প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৩২
আরাফাত আদনান সামি
রাতের গভীরতা যখন সর্বোচ্চ, ঠিক তখন পুরো ঢাকা শহর এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ঢাকা পড়ে যায়। চৌধুরী ভিলার সেই বিশাল লাক্সারিয়াস বেডরুমের জানালার ভারী সিল্কের পর্দাগুলো এখন সম্পূর্ণ টানা। বাইরের হাইওয়ের ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো, আকাশের মায়াবী জোছনা কোনো কিছুই এই ঘরের ভেতরের নিবিড় অন্ধকারকে ভেদ করতে পারছে না। ঘরের ভেতরের এসি-র মৃদু গুঞ্জন আর বাতাসে ভাসতে থাকা রজনীগন্ধা ও কৌশিকের চেনা কড়া পারফিউমের মিশ্র সুবাস। বিশাল রাজকীয় পালঙ্কের ঠিক মাঝখানে, ধবধবে সাদা চাদরের ওপর মায়া ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। তার শরীরটা এক অদ্ভুত ক্লান্তিতে অবশ। গাঢ় নীল শিফন শাড়িটা শরীরের সাথে পেঁচানো, খোঁপাটা সেই হাইওয়ের লং ড্রাইভে যাওয়ার সময়ই খুলে গিয়েছিল, এখন সেই রেশমি কালো চুলের গোছাগুলো বিছানাময় চাদরের ওপর ডানা মেলে ছড়িয়ে আছে। ঠোঁটের লিপস্টিক উধাও, চোখের কাজল লেপ্টে গিয়ে চোখের নিচে এক মায়াবী ছায়া তৈরি করেছে।
কৌশিক মায়াকে নিজের বুকের সাথে একদম পাথর চাপা দেওয়ার মতো করে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে। তার একটা বলিষ্ঠ পা মায়ার দু পায়ের ওপর লক করা, আর একখানা চওড়া হাত মায়ার নরম কোমরের ভাঁজে এমনভাবে কামড়ে ধরে রাখা, যেন একটু আলগা হলেই তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদটা হারিয়ে যাবে। রাতের সেই তীব্র লং ড্রাইভ আর গাড়ির ভেতরের সেই শ্বাসরুদ্ধকর ভালোবাসার ঝড় তাদের দুজনকে শারীরিকভাবে ক্লান্ত করলেও, মানসিকভাবে এক অনাবিল প্রশান্তি দিয়েছে।
সময় তার নিজস্ব গতিতে বয়ে চলে। ঘড়ির কাঁটা যখন ভোর পাঁচটা ছুঁইছুঁই, তখন মায়ার বন্ধ চোখের পাতা দুটো ধীরে ধীরে কেঁপে উঠল। তার শরীরের প্রতিটি জোড়ায় ব্যথা। নড়াচড়া করতে গিয়েই সে বুঝল, সে একপ্রকার অবরুদ্ধ। কৌশিকের তপ্ত নিশ্বাস তার কানের লতিতে, ঘাড়ের ওপর আছড়ে পড়ছে। প্রতিবার কৌশিক নিশ্বাস ছাড়ছে আর মায়ার শরীরের লোমকূপগুলো শিউরে উঠছে। মায়া আলতো করে নিজের মাথাটা একটু তুলল। ভোরের সেই মৃদু আলো-আঁধারিতে সে কৌশিকের মুখের দিকে তাকাল। শার্টের ওপরের তিনটে বোতাম খোলা, যার ভেতর দিয়ে তার সুগঠিত চওড়া বুকটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ঘুমের ঘোরে কৌশিককে কতটা গম্ভীর অথচ কতটা আকর্ষণীয় লাগছে! মায়া নিজের হাতটা আলতো করে কৌশিকের গালে রাখল। তার দাড়িগুলোর শক্ত স্পর্শ মায়ার নরম হাতের তালুতে এক অন্যরকম ভালোলাগা এনে দিল।
মায়া মনে মনে ভাবল,
‘এই মানুষটা কতটা ভালোবাসে আমাকে! ওর এই পজেসিভনেস, এই পাগলামি না থাকলে হয়তো আজ আমি অন্য কারও ঘরে থাকতাম। ভাবতেই বুকটা কেমন কেঁপে ওঠে।’
ঠিক তখনই কৌশিক ঘুমের ঘোরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মায়ার কোমরটা আরও শক্ত করে নিজের দিকে টেনে নিল। মায়া অপ্রস্তুত হয়ে কৌশিকের বুকের সাথে একদম লেপ্টে গেল।
কৌশিক চোখ না মেলেই, অত্যন্ত ভারী, ভাঙা আর ঘুম জড়ানো কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
“উমম সুইটহার্ট,কী করছিলে শুনি?”
মায়া চমকে উঠে নিজের হাতটা সরিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু কৌশিক তার আগেই মায়ার হাতটা ধরে নিজের বুকের ওপর চেপে ধরল। যেখানে তার হৃদপিণ্ডটা বেশ দ্রুত গতিতে ধকধক করছে।
মায়া আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করল,
“ক-কৌশিক ভাই! আপনি জেগে ছিলেন?”
কৌশিক এবার আস্তে আস্তে তার চোখ দুটো মেলল। সেই চেনা নেশাতুর চোখ, যা দেখলে মায়ার ভেতরের সমস্ত শক্তি যেন কর্পূরের মতো উড়ে যায়। কৌশিক মায়ার চোখের দিকে তাকিয়ে এক চিলতে হাসল। অতঃপর কৌশিক মায়ার কপালে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। বলল,
“তোর এই নরম হাতের ছোঁয়া পাওয়ার পর কৌশিক কী আর ঘুমাতে পারে, বল তো সুইটহার্ট? তুই যখন আমার গালে হাত দিলি, আমার মনে হলো আমার সারারাত জেগে থাকার সমস্ত ক্লান্তি এক নিমেষে শেষ হয়ে গেল।”
মায়া অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“সারারাত জেগে থাকা মানে? আপনি ঘুমাননি?”
কৌশিক মায়ার গালের ওপর আলতো করে নিজের আঙুল বোলাতে বোলাতে বলল,
“কীভাবে ঘুমাব? আমার বুকের ওপর একটা পরী ঘুমাচ্ছে, আর আমি চোখ বন্ধ করে সময় নষ্ট করব? আমি তোকে দেখছিলাম মায়া। তোর এই নিষ্পাপ মুখ, এই এলোমেলো চুল, আর তোর এই লেপ্টে যাওয়া কাজল, এইসব সবকিছু আমার চোখ ভোলাতে পারছিল না।”
মায়া লজ্জায় মুখটা আবার কৌশিকের বুকের খাঁজে লুকিয়ে ফেলল।
“আপনি না সত্যি একটা পাগল। নিজের বউকে কেউ এভাবে সারারাত জেগে জেগে দেখে নাকি? আমার নজর লাগবে না বুঝি?”
“লাগুক! কিন্তু সেটা আমার লাগুক অন্য কোন পরপুরুষের না। আর তোর দিকে যে নজর দিবে তার চোখ আমি উপড়ে নিব। আর আমার বউটাও তো কোন সাধারণ বউ নয়, আমার বউ একটা পরী, আমার পরী, আমার মায়াবিনী পরী। যার তীক্ষ্ণ এক দৃষ্টি এই কৌশিক নীর চৌধুরীকে পাগল করার ক্ষমতা রাখে। তুই আমার সেই মায়াবিনী পরী বুঝলি!”
কথাটা বলে কৌশিক একটু থামল অতঃপর মায়ার থুতনি ধরে মুখটা ওপরে তুলল। আবার বলল,
“কী যেন বলছিলি কাল রাতে? আমি খুব রুক্ষ আচরণ করি? এখন বল, এই অসভ্য লোকটার আদর কি খুব রুক্ষ ছিল, ওয়াইফি?”
কৌশিকের এই হঠাৎ প্রশ্নে মায়ার ফর্সা মুখটা মুহূর্তের মধ্যে টকটকে লাল হয়ে গেল। সে চোখ বন্ধ করে বলল,
“আপনি প্লিজ একটু চুপ করবেন? সকাল সকাল এসব কথা কেউ বলে? পাগল একটা।”
“তোর প্রেমে।”
মায়া ভ্রু কুঁচকালো,
“কী আমার প্রেমে?”
“পাগল।”
“অসভ্য। একটুও লজ্জা করে না?”
“মন দিয়ে শোন আমি কী বলি। আমার ডিকশনারিতে লজ্জা বলে কোনো শব্দ নেই, বিশেষ করে যখন আমি আমার এই মায়কবিনী পরীর কাছাকাছি থাকি।”
এই বলে কৌশিক মায়ার ঠোঁটের খুব কাছে নিজের মুখটা নিয়ে এল। বলল,
“আজকে কিন্তু কোনো বাহানা চলবে না। আই ওয়ান্ট মাই মর্নিং ডোজ, হানি।”
“না না না কৌশিক ভাই… প্লিজ… এখনি নিচে যেতে হবে আমাকে। মা হয়তো উঠে গেছেন। উনাকে রান্নার কাজে সাহায্য করতে হবে ছাড়ুন।”
মায়া বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল।
“মা উঠলে উঠুক।”
“অন্য কেউ চলে আসবে ছাড়ুন তো।”
“এই ঘরে ঢোকার পারমিশন কারও নেই। আর তাছাড়া, আমি এখন বিবাহিত। সাতসকালে নতুন দম্পত্তিদের ডিস্টার্ব করতে কেউ আসবেও না। গট ইট?”
কৌশিক আর কোনো কথা না বাড়িয়ে মায়ার ঠোঁট জোড়া নিজের ঠোঁটের গভীরে টেনে নিতে চাইল, কিন্তু মায়া চট করে নিজের মুখটা ডানদিকে ঘুরিয়ে নিল। কৌশিকের ঠোঁট গিয়ে পড়ল মায়ার নরম গালের ওপর। মায়ার এমন অবাধ্যতায় কৌশিকের চোখ দুটো সামান্য সরু হয়ে এল। তার ভেতরে এক আদিম পুরুষালি জেদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। কৌশিক গম্ভীর কণ্ঠস্বরে বলল,
“মায়া… আমার কথার অবাধ্য হওয়া আমি পছন্দ করি না, তুই খুব ভালো করেই জানিস।”
মায়া দুই হাত দিয়ে কৌশিকের চওড়া বুকটা ঠেলে দূরে সরানোর ব্যর্থ চেষ্টা করতে করতে বলল,
“না কৌশিক ভাই, সত্যি বলছি। আজ আমার শরীরটা বড্ড ম্যাচম্যাচ করছে। কাল রাতের ওই লং ড্রাইভ, তারপর… তারপর আপনার ওই বেপরোয়া… আই মিন, আমি খুব ক্লান্ত। আমার গায়ে একদম শক্তি নেই। আমি পারবো না।”
কৌশিক এক ঝটকায় মায়ার দুটো হাত ধরে তার মাথার ওপর চাদরের সাথে লক করে দিল। তার ভারী শরীরের পুরো ওজনটা মায়ার ওপর ছেড়ে না দিলেও, তার সান্নিধ্য মায়াকে একপ্রকার পিষে ফেলল। কৌশিক মায়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে তপ্ত নিশ্বাস ছেড়ে বলল,
“শক্তি নেই তো কী হয়েছে? শক্তি যা দেওয়ার, তা আমি দেব। তোমাকে শুধু আমার ছোঁয়াগুলো অনুভব করতে হবে, সুইটহার্ট।”
“কৌশিক ভাই, শুনুন না!”
মায়া এবার অন্য বাহানা খোঁজার চেষ্টা করল, তার কণ্ঠস্বরে আতঙ্ক ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে বলল, “আমার মনে হয় আমার জ্বর আসছে। দেখুন, আমার শরীরটা কেমন গরম হয়ে আছে।”
কৌশিক আলতো করে হাসল। সেই হাসিতে ছিল এক চরম মাদকতা। সে নিজের ঠোঁটটা মায়ার গলার লতিতে ছোঁয়াল, তারপর ধীরে ধীরে তার ঠোঁট জোড়া মায়ার কণ্ঠনালীর ওপর দিয়ে স্লাইড করে নিচে নামাতে নামাতে ফিসফিস করে বলল, “শরীর তো গরম হবেই, জান। এই আগুন তো আমার জ্বালানো। আর এই জ্বরের একমাত্র ওষুধ আজ আমার কাছেই আছে। কোনো প্যারাসিটামল কাজ করবে না।”
মায়ার পুরো শরীরটা শিউরে উঠল। কৌশিকের হাতের আঙুলগুলো এখন মায়ার শাড়ির আঁচলটা আলতো করে সরিয়ে তার উন্মুক্ত পেটের ওপর বৃত্তাকারে ঘুরছে। সেই স্পর্শে মায়ার ভেতরের সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে পড়তে লাগল। সে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল। তার ঠোঁট দুটো কাঁপছিল।
“ছে-ছেড়ে দিন… কেউ দেখে ফেলবে…”
মায়ার কণ্ঠস্বর এবার এতটাই দুর্বল হয়ে এল যে তা নিজের কান পর্যন্ত পৌঁছানোও দায়।
“কে দেখবে? এই চার দেয়ালের মাঝে তুই আর আমি। আর আমাদের মাঝে এখন কোনো তৃতীয় শক্তির প্রবেশ নিষেধ।”
কৌশিক তার ডান হাতটা মায়ার কোমরের নিখুঁত ভাঁজে স্থাপন করল। তার হাতের শক্ত ও উষ্ণ স্পর্শ মায়ার নরম চামড়ার ওপর এক তীব্র কামনার সৃষ্টি করল। মায়া নিজেকে সামলানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে বলল,
“কৌশিক ভাই, আমার খুব তৃষ্ণা পেয়েছে। প্লিজ, আমাকে এক গ্লাস পানি খেতে দিন। গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।”
কৌশিক মায়ার দিক থেকে চোখ না সরিয়েই টেবিলের ওপর রাখা পানির জগ আর গ্লাসের দিকে তাকাল। সে এক হাত দিয়ে গ্লাসে কিছুটা পানি ঢালল এবং গ্লাসটা মায়ার ঠোঁটের কাছে ধরল। মায়া এক ঢোক পানি গিলতেই কৌশিক গ্লাসটা সরিয়ে আবার টেবিলের ওপর রেখে দিল।
কৌশিক ঘোর লাগা কণ্ঠস্বরে বরল,
“পানি খাওয়া শেষ? এবার আমার তৃষ্ণা মেটানোর পালা।”
সে মায়ার নীল শিফন শাড়ির কুঁচিগুলো এক টানে আলগা করে দিল। মায়া আঁতকে উঠে বলল, “কৌশিক ভাই! কী করছেন এসব? সকাল বেলা… এভাবে…”
“এভাবেই, মায়া। আমার ভালোবাসা কোনো সময় মানে না, কোনো নিয়ম মানে না। কাল রাতে গাড়ির ভেতরে তোমাকে যেভাবে সম্পূর্ণ নিজের করে পেয়েছিলাম, আমার নেশা তাতে আরও বেড়ে গেছে। আমি যতবার তোমাকে ছুঁই, ততবার মনে হয় কম হয়ে যাচ্ছে।”
কৌশিক তার বলিষ্ঠ হাত দিয়ে মায়ার পিঠের ওপরের ব্লাউজের হুকগুলো এক এক করে খুলতে লাগল। মায়ার শরীরের প্রতিটা কোষে কোষে এক অদ্ভুত অবশ অনুভূতি ছড়িয়ে পড়তে লাগল। সে আর পারছে না। কৌশিকের এই বেপরোয়া, পজেসিভ আর তীব্র ভালোবাসার টান তাকে এক অতল গহ্বরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। কৌশিক তার মুখটা মায়ার উন্মুক্ত কাঁধের ওপর চেপে ধরল। তার দাঁতের হালকা কামড় মায়ার মুখে এক মৃদু যন্ত্রণার আর্তনাদ এনে দিল, যা পরক্ষণেই এক গভীর সুখে পরিণত হলো।
“কৌশিক… উমম… প্লিজ…”
মায়ার মুখ থেকে এবার কৌশিক ভাই শব্দটা হারিয়ে গেল। সে অবচেতনভাবেই কৌশিকের চুলগুলো নিজের আঙুলের মাঝে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। মায়ার এই আত্মসমর্পণ কৌশিককে আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলল। সে মায়ার ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁট দুটো এমনভাবে চেপে ধরল, যেন সে মায়ার ভেতরের সমস্ত নিশ্বাস শুষে নিতে চায়। মায়ার সমস্ত বাহানা, সমস্ত ফন্দি-ফিকির এক নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে গেল। কৌশিকের হাতের প্রতিটি স্পর্শ, তার শরীরের প্রতিটি ঘর্ষণ মায়াকে এক উন্মাতাল সাগরে ভাসিয়ে নিয়ে গেল।
ভোরের আলো তখন জানালার সিল্কের পর্দা ভেদ করে ঘরের ভেতরের অন্ধকারকে দূর করার চেষ্টা করছে। কিন্তু চৌধুরী ভিলার এই লাক্সারিয়াস বেডরুমের রাজকীয় পালঙ্কে তখন এক নতুন ঝড়ের সূচনা হয়েছে। যে ঝড়ে মায়া আবারও নিজের সমস্ত অস্তিত্ব হারিয়ে, কৌশিকের সেই তীব্র আর বেপরোয়া ভালোবাসার কাছে নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দিল। ঘরের বাতাসে রজনীগন্ধার সুবাস আর কৌশিকের কড়া পারফিউমের গন্ধ যেন আরও ঘনীভূত হয়ে উঠল, যা সাক্ষী রইল এক অবাধ্য, বেপরোয়া প্রেমের।
ঘড়ির কাঁটা যখন সকাল সাড়ে সাতটা, তখন মায়া ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বের হলো। এবার সে একটা বাসন্তী রঙের সুতির শাড়ি পরেছে, যার পাড়ে লাল সুতোর নিখুঁত কাজ করা। ভেজা চুলগুলো পিঠের ওপর এলোমেলো। সকালের কাঁচা রোদে মায়ার মুখটা চকচক করছে। তাকে দেখতে একদম স্নিগ্ধ, নিখাদ এক বাঙালি বধূর মতো লাগছে।
কৌশিক তখনো বিছানায় আধশোয়া হয়ে ল্যাপটপে অফিসের জরুরি কিছু ফাইল দেখছিল। মায়াকে এই লুকে ঘর থেকে বের হতে দেখে সে ল্যাপটপটা একপাশে সরিয়ে রেখে বিছানায় সোজা হয়ে বসল। তার চোখে এক পলকেই এক অন্যরকম নেশা আর মুগ্ধতা নেমে এল। কৌশিক ঠোঁটের কোণে একটা দুষ্টু আর চতুর হাসি ফুটিয়ে বলল,
“মাশাআল্লাহ,মাশাআল্লাহ,মাশাআল্লাহ। আমার বউকে তো আজ খুব সুন্দর লাগছে। তোর এই সৌন্দর্য দেখে আমার আবার মুড চলে আসছে, হানি।”
মায়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের শাড়ির আঁচলটা ঠিক করতে করতে আয়না দিয়েই কৌশিকের দিকে একপলক তাকাল। সে চোখ রাঙিয়ে রাগ দেখিয়ে বলল,
“আপনার ওই অসভ্য মুড দয়া করে নিজের কাছেই রাখুন। সকাল সকাল কোনো ভালো কথা আপনার মুখ থেকে বের হয় না? আমি নিচে যাচ্ছি, মা-কে রান্নায় সাহায্য করতে হবে। আপনিও আর অলসতা না করে তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নিচে আসুন। অসভ্য।”
কৌশিক বিছানা থেকে নেমে মায়ার দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে আসতে আসতে বলল,
“নিজের বউয়ের রূপের প্রশংসা করা যদি অসভ্যতা হয়, তবে আমি সারাজীবন অসভ্যই থাকতে রাজি, ওয়াইফি। তাছাড়া, ভোর সকালে যা হয়েছে…”
মায়া আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার সাহস পেল না। কৌশিক কাছে আসার আগেই সে চট করে ঘরের দরজা খুলে নিচে নেমে গেল। এটা দেখে কৌশিক পেছন থেকে উচ্চস্বরে হাসে উঠল। মায়া নিচে নামতেই রান্নাঘর থেকে সুস্বাদু খাবারের সুঘ্রাণ মায়ার নাকে এল। সে ধীর পায়ে গিয়ে দেখল তার শ্বাশুড়ি মা আর তার ছোট মামি রুটি বেলছেন আর সবজি-ভাজির তদারকি করছেন। মায়াকে রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মাহিমা চৌধুরী কাজ থামিয়ে পরম স্নেহে হেসে উঠলেন।
“এসো মা, এসো। ঘুম ভালো হয়েছে তো? শরীর ঠিক আছে তো তোমার?”
মায়া কুণ্ঠিত হয়ে দুই হাতের বাধন আলগা করল। শ্বশুরবাড়ির বড়দের সামনে এত দেরিতে ঘুম থেকে ওঠায় তার ভেতরে এক তীব্র লজ্জা কাজ করছিল। সে আমতা আমতা করে বলল,
“হ্যাঁ মা, ঠিক আছি। আপনারা সকাল সকাল কাজ শুরু করে দিয়েছেন, আমাকে একটু ডাকলেই তো হতো। আমি তো অনেক দেরি করে ফেললাম। সকালে উঠে আমারই তো আপনাদের সাহায্য করার কথা ছিল।”
সায়েরা চৌধুরী রুটি সেঁকতে সেঁকতে একটু শব্দ করেই হেসে উঠলেন।
“আরে না মায়া, নতুন বউয়ের এত সকালে ওঠার কোনো দরকার নেই। আমাদের কৌশিক তো এমনিতেই রুক্ষ স্বভাবের, সে যেভাবে নিজের জিনিসের ওপর অধিকার ফলায়। আর তুমি তো তার বিবাহিতা স্ত্রী।”
সায়েরা চৌধুরীর কথায় মায়া লজ্জায় যেন মাটির সাথে মিশে যেতে চাইল। তার ফর্সা গাল দুটো মুহূর্তের মধ্যে লাল গোলাপের মতো টকটকে হয়ে উঠল। সে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে কথা ঘোরানোর জন্য বলল,
“মামি, দিন ওটা আমাকে দিন, আমি রুটিগুলো সেঁকে দিই? আপনারা অনেকক্ষণ ধরে করছেন, এবার একটু বসে বিশ্রাম নিন আপনারা দুইজন। আমি সব কাজ সামলে নিব।”
মাহিমা চৌধুরী হাত ধুয়ে বললেন,
“আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি যখন এতই করে বলছ, তবে এই নাও বেলন-চৌকি। কটা রুটি বেলে দাও তো দেখি, দেখি তোমার হাতের রুটি কেমন গোল হয়।”
মায়া হাসিমুখে শাড়ির আঁচলটা কোমরে ভালো করে গুঁজে নিয়ে কাজ শুরু করল। তার হাতের প্রতিটি রুটি যেন একদম নিখুঁত গোল গোল হচ্ছিল। মায়ার এই নিপুণতা দেখে মাহিমা চৌধুরী ভীষণ খুশি হলেন। তিনি সায়েরা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
“দেখলে সায়েরা? মায়ার হাত তো খুব সুন্দর। একদম পারফেক্ট রুটি হচ্ছে। আজকালকার যুগের মেয়েরা তো গোল রুটি বানানো তো দূরে থাক ময়দা পর্যন্ত মাখতে পারে না।”
ঠিক তখনই তিয়াশা ড্রইংরুম হয়ে রান্নাঘরের সামনে দিয়ে গটগট করে হেঁটে যাচ্ছিল। মায়াকে সুতির শাড়ি পরে রান্নাঘরে সাধারণ গৃহবধূর মতো কাজ করতে দেখে সে ভেতরে ঢুকল না। সে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে নাক সিটকে দূর থেকেই উচ্চস্বরে বলল,
“মা, আমার ব্রেকফাস্টটা টেবিলে দিয়ে দিও তো। আর হ্যাঁ, আজ কিন্তু আমি কন্টিনেন্টাল ছাড়া কিছু খাব না। এই সকাল বেলা তেল-ঝালের রুটি-ভাজি আর ময়দার জিনিস আমার ডায়েটের সাথে একদমই স্যুট করে না। আই নিড মাই ওটস এন্ড এগ হোয়াইটস।”
সায়েরা চৌধুরী মেয়ের এই নখরা দেখে রুটি সেঁকার চাটুটা নামিয়ে রেখে রেগে গিয়ে বললেন, “তিয়াশা! তোকে যদি এতই তোর ডায়েটের আর মডার্ন খাবারের চিন্তা থাকে, তবে নিজে এসে রান্নাঘরে বানিয়ে নে। মায়া কষ্ট করে সবার জন্য রুটি করছে, আর আজ এই বাড়িতে ওটাই সকালের মেনু। তোকেও ওটাই খেতে হবে।”
তিয়াশা মুখ বাঁকিয়ে মায়ার দিকে একটা অবজ্ঞার দৃষ্টি হেনে বলল,
“আমি ওই মিডল ক্লাস মেনু খেতে পারব না মা। ওসব খেয়ে আমার মেদ বাড়ানোর কোনো ইচ্ছে নেই। ভাইয়াকে বলো আমাকে বাইরে থেকে কোনো ভালো ক্যাফে থেকে ব্রেকফাস্ট আনিয়ে দিতে।”
“কাকে বাইরে থেকে ব্রেকফাস্ট আনিয়ে দিতে হবে তিয়াশা?”
ঠিক তখনই পেছন থেকে কৌশিকের গম্ভীর কন্ঠস্বর শোনা গেল। কৌশিকও সিড়ি বেয়ে নিচে নামছিল। কৌশিক ফ্রেশ হয়ে একটা নীল রঙের ক্যাজুয়াল শার্ট আর কালো ট্রাউজার পরে নিচে নেমে এসেছে। তার চুলগুলো এখনো হালকা ভেজা, যার দুই-একটা ফোঁটা তার কপালে লেপ্টে আছে। কৌশিকের গলার আওয়াজ শুনে তিয়াশা পলকেই থমকে গেল। সে বলল,
“আমাকে।”
“কোনো? বাহিরের খাবার কেনো আজকে কী ঘরে রান্না হচ্ছে না?”
“এত কিছু জানি না। আর নিজের ছোট বোনের জন্য একটু কষ্ট করে বাহির থেকে খাবার এনে দিলে তোমার কোন ক্ষতি হবে কী?”
তিয়াশার কথাে কোন উত্তর দিল না কৌশিক। সে রান্নাঘরে ঢুকে মায়ার একবারে পাশে গিয়ে দাঁড়াল। মায়ার কপালে জমে থাকা ঘাম সে নিজের ডান হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে পরম যত্নে আর সবার সামনেই আলতো করে মুছে দিল। মায়া লজ্জায় মাথা নিচু করে রইল। এরপর কৌশিক তিয়াশার দিকে তার সেই তীক্ষ্ণ আর হিমশীতল চোখ দুটো তুলে তাকাল। কৌশিক তিয়াশার দিকে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“এই বাড়িতে যা রান্না হবে, তোকে সেটাই খেতে হবে তিয়াশা। মায়া এই সকাল বেলা রান্নাঘরে এসে সবার জন্য কষ্ট করে রুটি বেলছে, আর তুই এখানে এসে তোর মডার্ন ডায়েটের নখরা দেখাচ্ছিস? তোর যদি কন্টিনেন্টাল বা ওটস খাওয়ার এতই শখ থাকে, তবে এই মুহূর্তেই নিজে রান্নাঘরে ঢুকে নিজের খাবার নিজে তৈরি কর। অন্যথায় টেবিলে যা দেওয়া হবে, চুপচাপ সেটা খেয়ে নিজের ঘরে গিয়ে পড়াশোনা কর। এই বাড়িতে বাহিরের কোন খাবার আসবে না আর না আমি এই বাড়িতে বাড়তি কোনো নাটক আমি সহ্য করব।”
তিয়াশা রাগে ও অপমানে ফুসতে ফুসতে বলল, “ভাইয়া! তুমি এই সামান্য একটা মেয়ের জন্য, যে কিনা পরশু এই বাড়িতে এসেছে, তার জন্য আমার সাথে এভাবে কথা বলছ? ও আসার পর থেকেই দেখছি এই বাড়িতে আমার কোনো ভ্যালু নেই! সবাই ওকে নিয়েই নাচানাচি করছে!”
“ভ্যালু নিজের আচরণের মাধ্যমে তৈরি করতে হয় তিয়াশা, অহংকার আর অবজ্ঞা দিয়ে নয়। মায়া এই চৌধুরী ভিলার বড় বউ, ওর সম্মান এই বাড়িতে সবার ওপরে। ওটা নিজের ওই গোবর মাথায় ভালো করে ঢুকিয়ে রাখ।”
কৌশিক বরফশীতল কণ্ঠে তার শেষ সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিল। তিয়াশা আর কোনো কথা বলার সাহস পেল না। সে রাগে পা দাপাতে দাপাতে ড্রইংরুমের দিকে চলে গেল। সায়েরা চৌধুরী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“কৌশিক বাবা, তুই সকাল সকাল এত রাগ করিস না তো। একটু অবুঝ।”
কৌশিক মায়ার দিকে গভীর চোখে তাকিয়ে মায়ের উদ্দেশ্যে বলল,
“কাকি,ও অবুঝ নয়, ওর মাথায় কী কী চলে সেটা আমি ব্যতীত এই বাড়ির আর কেউ জানে না এবং কী ওর নিজের ভাই রোহিতও না। কাকার লায় পেয়ে পেয়ে ওর স্বভাবটাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছো। ওকে এখন লাই দিলে ও মায়াকে আরও ছোট করার চেষ্টা করবে, যা আমি এই বাড়িতে বেঁচে থাকতে কখনোই অ্যালাউ করব না। মায়া, তুমি রুটি করা শেষ করে তাড়াতাড়ি ডাইনিং টেবিলে আসো। আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।”
এই বলে কৌশিক ড্রইংরুমের দিকে চলে গেল। মায়া রুটি বেলতে বেলতে মনে মনে এক অদ্ভুত ও পরম শান্তি অনুভব করল। যে পুরুষ তার সম্মানের জন্য নিজের চাচাতো বোনের অন্যায় আচরণের সাথেও বিন্দুমাত্র আপোষ করে না, তার চেয়ে উত্তম ও নিরাপদ স্বামী আর কে হতে পারে! মায়ার চোখ দুটো সামান্য ভিজে উঠল।
সকাল সাড়ে আটটায় ডাইনিং টেবিলে চৌধুরী পরিবারের প্রায় সব সদস্যই জড়ো হয়েছেন। আশরাফ চৌধুরী আর আসিফ চৌধুরী রোজকার মতো খবরের কাগজ পাশে রেখে সকালের গরম চায়ে চুমুক দিচ্ছেন আর দেশের রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করছেন। টেবিলে তখন ধোঁয়া ওঠা গরম গরম রুটি, সুজি, সবজি আর আলুর দম সুন্দর করে সাজানো। মায়া আর মাহিমা চৌধুরী মিলে সবাইকে খাবার বেড়ে দিচ্ছিলেন। কৌশিক নিজের নির্দিষ্ট চেয়ারে বসে শুধু মায়ার প্রতিটি নড়াচড়া, তার শাড়ির আঁচল সামলানোর ভঙ্গি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে লক্ষ্য করছে। ঠিক তখনই রোহিত হন্তদন্ত হয়ে ডাইনিং রুমে ঢুকল। তার চুলগুলো পুরোপুরি এলোমেলো, চোখে তখনো ঘুম রেস। সে এসেই কৌশিকের ঠিক পাশের চেয়ারটায় ধপাস করে বসে পড়ল। টেবিলে এত খাবার দেখে সে বলল,
“গুড মর্নিং এভরিওয়ান! বাপরে বাপ, এত রান্না কে করেছে?”
সায়েরা চৌধুরী নিজের ছেলের কথা শুনে বললেন,
“সব মায়া করেছে।”
“বাহ্ কী মিষ্টি ঘ্রাণ বের হচ্ছে খাবার থেকে। একেই আজ যা খিদে লেগেছে আমার, তার উপর চোখের সামনে এত এত খারার। খিদে তো দ্বিগুণ হয়ে গেলো। এখন তো খিদের ঠেলায় আমার পেটে তেলাপোকা দৌড়া দৌড়ি শুরু করে দিয়েছে।”
এই বলে রোহিত তারাতাড়ি নিজের ফাঁকা প্লেটটা মায়ার দিকে একটু এগিয়ে দিয়ে বলল,
“ভাবি, জলদি জলদি দুটো রুটি আর বেশি করে আলুর দম দাও তো। তোমার হাতের প্রথম সকালের রান্না, আজ তো আমি পুরো চেটেপুটে প্লেট সাফ করে দেব।”
মায়া হাসিমুখে রোহিতের প্লেটে যত্ন করে খাবার বেড়ে দিল।
“নিন ভাইয়া, খেয়ে দেখুন কেমন হয়েছে। ঝাল বা লবণ কম হলে বলবেন।”
রোহিত এক লোকমা আলুর দম আর রুটি মুখে দিয়েই চোখ বন্ধ করে ফেলল, যেন সে কোনো স্বর্গীয় স্বাদ পেয়েছে।
“ওহ্ মাই গড! ব্রো, তুই তো জাস্ট লটারি জিতেছিস রে! ভাবির হাতের আলুর দম জাস্ট নেক্সট লেভেল। আম্মু তুমি তো ফেল।”
সায়েরা চৌধুরী টেবিলের ওপাশ থেকে বললেন, “হ্যাঁ রে বাঁদর! আমার রান্না তো এখন তোর তিতো লাগবেই। নতুন রূপবতী ভাবি এসেছে বলে কথা, এখন তো সব ওরটাই ভালো লাগবে।”
রোহিত হাসতে হাসতে কৌশিকের দিকে তাকাল, যে কিনা অত্যন্ত শান্ত ভঙ্গিতে রুটি মুখে দিচ্ছিল। রোহিত কৌশিকের দিকে একটু ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে, কিন্তু টেবিলে বসা বাকিদের আড়ালে বলল,
“কী রে ব্রো? কাল রাতের লং ড্রাইভ কেমন হলো? আমি তো তোদের গাড়িটা ওই অন্ধকারের মধ্যে হাইওয়ের পাশে একটা বড় গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। দূর থেকে ভাবলাম তোদের লাক্সারিয়াস গাড়ির এসি বুঝি হঠাৎ নষ্ট হয়ে গেছে, তাই গাড়ি থামিয়ে তোরা দুজনে খুব হাওয়া খাচ্ছিস!”
রোহিতের এই দুষ্টুমি ভরা কথা শুনে মায়ার হাত কাঁপতে লাগল। সে যে চামচ দিয়ে সুজি বাড়ছিল, সেটা প্রায় হাত থেকে পড়েই যাচ্ছিল। সে তীব্র লজ্জায় লাল হয়ে ছটফট করতে করতে মাথা নিচু করে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। কৌশিক রুটি খাওয়া শেষ করে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিল। রোহিতের কথাগুলো তার কানে পৌঁছানো মাত্র সে কাপটা পিরিচের ওপর খট করে রাখল। তারপর রোহিতের দিকে এক তীব্র, তীক্ষ্ণ আর জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“রোহিত, তোর চোখ দুটো কি রাস্তায় চলার সময় একটু বেশিই ঘোরে? ড্রাইভ করার সময় নিজের লাইনের দিকে সোজা তাকাতে পারিস না? নাকি তোর চোখে মরিচ ডালতে হবে?”
রোহিত চোখ টিপে আবার ফিসফিস করল, “আরে ব্রো, আমি তো জাস্ট তোদের সুরক্ষার কথা ভাবছিলাম। হাইওয়ের পাশে ওভাবে রাতের বেলা গাড়ি থামিয়ে রাখা কি নিরাপদ? তা ভাবি, ভাইয়া কি কোনো রোমান্টিক ডায়লগ ফায়লগ দিয়েছিল? নাকি আবার সেই প্রসে…”
আসিফ চৌধুরী টেবিলের ওপর থেকে ধমক দিয়ে বললেন,
“রোহিত! সকাল সকাল বড় ভাইয়ের সাথে কীসব ফাজলামি শুরু করেছিস? চুপচাপ নিজের প্লেটের খাবার শেষ কর।”
রোহিত তার বাবাকে দেখে একটু দমে গেল, কিন্তু কৌশিককে ক্ষ্যাপানোর যে আনন্দ, তা সে বন্ধ করল না। সে আবার মায়াকে লক্ষ্য করে নিচু স্বরে বলল,
“ব্রো, রাগ করিস না। আমি তো জাস্ট ভাবির শারীরিক কন্ডিশন দেখছিলাম। একমাত্র ভাবি বলে কথা। তা ভাবিকে আজ একটু বেশিই ক্লান্ত লাগছে। তুই কি রাতে ভাবিকে একটুও ঘুমাতে দিসনি? নাকি পুরো রাতটাই…”
কৌশিক এবার আর শান্ত থাকতে পারল না। সে সবার আড়ালে রোহিতের বডির ওপর সপাটে একটা ঘুসি মারল। রোহিত বাসের মতো ব্যথায় ‘আহ্’ করে হাত চেপে ধরে কুঁকড়ে উঠল।
কৌশিক একটু ফিসফিস করেই বলল,
“রোহিত, তুই যদি আর একটাও ফালতু কথা বা লিমিট ক্রস করা কথা বলিস, তবে আজ আমি উল্টো করে ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে রাখবো। ভাবির সাথে কীভাবে কথা বলতে হয়, তা আগে ভালো করে শেখ। সাথে তোর ফান্ড টাও আটকে দিব।”
ফান্ডের কথা শুনতেই রোহিতের মুখের সমস্ত রঙ চট করে উড়ে গেল। সে তৎক্ষণাৎ নিজের দুই হাত জোড় করে বাচ্চার মতো মুখ করে বলল,
“আরে ব্রো! তুই সব সময় সিরিয়াস হয়ে যাস কেন! আমি তো জাস্ট একটু মজা করছিলাম তোদের সাথে। তুই তো আমার আইডল, আমার জানের ভাই। প্লিজ ফান্ডটা আটকে দিস না ভাই! আমি আর একটা কথাও বলব না, প্রমিস!”
আশরাফ চৌধুরী হেসে উঠলেন। তিনি বললেন, “কৌশিক, ও তো তোর ছোট ভাই। নতুন ভাবি এসেছে, একটু দুষ্টুমি তো করবেই। তুই সবসময় এত রেগে যাস কেন বল তো?”
কৌশিক শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল,
“আব্বু, ও দুষ্টুমি করুক, তাতে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু সবকিছুর একটা লিমিট থাকা উচিত। মায়া এই বাড়িতে বউ হয়ে এসেছে, ওর সামনে এসব আজেবাজে কথা বললে ও আনকমফোর্টেবল ফিল করে। আমি চাই না আমার বউ আমারই পরিবারে এসে লজ্জা পাক বা গুটিয়ে থাকুক।”
মায়া কৌশিকের এই প্রোটেক্টিভ স্বভাবের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবল, ‘এই মানুষটা কত ছোট ছোট বিষয়েও আমার স্বাচ্ছন্দ্যের খেয়াল রাখে।’ সে রোহিতকে এই কঠিন পরিস্থিতি থেকে বাঁচানোর জন্য কৌশিকের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
“বাদ দিন তো। ভাইয়া তো এমনিই ঠাট্টা করছিলেন। প্লিজ আপনি এত রাগ করবেন না।”
রোহিত মায়ার দিকে এক গাল হেসে বলল, “দেখেছিস ব্রো? ভাবি কত ভালো বুঝে আমাকে আর কত ভালো! তুমি আস্ত একটা হিটল…”
কথা বলার মাঝেই কৌশিকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দেখে রোহিত চুপ করে গেলো। তারপর মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“থ্যাঙ্ক ইউ ভাবি, আজ তোমার এই সুপারিশের জন্যই আমার কোটি টাকার ফান্ডটা বেঁচে গেল। আজ থেকে তুমিই আমার আসল বস।”
টেবিলের পরিবেশ আবার হাসিখুশি ও স্বাভাবিক হয়ে উঠল। তিয়াশা ডাইনিং টেবিলের এক কোণায় বসে চুপচাপ নিজের ওটস চিবোচ্ছিল আর মায়ার প্রতি সবার এই ভালোবাসা আর মনোযোগ দেখে তার ভেতরের হিংসার আগুন আরও দাউদাউ করে জ্বলছিল।
দুপুরের দিকে আশরাফ চৌধুরী আর আসিফ চৌধুরী অফিসের আর্জেন্ট কিছু বিশেষ কাজে বাইরে বেরিয়ে গেলেন। মাহিমা চৌধুরী আর সায়েরা চৌধুরী নিজেদের ঘরে দুপুরের বিশ্রামের জন্য শুয়েছিলেন। মায়াও ড্রইংরুমের বড় বড় কাঠের বইয়ের তাকগুলো একটা সুতি কাপড় দিয়ে পরিষ্কার করছিল। সে জানত না যে এই বিশাল চৌধুরী ভিলার এক কোণে একটা রাজকীয় লাইব্রেরি ঘরও আছে। অথচ সে তার মামার বাড়ি বেড়াতে প্রায় প্রতি বছরেই আসতো তার বাবা মায়ের সাথে। রোহিত ড্রইংরুম দিয়ে যাওয়ার সময় মায়াকে কাজ করতে দেখে দাঁড়িয়ে গেল। সে বলল,
“ভাবি, তুমি যদি বই পড়তে ভালোবাসো, তবে দোতলার একদম শেষ মাথার কর্নারের লাইব্রেরি ঘরে যেতে পারো। ওটা ব্রো-র নিজস্ব রাজ্য। ওখানে ভাইয়ার কালেকশনের হাজার হাজার দেশী-বিদেশী বই আছে। আমাদের কৌশিক নীর চৌধুরী তো একটা আস্ত বুকওয়ার্ম, ব্যবসার বাইরে ও শুধু বই বোঝে আর এখন তোমাকে।”
রোহিতের কথা শুনে মায়া চমকে উঠল। সে বলল,
“কী বললেন? কৌশিক ভাইয়ার আলদা লাইব্রেরি আছে তাও বইয়ের? আর ইনি বই পড়তে এতটা পছন্দ করেন?”
“হ্যাঁ।”
“কই আমি তো ছোট থেকে কখনো উনাকে বই পড়তে দেখি নি আর না এইসব লাইব্রেরি সম্পর্কে জানতাম। আর না আমি এইসব লাইব্রেরি এই বাড়িতে আগে কখনো দেখেছি।”
“তোমরা আসতেই কয়েকদিনের জন্য। আর তুমি হয়তো ভুলে যাচ্ছো এটা আমাদের নতুন বাড়ি। আর এই বাড়ির সব রুমে তুমি এখনো যাও নি।”
“হ্যাঁ তা তো ঠিক। কিন্তু…”
“কোন কিন্তু টিন্তু নয় আমার কাজ আছে আমি গেলা।”
বলেই রোহিত চলে গেলো। রোহিতের এইসব কথা শুনে মায়া কিছুক্ষণ স্থীর দাড়িয়ে রইল। মায়ার ছোটবেলা থেকেই সৃজনশীল বই পড়ার দারুণ শখ ছিল। সে রোহিতের কথা শুনে ভীষণ উৎসাহিত হয়ে উঠল। হাতের কাজ শেষ করে সে কৌতূহল সামলাতে না পেরে দোতলার সেই লাইব্রেরি ঘরের দিকে পা বাড়াল। লাইব্রেরি ঘরের বিশাল মেহগনি কাঠের দরজাটা হালকা খোলাই ছিল। মায়া আলতো করে ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই বিস্ময়ে তার মুখ হাঁ হয়ে গেল। চারদিকের দেওয়াল জুড়ে ছাদ পর্যন্ত বিশাল বিশাল কাঠের আলমারি, আর তাতে থরে থরে সাজানো বিশ্ববিখ্যাত ক্লাসিক উপন্যাস, মোটা মোটা পৃথিবীর ইতিহাসের বই আর কবিতার বই আর না জানি কত কত রকমের বই। ঘরের মাঝখানে একটা আরামদায়ক চামড়ার সোফা আর একটা বড় প্রাচীন ধাঁচের কাঠের টেবিল, যার ওপর একটা ল্যাম্পপোস্ট রাখা। মায়া মন্ত্রমুগ্ধের মতো একটা আলমারির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখ পড়ল একটা চমৎকার ভিন্টেজ সংস্করণের প্রাচীন উপন্যাসের ওপর। সে বইটা বের করতে গেল। কিন্তু বইটা তার উচ্চতার চেয়ে কিছুটা ওপরে হওয়ায় সে সহজে নাগাল পাচ্ছিল না। মায়া তার বাসন্তী শাড়ির কুঁচিটা এক হাত দিয়ে ধরে পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে শরীরটা টানটান করে হাতটা ওপরে বাড়াল। ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা বলিষ্ঠ, চওড়া আর উষ্ণ পুরুষালি শরীর মায়ার নরম পিঠের সাথে এসে শক্তভাবে মিশে গেল। মায়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটা বড়, শিরা উপশিরা জাগা হাত মায়ার হাতের ওপর দিয়ে গিয়ে বইটা আলমারি থেকে আলতো করে পেড়ে নিল। মায়া চমকে উঠে তীব্র গতিতে পেছনে ঘুরতেই তার নাক গিয়ে ঠেকল কৌশিকের শক্ত বুকে। কৌশিক বইটা মায়ার হাতে না দিয়ে নিজের হাতের মুঠোতেই রাখল।
“বই পড়তে এসেছিস নাকি সুইটহার্ট?”
“হ্যাঁ।”
“তা নিজের বই পড়ে শেষ করেছিস?”
“না।”
“কেনো?”
“এমনি।”
“সামনে না তোর বোর্ড পরীক্ষা?”
“কিসের বই আর কিসের বোর্ড পরীক্ষার কথা বলছেন? বিয়ে হয়ে গেছে আমার বুঝেছেন মিস্টার মানে লেখা পড়া থেকে একদম ছুটি কোন পরীক্ষা টরিক্ষা দিব না আমি।”
কৌসিক গম্ভীর কণ্ঠস্বরে বলল,
“বুঝতে পারছি খুব ভালো ভাবেই মাথায় সয়তান চড়েছে! যাগ্গে সন্ধ্যা হতেই থেকে পড়তে বসবি।”
কৌশিকের মুখ থেকে এমত কথা শুনে মায়া যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে মনে মনে বলল,
“বিয়েটা হয়ে যাওয়ার পর আমি কত খুশি ছিলাম।ভেবেছিলাম অবশেষে লেখাপড়ার এই প্যারাময় জীবন থেকে মুক্তি পেলাম। বিয়ের আগে অবশ্য পড়াশোনা করতে খারাপ লাগত না, কিন্তু বিয়ের পর বুঝলাম লেখা পড়ার থেকে সংসার সামলানোই বরং অনেক সহজ। তাই মনে মনে ভাবছিলাম, যাক! এবার অন্তত বই-খাতার ঝামেলা থেকে রেহাই মিলল। কিন্তু কোথায় কী! সব তো উল্টো হয়ে গেল। যে মানুষটা তিনদিন আগেও আমার পরীক্ষার কথা শুনে রেগে আগুন হয়ে গিয়েছিল, আজ সেই মানুষটাই আবার পড়াশোনা নিয়ে এত কথা বলছে! হে মাবুদ, আমাকে তুলে নাও তবুও এই লেখাপড়ার প্যারাভরা জীবন আমাকে আর ফিরিয়ে দিয়ো না! একে এই অসভ্য সাবজেক্টের চাপ তার উপর এই লেখা পড়ার মতো অপদার্থ সাবজেক্টের চাপ যোগ হচ্ছে। মাবুদ তোমার এই নিষ্পাপ মায়ার প্রতি কী একটুও মায়া-দয়া হচ্ছে না? এত চাপে আমি পিষে যাবো তো।”
“যাগ্গে রাতেরটা রাতে দেখা যাবে। তা আমার এই বিশাল কালেকশনের মাঝে তোর কোন বইটা বেশি পছন্দ হলো?”
কৌশিক মায়ার কানের লতির খুব কাছে নিজের মুখটা নিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল। তার তপ্ত নিশ্বাস মায়ার ঘাড়ে আছড়ে পড়ল। মায়ার বিড়বিড়ের মাঝে হঠাৎ কৌশিকের কথাতে মায়া চমকে উঠল।
“একটা। এটা দারুণ একটা উপন্যাস দেখছিলাম। অনেকদিন ধরে পড়ার ইচ্ছে ছিল। দিন না বইটা।”
মায়া আমতা আমতা করে বলল। তার হার্টবিট অলরেডি দ্রুত চলতে শুরু করেছে।
“বই তো দেব, জান। তবে তার আগে আমার একটা বকেয়া পাওনা মেটাতে হবে।”
কৌশিক মায়াকে আলমারির শক্ত কাঠের সাথে নিজের শরীর দিয়ে চেপে ধরল, যাতে মায়ার পালানোর কোনো পথ না থাকে।
“কীসের পাওনা? আর আপনি দুপুর বেলা এই নির্জন ঘরে এসে কী শুরু করলেন? কেউ দেখে ফেললে কী ভাববে?”
কথাটা বলে মায়া কৌশিকের শক্ত বুকে দুই হাত দিয়ে তাকে দূরে সরানোর এক ব্যর্থ চেষ্টা করল। কৌশিক মায়ার বাসন্তী শাড়ির আঁচলটা তার এক হাত দিয়ে আলতো করে সরাতে সরাতে বলল। তার অন্য হাতটা মায়ার কোমরের নগ্ন অংশে গিয়ে স্থির হলো।
“আর পাওনার কথা বলছিস? সেইদিন রাতে তুই নিজেই আমাকে বলেছিলি যে তুই আমার এই ভালোবাসার কয়েদখানা থেকে কোনোদিন মুক্তি চাস না। তো, কয়েদির ওপর তো এই জেলার এর কিছু এক্সট্রা অধিকার থাকেই, তাই না, হানি?”
“কৌশিক… প্লিজ… এটা লাইব্রেরি ঘর। মা বা কাকি যেকোনো সময় চলে আসতে পারেন।”
মায়ার গলার আওয়াজ এবার পুরোপুরি বুজে এল। কৌশিকের হাতের প্রতিটি উষ্ণ স্পর্শ তার সুতির শাড়ির ওপর দিয়ে তার শরীরে এক তীব্র কামনার আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছিল, যা সে মুখে অস্বীকার করলেও তার শরীর সায় দিচ্ছিল।
“কেউ আসবে না মায়া। এই ঘরে আমার পারমিশন ছাড়া বাড়ির কোন সদস্যরাও ঢোকার সাহস পায় না।”
“কিন্তু আমি আপনার বউ। আপনার সব কিছুতেই আমার এখন অধিকার আছে। বুঝলেন মিস্টার অসভ্য!”
বলেই মায়া কৌশিকের হাত থেকে বইটা নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেলো। কৌশিক মায়াকে দৌড়ে যেতে দেখে মুচকি হেঁসে বলল,
“আরে আস্তে যা পড়ে যাবি তো। পাগলী মেয়ে একটা।”
বিকেল পাঁচটা। চৌধুরী ভিলার চারদিকের বিশাল সবুজ বাগানে মাহিমা চৌধুরী আর সায়েরা চৌধুরী বেতের চেয়ারে বসে চা খাচ্ছিলেন। মায়া তাদের জন্য রান্নাঘর থেকে নিজের হাতে গরম গরম পেঁয়াজু আর আলুর চপ ভেজে একটা বড় কাঁচের প্লেটে করে নিয়ে এল। মাহিমা চৌধুরী একটা মুচমুচে চপ মুখে দিয়ে তৃপ্তির হাসি হাসলেন।
“বাহ্ মায়া! তোমার হাতের চপ তো দারুণ হয়েছে। একদম পারফেক্ট মুচমুচে আর সুস্বাদু।”
মায়া হাসিমুখে মাথা নিচু করে বলল,
“ধন্যবাদ মা। আপনারা পছন্দ করলেই আমার সকাল-বিকালের এই কষ্ট সার্থক।”
ঠিক তখনই তিয়াশা তার স্কুলের ও হাই-সোসাইটির কিছু বন্ধুদের নিয়ে বাগানের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকল। তার বন্ধুরা সবাই খুব মডার্ন, উশৃঙ্খল আর অতি উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়ে। কিন্তু নিধি ব্যতিত নিধি তাদের মতো এত বড়লোক পরিবারের নয়। তিয়াশার সাথে নিধিও ছিল। তিয়াশা মায়াকে সাধারণ সুতির শাড়ি পরা অবস্থায় খাবার পরিবেশন করতে দেখে তার বন্ধুদের সামনে নিজের আভিজাত্য দেখানোর জন্য আর মায়াকে ছোট করার জন্য একটা চাল চালল। তিয়াশা মায়ার সামনে এসে অত্যন্ত অবজ্ঞার সুরে বলল,
“এই যে মায়া আপু উফ্ সরি ভাবি, আমার বন্ধুদের জন্য একটু কোল্ড কফি আর কিছু স্যান্ডউইচ বানিয়ে নিয়ে এসো তো রান্নাঘর থেকে। আর হ্যাঁ, একটু তাড়াতাড়ি করো, ওদের আবার মলে শপিংয়ে যেতে হবে। লেট কোরো না।”
তিয়াশাকে মায়ার সাথে এইভাবে কথা বলতে দেখে নিধি বলল,
“তিয়াশা কীভাবে কথা বলছি মায়া আপু না তোর বড় বোন হয়? আর এখন তোর ভাবিও।”
“হ্যাঁ তো? দেখ নিধি অন্যজনের সাপোর্ট নিয়ে কথা বলা বন্ধ কর।”
তিয়াশার কথা শেষ হতেই তিয়াশার বন্ধুদের মধ্যে অহংকারী দেখতে একটা মেয়ে মায়ার দিকে উপর-নিচ তাকিয়ে নাক সিটকে বলল,
“তিয়াশা, ইনিই কি তোমার সেই নিউলি ওযেড ভাবি? দেখতে তো বেশ মিডল ক্লাস আর সিম্পল। একদম তোমাদের বাড়ির কাজের মাসিদের মতো সস্তা সুতির শাড়ি পরে খাবার সার্ভ করছেন। আই থট তোমাদের বাড়ির বড় বউ অনেক স্টাইলিশ হবে!”
মেয়েটার এই কুৎসিত অপমানে মায়ার বুকটা কেঁপে উঠল, তার চোখ ফেটে জল চলে এল। সে এত বড় রাজকীয় বাড়িতে এসে এভাবে অপমানিত হবে তা ভাবেনি। সে কোনো কথা না বলে মাথা নিচু করে চোখের জল আড়াল করার চেষ্টা করল। মাহিমা চৌধুরী রেগে গিয়ে বেতের চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন।
“তিয়াশা! তোর বন্ধুদের এই মুহূর্তে এই চৌধুরী ভিলা থেকে গেট আউট হতে বল। ওরা আমার বাড়ির বউকে, এই বাড়ির লক্ষ্মীকে অপমান করার সাহস কীভাবে পায়? আর তোর শিক্ষা কি এতটাই নিচে নেমে গেছে? ভুলে যাস না মায়ার তোর বড় আর তোর ভাবি হয়।”
তিয়াশা তার বড় আম্মুর ওপর উল্টো সুরে চেঁচিয়ে বলল,
“বড় আম্মু! ওরাই তো সত্যি কথাই… ও যেভাবে এই সস্তা ক্যাজুয়াল শাড়ি পরে কাজের লোকের মতো সার্ভ করছে, বাইরের যে কেউ ওকে কাজের মেয়েই ভাববে। এতে আমার ফ্রেন্ড সার্কেলে আমার রেপুটেশন নষ্ট হচ্ছে।”
“কার রেপুটেশন নষ্ট হচ্ছে তিয়াশা? আর কাকে তুই এখানে কাজের মেয়ে বললি?”
পেছন থেকে এক বজ্রকঠিন, গম্ভীর আর ভয়ংকর কণ্ঠস্বর ভেসে এল। বাগানের সবাই চমকে তাকিয়ে দেখল কৌশিক আর রোহিত অফিস থেকে ফিরে বাগানেরদিকে হেঁটে আসছে। কৌশিকের দুই হাত তখন রাগে মুষ্টিবদ্ধ, আর তার চোয়ালের হাড় শক্ত হয়ে গেছে, চোখ দুটো রাগে লাল। কৌশিক ধীর কিন্তু অত্যন্ত ভারী পায়ে এগিয়ে এসে তিয়াশার সেই বান্ধবীর একদম সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখের সেই খুনে আর তীব্র চাহনিতে মেয়েটা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে এক পা পিছিয়ে গেল। কৌশিক অত্যন্ত ঠাণ্ডা অথচ মারাত্মক ভয়ংকর গলায় বলল,
“তুমি আমার স্ত্রীকে, এই চৌধুরী বংশের বড় বউকে কাজের মেয়ে বললে? তোমার মতো একটা নিচু মানসিকতার মেয়ের এই চৌধুরী ভিলাতে পা রাখার তো দূর, এই বাগানের ঘাস ছোঁয়ারও যোগ্যতা রাখে না। এই মুহূর্তে আমার চোখের সামনে থেকে দূর হও। অন্যথায় আমি তোমার বাবাকে এখনই ফোন করে বলব যে তার মেয়ে অন্যের বাড়িতে এসে অপমানের নোংরা খেলা খেলছে, আর কালই তোমার বাবার বিজনেসের সমস্ত ফান্ডিং আমি পারসোনালি বন্ধ করে দেব। গেট আউট ফ্রম মাই প্রোপার্টি!”
মেয়েটা আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে নিজের ব্যাগটা চেপে ধরে ভয়ে বাগান থেকে প্রায় দৌড়ে পালিয়ে গেল। তার সেই অবস্থা দেখে তিয়াশার অন্য বান্ধবীরাও কোনো কথা না বলে বাগান ছেড়ে চম্পট দিল। তিয়াশা এবার চিৎকার করে বলল,
“তুমি আমার বন্ধুদের আমার সামনে এভাবে অপমান করে তাড়িয়ে দিলে? সোসাইটিতে আমার একটা রেপুটেশন আছে!”
কৌশিক এক ঝটকায় তিয়াশার ডান হাতটা চেপে ধরল। তার লোহার মতো হাতের তীব্র চাপে তিয়াশা ব্যথায় চিৎকার করে উঠল।
“রেপুটেশন? তোর কিসের রেপুটেশন তিয়াশা? তুই এই বাড়ির একটা পরজীবী, যে নিজের বাবার আর ভাইয়ের টাকায় অহংকার করিস। মায়া এই বাড়ির বড় বউ, ও এই বাড়ির রানী। ওর একটা পায়ের নখের যোগ্যতাও তোর বা তোর বন্ধুদের নেই। আজ থেকে তোর এই চৌধুরী ভিলাতে কোনো ধরনের পার্টি, গেট-টুগেদার বা বন্ধুদের আনা সম্পূর্ণ এবং চিরতরে নিষিদ্ধ করা হলো। আর যদি কোনোদিন মায়াকে নিয়ে তোর মুখ থেকে একটাও বাজে বা ছোট কথা শুনি, তবে তোকে আমি এই চৌধুরী ভিলা থেকে চিরতরে সরিয়ে দেব। কৌশিক নীর চৌধুরী যা বলে, তা করেও দেখায়। রোহিত বোঝা তোর বোন কে।”
এই বলে কৌশিক তিয়াশাকে এক ঝটকায় ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল।
রোহিত রাগ ভরা কণ্ঠে ধমকের সূরে বলল,
“তিয়াশা রুমে যা।”
তিয়াশা ব্যথায় আর রাগে কাঁদতে কাঁদতে নিজের ঘরের দিকে দৌড়ে চলে গেল। মাহিমা চৌধুরী আর সায়েরা চৌধুরীও তিয়াশার এই শাস্তিতে সন্তুষ্ট হলেন। সায়েরা চৌধুরী বলল,
“এই মেয়েটাকে নিয়ে আমি কী করি।”
সায়েরা চৌধুরীর কথা শুনে মাহিনা চৌধুরী বলল,
“থাক বাদ দে যা হবার হয়ে গেছে।”
কৌশিক মায়ার দিকে তাকাল। মায়ার চোখ দিয়ে তখনো টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ছিল। কৌশিক সবার সামনেই, নিজের মা আর কাকির উপস্থিতির তোয়াক্কা না করে মায়াকে এক টানে নিজের শক্ত বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। তার এক হাত মায়ার মাথায় শান্ত্বনা দেওয়ার মতো বিলি কাটতে লাগল।
“কেঁদো না মায়া। এই কৌশিক নীর চৌধুরী যতদিন বেঁচে আছে, এই পৃথিবীর কোনো শক্তি তোমাকে ছোট করার সাহস পাবে না। তুমি আমার রানী, আর এই চৌধুরী বাড়ির একমাত্র আসল মালকিন। তোমার চোখের জল ফেলার অধিকার শুধু আমার আছে, অন্য কারও নায়।”
কথাটা বলে কৌশিক মায়ার কপালে এক দীর্ঘ চুমু খেল। রোহিত পাশে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে বলল, “একদম ঠিক বলেছিস ব্রো। ভাবি, তুমি একদম কাঁদবে না। তিয়াশা একটা বেয়াদব। ওর ডানা আজ ব্রো একদম গোড়া থেকে কেটে দিয়েছে। খুব ভালো হয়েছে। আর আমি ওকে সামলাতে পারি কোথায় আমার কথা শুনে ও?”
মাহিমা চৌধুরী মায়ার কাছে এসে তার হাত ধরে বললেন,
“কেঁদো না মা। কৌশিক ঠিকই বলেছে। তুমি আমাদের ঘরের সম্মান।”
সায়েরা চৌধুরী পাশ থেকে এসে বলল,
“তিয়াশার কথায় কিছু মনে করো না মা ওর আমি আমি তোমার কাছে কাছে ক্ষমা চাইছি।”
মায়া ঝটপট তার ছোট মামির হাত ধরে বলল,
“আরে আরে,কী করছেন টা কী আপনি? আপনি আমার গুরুজন আমার কাছে আপনি ক্ষমা চাইলে আমি কার কাছে চাইব? আর আমি তিয়াশার কথায় কিছু মনে করে নি।”
সায়েটা চৌধুরী মায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“তোমার মতো আমার মেয়েটাও যদি হতো।”
মায়া বলল,
“হয়ে যাবে মামি আমি আছি তো নাকি? সব সামলে নিব।”
“এখন তুমিই ভরসা।”
রাত এগারোটা। পুরো চৌধুরী ভিলা এখন সম্পূর্ণ শান্ত, নিস্তব্ধ। মায়া আর কৌশিক রাতের ডিনার শেষ করে নিজেদের ঘরে ফিরে এসেছে। ঘরের এসি-র তাপমাত্রা কিছুটা কমানো। মায়া ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে বিছানায় বসল। কিন্তু কেন যেন তার শরীরটা বড্ড ভারী আর ম্যাচম্যাচ লাগছিল। মাথায় এক তীব্র যন্ত্রণা অনুভব হচ্ছিল। কৌশিক শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে মায়ার দিকে তাকাল। মায়ার মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাশে আর চোখের কোণগুলো লাল দেখাচ্ছিল। সে মায়ার পাশে এসে বসল।
“কী হলো সুইটহার্ট? একটা কিসি খাই?”
এই বলে কৌশিক মায়ার গলার কাছে নিজের মুখটা নিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু মায়া এবার কৌশিককে কোনো দুষ্টুমি বা বাহানা দিয়ে জড়াল না। সে দুর্বল হাতে কৌশিককে সামান্য ঠেলে দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল এবং গায়ের ওপর চাদরটা টেনে নিল। তার কণ্ঠস্বর কাঁপছিল,
“কৌশিক… প্লিজ… আজ না। আজ সত্যি আমার খুব খারাপ লাগছে। আমার কেমন জানি লাগছে।”
কৌশিক প্রথমে ভাবল মায়া হয়তো সকালের মতো কোনো নতুন বাহানা বা ফন্দি আটছে তার কাছ থেকে পালানোর জন্য। সে একটু হেসে বলল,
“আবার বাহানা শুরু? তুমি যতই ফন্দি আটো না কেন, এই কৌশিক নীর চৌধুরীর হাত থেকে আজ তুমি পার পাবে না। আই ওয়ান্ট ইউ রাইট নাউ।”
কৌশিক মায়ার ওপর ঝুঁকে এসে তার চাদরটা এক টানে সরিয়ে দিল এবং মায়ার হাত দুটো ধরে লক করতে গেল। কিন্তু মায়ার হাত দুটো ছোঁবামাত্রই কৌশিক এক ঝটকায় স্তব্ধ হয়ে গেল। মায়ার হাতের তালু আর তার পুরো শরীর যেন আগুনের মতো তপ্ত, ফুটন্ত পানির মতো গরম হয়ে আছে! কৌশিক চট করে নিজের ডান হাতটা মায়ার কপালে আর গলার ওপর রাখল। স্পর্শ করতেই তার বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় মোচড় দিয়ে উঠল। মায়ার তীব্র জ্বর এসেছে। শরীরটা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। কৌশিকের দুষ্টুমির ভাবটা এক নিমেষেই উধাও হয়ে গেল।
“মায়া! তোর শরীরে তো প্রচণ্ড জ্বর এসেছে! শরীরটা একদম জ্বরে পুড়ছে। তুই আমাকে আগে বলিসনি কেন?”
মায়া চোখ বন্ধ করে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “ভেবেছিলাম… এমনিই ক্লান্তি। একটু ঘুমালেই ঠিক হয়ে যাবে। আপনি আলোটা নিভিয়ে দিন… আমার চোখে লাগছে।”
কৌশিক আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে বিছানা থেকে নেমে ঘরের মেইন লাইটটা নিভিয়ে একটা জিরো ওয়াটের নীল ডিম লাইট জ্বেলে দিল। তারপর সে দ্রুত ওয়াশরুমে গিয়ে একটা পাত্রে ঠান্ডা পানি আর একটা নরম সুতির তোয়ালে নিয়ে এল। সে মায়ার পাশে বসে পরম যত্নে মায়ার মাথার নিচে একটা বালিশ ভালো করে গুঁজে দিল। তারপর তোয়ালেটা ঠান্ডা পানিতে ভিজিয়ে ভালো করে নিংড়ে নিয়ে মায়ার কপালে আলতো করে বসিয়ে দিল। ঠান্ডা তোয়ালের স্পর্শে মায়া অবচেতনভাবেই একটা স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কৌশিক মায়ার মাথার চুলে নিজের আঙুল দিয়ে বিলি কাটতে কাটতে অত্যন্ত নরম আর অনুতপ্ত গলায় বলল,
“আই এম সরি মায়া। আমি আসলেইর একটা অসভ্য। তোমার শরীর এত খারাপ, আর আমি নিজের নেশায় মত্ত হয়ে তোমার সাথে জবরদস্তি করতে যাচ্ছিলাম। আমাকে ক্ষমা করে দে জান।”
মায়া চোখ না মেলেই কৌশিকের একটা হাত নিজের দুই হাতের মুঠোয় শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। সে মৃদু ফিসফিস করে বলল,
“না কৌশিক ভাই… আপনি নিজেকে দোষ দেবেন না। আপনি তো জানতেন না। আপনি পাশে আছেন, এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া।”
মায়ার আর চোখ মেলে রাখতে পারল না। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সে ঘুমিয়ে পড়ল। কিন্তু কৌশিকের চোখে সারারাত ঘুম এল না কৌশিক সারারাত মায়ার পাশে বসে রইল। প্রতি পাঁচ মিনিট পর পর সে তোয়ালেটা পানিতে ভিজিয়ে মায়ার কপালে জলপট্টি দিতে লাগল। মায়ার গায়ের জ্বর যখন মাঝরাতে আরও বাড়ছিল, সে যখন জ্বরের ঘোরে কাঁপছিল, কৌশিক তাকে নিজের বিশাল আর চওড়া বুকের সাথে একদম শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিজের শরীরের উষ্ণতা দিয়ে তার কাঁপুনি থামানোর চেষ্টা করছিল। তার চোখে কোনো ঘুম নেই, আছে শুধু নিজের ভালোবাসার মানুষের জন্য এক পরম ব্যাকুলতা আর ভয়।
প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৩১
রাত প্রায় ৪ টা বাজে ৩০ মিনিট। তখন মায়ার গায়ের জ্বরটা অনেকটাই কমে এসেছে। সে শান্তিতে কৌশিকের বুকে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে। আর কৌশিক সারারাত এক ফোঁটা চোখের পাতা এক না করে নিজের স্ত্রীর মাথায় জলপট্টি দিয়ে তার সেবা করে চলেছে। কৌশিক তার এক হাত মায়ার কপালে রাখল জ্বরটা কমেছে কিনা দেখার জন্য। মায়ার শরীরের জ্বর কিছুটা কমে এসেছে দেখে কৌশিক এবার সস্তির নিশ্বাস ছাড়ল। অতঃপর সারারাত জায়গার কারণে কৌশিক নিজের চোখকে আর ফাকি দিতে পারল না। সেও মায়াকে জড়িয়ে ঘরে ঘুমিয়ে পড়ল।
