প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ২১
ইনান হাওলাদার
আজকের পরিবেশটা প্রতিদিনের মতো উৎসবমুখর নয় ।কিছুটা থমথমে ! কেননা একটু আগেই আকবর চৌধুরী ছেলের উপর চি’ৎকার – চেঁ’চামেচি করেছেন। সরাসরি ছেলেকে না বললেও তাকে শুনিয়ে শুনিয়ে পারভিন বেগমের উপর চেঁ’চামেচি করেছেন।তূর্য নিজের ঘরেই থাকার দরুন সবটা শুনেছে।কিন্তু কোনো উত্তর করেনি। যদিও কখনো ত’র্কা’ত’র্কিতে জড়ায় না সে। বে’শি রা’গ উঠলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।এসব কথা কা’টা’কা’টি ভালো লাগে না তার। সকাল সকাল খাবার টেবিলে বসে নাস্তা করছে চৌধুরী পরিবার।খাবার প্লেট আর চামচের ঠকঠক শব্দ ব্যতীত কারো মুখে কোনো কথা নেয়।
নীরবতা ভেঙে পারভিন বেগম বললেন,
” বলছিলাম নাজমা ভাবি আমার কাছে একটা প্রস্তাব দিয়েছিল ।তার ছোট ছেলের জন্য আমাদের মেয়ের হাতটা চাইছে ।
সবাই এক জায়গা আছো তাই এখনই বললাম।”
“তুমি কি বলেছ ভাবি?”খাবারে হাত চালাতে চালাতে বললেন আসলাম চৌধুরী।
” বলেছি তাদের বাপ – চাচাদের জানাবো।তারা যেটা ভালো বুঝে করবে ”
” কেন? না করে দিতে পারো নি ?” স্বামীর গলায় এমন কা’ট’কা’ট কথা শুনে পারভিন বেগম বললেন,
“মেয়ের মা আমি !মুখের উপর না করা যায় ? মেজো ভাই তুমিই বলো ”
” অন্যের মেয়েকে নিজের মেয়ে ভাবার কোনো প্রয়োজন নেয় ” রু’ক্ষ গলায় কথাটা বলেই খাবার টেবিল ছেড়ে উঠে গেল তূর্য।তাকে এভাবে উঠে যেতে দেখে মারুফা বেগম বললেন,
” কী হয়েছে,বুবু? তূর্য এভাবে খাবার রেখে চলে গেল কেন? ওর কি এই সম্বন্ধে মত আছে?”
” ওর মত তো থাকারই কথা,মেজো বউ। আহির বিয়ে হয়ে গেলে ওকে আর জ্বা’লানোর কেউ থাকবে না ” হালকা ঠাট্টার ভঙ্গিতে বললেন আকবর চৌধুরী।
আসিফ চৌধুরী বললেন,
” তোমরা একটা বিষয় লক্ষ্য করেছ ? আমাদের তূর্য কিন্তু ফ্যামিলির কোনো বিষয়ে তেমন কোনো কথা বলে না।কিন্তু আজ বলল! আস্তে আস্তে ফ্যামেলিম্যান হচ্ছে ছেলেটা ”
” একটা বিয়ে করাতে পারলে আরো উন্নতি হতো “কথাটা বলে তূর্যের রাখা এটো প্লেটটা হাতে নিয়ে কিচেন রুমের দিকে পা বাড়ালেন লতা বেগম।
” মেয়েকে একদিন বিয়ে দিতে হবে ,সে আর এই বাড়িতে থাকবে না ভাবলেই বুকটা খালি খালি লাগে ” বলে একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেললেন আসলাম চৌধুরী।দেবরের মলিন মুখের কথা শুনে কিছুটা রসিকতা করে পারভিন চৌধুরী বললেন,
” তাহলে আর মেয়েকে বাড়ি ছাড়া করার দরকার নেয়।এই বাড়িতেই রেখে দেই ”
” যেমন দেবর, তেমন ভাবি !মেয়েকে ঘরের খুঁটি করে রেখে দিও তোমরা ” ক’পট রা’গ দেখিয়ে বললেন মারুফা বেগম।
” আরে এসব বিয়ে – টিয়ে বাদ দেও তো তোমরা।কয়দিন পরই আমার ফাইলান (ফাইনাল ) পরীক্ষা।”
এরই মধ্যে আহি পরিপাটি হয়ে ডাইনিংয়ে আসলো।আজকে তার মন – মে’জাজ ফুরফুরে। কেননা ,সকাল সকাল বড় আব্বুর চেঁ’চামেচি শুনে ঘুম ভেঙেছে তার।যখন চেঁ’চামেচির কারণই তূর্য ভাই , তখন আর লাগে কি ! ঘুম থেকে উঠেই সে লাফাতে আরম্ভ করেছিল।মনে হচ্ছিল বড় আব্বু বক্সে গান বাজাচ্ছে আর সে সেই গানের তালে ডান্স করছে।
পুরো কথা না শুনলেও তাহির শেষ কথাটা শুনে সে বলল,
” কী হয়েছে গো ? কার বিয়ে? তূর্য ভাইয়ের? ”
নিজের বিয়ের কথা চলছে শুনলে আহির বাচ্চা মনে প্রভাব পরতে পারে। দুইদিন পরই তার রেজাল্ট ।তার কয়েক মাস পরই ভর্তি পরীক্ষা।এইমুহুর্তে কোনো মা’নসিক আ’ঘাত পেলে ঠিক করে পড়ায় মন দিতে পারবে না।তাই প্রসঙ্গ পাল্টাতে আকবর চৌধুরী বললেন,
” তোর তো কোচিং আছে । একা যেতে পারবি?”
” হ্যাঁ, পারবো! কিন্তু তূর্য ভাইও তো হসপিটালে যাবেন তাই না বড় মা? আমি ওনার সাথে চলে যাব ”
কিছুক্ষণের মধ্যে পরিপাটি হয়ে নিচে নামলো তূর্য। বাড়ি থেকে কোথাও যাওয়ার আগে পারভিন বেগম যেখানেই থাকুন না কেন তূর্য তাকে খুঁজে বের করে বলবে ,
” আম্মু ,আসছি!” ছোটকালের অ’ভ্যাস পাল্টানো মুশকিল।
প্রতিদিনের মতো আজও তূর্য মায়ের উদ্দেশ্যে বলল,
” আসছি !” আজ আর আম্মু বলে সম্বোধন করেনি।পারভিন বেগম বুঝলেন ছেলের অ’ভিমান। এটা নেহাত ছেলে মানুষি বৈকি আর কিছু না।আহি শেষ খাবার টুকু গালে পুরতে পুরতে বলল,
” এক মিনিট দাঁড়ান ভাইয়া । আমিও যাবো ”
তূর্য আহির কথা কানে শুনলেও পায়ের গতির কোনো তারতম্য বোঝা গেল না। সে পুরুষালী কদমে এগিয়ে গেল।
পারভিন বেগমের হঠাৎ অতীতের একটা কথা মনে পড়লো।তখন আহি অনেকটাই ছোট নয় – দশ বছর বয়স হবে হয়তো। তাদের বাড়ির পাশের বাড়িতে একটা পিচ্চি ছিল, তার সাথে প্রায়ই খেলা করতে চলে যেত সে। একদিন কাউকে কিছু না বলেই তাদের বাড়িতে খেলতে যায় আহি।এদিকে বাড়ি শুদ্ধু লোক তাকে খুঁজে খুঁজে আধ’ম’রা হয়ে গিয়েছে। তারপর তূর্য গিয়ে খুঁজে নিয়ে আসে।সেদিন একটা চ’ড়ও মে’রেছিল।বাড়ি আনার পর এটা নিয়ে মারুফা বেগম তাকে মা’রতে মা’রতে বলেছিলেন ,
” দেখ, তোর তূর্য ভাইয়াকে দেখ। এত বড় হয়েছে, কলেজে পড়ে।তবুও যেখানেই যাক তোর বড় মাকে বলে যায়। আর তুই! ”
তারপর থেকে কিছুদিন বাড়ির বাইরে তো বাদ থাক ঘুমোতে, গোসলে ,ওয়াশরুম যেখানেই যাক না কেন সে মাকে বলে যেত। একদিন তার খুব জোরে ওয়াশরুম পেয়েছে।রুম থেকে দৌঁড়ে বেরিয়েছে মাকে জানাতে সে ওয়াশরুমে যাচ্ছে। ডাইনিং রুমে এসে দেখে তূর্য আর মারুফা বেগম কথা বলছে।সে তাদের দিকে এগিয়ে পেট চেপে দাঁড়িয়ে আছে । কথার মধ্যে কথা বলা বে’য়াদবি হবে। এদিক পেটে ব্যথাও করছে।সে যে অ’স্বস্তিতে আছে সেটা তার মুখেও ফুটে উঠেছে।খানিকবাদে মারুফা বেগম সেটা লক্ষ্য করে বললেন,
” কী হয়েছে তোর? পেট চেপে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”
সে জিজ্ঞেস করলো,
” আ…ম্মু ওয়াশরুমে যাবো ?”
” নাহ! যাস না! ই’ডিয়েট ”
” তূর্য ভাই,আমি আপনাকে বলিনি। আম্মু বলো না তাড়াতাড়ি ।নাহলে এখানেই…”
” ক্ষ’মা কর মা।আমার কাছে জিজ্ঞেস করে আর কোথাও যেতে হবে না তোর।যেখানে মন চাইবে যাবি। যা এখন “কল্পনা শেষে মুখে হাসি ফুটলো পারভীন বেগমের।সেই বাচ্চাকাল থেকে ছেলে – মেয়ে দুটো এমন !
আহি তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে বাড়ির গেটের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।তূর্য গাড়ি বের করে তার সামনে গিয়ে থামালো। আহি সামনে বসার জন্য গাড়ির দরজা খুলতে গেলেই গ’ম্ভীর কন্ঠস্বর ভেসে আসলো,
” পিছনে বস ”
” আল্লাহ কেন ?”অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো আহি।
” এক কথা বার বার রিপিট না করলে বুঝিস না তুই?”
” সামনে তো কেউ বসছে না ” বলে তূর্যের গ’ম্ভীর মুখ পানে তাঁকিয়ে আর কিছু বলার সা’হস পেল না। চুপচাপ পিছনে গিয়ে বসলো।
ঢাকার সকালটা যেন এক ব্যস্ত সংগীত।এখন অফিস টাইম হওয়ায় রাস্তায় ব্যস্ততা একটু বেশিই। গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে দেখা যায়, সূর্যের আলো ধুলোয় মিশে একধরনের সোনালি কুয়াশা তৈরি করেছে। রাস্তায় ট্রাফিকের লাল-সবুজ আলো যেন ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছে প্রতিনিয়ত।
দুইজন গাড়ির ভেতরে বসে আছে চুপচাপ। বাইরে হর্ণের শব্দ, রিকশার টুংটাং, ফুটপাথে হেঁটে চলা মানুষের তাড়াহুড়ো সব মিলিয়ে এক বি’শৃঙ্খল সিম্ফনি। হকারেরা গাড়ির জানালার পাশে এসে দাঁড়ায়, কেউ পানির বোতল বিক্রি করছে, কেউ টিস্যু।
বাইরে শহরটা যেন চেঁচিয়ে কথা বলছে,কিন্তু গাড়ির ভেতরের মানুষ দু’জন নীরব।আহি নীরবতা ভেঙে বলল,
” আপনার কলম আমি ফেরত দিয়ে দিবো,ঠিক আছে? ”
কিছুক্ষণ পার হলেও তূর্যের কোনো ভাবান্তর হলো না।সে ট্রাফিক সিগন্যাল পেয়ে আবার ড্রাইভিংয়ে মনোযোগ দিল।আহি ফের বলল,
“একটা কলমের জন্য এভাবে কথা বলা বন্ধ করবেন না প্লীজ ” আহি জানে এটা মি’থ্যা, তূর্য ভাই একটু ছ্যাঁ’চড়ামি করতে পারে তাই বলে একটা কলমের জন্য কখনো এমনটা করবেন না,তবুও বলল।তার কথা শুনে ভ্রু কুঁচকালো তূর্য।একবার লুকিং গ্লাসে চোখ বুলিয়ে নিল তারপর বলল,
” হোয়াট? সামান্য একটা কলমের জন্য আমি তোর সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিবো?তাছাড়া,আমি কবে তোর সাথে ফাউ আলাপ করতে গেলাম ?”
” ফাউ আলাপ না করেন ,ব’কাঝকা তো করেন !”
” সেটা তোর স্বভাবের জন্য করি ! ”
” আপনি শুধু শুধুও আমাকে ব’কেন তূর্য ভাই। ব’কুন ,আমার কোনো স’মস্যা নেই! তাও কথা তো বলুন ”
আহির শেষ কথাটুকু শুনে তূর্যের কুঁচকানো ভ্রু আরো কুঁচকে গেল।সে কৌ’তূহলী হয়ে বলল,
” কেন?”
” অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। না ব’কলে ভালো লাগে না ”
” খুব ভালো ড্রামা শিখেছিস। একদিন সময় করে নাট্যকলা একাডেমিতে ভর্তি করে আসবো।এখন নাম,আমার লেইট হচ্ছে। “বলে নিজের হাতে থাকা ঘড়িতে একবার চোখ বুলালো তূর্য। মন ম’রা হয়ে নেমে গেল আহি।তার তো সত্যিই খা’রাপ লাগছে।এটা তূর্য ভাই মানতে কেন চাইছেন না? তূর্য ভাই কম কথা বলেন সত্য ,কিন্তু এতটাও নয়। তার উপরে কি কোনোভাবে রে’গে আছেন তূর্য ভাই? নাকি অন্য কোনো কারণ আছে! এসব ভাবতে ভাবতে আহি কোচিং সেন্টারের মেইন গেইট পেরোতেই তূর্য ফের গাড়ি স্টার্ট দিয়ে চলে গেল, নিজ চেম্বারের উদ্দেশ্যে।
দুপুরের রোদটা এখন নরম হলেও শহরের গরম বাতাসে যেন একরাশ ক্লা’ন্তি মিশে আছে। কোচিং শেষ করে দুই বান্ধবি রাস্তার ধারে এসে দাঁড়িয়েছে।গাড়ি, রিকশা, মোটরসাইকেলের গর্জন আর ধুলোবালি মিলে এক অচেনা কোলাহল তৈরি করেছে।
ফুটপাতের পাশে কয়েকজন পথচারী তাড়াহুড়ো করে যাতায়াত করছে।
রাস্তায় একপাশে গাছের ছায়া পড়েছে, সেখানে দাঁড়িয়ে আছে আহি আর তারিন।যেন একটু স্বস্তি পাচ্ছে। সূর্যের আলোয় তাদের মুখে হালকা ঘাম জমে উঠেছে।
পাশের দোকান থেকে ভাজা সামুচা,সিঙ্গারাসহ আরো নানান ভাজা পোড়ার ঘ্রান নাকে আসছে।এমনি দিন হলে আহি এসব খাবার কেনার জন্য ব্যস্ত হয়ে পরত।কিন্তু আজ নিরিবিলি বাড়ির গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছে।কতদিন পর তারিনের সাথে তার সাক্ষাৎ হয়েছে তার।সারাক্ষণ ব’কবক করার কথা কিন্তু আজকে যেন আহি মেপে মেপে কথা বলছে।বিষয়গুলো খেয়াল করে তারিন আহির উদ্দেশ্যে বলল,
” কিরে ? মন খা’রাপ তোর ?
আহি অন্যমনস্ক ছিল।তারিনের কথা শুনে একটু চমকে তাকাল, তারপর ঠোঁটে কৃত্রিম হাসি টেনে বলল,
” না…!”
তারিন ভ্রু কুঁচকে বলল,
” তাহলে? এত চুপচাপ কেন আজ?”
” আমি না ভেবেছিলাম তূর্য ভাইয়ের বিয়ের পর আমি ভাবির সাথে মিলে ওনাকে খুব জ্বা’লাবো। ওনার জীবনটা ত্যা’না ত্যা’না করে ছাড়বো। কিন্তু….” একদম শান্ত শিষ্ট ভাবে অন্যমনস্ক হয়ে বলল আহি।
” কিন্তু কী?”তারিনের গলায় এখন কৌতূহল।
আহি হঠাৎ নিচু গলায় বলল,
” বাড়িতে মনে হয় ভাইয়ার বিয়ের কথা চলছে।তাই এখন থেকেই উনি আমার সাথে কথা বলছেন না।বিয়ের পর তো মোটেও বলবেন না ,তাইনা ?বড় মা ঠিকই বলেন বিয়ের পর সবাই বউয়ের কথাই শোন।তূর্য ভাইও সেটাই করবে বল?আর উনার বউও যদি ওনার মতোই খ’চ্চর হয় ? আমাকে তো তূর্য ভাইয়ের রুমের সীমানায়ও পাড়া দিতে দিবে না,ওই ডা’ইনি মহিলা। এদিকে তূর্য ভাইকে জ্বা’লাতে না পারলে তো আমার রাতে ঠিকমতো ঘুম হয় না।এখন কি করবো বল? ”
তারিন আহির অগোচরে একটু হেসে,কপট রা’গ দেখিয়ে গ’ম্ভীর সুরে বলল,
” এই জন্য সেই সকল থেকে মুখ কালো করে রেখেছিস? এতই যখন ক’ষ্ট , তুই ই তার বউ হয়ে যা”
চোখ বড় বড় করে তাকাল আহি, অবাক হলো অনেকটা ।তবুও সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল,
” কিন্তু তূর্য ভাই তো আমাকে দু চোখেই সহ্য করতে পারেন না। ”
তারিন ভ্রু উঁচু করে বলল,
” মানে তুই ওনাকে বিয়ের জন্য রাজি ?”
আহি গাল ফুলিয়ে বলল,
” ধুর! উনি আমাকে বিয়ে করতেন নাকি!”
তারিন হেসে উঠে বলল,
” একটা চান্স নিয়ে দেখতে পারিস,বে’ইবি! ভাইয়া কিন্তু দেখতে মাশাআল্লাহ ! একেবারে তোর ফিকশনাল ম্যানের মতো ”
এতক্ষণে অন্যমনস্কতার ভাব কাটলো আহির। নিজের মধ্যে ফিরল সে।আর বলল,
” তারিন,থাম তুই!তোর সাথে সেটিং করিয়ে দিবো । তারপর আমরা দুইজন তূর্য ভাইয়ের ঘাড়ের উপর উঠে নাচবো । ভালো আইডিয়া নাহ?” বলে দুই বান্ধবী একসাথে উচ্চস্বরে হাসতে আরম্ভ করলো।কিছুক্ষণ পর আহিদের বাড়ির গাড়ি আসতেই দুজনে উঠে পড়ল। আহি আর তারিনদের বাড়ির দূরত্ব খুব বেশি নয়। আর একই রাস্তায় হওয়ায় কোনো অসুবিধা হয় না।
হাতে একটা প্যারাসুট তেলের বোতল নিয়ে মায়ের পিছন পিছন ঘুরে বেড়াচ্ছে আহি। দুনিয়ার সব কাজ ,আবদার করার সময় বড় মার কাছে গেলেও এই একটা কাজের জন্য সে মারুফা বেগমের পিছনে পড়ে থাকে। মায়ের হাতের তেল লাগানো ছাড়া তার পছন্দ হয় না। লতা বেগম বারবার বলেছেন ,” আয়,আমি লাগিয়ে দেই ” কিন্তু সে লাগাতে দেয়নি। লতা বেগম যদি তেল দেন তাহলে এক্ষুনি তাকে গোসল করতে হবে। দেখে মনে হবে যেন চুলগুলোকে সতেজ রাখার জন্য তেলে চুবিয়ে রাখা হয়েছে। ঘাড়,কপাল চুইয়ে চুইয়ে সেই তেল পরবে। মারুফা বেগম একেবারে তার মনের মতো করে দেন।
যদিও সবসময় চুলে তেল দেয় না সে।মাঝে মধ্যে মারুফা বেগম জো’র করে লাগিয়ে দেন। আজ মাথাটা কেমন যেন ব্যথা ব্যথা অনুভব হচ্ছে তাই নিজে থেকেই তেল নিতে এসেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে মারুফা বেগমের হাতের কাজ শেষ হলো। ড্রয়িং রুমের একপাশে দুটো টুল নিয়ে বসে মেয়ের সুদীর্ঘ চুলে তেল দিতে আরম্ভ করলেন।আহি বলল,
” আম্মু মাথার তালুর উপর একটু বেশি করে দেও ”
মারুফা বেগম আরও কিছু পরিমাণ তেল নিজের হাতের তালুতে ঢেলে মেয়ের মাথায় দিতে দিতে বললেন,
” সূর্য কোন দিক দিয়ে উঠেছে আজ ? পায়ে ধরেও তেল দিতে পারি না আর আজ নিজে থেকে এসেছিস আবার তালুতে বেশি করেও দিতে বলছিস ?”
” মাথা ব্য’থা করছে খুব ”
” পরশু দিন রেজাল্ট, আজ তো মাথা ব্য’থা করবেই। রেজাল্ট খা’রাপ হলে মাথার সাথে শ’রীর ব্য’থা করার ব্যবস্থা করব”
” হবে না ! তুমি তেল দেও তো !”
” রেজাল্ট যদি এমন তেমন হয় তোর খবর আছেরে আহি ”
” হবে না বললাম তো !” মুখে ‘ চ ‘ সূচক শব্দ করে বলল আহি।
কিছুক্ষণ পর একটু চি’ন্তিত কন্ঠে সে ফের বলল,
” আম্মু,তূর্য ভাই বাড়ি ফিরেছেন? ”
” হ্যাঁ! কেন ?”
” এমনি ! ”
” এখন আবার জ্বা’লাতে যাস না যেন। কাউকে রুমের কাছে যেতে মানা করে গেছে। ”
” আমি যাচ্ছি নাকি? নিজের জ্বা’লায় নিজে জ্ব’লছি ওনাকে কী জ্বা’লাবো !”
দেখতে দেখতে আরো কিছু মাস গত হলো। এর মধ্যে আবার সবটা আগের মতো হয়ে গিয়েছে। চৌধুরী বাড়ির পরিবেশ — আহি,তাহি,শান্ত,প্রান্তের দুষ্টুমি,মজা,খুনসুঁটি। আহির তূর্যকে বি’রক্ত করা,তার রুম থেকে এটা ওটা নিয়ে চলে আসা। আহিকে তূর্যের ধ’মকা ধ’মকি।চৌধুরী বাড়িতে কিছু হোক বা না হোক নিয়ম করে প্রতিদিন একবার আহির ব’কা শোনা হয়েছে তূর্যের কাছে।কোনোদিন একবারের বেশিও হয়েছে।
উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় জিপিএ ফাইভ পেয়েছে আহি। দুই সাবজেক্টে অল্প কিছু মার্কের জন্য এ গ্রেট পাওয়ায় গোল্ডেন এ প্লাস আসেনি। এটা নিয়ে কেউ কিছু না বললেও মারুফা বেগম আরও তূর্য রা’গ করেছিল। তূর্য সরাসরি কিছু না বললেও খোঁ’চা মেরে কয়েকটা কথা বলেছিল।যদিও এর সুযোগ সে ই করে দিয়েছিল।রেজাল্টের দিন সকালে সে বড় গলায় বলেছিল,
” আমি তূর্য ভাইয়ের থেকে ভালো রেজাল্ট করব।দেখে নিও তোমরা ” অথচ সে তূর্যের রেজাল্টের পায়ের কাছেও যেতে পারিনি।তখন সে যুক্তি দিয়ে বলেছিল ,
” তূর্য ভাইয়ের রেজাল্টও জিপিএ ফাইভ,আমার রেজাল্টও জিপিএ ফাইভ।উনি বোর্ডে ফার্স্ট হয়েছিলেন তো কি হয়েছে!পয়েন্ট তো আর সিক্স করতে পারেননি। সেই ফাইভ ই ”
রেজাল্টের দিন তার বাবা – চাচারা সারা মহল্লায় মিষ্টি বিলিয়েছিল।তাদের কাছে যা চেয়েছিল তারা তাই দিয়েছিল। সে ভেবেছিল হয়তো তূর্য ভাইও দিবে।তাই সে তূর্যকে বলেছিল,
” তূর্য ভাই? আব্বু,বড় আব্বু,ছোট বাবা সবাই আমাকে গিফট দিয়েছেন।আপনি তো কিছু দিলেন না ”
কথাটা বলে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে আহি।তবুও তূর্যের মুখ থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে একই কথা আরো কয়েকবার রিপিট করে। তারপর তূর্য ক’র্কশ গলায় বলে,
” কী লাগবে ?”
সে লাজুক ভঙ্গিতে হাসি হাসি মুখ করে বলল,
” আপনি ভালোবেসে যেটা দিবেন সেটাই নিবো ”
” সেটা তোর হজম হবে না ”
” হবে হবে! একবার দিয়েই দেখুন ”
তূর্য হাস্কি স্বরে বলল,
” উমমমম ..কাছে আয় ” আহি খুশি মনে এগিয়ে গেল। তূর্য দাঁত দাঁত চেপে বলল,
” সসম্মানে বের হ।নাহলে এমন থা’বড় দিবো এক ঘন্টা ধরে স্লিং ফ্যানের মতো ঘুরবি ” সাথে সাথে আহির হাসি হাসি মুখটা চুপসে যায়। এর চেয়ে ভালো একেবারে বলে দিলেই হতো,
” আমি, কি’প্টা,আমি ছোটলোক ।কোনো উপহার দিবো না তোকে ” সে নিজের মান – সম্মান নিয়ে বের হয়ে চলে আসত।
তারই বো’কামি ! সে তো জানেই তূর্য ভাইয়ের হাত থেকে পানিও পরে না।আর সেখানে কোনো গিফট চাওয়া তো বিলাসিতা।
আর পনেরো দিন পর থেকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা শুরু হবে।চৌধুরী বাড়ির সবাই চায় আহি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুক ।চৌধুরী বাড়ি থেকে অনেকটা কাছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। তবুও এক জায়গার আশায় তো আর বসে থাকা যায় না। ভাগ্যের কথা কিছু বলা যায় না। তাই সে বেশ কয়েক বিশ্ববিদ্যলয়ের ফরম তুলেছে। যদিও তূর্য বলে দিয়েছে জাবিতে না হলে আশেপাশে কোনো ভালো ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে পড়বে।বাড়ির বাইরে থেকে পড়ার কোনো দরকার নেয়। বাড়ির সবাইও এটাই চায়।
কিন্তু,আহির স্বপ্ন পাবলিকে পড়ার ।শুধু আহির নয়,এটা প্রতিটা শিক্ষার্থীর স্বপ্ন। তাই সে তূর্যের কথায় নাকচ করে।সেটা শুনে শান্ত বলে,
” আরে আহিপু তোর তো জাবিতে পড়ার ইচ্ছা। তো ন্যাশনালে পড়লেও তো তোর জাবিতেই পড়া হচ্ছে । সেটা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় হোক বা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় হোক। জাবিই তো হবে !”
” এই তোর যুক্তিবিদ্যা অফ কর। যুক্তি দিতে এসেছে।যা ভাগ! ভাইয়ের চামচ ” ক’টমট করে বলে উঠে আহি।
রে’গে যায় শান্ত শা’সানোর ভঙ্গিতে বলে,
” একদম চামচা বলবি না আহিপু ”
” আমি তো তোকে সম্মান দেখিয়ে চামচ বললাম। আর তুই তো…..”
” পড়া লেখার যে শ্রী ,পাবলিক তো দূরে থাক জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়েও চান্স পাবি না।যা পড়তে বস! ” মায়ের ধ’মক খেয়ে তখনকার মতো ঝ’গড়া বন্ধ করে চলে যায় আহি।
সে সব এখন অতীত। তার প্রিপারেশনও খুব ভালো। বাকিটা ভাগ্যের উপর!কিন্তু গত দুই মাস ধরে সারাক্ষণ একটা কথাই ঘুরপাক খায়। এসব কথা কারো সামনে বলাও লজ্জা জনক। এখানে তার তো কোনো দো’ষ নেয়। সে টোটালি নি’র্দোষ ! সব দো’ষ যে তাকে উপন্যাসের বই গিফট করেছে তার।এই কয়মাসে সে একাডেমিক বইয়ের পাশাপাশি উপন্যাসের বই দুইটাও শেষ করেছে। তাও একবার করে নয়।দুই দুইবার করে শেষ করেছে। বইয়ের হিরোগুলো কত সুন্দর ! একেবারে জেন্টেলম্যান! রাস্তা ঘাটে কত চলা ফেরা করে কখনো উপন্যাসের মতো সুদর্শন পুরুষ চোখে পড়ে না। তাদের বাড়িতে একটা আছে কিন্তু সেটা তো খ’চ্চর। কী এক জ্বা’লা! গত দুই মাস ধরে ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে তূর্য ভাইকে প্রপোজ করবে। একবার সুযোগ নিয়ে দেখাই যাক।কিন্তু কোনো ভাবে যদি তূর্যকে পটিয়েও ফেলে বিয়ের পর, হয় কথা না হতেই তো গায়ে হাত তুলবে তখন কি করবে?
থাকগে! একটা সুদর্শন পুরুষকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেতে হলে এইটুকু স্যা’ক্রিফাইস করাই যায়। সবার সামনে বলতে তো পারবে এই সুদর্শন পুরুষ তার ব্যক্তিগত পুরুষ! না, না ,সে মা’র কেন খেতে যাবে?বিয়ের পরও তো তারা এই বাড়িতেই থাকবে।কিছু বললেই সে বড় আব্বুকে বলে দেবে।মা’র খাওয়ার কোনো প্রশ্নই উঠে না! কিন্তু তূর্য ভাই তো মনে হয় আন’রো’মান্টিক ! গল্পের নায়ক দুটি তূর্য ভাইয়ের মতো মুডি হলেও রো’মান্টিক আছে। থাক! এই জিনিসটাও না হয় মেনে নিলো।কি আর করার !
এত এত চিন্তা ভাবনা করে ফেলেছে অথচ এখনো তূর্যকে কিছু বলে উঠতে পারেনি।
“একটু আগে তো তূর্য ভাইয়ের রুম থেকে তাহির হাসির আওয়াজ আসছিল।তারমানে তূর্য ভাইয়ের মুড এখন ভালো। এখন যাওয়াই শ্রেয়।” মনে মনে কথাটা ভেবেই সে তূর্যের রুমের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো।দরজা নক করার আগেই তাহি হাসতে হাসতে দরজা দিয়ে হুড়মুড় করে বেরিয়ে পড়লো। এমনি দিন হলে আহি তাকে জিজ্ঞেস করতো,” কিরে?এত হাসছিস কেন?” কিন্তু আজ করলো না।দরজা খোলা থাকতে থাকতে ঢুকে পড়তে হবে।তাহলে একটা অজুহাত অন্তত দিতে পারবে,
” দরজা খোলা ছিল তাই অনুমতি না নিয়েই ঢুকেছি ” যেই ভাবা সেই কাজ। রুমে ঢুকেই সে দেখতে পেল তূর্য খাটের সাথে হেলান দিয়ে বাম হাত চোখের উপর দিয়ে হাসছে। হাসলে তার গাল দু’টোয় হালকা ডিম্পল পড়ে, যেন সৌন্দর্যের ছোট্ট ফাঁদ।মুখটা এমন উজ্জ্বল লাগছে, যেন কোনো শিল্পী যত্ন করে তুলির টানে তৈরি করেছে এক পরিপূর্ণ মুখচ্ছবি।
হাসিতে কোনো শব্দ নেয়।আহা! কী চ’মৎকার সেই হাসি । এভাবে শব্দ না করেও বুঝি এত সুন্দর হাসা যায়? তূর্যকে না দেখলে সে জানতেই পারত না।তূর্য ভাইয়ের দাঁত গুলোও কি সুন্দর।সবগুলো যেন মেপে মেপে বসানো।তূর্য প্রথমে টের না পেলেও মিনিট খানিক পর রুমে কারো উপস্থিতি বুঝতে পেরে চোখ হতে হাত সরিয়ে তাকালো। আহিকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চেহারাটাকে বরাবরের মতো করে বলল,
” কী প্রবলেম?আবার নক না করে এসেছিস?”
“এমন ভাব করে যেন মেয়ে মানুষ!” কথাটা মনেমনে বিড়বিড় করলেও সরাসরি বলল না আহি। এখন ঝগড়া করলে চলবে না। তূর্য ভাইকে ইমপ্রেস করতে হবে। যে করেই হোক!
এসেই আই লাভ ইউ বলা কি ঠিক হবে? না, হবে না! এর আগে কিছু পাম দেওয়া কথা বার্তা বলতে হবে।কিন্তু সে তো এসব পারে না। কোনো এক্সপেরিয়েন্স নেয়।আর মি’থ্যা কথাটাও সে ভালো করে বলতে পারে না। তূর্য ভাই ঠিকই ধরে ফেলেন।সে যদি সত্যি সত্যি তূর্য ভাইকে ভালোবাসতো তাহলেও হতো।
আরেকটু আগে মনে পড়লে চ্যাটজিপিটি থেকে দেখে আসতে পারতো। হঠাৎ একটু আগের কথা মনে পড়তেই সে চট করে বলল,
“তূর্য ভাই আপনার হাসিটা অনেক সুন্দর”
” জানি ” এভাবে খ’চ্চরের মতো বলায় রা’গ হলো আহির ।তবু কিছু বললো না। অভিনয় চালিয়ে যেতে হবে।যদিও তূর্য ভাইয়ের হাসিটা সত্যিই সুন্দর। সে ফের বলল,
” তাহলে হাসেন না কেন? এটা কিন্তু খুব খা’রাপ।আচ্ছা আমার কোন জিনিস আপনার কাছে খা’রাপ লাগে?”
তূর্য বিছানা থেকে উঠতে উঠতে বলল,
” সব ”
নাহ! রা’গলে চলবে না।ধৈর্য ধারণ করতে হবে। এইটুকুতেই যদি রে’গে যায় তাহলে সারা জীবন সংসার করবে কীভাবে? বুকের ভিতর ধুকপুক ধুকপুক করছে,সে এবার গলা ঝেড়ে বলল,
” আই লাভ ইউ,তূর্য ভাই ”
বলেই নাক – মুখ খিচে বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইলো। এখন নিশ্চয়ই দুই গালে দুইটা ঠা’টিয়ে চ’ড় খাবে।মা’র না হয় খেলো।কিন্তু এই কথা যদি তূর্য ভাই বাড়ি শুদ্ধু লোকদের জানিয়ে দেয় তাহলে কী হবে ?হায় হায়! এতক্ষণ কেনো এই কথা মাথায় আসেনি তার? তাহলে জীবনেও সে এসব কথা বলতো না। সেভাবে চোখ বন্ধ রেখেই সে ফের বলল,
প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ২০
” আপনার আল্লার কি’রে লাগে তূর্য ভাই এসব কথা কাউকে বলবেন না ! ” বলেই এক দৌঁড়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায় আহি। এদিকে রোবটের মতো দাঁড়িয়ে আছে তূর্য। কী বলে গেল এই মেয়ে! সে কী ঠিক শুনল ? ভালোবাসি বলল ? নাকি সে ভুল শুনল? এটা আবার কোন লেভেলের নাটকবাজি করে গেল? কী চলছে বে’য়াদবটার মনে ? সা’হসটা কি একটু বেশিই বেড়ে গেছে?
