Home প্রণয়ের নব্য সূচনা প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ১৬

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ১৬

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ১৬
insia isha chowdhury

সড়কপথ ধরে গাড়িটি বেশ দ্রুতগতিতেই ছুটে চলছিল। কিন্তু অস্থির যুবকটির কাছে সেই গতিও যথেষ্ট মনে হচ্ছিল না। তার মনে হচ্ছিল, গাড়িটা যেন ইচ্ছে করেই ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। রাফি কব্জিতে বাঁধা সিলভার রঙের ব্র্যান্ডেড ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে সময় দেখে নিল। বিরক্তিতে তার ভ্রু কুঁচকে গেল। যেতে এত সময় লাগছে কেন? বারবার তার দৃষ্টি চলে যাচ্ছিল সূচনার জন্য আনা উপহারগুলোর দিকে।
দেশে ফেরার আগেই প্রায় একদিন সময় নিয়ে সব কেনাকাটা সেরে রেখেছিল সে। যতদূর জানে, সূচনার পছন্দের জিনিসগুলোই বেছে এনেছে। একটা বড় টেডি বিয়ার, আরো নানান ধরনের কিউট কিউট জিনিসপত্র। আর নানা ধরনের চকলেট—সবই সূচনার খুব প্রিয়। সময়ের স্বল্পতার কারণে আরও কিছু কিনতে পারেনি ঠিকই, তবে সে নিশ্চিত ছিল, এই উপহারগুলো সূচনার মন ছুঁয়ে যাবে।
কিন্তু এখন এসব ভাবারও সময় নেই। তার শুধু মনে হচ্ছিল, গাড়িটা যেন খুব ধীরে চলছে। এভাবে চলতে থাকলে গন্তব্যে পৌঁছাতে পৌঁছাতে অনেক দেরি হয়ে যাবে। অবশেষে আর ধৈর্য রাখতে না পেরে রাফি সামনের দিকে ঝুঁকে ড্রাইভারকে বলল,

“এক্সকিউজ মি, আপনি যদি কিছু মনে না করেন, তাহলে গাড়িটা আমি চালাতে চাই। আপনার ড্রাইভিংটা আমার কাছে একটু বেশি ধীর মনে হচ্ছে।”
ড্রাইভার এক মুহূর্তের জন্য বিস্মিত হয়ে গেল। এই পেশায় সে বহু বছর ধরে আছে, কিন্তু কোনো যাত্রীকে এভাবে ড্রাইভিং সিট চাইতে সে আগে কখনো দেখেনি।
কিছুটা অবাক স্বরে সে বলল,
“স্যার, আমি তো যথেষ্ট দ্রুতগতিতেই গাড়ি চালাচ্ছি। ”
রাফি ত্যাড়ার মতো দৃঢ়ভাবে মাথা নেড়ে বলল,
“হতে পারে। কিন্তু আমার কাছে গতিটা যথেষ্ট মনে হচ্ছে না। আপনি গাড়িটা এক পাশে থামান। আমি নিজেই ড্রাইভ করব।”

রাফির কণ্ঠে এমন একরোখা দৃঢ়তা ছিল যে ড্রাইভার আর কোনো আপত্তি করল না। শেষমেশ রাস্তার এক পাশে গাড়িটি থামিয়ে সে ড্রাইভিং সিট ছেড়ে দিল। পরমুহূর্তেই রাফি স্টিয়ারিং হাতে নিয়ে বসে পড়ল। তারপর ইঞ্জিনের গর্জন তুলে গাড়িটাকে আগের চেয়ে অনেক বেশি গতিতে ছুটিয়ে দিল সামনের পথে।
সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল। রাফি বেশ দক্ষতার সঙ্গেই গাড়ি চালাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎই তার ফোন বেজে উঠল। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য ফোনের দিকে দৃষ্টি যেতেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটা ঘটে গেল।
সামনের একটি গাড়ির সঙ্গে তার গাড়ির হালকা সংঘর্ষ হলো। ঘটনাটা এতটাই আকস্মিক ছিল যে রাফি এবং পাশে বসা ড্রাইভার দুজনেই ভীষণ হকচকিয়ে গেল।
রাফি দ্রুত গাড়ি থামিয়ে ফেলল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই অপর পাশের গাড়ির দরজা খুলে একজন তরুণী নেমে এল। অফ-হোয়াইট রঙের সালোয়ার-কামিজ পরা মেয়েটি দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে গাড়ির জানালায় টোকা দিল। রাফি বুঝতে পারল, পরিস্থিতি মোটেও সুবিধার নয়। সে গাড়ি থেকে নেমে আসতেই মেয়েটির মুখটা স্পষ্ট দেখতে পেল। মুখভর্তি রাগ, চোখদুটো যেন আগুন ছড়াচ্ছে।

রাফি কিছু বলার আগেই তরুণীটা সাপের মতো ফোঁসফোঁস করতে করতে বলে উঠল,
“আশ্চর্য! ঠিকমতো গাড়ি চালাতে পারেন না, তাহলে গাড়ি নিয়ে রাস্তায় বের হন কেন?”
কথাটা শুনে রাফি কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।
তার বয়স এখন ২৮। পাঁচ বছরেরও বেশি সময় আগে ড্রাইভিং লাইসেন্স করেছে। দীর্ঘদিন ধরেই সে নিজে গাড়ি চালায়। সেখানে একটা ছোট দুর্ঘটনার জন্য তাকে এভাবে কথা শুনতে হবে? এসব ভেবেই রাফির চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। এদিকে রাফি কোনো উত্তর দিচ্ছে না দেখে মেয়েটি আবার বলে উঠল,
“আপনি কি কানা? আর তার সাথে কি বোবাও? কথা বলতে পারেন না বুঝি?”
এবার রাফির ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। গম্ভীর স্বরে সে বলল,

“এই মেয়ে, তোমার বয়স কত? উল্টাপাল্টা কথা বলছ কেন? সাহস হয় কীভাবে আমাকে কানা আর বোবা বলার? তুমি নিজেই তো একটা বেয়াদব!”
মেয়েটি বিন্দুমাত্র না ঘাবড়িয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“ও আচ্ছা! আপনি আমার গাড়িতে ধাক্কা মারবেন, তাতে কোনো সমস্যা নেই। আর আমি সত্যি কথা বললে আমি বেয়াদব?”
তারপর কটাক্ষের হাসি হেসে যোগ করল,
“আর কী বললেন? আমার বয়স কত? আমার বয়স যতই হোক, আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে আপনি আমার দাদুর বয়সী!”
রাফি বিস্ফোরিত চোখে তাকাল।
“হোয়াট? দাদু?”

“হ্যাঁ, দাদুই তো! আমার বয়স জেনে আপনি কী করবেন? আমার বিয়ের ঘটকালি করবেন নাকি?”
“আশ্চর্য! তোমার মাথায় কোনো সমস্যা আছে?”
“সমস্যা তো আপনার। দেখুন, আপনি আমার গাড়ির দরজার হ্যান্ডেল ভেঙে দিয়েছেন। এখন আপনাকে কী করা উচিত জানেন? আপনাকে পুলিশে দেওয়া উচিত!”
এদিকে গাড়ির ভেতরে বসেছিল সুপ্তি। ঋতুর একটা জরুরি কাজ ছিল, আর জোর করেই সে সুপ্তিকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়েছিল। কিন্তু অনেকক্ষণ ধরে একজন অচেনা লোকের সঙ্গে ঋতুর এমন তর্ক-বিতর্ক দেখে সুপ্তি আর বসে থাকতে পারল না।
সে গাড়ি থেকে নেমে আসতেই রাফি উঁচু গলায় বলে উঠল,
“তোমার সাহস কত বড়! আমাকে পুলিশে দেওয়ার কথা বলছ? আমি কি একবারও বলেছি যে আমি ক্ষতিপূরণ দেব না?”
ঋতু তৎক্ষণাৎ জবাব দিল,

“আপনি বললেও দেবেন, না বললেও দেবেন। কারণ ভুলটা আপনার!”
এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতি দেখে সুপ্তি ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ে গেল। সে দ্রুত ঋতুর হাত ধরে বলল,
“আশ্চর্য! কী শুরু করেছিস? একটা ছোট বিষয় নিয়ে এত ঝামেলা করার কী আছে?”
ঋতু বিরক্ত হয়ে বলল,
“আমি কি ইচ্ছে করে ঝামেলা করেছি? লোকটা গাড়ি ভেঙেছে, আমি ডাকছি, কোনো উত্তর দিচ্ছে না। শুধু আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। তাহলে আমার কী করা উচিত ছিল?”
সুপ্তি এবার রাফির দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল,
“দেখুন, আমরা একটা জরুরি কাজে যাচ্ছি। মাঝপথে এই ঝামেলা হওয়ায় ও একটু বেশি রেগে গেছে। আপনি কিছু মনে করবেন না। ও আসলে একটু রাগী, কিন্তু ওর মনটা অনেক ভালো।”
রাফি ভ্রু কুঁচকে বলল,

“ওনার মন ভালো দিয়ে আমি কী করব?”
ঋতু অবাক হয়ে সুপ্তির দিকে ফিরল।
“তুই কি পাগল? ওনাকে আমার সম্পর্কে এসব বলছিস কেন?”
রাফিও সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“আমারও আপনার সম্পর্কে জানার কোনো আগ্রহ নেই। আর উনি পাগল নন, পাগল তো আপনি।”
“দেখেছিস! সাহস কত বড়! আমি একে সত্যিই পুলিশে দেব!”
সুপ্তি এবার নিজেই ঋতুকে সরিয়ে সামনে এগিয়ে এল।
“দেখুন, আমরা কোনো ঝামেলা চাই না। আপনিও হয়তো কোথাও জরুরি কাজে যাচ্ছেন, আমরাও যাচ্ছি। এসব নিয়ে আর বাড়াবাড়ি না করাই ভালো।”

রাফি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর মানিব্যাগ বের করে গাড়ির ক্ষতিপূরণ হিসেবে সুপ্তির হাতে টাকা তুলে দিল। আসলে শুধু একটা হ্যান্ডেলই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু তার তুলনায় অনেক বেশি টাকা দিয়েছে সে। এতগুলো টাকা দেখে ঋতু আবারও ক্ষেপে উঠল। তার কাছে মনে হলো লোকটা টাকার জোর দেখাচ্ছে। সে ঝড়ের বেগে এগিয়ে এসে সুপ্তির হাত থেকে টাকাগুলো নিয়ে রাফির দিকে ছুড়ে মারল। আর বলল,
“আপনি টাকার গরম কাকে দেখাচ্ছেন? এই টাকা আমাদের দরকার নেই! আপনাকে ক্ষমা চাইতে হবে। ভুল করেছেন আপনি, তাই এখনই সরি বলুন!
ছোট একটা দুর্ঘটনা হয়েছে। কিন্তু বড় দুর্ঘটনাও হতে পারত তাই এখন আপনার উচিত আমাদেরকে সরি বলা।”
এবার সত্যিই রাফির মেজাজ খারাপ হয়ে গেল।

সে চেয়েছিল বিষয়টা শান্তভাবে মিটিয়ে ফেলতে। কিন্তু মেয়েটার একের পর এক আচরণ তার ধৈর্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। রাফির মতে এই মেয়েকে শিক্ষা দেওয়া উচিত। কিছু না বলে সে নিজের গাড়ির দিকে চলে গেল। গাড়ির পেছনের সিট থেকে একটা পানির বোতল নিয়ে আবার ফিরে এল। ঋতু ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে ছিল। পরের মুহূর্তেই রাফি বোতলের ঢাকনা খুলে পুরো পানিটা ঋতুর মাথার ওপর ঢেলে দিল।
ঘটনাটা এতটাই অপ্রত্যাশিত ছিল যে সুপ্তি, ঋতু আর ড্রাইভার তিনজনই হতভম্ব হয়ে গেল।
ঋতু যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য জমে গেল।
রাফি শান্ত দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“প্রথমত, নিজের মাথাটা ঠান্ডা করো। তোমাদের বেশি টাকা দেওয়ারও আমার কোনো ইচ্ছে ছিল না। আমি শুধু ঝামেলাটা মিটিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে তুমি ঝামেলা ছাড়া থাকতে পারো না। তুমি নিজেই একটা চলমান ঝামেলা।”

কথাগুলো বলে সে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না।ঘুরে নিজের গাড়ির দিকে চলে গেল। ড্রাইভারও দ্রুত তার পিছু নিল। আর এদিকে ঋতু পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ঠিক কী ঘটল, সে নিজেই বুঝে উঠতে পারছিল না। সুপ্তি ধীরে ধীরে তার কাঁধে হাত রাখতেই ঋতু হঠাৎ চিৎকার করে উঠল,
“ওই শয়তানের এত বড় সাহস! আমি ওর নামে কেস করব!”
সুপ্তি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“প্লিজ, একটু ঠান্ডা হ। তুই বেশি বেশি রাগ করছিস। ভদ্রলোক তো শুরু থেকেই ঝামেলা মেটাতে চেয়েছিল।”
ঋতু চোখ বড় বড় করে তাকাল।
“ভদ্রলোক? ওকে কোন দিক থেকে তোর ভদ্রলোক মনে হয়? ও তো একটা জলজ্যান্ত অভদ্র মানুষ!”
দাঁতে দাঁত চেপে সে আবার বলল,
“ওর নামে আমি অবশ্যই কেস করব! যেভাবেই হোক করব!”
সুপ্তি হতাশার দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

সূচনার মুখটা এখন এই মুহূর্তেই ফেটে চুপসে যাওয়া বেলুনের মতো হয়ে আছে। বিয়ের পরের জীবন নিয়ে তার কত রঙিন পরিকল্পনাই না ছিল! ভেবেছিল, পড়াশোনার ঝামেলা থেকে কিছুদিনের জন্য হলেও মুক্তি মিলবে। আরাম করে ঘুরে বেড়াবে, ইচ্ছেমতো খাওয়া-দাওয়া করবে, নতুন সংসারের ছোট ছোট মুহূর্তগুলো উপভোগ করবে। কিন্তু বাস্তবতা তার কল্পনার সম্পূর্ণ উল্টো পথে হাঁটছে। সকালের নাস্তা শেষ হতেই প্রণয় তাকে ন পড়তে বসিয়েছে। এমনকি প্রণয়ের এমন সিদ্ধান্তে বাড়ির সবাই ভীষণ খুশিও হয়েছে। শুধু তাই নয়, পরীক্ষার আগে কীভাবে পুরো সিলেবাস শেষ করা যাবে, তার জন্য সুন্দর করে একটা রুটিনও বানিয়ে দিয়েছে।
অথচ সূচনার মন বইয়ের পাতায় একটুও বসছে না। সে বই খুলে বসে থাকলেও চোখ দুটো বারবার অন্যদিকে চলে যাচ্ছে। প্রণয় কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে থেকে ভ্রু কুঁচকে বলল,

“আশ্চর্য! তুমি এভাবে বসে আছো কেন? পড়া শুরু করো।”
সূচনা ঠোঁট ফুলিয়ে উত্তর দিল,
“পরীক্ষার তো এখনো অনেক দেরি আছে। এত আগে পড়াশোনা করে কী হবে?”
প্রণয় অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“তোমার মাথা ঠিক আছে তো? পুরো সিলেবাসটাই এখনো বাকি, আর তুমি বলছো অনেক সময় আছে! এই সময়গুলো কিছুই না, চোখের পলকেই চলে যাবে। আচ্ছা, একটা কথা বলো তো, তুমি পড়াশোনা করতে চাও না কেন?”
সূচনার মুখে বিরক্তির ছাপ আরও গাঢ় হয়ে উঠল।
“কারণ অল্প পড়লেই আমি ভালো মার্কস পেয়ে পাশ করতে পারি। তাই এত বেশি পড়তে মন চায় না।”
প্রণয় হালকা হেসে মাথা নাড়ল।
“এটাই তো ভুল কথা। অল্প পড়ে যদি ভালো করতে পারো, তাহলে আরও মনোযোগ দিয়ে পড়লে আরও ভালো ফলাফল করতে পারবে।”
সূচনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমার এখন একদমই পড়তে ইচ্ছা করছে না।”
প্রণয়ের চোখে তখন ধৈর্যের ছাপ।
“জানো, একজন স্টুডেন্টের যখন মনে হয় যে তার একদম পড়তে ইচ্ছা করছে না, ঠিক তখনই পড়তে বসা উচিত। কারণ সেই সময়টুকু পার করতে পারলেই ভেতরের অলসতা আর ভয়টা কেটে যায়। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ এখানেই ভুল করে। ভাবে, “আজ না হয় থাক, পরে পড়ব।” আর সেই “পরে” আর আসে না।”
সূচনা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“এসব তত্ত্ব আমি মানি না। আমি পরে পড়ব। আজকে একদম পড়ব না।”
প্রণয় মুচকি হেসে একটু সামনে ঝুঁকল।
“ঠিক আছে। কিন্তু তুমি যদি এখন পড়ো, তাহলে তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে। একটা গিফট পাবে।”
গিফটের কথা শুনতেই সূচনার চোখ দুটো মুহূর্তে চকচক করে উঠল।

“সত্যি? কী গিফট?”
প্রণয় ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি টেনে বলল,
“সেটা আগে বলে দিলে সারপ্রাইজের মজাটাই নষ্ট হয়ে যাবে। আগে পড়াশোনা করো, তারপর জানতে পারবে।”
প্রণয় দেখল সূচনা এখনো মন খারাপ করে বসে আছে। তাই প্রণয় সূচনার মন ভালো করার জন্য একটি গান গেয়ে উঠল,
“তোমার চোখে আকাশ আমার।”
“চাঁদ উজাড় পূর্ণিমা।”
“ভেতর থেকে বলছে হৃদয়।”
“তুমি আমার প্রিয়তমা।” ❤️
প্রনয়ের এমন কণ্ঠস্বর শুনে ইতিমধ্যে সূচনার চোয়াল ঝুলে গেছে। সূচনা খুশি হয়ে বলল,
“বাহ আপনি কি সুন্দর গান গাইতে পারেন।”
তোমাকে পরে আরো গান শোনাবো এখন পড়তে বসো। এই বলে সে বইয়ের একটা প্রশ্নে দাগ টেনে সূচনার সামনে এগিয়ে দিল।

“এটা সলভ করো।”
বেচারি সূচনা বইয়ের মোটা মোটা পাতাগুলোর দিকে এমনভাবে তাকিয়ে রইল, যেন ওগুলো কোনো বই নয়, বরং তার সহজ সরল জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রু। মনে মনে কাতর স্বরে বলল,
“হায় আল্লাহ! বিয়ের পর ভেবেছিলাম স্বামী আমাকে ঘুরতে নিয়ে যাবে, আদর করবে, শপিং করাবে। আর আমার কপালে জুটল একজন ফুল-টাইম টিউটর!”
ভাবনাটা মনে আসতেই সূচনা অসহায় মুখে একবার বইয়ের দিকে আর একবার প্রণয়ের দিকে তাকাল। কিন্তু প্রণয়ের কঠোর দৃষ্টির সামনে শেষ পর্যন্ত হার মেনেই কলমটা হাতে তুলে নিল।
বেশ খানিকটা সময় পেরিয়ে গেছে। আশ্চর্যের বিষয়, পুরো সময়টুকু সূচনা সত্যিই মন দিয়ে পড়াশোনা করেছে। যদিও মাঝে মাঝে বিরক্তিতে মুখ ফুলিয়েছে, দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে। তবুও প্রণয়ের কড়া নজরের কারণে শেষ পর্যন্ত পড়া চালিয়ে যেতে হয়েছে।

এমন সময় প্রণয়ের ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই সে বুঝতে পারল কলটি গুরুত্বপূর্ণ। এক মুহূর্ত কিছুক্ষণ ভেবে সূচনার দিকে তাকাল। মেয়েটা অনেক কষ্টে পড়ায় মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করছে। এখানে কথা বললে ওর পড়ায় ব্যাঘাত ঘটতে পারে। এই ভেবেই প্রণয় নিঃশব্দে উঠে ব্যালকনির দিকে চলে গেল এবং ফোন রিসিভ করে কথা বলতে শুরু করল। প্রণয় চোখের আড়াল হতেই সূচনার ভেতরে জমে থাকা সব ক্ষোভ যেন একসাথে বেরিয়ে আসার সুযোগ পেয়ে গেল।
মুখ কুঁচকে বইটা বন্ধ করে। নিজের রাগ নিয়ে একটু জোরেই বলল,
“লোকের স্বামীরা কত ভালো। আর আমার স্বামী!
নতুন বিয়ে হয়েছে কোথায় ঘুরতে নিয়ে যাবে। তা না
উল্টো তার জীবন তেজপাতা বানিয়ে দিয়েছে।
ঘোড়ার আন্ডার মতো সারাদিন খালি পড়াশোনা করো। পড়তে পড়তে কবে মরে যায়!”
রাগের মাথায় কথাগুলো বলতে বলতে অজান্তেই সূচনার গলার স্বর একটু বেশি উঁচু হয়ে গিয়েছিল।
ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থাকা প্রণয় পুরো কথাটা শুনতে না পেলেও এটুকু ঠিকই বুঝতে পারল যে সূচনা তাকে নিয়েই কিছু একটা বলে রাগ ঝাড়ছে।
ফোনের কথোপকথন শেষ করে সে ধীর পায়ে আবার রুমের ভেতরে ঢুকল। অন্যদিকে সূচনা ততক্ষণে মনে মনে শক্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে।

এবার উনাকে সরাসরি বলেই দেব—“আমি এখষ আর পড়ব না!”
মনে মনে কথাগুলো গুছিয়ে নিয়ে সে ঠিক করছিল কীভাবে প্রতিবাদ করবে।
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই হঠাৎ করেই ড্রয়িং রুমের দিক থেকে ভেসে এল বজ্রপাতের মতো এক উচ্চস্বরে ডাক। পুরো বাড়িটা যেন সেই কণ্ঠস্বরের তীব্রতায় কেঁপে উঠল। নিজের নাম এত জোরে শুনে সূচনা ভয়ে চেয়ার থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠল। বুকের ভেতর ধক করে উঠল, চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। প্রণয়ও মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
এভাবে সূচনাকে কে ডাকতে পারে?

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ১৫

আর সূচনা ও অবাক হয়ে গেছে। এমন কী হয়েছে যে পুরো বাড়ি মাথায় তুলে তার নাম ধরে চিৎকার করতে হচ্ছে? সূচনা আর প্রণয় দু’জনেই একে অপরের দিকে তাকাল।

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ১৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here