন্নেসার চোখের পানি আর বাধ মানলো না। ঝরঝর করে পড়লো মুক্তো দানার মতো। অভিযোগ আর তিক্ততা মিশিয়ে বলল

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৩৪ (২)

“আমাকে যদি ভুলই বুঝবেন তাহলে কেন আমায় বিয়ে করেছিলেন? কেন এত কাছে টানলেন? ভালো বাসতে বাধ্য করলেন আমায়। আপনার গায়ের গন্ধ না মেখে ঘুমাতে পারি না। এই যে দেখুন, দেখুন না শাহজাদা। কত রাতের নিদ্রাহীন আমি। মহল থেকে পরা পোষাক গুলো ঢিলে হয়ে গেছে। অসুন্দর হয়ে গেছি, এখন তো আর দেখবেন না। কেন দেখবেন এখন?”
এক নাগাড়ে কথা গুলো বলে চোখ মুখ মুছলো মেহেরুন্নেসা।
“কোথায় তালাক নামা? দিন, দিন আমায়। সই করে দিচ্ছি।”

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৩৫