নোলকের নতুন শাড়ি পর্ব ৩
ইলোরা ফারদিন
বাসার অবস্থা থমথমে। বৈঠক ঘরের এক কোণে থমথম মুখে বসে আছেন ফরিদা বানু। অন্যদিকে রতন রতনের স্ত্রী আরেক কোণে দাঁড়িয়ে আছে।
এদিকে মিনু বিরবির করে কাদছে। আজ সন্ধ্যায় তার গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান। বড় ভাই নাকি টাকা দিবে না, মেঝ ভাই তো আগেই হাত গুটিয়ে রেখেছে, মাও কিছু বলছে না। তার উপর তার ভাবি এখন ঘর ভর্তি মেহমানের সামনে গহনার হিসাব নিতে বসেছে।
বিনু উপায় না পেয়ে হাসানের কাছে কাদতে কাদতে বলল,” ভাইয়া আমার ছাদ ঢালাইয়ের কাজে টাকা কম পরেছিল। বাধ্য হয়ে ভাবির গহনা গুলো বিক্রি করেছিলাম। আমি কি ভাবির পর বলো? ভাবিকে তো আমি নিজের বোনের চোখেই দেখি।আমার বিপদের দিন নাহয় ভাবির গহনা কাজে লাগিয়েছি, তাই বলে তোরা এভাবে অপমান করবা?
শুনো ভাইয়া, মুন্নির বাপের ব্যবসায় এখন একটু সমস্যা চলছে। ছয় মাস পরেই আমি তিন ভরি গহনা ভাবিকে বানিয়ে দিব। কিন্তু মনে রাখিও ভাই, আমি এই অপমান ভুলব না। সেই গহনা ফেরত দেয়ার সাথে সাথেই তোমার সাথে আমার সব সম্পর্ক শেষ করব।”
“তাই নাকি বিণু আপা? আমার যতদূর মনে আছে তুমি ছয় বছর আগে ওই গহনা আমার কাছে ধার নিয়েছিলে তোমার ননদের বিয়েতে পরবে বলে। তারপর বিয়ে শেষে ফেরত দিলে না কেনো? এর আরও দুই বছর পর তোমার বাসার ছাদ ঢালাই দিয়েছিলে।
আমার জানা মতে, তোমার বিয়েতে আমার শ্বাশুড়ি তোমাকে পুরো পাচ ভরি স্বর্ণ দিয়েছিল। ওগুলো তো ঠিকি এখনো পরে ঘুরে বেড়াও। তাহলে আমার বাপের দেয়া গহনা বিক্রি করলে কোন সুখে?
শুনেন আপা, আমি ওতশত কথা বুঝি না। আমার গহনা দিতে না পারলে আমাকে তিন ভরি সমান গহনা দেও। তোমার তো আবার গহনার অভাব নেই। আর তা না হলে আমি কিন্তু এখনি পুলিশ ডাকব। মিতুর বিয়ে টাও ভাঙবে।” নোলক কাট কাট স্বরে জবাব দিল
মিতু এবার না পেরে ওর মায়ের কাছে গিয়ে কাদতে কাদতে বলল,” ও মা, ভাবিকে পুলিশ ডাকতে নিষেধ কর না। আমার বিয়েটা ভেঙে যাবে মা।”
ফরিদা বানু বাধ্য হয়ে ছেলের দিকে তাকি বলল,” হাসান এখনো চুপ থাকবি তুই? এই মা*গিরে ক এখনি থামতে। গোলম হইছস বউয়ের? কাল রাইতে মনে হয় ভালোই জ্বালা মিটাইতে তোর। তার জন্য সক্কাক সক্কাল তোর নতুন রূপ দেখতে হচ্ছে।
শুন , এই মা*গিরে এখনি থামা। নাহলে কিন্তু ঘাড়ে ধা*ক্কা দিয়ে এরে বাড়ি থেকে বের করবো। তখন এরে ব্যা*স্যা পল্লিতেও কেউ জায়গা দিবে না।”
মায়ের কুরুচিপূর্ণ কথায় লজ্জায় মাথা নত করলো হাসান। মায়ের ভাষা যে এতোটাও নোংরা হতে পারে তা তার কল্পনারও বাহিরে ছিল। সবাই সত্যিই বলে মানুষ তার আসল বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে যখন সে রেগে থাকে।
এদিকে নোলক এক পলক তাকায় স্বামীর দিকে। স্বামীকে চুপ থাকতে দেখে তাচ্ছিল্য হাসে। মনে মনে ভাবে এবারও বুঝি তার স্বামী কাপুরুষের মতো চুপ করে থাকবে। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে হাসান বলে,” আমার স্ত্রী, আমার সন্তানদের মাকে নিয়ে দয়া করে এতো নোংরা কথা বলো না মা। আমি সহ্য করব না।
আর নোলকের বাপের দেয়া গহনা বিক্রির আগে বিণুর ভাবা উচিত ছিল আম্মা। হয় বিণু তিন ভরি সম পরিমাণ গহনা ফেরত দিবে। নাহলে আমি নিজেই নোলকের হয়ে পুলিশ ডাকব।”
ছেলের কথায় আকাশ থেকে পরলেন ফরিদা বানু।
এদিকে বিণুও ভাইয়ের কথায় অবাক হলো। রাগে সে ঘরে যেয়ে হাতে কিছু গহনা নিয়ে এসে নোলকের মুখে ফিকে মারলো। হিসহিসিয়ে বলল,” এখানে তিন ভরির বেশি আছে, যা আছে সব নিয়ে নাও। তোমার মতো আত্মা ছোট না আমার।”
নোলক একটা গহনাও ছুইলো না। মুচকি হেসে তার দূরসম্পর্কের ভাতিজাকে বলল,” রণি যা তো বাবা, বাড়ির মোড়েই স্বর্ণকারের দোকান আছে। ওখান থেকে চন্দন কাকাকে নিয়ে আয়। বলবি সোনা পরখের আর ওজনের জিনিসপত্র নিয়ে আসতে।”
রণিও আদেশ মেনে বেরিয়ে গেল।
এদিকে বিনু ঘামতে শুরু করলো। থমথম খেয়ে বলল,” বাহিরের মানুষের সামনে আর নাটক করো না ভাবি। এ বাসার মান সম্মান সব খোয়াবে। ভাইয়া এখনি কি চুপ থাকবে তুমি? তোমার বউ আমাকে মিথ্যুক প্রমাণ করতে চায়। আমি কি নকল গহনা দিব?”
” যেহেতু গহনা তোর ভাবির, তা পরীক্ষা করার অধিকার তার আছে। আমি এ ব্যাপারে কোনো কথা বলতে চাই না।” নির্লিপ্ত ভাবে উত্তর দিল হাসান।
এরই মধ্যে বাসায় আসলো চন্দন কাকা। গহনা পরীক্ষা করে বলল, ” নোলক মা, এগুলো একটাও স্বর্ণ না, সব সিটিগোল্ড!”
সাথে সাথে সবাই ছি ছি শুরু করে দিল। শুরু হলো ফিসফিসানি বোনের কান্ডে হাসান অবাক হলো
কিন্তু বিণু তবুও না দমে নাটক করে বলল,” কি বলেন চন্দন কাকা, তার মানে…
” থামেন বিণু আপা, এসব নাটক আর সহ্য হচ্ছে না। আমি এগুলো দেখেই বুঝেছিলাম এগুলো নকল। ভেবেছিলেন এগুলো দিয়ে আমার মন ভুলাবেন। পরে ধরা পরলে অস্বীকার করবেন? আপনাকে চেনা আছে আমার। ভালোয় ভালোয় তোমার সোনার গহনা বের করো, নাহয় আমি এখনি পুলিশ ডাকছি।”
বাধ্য হয়ে বিনু নিয়ের স্বর্ণের গহনা নিয়ে আসল। চন্দন কাকা পরখ করে তিন ভরি নোলককে দিয়ে বাকি গুলো বিনুকে ফেরত দিল।
নোলক স্বর্ণ নিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল। বিণুও কাদতে কাদতে বাচ্চাদের নিয়ে তার ঘরে গেল। সে আছে ভয়ে। তার স্বামী যদি স্বর্ণ কাহিনী জানতে পারে তাহলে তার রক্ষে নেই।
এদিকে হাসান ঘরের যেতে নিলে তার মা তাকে আটকায়। গম্ভীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,” তুই কি মিনুর বিয়েতে কোনো টাকাই দিবি না? ”
নোলকের নতুন শাড়ি পর্ব ২
হাসান কাট কাট কন্ঠে জবাব দেয়, “না” বলেই সে ঘরে চলে যায়।
এদিকে এসব ঘটনায় একদম চুপচাপ ছিল রতন আর তার স্ত্রী। ফ্রি ফ্রি সিনেমা দেখছিল তারা। তারা ভালোভাবেই জানে এখানে কিছু বললে দায়িত্বের বোঝা পরে তাদের ঘাড়েই পরবে। কে আবার খাল কাটে কুমির আনতে চায়
