Home প্রণয়ের ঘোর রাত প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ২৬

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ২৬

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ২৬
আরাফাত আদনান সামি

“কী হলো কিছু বলছিস না কেনো? অনেক ভালোবাসিস আমায়?”
মায়া লজ্জায় এবার একটু মুখ খুলল,
“জানি না।”
“তাহলে ভালোবাসিস না?”
“জানি ন।”
কৌশিক ভ্রকুচকে বলল,
“তাহলে কী জানিস?”
“এটা জানি যে এখন থেকে আপনি সবসময় ফোন কাছে রাখবেন যাতে আমি ফোন দিলে সাথে সাথে রিসিভ করবেন ওকে।”
কৌশিক হেসে ফেলল, তার কণ্ঠে উষ্ণতার ছোঁয়া, “ওক্কে আমার চিপকালি ম্যাডাম মনে থাকবে। কিন্তু আমার উত্তর…?”

কৌশিকের কথা শুনে মায়া একটু ভ্রুকুচকাল।
“কিসের উত্তর?”
ফোনের ওপাশে কৌশিকের গলা নরম, সুরেলা।
“অনেক ভালোবাসিস আমায়?”
হঠাৎ প্রশ্নে মায়ার গাল লাল হয়ে উঠল। লজ্জা পেলেও সে তা আড়াল করতে অদ্ভুত দুষ্টু স্বরেই বলল,
“কিছু বললেন, কৌশিক ভাই?”
ওপাশে কৌশিক ভ্রুকুচকাল।
“বলছি যে, ভালোবাসিস আমায়?”
“হ্যালো… হ্যালো…।”
“কী হলো মায়া? আমার কথা শুনতে পাচ্ছিস না?”
“হ্যাঁ? কী হলো? কথা বলছেন না কেনো, কৌশিক ভাই?”
“আরে চিপকালি…”

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

ওদিকে মায়া ফোনের ওপাশে মুচকি মুচকি হাসছে। শুনেও না শোনার ভান করে যাচ্ছে।
“কিছু বলছেন আপনি? আমি তো শুনতেই পাচ্ছি না! ধ্যাত,মনে হয় নেটওয়ার্ক প্রবলেম…”
কৌশিক ঠিক সেই মুহূর্তেই কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই মায়া কলটা কেটে দিল। এক মুহূর্ত বাকরুদ্ধ হয়ে রইল কৌশিক। তারপর ধীরে ধীরে ঠোঁট কামড়ে হাঁসল। গভীর স্বরে ফিসফিস করে বলল,
“কতদিন? কতদিন পালামি? একদিন না একদিন আমার খাজায় বন্দী তো তোকে হতেই হবে, মায়া।”
কৌশিক ঠিক যেই আবার মায়াকে কল দিতে যাবে, এমন সময় হঠাৎ দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকল রোহিত। ঢুকতে ঢুকতেই জিজ্ঞেস করল,

“ভাইয়া, তুমি অফিস থেকে কখন আসলে?”
কৌশিক হালকা মুচকি হাসল।
“এই তো একটু আগে। তুই কখন আসলি?”
“আমি তো ভাইয়া মাত্রই আসলাম।”
“তা আজ এত দেরি কেনো?”
“ওই আজ একটু কাজের চাপ বেশি ছিল।”
“বুঝলাম। আচ্ছা যা রুমে গিয়ে আগে ফ্রেশ হো। আমিও হবো।”
রোহিত সঙ্গে সঙ্গেই প্রশ্ন করল,
“হ্যাঁ যাবো। কিন্তু ব্রো, তুমি এতক্ষণ আগে এসে এখনো ফ্রেশ হোওনি কেনো?”
কৌশিকের ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি।
“এমনি।”
রোহিত চোখ সরু করল।

“এমনি? নাকি মায়ার সাথে ইটিস-ফিটি…”
বাকিটা আর বলতে দিল না কৌশিক। তৎক্ষণাৎ গম্ভীর হয়ে উঠল সে,
“যাবি নাকি আমার হাতে গরম গরম মাইর খাবি?”
রোহিত সাথে সাথে বলল,
“আরে আরে যাচ্ছি তো! নিজে ইটিস-ফিসিট করবে আর আমি বললেই দোষ!”
“তবে রে… যা এখান থেকে…”

বাকিটা শেষ করতে হলো না। রোহিতের পলায়নের গতি দেখে মনে হলো ৩ সেকেন্ডও নেয়নি রুম ছাড়তে। এক দৌড়ে নিজ রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ।কৌশিক হেসে মাথা নাড়ল। মনে মনে বলল, ‘পাগল!’
তারপর আলমারি থেকে একটা তোয়ালে নিয়ে ফ্রেশ হতে ওয়াশরুমে ঢুকল। অনেকক্ষণ পর ওয়াশরুম থেকে বের হলো কৌশিক। সাদা টি-শার্ট আর কালো পাতলা ট্রাউজারে যেন আরও পরিপাটি লাগছিল তাকে। ভেজা চুলগুলো তোয়ালে দিয়ে মুছে আঙুলে টেনে তিন-চার ইঞ্চি লম্বা চুল একটু স্টাইল করে নিল। অফিসে নানা রকম খাওয়াদাওয়ায় পেট ভরানো, কিন্তু ক্লান্তি শরীরের প্রতিটা কোণে জমে আছে। ওয়াশরুম থেকে বের হতেই বিছানার নরম গদিটা যেন তাকে ডাকছিল। কোনো কিছু না ভেবেই বিছানার ওপর ঢলে পড়ল কৌশিক। বালিশে মুখ রাখা মাত্রই সারাদিনের ক্লান্তি তাকে গ্রাস করল যেন। দুই মিনিটও লাগল না চোখ ভেসে গেল ঘুমের গভীর অন্ধকারে। চৌধুরী বাড়ি নিঃশব্দ, বাতাস বইছে তবে নরম আর কৌশিক ঘুমিয়ে আছে অচেতন শান্তিতে।

সকাল প্রায় ৯টা। শীতের সকাল মায়ার রুমের জানালার পাশে কোন গাছ-পালা না থাকায় কুয়াশা ভেদ করে হারকা পাতলা নরম রোদের আলো জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরের ভেতর ঢুকছে। সেই আলোই মায়ার চোখে পড়ে তাকে ধীরে ধীরে জাগিয়ে তুলল। ঘুম জড়ানো চোখ মেলে উঠে বসল সে। আজ অনেকদিন পর কলেজে যাবে এই ভাবনাটাই যেন তাকে একটু চনমনে করে দিল। ফ্রেশ হয়ে নাস্তা সেরে নিল দ্রুত। ছুটে চলা সময়কে যেন আজ আটকানোর উপায় নেই। মায়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের হিজাব এর কুঁচি ঠিক করল। কালো বোরকাটা তাকে আরও পরিপক্ক, আরও শান্ত দেখায়। ছোট্ট একটা ব্যাগ হাতে নিল।আজকের দিনের প্রয়োজনীয় সব জিনিসই তাতে গুঁজে রেখেছে। মোটামুটি ৩০ মিনিট ধরে রেডি হয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এল সে। কলেজে যাওয়ার উত্তেজনায় তার হাঁটাতে আজ একটু তাড়াহুড়োর ছাপও আছে। অনেকদিন পর সহপাঠীদের সাথে দেখা হবে। পরীক্ষার পর তো আর তাদের সাথে তেমন কথা হবে না, তাই আজ কলেজে যেতেই হবে। মায়া দ্রুত পায়ে সিড়ি বেয়ে নিচে নেমে সামনে দিকে এগোতেই হঠাৎ দেয়ালের আড়াল থেকে বের হয়ে এল রুবিনা পাটোয়ারী। মেয়েকে এমন তাড়াহুড়ো করতে দেখে তিনি ভ্রু তুললেন।

“এইভাবে তাড়াহুড়ো করে কোথায় যাওয়া হচ্ছে শুনি?”
মায়া থমকে দাঁড়াল।
“কলেজে যাচ্ছি, আম্মু।”
“শীত তো পড়েই গেল! ঠান্ডা লেগে যাবে। বোরকার ওপরে কিছু পড়ো নি কেনো?কিছু পড়ে আসো যাও।”
“না আম্মু, ঠিক আ…”
মায়ার কথা শেষ হবার আগেই রুবিনা পাটোয়ারীর কণ্ঠ ঠাণ্ডা, কিন্তু দৃঢ় হয়ে উঠল,
“যা বলছি তাই করো।”
এ স্বরটা মায়া খুব ভালো করেই চেনে। এতে তর্ক চলে না। মায়া আর কিছু বলল না। সোজা নিজের রুমে ফিরে গিয়ে ওয়ারড্রব খুলল। ভেতর থেকে একটা মোলায়েম শাল বের করে কাঁধে সুন্দরভাবে জড়িয়ে নিল। শীতের সকাল বলে শালটা জড়াতেই শরীরে আরাম ছড়িয়ে গেল তার। সব ঠিকঠাক করে আবার নিচে এসে দাঁড়াতেই রুবিনা পাটোয়ারী তাকালেন তার দিকে।

“গাড়ি ভাড়ার টাকা আছে নাকি, দিতে হবে?”
“না আম্মু, আছে।”
“ঠিক আছে, তাহলে যাও। আর হ্যাঁ সাবধানে যেও।”
মায়া নরম স্বরে বলল,
“ঠিক আছে, আম্মু।”
মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়েই মায়া বাড়ির দরজা পেরোল। সকালের শীত যেন আরও ঘনীভূত হয়ে তাকে ঘিরে ধরল। বাতাসে কুয়াশা এতটাই গাঢ় যে রাস্তার শেষপ্রান্তটা বোঝাই যাচ্ছে না। মায়া প্রায় ১৫ মিনিট ধরে হাঁটছে, কিন্তু আশেপাশে একটা গাড়িও নেই আর যা চলাচল আছে তা থামছে না। কুয়াশায় ঢেকে থাকা রাস্তাটা বিরান। মানুষের চলাচল একদমই নেই। অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়তে লাগল মায়ার মনে। শালটা কাঁধে শক্ত করে টেনে ধরল সে, যেন এভাবেই নিজের সাহসটা গায়ে জড়িয়ে রাখবে।
হঠাৎ ধপ করে তিনটা ছায়ামূর্তি কুয়াশা চিরে এসে দাঁড়াল ঠিক তার সামনে। এতটা হঠাৎ যে মায়ার বুক ধক করে উঠল। তাদের একজন সিগারেট হাতে, ধোঁয়ার পাক ছেড়ে মায়ার দিকে তাকিয়ে কুৎসিত হাসিতে বলল,

“হেই চুমকি সুন্দরী।”
মায়ার মুখ লাল হয়ে উঠল রাগে আর ঘৃণায়।
“আপনারা কে? এইসব কী অসভ্যতামি? আমার পথ আটকে দাঁড়িয়েছেন কেনো? সামনে থেকে সরুন!”
তার কথা বাতাসেই মিলিয়ে গেল। তিনজনের কেউই সরল না বরং একে অপরের দিকে তাকিয়ে আরও বেশি বিকৃত হাসল। মায়া আর কথা বাড়াল না। তাদের পাশ কেটে দ্রুত পা চালিয়ে সামনে এগিয়ে গেল। কিন্তু ঠিক তখনই তার পেছন থেকে সুরেলা, কিন্তু ভয়ঙ্কর বিদ্রূপমাখা গলায় গান শুরু হলো,

চুমকি চলেছে একলা পথে
সঙ্গী হলে দোষ কী তাতে
রাগ করো না, সুন্দরী গো
রাগলে তোমায় লাগে আরো ভালো…”
পেছন থেকে আবার আরেকটা কণ্ঠ ভেসে এলো। একটা ভয়ঙ্কর স্বর,
“হেই চুমকি,এই শীতের সকালে সঙ্গী ছাড়া একা একা কোথায় যাচ্ছো? আমাদেরও তোমার সঙ্গে নাও সুন্দরী। বেশি কিছু চাই না এই শীতের মিষ্টি সকালে শুধু একটু সঙ্গ চাই তোমার।”
সাথে সাথেই আরেকজন সিগারেটের টান দিয়ে ধোঁয়া উড়িয়ে বলল,
“হেই সুন্দরী, হবে নাকি এক ম্যাচ?”

আর তারপরই তিনজন মিলে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। সেই হাসি যেন কুয়াশা চিরে মায়ার চারপাশে বিষধরের মতো পেঁচিয়ে ধরল। এমন নোংরা কথা কান পর্যন্ত পৌঁছাতেই মায়ার ভেতরটা হঠাৎ করে জ্বলে উঠল রাগে, আর সাথে সাথে ঢুকে গেল অসহ্য ঘৃণা। শালটা সে শক্ত করে বুকের সাথে চেপে ধরল, যেন এভাবেই নিজেকে অশুচি দৃষ্টির হাত থেকে আড়াল করতে পারবে। সে সব শুনল, প্রতিটা শব্দ ছুরির মতো গায়ের ভেতর বেঁধে গেল। কিন্তু সাহস হলো না পেছনে ঘুরে তাকানোর। ভয় যেন গলা পর্যন্ত উঠে এসে হাত-পা ঠাণ্ডা করে দিল। মায়া হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিল। তার প্রতিটা পদক্ষেপে তাড়াহুড়ো, আতঙ্ক আর সামান্য আশা,কাউকে না কাউক যদি সামনে দেখা যায়। কিন্তু কুয়াশার বুকে ছায়ার মতো তিনটি ফিগার আবার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। মায়ার পথ পুরোপুরি আটকে গেল। মায়া এবার সত্যি থমকে দাঁড়াল। তার গলা কাঁপছে, নিশ্বাস ভারী, চোখে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট। ভয়ে ভয়ে মায়া কোনোমতে শব্দ বের করল,

“দে… দেখুন আপনারা যা করছেন মোটেও ভালো কাজ করছেন না। প্লিজ, দয়া করে আমার পথ ছাড়ুন।”
তিনজনের একজন ঠোঁট বাঁকিয়ে এগিয়ে এলো। চোখে কুৎসিত ঝিলিক নিয়ে বলল,
“যদি না ছাড়ি তো?”
মায়া ভয় পেলেও গলা শক্ত রাখার চেষ্টা করল।
“আমি কিন্তু লোক জড়ো করতে বাধ্য হবো!”
ছেলেটা ব্যঙ্গভরে চারপাশ তাকাল।
“এখানে তো কেউ নেই কাকে ডাকবি? কুয়াশাও তো আমাদের পক্ষেই আছে, সুন্দরী। এই যে কীভাবে তোমাকে আমাদের নজরে খুলা আর বাকি সবার নজর থেকে আড়ালে।”

এ কথা বলতেই পাশ থেকে আরেকটা ছেলে হাত বাড়িয়ে মায়ার কাঁধে ছোঁয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু মায়া আর অপেক্ষা করেনি তার হাত ঝটকায় বাতাস কেটে গিয়ে চপাৎ! করে বসে গেল ছেলেটার গালে। থাপ্পড়টা এত জোরে ছিল যে ছেলেটা একটু টলতে টলতে পেছনে সরে গেল। তার চোখে অবিশ্বাস, মুখে জ্বালা মেয়েটা যে এমনটা করবে, তা সে ভাবতেই পারেনি। মায়া কাঁপতে কাঁপতে গলা উঁচু করে বলল,
“একদম আমাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করবেন না। এর পরিণতি কিন্তু খুবই খারাপ হবে বলে দিলাম।”
আরেকটা ছেলে তখন রাগে চিৎকার করে উঠল,
“কী বললি তুই?!”

বলেই সে বজ্রের মতো ঝাঁপিয়ে এসে মায়ার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। এত জোরে যে মায়ার মুখ বিকৃত হয়ে গেল ব্যথায়।
“ছাড়ুন! ছাড়ুন বলছি আমার হাত!”
মায়া যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগল, চেষ্টা করল ছেলেটার হাত থেকে নিজের হাত ছুটিয়ে নিতে
কিন্তু সে পেরে উঠল না। আতঙ্কে তার কণ্ঠ কাঁপতে লাগল।
“কেউ আছেন? প্লিজ! আমাকে সাহায্য করুন! কেউ আছেন এই পশুদের হাত থেকে আমাকে কেউ বাঁচান।”
তার ভয়ার্ত চিৎকার নীরব রাস্তায় গুমরে গুমরে প্রতিধ্বনিত হলো। কুয়াশা যেন আরও ঘন হয়ে চারদিকে নেমে এলো যেন পৃথিবী তাকে গিলে ফেলতে চাইছে। ঠিক তখনই যাকে মায়া মুহূর্ত আগে থাপ্পড় মেরেছিল, সে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সামনে এগিয়ে এল। এক মুহূর্তে মায়ার শাল ধরে টেনে নিল। আর এক টানে সেটা নিয়ে রাস্তার পাশে ছুড়ে ফেলল। চাদরটা মাটিতে পড়তেই মায়া শিউরে উঠল। শীত নয় ভয় তার পুরো শরীর গ্রাস করল। ছেলেটা মুখের কাছে মুখ এনে দাঁত চেপে বলল,

“তুই আমাকে থাপ্পড় মারলি? আমাকে?
তুই জানিস আমি কে? এর শাস্তি তোকে পেতেই হবে আজই আর এখনি।”
তার চোখ দুটো হিংসায় লাল হয়ে আছে। যেন মুহূর্তেই ঝাঁপিয়ে পড়ে সবকিছু ছিন্নভিন্ন করে দেবে। মায়া ছেলেটার কথায় একদম ভেঙে পড়ল। চোখে পানি জমে উঠল, গলা কাঁপতে লাগল।
“এমনটা করবেন না, প্লিজ আমাকে যেতে দিন…”
কিন্তু ছেলেগুলো মায়ার কোনো কথা শুনল না।
তারা আরও কাছে আসছে, আরও হিংস্র, আরও অমানবিক হয়ে উঠছে। মায়া ছটফট করতে করতে চিৎকার করতে লাগল,

“বাঁচান! প্লিজ কেউ আছেন? আমাকে বাঁচান।”
তার চিৎকার কুয়াশার দেয়ালে গিয়ে দমে গেল।
রাস্তা নিস্তব্ধ; কেউ নেই। শুধু তিনটে নেকড়ের মতো চোখ তার ওপর ক্ষুধার্ত দৃষ্টিতে ঝুঁকে আছে। ঠিক সেই মুহূর্তে ছেলেটা যখন মায়ার গালে হাত তোলার জন্য হাত উঠাল মায়া চোখ শক্ত করে বন্ধ করে নিল। ভয়ে তার ঠোঁট কেঁপে উঠছে। পরের মুহূর্তে কী হবে সে ভাবতেই পারছে না। আর ঠিক তখনি,‘ধপ্!’ চারদিক হঠাৎ বিকট এক ধ্বনিতে কেঁপে উঠল। মায়া চমকে গেল, শরীর জমে গেল ভয় আর বিস্ময়ে। তার সামনে থাকা ছেলেটা যেন হাওয়ায় উঠে আবার মাটিতে আছড়ে পড়ল। একেবারে নিস্তেজ, রক্তাক্ত, অজ্ঞান অবস্থায়। অন্য দুই ছেলে ভয় পেয়ে এক কদম পেছনে সরে গেল। মায়ার হৃদস্পন্দন থমকে গেল।এটা কী হলো? কে এলো? ধীরে ধীরে ভালো ভাবে চোখ খুলল মায়া। আর চোখ খুলতেই তার নিশ্বাস আটকে গেল। কুয়াশার ভেতর পিস্তল হাতে দাঁড়িয়ে আছে,‘কৌশিক।’ চোখে আগুন, মুখে কঠিন ছায়া, শরীরের প্রতিটি ভঙ্গিতে অটুট দৃঢ়তা। তার দৃষ্টি ছেলেগুলোর ওপর একবার পড়তেই যেন চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠল।

মায়া কাঁপতে কাঁপতে তার দিকে এক পা বাড়াতেই, হঠাৎ পাশ থেকে একটা ছেলে ঝাঁপিয়ে এলো। পকেট থেকে ছুরি বের করে ঝট করে মায়ার গলায় চেপে ধরল। ছুরি গলায় ঠেকতেই মায়ার দম বন্ধ হয়ে আসছিল।মায়া একটু কেঁশে উঠল। ছেলেটা কৌশিকের দিকে তাকিয়ে দাঁত চেপে গর্জে উঠল,

“একদম,একদম আমাদের কাছে আসার চেষ্টা করবি না! না হলে এর গলায় এখনই ছুরি বসিয়ে দেব!”
ভয়ে মায়ার শরীর কাঁপছে আর কৌশিকের চোখ দুটো নিঃশব্দ আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলছে। এক সেকেন্ডে বিস্ফোরণ ঘটার অপেক্ষায়। কিন্তু কৌমিক এরি মাঝে জোরে হেঁসে উঠল। কৌশিকের হাসিটা যেন চারপাশের অন্ধকার বাতাসকে ছিঁড়ে ফেলল। ওর হাসিতে এমন এক দম্ভ, এমন এক আগুন যেন হুমকি নামের জিনিসটা তার কাছে কেবলই মজা মনে হলো। পাশেই তার গাড়িটা রাখা। এক লাফে গাড়ির বোনেটের ওপর উঠে বসল কৌশিক। এক হাঁটু তুলে তার ওপর হাত রেখে বন্দুকটা ভারি করে ধরল। অন্য হাতে সিগারেট ধরিয়ে গভীর একটা টান নিল। ধোঁয়ার কুণ্ডলি ভেসে উঠতেই সে ঘন গলায় বলল,

“দেখি, তোর কলিজা কত বড়। পারলে চালা তোর ছুরি।”
ছুরিটা ধরে থাকা ছেলেটা কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
“আমাদের কাছে আসবি না, না হলে সত্যি সত্যি ছুরি চালিয়ে দিব।”
কৌশিক ঠোঁট বাঁকা করে হেসে বলল,
“তো চালা না! বারণ করছে কে? দেখি ছুরি ধার কত আর ছুরি চালাতে তোর সাহস আছে কিনা, চালা বেটা…।”
পাশের আরেকটা ছেলে অসহায় হয়ে গিলে বলল, “ক… কে রে তুই?”
কৌশিক সিগারেটটাকে শেষ টানে নিঃশেষ করে ছুড়ে মারল দূরে। ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নামল। পদক্ষেপগুলো ভারি, আত্মবিশ্বাসে টগবগে। তাদের দিকে এগোতে এগোতে বলল,
“প্রেমিক। ওর পাগল, উন্মাদ, বজ্জাত, অসভ্য, মাতাল প্রেমিক। আর সেই প্রেমিকের প্রেমিকাকে তোরা মারবি? তোরা? কিন্তু আফসোস ও তো এভাবে মরবে না।”

কথাটা বলে কৌশিক হঠাৎই থেমে গেল। পরের মুহূর্তেই ছিঁড়ে ফেলল নিজের পরনের শার্ট এক টানেই। উন্মুক্ত হয়ে গেল তার বুক,জিম করা শক্ত পেশিগুলো উত্তেজনায় ফুলে আছে। কৌশিক ধীরে ধীরে পিস্তল হাতে ছেলেগুলোর দিকে এগিয়ে গেল। ওদের হাত-পা কাঁপছে, নিঃশ্বাস এলোমেলো। ছুরি ধরা ছেলেটা তো কাঁপতে কাঁপতে মায়ার গলাতেই চাপ বাড়িয়ে ফেলছিল। কৌশিক কাছে যেতে যেতেই ছেলেটার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে সরিয়ে নিল মায়ার গলা থেকে। তারপর সেই ছুরি ধরা হাতটাই ধরে নিজের বুকের বাম পাশের ওপর এনে ঠেকিয়ে দিল। তাচ্ছিল্যের ঠাণ্ডা হাসি মুখে নিয়ে বলল,

“ও এমনে মরবে নাকি?”
দু’জন ছেলেই কাঁপা গলায় বলল,
“ত…তা… তা… তাহলে…?”
কৌশিক আরও এক কদম এগিয়ে গিয়ে গর্জে উঠল,
“ও তো এভাবে মরবে না। ওর প্রাণ তো এখানে, আমার এই বুকের বাঁ-পাশটায়। ওকে মারতে চাস তো? তাহলে আমার এই বুকের বাঁ-পাশটায় ছুরি দিয়ে একের পর এক আঘাত কর। এমনভাবে আঘাত কর, যেন ছুরির প্রতিটা আঘাতে আমার বুকের বাঁ-পাশটা জর্জর হয়ে যায়। দেখবি, ও এমনিই মরে যাবে।”
মায়া কৌশিকের কথা শুনে হতবাক। সে জানে তার জন্য কৌশিক পাগল কিন্তু এতটা? ভয়ে, অবাক হয়ে, আবার অদ্ভুত এক নিশ্চিন্ততায় তার চোখ ভরে উঠল পানিতে। রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে কুচকুচে হয়ে সে যেন ছোট হয়ে গেল। কৌশিক আবার হেসে উঠল ঠান্ডা, ধারালো হাসি।

“কি হলো? তোর হাত কাপছে কেন? এভাবে হুন্ডামি করলে হবে বেটা? এখন ভয় পাচ্ছিস কেন?”
ছেলেটার হাত থেকে ছুরিটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
তার পুরো শরীর কুঁকড়ে গেছে ভয়ে।কৌশিকের চোখে চোখ রাখতেই সে তড়পায়ে মাথা নামিয়ে ফেলল। কৌশিক কিছুক্ষণের জন্য থমকে দাঁড়াল। তার চোখ-মুখ রাগে লাল নেভে আসা আগুনের মতো জ্বলছে। পরের মুহূর্তেই গর্জে উঠল,

“চালা ছুরি! না হলে তোদের মাথার খুলি এখানেই উড়িয়ে দিব!”
কথাটা বলে একটু থামল অতঃপর রাগান্বিত স্বরে আবার বলল,
“রাস্তা-ঘাটে মেয়েদের নিয়ে মজা করার অনেক শখ তোদের, তাই না? এখন যদি তোদের এই ছুরি দিয়েই তোদের মজা করার জিনিস উধাও করে দিই?”
এই কথা শুনতেই পাশের ছেলেটা ভয়ে কেঁপে উঠল। তার মুখ সাদা হয়ে গেছে। হঠাৎই সে কৌশিকের পায়ে লুটিয়ে পড়ল।কাঁদো কাঁদো স্বরে বলতে লাগল,
“ভুল হয়ে গেছে ভাইজান! আমাদের যেতে দেন! এই কানে ধরছি, আর কখনো এমন কাজ করবো না। প্লিজ ছেড়ে দেন…”

তার কথার মাঝেই মায়া মুখ তুলে বলল, কণ্ঠ কাঁপছে ক্ষোভে,
“না! কৌশিক ভাই একদম ছাড়বেন না ওদের। ওরা আমাকে খুব বাজে, নোংরা কথা বলেছে! আমাকে খারাপ ভাবে স্পর্শ করার চেষ্টা করেছে।”
মায়ার একটাই বাক্য আর কৌশিকের ভেতরের সবটা নিয়ন্ত্রণ যেন ভেঙে গেল। একজন তো আগেই গুলিবিদ্ধ হয়ে অচেতন হয়ে পড়ে আছে।
বাকি দুজনের উপর শুরু হলো তাদের আসল দুঃস্বপ্ন। কৌশিক আর সময় নিল না। ইচ্ছামতো, একের পর এক ঘা বর্ষাতে লাগল। ছেলেদুটোর নাক-মুখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে গরম রক্ত। তারা দু’জনেই ছটফট করতে করতে শেষে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ল। তাদের গোঙানি থেমে এলো, নিঃশ্বাস ভাঙা ভাঙা। কৌশিক আবারও ঘুষি তুলল, এই আঘাতটা গেলে হয়তো তারা আর উঠতেই পারত না বা মরেই যাবে। ঠিক তখনই মায়া ছুটে এসে কৌশিকের হাত শক্ত করে চেপে ধরল। কাঁপা, আতঙ্কিত কণ্ঠে বলল,

“আর কত মারবেন? মরে যাবে তো…”
কৌশিক রক্তে উঠা চোখে ছেলেদুটোর দিকে তাকাল। তার বুক ওঠানামা করছে দ্রুত রাগের আগুনে যেন দপদপ করছে সে।
“এরা তোকে নোংরা কথা বলেছে। তোকে ছুঁয়েছে। ওদের তো এবার মরতেই হবে!”
সে গুলি করার জন্য পিস্তলটা তুলতেই মায়া হঠাৎ ছুটে এসে তার হাত শক্ত করে ধরে ফেলল। কাঁপা কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল,

“কী করছেন এসব? অনেক হয়েছে কৌশিক ভাই ! যা মারার দরকার ছিল, তার চেয়ে বেশি মেরেছেন। ৫–৬ মাস তো ওরা হসপিটালের বিছানা থেকে উঠতেই পারবে না।”
মায়ার একটু থামল তারপর কৌশিকের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,
“প্লিজ আপনি এবার শান্ত হোন।”
মায়ার এই কথাগুলো শুনতেই কৌশিকের রাগ যেন মোমের মতো ধীরে ধীরে গলে পড়ল।সে গভীর নিঃশ্বাস নিল। তার চোখের আগুন একটু নরম হলো শুধু মায়ার জন্য। কৌশিক হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল ছেলেদুটোর কাছে। দু’জনের গাল দু’হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে নিজের দিকে কাছে টেনে নিল। এক এক করে স্পষ্ট, হুমকিস্বরের চেয়ে গভীর গলায় বলল,

“আজ মায়ার জন্য তোদের ছেড়ে দিচ্ছি। না হলে এতক্ষণে তোদের সবাইকে উপরে পাঠিয়ে দিতাম।”
ছেলেদুটো সন্ত্রস্ত চোখে তাকিয়ে আছে, কাপছে আর হাঁপাতে হাঁপাতে শ্বাস নিচ্ছে।কৌশিক মুখটা আরও কাছে এনে বলল,
“টেক্সট টাইম থেকে কোনোদিন যদি একটাবারও কোনো মেয়ের সাথে অসভ্যতামি করিস, আর সেটা যদি আমার চোখে পড়ে তাহলে সেইদিনই তোদের শেষ দিন হবে। মনে করবি সেই দিন তোদের বাঁচানোর মতো কোনো মানুষ জন্মায়নি এই দুনিয়ায়। তোদের মুখটা চিনে রাখলাম।
মনে রাখিস নেক্সট টাইম নেই।”

বলেই কৌশিক উঠে দাঁড়াল। শরীরে আগের সেই দাপট তবুও কণ্ঠে এক অদ্ভুত শান্তি ফিরে এসেছে। দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে রক্তাক্ত শরীরে থাকা ছেলেদের মুখের উপর ছুড়ে দিল।
“এখানে হসপিটাল পর্যন্ত যাওয়ার ভাড়া আছে।
চোখের সামনে থেকে তারাতাড়ি চলে যা। নাহলে এমন মার মারবো তোদের মা বাবা তাদের ছেলের লাশ চিনতেও পারত না।”

বুক চাপড়ানো নীরবতা। ছেলেগুলো কাঁপতে কাঁপতে টাকা কুড়াতে লাগল। কৌশিক আবার পিছন ফিরে হাঁটল সরাসরি মায়ার দিকে। রাস্তার পাশে পড়ে থাকা মায়ার চাদরটা সে তুলে নিল।
হালকা ধুলা ঝেড়ে নরম হাতেই মায়ার কাঁধে পেচিয়ে দিল চাদরটা। মায়া কিছু বলতে পারল না
শুধু তার বুক ধড়ফড় করছে, চোখ ভিজে উঠছে অজান্তেই। এরপর কৌশিক মায়ার হাতটা নিজের হাতে জড়িয়ে গাড়ির দিকে হাঁটা দিল। মায়া কোনো প্রতিরোধ করল না। কৌশিকের সেই শক্ত, উষ্ণ হাতে যেন সে নিরাপত্তার পুরো পৃথিবী খুঁজে পেল। গাড়িতে বসে পড়তেই দেখা গেল কৌশিকের গায়ে শুধু একটা প্যান্ট। উন্মুক্ত বুকজুড়ে হালকা ধুলো, ঘাম, আর কয়েক জায়গায় তাজা আঁচড়ের দাগ। তবুও চোখ সরানো যায় না। মায়া তাকিয়ে আছে স্থির, নিঃশব্দে। কৌশিক গাড়ির ইঞ্জিন চালু করল। শীতের কুয়াশায় তার গাঢ় শ্বাস নরম ধোঁয়ার মতো ফুটে উঠছে। হঠাৎ সে বলে উঠল,

“কী হলো? এমন করে কী দেখছিস?”
মায়া চমকে উঠল। তবে চোখ ফিরিয়ে নিতে পারল না। গলা শুকিয়ে আসছে তার।আমতা আমতা করে বলল,
“আ… আপনার তো এই সময়ে অফিসে থাকার কথা ছিল,কিন্তু আপনি এখানে এই সময়ে?”
কৌশিক মায়ার দিকে গভীর, গম্ভীর চোখে তাকালেই মায়া হঠাৎ চুপ হয়ে গেল। হৃদয় যেন থেমে গিয়েছে কিছু বলতে পারছে না। কৌশিকের ধমকানো স্বর বলল
“তোর বাড়িতে গাড়ি নেই?”
মায়া হঠাৎ কেঁপে উঠল, হাতটা লুকিয়ে ধরে অল্প আওয়াজে বলল,
“ধ..ধমকাচ্ছেন কেনো!”
কৌশিকের চোখ থেকে সরাসরি ধমকের ঝলক লাফ দিয়ে মায়ার মনে পৌঁছালো। আবারো সে একই স্বরে বলল,
“যা বলেছি, তার উত্তর দে।”
মায়ার গলা কাঁপতে কাঁপতে মুখে এল,

“আ..আছে।”
“তাহলে, গাড়ি ছাড়া বের হলি কেন?”
মায়া কিছুটা হচকা স্বরে মুখ খুলল,
“ওই আসলে…”
“ওই আসলে কী?”
মায়া অবশেষে গভীর নিশ্বাস নিয়ে বলল,
“আরে, আমার কথাটা তো শুনুন। আপনি জানেন না আমাদের গাড়ি কয়টা? আপনার মতো এত বড়লোক নই আমরা। একটাই গাড়ি আছে, আর সেটা দিয়ে আব্বু প্রতিদিন অফিসে যায়।”
কৌশিক মায়ার কথা শুনে ভ্রুকুচকাল।
“এখন থেকে কলেজ বা যেখানেই যাবি, আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাবি মনে থাকবে?”
মায়া চুপ করে রইল, কোন উত্তর দিল না। কৌশিক ধমকের তীব্রতা আরো বাড়িযে বলল,

“কী হলো? উত্তর দিচ্ছিস না কেনো?”
মায়া হঠাৎ আতঙ্কিত হয়ে কেঁপে উঠল।
“ঠি..ঠিক আ..আছে, ম..মনে থাকবে।”
মায়া আর কোন কথা বলল না। গাড়িতে নীরবতা চেপে ধরেছিল। কয়েক মুহূর্তে তার মনটা এক অজানা অস্থিরতায় কেঁপে উঠল। পথচলার সময়ও কেটে গেল, কিন্তু কলেজে পৌঁছাল না, বাড়িতেও নয়। রাস্তাগুলোও তার পরিচিত নয়। অজানা পথ, অজানা পরিবেশ সব মিলিয়ে মায়ার মনে গভীর এক বিভ্রান্তি কাজ করছিল। হঠাৎ, এই নীরবতাকে ভেঙে মায়া হড়বড় করে বলল,

“আচ্ছা আমরা কোথায় যাচ্ছি, কৌশিক ভাই?”
কৌশিক নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে গাড়ি চালাতে চালাতে বলল,
“কাজি অফিসে।”
মায়ার ভ্রুকুচকে উঠে গেল।
“হোয়াট?”
কৌশিক তার দিকে তাকিয়ে হালকা স্নিগ্ধ হাসি ছুঁড়ল।
“মুখটা পচা টমেটোর মতো বানালি কেন? খারাপ কিছু বললাম নাকি?”
মায়া আক্ষেপ আর বিভ্রান্তিতে কণ্ঠস্বর কমিয়ে বলল,
“কিন্তু কাজি অফিসে কেন?”
কৌশিক নির্লিপ্তভাবে উত্তর দিল,

“কাজি অফিসে মানুষ কেনো যায়? কলা খেতে,খাবি?”
মায়া ভ্রুকুচকে প্রথটার উত্তর দিল।
“অসভ্য,কাজি অফিসে বিয়ে করতে যায়!”
কৌশিকের চোখে সামান্য ছলছল। সে বলল,
“হ্যাঁ, তাহলে আমরাও বিয়ে করতেই যাচ্ছি। তাই তুই চুপচাপ এখানেই বসে থাক নায়তো বিয়ের আগে গাড়িতেই সব কাজ সেরে ফেলব।”

কৌশিকের কথা শুনে মায়া ভয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল। কিন্তু আর চুপ থাকতে পারল না। মায়া চোখ বড় করে তাকাল। মনের ভিতর এক অচেনা ঝড় উঠল।
“মাথাটা আসলেই গেছে আপনার। কোন সিচুয়েশনে কী কথা বলছেন আপনি? একটু আগেই একটা বড় ঝড় থেকে বেঁচে আসলাম। আর এইভাবে সবাইকে না জানিয়ে? আর আপনি জানেন না সামনে যে আমার পরীক্ষা?”
“তোর পরীক্ষার মায়রে-বাপ আসসালামু আলাইকুম।”
মায়া কিছুই বুঝতে পারল না। সে হতাশার সাথে হালকা অবাক হয়ে বলল,
“পরীক্ষার কথা বাদ দিলাম, কিন্তু পরিবার? এইভাবে সবাইকে না জানিয়ে না নিয়ে আমি আপনাকে বিয়ে করতে পারব না।”

কৌশিক মায়ার দিকে এক দৃঢ় দৃষ্টিতে তাকাল, তারপর বলল,
“আমি আসতে আর একটু দেরি করলে, আমার মুরগী অন্য শিয়ালের শিকার হয়ে যেত। তোর পরীক্ষা হেন তেন বালের জন্য আমি আর রিক্সি নিতে চাই না, আর নিতেও পারবো না। তাই তোর মঙ্গল এতেই হবে তুই চুপচাপ কোন কথা না বলে বসে থাক।”
মায়ার কণ্ঠে শঙ্কা ও আতঙ্ক মিলেমিশে উঠল,

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ২৫

“কিন্তু কৌশিক ভাই…”
কৌশিক মাঝপথেই গাড়ি থামাল, নির্দিষ্ট স্বরে বলল,
“তুই আমাকে ভালোবাসিস তো?”
মায়া অদ্ভুতভাবে থেমে গিয়ে কয়েক সেকেন্ড নীরব থাকল, তারপর বলল,
“হ্যাঁ, কিন্তু…”
কৌশিকের চোখে তখন কোন অমায়িকতা নেই। সে নির্দিষ্টভাবে বলল,
“তাহলে কোন কথা না বলে চুপচাপ লক্ষী মেয়ের মতো বসে থাক।”

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ২৭