Home প্রণয় ব্যাকুলতা প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ২৯ (২)

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ২৯ (২)

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ২৯ (২)
ইনান হাওলাদার

রাতের শহরটা হালকা আলোয় পূর্ণ। রাস্তার দু’পাশে ঝুলে থাকা ল্যাম্পপোস্ট গুলো একে একে জ্ব’লে উঠেছে সেই কখন। ম্লান হলুদ আলো ছড়িয়ে পড়ছে পিচের ওপর।
সন্ধ্যার আড্ডা শেষে নাবিল পিংকিকে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার নাম করে বাইকে উঠিয়েছে।কিন্তু বাসায় না নিয়ে ঢাকা শহরের নির্জন রাস্তায় বাইক নিয়ে ছুটছে।
ফ্রেন্ড হিসেবে পিংকি অসংখ্য বার নাবিলের বাইকে উঠেছে। তবে আজকের অনুভূতিটা ভিন্ন। অদ্ভুত এক ভালো লাগা।
সে কখনো দুইপাশে হাত মেলে চোখ বন্ধ করে রাতের শীতল হাওয়া অনুভব করছে, তো কখনো নাবিলের পিঠে মাথা ঠেকাচ্ছে। বাতাস ছুটে এসে তার মুখে পড়ছে, চুলগুলো এলোমেলো করে দিচ্ছে । নাবিল শুধু পিংকির কান্ড পরখ করছে আর মুচকি হাসছে। আসলে বয়স যা-ই হোক ভিতর থেকে সকল মানুষই সেই ঊনিশ – কুড়িতে পড়ে থাকে।কেউ প্রকাশ করে ,কেউ করে না ,আর কেউ বা নির্দিষ্ট কোনো মানুষের সামনেই নিজেকে মুক্ত করে। এক পর্যায়ে পিংকি বললো,

” রাত বাড়ছে নাবিল বাসার দিকে চল ”
” বাসায় কী? ”
” বাসায় কী, মানে? কত রাত হয়েছে তোর হুস আছে?”
” এক ঘন্টার মধ্যে যাইবি নাকি আধ ঘন্টা?”
” এক ঘন্টার মধ্যে যেতে পারবি ? আবার আধ ঘন্টা বলছিস?”
” যাইবি কিনা ক ”
” চল ”
” তাইলে শ’ক্ত কইরা জ’ড়াইয়া ধইরা বয়
” আহারে ,চান্দু আমার ! ” টেনে টেনে কথাটা বললো পিংকি।
” স্পিড বাড়াইবো,না ধরলে পইড়া যাবি ”
” তিন ঘন্টায় চল তুই ”
” একটাও গালি দেই নাই । এই জন্যেও তো কিছু ডিজার্ভ করি ”
” তুই নামা আমাকে । সিএনজিতে চলে যাবো ”
” বা’ড়ার কপাল আমার ! ” নাবিলের বিড়বিড় করে বলা কথা ঠিকমতো শুনতে পেল না পিংকি।সে বলল,
” কী বললি? জোরে বল ”
” বা’ড়া কবো তোরে ”

বলে গাড়ি ঘুরিয়ে বাড়ির রাস্তা ধরে নাবিল। প্রায় মিনিট পঞ্চাশেকের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছায় তারা। পিংকি নেমে হেলমেট খুলে নাবিলের উদ্দেশ্যে বলে,
” সোজা আমার শ্বশুর বাড়িতে যাবি । এদিক – ওদিক আড্ডা দিবি না ”
” তোর সতীনের বাড়ি যাবো ”
” আইচ্ছা যা ”
” ভ’য় পাস না আমারে ?”
” তুই বা’ঘ নাকি ভা’ল্লুক যে ভ’য় পাবো?”
” পাওন লাগতো না। যাহ !” বলে পিংকির কাঁধে মৃদু ধা’ক্কা দিলো নাবিল।
” সা’বধানে যাস ”
বলে পিংক হাঁটা দিতেই নাবিল বাইকে বসে থাকা অবস্থায় পিছন থেকে তার হাত টেনে ধরে অসহায় কন্ঠে বলল,

” কিছু তো কর মাংকি ”
পিংকি পিছন ফিরে নাবিলের দিকে তাকিয়ে বলল,
” আজব ! যেতে দে নাবিল ”
নাবিল পিংকির দুই হাতের কব্জি ধরে টেনে নিজের নিকট আনলো।তারপর বাচ্চাদের মতো করে বলল,
” একটা হা’গ দে ”
” পারবো না ”
” দে বা’ড়া ”
” না ,বা’ড়া ”
” হ্যাঁ, বা’ড়া!”
পিংকি একটু ভেবে তারপর বললো,
” হেলমেট খোল ”

খুশিতে নাবিলের চোখ চিকচিক করে উঠেছে। পিংকি তাকে চু’মু – টুমু খেয়ে বসবে না তো ? সে তো এতটাও আশা করেনি।দ্রুত হেলমেট খুলে চোখ বন্ধ করে পিংকির দিকে মুখ বাড়িয়ে দিলো । পিংকি দুই হাতে নাবিলের এলোমেলো চুলগুলো আরেকটু এলোমেলো করে দিয়ে চলে গেল। নাবিল চোখ খুলতে খুলতে সে নাগালের বাইরে । নাবিল একটু চেঁ’চিয়ে বলে উঠলো,
” এত বড় ধোঁ’কা আমার এক্স আশাও কোনোদিন দেয় নাই। শা’লার মাংকির বা’চ্চা ”
” না’পিতের বা’চ্চাআআআআআআ! ” পিংকিও একটু চেঁচিয়ে কথাটা বলল।সে দৃষ্টির আড়াল হলে নাবিল বাইকে স্টার্ট দিলো।

ভাইয়া,এই অংকটা করে দেও ” তূর্যের সকল ভাবনার ইতি ঘটলো এই কথায়।তাহির কন্ঠ শুনে আবারো আশাহত হলো সে।তাহলে ওটা তাহি ছিল। বুক চি’রে একটা দীর্ঘ’শ্বাস বেরিয়ে আসলো। বিড়বিড় করে আউড়ালো ,
” আর কত জ্বা’লাবি আহি?” আর বোনকে বললো,
” ভাইয়া একটু টে’ন্সড আছি।আহি আপু বা শান্ত – প্রান্ত ভাইয়ার কাছে যাও ”
তূর্যের কথায় দুইপাশে মাথা নেড়ে চলে গেল তাহি। কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে আসলো।এবার মুখ কালো করে এসেছে।তূর্য দুই ভ্রু উঁচিয়ে ইশারায় জিজ্ঞেস করলো,” কি হয়েছে?” আহি থমথমে মুখে বললো,
” শান্ত ভাইয়ার পরীক্ষা,প্রান্ত ভাইয়া অনলাইনে ক্লাস করছে আর আহি আপু বুঝিয়ে দেয়নি ”
” কেন ? কি করছে ?”
” কিচ্ছু করছে না,শুয়ে শুয়ে রিলস দেখছে।তুমি রেফার করেছ তাই বুঝিয়ে দিতে গিয়েও দিলো না।বললো, ‘ তোর বিলেত ফেরত ডাক্তার ভাইয়ের কাছে যা ‘ ”

” গিয়ে বল আমি ডাকছি ”
” তুমি রেফার করায় বুঝিয়ে দিলো না।আর ডাকছো‌ বললে আসবে নাকি?”
” ওকে,এদিকে আয় ” তাহি গিয়ে বিছানার উপর বই – খাতা মেলে বসলো।তূর্য একটু সময় নিয়ে তাহিকে ম্যাথগুলো বুঝিয়ে দিলো। বলা বাহুল্য, এই বাড়ির প্রত্যেকটা ছেলে – মেয়েরই মাথা খুব ভালো। যার দরুন বেশি সময় নিয়ে বোঝানোর দরকার হয় না। অংক বোঝানো শেষে তাহি কিছুক্ষন এটা – ওটা কথা বলে চলে গেল।তারপর আরো কিছুক্ষণ পার হলো। তুর্যের অ’স্থিরতা ক্রমশ বাড়ছে। মাত্র একদিনের বি’রহে এতটা কাবু হওয়া কি মোটেও ঠিক? সে ফোঁ’স করে একটা নিঃশ্বাস ছাড়লো। কিছু একটা ভেবে আহির রুমের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালো। হার যখন মানতেই হবে আগে ভাগে গিয়েই মেনে নিক। শুধু শুধু সারা রাত হা’সফাস করে কী লাভ !
তূর্য হাতের উল্টো পিঠের সাহায্যে দরজায় দুইবার নক করতেই আহি বললো,

” কে? আসুন ”
রুমে প্রবেশ করলো তূর্য।
আহি ভেবেছিল তার মা – চাচি হবে হয়তো।যদিও তারা আসলে ডোর নক করে না।তবে তূর্যকে দেখে মনে মনে বিশ্ব জয়ের আনন্দ অনুভূত হলো তার। সে এখনো শুয়ে শুয়ে রিইলস দেখছে।তূর্যকে দেখে চেহারায় কপট কা’ঠিন্নতা আনলো। এমন ভাব করলো যেন তার রুমে কেউ এসেছে সেটা সে দেখেইনি।
তূর্য এসে স্টাডি টেবিলের পাশে রাখা চেয়ার টেনে বসলো। আহির বেখেয়ালিপনা দেখে বি’রক্ত হলো। কথা না বলিস ,মোবাইলটা রেখে উঠে তো বসবি! অনেকক্ষণ পার হলো তবুও আহির কোনো হেলদোল না দেখে তূর্যের মুখ ক’ঠোরতায় ছেয়ে গেল। চোয়াল শ’ক্ত করে চেপে আছে, যেন নিজের রাগ’কে দাঁতে কা’মড়ে ধরে রেখেছে। অভিমান আর দ’হন মিশে তৈরি এক কঠিন শীতলতা জমেছে অন্তরে।
আহি একের পর এক রিইলস দেখেই যাচ্ছে।তবে তার পূর্ণ মনোযোগ তূর্যের দিকে। তূর্যও তার কান্ড – কারখানা দেখছে। কতক্ষন মুখ বন্ধ করে থাকতে পারে সেও দেখবে।
কিন্তু আজ তাকে হার মানতে হলো । আহি তার অবস্থানে অনড়। নাটক দেখার এত ধৈর্য তার নেই।

” হোয়াটস রং উইথ ইউ ? ”
নিঃশব্দ রুমে হঠাৎ তূর্যের ভারি কন্ঠের আওয়াজ প্রতিটা দেয়ালে গিয়ে ধ্বনিত হলো। তবে আহি নিশ্চুপ !
মনে মনে খুব খুশি লাগছে । সে এবার রিইলস ছেড়ে নিউজফিড স্ক্রল করতে আরম্ভ করেছে।
তূর্যের রা’গ ক্রমশ বাড়তে থাকলো।চোয়াল শ’ক্ত হয়ে মুখশ্রী র’ক্তিম হয়ে উঠেছে। সে প্রশ্নটা করে কিছুক্ষণ অপেক্ষাও করলো।কোনো রেসপন্স আসছে না দেখে শব্দ করে চেয়ার থেকে উঠে দরজার দিকে পা বাড়ালো।
আহি মনে মনে ভাবলো ,সে তীরে এসে তরী ডুবিয়ে ফেললো? তূর্য ভাই চলে যাচ্ছেন? এবার যেন তার আরো অ’ভিমান হলো,তূর্য পুরুষ মানুষ হওয়া সত্ত্বেও যদি তার এত ই’গো থাকতে পারে তাহলে আহির কেন থাকবে না?
তবে আহির ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো।তূর্য ডোর লক করে আহির হাত থেকে ছোঁ মে’রে মোবাইলটা নিয়ে বিছানার এক প্রান্তে ছুঁড়ে মা’রলো। আহির মুখের উপর সামান্য ঝুঁকে চোয়াল শ’ক্ত করে চি’বিয়ে চি’বিয়ে বললো,

” হোয়াট’স ইউওর প্রবলেম?বল, কী প্রবলেম তোর ?”
আহি ঘাড় ঘুরিয়ে মুখ অন্য দিকে ফিরিয়ে নিলো। রা’গে শ’রীর কাঁপছে তূর্যের । সে তিন আঙুলের সাহায্যে আহির চোয়াল ধরে নিজের দিকে ফেরালো। আহি পুনরায় একই কাজ করলো। তূর্যও একই কায়দায় আবার আহিকে নিজের দিকে ঘুরালো।এবার আর চোয়াল ছেড়ে দেয়নি। শ’ক্ত করে চেপে রেখে দাঁতে দাঁত পি’ষে বলল,
” তোর ঢং দেখার মতো ফালতু টাইম আমার নেই। ”
আহি এবারও নিশ্চুপ।কিন্তু এবার ভ’য়ে তার বুক ঢিপঢিপ করছে। তবুও অনুভূতি শূন্য হয়ে সটান হয়ে পড়ে আছে। তূর্যের মুখের দিকে একবার চেয়ে চোখ সরিয়ে নিলো। মুখশ্রী অসম্ভব রকমে লাল হয়ে আছে। কি ভ’য়ংকর ভাবে রে’গে গেছেন তূর্য ভাই।

তূর্যের ধারালো চাহুনি দেখে তার অ’ন্তরাত্মা ভ’য়ে শুকিয়ে এসেছে।কিন্তু বাইরে নিজের ভ’য় প্রকাশ করলো না।
তূর্য কিছুক্ষণ আহির মুখের দিকে র’ক্তিম চোখে তাকিয়ে থেকে ঝামটি মে’রে গাল ছেড়ে রুম ত্যাগ করলো। এইমুহুর্তে মাথা কাজ করছে না তার। এখন এখানে থাকলে পরিস্থিতি খারাপ বৈকি ভালো হবে না। যাওয়ার আগে পায়ের কাছে থাকা চেয়ারটাকে সজোরে একটা লা’থি মে’রে দরজাটাও জোরে লাগিয়ে দিয়ে গিয়েছে। চেয়ার পড়া আর দরজা লাগানোর বিকট শব্দে আহি চোখ খিঁচে কানে হাত চেপে ধরেছে।
তূর্য যেতেই সে উঠে বসলো।আগেই খাটের এক কোণে পড়ে থাকা মোবাইলটা উঠিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলো। না ,মোবাইল ঠিকঠাক আছে।সেটাকে চার্জে রেখে নিজে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চোয়াল ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলো,দুই গাল লাল হয়ে আছে। চোখে জল টলমল করছে। তূর্য ভাই কতটা পা’ষাণ। স্য’রি তো বললেন না ,উল্টে কায়দায় ফেলে মে’রে রেখে গেলেন। যদিও কথা বলতো এরপরে তো কখনো কথা বলবে না।

পারভিন বেগম দুপুরের খাবার খেয়ে একটু শুয়ে ছিলেন ।তখনই আহি একটা নেইল কাটার হাতে নিয়ে তার রুমে আসে। এসে বলে ,” আসুন বড় মা আপনার নখ কেঁ’টে দেই ”
পারভিন বেগমও হাত বাড়িয়ে দেন।নখ কাটা শেষে আহি আদুরে কন্ঠে ডাক ছোড়ে,
” বড় মা ? ”
ঘুমে পারভিন বেগমের চোখ প্রায় লেগে এসেছে।তিনি চোখ বন্ধ করে ঘুমের ঘোরে বললেন,
” হুমম ”
” ঘুমিয়ে পড়েছেন?”
পারভিন বেগম চোখ খুলে উঠে বসে বললেন,
” না,বল ”
” তূর্ … আপনার ছেলে কখন বেরিয়েছে? ” তূর্য ভাই বলতে গিয়েও বলল না আহি।
” প্রতিদিন যখন বেরোয় তখন! ”
” ওহ! ” তারপর একটু থেমে ফের বলল ,
” ছেলে বড় হয়ে গেলে তাকে উত্তম – মধ্যম দেওয়া যায় না ?”

” যায় তো ! মায়েয়া সব বয়সেই সন্তানদের উত্তম – মধ্যম দিতে পারে।কিন্তু বড় বড় ছেলে – মেয়েদের গায়ে হাত তোলা দৃ’ষ্টিকটু দেখায় তাই আর কেউ মা’রধর করে না ”
” আপনি একটু কানে ধরিয়েন তাহলে।যদিও আপনার ছেলে মা’র খাওয়ার যোগ্য ” শেষ কথাটা খানিকটা গ’ম্ভীর হয়ে বলল আহি।
” কেন? কী করেছে আমার ছেলে ?” স’ন্দিহান গলায় বললেন পারভিন বেগম।যদিও ঘটনার সামান্য আঁচ তিনি তূর্যের কাছ থেকেই পেয়েছেন।
আহি যেন এই প্রশ্নটাই শুনতে চাচ্ছিলো। কথার তালে তালে পারভিন বেগমের মুখ থেকে কখন এই প্রশ্ন বের করবে,আর কখন কাল থেকে মনে মনে সত্য – মি’থ্যা দিয়ে সাজিয়ে রাখা কথাগুলো বলবে।
পারভিন বেগম প্রশ্নটা করার সাথে সাথে সে গড়গড় করে বলতে আরম্ভ করলো,

” কি করেনি সেটা বলুন বড় মা ! গত পরশু শুধু শুধু আমাকে ব’কেছে ।একদম খালি খালি ! যেমন – তেমন ব’কা না, বড় মা।পারলে আমাকে ছাদ থেকে ফেলে দেয়।এত ব’কা খেয়ে আমি তো একটু রা’গ করতেই পারি ,বলুন?পারি না? করেছি একটু রা’গ ।বেশি না অল্পই!
তারপর একটা দিন পার হয়ে যাওয়ার পর আপনার ছেলে আমার রুমে আসলো। আমি ভাবলাম হয়তো স্য’রি চাইতে এসেছে। স্য’রি তো বললোই না ,উল্টে আবারো ব’কলো আর কি মা’রটাই না মা’রলো আমাকে।এবার অনেক রা’গ করেছি! ম’রে গেলেও সে’ধে কথা বলব না। ”
পারভিন বেগম জানেন আহি যতটা বলেছে ঘটনা ততটাও মা’রাত্মক না। আহির বি’চার দেওয়ার ভঙ্গি দেখে হাসি পেল তার। নিজের হাসি আটকে রেখে বললেন,

” অনেক মে’রেছে , মা?”
আহি হাতের আঙুল দ্বারা নিজের গাল চে’পে ধরে বলল,
” এইযে এভেবে চেপে ধরেছিল ” তারপর গাল থেকে হাত সরিয়ে বলল,
” আমার কাছে প্রমাণও আছে।ছবি তুলে রেখেছি ,দাঁড়ান আপনাকে দেখায় ” বলে মোবাইল বের করে গ্যালারিতে ঢুকলো আহি। কাল তূর্য সত্যিই খানিকটা জোরেই তার গাল চেপে ধরেছিল। ফর্সা গাল হওয়ায় অনেকক্ষণ ধরে লাল হয়েও ছিল।কিন্তু আহি তার উপর হালকা করে ব্ল্যাশ দিয়ে সেটাকে আরো লাল করেছে। তারপর সেটাকে মোবাইল বন্দি করেছে। সে পারভিন বেগমকে সেই ছবিটাই বের করে দেখলো। পারভিন বেগম বুঝলেন না আহির চা’লাকি।তিনি উপর নিচ মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন,

” সত্যিই তো ! এত জো’রে মা’রা উচিত হয়নি।বাড়ি ফিরলে ধরবো ওকে।কেন এত জো’রে মা’রল ?”
‘” আপনার ছেলে স্বী’কার যাবে না দেখে নিয়েন বড় মা ”
” তাহলে ঐ ছবিটা আমাকে পাঠিয়ে রাখ।আমিও ওকে প্রমাণ দেখাবো ”
আহি মনে মনে পুরোটা খুশি হয়ে গেল।সাথে সাথে ছবিটা পারভিন বেগমের মোবাইলে পাঠিয়ে দিলো।এই বার কী করবেন তূর্য ভাই? মা’র না খান ব’কা তো খাবেন ! পারভিন বেগম একটু থেমে বললেন,
” বার বার যে আপনার ছেলে,আপনার ছেলে বললি,আমার ছেলে তোর কি হয় ?”
” আগে ভাই হতো এখন কিচ্ছু হয় না ” একটু ভেবে থমথমে কন্ঠে বললো আহি।
” কেন?”
” কারণ….” এর মধ্যে ফোন বেজে ওঠে আহির।তূর্যের কল ! অবাক হলো আহি।কিন্তু সে তো কিছুতেই কথা বলবে না। রিসিভ করে পারভিন বেগমের কাছে দিলো ।

” আম্মুর কাছে নিয়ে যা ” গ’ম্ভীর কন্ঠ তূর্যের।
” বল,আমার কাছেই আছে ”
মায়ের কন্ঠ শুনে তূর্যের মুখের অবস্থা দেখার মতো।কি বলবে সে? সে তো আহিকে কল করেছিল। বেশি না হোক রিসিভ করে একটা কথা তো বলতো। সেটাও করলো না। স্টুপিড একটা! মনে মনে কথা সাজাচ্ছে সে।
তূর্যের নীরবতা পেয়ে পারভিন বেগম দু’ষ্টুমি মিশ্রিত কন্ঠে বললেন,
” আমার সাথে কথা বলবি ,তাহলে আমার নম্বরে কল করতি ”
” তুমি ফোনের কাছে থাকো কিনা তাই …..”
” আচ্ছা,বুঝেছি । কী হয়েছে বল ” তূর্য কথা সম্পূর্ণ করার আগেই পারভিন বেগম বলে উঠলেন। তার ঠোঁ’টে মুচকি হাসি। ছেলেকে ছোট থেকে বড় করেছেন তিনি। ছেলের মন কি তিনি পড়তে পারেন না? সে যে একটা মি’থ্যা অ’জুহাতে কল করেছে, পারভিন বেগম সেটা বুঝেও না বোঝার ভান করলেন।
আহি কান খাঁড়া করে রেখেছে।ওপাশ থেকে তূর্য কি বলছে সেটা শোনার আপ্রাণ চে’ষ্টা করে যাচ্ছে।কিন্তু কোনো কথাই তার কান অবধি পৌঁছাচ্ছে না।
তূর্য কোনো কথা খুঁজে না পেয়ে বললো,

” কী করছো ?”
” এটা জানতে মাকে কল করেছিস ?”
” হ্যাঁ! আচ্ছা আম্মু বিজি আছি।বাড়ি ফিরে বলবো ”
বলে দ্রুত কল কাটে তূর্য।
একাত – ওকাত হয়ে কাল সারা রাত পার করেছে সে।কিছুতেই দু চোখের পাতা এক করতে পারেনি। হাসপাতাল থেকে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা। কখন বাড়িতে ফিরবে ,আর কিভাবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করবে সকাল থেকে এই টে’নশন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। আর তিনি এখনো রা’গ বেঁধে বসে আছেন। কলটা পর্যন্ত রিসিভ করতে পারলো না।
একেই রে’গে ছিল , কাল রাতের পর নিশ্চয়ই আরো রে’গে আছে। সে তো দুই – একটা কথা বলেই চলে আসতো। কিন্তু আহি এমন ভাবে ই’গনোর করায় রা’গ উঠে গিয়েছিল।
তূর্য চোখ ব’ন্ধ করে একটা দী’র্ঘশ্বাস ছেড়ে মনে মনে বিড়বিড় করলো,

” কখনো তোর মনের মতো প্রেমিক পুরুষ হতে পারবো না,এসব মান – অ’ভিমান ভা’ঙাতে পারবো না,আই নো দ্যাট। দ্যাট’স হোয়ায়, যতটা পারি ই’গনোর করে চলি। কিন্তু তুই ? সেই অ’ভিমান করেই পরে আছিস। ”
কিভাবে রা’গ ভা’ঙাবে, কিভাবে কি করবে কিচ্ছু মাথায় আসছে না তার। কোনো এক্সপেরিয়েন্সও নেই।
তূর্য একটু চি’ন্তা – ভাবনা করে আলিয়ার নাম্বারে কল করলো।আলিয়া কল রিসিভ করে বললো,
” কিরে তূর্য অসময়ে তোর কল ?”
” শোন…ওই….”
কথাটা সম্পূর্ণ করতে পারলো না তূর্য। ভিতর থেকে বের হচ্ছে না। ফ্রেন্ডের কাছে এখন শুনতে হবে মেয়েদের রা’গ ভা’ঙাতে হয় কিভাবে? তূর্য থেমে যাওয়ায় আলিয়া বলল,

” কি হয়েছে তোর? এভাবে আমতা – আমতা করছিস কেন?”
তূর্য কিছুটা সময় নিয়ে এক দ’মে বললো,
” কি করলে তোদের… আই মিন, মেয়েদের রা’গ কমে? ”
তূর্যের মুখে এমন কথা শুনে আলিয়া আরেকবার ফোনে সেভ করা নম্বরটা দেখে নিলো ।এটা সত্যিই তূর্য তো ? হ্যাঁ,ইংরেজি বড় বড় অক্ষরে তূর্যই লেখা আছে।
আলিয়ার কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে তূর্য ফের বললো,

” আলিয়া? শুনতে পাসনি?”
” পেয়েছি ,পেয়েছি।কিন্তু তোর প্রশ্ন শুনে আপাতত কো’মায় আছি ”
” কাম অন আলিয়া ! তুইও নাবিল আর তাসিনের মতো শুরু করিস না ”
” কে রা’গ করেছে ? আহি ?”
” হুঁ ” আস্তে করে উত্তর দিলো তূর্য।
” বাচ্চা মেয়ে কয়েকটা চকলেট ,আইসক্রিম কিনে দিস ,খুশি হয়ে যাবে ”
” হবে না! স্ট্রং কিছু বল ”
আলিয়া কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
” এটা ভিতর থেকে আসে বন্ধু।এভাবে বলে – কয়ে হয় না।তুই নিজের মতো করে ট্রাই কর ”
” নিজে পারলে আর তোকে বলতাম।আচ্ছা রাখ ! ”

কল কেটে দুই আঙুলের সাহায্যে কপাল ডলতে লাগলো তূর্য।একটু ভেবে গুগলে ঢুকলো সে ।গুগল ছাড়া আর কোনো ওয়ে নেই।একমাত্র এবং শেষ ভরসা।
এখন সার্চ দিতে গিয়ে বাঁধলো জ্বা’লা। ‘ হাউ ক্যান আই কাম ( calm)….. ‘ আংশিক লিখে বসে আছে ।এরপর কি লিখবে গার্লফ্রেন্ড নাকি ওয়াইফ ? আহি তো তার একটাও না। ইচ্ছা করছে নিজের মাথায় একটা বাড়ি মা’রতে। ব’কা খাওয়া কাজ করে বেড়াবে আর ব’কলেই দো’ষ। এখন আবার তার ই’গোও হয়েছে। ঘটা করে রা’গ ভা’ঙানো লাগবে। ম্যাডামফুলি!

একটু ভেবে তারপর সেন্টেন্সটা কমপ্লিট করলো তূর্য।লিখলো, ‘ হাউ ক্যান আই কাম মাই লাভ’স অ্যাংগার ‘ সার্চ দিতেই কয়েকটা ভিডিও এসেছে সাথে আরো কিছু লেখা।
তূর্য বেছে বেছে সবচেয়ে অল্প সময়ের একটা ভিডিও অন করলো। দুই সেকেন্ড পার হওয়ার আগেই মোবাইল ভুট করে সামনে থাকা টেবিলটার উপর এক প্রকার ছুঁড়ে মে’রেছে সে। কিসব অ’শ্লীল ভিডিও।এসব অ্যাপ কোনো কাজের না। অযথাই ফোনের স্টোরেজ দখল করে বসে আসে।
আহি আর নিজেকে ওই প’জিশনে ভেবেই গায়ে কাঁ’টা দিয়ে উঠেছে তার।
মুহূর্তে আবার তূর্যের ঠোঁ’ট প্রসারিত হলো। ঠোঁ’টের কোনে তি’র্যক হাসির রেখা খেলে গেল। আজ না হয় কাল তাদেরও তো এমন মোমেন্ট আসবে ।তখন ঠিক কি করবে আহি?তার চোখের সামনে আহির ভীতু চেহারা ভেসে উঠেছে ।

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ২৯

যে পরিমাণে বি’চ্ছু নিশ্চয়ই পালানোর সর্বোচ্চ ট্রাই করে যাবে।কিন্তু সে কি আদেও সেই সুযোগ দিবে? নো ওয়ে!
এখন অনেক ধৈর্য ধরছে ,কিন্তু তখন নো কম্প্রোমাইজ।
সুধে – আসলে উসুল করবে সবটা।
কথাগুলো ভেবেই ঠোঁ’ট টিপে হাসলো তূর্য।

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৩০