Home পৌষপার্বণ পৌষপার্বণ পর্ব ২২ (২)

পৌষপার্বণ পর্ব ২২ (২)

পৌষপার্বণ পর্ব ২২ (২)
Irfa Mahnaj

পৌষ পার্বণ একই ক্লাস বিভাগ হলেও ওদের দুজনের সেকশন আলাদা। যার জন্য দুজনকে আলাদা আলাদা ক্লাস রুমে যেতে হবে।
পার্বণ বিষয়টা মানতেই পারছে না। কিন্তু পৌষ ওকে বুঝিয়ে শুনিয়ে পাঠায়। পার্বণ যতই ভণ্ডামি করুক, দুস্টুমি করুক পৌষের প্রতি ও যত্নশীল।
আর এখন তো আরো পৌষ মা হতে যাচ্ছে ওর বাচ্চার মা। আর ও বাবা!হ্যা বাবা হবে সেও। হাসি তামাশা করা ছেলেটার ভিতরটাও প্রশান্তি প্রশান্তি অনুভব হচ্ছে।
বাবা হওয়ার অনুভূতি বুঝি এতো টা সুন্দর হয়? কেমন জানি প্রাপ্তি প্রাপ্তি বোধ হচ্ছে। হাসছে পার্বণ।
গা দুলিয়ে নয়। নীরবে মুচকি হাসছে। পুরো ক্লাস মাতিয়ে রাখা ছেলেটা যখন নীরব হয়ে যায় না? তখন সেটা সবার নজরে পড়ে।
ওদের ক্লাস নেওয়া টিচার গুনগুন ও ব্যাপারটা খেয়াল করলেন। সে এগিয়ে আসলো পার্বণের কাছে।
তিনি কিছু বলবেন তার আগেই পূর্ণা দৌড়ে এসে পার্বণকে ডাকলো।হাঁটুর উপর ভর দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

— পার্বণ? এই পার্বণ তাড়াতাড়ি চল পৌষ…
বাকিটুকু শেষ করার আগেই হাওয়ার বেগে পূর্ণার সামনে এসে ওকে জিজ্ঞেস করে পার্বণ,
— পৌষ? আমার পৌষের কি হয়েছে? ওকে এই কারণেই আমি আসতে বারণ করেছিলাম।
পূর্ণার পুরো কথা না শুনেই ও দৌড় দিলো। ওকে এমন রকেটের গতিতে দৌড় দিতে দেখে ক্লাসের সবাই হলেন। সাথে গুনগুন ও।
কিন্ত পূর্ণা নিজের কপাল চাপড়াচ্ছে। আরে ছেলেটা ওর পুরো কথা না শুনেই চলে গিয়েছে।
পূর্ণার কাছে বনচাঁপা আসে জিজ্ঞেস করে,
— কি হয়েছে রে পূর্ণা?
পৌষের ক্লাস রুমে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে পার্বণ। এসে দেখে পৌষের বেঞ্চে জটলা। ভয় পেয়ে গেলো ছেলেটা।
দ্রুত পৌষের কাছে গিয়ে যখন ওকে ঠিকঠাক দেখলো তখনই সময় নষ্ট না করে ওকে জড়িয়ে ধরলো। পারলে পৌষকে বুকের মধ্যে ডুকিয়ে ফেলে।
স্থান, পরিবেশ পার্বণের খেয়ালে নেই। ওর হার্টবিট এতো ফাস্ট হয়ে গেছে মনে হচ্ছে হার্টটাই বেরিয়ে আসবে।
ফুঁপিয়ে উঠলো পৌষ। ওর কান্না দেখতেই উদগ্রীব হয়ে গেলো পার্বণ। জিজ্ঞেস করে,

— কি হয়েছে? তোর শরীর খারাপ লাগছে? পেটে ব্যথা করছে?
নাক টেনে মাথা দুদিকে নাড়িয়ে না বোঝালো।
— তাহলে?
— ক্ষিদে পেয়েছে আমার।
— সকালে খাস নি?
— খেয়েছি তো। আবার খেতে ইচ্ছে করছে।
— কি খাবি?
এবার পার্বণের বাহুডোর থেকে মাথা উঠিয়ে জানালার বাহিরে আঙ্গুল তাক করে বলল,
— ওই যে ইটের গুড়া। লাল লাল ইটের গুড়া।
আহাম্মক বনে যায় পার্বণ। অবাক গলায় বলল,
— এ্যা?
— হ্যা আমি ওগুলোই খাবো।
— তাই বলে ইটের গুড়া?
[আমাদের এখানে একজনকে আমি দেখেছিলাম ইটের যে লাল বালু গুলো থাকে সেগুলো খাওয়ার ক্র্যাভিংস উঠেছে 🙂]

আজ নববর্ষ। বাংলা বছরের প্রথম মাস। চারপাশ লাল, সাদা সাজে রঙিন হয়ে উঠেছে। পহেলা বৈশাখে প্রতিবছর সব জায়গায় বৈশাখী মেলা বসে।
এবারেও তার ব্যতিক্রম নয়। মেলা বসেছে আর সেখানে বারোমাসি নীড়ের সবাই যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে।
পৌষ নিজের রুমে গেছে সাজতে। যদিও সে পার্বণের ঘরেই থাকে। তার বেশিরভাগ জিনিসও পার্বণের ঘরে শিফট করা। কিন্তু কিছু কিছু এখনো নিজের সেই আগের ঘরটাতে।
পার্বণের সামনে দিয়ে পৌষ যখন শাড়ি নিয়ে নিজের রুমে আসতে পা বাড়ায় তখনি খাটে শুয়ে মোবাইলে গেমস খেলতে থাকা পার্বণ ঠেস মেরে বলে উঠে,

— একজন মানুষের সব দেখা দুখা শেষ আমার বাচ্চাও পেটে ধরে বসে আছে এখনো এতো ঢং। বাবা রে বাবা আজকাল মানুষদের এতো ঢং থাকে কিভাবে!
তেড়ে গিয়ে পার্বণকে মারতে নিলেই ওর হাত ধরে আটকে দেয় পার্বণ।বাঁকা হেসে বলে,
— আই নো উই আর সেম এজ বাট আ’ম ইওর হাসব্যান্ড। তোর মুভমেন্ট আমার নখদর্পণে!
বলতে বলতেই পৌষকে নিজের কোলে বসিয়ে ওর দুই হাত এক হাত দিয়ে পিছমোরা করে ধরে পার্বণ। আরেক হাত দিয়ে ওর গাল ঠেসে ধরে চুমু খেয়ে বলে,
— গুলুমুলু পৌষকে দেখতে ইচ্ছে করছে। ভীষণ আদুরে লাগবে বোধহয়।
পার্বণের গায়ে থাপ্পড়, কিল মেরে নিজেকে পার্বণের থেকে ছাড়িয়ে উঠে পড়ে পৌষ। তারপর শাসানোর মতো করে বলে,
— গেমস খেলা বাদ দিয়ে দ্রুত রেডি হো।
পৌষের কথা হাওয়ায় উড়িয়ে দেওয়ার মতো করে দিয়ে ফেলে রাখা ফোনটা আবারো নেয় হাতে। গেমস খেলতে খেলতেই জবাব দেয়,
— তোদের মতো আমার এতো টাইম লাগে না।
পৌষ আবারো যেতে নিলেই মোবাইলের দিকে নজর রেখেই পার্বণ বলে,

পার্বণ বলেছে আর পৌষ সেটা শুনবে? অসম্ভব। সাজে পৌষ, খুব সুন্দর করে সাজে। লাল পাড়ের সাদা আর খয়েরি মিশেলের শাড়িটা জড়ায়।
কোনো প্রসাধনী ছাড়াই শুধু শাড়ি পড়েই ওকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে। চুলগুলো ঢিলে করে হাত খোপা করে। সেথায় আবার ফুলের গাজরাও দেয়।
সামনে দিক থেকে দুই পাশে দুই গোছা চুল বেরিয়ে আছে। প্রাইমার, কনসিলার, ব্লাশ, আইলেনার, কাজল, মাস্কারা লাগানো শেষে এখন ঠোঁট আর্ট করছে।
প্রথমেই ঠোঁটে গাঢ় খয়েরি রঙের পেন্সিল লিপস্টিক দিয়ে ঠোঁট আর্ট করে তারপর মানান সই একটা লিপস্টিক ঘষে।শেষ বার নিজেকে আয়নায় দেখে নিয়ে বের হয়ে যায়।
ড্রয়িং রুমে সবাই বসে আছে একজনের অপেক্ষায়। এই একজনটা আর কেউ না। আমাদের ভন্ড পার্বণ।
একটু আগে পৌষকে জ্ঞান দিয়েছিলো ওর তৈরি হতে টাইম লাগে না এখন ওই আসেনি। বিরক্ত হয়ে মনে মনে পৌষ বলে,

— মেয়েদের থেকেও বেশি সময় নিয়ে বলে কিনা টাইম লাগে না!
ঠিক তখনই সেখানে উপস্থিত হয় পার্বণ। শ্যাম বর্ণের পার্বণের গায়ে সাদা লালের মিশেলের পাঞ্জাবীটা বেশ লাগছে। হাতে আবার ঘড়িও পড়েছে।
বড় বড় চুল গুলো কপালে আছড়ে পড়ছে। সেগুলো হাত দিয়ে স্লাইড করে। সব কিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলো পৌষ।
পৌষের দিকে এখনো পর্যন্ত তাকায়নি পার্বণ। নিজেই দেরি করে এসে এখন সবাইকে তাড়া দিচ্ছে।
মানে কি লেবেলের জাউরা হলে এমন করে। পার্বণ বলে,
— আরে কি ব্যাপার তোমরা এখনো দাড়িয়ে যে দেরি হয়ে যাচ্ছে তো নাকি।
ওর কথা শুনে ফাল্গুন তেতে উঠে বলে,
— নিজে দেরি করে এসে এখন আমাদের তাড়া দিচ্ছিস। জাউরামি আর ছাড়বি কবে?
— উফ মা এসব ছাড়তে পারবো না। এখন চলো।
সবাই চলে যেতে নিলেই পার্বণের নজর যায় পৌষের দিকে। তাতেই থমকে যায় ছেলেটা। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসির রেখা তুলে মনে মনে বলে,

— আমার ওয়ার্নিং শুনলি না তো? ঠিক আছে আমার ও এখন কিছু করার নাই।
সবাই বের হতে নিলেই বাধ সাধে পার্বণ। হুট করে ওর আবার কি হলো জানতে চাইলে ওর বক্তব্য ও নাকি যাবে না।
ঠিক আছে তু্ই যাবি না যাস না তাহলে। কিন্ত না মহাশয় পৌষকেও যেতে দিবে না। আর পৌষ বেচারি এতো কষ্ট করে সাজলো কি না যাওয়ার জন্য?
ও গো ধরে বসলো। পার্বণ ও নাছোড়বান্দা। ও নিজেও যাবে না পৌষকেও যেতে দিবে না। বাড়ির প্রত্যেকে জিজ্ঞেস করলেই হাবিজাবি কিসব বোঝাচ্ছে।
সবাই মানলেও পৌষের এক কথা ও যাবে। আর পার্বণ তো ভাই পার্বণই। ও আকাম করবে না তা হয়।
হুট করে সবার সামনে থেকে পৌষকে পাঁজকোলে তুলে নিলো। পৌষ চেঁচিয়ে উঠলেও ওর কোনো হেলদোল নেই।
ও হাটছে। আর পৌষ বার বার ওকে নামিয়ে দিতে বলছে। শেষে পার্বণ ওর দিকে রাগী লুক নিয়ে তাকিয়ে বলে উঠে,

পৌষপার্বণ পর্ব ২২

— চল রুমে যাই। বড়রা ঘুরতে যাবে তাদের মধ্যে যেয়ে আমাদের কাজ নেই। আমরা বরং গল্প করবো।
ওর কথা শুনে ভাদ্র বলে উঠলো,
— ছোট হলে বাপ মা হলি কিভাবে?
বসন্ত সেটা শুনে বলে,
— ওটা পরের কথা। পার্বণ ভাই যদি ছোট হয় আমি আর হেমন্ত কি তাহলে? আমরা যে যাচ্ছি।
হেমন্ত ভাইয়ের কাঁধে হাত রেখে বলল,
— কি জানি ভাই? আমি তো ভাবছি ওরা কি গল্প করবে!

পৌষপার্বণ পর্ব ২৩