Home প্রণয়ের নব্য সূচনা প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ১০

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ১০

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ১০
insia isha chowdhury

ঋতুর প্রশ্ন শুনে সূচনার ভীষণ ইচ্ছে করছিল একটা বেফাঁস উত্তর দিতে। মনে মনে সে ভাবল,
এই বাড়িতে তো বউ হয়ে আসতে চেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম নিজের একটা ছোট্ট সংসার হবে। আমার জামাইকে আমি শাড়ির আঁচলে বেঁধে রাখব। যদিও আমি শাড়ি কমই পরি, তাই ওড়নাতেই না হয় বর টাকে বেঁধে রাখব! তারপর সে আমার কথায় উঠবে-বসবে।
কিন্তু সব যেন উল্টো হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে বিয়ে করে শ্বশুরবাড়িতে আসিনি, বরং আবার কলেজে ভর্তি হয়ে গেছি। যেখানে সারাক্ষণ শুধু পড়াশোনা আর পড়াশোনা চলে!
ঋতু এবার আর স্থির থাকতে পারল না। সে নিজেই দ্রুত সূচনার দিকে এগিয়ে এসে বিস্মিত গলায় বলল,
“সিরিয়াসলি! আমার ভাইয়ের সাথে তোর বিয়ে হয়েছে?”
সূচনার মুখে কথা ফোটার আগেই শায়লা খাতুন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“তোরা একে অপরকে চিনিস নাকি?”

ঋতু সঙ্গে সঙ্গে হেসে উঠল। তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আরে মা, এ তো আমাদের সূচি! আমার স্কুলের জুনিয়র ছিল। আমরা একসাথে কত মজা করেছি! কিন্তু পরে আমি কলেজ ভর্তি হয়ে যাওয়ার পর ওর সাথে আর তেমনভাবে যোগাযোগ রাখা হয়নি।
কথাটা শুনে সূচনা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে এগিয়ে গিয়ে ঋতুকে জড়িয়ে ধরে আদুরে গলায় বলল,
“কেমন আছিস, ঋতুর বাচ্চা?”
ঋতুও তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হেসে বলল,
“আমি তো ভালোই আছি, সূচি। কিন্তু তুই তো একেবারে সোজা আমার ভাইয়ের বউ হয়ে গেছিস!”
তাদের এমন বন্ধুত্ব দেখে শায়লা খাতুন এবার মেয়েকে হালকা ধমকের সুরে বললেন,
“ঋতু! সূচনা এখন তোর ভাবি হয়। সূচি সূচি বলছিস কেন?”
ঋতু ঠোঁট ফুলিয়ে মিষ্টি গলায় বলল,
“উফ মা! এটা তো বহুদিনের অভ্যাস। তাই মুখ ফসকে বারবার সূচিই বের হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ করে ভাবি বলা একটু টাফ লাগছে।”

ঋতুর কথায় সূচনার মুখে হালকা অভিমানের ছাপ ফুটে উঠল। সে নরম গলায় বলল,
“ঋতু, তুই তো বলেছিলি এক্সাম শেষ হলে আমার সাথে ঠিকমতো কথা বলবি। আমরা একই কলেজে ভর্তি হব। এমন কত প্ল্যান করেছিলাম! কিন্তু পরে তুই আর যোগাযোগই করলি না।”
ঋতুর মুখটা মুহূর্তেই নরম হয়ে এলো। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আসলে কী বলব, এক্সাম শেষ হওয়ার পর কলেজ অ্যাডমিশনের ঝামেলায় খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। তারপর হঠাৎ আমার ফোনটাও চুরি হয়ে গেল। এর উপর আরও অনেক চাপ মাথার ওপর ঘুরছিল। তাই চাইলেও তোর সাথে আর যোগাযোগ করতে পারিনি।”
একটু থেমে সে আবার মিষ্টি করে হেসে বলল,
“কিন্তু একটা কথা সত্যি আমি ভীষণ খুশি হয়েছি যে শেষ পর্যন্ত তুই আমার ভাবি হয়েছিস।”
রবিন এবার সোফার উপর হেলান দিয়ে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলে হালকা হেসে বলল,
“বাহ ভাই বাহ… ঋতু আর সূচনা তাহলে খুব ভালো বন্ধু!”
ঋতু মিষ্টি হেসে বলল,

“হ্যাঁ, ও আমার অনেক ভালো বান্ধবী।”
রিমা দু’জনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
“তাহলে এতদিন পর যখন বন্ধুদের আবার একসাথে দেখা হয়েছে, তখন তো একটা সেলিব্রেশন হওয়াই উচিত।”
সূচনা সঙ্গে সঙ্গে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল,
“একদম! আমাদের অবশ্যই সেলিব্রেশন করা উচিত।”
ঋতুও সায় দিয়ে বলল,
“আসলেই আজকে সেলিব্রেশন করতে হবে। কাল পুরো দিন আমার শপিং করতে করতে কেটে যাবে, আর তারপরের দিন তো তোর বউভাতের অনুষ্ঠান। তাই ভাবি, আজকে আমরা সব গার্লসরা একসাথে থাকব।”
রিমা একটু ভেবে বলল,
“ঠিক আছে, তবে একটা শর্ত আছে।”
সূচনা কৌতূহলী হয়ে বলল,
“কি শর্ত?”
রিমা শান্ত গলায় বলল,

“খাবার বাইরে থেকে অর্ডার করা যাবে না। সব খাবার আমি বাসাতেই বানাবো। বাইরে থেকে খাবার আনলে তামজিদও খাওয়ার জন্য জেদ করবে, আর আমি চাই না বাইরের খাবার খেয়ে ও অসুস্থ হোক।”
ঋতু আর সূচনা একসাথে হেসে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে।”
তারপর গল্পের মাঝেই ধীরে ধীরে পড়ন্ত বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এলো। তিনজন মিলে রান্নাঘরে ব্যস্ত হয়ে পড়ল রান্না করতে। যদিও মূল রান্নাটা করছিল রিমা, তবুও ঋতু আর সূচনা দু’জনই তাকে সাহায্য করছিল বেশ আগ্রহ নিয়ে।
আজকের মেনুতেও ছিল বেশ আয়োজন ধোঁয়া ওঠা তান্দুরি চিকেন, গ্রিল চিকেন, নরম তুলতুলে রুটি আর জুসি স্টেক। রান্নাঘরের চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে মশলার দারুণ সুবাস। বেশ খানিকটা সময় পর অবশেষে সব রান্না শেষ হলো। এর মধ্যেই ঋতু কিছু সফট ড্রিঙ্কসও অর্ডার করেছিল।
রিমা খুব যত্ন করে বাড়ির সবার জন্য খাবার আলাদা করে সাজিয়ে রেখে দিল। সবকিছু গুছিয়ে নেওয়ার পর তাদের তিনজনের জন্য খাবার নিয়ে ঋতুর রুমে চলে গেল। আজকের রাতটা তারা একসাথেই কাটাবে। ঋতুর রুমে ঢুকে তিনজন মিলে হাসতে হাসতে খাবারগুলো সাজিয়ে রাখতে শুরু করল। পুরো ঘরজুড়ে তখন সুন্দর এক আবহ ছড়িয়ে ছিল।

অন্যদিকে প্রণয়ের বাড়ি ফিরতে ফিরতে প্রায় রাত দশটা বেজে গেল। নিজের পেশা নিয়েই সে এত বেশি ব্যস্ত থাকে যে বিজনেসের দিকটায় খুব একটা সময় দেওয়া হয়ে ওঠে না তার। কিন্তু আজ আরিফুল মির্জার একটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে কিছু সমস্যা তৈরি হওয়ায় সেটাই সামলাতে গিয়ে অনেকটা সময় কেটে গেছে প্রণয়ের।
বাড়িতে ঢুকেই সে সোজা নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। দরজা খুলতেই চোখে পড়ল পুরো ঘরটা একদম পরিপাটি আর শান্ত। টেবিলের উপর বইপত্র সুন্দর করে গুছিয়ে রাখা, আর টি-টেবিলের উপর তার জন্য খাবার সাজানো। তবে সূচনাকে কোথাও দেখা গেল না। প্রণয় প্রথমে বিশেষ কিছু ভাবল না। হয়তো ভাবির ঘরে আছে, কিংবা মায়ের সাথে গল্প করছে। এমনটাই ভেবে সে ফ্রেশ হতে বাথরুমে চলে গেল। বেশ খানিকটা সময় নিয়ে শাওয়ার শেষ করে বেরিয়ে এলো সে। কিন্তু তখনও সূচনা ঘরে ফেরেনি।
প্রণয় ভ্রু কুঁচকে ঘড়ির দিকে তাকাল। রাত দশটা আটত্রিশ বাজে। এত রাত হয়ে যাচ্ছে, এখনও সূচনা ঘরে আসছে না কেন? মনে হালকা বিরক্তি নিয়ে সে ল্যাপটপ নিয়ে কিছু কাজ সারতে বসে গেল। কিন্তু কাজ করতে করতেই কখন সময় গড়িয়ে রাত সাড়ে বারোটা বেজে গেল, সে খেয়ালই করেনি। এবার সত্যিই তার মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল।
প্রণয় ভেবেছিল সূচনা হয়তো রিমার ঘরেই আছে। তাই আর দেরি না করে বড় ভাইয়ের রুমের সামনে গিয়ে নক করল। দরজা খুলতেই রবিন দ্রুত ফিসফিস করে বলল,

“চুপ কর ভাই! একটা শব্দও করিস না। অনেক কষ্টে তামজিদকে ঘুম পাড়িয়েছি।”
প্রণয় নিচু গলায় বলল,
“তুমি তামজিদকে ঘুম পাড়িয়েছো, ঠিক আছে। কিন্তু ভাবি কোথায়?”
রবিন বিরক্ত মুখে বলল,
“আরে তোকে কি বলছি বুঝতে পারছিস না? আস্তে কথা বল!”
প্রণয় এবার কপালে দু’আঙুল বুলিয়ে ধৈর্য ধরে বলল,
“ঠিক আছে, আস্তেই কথা বলছি। এখন বলো তো সূচনা কোথায়?”
রবিন হঠাৎ যেন কিছু মনে পড়তেই হেসে ফেলল।
“ওহ আচ্ছা! ব্যাটা তুই তোর বউকে খুঁজতে বের হয়েছিস।”
প্রণয় বিরক্ত হয়ে বলল,
“ফালতু প্যাঁচাল বাদ দিয়ে বলো কোথায় গেছে। অনেক রাত হয়ে গেছে।”
রবিন মুচকি হেসে বলল,

“যা ভাই, চুপচাপ গিয়ে ঘুমিয়ে পড়।”
তারপর আরও মজা নিয়ে বলল,
“তোর বউ আর আমার বউ দু’জন মিলে এখন ঋতুর সাথে আড্ডা দিচ্ছে।”
প্রণয়ের ভ্রু কুঁচকে গেল।
“কী?”
রবিন এবার হাসতে হাসতেই বলল,
“হ্যাঁ। তোকে বলা হয়নি সূচনা আর ঋতু একসাথে একই স্কুলে পড়ত। সূচনা ছিল ঋতুর জুনিয়র। আজ এতদিন পর একে অপরকে দেখে দু’জনই ভীষণ খুশি হয়েছে। এখন তিনজন মিলে ঋতুর রুমে বসে আড্ডা দিচ্ছে।”
কথাটা শোনামাত্রই প্রণয় কোনো উত্তর না দিয়ে ঋতুর রুমের দিকে হাঁটতে শুরু করল। পেছন থেকে রবিন হেসে বলে উঠল,
“আরে যাস না ভাই! কোনো লাভ নেই। ওরা তোকে ঘরের ভেতর ঢুকতেই দেবে না।”
প্রণয় হাঁটতে হাঁটতেই ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলল,
“সেটা তো সময়ই বলে দেবে।
অন্যদিকে সূচনা, ঋতু আর রিমা খাওয়া-দাওয়া শেষ করে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছিল। তিনজনের হাসি-ঠাট্টায় পুরো ঘরটা প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। ঠিক তখনই দরজায় হালকা ধাক্কার শব্দ হলো। সঙ্গে ভেসে এলো প্রণয়ের গম্ভীর কণ্ঠ,
“ঋতু, দরজাটা খোল তো।”

ঋতু দরজা খুলতেই প্রণয় কিছু বলার আগেই সে তড়িঘড়ি করে বলে উঠল,
“না না না, সূচনা আজকে আমাদের সাথেই থাকবে। তোমার কোনো রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করা হবে না।”
প্রণয় ভ্রু কুঁচকে মৃদু অবাক হয়ে বলল,
“কিন্তু আমি তো এখনো কিছুই বলিনি।”
এদিকে প্রণয়ের কণ্ঠস্বর কানে যেতেই সূচনা অজান্তেই হাতের কাছে থাকা বালিশটা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তারপর একটু সিটিয়ে বসে পড়ল, যেন প্রণয় তাকে দেখতে না পায়। কেননা প্রণয় তাকে পড়াশোনা করতে বলেছিল কিন্তু সে কিছুই পড়েনি। এখন প্রণয় বাড়িতে এসেছে নিশ্চয়ই এতক্ষণে জেনে গেছে যে সূচনা কিছুই পড়াশোনা করেনি। তাহলে এখন আবার সূচনাকে নিয়ে গিয়ে পড়তে বসাবে অবশ্যই। তাই সূচনা নিজেকে আড়াল করে রাখল।
ঋতু ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“বলোনি ঠিকই, কিন্তু তুমি কি বলতে পারো সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি। সূচনা আজ আমাদের সাথেই থাকবে।”

কথাটা বলেই সে দরজা বন্ধ করতে উদ্যত হতেই হঠাৎ রবিন দ্রুত এগিয়ে এসে দরজাটা ধরে ফেলল। তারপর অসহায় মুখ করে মিনতির সুরে বলল,
“রিমু, তোমার ছেলে আবার উঠে গেছে। আমার পক্ষে ওকে আর ঘুম পাড়ানো সম্ভব না। প্লিজ, আজকে এইসব গল্প বাদ দিয়ে চলে এসো।”
রিমার ভীষণ ইচ্ছে ছিল আরও কিছুক্ষণ গল্প করার। কিন্তু ছেলের কথা শুনে আর উপায় রইল না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে রবিনের সাথে চলে যেতে হলো। রিমা আর রবিন চলে যেতেই ঘরে মুহূর্তের জন্য এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। সেই নীরবতার মাঝেই প্রণয় ধীর স্বরে সূচনার উদ্দেশ্যে বলল,
“কেউ যদি এখন আমার সাথে যেতে চায়, তাহলে আসতে পারে।”
সূচনা সঙ্গে সঙ্গেই পাল্টা জবাব দিল,
“কেউ যেতে চাইছে না। সে যেন এখান থেকে চলে যায়।”
দুজনের কথোপকথন শুনে ঋতু ফিক করে হেসে ফেলল। আর প্রণয়ও শান্ত গলায় বলল,
“ঠিক আছে, সে তাহলে চলেই যাচ্ছে।”

কথাটা বলেই সে ধীর পায়ে নিজের ঘরের দিকে হাঁটতে শুরু করল। গভীর রাত। চারপাশে নিস্তব্ধতার চাদর বিছিয়ে আছে। দেয়ালে টাঙানো ঘড়ির কাঁটা তখন প্রায় দু’টা ছুঁইছুঁই। অথচ সেই নীরব রাতেও ঋতুর চোখে একফোঁটা ঘুম নেই। কারণ তার পাশে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকা সূচনা পুরো বিছানাটাকেই নিজের রাজ্য বানিয়ে ফেলেছে।
ঘুমের মধ্যেই কখনো হাত ছুঁড়ছে, কখনো পা নাড়ছে, কখনো আবার এপাশ-ওপাশ করতে গিয়ে পুরো বিছানাটাই দখল করে নিচ্ছে। কয়েকবার তো ঋতুর ঘুম ভাঙিয়েই ছাড়ল, এমনকি একবার ধাক্কা খেয়ে ঋতু বিছানা থেকেই পড়ে গেল। কিন্তু তাতেও সূচনার ঘুমের বিন্দুমাত্র হেরফের হলো না। সে ঠিক আগের মতোই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
মেঝেতে বসে বিরক্ত মুখে কিছুক্ষণ সূচনার দিকে তাকিয়ে রইল ঋতু। তারপর হাল ছেড়ে দিয়ে ফোনটা হাতে তুলে নিল। এই সমস্যার সমাধান একমাত্র একজনই করতে পারবে। একজনকে ফোন দিল ঋতু কিছুক্ষণ রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো,

“হ্যালো।”
ঋতু তখনই কাঁদো কাঁদো গলায় বলে উঠল,
“ভাইয়া, আমি ঋতু বলছি। তুমি প্লিজ ভাবীকে নিয়ে যাও।”
প্রণয় ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কেন? তোর ভাবীকে নিয়ে যাব কেন? তুই তো অনেক শখ করে তোর ভাবিকে নিজের কাছে রেখেছিস। তাহলে তোর ভাবি তোর কাছেই থাকুক।”
ঋতু প্রায় অসহায় গলায় বলে উঠল,
“ভাইয়া প্লিজ! তুমি ভাবিকে নিয়ে যাও। না হলে আমার আর ঘুম আসবে না। ভাবি আমাকে কিছুতেই ঘুমাতে দিচ্ছে না। এমনভাবে নড়াচড়া করছে আমি ঠিক বুঝতে পারছি আমাকে যে ঘুমাতে দেবে না, সেটা আমি ভালো করেই বুঝতে পারছি। প্লিজ ভাইয়া।”
ঋতুর কথা শেষ হতেই দরজায় হালকা নক পড়ল। চমকে উঠে ঋতু বলল,
“এত রাতে আমার ঘরের বাইরে কে এলো?”
ওপাশ থেকে প্রণয়ের গম্ভীর গলা শোনা গেল,

“গাধা, ওটা আমি। তোর ভাই। তাড়াতাড়ি দরজা খোল।”
ঋতু তড়িঘড়ি করে বিছানা থেকে নেমে বলল,
“হ্যাঁ হ্যাঁ, এখনই খুলছি!”
দরজা খুলতেই ঘরের আলো জ্বলে উঠল। আলো পড়তেই বিছানায় ঘুমন্ত সূচনাকে দেখে কিছুক্ষণের জন্য স্থির হয়ে গেল প্রণয়। বিছানাজুড়ে এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে সূচনার ঘন চুলগুলো। বেবি পিংক রঙের গোল জামাটা ওর পরনে। প্রণয় নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। তারপর মনে মনে বিরক্ত হলো–
“এই মেয়েটা প্রতিদিন চুল ছেড়ে ঘুমায় কীভাবে?
এভাবে তো চুলগুলো নষ্ট হয়ে যাবে।”
প্রণয়কে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ঋতু এগিয়ে এসে বলল,
“দাঁড়াও ভাইয়া, আমি ভাবিকে ডেকে দিচ্ছি।”
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই প্রণয় দ্রুত বলল,
“তার কোনো দরকার নেই। ওকে ঘুমাতে দে। আমি ওকে নিয়ে যাচ্ছি।”
কথাটা বলেই সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। তারপর অত্যন্ত সাবধানে ঘুমন্ত সূচনাকে কোলে তুলে নিল।
ঘুমের মধ্যেই সূচনা অচেতন ভঙ্গিতে প্রণয়ের শার্ট মুঠো করে ধরল। দৃশ্যটা দেখে ঋতুর ঠোঁটের কোণে আপনাআপনি হাসি ফুটে উঠল।

প্রণয় দরজার দিকে এগোতে এগোতে বলল,
“তুই এবার ঘুমিয়ে পড়।”
তারপর রাতের সেই নিস্তব্ধতার মাঝেই নিজের ঘুমন্ত বউকে বুকে আগলে নিয়ে প্রণয় ধীরে ধীরে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। প্রণয় ধীর হাতে সূচনাকে বিছানায় শুইয়ে দিল। তারপর নিঃশব্দে দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে ঘরের প্রধান আলো নিভিয়ে দিল। মুহূর্তেই চারপাশটা নরম নীলাভ অন্ধকারে ডুবে গেল। সেই আবছা আলোয় সূচনাকে যেন আরও অচেনা সুন্দর লাগছিল। ওর গলায় থাকা সরু স্বর্ণের চেইনটা মাঝে মাঝে আলো কেটে চিকচিক করে উঠছিল, আর প্রতিবারই প্রণয়ের দৃষ্টি অদ্ভুতভাবে সেখানে আটকে যাচ্ছিল।
আজ প্রণয়ের চোখে ঘুম নেই। অথচ মানুষটা বরাবরই নিয়মের বাঁধনে বাঁধা। ভোরের নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে ওঠা, নামাজ পড়া, সময় মেপে জিম করা, কাজের ফাঁকে এক সেকেন্ডও অপচয় না করা। এমনকি রাতের ঘুমটাও যেন ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ করা প্রণয়ের। তার জীবনটা ছিল একেবারে পরিপাটি হিসেবের মতো, যেখানে আবেগের জন্য আলাদা কোনো জায়গা রাখা ছিল না।

কিন্তু সেই সাজানো জীবনের মাঝখানে হঠাৎ করেই ঝড়ের মতো এসে পড়েছে সূচনা।
মেয়েটা যেন একদিনেই প্রণয়ের সমস্ত নিয়ম এলোমেলো করে দিয়েছে। তার রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে, স্থিরতা ভেঙে দিয়েছে, এমনকি নিজের অজান্তেই তাকে অপেক্ষা করতে শিখিয়েছে। তাই তো সে নিজেও ঋতুর খবরের অপেক্ষায় ছিল। কারণ একদিনেই প্রণয় বুঝে গেছে। সূচনার পাশে কেউ নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারে না।
প্রণয় নিজেই বুঝতে পারে না, কেন এই মেয়েটা তাকে এতটা টানে। কেন বারবার তার চোখ সূচনার দিকেই ফিরে যায়। কেন এই অগোছালো, চঞ্চল মেয়েটার পাশে আসতেই তার সমস্ত নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়ে। তবে কি তিন কবুলের মাঝেই লুকিয়ে থাকে এক অদৃশ্য বন্ধন? যে বন্ধন অচেনা দুটো মানুষকে অজান্তেই একে অপরের দুর্বলতা বানিয়ে ফেলে?

সূচনা আধো ঘুমের আবেশে ধীরে ধীরে কাত হয়ে পাশে রাখা কোলবালিশটা বুকের মাঝে টেনে নিল। নরম তুলোর সেই বালিশে মুখ গুঁজে সে নিশ্চিন্তে শুয়ে পড়তেই প্রণয়ের ভ্রু হালকা কুঁচকে উঠল। অদ্ভুত এক ঈর্ষা এসে ভর করল তার মনে। যেন ওই নিরীহ কোলবালিশটাই তার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী।
একটুও দেরি না করে প্রণয় এগিয়ে গেল। সূচনার বাহুর ফাঁক থেকে কোলবালিশটা আলতো টানে সরিয়ে এমনভাবে দূরে ছুড়ে রাখল, যেন বিছানায় তার জায়গা আর কখনোই হবে না। তারপর নিজেও বিছানায় শুয়ে এক টানে সূচনাকে নিজের বুকের উপর এনে ফেলল।
ঘুম জড়ানো সূচনা বিন্দুমাত্র আপত্তি করল না। বরং আদুরে বিড়ালছানার মতো প্রণয়ের বুকের সাথে মুখ ঘষে আরও একটু গা এলিয়ে দিল। তার উষ্ণ নিঃশ্বাস গিয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছিল প্রণয়ের বুকে জমে থাকা সমস্ত ক্লান্তি। দু’হাতে শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরতেই প্রণয়ের চোখে নেমে এল এক গভীর প্রশান্তি।
সে ধীরে ধীরে মুখটা সূচনার ঘাড়ের কাছে গুঁজে দিল। তারপর খুব নিচু স্বরে, ভালোবাসা মাখানো এক ফিসফিসে কণ্ঠে বলল

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৯

“এখন থেকে এই বিছানায় আর কোনো কোলবালিশ থাকবে না, সূচনা। এখানে শুধু একটা বালিশ থাকবে, যেখানে মাথা রাখবে প্রণয়।
আর প্রণয়ের বুকের ঠিক মাঝখানটায় ঘুমাবে তার অর্ধাঙ্গিনী।”

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ১১