Home প্রণয়ের নব্য সূচনা প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৬

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৬

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৬
insia isha chowdhury

প্রণয় রান্নাঘরে গিয়ে এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সূচনা একদম পাকা গিন্নির মতো কোমরে ওড়না বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। কোমর ছুঁইছুঁই চুলগুলো এলোমেলোভাবে হাতখোঁপা করা। দু’হাতে চিকন গড়নের সোনার চুড়ি, আর সামান্য নড়াচড়াতেই টুংটাং শব্দ উঠছে।
সূচনা একটা আলু হাতে নিয়ে মনোযোগ দিয়ে চাকু চালাচ্ছিল। ঠিক তখনই আড়চোখে প্রণয়কে দেখতে পেয়ে থমকে গেল। প্রণয় ধীর পায়ে ওর দিকে এগিয়ে এসে দৃষ্টি স্থির রেখেই জিজ্ঞেস করল,
“কি করছো তুমি এখানে?”
সূচনা হাতে থাকা আলুটা দেখিয়ে ঠোঁট উল্টে বলল,
“এই যে রান্না… রান্না করছি।”
প্রণয় এক ভ্রু উঁচু করে বলল,
“তুমি যে রান্না করতে এসেছ, তুমি কি রান্না করতে পারো?”
সূচনা নাক টেনে ছোট্ট মুখ করে বলল,

“কি করব? আপনার কাছে থাকলে তো সারাক্ষণ পড়তে বসান। এখানে এসেছি, আর এরা আমাকে রান্নাঘরে পাঠিয়ে দিয়েছে।”
প্রণয় হালকা অবাক হয়ে বলল,
“আমি তো এটাই বুঝতে পারছি না, তোমাকে সবাই মিলে রান্নাঘরে কেন পাঠিয়েছে?”
সূচনার কপালে লেপ্টে থাকা চুলগুলো হাত দিয়ে কানের পেছনে গুঁজতে গুঁজতে বলল,
“আসলে কারও দোষ নেই। আমি নিজের ইচ্ছেতেই এসেছি।”
প্রণয় এবার একটু ঝুঁকে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তাহলে তোমার মুখ দেখে আমার কেন মনে হচ্ছে তুমি ভয় পাচ্ছো? আর বাড়ির লোকদের তুমি কি বলেছ যে ওরা তোমাকে রান্নাঘরে পাঠিয়ে দিয়েছে?”
সূচনা নিজের গালে হাত রেখে নিষ্পাপ মুখে বলল,
“আসলেই আমি ভয় পাচ্ছি?”
“আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও।”
সূচনা এবার ইতস্তত করে বলল,

“আসলে… আপনার মায়ের সাথে যখন প্রথম দেখা হয়েছিল, তখন আমি একা একা বলেছিলাম যে আমি অনেক রকম খাবার বানাতে পারি।”
“আচ্ছা, তারপর?”
“তারপর বলেছি আমি অনেক দেশের রান্নাও পারি। এই কথাটা সুপ্তি তুলতেই আপনার ভাইয়া বলল, এত দেশের রান্না পারো যখন, আগে বাঙালি খাবার রান্না করে দেখাও। এরপর আপনার মা বলল আমি অসুস্থ, তাই রান্না করতে পারব না। আর তারপর ওই সুপ্তি…”
কথাটা বলেই সূচনা মুখ ফুলিয়ে ফেলল।
“সুপ্তি আবার কি করেছে?”
“ও বলেছে ও সবার জন্য রান্না করবে। তাই ওকে দেখানোর জন্য আমিও বলে ফেলেছি আমি রান্না করব।”
শেষ কথাটা বলতেই সূচনার মুখটা ছোট হয়ে গেল। অন্যদিকে প্রণয় বিস্ফারিত চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। এই মেয়েটা না বুঝে কি না কি বলে বসে!
প্রণয় অবশেষে বলল,
“তুমি আমার মাকে কেন মিথ্যে বলেছ যে তুমি এত কিছু রান্না করতে পারো?”
সূচনা এবার তড়িঘড়ি করে বলে উঠল,
“আসলে আমি আপনার মাকে ইমপ্রেস করতে চেয়েছিলাম। এজন্যই বলেছি। কিন্তু এখন আমি কি করব? আমি তো কখনো এই সব রান্না করিনি!”

প্রণয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে সূচনার এক হাত ধরে বলল,
“চলো আমার সাথে। বাকিটা আমি সামলে নেব।”
কিন্তু সূচনা দ্রুত মাথা নেড়ে বলল,
“না না না! আমি যদি এখন চলে যাই আর সবাই জানতে পারে আমি রান্না পারি না, তাহলে আমার মান-সম্মান সব শেষ হয়ে যাবে।”
প্রণয় ঠোঁট চেপে হাসল,
“আচ্ছা তাই?”
“একদম তাই। আপনার কাছে ফোন আছে না? ফোনটা বের করুন। ইউটিউব দেখে দেখে রান্না করে ফেলব।”
প্রণয় হতাশ চোখে ওর দিকে তাকিয়ে রইল।
সূচনা আবার বলল,
“কি আশ্চর্য! ফোনটা দিন।”
অবশেষে আর কিছু না বলে প্রণয় নিজের ফোনটা এগিয়ে দিল। সূচনা দ্রুত ফোনটা নিয়ে ইউটিউবে ঢুকে “আলুর পরোটা রেসিপি” লিখে সার্চ করল। তারপর একটা ভিডিও চালু করে আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে বলল,
“এবার দেখুন… আমি কিভাবে রান্নাটা করে ফেলি!”
প্রণয় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সূচনার সব কর্মকাণ্ড দেখছিল। সূচনা বেশ মনোযোগ দিয়েই আলুগুলো কেটে সিদ্ধ করতে বসিয়ে দিল। তারপর একটা বড় বাটিতে ময়দা নিয়ে পানি মিশিয়ে ডো বানাতে শুরু করল। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই বোঝা গেল ময়দাটা একটু বেশিই শক্ত হয়ে গেছে।
প্রণয় পাশে দাঁড়িয়েই বলল,

“আর একটু পানি দাও। তাহলে ডোটা নরম হয়ে যাবে।”
সূচনা এবার বাধ্য মেয়ের মতোই আরেকটু পানি ঢেলে আবার মাখতে শুরু করল। ময়দা মাখতে মাখতেই বলল,
“আচ্ছা আপনি এখানে দাঁড়িয়ে কি করছেন? এখানে আপনার কি কাজ?”
প্রণয় কপালে এক হাত ঠেকিয়ে বলল,
“না, আমি দেখতে চাই তুমি কিভাবে রান্না করো।”
সূচনা আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে বলল,
“আমি তো দেখেশুনেই রান্না করছি। মানে রান্নাটা ঠিকই হবে। এত ভয় পাওয়ার কিছু নেই।”
প্রণয় নিচু স্বরে বলল,
“তুমি রান্না করছো— এটাই সবচেয়ে বড় ভয়ের ব্যাপার।”
সূচনা চোখ বড় বড় করে তাকাল,
“কি বললেন?”

তারপর সাথে সাথেই একটা পেঁয়াজ আর কাঁচামরিচ এগিয়ে দিয়ে বলল,
“যখন এখানে থাকবেন, তখন এত কথা না বলে এগুলো কেটে দিন।”
যদিও সূচনা কথাটা মজা করেই বলেছিল, কিন্তু প্রণয় সত্যিই চাকু হাতে নিয়ে পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ আরও ধনেপাতা খচাখচ করে কেটে ফেলল।
এত দ্রুত ও নিখুঁতভাবে কাটতে দেখে সূচনা একদম হা হয়ে গেল।
“আচ্ছা! আপনি এত দ্রুত এগুলো কাটলেন কিভাবে?”
প্রণয় নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
“কম কথা বলো। আমি তোমাকে সাহায্য করছি। তাড়াতাড়ি রান্নাটা শেষ করা যাক।”
সূচনাও আর কথা বাড়াল না। আবার কাজে মন দিল। কিন্তু আসল বিপত্তি ঘটল পরোটা বেলতে গিয়ে। রুটিটা গোল হওয়ার বদলে কখনো বাংলাদেশ, কখনো আফ্রিকার মানচিত্রের মতো আকার নিচ্ছে। সূচনার মুখ মুহূর্তেই ছোট হয়ে গেল। হতাশ চোখে প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“এগুলো গোল হচ্ছে না কেন? এমন মানচিত্র হয়ে যাচ্ছে কেন? ভিডিওতে তো কত সুন্দর গোল হচ্ছিল!”
প্রণয় ঠোঁট চেপে হাসি আটকিয়ে বলল,

“সমস্যা নেই। চেষ্টা করতে করতে একসময় মানচিত্র থেকে গোল হয়ে যাবে।”
সূচনা বিরক্ত মুখে বলল,
“কিন্তু এখন তো চেষ্টা করার সময় নেই।”
প্রণয় এবার চারপাশে চোখ বুলিয়ে কিছু একটা খুঁজল। তারপর কেবিনেট খুলে একটা বড় গোল বাটি বের করল। সূচনার বেলা বেখাপ্পা রুটিটার ওপর বাটিটা উল্টো করে রেখে চারপাশ চাকু দিয়ে কেটে দিল। মুহূর্তের মধ্যেই রুটিটা একদম নিখুঁত গোল হয়ে গেল।
এটা দেখে সূচনার চোখ চকচক করে উঠল। ভীষণ খুশি হয়ে বলল,
“ওয়াও! এটা তো একদম পারফেক্ট গোল হয়েছে!”
“হুম।”

রিমা নিজের মায়ের সাথে কথা শেষ করে তামজিদকে রবিনের কাছে রেখে রান্নাঘরের দিকে চলে এলো। মনে মনে ভাবছিল, না জানি সূচনা একা একা কি করছে! ওকে একটু সাহায্য করা দরকার। কিন্তু রান্নাঘরের সামনে এসে ভিতরের দৃশ্যটা দেখেই রিমা আর ভেতরে ঢুকল না।
প্রণয় একমনে দাঁড়িয়ে সূচনাকে রুটি বেলে দিতে সাহায্য করছে। আর সূচনা মন দিয়ে সেগুলো ভেজে নিচ্ছে। দু’জনের মাঝে ছোট ছোট খুনসুটি চললেও দৃশ্যটা এত সুন্দর লাগছিল যে রিমার অজান্তেই ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। ওদের আর বিরক্ত না করে রিমা চুপচাপ ফিরে গেল।
বসার ঘরে এসে আবার রবিনের পাশে বসতেই বলল,
“শোনো, তুমি কি জানো তোমার ভাই কি করছে?”
রবিন ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কেন? প্রণয় আবার কি করছে?”
রিমা বলল,
“কি করছে মানে? কি সুন্দর করে সূচনাকে রুটিগুলো বেলে দিচ্ছে। আর সূচনা সেগুলো ভেজে নিচ্ছে।”
রবিন অবাক হয়ে বলল,
“তাই নাকি?”

রিমা সাথে সাথেই চোখ রাঙিয়ে বলল,
“তুমি শুধু ‘তাই নাকি, তাই নাকি’ করেই যাও। জীবনে কোনোদিন আমাকে রান্না করতে হেল্প করেছ?”
রবিন হালকা কাশি দিয়ে গলা পরিষ্কার করল।
রিমা আবার বলল,
“তোমার ভাইকে দেখে তোমার শেখা উচিত। বউদের রান্না করার সময় সাহায্য করতে হয়, বুঝলে?”
রবিন অসহায় মুখ করে রিমার দিকে তাকাল।
মনে মনে ভাবল,
‘প্রণয় ব্যাটা, নিজের বউকে সাহায্য করছিস ভালো কথা। কিন্তু আমার বউকে দেখানোর কি দরকার ছিল!’
তবুও মুখে ছোট্ট হাসি এনে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে। এরপর থেকে আমিও তোমাকে রান্না করতে সাহায্য করব।”
রিমা সাথে সাথে মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“রান্না ছাড়ো। জীবনে কোনোদিন তুমি আমাকে এক কাপ চাও বানিয়ে খাওয়াওনি।”
রবিন এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
“এ তো দেখছি মহা যন্ত্রণা!”
তারপর একটু নরম গলায় বলল,

“আচ্ছা, তুমি রাগ করো না। তোমাকে আমি শপিং করাতে নিয়ে যাব। তারপর তোমার পছন্দের সিনেমা দেখাব আর তোমাকে রেস্টুরেন্টেও নিয়ে যাব।”
রিমার চোখ দুটো মুহূর্তেই চকচক করে উঠল।
“সত্যি? পরে আবার ভুলে যাবে না তো?”
রবিন মুচকি হেসে বলল,
“একদমই না। ভুলব কেন?”
সুপ্তি ওদের কথোপকথন শুনেই ধীরে ধীরে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু ভেতরে ঢুকতেই সামনে দেখা দৃশ্যটা যেন মুহূর্তেই তার বুকের ভেতরটা জ্বালিয়ে দিল। প্রণয় আর সূচনা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। প্রণয় সূচনাকে সাহায্য করছে।
সুপ্তির চোখ হঠাৎই স্থির হয়ে গেল সেই দৃশ্যে।
সম্পর্কে সে প্রণয়ের খালাতো বোন। পড়াশোনার জন্য ঢাকায় এসে উঠেছিল মির্জা বাড়িতে। এখন ইউনিভার্সিটির থার্ড ইয়ারের ছাত্রী। ছোটবেলায় বাড়ির সবাই মজা করে একদিন বলেছিল,
“সুপ্তির সাথে প্রণয়ের বিয়ে দিলে কেমন হয়?”

সেটা তখন নিছকই হাসির কথা ছিল। কিন্তু বড় হতে হতে সেই মজার কথাটাই কখন যেন সুপ্তির মনে অন্যরকম অনুভূতি তৈরি করে ফেলেছিল। মির্জা বাড়িতে আসার পর থেকে অজান্তেই সে প্রণয়কে ভালোবেসে ফেলেছিল। তবে সেই অনুভূতির কথা কোনোদিন মুখ ফুটে বলা হয়নি।
আর আজ…আজ সেই প্রণয়ই নিজের স্ত্রীকে নিয়ে হাসছে, খুনসুটি করছে। দূর থেকে দৃশ্যটা দেখে সুপ্তির ভেতরটা হঠাৎ কেমন ফাঁকা হয়ে গেল। বুকের ভেতর চাপা কষ্ট নিয়ে সে আর সেখানে এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। নিঃশব্দে ফিরে গেল সেখান থেকে। এদিকে সূচনা তখনও প্রণয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে হেসেই চলেছে।
প্রণয় ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,

“তুমি এভাবে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসছো কেন?”
আসলে রুটি বেলতে গিয়ে প্রণয়ের গালের একপাশে ময়দা লেগে গিয়েছিল। পুরো গালটাই সাদা সাদা হয়ে আছে। আর সেটাই দেখে সূচনার এত হাসি পাচ্ছিল। কিন্তু সরাসরি কিছু না বলে সূচনা হঠাৎ প্রণয়ের ফোনটা হাতে নিয়ে ক্যামেরা অন করল। তারপর প্রণয়ের ছোট্ট একটা ভিডিও করতে লাগল।
প্রণয় অবাক হয়ে বলল,
“আরে আশ্চর্য! কী করছো? আমার ভিডিও কেন বানাচ্ছো?”
সূচনা হাসি চেপে বলল,
“এক মিনিট, আপনাকেই দেখাচ্ছি।”
কথাটা বলেই সে ফোনটা ঘুরিয়ে প্রণয়ের সামনে ধরল। ভিডিওতে নিজের মুখের অবস্থা দেখে প্রণয় থমকে গেল। গালের একপাশে সাদা ময়দা লেগে আছে। আর সেটা দেখেই সূচনা আবারও হেসে উঠল প্রাণ খুলে।
সূচনাকে এভাবে মুখের ওপর হেসে উঠতে দেখে প্রণয়ের একদমই ভালো লাগল না। মুহূর্তেই সে সূচনার এক বাহু ধরে নিজের দিকে টেনে নিল। আচমকাই এতটা কাছে চলে আসায় সূচনার হাসি থেমে গেল। প্রণয় ধীরে ধীরে ওর দিকে ঝুঁকে আসতেই সূচনা ভয়ে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই সে টের পেল, প্রণয় নিজের গালে লেগে থাকা ময়দা ওর গালে ঘষে দিচ্ছে। খোঁচা খোঁচা দাড়ির ছোঁয়ায় সূচনার গালে হালকা ব্যথা লাগল। আর তাতেই প্রণয়ের গালের ময়দা লেগে গেল সূচনার গালেও।
কাজ শেষ করে প্রণয় ধীর ভঙ্গিতে সরে দাঁড়াতেই সূচনা অবাক চোখে নিজের গালে হাত দিল। আঙুলে ময়দা লেগে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকে বলল,

“আজব তো! আপনি আমার গালে ময়দা লাগিয়ে দিলেন কেন?”
প্রণয় মুচকি হেসে সূচনার নাকে আলতো টোকা দিয়ে বলল,
“কারণ আমার গালে ময়দাটা তোমার জন্যই লেগেছে। তাই তোমার গালেও লাগিয়ে দিলাম। টিট ফর ট্যাট!”
সূচনার মুখটা সঙ্গে সঙ্গে ফুলে উঠল।
“এটা তো আপনারই দোষ। আপনি রুটি বেলছিলেন বলেই নিজের গালে নিজেই ময়দা লাগিয়েছেন। তাই বলে আমাকে শাস্তি দেবেন?”
“ হ্যাঁ, দেব।”
“পচা স্বামী!”
“ পড়াচোর বউ!”
“ধুর! আপনার সাথে আমি কথাই বলব না।”
প্রণয় ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“হ্যাঁ, এখন তো কথা বলবেই না। কাজ তো হয়ে গেছে।”
সূচনাও হার মানার পাত্রী নয়। গর্বিত ভঙ্গিতে বলল,
“হ্যাঁ, রান্না তো শেষ। এবার পালা সবাইকে টেস্ট করানোর!”

বসার ঘরের ডাইনিং টেবিল ঘিরে সবাই বসে আছে। চারপাশে এক উষ্ণ, পারিবারিক আবহ। রিমা আর সূচনা ব্যস্ত হাতে সবাইকে খাবার পরিবেশন করছে। রবিন আর প্রণয় পাশাপাশি বসেছিল। হঠাৎ রবিন একটু ঝুঁকে প্রণয়ের কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“বুঝতে পারছি নতুন বউকে সাহায্য করবি, ভালো কথা। কিন্তু আমার বউকে দেখিয়ে দেখিয়ে সাহায্য করার কী দরকার ছিল?”
প্রণয় ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“মানে তুমি কী বলতে চাইছ?”
রবিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“মানে, তুই যে তোর বউকে রান্নাঘরে সাহায্য করেছিস, সেটা দেখেই তোর ভাবি এসে আমাকে জ্ঞান দেওয়া শুরু করেছে!”
কথাটা শুনে প্রণয় আর কিছু বলল না। শুধু বাঁকা চোখে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর সবাই খাবারে মন দিল। এমন সময় রবিন হঠাৎ বলল,

“আচ্ছা, আর তো মাত্র দুই দিন পর বৌভাতের অনুষ্ঠান। ঋতু কবে আসছে বাড়িতে?”
রবিনের কথায় যেন হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়ে গেল প্রণয়ের। সে খানিকটা গম্ভীর হয়ে বলল,
“আমার মনে হয়, বৌভাতের অনুষ্ঠানের আগেই সূচনার দাদীর সঙ্গে একবার দেখা করা উচিত।”
কথাটা বলা মাত্রই রবিন বিষম খেয়ে কাশতে শুরু করল। রিমা তড়িঘড়ি করে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিল। পানি খেয়ে রবিন আস্তে করে রিমার দিকে ঝুঁকে বলল,
“দেখেছ রিমা? আমার ভাই বিয়ের একদিনের মধ্যেই পাগল হয়ে গেছে। কী সব উল্টাপাল্টা কথা বলছে!”
প্রণয় বিরক্ত চোখে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। ঠিক তখনই শায়লা খাতুন বিস্মিত কণ্ঠে বললেন,
“প্রণয়, তুমি কার সঙ্গে দেখা করার কথা বলছ?”
প্রণয় একদম সোজাসাপ্টা গলায় বলল,
“সূচনার দাদীর সঙ্গে। উনি অসুস্থ, তাই ভাবলাম দেখা করে আসা উচিত।”
এই কথাটা শুনেই সূচনার বুক ধক করে উঠল। অফিস রুমে সেদিন ছুটি নেওয়ার জন্য সে নিজেই প্রণয়কে বলেছিল, তার দাদি অসুস্থ।
কিন্তু বিয়ের দিনও প্রণয়ের সঙ্গে তার দাদীর দেখা হয়নি। সেই সূত্র ধরেই আজ এই কথা বলে ফেলেছে প্রণয়। এদিকে সূচনা বারবার চোখের ইশারায় প্রণয়কে থামতে বলছিল। যেন আর একটাও প্রশ্ন না করে। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার, তা হয়ে গেছে।
শায়লা খাতুন তৎক্ষণাৎ বলে উঠলেন,

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৫

“প্রণয়, সূচনার দাদি তো আজ থেকে তিন বছর আগেই মারা গেছেন। তাহলে তুমি কার সঙ্গে দেখা করবে? আর তোমাকে কে বলল উনি অসুস্থ?”
মায়ের কথাগুলো কানে যেতেই প্রণয়ের মুখের ভাব মুহূর্তে বদলে গেল। বিস্মিত চোখে সে সূচনার দিকে তাকাল। আর সূচনা? সে তখন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। মুখটা এমনভাবে লুকিয়ে ফেলেছে, যে হাতেনাতে ধরা পড়া কোনো চোর নিজের অপরাধ আড়াল করার শেষ চেষ্টা করছে।

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৭

1 COMMENT

Comments are closed.