Home নোলকের নতুন শাড়ি নোলকের নতুন শাড়ি পর্ব ৪

নোলকের নতুন শাড়ি পর্ব ৪

নোলকের নতুন শাড়ি পর্ব ৪
ইলোরা ফারদিন

বিয়ের কার্যক্রম আবার আগের নিয়মে শুরু হয়েছে। ফরিদা বানু ব্যংকে যেয়ে টাকা তুলে এনেছেন। মন মেজাজ ভালো নেই তার।
এদিকে হাসান চুপচাপ রূমে বসে আছে। তখন রাগের মাথায় বলেছিল যে মিনুর বিয়েতে এক টাকাও খরচ করবে না। কিন্তু এখন মনটা খারাপ তার। যতই হোক, মিনু তার বোন। মিনুর প্রতি তার একটা দায়িত্ব আছে না!
হাসানের চিন্তার মাঝেই নোলক ঘরে আসলো। তারপর হাসানের দিকে তাকিয়ে বলল,” এতো অনুশোচনা করার দরকার নেই। যেই বোনের কথা চিন্তা করে হাশেম ভাইয়ের কাছে সাত লাখ টাকা ধার নিতে চেয়েছিলেন, আপনার সেই প্রিয় বোন দেখেন আপনাকে ছাড়াই নিজের গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে নাচ গান করছে।
রতন ভাইও তো টাকা দিতে চাই নি। কই তার প্রতি তো কারো কোনো রাগ বা ক্ষোভ নেই। তাহলে আপনার প্রতি এতো রাগ কিসের?

এই বোনের শখের ফোন কিনতে নিজের মেয়ের কানের দুলের জন্য জমানো টাকা খরচ করেছিলেন মনে আছে? আমি কিন্তু ভুলি নি। কত কষ্টে ওই টাকা আমি জমিয়েছিলাম আমি জানি। কই এখন আপনার সেই বোন? সারা জীবন গাধার মতো এই ভাই বোন গুলোর জন্য খেটেছেন। বিনিময়ে কি পেলেন?
মাথায় একটা কথা গেথে রাখেন। আপনি মরলে আপনার বউ বাচ্চাকে রাস্তায় ভিক্ষা করে খেতে হবে। এখন অন্তত ভাই বোনের চিন্তা বাদ দেন। সবাই সবার জীবনে এখন প্রতিষ্ঠিত। আপনার মায়েরও ব্যংক ভর্তি টাকা। এবার নিজের বউ সন্তানদের কথা ভাবেন। ব্যংকে এক টাকাও নেই আপনার। এখন যদি হুট করে বাচ্চারা অসুস্থ হয় বা কোনো বিপদ হয়, আপনার কি মনে হয় আপনার এই মা ভাই বোনেরা টাকা দিবে? হাহ! ভুলে যান সেই কথা। এক টাকাও কেউ দিবে না। সবাই নিজ নিজ ভাগ আগেই গুছিয়ে নিয়েছে। আপনার জন্য রেখেছে আন্ডা! ”
বলেই নোলক বাচ্চাদের রেডি করতে শুরু করলো। বড়দের যতই ঝামেলা হোক না কেন, বাচ্চাদের আনন্দ মাটি করতে রাজি নয় নোলক!

ঘরে একা বসে আছে নোলক। ওসব গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে যাওয়ার তার রুচি নেই।
চোখ বন্ধ করতেই নোলকের চোখে ভেসে উঠলো বিগত ছয় মাসে ঘটা প্রতিটি ঘটনা।
ছয় মাস আগে বিয়ে করে নোলকের দেবর রতন। কিন্তু রতনের বিয়ের পর থেকেই নোলকের চোখে ধরা দেয় ভিন্ন এক কাহিনী। যেখানে বিয়ের পরের দিন থেকেই নোলকের কাধে চাপিয়ে দেয়া হয় সংসারের দায়িত্ব, সেখানে রতনের স্ত্রীকে ওর শ্বাশুড়ি ভুলেও কোনো কাজ করতে বলতো না। রতনের স্ত্রী হুকুম করতো আর নোলক সে অনুযায়ী কাজ করতো। এমনকি সকালে রতনের বউয়ের গ্রিণ টিও নোলককে বানাতে হতো। ফরিদা বানু নোলকের প্রতি যতটা কঠোর ছিলেন, রতনের বউয়ের বেলা ততটাই নরম।
অন্যদিকে নোলকের ননদরাও রতনের বউয়ের জন্য পাগল ছিল।
নোলক তখন প্রথম বারের মতো ভাবতে শুরু করে নিজেকে নিয়ে। এতোগুলা বছর এই সংসারের জন্য খেটেও সে কারো মন পায় নি। তার স্বামীও সবার জন্য এতো করেও দিনশেষে তাদের হাত ফাকা। অন্যদিকে রতন ঠিকি টাকা জমাচ্ছে, বউকে নিয়ে ঘুরছে। কিন্তু সংসারে এক টাকাও দেয় না।
নোলক বুঝেছিল, এই সমাজটা শক্তের ভক্ত, নরমের জম। তাই তো সে প্রতিবাদ করেছিল।
নোলকের চিন্তার মাঝেই বাহিরে চেচামেচির শব্দ হলো। তাই সে তাড়াতাড়ি দৌড়ে বাহিরে গেল। যেয়ে দেখে তার মেয়েটা কাদছে।
নোলক মেয়েকে নিয়ে বুকে নিতেই বাচ্চাটা বলল,” মা আমি শুধু মাত্র একটু কেক নিয়েছিলাম, ফুপি আমাকে থাপ্প*ড় মেরেছে।”

ততক্ষণে হাসানও সেখানে উপস্থিত হয়। অবাক হয়ে জানে চায় পাচ বছরের বাচ্চাটার গায়ে হাত তোলার মানেটা কি।
মিনু স্বার্থপরের মতো বলে, ” অনুমতি ছাড়া কোন সাহসে তোমার মেয়ে আমার গায়ে হলুদের কেকে হাত দিল। বাসায় এতোগুলা মেহমান। চোর একটা। ”
নোলক সবাইকে অবাক করে দিয়ে মিনুর গালেও থা*প্পড় বসিয়ে দিল। তারপর যেয়ে টেবিলের উপরে রাখে পুরো কেক মাটিতে ফেলে দিল। এরপর মুহুর্তের মাঝে সোফায় রাখা মিনুর ফোনটা আছাড় মেরে ভেঙে ফেললো। তারপর হিসহিসিয়ে বলল,” এই কেকটার অর্ডার দেয়ার সময় আমার স্বামী টাকা দিয়েছিল। তাই এটা যদি আমার বাচ্চা খেতে না পারে, তাহলে কেউ খাবে না।
এই ফোনটা আমার স্বামীর টাকায় কেনা, তাই এটাও তোমার ব্যাবহার করার অধিকার নেই।”
এরপর আবারও সবাইকে অবাক করে দিয়ে পাকের ঘরে গিয়ে গ্যাসলাইটার হাতে নিয়ে দৌড়ে মিনুর ঘরে ঢুকে বাহির থেকে দরজা লাগিয়ে দিল।
জিনিসগুলো এতো তাড়াতাড়ি ঘটলো যে কেউ কিছু বুঝে উঠতেই পারলো না। তারপর সবার যখন হুশ এলো সবাই যেয়ে দরজায় বারি মারতে লাগলো।

এদিকে নোলক মিনু সাজগোজের জিনিস, নতুন পুরাতন সব পোশাক, বই পত্র সব কিছু জোড়ো করে আগুন লাগিয়ে দিল। শুধু বাদ রাখলো মিনুর হবু শ্বশুর বাড়ি থেকে আসা বিয়ের পোশাক।
তারপর দরজা খুলে বেরিয়ে বলল, ” আমার স্বামীর টাকায় কেনা সব পুড়িয়ে দিয়েছি। এরপর থেকে আমার বাচ্চার গায়ে হাত তোলার আগে দশবার ভাববে মিনু।” বলল নোলক
” এসব কেনো করলে ভাবি? ” কানতে কানতে জিজ্ঞেস করলো মিনু
“যেকারণে তুমি আমার ছোট্ট বাচ্চাটার গায়ে হাত তুলেছে, ঠিক সে কারণেই আমার স্বামীর টাকার জিনিস আমি নষ্ট করেছি।” বলেই স্বামী সন্তানকে নিয়ে ঘরে চলে গেল নোলক।
হতবাক হয়ে চেয়ে রইলো সবাই।

নোলকের নতুন শাড়ি পর্ব ৩

এদিকে রূমে ঢুকে মিনু দেখে তার পুরোনো সব ব্যবহারের পোশাক, বিয়ে উপলক্ষে কেনা নতুন পোশাক, ঘুরতে যাওয়ার দামি পোশাক সব আগুনে পুড়ে ছাই। তার দামি মেকাপের জিনিস কিচ্ছু বাকি রাখে নি। এমনকি শখের ড্রেসিং টেবিলটাও জায়গায় জায়গায় ভাংগা। শুধু ছেলে পক্ষ থেকে পাওয়া বিয়ের জিনিসপত্র নোলক অক্ষত রেখেছে।
নিজের শখের জিনিস গুলোর করুণ অবস্থা দেখে কান্নায় ভেঙে পরলো মিনু। এদিকে সবাই অবাক হয়ে চেয়ে আছে। শান্তশিষ্ট নোলক যে এতোটা ভয়ংকর হতে পারে, তা কারো ধারণারও বাহিরে ছিল।
অন্যদিকে ছেলে পক্ষ যে এসেছিল তা কেউ জানতেও পারে নি। সবাই ব্যস্ত ছিল ঝগড়া নিয়ে।
ছেলেপক্ষ হলুদ নিয়ে এসেছিল। এসে দেখে এ বাসায় ঝগড়াঝাটি চলছে। যখন কারণ শুনলো সবাই অবাক হলো। সামান্য কেক খাওয়ার অপরাধে আপন ভাতিজির গায়ে হাত কি করে তুলে একটি মেয়ে। আর কিছু না বলে তারা ওভাবেই দরজা থেকেই ফিরে যায়…

নোলকের নতুন শাড়ি পর্ব ৫