Home রোমান্টিক ভাইয়া রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ২৫

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ২৫

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ২৫
মহাসিন

শাপলা এখনো বিছানায় শুয়ে মোড়ামুড়ি করছে। সারা শরীরে আলসেমি, চোখে ঘুমের রেশ। ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ বেজে উঠল তার ফোনটা।
চমকে উঠে তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়ল সে। টেবিলের উপর থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। অচেনা নম্বর।
শাপলা বুঝল—এটা আনিক।
শাপলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কলটা রিসিভ করল।
ওপাশ থেকে ভেসে এলো সেই চেনা গলা,
“হাই সোনা, কেমন আছো?”
শাপলার মুখ শক্ত হয়ে গেল। গলায় বি*ষ ঝরিয়ে বলল,
“এই গা*ধার বাচ্চা, তুই ম*র*তে পারিস না? তোর ফোনে ঠা*ডা পড়ে, তোর ফোনটা নষ্ট হতে পারে না?”

আনিক একটুও দমল না। গলায় কৃত্রিম কষ্ট মিশিয়ে বলল,
“তুমি এত খারাপ কেন? এভাবে অ*ভি*শাপ দেওয়া কি ঠিক হলো?”
একটু থেমে আবার বলতে লাগলো, আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি নিজেকে ক*ন্ট্রো*ল করতে পারছি না। তোমার সাথে শুধু রো*মা*ন্স করতে মন চায় । উফ্ তুমি কেন বোঝো না আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি। তুমি আমার হয়ে যাও । অনেক রো*মা*ন্স করবো তোমার সাথে। তুমি ম*জা পাবে।”
শাপলার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল।
“এই জা*নো*য়া*রের বাচ্চা! তুই ম*র*তে পারিস না, কু*ত্তা*র বা*চ্চা? তোকে কতবার বলেছি আমাকে কল দিবি না। আমি তোর মতো বে*য়া*দ*ব ছেলের সাথে প্রেম করবো না।”
আনিকের গলায় এবার স্পষ্ট দাম্ভিকতা,
“আমি তো তোমার সাথেই প্রেম করবো। তোমার ভেতরে যত তে*জ আছে, সব বের করবো। তুমি আমার হয়ে যাও। তোমার সাথে এতো রো*মা*ন্স করবো তুমি আমার জন্য পা*গল হয়ে যাবে।”
শাপলার চোখে আগুন জ্বলে উঠল।
“তুই কু*ত্তা*র চেয়েও খা*রাপ। তোর ভেতরের মন-মানসিকতা সব ম*রে গেছে। তুই প*শুর চেয়েও জ*ঘন্য, নোং*রা!”

আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। কলটা কেটে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে নম্বরটা ব্লক করে দিল সে।
ফোনটা টেবিলে রেখে জানালার পাশে দাঁড়াল শাপলা। বুক চিরে বেরিয়ে এলো একটা দীর্ঘশ্বাস।
শেষমেশ ভারী পায়ে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল সে।
গাড়িটা ধীরে চলছে। ভেতরে নীরবতা।
সিয়াম গাড়ি ড্রাইভ করছে। তার পাশে আলো বসে আছে। পেছনের সিটে নীলাঞ্জনা, কবিতা আর জেরিন। জেরিন এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সিয়ামের দিকে।
কবিতার চোখে ভেসে উঠছে গত রাতের প্রতিটি মুহূর্ত।
গত রাত—
ব্যালকনির অন্ধকারে দাঁড়িয়ে কবিতা একের পর এক কল দিয়ে যাচ্ছিল সিরাজের নম্বরে।
প্রথমবার রিসিভ হলো না। দ্বিতীয়বারও না।
বিরক্ত হয়ে ফিসফিস করে বলল,
“ওরে সিরাজ, কলটা রিসিভ কর। জরুরি কথা আছে। রিসিভ কর!”
আরো কয়েকবা কল দেওয়ার পর অবশেষে কল ধরল সিরাজ।
“আরে, ওয়াশরুমে গেছিলাম। কী বলবি বল,” গলায় আলসেমি।

কবিতা আর দেরি করল না। গলার স্বর নামিয়ে বলল,
“আমার ননদ জেরিন সিয়ামকে ভালোবাসে। কিন্তু মাঝখানে কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে শাপলা। শাপলা আর সিয়াম দুজনে প্রেম করে। এখন যেভাবেই হোক, শাপলাকে সিয়ামের জী*বন থেকে স*রাতে হবে। তোর সাহায্য চাই।”
ওপাশ থেকে সিরাজ বাঁকা হাসল।
“ঠিক আছে। কী করতে হবে বল।”
“কাল আমরা সবাই শপিংয়ে যাব। শাপলা একা বাড়িতে থাকবে। তখন তোকে এমন কিছু করতে হবে যাতে শাপলা আর কাউকে মু*খ দে*খাতে না পারে,” কবিতার গলায় ঠান্ডা দৃঢ়তা।
সিরাজের হাসি আরও গাঢ় হলো।
“শাপলার উপর অনেক আগেই আমার ন*জ*র পড়েছে। ওকে আমি ভো**গ ক*রতে চা*ই। এবার আর শাপলা আমার থেকে রে*হাই পা*বে না।”
“তুই যা খুশি কর। শুধু শাপলা যেন জেরিনের পথের কাঁটা না হয়,” কবিতা বলল।
“ঠিক আছে। কাল যখন শপিংয়ে বের হবি, বাসা ফাঁকা থাকবে। তখন একটা মেসেজ দিস। আমার কাজ আমি করে ফেলবো,” সিরাজের গলায় নিশ্চয়তা।
কবিতা সাবধান করে দিল,
“আর একটা কথা—কোনোভাবে যদি কারো কাছে ধরা পড়ে যাস, তাহলে আমার নাম মুখেও আনবি না। বলে দিলাম।”

“ঠিক আছে, তাই হবে।”
“ওকে, ভালো থাক। রাখি,” বলে কল কেটে দিল কবিতা।
বর্তমানে ফিরে এলো সে। গাড়ির কাঁচের বাইরে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল একটা হালকা, নিঃশব্দ হাসি।
যে হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে একটা নীরব ষড়যন্ত্র, যার শিকার হতে চলেছে শাপলা।
এর পর কবিতা সিরাজ কে মেসেজ করে জানিয়ে দিলো যে শাপলা এখন বাড়িতে একা আছে।
ড্রয়িংরুমের সোফায় গুটিশুটি মেরে বসে আছে শাপলা। সামনে টিভি চলছে, কিন্তু পর্দার দিকে তার মন নেই। গোটা বাড়িটা কেমন নিস্তব্ধ, থমথমে। সবাই শপিংয়ে গেছে, আর সে পড়ে আছে একা।
বিরক্ত হয়ে বিড়বিড় করল শাপলা,
“ধ্যাত, ভালো লাগে না! কেন যে তাদের সাথে গেলাম না। জেরিনও তো গেছে, নিশ্চয়ই সিয়াম ভাইয়ার কাছাকাছি থাকার ধান্দায়। ওই ফা*লতু মেয়েটাকে একদম সহ্য হয় না। মন চায় চু*লগুলো টেনে ছিঁ*ড়ে দিই।”
এভাবে আরও কিছুক্ষণ নিজের মনে মনে বকবক করল সে।
হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল। হাতে নিয়ে দেখল অচেনা নম্বর।
ভ্রু কুঁচকে বলল,
“উফ, আর ভালো লাগে না! নিশ্চয়ই আনিক আবার অন্য নম্বর দিয়ে কল দিয়েছে। রিসিভ করবো না।”
বলে কলটা কেটে দিল।
কিন্তু ফোনটা থামল না। আবার কল এলো। শাপলা আবার কেটে দিল।
আবার কল। আবার কাটল।
তৃতীয়বার যখন ফোন বেজে উঠল, বিরক্তির চরম সীমায় পৌঁছে রিসিভ করল সে।

ওপাশ থেকে ভেসে এলো মেয়েলি কণ্ঠ,
“এই শাপলা, কল কেটে দিচ্ছিস কেন?”
শাপলা অবাক হয়ে বলল,
“কে আপনি?”
“শাপলা, তুই আমাকে চিনতে পারছিস না? আমি কলি রে, কলি।”
“ওহ, তুই! আমি বুঝতেই পারিনি। তা বল, কী অবস্থা? কেমন আছিস?”
“হ্যাঁ, ভালো আছি। তুই কেমন আছিস?”
শাপলার গলা ধরে এলো,
“ওরে কলি, আমি ভালো নেই রে। ওই দীপা আমার জীবনটা শে*ষ ক*রে দেওয়ার উপক্রম করেছে।”
কলি চমকে উঠল,
“মানে? কী হয়েছে? খুলে বল।”
শাপলা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“দীপা আমার নম্বর আনিককে দিয়েছে। ছেলেটাকে আমি স্পষ্ট বলে দিয়েছি আমি ওর সাথে প্রেম করবো না। তবুও কল দিয়ে নোং*রা নোং*রা কথা বলে। নম্বর ব্লক করলে অন্য নম্বর দিয়ে কল দেয়। এজন্য এতক্ষণ তোর কলও কেটে দিচ্ছিলাম। আমি ভেবেছি ওই আনিক বুঝি।”
কলি শান্ত গলায় বলল,
“আচ্ছা, কী আর করবি। কল এলেই ব্লক করে দিবি। স্কুল খুলুক, তারপর ওই আনিকের ব্যবস্থা করবো। তা বাড়ির সবাই কেমন আছে?”

“হ্যাঁ, সবাই ভালো আছে।”
একটু থেমে শাপলা বলল,
“তুই মাঝে মাঝে কল দিস রে। বাড়িতে আর ভালো লাগে না। কবে যে স্কুল খুলবে কে জানে।”
“হ্যাঁ, আমারও বাড়িতে ভালো লাগে না,” কলি হেসে বলল।
“আচ্ছা, এখন রাখি। মা ডাকছে। পরে কথা হবে।”
কল কেটে যেতেই শাপলা আবার টিভির দিকে তাকাল। কিন্তু মন টিকল না। হঠাৎ মা-বাবার কথা খুব মনে পড়ে গেল।
ফোন তুলে মায়ের নম্বরে কল দিল।
“হ্যালো।”
“হ্যালো মা। তুমি ভালো আছো তো?”
“হ্যাঁ রে, ভালো আছি। তুই কেমন আছিস?”
“ভালো আছি। বাবা কেমন আছে?”
“তোর বাবা ভালো আছে।”
শাপলার গলা নরম হয়ে এলো,
“মা, তোমার আর বাবার কথা খুব মনে পড়ে।”
“চিন্তা করিস না। খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসবো,” ওপাশ থেকে মায়ের স্নেহমাখা গলা ভেসে এলো।
“ওই বাড়িতে ভালো আছিস তো?”

শাপলা একটু চুপ করে থেকে বলল,
“হ্যাঁ মা, ভালো আছি।”
এরপর মা-মেয়ে অনেকক্ষণ ধরে সুখ-দুঃখের গল্প করল। শেষে মা বললেন,
“আচ্ছা, ঠিকমতো পড়াশোনা করিস। ভালো থাকিস। রাখি এখন।”
কল কেটে দিলো।
শাপলা ফোনটা বুকের কাছে চেপে ধরল। একাকী বাড়িটা এখন একটু কম নিঃসঙ্গ লাগছে। মায়ের গলার উষ্ণতা যেন ঘরের চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে।
শাপলা টিভিটা বন্ধ করে দিল। ঘরের নিস্তব্ধতা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল।
সোফার উপর গা এলিয়ে দিয়ে গুনগুন করে গাইতে লাগল সে—
_একাকী মন আজ নীরবে
বিবাগী তোমার অনুভবে
ফেরারি প্রেম খোঁজে ঠিকানা।
আকাশে মেঘ মানে বোঝো কিনা,
বিরহ নীলে নীলে বাঁধে বাসা।
অজানা ব্যথায়
অধরা তারাগুলো কাঁদে বেদনায়,
খেয়ালি তুমি কোথায়?
না রে নান রে নান রে না…_

—টং টং টং।
হঠাৎ কলিং বেলটা বেজে উঠল।
শাপলা চমকে উঠে সোজা হয়ে বসল। বুকের ভেতরটা ধ্বক করে উঠল।
কলিং বেল থামছে না। অনবরত বেজেই চলেছে।
সে বিড়বিড় করে বলল,
“সবাই তো শপিং করতে গেছে। তাহলে এই সময়ে বাড়িতে কে এলো?”
শুকনো ঢোঁক গিলল শাপলা। বুকের ভেতর ধুকপুকানি বেড়ে গেল।
কলিং বেলের শব্দটা কানে যেন বিঁধছে।
কাঁপা কাঁপা পায়ে উঠে দাঁড়ালো । ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল সদর দরজার দিকে।
প্রতিটি পদক্ষেপের সাথে বুকের ভেতর জমাট বাঁধছে অজানা ভয়।

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ২৪

দরজার ওপাশে কে?
এমন সময় কে আসবে?
কলিং বেলটা এখনো বেজে চলেছে, যেন কেউ জরুরি তাগাদা দিচ্ছে।
আর শাপলার মনে হচ্ছে, এই শব্দের আড়ালে লুকিয়ে আছে কোনো অশুভ ছায়া।

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ২৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here