প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ১১
insia isha chowdhury
ভোরের আলো অনেক আগেই পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে পড়েছে। গত রাতের তুমুল ঝড়-বৃষ্টির পর প্রকৃতি এখন শান্ত। বাইরে এখনও টুপটাপ করে ঝিরঝির বৃষ্টি পড়ছে। ভেজা মাটির গন্ধ মিশে আছে চারপাশে। হঠাৎ করেই সূচনার ঘুম ভেঙে গেল। কিন্তু চোখ খুলেই সে কিছু বুঝতে পারল না। চারপাশ অন্ধকার। আর কেউ তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতেই অনুভব করল, সে কারও বাহুবন্ধনে এমনভাবে আবদ্ধ যে নড়াচড়া করাটাই কঠিন হয়ে উঠেছে।
ঠিকমতো নিঃশ্বাস নিতে না পেরে সূচনা কষ্ট করে মাথাটা একটু উঁচু করল। আর তারপরই তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। প্রণয়! সে প্রণয়ের বুকের ভেতর আশ্রয় নিয়ে শুয়ে আছে! মুহূর্তেই গত রাতের কথা মনে পড়ে গেল তার। সে তো ঋতুর ঘরে ঘুমিয়েছিল। তাহলে এখন এখানে কী করছে? আর এই ঘরে এলো কীভাবে?
একটু ভাবতেই সব রহস্যের জট খুলে গেল। প্রণয়ই তাকে এখানে নিয়ে এসেছে। ভাবতেই লজ্জা আর অস্বস্তিতে সূচনার গাল দুটো লাল হয়ে উঠল।
বিছানার এক কোণায় নিজের ওড়নাটা অবহেলায় পড়ে থাকতে দেখে সূচনা তাড়াতাড়ি প্রণয়ের হাতটা নিজের কোমর থেকে সরিয়ে দিল।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই প্রণয় আধো ঘুমের ঘোরে আবার তাকে নিজের কাছে টেনে নিল। মুখটা ডুবিয়ে দিল তার ছোট্ট গলার কাছে। প্রণয়ের উষ্ণ নিশ্বাস গলায় এসে লাগতেই সূচনার সমস্ত ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। কোন কিছু না ভেবেই সে জোরে একটা ধাক্কা দিল প্রণয়কে। ধাক্কা খেয়ে প্রণয়ের ঘুম ভেঙে গেল। চোখ মুছতে মুছতে সে আড়মোড়া ভাঙল। তারপর পাশের ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখল, প্রায় সাতটা বাজে। অনেক দেরি হয়ে গেছে।
ঠিক তখনই সূচনা কোমর ছোঁয়া চুলগুলো সামনে এনে গম্ভীর স্বরে একটু জোরে বলল,
“আমি এই ঘরে কিভাবে আসলাম?”
প্রণয় ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে তার দিকে তাকাল।
সেই দৃষ্টি পড়তেই সূচনার বুকটা কেমন যেন ধক করে উঠল। এক মুহূর্ত আগেও যে সাহস নিয়ে প্রশ্নটা করেছিল, এখন নিজেকেই নিজের কাছে অবাক লাগছে। সে কিভাবে তার এই জল্লাদ প্রফেসর, ওরফে জল্লাদ স্বামীকে এত জোর গলায় জবাবদিহি করতে বলল?
প্রণয় বুঝতে পারল, প্রশ্ন করার পর এখন মেয়েটা নিজেই একটু ভয় পেয়ে গেছে।
তাই ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে বলল,
“তুমি তো আগে বলোনি তোমার এই রোগ আছে?”
সূচনা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“রোগ? কিসের রোগ?”
প্রণয় বাঁ হাতে গাল চুলকাতে চুলকাতে বলল,
“ছি! ওয়াইফি, ছি! আমার কাছ থেকে এত বড় একটা কথা লুকিয়ে রেখেছো?
সূচনা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল,
“কি লুকিয়েছি আমি?”
“এই যে, ঘুমের মধ্যে ঘুমের ঘোরে তুমি হাঁটো!”
সূচনা এক মুহূর্তের জন্য বুঝতে পারল না যে প্রণয় আসলে তাকে কি বলছে! তাই ও আবারো জিজ্ঞাসা করল,
“মানে?”
“মানে তুমি যে ঘুমের ঘোরে হাঁটাহাঁটি করো। কালকে তো ঋতুর ঘরে ঘুমিয়েছিলে। তারপর ঘুমের মধ্যেই হাঁটতে হাঁটতে আমার রুমে চলে এসেছো।”
কথাটা শুনে সূচনা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল প্রণয়ের দিকে। সে খুব ভালো করেই জানে, লোকটা নির্লজ্জের মতো তাকে মিথ্যে বলছে। তাই ও ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“ও আচ্ছা! তাহলে আমি ঘুমের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে আপনার কাছে চলে এসেছিলাম?”
“অবশ্যই। এতে কোন সন্দেহ নেই।”
“তাহলে আপনি আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন কেন?”
সূচনার কথাটা শুনে প্রণয় সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসল। এতক্ষণ সে বিছানায় শুয়ে ছিল কিন্তু সূচনার কথা শুনে সে বসলো তারপর ধীরে ধীরে সূচনার দিকে ঝুঁকে এল।
ঘটনাটা এত দ্রুত হয়েছে যে সূচনা হালকা ভয়ে অজান্তেই একটু পিছিয়ে গেল। কিন্তু প্রণয় তার এক বাহু ধরে ফেলল।তারপর মুখটা কানের কাছে নিয়ে নরম স্বরে বলল,
“কারণ আমি তোমাকে নিয়ে কোনো রিস্ক নিতে চাইনি।”
সূচনা বিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করল,
“রিস্ক! কিসের রিস্ক?”
প্রণয়ের গলার স্বরটা এবার অদ্ভুতভাবে কোমল হয়ে উঠল।
“যদি আবার ঘুমের ঘোরে হাঁটতে শুরু করতে? যদি কোথাও গিয়ে পড়তে? আর তুমি যদি ব্যথা পেয়ে যেতে! তাই তোমাকে জড়িয়ে ধরেছিলাম। যাতে তুমি আর কোথাও চলে যেতে না পারো।”
কথাগুলো শুনে সূচনার গাল গরম হয়ে উঠল।
তবে সেটা লজ্জায়, না বিরক্তিতে, সে নিজেও জানে না।
সূচনা দ্রুত ওড়নাটা গায়ে জড়িয়ে নিয়ে বলল,
“আপনি একজন মিথ্যেবাদী প্রফেসার। নাটক করা বন্ধ করুন। আমার এমন কোনো রোগ নেই। আপনি নিজেই আমাকে কাল রাতে এখানে নিয়ে এসেছেন। তা আমি ভালো করেই বুঝতে পারছি। বিন্দুমাত্র লজ্জা-শরম নেই আপনার! যেখানে আমি ঋতুর সঙ্গে ঘুমিয়ে ছিলাম, আমাকে এখানে নিয়ে আসার কী এত দরকার ছিল?”
প্রণয় এবার বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল।য়তারও অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে। শার্টের হাতা গুটাতে গুটাতে বলল,
তোমার আদরের ননদই আমাকে ফোন করে বলেছে, “ভাইয়া, ভাবিকে নিয়ে যাও।”
কথাটা বলেই প্রণয় হাঁটা শুরু করলো তারপর একটু থেমে আবার বলল,
“নাহলে আমার কি এত শখ পড়েছে তোমাকে নিয়ে আসার? আর তুমি তো ঘুমালে এত নড়াচড়া করো যে বিছানা থেকে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তাই ধরে রেখেছিলাম। এর বাইরে তোমাকে জড়িয়ে ধরার কোনো ইচ্ছেই ছিল না আমার।”
সূচনা চোখ ছোট করে তাকাল। এইটা সে নিজেও জানে যে তার ঘুমানোর ধরন খারাপ তাই বলে সে ছোট বাচ্চা না যে বিছানা থেকে পড়ে যাবে। তারপর ফোঁস করে বলল,
“মিথ্যেবাদী একটা!”
প্রণয় ওয়াশরুমের দরজার কাছে গিয়ে থামল। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল তার দিকে।
“কি বললে, আমি মিথ্যাবাদী?” তারপর গভীর স্বরে বলল,
“সে যাই হই কিন্তু তোমারই তো স্বামী।”
স্বামী কথাটা শুনে সূচনার বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠল।
সূচনা ফ্রেশ হয়ে নিচে নামতেই করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা ঋতুকে দেখতে পেল। ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলছে সে। সূচনা ধীর পায়ে এগিয়ে যেতেই ঋতুর কণ্ঠ ভেসে এলো,
“আমি তো এটাই বুঝতে পারছি না তুই এমনটা কিভাবে করলি? ঠিক আছে, তোর এক্সাম শেষ হয়েছে। তাই বলে তুই তো জানিস আমার গতকাল আসার কথা ছিল। তাহলে তুই কোন হিসেবে তোর বান্ধবীর বাড়িতে চলে গেলি?”
ফোনের ওপাশ থেকে সুপ্তি নির্বিকার গলায় বলল,
“আসলে রেজাল্টের টেনশন, তারপর আরও বিভিন্ন কারণ আছে। তাই ভাবছিলাম একটু অন্য কোথাও যাওয়া উচিত। মিনুর কাছে দুই দিন থাকলে হয়তো একটু ভালো লাগবে। সেই জন্য এখানে এসেছি।”
“আচ্ছা ঠিক আছে, থাক। কিন্তু কাল যে বউভাতের অনুষ্ঠান। তুই কিন্তু ঠিক সময়ে চলে আসবি।
ঋতুর কথায় সুপ্তির বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।
“বিশ্বাস কর ঋতু, আমার একদমই যাওয়ার ইচ্ছে নেই। সেই জন্যই তো আমি পালিয়ে এসেছি।”
কথাটা বলতে ভীষণ ইচ্ছে করলেও মুখে আনল না সুপ্তি। সত্যি বলতে প্রণয়ের বিয়েতেও সে উপস্থিত ছিল না। সেদিন বাড়িতে জানিয়ে দিয়েছিল শরীর খারাপ। আর কেউ জোরও করেনি।
ঋতু আবার বলল,
“আর শোন, খালামণি মনে হয় আজকেই আসবে। উনি যদি এসে দেখেন ওনার মেয়ে এখানে না থেকে বান্ধবীর বাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাহলে কিন্তু ভীষণ রাগ করবে। তাই যত তাড়াতাড়ি পারিস চলে আসিস।”
“আচ্ছা।”
ছোট্ট উত্তর দিয়েই ফোন কেটে দিল সুপ্তি।
ঋতু ফোনটা নামাতেই সূচনা জিজ্ঞেস করল,
“কার সাথে কথা বলছিলি?”
“আরে, সুপ্তির সাথে। কালকে বাসায় অনুষ্ঠান, আর মহারানী এক্সাম শেষ হতেই সোজা ওর বান্ধবী মিনুর বাড়িতে চলে গেছে।”
“ও, শুধু এটুকুই বলল সূচনা।”
তবে তার মুখভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল সে অন্য কিছু ভাবছে। তা দেখে ঋতু ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কী রে? এত কী ভাবছিস?”
সূচনা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“জানি না, হয়তো তোর কাছে অদ্ভুত লাগবে। কিন্তু আমার কেন যেন মনে হয়, সুপ্তি মেয়েটা আমাকে ঠিক পছন্দ করে না। না হলে ও আমার বিয়ের পরের দিনই আমাকে দেখে বাড়ি থেকে চলে গেল কেন?”
কথাটা শুনে ঋতু হেসে ফেলল। কারণ প্রায় অনেক বছর ধরেই সুপ্তি এই বাড়িতে থাকছে। ঋতুও ওর সঙ্গে অনেকটা সময় কাটিয়েছে। আজ পর্যন্ত কখনো সুপ্তিকে কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতে দেখেনি। বাড়ির সবার সাথেই মেয়েটার সম্পর্ক ভালো। আর সূচনার মতো মিষ্টি, প্রাণবন্ত একটা মেয়েকে কেউ অপছন্দ করতে পারে, এমনটা ভাবাই কঠিন। তাই হেসে বলল,
“ধুর! তুই বেশি ভাবছিস। এমন কিছু না। সুপ্তি আসলে সবার সাথে একটু কম কথা বলে। তোর সাথে মিশতে হয়তো সময় লাগবে। কিন্তু ও সত্যিই অনেক ভালো একটা মেয়ে। আর তুই এত কিউট একটা মেয়ে, তোকে আবার কে অপছন্দ করবে বল?”
ঋতুর কথা শুনেও সূচনা কিছু বলল না। শুধু নিঃশব্দে ঋতুর দিকে তাকিয়ে রইল। ঋতুর কথা শুনেও সূচনার মনের ভেতরের অদ্ভুত অনুভূতিটা কিছুতেই দূর হলো না। কিছু কিছু মানুষ থাকে, যাদের মুখের ভাষা আর মনের ভাষা এক হয় না। বাইরে থেকে তারা যতই স্বাভাবিক আর ভদ্র হোক, তাদের চোখের গভীরে লুকিয়ে থাকে এক অদৃশ্য দূরত্ব। সুপ্তির ব্যাপারেও সূচনার ঠিক এমনটাই মনে হয়। কোনো নির্দিষ্ট কারণ নেই, কোনো প্রমাণও নেই। তবুও যখনই মেয়েটার কথা মনে পড়ে, সূচনার বুকের ভেতর কেমন একটা অস্বস্তি জমে ওঠে। যেন শান্ত পুকুরের স্বচ্ছ জলের নিচে কোথাও অদৃশ্য স্রোত বয়ে চলেছে। আবার সূচনা ভাবল হয়তো সে ভুল ভাবছে। হয়তো সবটাই তার কল্পনা। এর বাইরে আর কিছুই না।
আজ সূচনার বৌভাতের অনুষ্ঠান। সকাল থেকেই পুরো মির্জা বাড়িতে উৎসবের রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে। বাড়ির প্রতিটি কোণ আলো, ফুল আর মানুষের কোলাহলে মুখর। পার্লারের মেয়েরা বাড়িতে এসেই সূচনাকে সাজিয়ে দিয়ে গেছে। গাঢ় মেরুন রঙের লেহেঙ্গায় আজ তাকে অপার্থিব সুন্দর লাগছে। মাথায় নিখুঁতভাবে সেট করা দোপাট্টা, তার সঙ্গে মানানসই গয়না। সব মিলিয়ে তাকে দেখে চোখ ফেরানো দায়।
সূচনার পাশে ঋতু আর রিমাও কম যায় না দুজনেই ল্যাভেন্ডার রঙের শাড়িতে সেজেছে।
অন্যদিকে প্রণয়ও তৈরি হচ্ছে। তাকে ব্ল্যাক রঙের পাঞ্জাবি দেওয়া হয়েছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো নিজেকে দেখে নিল সে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই বর-কনে স্টেজে গিয়ে বসবে।
কিন্তু এত আনন্দ, এত ব্যস্ততা আর হাসি-খুশির মাঝেও একজন মানুষ চুপচাপ মন খারাপ করে বসে আছেন। সোমা বেগম। তিনি একদিন আগেই মির্জা বাড়িতে এসে পৌঁছেছেন। কিন্তু বাড়িতে এসেই জানতে পেরেছেন, তার মেয়ে এখনো আসেনি। সবাই বলছে, সে নাকি তার বান্ধবীর বাড়িতে আছে। এরপরে সে নিজের মেয়ের সাথে কথা বলেছে। সুপ্তি নিজেও বলল তার আসতে আসতে দেরি হয়ে যাবে। কথাটা শুনেই তার মনটা কেমন যেন অস্থির হয়ে আছে।
এদিকে শায়লা খাতুন পুরো বাড়ির কাজকর্ম সামলাতে ব্যস্ত। কখন কোথায় কী লাগবে, কোন অতিথির কী প্রয়োজন সবকিছু একাই দেখাশোনা করছেন তিনি। যদিও অনুষ্ঠান এখনো শুরু হয়নি।
কিন্তু ব্যস্ততার মাঝেও ছোট বোনকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে তার কাছে এগিয়ে গেলেন।
“কি ব্যাপার সোমা? কি হয়েছে?”
সোমা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“কি আর বলব আপা! মেয়েটা পরীক্ষার রেজাল্টের চিন্তায় এমন অস্থির হয়ে আছে যে অনুষ্ঠানটাও ঠিকমতো এটেন্ড করতে পারছে না। এতদুর থেকে আসলাম তবু এখন পর্যন্ত মেয়ের মুখ টাও দেখতে পারলাম না তাই দুশ্চিন্তা হচ্ছে।”
শায়লা খাতুন মৃদু হেসে বললেন,
“আরে, ও কিছুক্ষণের মাঝেই চলে আসবে। তুই এত চিন্তা করিস না। আগে আমাকে বল, জামিউল কেন এলো না?”
সোমা বেগম এবার একটু অপ্রস্তুত হাসলেন।
“আর বলো না আপা। ব্যবসায়িক কাজে সুপ্তির বাবার যে কী পরিমাণ ছোটাছুটি করতে হয়! সকাল-সন্ধ্যা শুধু কাজ আর কাজ। ছেলেটাও যদি একটু বড় হতো, তাহলে বাবার হাতে হাতে সাহায্য করতে পারত। কাজের চাপে শেষ পর্যন্ত আসতেই পারল না।”
“ও আচ্ছা।”
শায়লা খাতুন মাথা নেড়ে বললেন। তারপর হঠাৎ করেই মুখে একটা হাসি ফুটিয়ে যোগ করলেন,
“কিন্তু এসব বাদ দে। আগে বল তো, আমার ছোট বউমাকে কেমন লাগলো?”
প্রশ্নটা শুনে সোমা বেগমের গতকালের ঘটনা মনে ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
সোমা বেগম গ্রামের বাড়ি থেকে এসেছেন। বড় বোনের বাড়িতে আসবেন বলে আগেভাগেই নিজের হাতে কত কিছু বানিয়ে এনেছেন। কাঁচা আমের আচার, এবং আম দিয়ে তৈরি বিভিন্ন রকমের আচার এছাড়া বড়ি, ও নানা রকম শুকনো খাবার, আর শায়লা খাতুনের পছন্দের কত কী! তবে এতসব জিনিসপত্র নিয়ে আসাটা যে সহজ ছিল না, সেটা বাড়ির গেট পেরোতেই বোঝা গিয়েছিল। সাথে ছিল শুধু তার ছোট ছেলে অনিক। ক্লাস সিক্সে পড়া ছেলেটা যতটুকু পারছিল সাহায্য করছিল, কিন্তু এতগুলো ব্যাগ সামলাতে গিয়ে হঠাৎই সোমা বেগমের হাত থেকে একটা ব্যাগ নিচে পড়ে যায়। ব্যাগের মুখ খুলে কয়েকটা জিনিসপত্র চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
সেই সময় সূচনা ড্রয়িংরুমেই ছিল। দৃশ্যটা চোখে পড়তেই এক মুহূর্তও দেরি করেনি সে। দ্রুত এগিয়ে গিয়ে নিচে পড়ে থাকা জিনিসগুলো কুড়িয়ে নিতে শুরু করল। সোমা বেগম অবাক হয়ে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। এই বাড়িতে আগে কখনো তাকে দেখেননি। তাই কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে বললেন,
“মা, তোমাকে তো আগে এই বাড়িতে দেখিনি। তুমি কি নতুন…”
কথাটা শেষ করার আগেই সূচনা হাসিমুখে বলে উঠল,
“হ্যাঁ, আমি এই বাড়ির নতুন বউ। আমার নাম আরুশি সিকদার সূচনা। আর আমার হাজবেন্ডের নাম আবরার প্রণয় মির্জা।”
এক নিঃশ্বাসে নিজের পুরো পরিচয় দিয়ে দেওয়ায় সোমা বেগম খানিকটা হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন। তারপরই মনে মনে হেসে ফেললেন। মেয়েটার ভেতরে কোনো জটিলতা নেই। যা মনে আসে, তাই সরলভাবে বলে ফেলছে। সূচনা ইতোমধ্যে ব্যাগগুলো নিজের হাতে তুলে নিয়েছে।
“ব্যাগগুলো আমাকে দিন। এত ভারী ব্যাগ আপনি একা একা নিয়ে এসেছেন! নিশ্চয়ই অনেক কষ্ট হয়েছে। আসুন, আগে বসুন।”
ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে রিমা বেরিয়ে এল। এসে খালামণিকে দেখে মুখভরা হাসি নিয়ে সালাম করল।
“আরে খালামণি! কেমন আছেন?”
তারপর সূচনার দিকে তাকিয়ে বলল,
“সূচনা, ইনি রবিনের ছোট খালামণি। আমাদেরও খালামণি।”
“ও আচ্ছা! আমি তো ওনার সাথেই কথা বলছিলাম।”
রিমা হেসে বলল,
“ব্যাগগুলো আমাকে দাও। আমি রেখে দিচ্ছি। তুমি বরং গিয়ে মাকে ডেকে আনো। মা নিজের ঘরেই আছে। আমি আর চুমকি রান্নাঘর সামলে নিয়েছি।”
সূচনা সঙ্গে সঙ্গেই মাথা নাড়ল।
“আচ্ছা, আমি এখনই ডেকে আনছি।
বলেই প্রায় দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গিয়েছিল সে। সেই দৃশ্যটার কথা মনে করেই সোমা বেগম এবার মুগ্ধ গলায় বললেন,
“মেয়েটা বেশ চঞ্চল, সহজ-সরল। দেখতে যেমন সুন্দর, স্বভাবও তেমন মিষ্টি। বলতে গেলে প্রণয়ের একদম উল্টো। তা আপা, এমন মেয়ের খোঁজ তুমি কোথায় পেলে?”
শায়লা খাতুন হালকা হেসে বললেন,
“তা বেশ বলেছিস। সূচনা আর প্রণয় সত্যিই একদম দুই মেরুর মানুষ। আর এই জিনিসটাই আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে। প্রণয় বরাবরই চুপচাপ। আর সূচনা? ও তো এক মুহূর্তও চুপ করে বসে থাকতে পারে না। আর সূচনাকে দেখে আমার মনে হয়েছিল ও আমার ছেলেকে ভালো রাখবে। আর যেটা বললি, তোর দুলাভাই আর সূচনার বাবা বহু বছরের বন্ধু। কয়েক মাস আগে ওদের বাড়িতে একটা দাওয়াত ছিল। আমি আর তোর দুলাভাই গিয়েছিলাম। সেখানেই প্রথম সূচনাকে দেখি। মেয়েটাকে প্রথম দেখাতেই আমার ভীষণ পছন্দ হয়ে যায়।”
শায়লা খাতুনের চোখে তখন ভেসে উঠল স্মৃতির কোমল ছায়া।
“তারপর আর দেরি করিনি। সুযোগ বুঝে বিয়ের প্রস্তাব দিলাম। ওরাও কিছুদিন সময় নিয়ে রাজি হয়ে গেল।”
সোমা বেগম মুচকি হেসে বললেন,
প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ১০
“কিন্তু প্রণয় তো বিয়ের নামই শুনতে চাইত না।”
“আর বলিস না! শায়লা খাতুন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন। একটাই কথা, “এখন না, আমার আরও সময় লাগবে। কত অজুহাত! ”
শেষে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে কোনোমতে রাজি করিয়েছি। রাজি হওয়ার পর আবার ভয় ছিল, যদি মত বদলে ফেলে! তাই আর দেরি করিনি। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিয়েটা সেরে ফেলেছি।”
