Home প্রণয়ের ঘোর রাত প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৩

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৩

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৩
আরাফাত আদনান সামি

রাত ১১টা ৫০ মিনিট। বাড়ির সবাই ডাইনিং টেবিলে বসে খেতে ব্যস্ত। কৌশিকের ঠিক মুখোমুখি চেয়ারে বসে মাথা নিচু করে চুপচাপ খাচ্ছে মায়া। কৌশিক খাবারের ফাঁকেই এক ভ্রু সামান্য উঁচু করে একনাগাড়ে তাকিয়ে আছে মায়ার দিকে। মায়া টের পেয়ে অস্থিরভাবে নড়ে চড়ে বসলো। খাবার মুখে দিচ্ছে খুব আস্তে আস্তে, যেন ঠোঁটের কোণের আঘাতের জায়গায় তরকারির ঝোল না লাগে।
কৌশিকের চোখে কেমন যেন দুষ্টু হাসি খেলে গেলো। মিটিমিটি হেসে তাকিয়ে রইলো মায়ার দিকে। ডাইনিং টেবিলে নিস্তব্ধতা। চারপাশে সবাই খাবারে মনোযোগী। কিন্তু সেই ভিড়ে কেবল দুই জোড়া চোখের খেলা হচ্ছে। কারো চোখে ফুটে উঠছে প্রেম তো কারো চোখে ধরা দিচ্ছে রাগ ।
সেই ভিড়ে হঠাৎই মায়া নড়েচড়ে বসল। তার চোখে বিরক্তির ঝলক। চোখের ইশারায় কৌশিককে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো সে,

“খাবার খাচ্ছেন তো খাবার খান, কিন্তু আমার দিকে এভাবে অসভ্যের মতো তাকিয়ে আছেন কেন, কৌশিক নীর চৌধুরী?”
কৌশিক সামনের চেয়ারটায় বসে আছে। চামচ হাতে, খাবার মুখে তুলছে বটে, কিন্তু তার দৃষ্টি একটুও সরে যাচ্ছে না। যেন চোখের ভেতর অদৃশ্য শলাকা বিঁধে দিয়ে মায়াকে বেঁধে রেখেছে। সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এতটাই স্থির যে, মায়া চাইলেও এড়িয়ে যেতে পারল না।
মুহূর্তের মধ্যেই মায়ার চোখের অজানা ভাষা পড়ে ফেলল কৌশিক। ঠোঁটে ফিসফিসিয়ে নিজের মনেই বিড়বিড় করে উঠল সে,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“ওরে আমার জঙ্গলি মেও, একদম জঙ্গলি মেও এর মতো দৃষ্টি তোর, না…না, জঙ্গলির মেও এর থেকেও ভয়ংকর তোর দৃষ্টি। চোখ দিয়ে রাগ ঝাড়লে না কী আমার বুকের ভেতরটা ঝাড়লে ? শুধু চোখের ইশারায়ই রাগ দেখিয়ে তুই আমার মনকে ঘায়েল করে দিলি। রাগে যখন তোর চোখ জ্বলে ওঠে,কী অদ্ভুত সুন্দরীই না দেখতে লাগে তোকে। যে নারীর চোখ এত ভয়ংকর রকমের সুন্দর, আর যার দৃষ্টির তীক্ষ্ণতা যেন ছুরির ধারকেও হার মানায়, সেই নারী নিঃসন্দেহে একজন জন্মগত দক্ষ খুনী। খুব শীঘ্রই আমি তোর সেই চোখের তীক্ষ্ণ আগুনে দগ্ধ হবো। আহ, কী সর্বনাশী চোখ তোর ! মনে হচ্ছে এখনি তোর ওই এক জোড়া চেখের আগুনের শিখায় নিজেকে জ্বালিয়ে ছাড়খাড় করে দেই। আমার জঙ্গলি মেওওও…….”

আমাকে চোখ দিয়ে ঘায়েল করা হচ্ছে দাড়া, এখনই তোকে দেখাচ্ছি মজা।
এই বলে কৌশিকের ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমে ভরা এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। তারপর ধীরে ধীরে বাম চোখের ভ্রুটি খানিকটা উঁচু করে মায়ার দিকে ছুঁড়ে দিলো এক অদ্ভুত ইশারা।
মুহূর্তের জন্য মায়ার বুক ধক করে উঠল। কৌশিকের সেই ইশারায় যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল তার শরীরে। চোখে মুখে অপ্রস্তুত এক ঝড় বয়ে গেল। কৌশিকের দৃষ্টি সামলাতে না পেরে খাবারের দিকে মন দিলো সে। কিন্তু ঠিক তখনই হাত কেঁপে উঠল তার। অন্যমনেই ঝাল তরকারির এক টুকরো তুলে নিলো মুখে।
পরক্ষণেই বুক চিরে বেরিয়ে এলো খুসখুসে কাশির শব্দ। ঝালের তীব্রতা নেমে গেলো সরাসরি ঠোঁটের কাটা জায়গায়। মুহূর্তেই যন্ত্রণা শরীর কাঁপিয়ে দিলো। কাঁপতে থাকা হাত দিয়ে ঠোঁট আঁকড়ে ধরল মায়া। চোখে জল চলে এলো অজান্তেই।
সাথে সাথে তীব্র ব্যথায় মায়া চিৎকার করে উঠলো,

“উফ্,জ্বলে গেলো মা, জ্বলে গেলো!”
ডাইনিং টেবিলে সবাই থমকে গেলো। মুহূর্তের মধ্যে সবাই ছুটে এলো মায়ার কাছে।
প্রথমেই ছুটে এলেন মাহিমা চৌধুরী ও রুবিনা পাটোয়ারী।
মহিমা শঙ্কিত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,
“কী হলো মায়া? কী হয়েছে?”
মায়া কোনো কথা বললো না। ব্যথায় চোখ বেয়ে টুপটাপ নোনা জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো গাল বেয়ে।
মায়ার মা “রুবিনা পাটোয়ারী” মায়ার দিকে তাকিয়ে স্নেহভরা কণ্ঠে বলে উঠলেন,
“মনে হয় তরকারির ঝোলটা ঠোঁটের কাটা জায়গায় লেগেছে। তাই এমন করছে।
চল মা, আমার সাথে ওয়াশবেসিনে গিয়ে মুখটা ধুয়ে নে।”
মহিমা চৌধুরী বলে উঠল,
“সে কী, ঠোঁটে কীভাবে চোট পেলে ?”

মায়া কোনো কথা না বলে দৌড়ে ওয়াশবেসিনের কাছে গিয়ে মুখে ঠাণ্ডা পানি দিতে লাগলো বারবার। কিছুক্ষণ পর সে ধীরে ধীরে আবার টেবিলে ফিরে এসে চুপচাপ বসল। এদিকে মায়া আসার আগেই কৌশিক খাবার শেষ করে উপরে উঠে গেছে। টেবিলে এক ধরনের নীরবতা নেমে এলো।
এমন সময় কৌশিকের বাবা “আশরাফ চৌধুরী” নরম স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,
“মায়া, তুমি ঠিক আছো? দাড়াও, আমি কৌশিককে বলছি তোমাকে যেন ডাক্তার দেখিয়ে আনে।”
মায়া কৌশিকের নাম শুনেই দ্রুত মাথা নাড়িয়ে বললো,
“না বড় মামা, দরকার নেই। আমি একদম ঠিক আছি।”
এই বলে মায়া খাবার খাওয়া শুরু করে দিলো।
রাতের খাবার শেষ হলো। সবাই যার যার ঘরে চলে গেল। পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ। কেবল অন্ধকারে বাতাসের মৃদু সোঁ সোঁ শব্দ শোনা যায়।

মায়া বিছানায় শুয়ে আছে। ঠোঁটে ব্যথার ঝাঁজটা বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে কৌশিকের দেওয়া আঘাতের কথা। ঠোঁট নড়ালেই টান টান যন্ত্রণায় শরীর কেঁপে উঠছে। আয়নায় না দেখেও বোঝা যাচ্ছে, কাটা জায়গাটা সেরে উঠতে সময় লাগবে।
সে চোখ বন্ধ করল, কিন্তু মনে শান্তি নেই। হঠাৎ করেই কিছুক্ষণ আগের ঘটনা বারবার মাথায় ফিরে আসছে। নিজের চুল মুঠো করে ধরে চাপা কান্নায় ভেঙে পড়ল সে।
“এটা কী হচ্ছে আমার সঙ্গে? কেন কৌশিক ভাইকে দেখলেই সব ভুলে যাই? কেন মনে হয় আমি অন্য এক ভ্রমের জগতে পড়ে যাচ্ছি?”

মায়ার বুক কেঁপে উঠল। কৌশিকের উন্মাদনা, তার অদ্ভুত ভালোবাসার প্রকাশ সবই যেন তাকে তাড়া করছে। অথচ সে জানে, এই অনুভূতিগুলোকে প্রশ্রয় দেওয়া ভয়ংকর ভুল হবে।
সে মনে মনে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল নিজের দিকেই,
“কৌশিক ভাই হঠাৎ আমায় এত কাছে টেনে নিল কেন? এত তাড়াতাড়ি আমার প্রতি ভালোবাসা জন্মাল কীভাবে? এগুলো নিশ্চয়ই ভান? ফাঁদ? আগে তো আমার দিকে ফিরেও তাকাত না। আর এখন ভালোবাসার নামে আমাকে অবরুদ্ধ করছে। কোনো ব্যাখ্যা নেই, কোনো উত্তর নেই শুধু আকস্মিক চুম্বন! তারপর আবার নীরবতা। অদ্ভুত মানুষ তো!
মায়া ঠোঁট কামড়ে রাগে ফিসফিস করে বলল,

“কিন্তু আমি হার মানব না। অপমানের শাস্তি আপনাকে দিতেই হবে। বয়সের তুলনা দিয়ে আমার ভালোবাসাকে ছোট করে, পাগলামি বলে উড়িয়ে দেওয়ার মূল্য যে পেতেই হবে। তিলে তিলে যেমন আমায় কষ্ট দিয়েছে, তেমনি তিলে তিলে আমিও আপনাকে পোড়াবো।
ভাবনার ঝড়ে ভেসে যেতে যেতে মায়ার ক্লান্ত দেহটা অবশেষে ঘুমের কাছে আত্মসমর্পণ করল।
অন্যদিকে কৌশিক। অন্ধকার ঘরে একা বসে আছে সে। হাতে সিগারেট। একটার পর একটা ধোঁয়ার পর্দায় যেনো নিজেকে লুকিয়ে রাখছে। সাধারণত সিগারেট ছোঁয় না, কিন্তু যখনই মনে আঘাত পায় তখনই ধোঁয়ার আড়ালে পালাতে চায়। যেনো সাদা ধোঁয়ার মেঘ সব কষ্ট ঢেকে ফেলবে।
হঠাৎ গম্ভীর, ভারী স্বরে বিড়বিড় করে উঠল কৌশিক,

“কেন এমন করছিস, আমার সুইটহার্ট? আমি তো সবই করেছি তোর ভালোর জন্য। তুই কেন সবসময় আমাকে ভুল বুঝিস? কেন করেছিলাম, সেটা জানার চেষ্টা করিসনি কখনো। অথচ আমি, আমি তো কারও প্রতিশ্রুতির বাঁধনে আবদ্ধ। তাই তোকে কিছু বলতে পারছি না। তাই বলে তুই আমার কাছে কিছু জানতে চাইবি না?”
শেষ টান দিয়ে সিগারেটটা নিভিয়ে দিল সে। টলতে টলতে দাঁড়াতে গেল, কিন্তু শরীরটা যেনো তার নিয়ন্ত্রণে নেই। মাথা ভারী, চোখ ঘোলাটে। কয়েক পা যেতেই ধপাসে পা আটকে পড়ে গেল সোজা বিছানার উপর।
সেখানে শুয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ২

“মায়া শুধু কৌশিকে জন্য। আমার হতেই হবে তোকে, তুই শুধুই আমার। তুই শুধু কৌশিক নীর চৌধুরীর, আর কারও নয়……”
এইসব বিড়বিড় করতে করতেই গভীর ঘুমে তলীয়ে পড়ল কৌশিক।

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৪