প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৩৮
আরাফাত আদনান সামি
দুপুরের সেই তীব্র কামনার ঝড় আর গভীর প্রণয়ের ঘোর কেটে যখন বিকেল নামল, ঘরের পরিবেশ তখন কিছুটা শান্ত। জানালার ভারী সিল্কের পর্দার ফাঁক গলে বিকেলের মরা, সোনালী রোদ এসে মায়ার ফর্সা আর ক্লান্ত মুখের ওপর পড়েছে। মায়া বিছানার এক কোণে শাড়ির আঁচলটা ভালো করে নিজের শরীরে জড়িয়ে শুয়ে আছে। ওর ফর্সা গলার ওপর এবং বুকের উন্মুক্ত অংশে কৌশিকের দেওয়া ভালোবাসার গাঢ় লালচে দাগগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কৌশিক ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে এল। ওর পরনে এখন শুধু একটা কালো ট্রাউজার, ওপরের চওড়া শরীরটা সম্পূর্ণ খালি। ওর পিঠে আর বুকে মায়ার নখের আঁচড়ের দাগ স্পষ্ট, যা দুপুরের সেই তীব্র ভালোবাসার নীরব সাক্ষী বহন করছে। ও তোয়ালে দিয়ে নিজের ভেজা ছোট চুলগুলো মুছতে মুছতে মায়ার দিকে তাকাল। মায়ার ওই শান্ত, অভিমানী আর লাজুক মুখটা দেখলে ওর ভেতরের সমস্ত কঠোরতা যেন এক নিমিষে উধাও হয়ে যায়। কৌশিক ধীর পায়ে এগিয়ে এসে বিছানার প্রান্তে বসল। ও মায়ার কপালে নিজের হাত রাখল,
“শরীর কি খুব খারাপ লাগছে, হার্টবিট? আমি কি একটু বেশিই ভালোবাসা দেখিয়ে ফেললাম?”
মায়া কৌশিকের দিকে না তাকিয়েই ওর হাতটা নিজের কপাল থেকে সরিয়ে দিল। ও একটু কৃত্রিম রাগ আর অভিমানী গলায় বলল,
“আপনি একটা আস্ত একটা অসভ্য। আমি বারবার বারণ করছিলাম না? যে আমার শরীর খুব ক্লান্ত? আমার শরীরের সমস্ত শক্তি আপনি এক নিমিষে শুষে নিয়েছেন। অনেক ব্যথা করছে তল পেটে। এখন আমার শরীররে একটুও ক্ষমতা নেই বিছানা থেকে ওঠার। আপনি আসলেই একটা অসভ্য লোক।”
কৌশিক মৃদু হাসল। মায়াকে হালকা করে টানল আর সাথে সাথে ও মায়াকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে ওর কাঁধের ওপর নিজের থুতনিটা রাখল, ওর হাতের শক্ত বাঁধনে মায়াকে আবার নিজের বুকের সাথে পিষে ধরল। ও মায়ার কানের লতিতে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
“আমার হার্টবিট কী আমার উপরে অভিমান করেছ?”
মায়া ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল,
“নাহ্।”
“সত্যি?”
“হ্যাঁ।”
কৌশিক থুতনিটা মায়ার ঘাড়ে একটু ঘষে গম্ভীর ও ঘোর লাগা কণ্ঠস্বরে বলল,
“তুই জানিস মায়া আজ তোকে নিজের কাছে, আমাদের দুইজনের ঘরে তোকে অক্ষত পেয়ে আমি নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণ করে রাখতে পারিনি। ব্যথা পেলেও আমার এই উগ্রতা শুধু তোকে ঘিরেই থাকবে। আর আমি এই ব্যথা তোকে সারাজীবন দিতে চাই, মাই ফা*কিং হার্টবিট।”
কৌশিকের শেষ কথাটা শুনে মায়া ভ্রু-কুচকে বলল,
“অসভ্য।”
কথাটা বলে মায়া আস্তে করে ফিসফিসিয়ে উঠল, “একবার তুমি বলে ডাকে তো আরেকবার তুই। শ্লা…গিরগিটি দেখেছি ইনার মতো গিরগিটি আমি আমার লাইফে দু’টো দেখি নি, সেকেন্ডে সেকেন্ডে রঙ চেঞ্জ করে।”
এমন সময় কৌশিক বলে উঠল,
“কিছু বললি?”
মায়া আমতা আমতা করে বলল,“কই না তোহ্।”
কথাটা বলে মায়া এবার ঘুরে কৌশিকের চোখের দিকে তাকাল। কৌশিকের চোখে অবাধ্য প্রেমিকের আকুলতা। মায়া নিজের ছোট, নরম হাতটা বাড়িয়ে কৌশিকের গালের সেই পুরোনো কাটার দাগটা আলতো করে ছুঁয়ে দিল।
“আমি আপনার এই উগ্রতাটাকেই ভালোবাসি। কিন্তু মাঝেমধ্যে আপনার এই ভালোবাসা আমার দম আটকে দেয়, জানেন? মনে হয় আপনি আমাকে আপনার কোন একটা দামী প্রোপার্টি মনে করেন।”
কৌশিক মায়ার ঘাড়ে একটা গভীর, দীর্ঘ চুমু খেল,
“তুই শুধু আমার প্রোপার্টি নোস মায়া, তুই আমার বেঁচে থাকার একমাত্র অক্সিজেন। চৌধুরী বংশের বড় বউ যাকে আগলে রাখার দায়িত্ব এই কৌশিক নীর চৌধুরীর। আর আমার জিনিসে অন্য কারও নজর তো দূরের কথা, খারাপ বাতাসও যেন ছুঁতে না পারে। ছুঁলে আমি ওর পুরো দুনিয়া জ্বালিয়ে দেব।”
মায়া রাগে মুখ ফুলিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে রইল। কৌশিক মায়ার সেই অভিমানী মুখটা দুহাতে ধরে ওর কপালে গভীর এক চুমু এঁকে দিল। কৌশিকের হাতের স্পর্শে মায়ার ভেতরের রাগটা যেন কর্পূরের মতো উবে যেতে লাগল, কিন্তু মুখে ও কিছুতেই হার মানবে না। ও কৌশিকের খালি বুকে আলতো করে একটা কিল মেরে বলল,
“ছাড়ুন আমাকে। সরুন বলছি! আপনার এই ভালোবাসার জ্বালায় আমার গায়ের চামড়া আস্ত থাকবে না। দেখুন কী অবস্থা করেছেন!”
কৌশিক মায়ার কোমরে নিজের শক্ত দু-হাতের বাঁধন আরও জোরালো করে ওকে নিজের দিকে আরও কিছুটা টেনে নিল। ওর ঠোঁটে এখন এক চিলতে শয়তানি হাসি।
“কই দেখি অবস্থা করেছি? একটু ভালো করে দেখতে দে তো।”
কৌশিকের দৃষ্টি মায়ার বুকের উন্মুক্ত অংশের দিকে নিবদ্ধ হতেই মায়া লজ্জায় লাল হয়ে দুই হাতে শাড়ির আঁচলটা টেনে ওপরে তোলার চেষ্টা করল। কিন্তু কৌশিক এক ঝটকায় মায়ার হাত দুটো ধরে খাটের ওপর চেপে ধরল। ও মায়ার ওপর নিজের শরীরের ভর কিছুটা ছেড়ে দিয়ে মায়ার মুখের খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়াল।
“কী করছেন! দরজা কিন্তু লক করা নেই!”
“মিথ্যে।”
“সত্যি পেছনে তাকিয়ে একবার দেখুন। নিজে দরজার লক খুলে নিজেই ভুলে গেলেন?”
“ওহ্ ওয়াশরুমে যাওয়ার আগে খুলে গিয়েছিলাম। যাগ্গে খুলা তো কী হয়েছে?”
“কী হয়েছে মানে? যখন তখন কেউ চলে আসতে পারে।”
মায়ার গলায় এবার সত্যি সত্যিই আতঙ্ক এবং লজ্জার মিশ্রণ।
“আসুক। নিজের ঘরে নিজের বউয়ের সাথে রোমান্স করছি, আর কারও বাপের ক্ষমতা নেই এই রুমের ভেতরে ঢোকার।”
কৌশিক এক প্রকার হুকুমদারী গলায় বলল, কিন্তু ওর চোখের মনিতে তখন কামনার নীল আগুন দাউদাউ করে জ্বলছে। ও মায়ার নাকের ডগায় নিজের নাকটা ঘষে আবার বলল,
“তোর এই লজ্জা পাওয়ার স্টাইলটা আমার খুব পছন্দ, হার্টবিট। যখন লাল হয়ে যাস, মনে হয় এক কামড়ে তোকে পুরোটা খেয়ে ফেলি।”
“উফফ! আপনি আসলেই একটা অসভ্য। সরুন এখান থেকে।”
মায়া নিজের মুখটা একপাশে ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু কৌশিক মায়ার নরম গালে নিজের ঠোঁটের চাপ বসিয়ে দিল। এক দীর্ঘ, গভীর চুম্বনে মায়ার সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। মায়ার হাত দুটো কৌশিকের চওড়া কাঁধের ওপর শক্ত হয়ে বসল, ওর নখগুলো আবার কৌশিকের পিঠের চামড়ায় বসে যেতে লাগল। দুপুরের তীব্র ঝড়ের পর বিকেলের এই মৃদু মাতাল হাওয়া মায়ার মনে এক অন্যরকম অনুভূতির সৃষ্টি করল। মায়া জোরে নিশ্বাস নিতে নিতে মুখ ফসকে বলল,
“ছাড়ো…তো। আজকে না তুমি বাড়িতে মিলাদ রেখেছো? তাহলে এখন তুমি এসব কী শুরু করলে?”
কৌশিক মায়ার ঠোঁট থেকে নিজের ঠোঁট সরিয়ে একটু দূরে সরল, কিন্তু মায়ার কোমর থেকে ওর হাত সরেনি। ও মায়ার চোখের দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত নরম গলায় বলল,
“তুই যখন আমাকে ‘তুমি’ বলে ডাকিস, তখন মনে হয় আমার পুরো সাম্রাজ্য তোর পায়ে ঢেলে দিই। কিন্তু যখন ওই দূরত্বের ‘আপনি’ শব্দটা উচ্চারণ করিস, তখন মনে হয় তোকে আবার ওই বাসর রাত রাত নামক শাস্তি দিয়ে শাসন করি।”
মায়া একটু থমকে গেল। কৌশিকের এই দ্বৈত রূপ ও চেনে। ও এক হাত দিয়ে কৌশিকের ছোট ছোট কাঁচা দাড়িতে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“এত খুশি হবার কিছু নেই মুখ ফসকে বলেছি। আর আপনি কড়া শাসন না করলে তো আবার আপনার মাফিয়া ইমেজ নষ্ট হয়ে যাবে, তাই না মিস্টার চৌধুরী? আপনি তো আবার সবাইকে নিজের বুটের নিচে রাখতেই ভালোবাসেন।”
“সবাইকে রাখি, কিন্তু তোকে তো নিজের বুকের ওপর রাখি।” কথাটা কৌশিক মায়ার ঠোঁটে আলতো করে একটা কামড় দিয়ে বলল।
“আহ্! লাগল তো!” মায়া নিজের ঠোঁট চেপে ধরে ভুরু কুঁচকে তাকাল।
“বহুরুপী গিরগিটি একটা। আপনি জানেন? আপনি যে সেকেন্ডে সেকেন্ডে রূপ বদলান।”
“আমি মনে হয় ইচ্ছা-ধারি কাল নাগ তাহলে।”
কৌশিকের কথা শুনে মায়া নিজের হাসি আটকে রাখতে পারলো না সে একটু জোরেই হেঁসে উঠল। সে বলল,
“আমার থেকেও আপনি নিজেকে নিজে খুব ভালো চিনেন দেখছি! আমিই এতক্ষণ ভুল-ভাল বলছিলাম। আপনার ব্যাবহারের সাথে বহুরুপী কাইল্যা নাক নামটাই বেস মানাচ্ছে। যাকে বলে, খাপে খাপ বহুরুপী কাইল্যা নাগের বাপ।”
বলেই মায়া আরো জোরে হাসতে লাগল। কৌশিক মায়ার কথা শুনে ভ্রু-কুচকালো। সে গম্ভীর কণ্ঠস্বরে বলল,
“মায়া তুই কিন্তু আজ আমার হাতে কড়া লেবেলের পিটুনি খাবি।”
“দেখছেন দেখছেন! এইমাত্র এত মিষ্টি কথা বললেন, আর তার পরেই আবার আমাকে মারার করে বললেন আমাকে ধমক দিলেন? আপনি আসলেই একটা ইচ্ছাকারী বহুরূপী কাইল্যা নাগ আপনার সাথে কোন কথা নাই হু..”
বলেই মায়া মুখ ফুলিয়ে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। মায়ার এমন কান্ড আর এইসব কথা শুনে কৌশিক হো হো করে হেসে উঠল। ওর এই অট্টহাসি খুব কম মানুষই শুনেছে। বাইরে যে কৌশিক নীর চৌধুরীকে দেখে বাঘে-মহিষে এক ঘাটে জল খায়, সেই মানুষটা এই চার দেয়ালের ভেতর একটা ঊনিশ বছরের মেয়ের সামনে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র। ঠিক তখনই ঘরের বন্ধ দরজায় মৃদু কিন্তু স্পষ্ট টোকা পড়ল।
“ভাইয়া! ভাবি! তোমরা কি ভেতরে আছ? অনেক তো হলো এবার নিচে আসো। নিচে বড় আম্মু আর ফুপি তোমাদের ডাকছেন। সন্ধ্যার নাস্তা রেডি করা হয়েছে, আর একটু পর মিলাদের হুজুররা চলে আসবেন।”
বাইরে থেকে রোহিতের দুষ্টু গলা শোনা গেল। রোহিতের গলা আচমকা শুনতে পেয়ে মায়া চমকে উঠে বিছানা থেকে দ্রুত নামার চেষ্টা করল, আচলটা দিয়ে নিজের গলা ঢাকার চেষ্টা করতে লাগল।
“সর্বনাশ হয়েছে! রোহিত ভাইয়া ডাকছেন। এখন আমি ওনাদের সামনে নিচে যাব কীভাবে? আমার এই গলার আর বুকের দাগগুলো দেখলে মা-চাচিরা কী ভাববেন বলুন তো! সব আপনার জন্য হয়েছে।”
কৌশিক বড্ড শান্ত আর গম্ভীর গলায় দরজার দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল,
“রোহিত, তুই নিচে যা। আমরা আধা ঘণ্টার মধ্যে ফ্রেশ হয়ে নিচে আসছি।”
আউটসাইড থেকে রোহিত একটু দুষ্টুমি ভরা, রসিকতার গলায় বলল,
“ও আচ্ছা… আচ্ছা! বুঝলাম কৌশিক ব্রো। বেশি তাড়া নেই, তোমরা আস্তে আস্তেই আসো। আমি নিচে গিয়ে বড় আম্মু আর ফুপিকে বলছি যে ভাবি এখনো হসপিটালের ক্লান্তিতে গভীর ঘুমে আছেন, সাথে কৌশিক ভাইও। ওদের যেন এখন কেউ ডিস্টার্ব না করে।”
বলেই রোহিত করিডোর দিয়ে হাসতে হাসতে চলে গেল। মায়া লজ্জায় নিজের দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলল,
“ইশ… আমার তো মরে যেতে ইচ্ছে করছে। সব আপনার এই অসভ্যতামির জন্য হয়েছে। আজ আমি নিচে যাবই না। নিচে গেলে ওনাদের সামনে মুখ দেখাব কী করে?”
কৌশিক মায়ার হাত দুটো মুখ থেকে জোর করে সরিয়ে দিয়ে শব্দ করে হাসল,
“না গিয়ে উপায় নেই সুইটহার্ট। আজ চৌধুরী ভিলা-য় তোর সুস্থতা আর দীর্ঘায়ু কামনায় একটা মিলাদ আর দোয়ার আয়োজন করা হয়েছে। বাড়ির সবাই, এমনকি আমার শ্বশুর শ্বাশুড়িও নিচে আছেন। চল, উঠে দ্রুত ফ্রেশ হয়ে নে।”
মায়া রাগ দেখিয়ে খাট থেকে নামতে গেল, কিন্তু তলপেটের সেই তীব্র ব্যথায় ওর মুখ থেকে একটা মৃদু আর্তনাদ বেরিয়ে এল,
“উফফ!”
ও আবার বিছানায় ধপাস করে বসে পড়ল। কৌশিক তৎক্ষণাৎ মায়ার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল।
“খুব বেশি ব্যথা করছে?”
মায়া ছলছল চোখে কৌশিকের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল।
“অনেক ব্যথা করছে।”
কৌশিক আর কোনো কথা না বলে মায়াকে এক ঝটকায় নিজের কোলে তুলে নিল। মায়া লজ্জায় কৌশিকের গলায় নিজের হাত দুটো জড়িয়ে ধরল।
“কী করছেন! নামান আমাকে, আমি নিজে যেতে পারব।”
“চুপচাপ থাক। বেশি কথা বললে বাথরুমের ভেতরেই আবার দুপুর ফিরিয়ে আনব।”
কৌশিকের এই ফ্লার্টে মায়া একদম চুপ মেরে গেল। ও নিজের মুখটা কৌশিকের চওড়া, খালি বুকে লুকিয়ে রাখল। কৌশিক মায়াকে নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকল। ও মায়াকে বাথটাবের পাশে সাবধানে বসিয়ে দিয়ে নিজে কুসুম গরম জলের কলটা ছেড়ে দিল। ফ্রেশ হওয়ার পুরোটা সময় কৌশিক মায়াকে নিজের হাতে আগলে রাখল। মায়াকে নিজ হাতে গোসল করানো থেকে শুরু করে ওর শাড়ির কুচি ঠিক করে দেওয়া থেকে শুরু করে ওর ভেজা চুলগুলো তোয়ালে দিয়ে মুছে দেওয়া, সবটাই ও নিজে হাতে করল। মায়া মুগ্ধ হয়ে দেখছিল এই মানুষটাকে। যে মানুষটা একহাতে আন্ডারওয়ার্ল্ডে লাশ ফেলে দিতে পারে, সেই মানুষটার হাত দুটো আজ মায়ার শরীরের ওপর কতটা যত্নশীল, কতটা কোমল হয়ে উঠেছে।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা ৬টা। চৌধুরী ভিলার বিশাল, রাজকীয় ড্রয়িংরুমটা এখন আত্মীয়-স্বজনে পরিপূর্ণ। ঘরের এক কোণে বড় রূপোর পাত্রে সুগন্ধি আগরবাতি আর কর্পূর জ্বলছে, যার গন্ধে পুরো ঘরের পরিবেশ পবিত্র হয়ে উঠেছে। মায়া একটা হালকা পিংক কালারের শাড়ি পড়েছে। মাথায় আর গলার ওপর বড় করে শাড়ির আঁচল টেনে নিচে নেমে এল যাতে দুপুরের সেই কামনার দাগগুলো কারো নজরে না পড়ে। ওর পাশে কৌশিক এক ছায়ার মতো, এক পরম অভিভাবকের মতো গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে। কৌশিকের পরনে এখন একটা অফ-হোয়াইট কালারের পাঞ্জাবি, যা ওকে দেখতে অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং মার্জিত করে তুলেছে। মায়ার ফর্সা মুখে এখনো হসপিটালের কিছুটা ফ্যাকাশে ভাব থাকলেও ওর চোখের মনিতে এক অদ্ভুত লাবণ্য আর তৃপ্তি ফুটে উঠেছে। রুবিনা পাটোয়ারী মায়াকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখেই দ্রুত ছুটে এসে ওকে জড়িয়ে ধরলেন। ওনার চোখ দিয়ে আবার আনন্দের অশ্রু ঝরতে লাগল,
“আমার মা! আমার আম্মু! তুই যে সুস্থ হয়ে আমাদের বুকে ফিরে এসেছিস, এর চেয়ে বড় শুকরিয়া আল্লাহর দরবারে আর কিছু হতে পারে না। আমি তো ভেবেছিলাম আমার কোল বুঝি…”
রুবিনা পাটোয়ারী থেমে গেল। মায়া ওর মায়ের চোখের জল নিজের আঁচল দিয়ে মুছে দিয়ে মৃদু হেসে বলল,
“আম্মু, তুমি কেঁদো না তো। এইদেখো আমি একদম ঠিক আছি। দেখো, তোমার জামাই তোমার মেয়ের কত খেয়াল রাখছে। এক ফোঁটা কষ্টও পেতে দিচ্ছে না আমাকে।”
মায়ার কথা শুনে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রোহিত এক হাত দিয়ে নিজের মুখ চেপে হাসতে লাগল। ও কৌশিকের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপ মারল, যার অর্থ-
‘হ্যাঁ, খেয়াল যে বড্ড বেশিই রাখা হচ্ছে, তা ভাবির হাঁটার স্টাইল দেখেই বোঝা যাচ্ছে!’
কৌশিক রোহিতের দিকে এক ভয়ানক চোখ রাঙানি দিল, কিন্তু রোহিত তাতে দমে যাওয়ার পাত্র নয়। ও এত বছরে পরিপক্ক হলেও, কৌশিকের সামনে ও সবসময়ই সেই পুরোনো ইয়ার্কি-ফাজলামির মেজাজটা ধরে রাখে। মাহিমা চৌধুরী আর সায়েরা চৌধুরীও এগিয়ে এলেন। সায়েরা চৌধুরী মায়ার মাথায় পরম স্নেহে হাত রেখে বললেন,
“মায়া, তুই যে কাজটা করেছিস, তার জন্য আমি তোর কাছে আজীবন ঋণী থাকব। তুই নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে আমার তিয়াশাকে ওই নরক থেকে বাঁচিয়েছিস।”
তিয়াশা তখন ড্রয়িংরুমের এক কোণে নিধির পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। ওর মাথাটা নিচু, চোখে এক তীব্র অপরাধবোধ আর লজ্জার ছায়া। ও ধীর পায়ে এগিয়ে এসে মায়ার সামনে দাঁড়াল। তিয়াশা এবার আর কোনো অহংকার বা জেদ দেখাল না, সে সরাসরি মায়ার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে মায়ার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিল। মায়া চমকে উঠে তিয়াশাকে টেনে তোলার চেষ্টা করল,
“একী করছিস তিয়াশা! তুই আমার ছোট বোন। বোন কি কখনো বোনের সামনে এভাবে বসে?”
তিয়াশা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, ওর চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছিল,
“ভাবি… আমাকে মাফ করে দাও। আমি সবসময় তোমার সাথে বড্ড খারাপ ব্যবহার করেছি, কত খোঁটা দিয়ে কথা বলেছি। আজ আমি বুঝতে পেরেছি, কৌশিক ভাইয়া কেন তোমাকে নিজের জানের চেয়েও বেশি ভালোবাসে। তুমি নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে আমাকে বাঁচিয়েছ ভাবি। আমি সত্যিই একটা খুব খারাপ মেয়ে। আমাকে তোমার ছোট বোন হিসেবে ক্ষমা করে দাও।”
মায়া তিয়াশাকে টেনে নিজের বুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
“ধুর পাগলি! তুই তো আমার ছোট বোন। বোনদের ওপর কি কেউ রাগ করে থাকে? তুই ভালো আছিস, সহিসালামতে বাড়ি ফিরেছিস, এটাই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ। আর কোনোদিন এসব কথা মুখে আনবি না, কেমন?”
তিয়াশা মায়ার বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে লাগল। চৌধুরী বাড়ির এই দৃশ্য দেখে রুবিনা পাটোয়ারী, মাহিমা চৌধুরী, আর সায়েরা চৌধুরীর চোখ জুড়িয়ে গেল। আবারও প্রমাণ হলো যে সংসারে এত ভালোবাসা, এত ত্যাগ থাকে, সেই সংসারকে কোনো ঝড়ই কোনোদিন ধ্বংস করতে পারে না।
ঠিক তখনই নিধি একটু পাশ থেকে ফিসফিসিয়ে বলল,
“নাটক তো ভালোই জমেছে। কিন্তু এই কান্নাকাটির সিনটা কি মিলাদের আগেই শেষ হবে, নাকি হুজুরদের সামনেও চলবে?”
নিধির কথা শুনে রোহিত ওর দিকে তাকাল। নিধির পরনে আজকে একটা কালো রঙের সালোয়ার কামিজ, কানে ছোট দুল। সতেরো বছরের নিধিকে এই কালো পোশাকে যেন আক্ষরিক অর্থেই এক খণ্ড জ্বলন্ত কয়লার মতো ড্যাশিং লাগছিল। রোহিত ধীর পায়ে নিধির পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
“কী ব্যাপার নিধি পাখি? আজকে কালো রঙ পরেছ যে? আমার মনের ভেতরের অন্ধকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের সাথে ম্যাচিং করার চেষ্টা নাকি হু?”
রোহিত একদম নিচু গলায় নিধির কানের কাছে এসে বলল। নিধি এক ঝটকায় রোহিতের থেকে দু-পা দূরে সরে গেল। ওর রাগী চোখ দুটো রোহিতের ওপর স্থির হলো।
“মিস্টার রোহিত চৌধুরী, নিজের সীমা বজায় রেখে কথা বলুন। এই চৌধুরী ভিলার পুরুষদের সমস্যাটা কী বলুন তো? সেকেন্ডে সেকেন্ডে মেয়েদের পার্সোনাল স্পেসে ঢুকে পড়া কি আপনাদের বংশগত রোগ?”
রোহিত হেসে ফেলল। ওর সেই ড্যাশিং মাফিয়া হাসি।
“বংশগত রোগ কিনা জানি না, তবে তোমাকে দেখলে আমার ভেতরের রোগটা একটু বেশিই বেড়ে যায়। আজ মিলাদ শেষ হোক, তারপর তোমার এই রাগ আমি কীভাবে ভাঙাই, তা তুমি আজ নিজের চোখেই দেখবে।”
নিধি রাগ চেপে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। ও মনে মনে ভাবল,
‘এই লোকটা একটা আস্ত অসভ্য দেখছি। পঁচিশ বছর বয়স হয়েছে, অথচ সতেরো বছরের একটা মেয়ের পেছনে কেমনে ঘুর ঘুর পারছে! ওর লজ্জা করে না?’
এর পর তাদের মধ্যে কোন কথা হলো না। মিলাদের সময়টা অত্যন্ত শান্তভাবে কাটল। হুজুররা যখন কৌশিক এবং মায়ার দীর্ঘায়ু এবং সুস্বাস্থ্য কামনায় মোনাজাত ধরলেন, তখন পুরো ড্রয়িংরুমে এক আধ্যাত্মিক নীরবতা নেমে এল। কৌশিক মোনাজাতের হাত তুলে আড়চোখে একবার মায়ার দিকে তাকাল। মায়া চোখ বন্ধ করে অত্যন্ত ভক্তিভরে দোয়া করছে। কৌশিক মনে মনে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানাল। যে মায়াকে সে একদিন নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল এবং দুর্বলতা মনে করেছিল, আজ সেই মায়াই ওর জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। মায়ার জন্য ও নিজের পুরো দুনিয়াকে এক নিমেষে ধ্বংস করে দিতে পারে। মিলাদ শেষ হওয়ার পর মেহমানদের নাস্তা পরিবেশন করা হলো। আত্মীয়-স্বজনরা সবাই মায়ার প্রশংসা করছিল। কৌশিক এক কোণে দাঁড়িয়ে একটা জুসের গ্লাস হাতে নিয়ে মায়াকে দেখছিল। মায়া সবার সাথে কথা বলতে বলতে কিছুটা হাঁপিয়ে উঠছিল। তলপেটের সেই হালকা টানটা ও এখনো অনুভব করছে। ও একটু আড়ালে গিয়ে ড্রয়িংরুমের পেছনের বড় করিডোরের জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরের ঠান্ডা হাওয়াটা ওর মুখের ওপর লাগতেই ও একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।
“সবার সামনে খুব তো ভালো বউয়ের পারফর্ম করলি। তা এখানে একা একা দাড়িয়ে কী করা হচ্ছে শুনি?”
হঠাৎ পেছন থেকে কৌশিকের রসিক কণ্ঠস্বর শুনে মায়া চমকে উঠল। ও ঘুরে দাঁড়াতেই দেখল কৌশিক ওর খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে। কৌশিকের হাতে দুটো জুসের গ্লাস। ও একটা গ্লাস মায়ার দিকে বাড়িয়ে দিল। মায়া গ্লাসটা নিয়ে এক চুমুক দিয়ে বলল,
“পারফর্ম করব কেন? ওনারা আমার আপনজন। আর আপনার মতো তো আমি নিষ্ঠুর নই যে সবার সামনেও মুখ কুচকে কালো করে রাখব। শুনের বাড়িতে মেহমান আসলে হাসি উজ্জল মুখ রাখতে হয় তাদের সাথে সুন্দর করে কথা বলতে হয় হাসতে হয় বুজচ্ছেন মিস্টার অসভ্য নীর চৌধুরী?”
কৌশিক মায়ার আরও কাছে এগিয়ে এল। করিডোরের এই অংশটায় আলো কিছুটা কম, বাড়ির বাকি সবাই এখন মেইন হলে ব্যস্ত। কৌশিক মায়াকে দেয়ালের সাথে আলতো করে চেপে ধরল।
“ওহ্ রিয়েলি! আমি মুখ কালো করে রাখি? কারো সাথে সুন্দর করে কথা বলি না? তা কী বলতাম যে, তাদের জামাই তাদের মেয়েকে ঘরের ভেতরে কেমন আদর যত্ন করে খেয়াল রাখে, তা কি হাসি মুখে ওনাদের খুলে বলতাম?”
প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৩৭
মায়া লজ্জায় লাল হয়ে কৌশিকের বুকে হাত দিয়ে ওকে সরানোর চেষ্টা করল।
“আপনি! আপনি আসলেই একটা নির্লজ্জ। নিচে এত মানুষ, আর আপনি এখানে এসেও এসব নোংরামি করছেন?”
“নোংরামি?”
কৌশিক মায়ার কপালে নিজের কপাল ঠেকাল। “নিজের বিবাহিত বউকে ভালোবাসলে সেটা যদি নোংরামি হয়, তবে আমি এই নোংরামি রোজ করতে চাই।”
