প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪৪
ইনান হাওলাদার
টিকটিক আওয়াজে ঘড়ির কাঁটা ঘুরে চলেছে।আহি ঘুমাতে এসেছে সেই এগারোটায়।এখন বাজে সোয়া দুইটা।গভীর রাত !
ড্রিম লাইটের আলোয় ঘড়িটা ততোটাও স্পষ্ট নয়।সে একদৃষ্টিতে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আছে।দুই চোখের কোণা বেয়ে একাধারে জল গড়িয়ে পড়ছে। থেকে থেকে দুই হাতের পিঠে নোনা জলগুলো মুছছে । আবার ইচ্ছা না হলে আর সেটা করছে না।অশ্রুকণাগুলো তাদের মতো বেয়ে চলছে।দুই চোখের কাছের বালিশ সেই জলে ভিজে জবুথবু। তূর্য কত করে তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করছে ,সে নিজেই বলছে না।তাহলে কেন কাঁদছে? কথা বলাবলি হয়ে গেলে তো আর কাঁন্না-কাটি ,ক’ষ্ট – দুঃখ কিছুই রইতো না। তাহলে কথা কেন বলছে না সে? শুধু তিনটা চ’ড়ের জন্যে? তূর্য ভাই তো সেটাই ভাবছেন ,তাইনা? কিন্তু সে তো অন্য কারণে এত অভিমান করে আছে।তূর্য ভাই তো তাকে বিশ্বাসই করে না । যেখানে তার প্রতি তূর্য ভাইয়ের বিশ্বাসই নেই,তাহলে এটা আবার কেমন ভালোবাসা? হয়তো কোনো ভাবে জানতে পেরেছেন মেহেদী আর তারিনের বিয়ে হয়েছে সেইজন্যেই তার সাথে কথা বলতে চাইছেন।নাহলে তো আর বলতেন না।সেতো চেনে তূর্যকে।বরাবরের মতো সেই তাকেই সেধে গিয়ে কথা বলতে হতো।কিন্তু এইবারে কি সে এই কাজ করতো? কখনোই না!
এইযে আহি কত ভুলো মনের। কিন্তু সেদিন বিকেলে তাকে জড়িয়ে তূর্যের বলা প্রত্যেকটা কথা এখনো অন্তরে গেঁথে আছে তার।শুধু কথা নয়,কথার টোন গুলোও কানে বাজছে।মনে থাকারই তো কথা!সেইদিনই তো তূর্য ভাই প্রথম তার সাথে প্রেমসুলভ আচরণ করলেন। তারপর….তারপর আরো পনেরো দিন কেঁটে গিয়েছে। ভাবা যায়!আচ্ছা, তূর্য ভাই যদি বাড়িতে থাকতেন তাহলে সে এভাবে কথা না বলে থাকতে পারতো? তিনি তো ঠিকই বন্ধুদের সাথে ঘোরাঘুরি করে বেড়াচ্ছেন। তার কথা হয়তো মনেও পড়ছে না! ভুলবশত মনে পড়লে হাসি – মজায় হয়তো আবার ভুলে যাচ্ছেন।
আজতো ওনার আসার কথা ছিল । এতক্ষণে নিশ্চয় চলে এসেছেন। কোনো সাড়া শব্দ তো পাওয়া গেল না। গত সপ্তাহেও তো আসার কথা ছিল।কিন্তু আসলেন না ! হয়তো এই সপ্তাহেও আসবে না ! কেন আসছেন না?কি ভাবছেন তিনি?
বাড়ির বাইরে থাকার কারণে সে অস্থির হয়ে পড়বে? নিজে থেকে কল করে আসতে বলবে? জীবনেও না !
কিন্তু,এভাবেই যদি সে রাগ বেঁধে পড়ে থাকে তাহলে তো সম্পর্কটা এখানেই থেমে যাবে। তার কি একবার তূর্যের কথা শোনা উচিত? সে কি খুব বাড়াবাড়ি করে ফেলছে?হয়তো করছে !
আহির এসব নানান চিন্তা ভাবনার মধ্যে হঠাৎ খেয়াল হলো আস্তে অস্তে দরজাটা ফাঁক হচ্ছে। সে কি দরজা লক করে রাখেনি? তারপর হঠাৎ মনে পড়লো, তাহি এসেছিল তার রুমে।আলসেমিতে পরে আর লক করা হয়নি। কিন্তু এত রাতে কে আসবে! মারুফা বেগম ? সে আস্তে করে ডাক দিলো,
” কে? আম্মু?”
ইতোমধ্যে আগন্তুক দরজা ঠেলে ঢুকে পড়েছে। লম্বা ছায়া,পুরুষ মানুষের মনে হচ্ছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো আহি।নিশ্চিত তূর্য ভাই …! তাছাড়া আর বাড়ির কোন পুরুষই বা আসবে? তাহলে তিনি সত্যিই ফিরেছেন।কখন ফিরলেন? সে তো জেগেই ছিল ,বুঝতে পারলো না কেন?
তার কি ঘুমানোর নাটক করা উচিত? উচিত কি অনুচিত বুঝে ওঠার আগেই লোকটা এসে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে তার শিয়রে বসলো। আহির দুই গালে আলতো করে হাত রাখলো।কেমন বরফ হয়ে আছে হাত দুটো।ঠান্ডা হাতের স্পর্শ পেয়ে কেঁপে উঠলো সে। কেন জানি চোখ বন্ধ করেছিল ,সেটা দপ করে খুললো। তূর্য হাতে পানির স্পর্শ টের পেয়ে মলিন হেসে বলল,
” আমাকে তোর দহনে পু’ড়িয়ে মা’রছিস,ভালো কথা! নিজে কেন পু’ড়ছিস? ”
চুপ করে পড়ে রইলো আহি। গলার মধ্যে কান্নারা এসে দলা পাকিয়েছে।কখন যেন সেগুলো বেরিয়ে পড়বে।তূর্য হাত সরলো তার গাল হতে।তারপর সুইচ চেপে টেবিলে ল্যাম্প অন করলো।
বললো,
” কি থেকে কি বানিয়ে ফেলেছিস আমাকে। ভালোবাসলে যে মানুষের ইগো কোথা থেকে কোথা চলে আসে তুই আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিস।আর বোঝাস না,আহি। আমি হাঁড়ে হাঁড়ে বুঝেছি। এর থেকে বেশি বোঝাতে গেলে অবশিষ্ট ছায়টুকুও আর রইবে না ”
তূর্যের চোখে চোখ মেলাতে পারলো না আহি। কথায় আছে,
‘ অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর ‘ তার অবস্থা ঠিক তেমনই হয়েছে। বুক ফেটে যাচ্ছে তবু মুখে ‘ আ ‘ টুকু উচ্চারণ করতে পারছে না। এগুলো কি সত্যিই ঘটছে? নাকি সে স্বপ্নে দেখছে?ঠিক কতটা কষ্ট পেলে অনুভূতি লুকিয়ে রাখা মানুষটা এত কা’তর হতে পারে?
এখন যেমন নিজের মধ্যে অ’পরাধ বোধ কাজ করছে এতদিন কেন করলো না? কেন তূর্যকে সে এত কষ্ট দিলো?
সে তো বুঝেইনি তার তূর্য ভাই সত্যি সত্যি কষ্ট পাচ্ছে। সে তো ভেবেছিল সে একাই এই নিদারুণ য’ন্ত্রণায় ভুগছে ।
একটু বিরতি নিয়ে তূর্য ফের অসহায় গলায় বললো,
” আমাকে কবে বুঝবি তুই, আহি?আমি এসব কেনো করি তোর সাথে তুই বুঝিস না? মেহেদীর সাথে তোকে দেখলে আমি ঠিক থাকি না।এত করে নিজেকে কন্ট্রোল করতে চাই,তবুও পারি না। তোকে ওর পাশে দেখলে আমার স’হ্য হয় না। তুই বলেছিলি না আমি জে’লাস। তখন তো স্বীকার করিনি। এখন করছি আ’ম জে’লাস হা’র্ট – স্টিলার, আম জে’লাস ! আ’ম স্যরি ! স্যরি ফর এভরিথিং। আর কখনো তোর গায়ে হাত তুলবো না।কক্ষনো না!
নেভার এভার! স্যরি এন্ড …. এন্ড আই লাভ ইউ । লাভ ইউ ভেইরি মাচ। ”
এবার আহি সত্যিই কিছু বলতে চায়।কিন্তু পারছে না। গলা দিয়ে কেমন যেন কথা বের হচ্ছে না। কয়েকবার হা করেও মুখ বন্ধ করে নিয়েছে।তূর্য আবারো বলল,
” এখনো কথা না বলে থাকবি? স্যরি বললাম তো। ওকেই,আবারো বলছি,হাজারবার বলছি স্যরি, স্যরি, স্যরি, স্যরি, স্য…..”
আহি একপ্রকার হামলে পড়লো তূর্যের বুকের উপর। হাউ মাউ করে কেঁদে উঠলো। তূর্য ওকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো একেবারে । মলিন মুখে হাসির রেখা ফুটলো।চুলের ভাঁজে এলোপাতাড়ি ভাবে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চুমু খেল।
খানিকক্ষণ ধরে মন ভরে কেঁদে শান্ত হলো আহি। ফোঁফাতে ফোঁফাতে কি কি যেন বললো।যার কিছু তূর্য বুঝলো আর বাকিটা বুঝলো না। কাঁন্না-কাটির পালা শেষ হলেও পুরুষালি বলিষ্ঠ বুক হতে মাথা উঠলো না মেয়েটা। একপর্যায়ে তূর্য নিজ হতে ছাড়ালো তাকে। দুই হাতে মুখ আঁজলা করে ধরে মাথা উঁচু করে একটা গভীর চুমু খেল প্রেয়সীর কপালে। বরাবরের মতো লজ্জা পাওয়ার কথা ছিল আহির। কিন্তু তার মুখে লজ্জার কোনো রেখা দেখা গেল না।উল্টে ফের অভিমানী মুখ করলো। এটা যে কপট অভিমান সেটা আর বুঝতে বাকি রইলো না তূর্যের। সে মহারানীর মুখ খুলবার অপেক্ষায় । কিয়ৎক্ষণ যেতেই আহি থমথমে গলায় বলল,
” আমার রা’গ এখনো পড়েনি ”
তূর্য ঠোঁট চেপে হাসি সংবরণ করলো।এক্ষেত্রে তাকেও চতুরতার সাথে উত্তর দিতে হবে।নাহলে সারারাত পার হয়ে গেলেও মহারানীর রা’গ ভাঙবে না। এত নাটক করতে জানে মেয়েটা।তবে বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে এই নাটকিনীকেই তার অসম্ভব ভালো লাগে। ঢং আর আহি একে অপরের পরিপূরক। সেও মুখমণ্ডলে কপট গম্ভীরতা টানলো। হাসি চেপে ভারি কন্ঠে বলল,
” আমি এত মিষ্টি কথা বলে রা’গ ভাঙাতে এক্সপার্ট নই, আহি। যেটুকু বলেছি ,অনেক বলে ফেলেছি । এইটুকুতেই না হলে অন্য ট্রিকস এ্যাপ্লাই করবো।সেটা তোর জন্যে সুখকর হবে না ”
তূর্য ভাই কি তাকে থ্রে’ট দিলেন? নাকি তার অভিনয় ধরে ফেললো? তবে থেমে গেল না আহি।সে আহ্লাদী গলায় বলল,
” আর কখনো বকা দিবেন না ”
দীর্ঘশ্বাস ফেললো তূর্য। রাত কম হয়নি।আর সময় নষ্ট না করে পাগলের তালে তাল দেওয়াতেই বেটার । সে নরম কন্ঠে বলল,
” ওকেই ”
” রুডলি কথা বলবেন না ”
” ওকেই ”
” আমি ভুল করলেও কিছু বলতে পারবেন না ”
” ওকেই ”
” সত্যিই কিছু বলতে পারবেন না ”
” ওকেই ”
এ যেন আহির পূর্ব পরিকল্পিত ছিল।তূর্য ভাই যখন এসে স্যরি চাইবেন সে এই সুযোগে এক গাদা প্রতিশ্রুতি নিয়ে রাখবে। এক পর্যায়ে শেষ হলো প্রতিশ্রুতি পর্ব। কিন্তু তূর্য সমাপ্তি বুঝলো না। সে আহির মুখ পানে চেয়ে আছে ।পরবর্তী ওয়াদার অপেক্ষায়।কিন্তু আহি কোনো কথা বলছে না দেখে তূর্য আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করলো,
” তারপর?”
আহি এদিক – ওদিক না বোধক মাথা নাড়লো ।
মুখে বলল,
“আর কিছু না !”
তূর্য ভ্রু কুঁচকে বিস্ময় নিয়ে বলল,
” আর কোনো প্রমিজ করানোর নেই?মাত্র এইটুকুই ?”
” মজা করছেন তূর্য ভাই ?”
তূর্য ঠোঁটের হাসি আটকে গম্ভীর হওয়ার ভান ধরে ‘ না ‘ বোধক মাথা নাড়লো আর মুখে বলল,
” মোটেও না ! ”
তার এই হাসি চাপানো মুখ দেখে হেসে দিলো আহি।তূর্যও ঠোঁট প্রসারিত করলো।বিমুগ্ধ নয়নে প্রেয়সীর চঞ্চলা হাসি দেখতে লাগলো। কি আছে এই হাসির মধ্যে, যার জন্যে সে এই কয়দিন ছটফট করেছে? চোখের ঘুম নিভে গিয়েছে? চারিদিক রোদে শুকানো খাঁ খাঁ মরুভূমি লেগেছে ? এখন তার হৃদয়ে এক নীরব প্রশান্তির ঢেউ বয়ে যাচ্ছে। যেন যুগ যুগ পর তৃষ্ণার্ত জমিন এক ফোঁটা জলের দেখা পেয়েছে।
গত রাতে প্রায় বারোটা পর্যন্ত ছেলের জন্যে অপেক্ষা করেছেন পারভিন বেগম।শীতের রাত বারোটা মানে অনেক।আর বর্তমানে যে হাড় কাঁপানো শীত পড়ছে!কোনো রকমে খেয়ে দেয়ে কম্বলের নিচে গেলেই শান্তি।কিন্তু ছেলে আসবে ,মায়ের কি আর কোনো শীত থাকে!তিনি নাড়ির টানে অপেক্ষা করে গেছেন।ঘড়ির কাঁটা যখন বারোটা পার করেছে তখন হ’তাশ হয়ে রুমে ফিরেছেন।ভেবেছেন সেদিনের মতো আজও মনে হয় আসবে না তূর্য। তবে তার ছেলে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন কখনো ছিল না।না আসলে একবার হলেও কল করে জানিয়ে রাখতো। হয়তো জানাতে ভুলে গেছে !
আজ বেশ খানিকটা বেলা করে ঘুম থেকে উঠেছে আহি।কতদিন পর একটা শান্তির ঘুম দিলো।একটু তো দেরি হবেই। সে উঠে কোনো রকমে ফ্রেশ হয়ে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে নিচে নামছিল, মাঝ পথে তাহির সাথে দেখা।
তাহিও আহির রুমেই যাচ্ছিল ,গরম খবর দিতে।এতদিন পর ভাইয়া এসেছে , খুশির খবরটা আহি আপুকে তো জানানো দরকার।পথি মধ্যে কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিকে পেয়ে মনটা আরো খুশি হয়ে গেল।সে উৎফুল্লতার সহিত বলল,
” আপু জানো? কাল রাতে ভাইয়া এসেছে ”
আহি তাড়াহুড়ো করে বলল,
” জানি ! জানি !”
” মিথ্যা কেনো বলছো ? তুমি কিভাবে জানবে ? মাত্রই তো ঘুম থেকে উঠলে!আর ভাইয়া এসেছে অনেক অনেক রাতে ”
সম্মতি ফিরলো আহির।একটু বুঝে শুনে মুখ থেকে কথা বার করতে পারে না ।সে ফিক করে হেসে দিয়ে বলল,
” একটু মিথ্যে বলেও শান্তি নেই।ঠিকই ধরে ফেললি।আমি যে মিথ্যা বললাম কিভাবে বুঝলি রে? মুখের এক্সপ্রেশন দেখে?”
” প্রতিবার তো এক্সপ্রেশন দেখেই বুঝি।কিন্তু এইবারে খুব ভালো অভিনয় করেছ আপু ।মনে হচ্ছিলো সত্য কথা বলছো ”
” সত্যই তো বলছিলাম রে পাগলা ” বিড়বিড় করে বলল আহি। তাহি প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে চাইলো।বলল,
” কি বললে? স্পষ্ট করে বলোতো বাবা! কিচ্ছু বুঝি না ”
” আরে কিছুই বলিনি।তুই যেখানে যাচ্ছিলি যা।আমার একটা কাজ আছে ”
” আমি তো তোমার কাছেই যাচ্ছিলাম ”
” তাহলে চল ,নিচে যাই। ” বলে তাহির কাঁধে হাত রাখলো আহি। তারপর নিচে নামলো দুই বোন।সেইটুকু সময়ে আরো নানান খুচরো আলাপ করলো।
এই বাড়িতে একমাত্র তাহির সাথেই আহির জমে। সে যা বোঝায় তাহি তাই বোঝে।মুখ থেকে বে’ফাঁ’স কথা বের হয়ে গেলেও এটা-ওটা বুঝিয়ে দিতে পারে।মেয়েটাও বিশ্বাস করে নেয়।আর শান্ত-প্রান্ত বদের হাড্ডি।তার ভালো কথা গুলোকেও ঘুরিয়ে ফিরিয়ে খারাপ বানিয়ে সেটা নিয়ে ব্লা’কমেইল করে বেড়ায়। আস্ত মু’ছিবত দুইটা !
নিত্য দিনের মতো আজও ড্রয়িং রুমে হৈচৈ।বাড়ির তিন গিন্নি সকালের নাস্তা তৈরিতে ব্যস্ত। বাঙালি পরিবার হওয়ার হালকা খাবারের পাশাপাশি কিছু ভারি খাবারও থাকে।বাড়ির বড় দুই কর্তার আবার ভারি খাবার ছাড়া ক্ষুধা ম’রে না। কিন্তু আজ আর তাদের খাবারের প্রতি বেশি একটা প্রাধান্য দিচ্ছেন না পারভিন বেগম।ছেলের পছন্দের সকল খাবার রান্না হচ্ছে।যদিও এতসব আয়োজন দেখে তূর্য মা’কে একটু আধটু শা’সন করবে।এত ঠান্ডার মধ্যে এত এত খাবার তৈরির কোনো মানে হয়? কিন্তু মায়েরা কি আর সেসবের পরোয়া করে! তাদের কাজ তারা করে যায়।রুটি তৈরি করলে সেই ছোটকাল থেকে তূর্য একটার বেশি কখনো মুখে তুলে না।সেজন্যে পারভিন বেগম চালাকি করে একটা রুটি বড় করে বানান আর সেটা ছেলের প্লেটে তুলে দেন।ছোট বেলায় ছেলে তার এসব চালাকি ধরতে না পারলেও এখন পারে।সে ঠিকই মেপে ঝুপে অর্ধেকটা খেয়ে বাকিটা রেখে দেয় ।
কথাগুলো ভেবে একটু মুচকি হাসলেন পারভিন বেগম।পরমুহুর্তে বুকের মধ্যে খচ করে উঠলো আসন্ন ঝ’ড়ের কথা ভেবে।আহি আর তূর্যের বিষয়টা যখন সামনে আসবে কি হবে? তাদের এই সুখের সংসারটা কি ভেঙে যাবে? ভেঙে না যাক,এই সংসারে একটা ফাটল ধরলেও তো তিনি সহ্য করতে পারবেন না।তার কথা নাহয় বাদই গেল আকবর চৌধুরী? তিনি তো পুরোপুরি ভে’ঙে পড়বেন।
সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেও ব্যর্থ হয়েছে আহি।সে ভার্সিটি যাওয়ার আগে তূর্য ভাই ঘুম থেকে ওঠেনি।আবার ভার্সিটি থেকে এসেও একই অবস্থা।তিনি নাকি আবার ঘুমিয়েছেন। কেমন ঘুম ঘুমাচ্ছে কে জানে! মনে হচ্ছে যেন মাস খানিকের ঘুম এক সাথে সারছে।এই বাড়ির একমাত্র কুম্ভকর্ণ তো সে ,তাহলে তূর্য ভাই আবার কবে থেকে হলেন? বড় মা আবার ডাকা ডাকি করতেও নিষেধ করলেন।এতদিন বেড়াবেড়ি করে এসে তো সবাইকে একটি সময় দেওয়া উচিত। সন্ধ্যে থেকে তো আবার হসপিটালে যাওয়া শুরু করবে।এসব ভাবতে ভাবতে সে তূর্যের রুমের দিকে রওনা হলো।কথা না বলা যাক একটু দেখেই চলে আসবে সে ।
সাবধানি কদম ফেলে রুমের মধ্যে প্রবেশ করলো।সত্যিই ঘুমোচ্ছেন তিনি।সে একবার ঘুমের কায়দা দেখলো।
মানে পরিস্থিতি যেমনই হোক তার ম্যানলি হাবভাব করতেই হবে।এইযে এত ঠান্ডা , সে সোয়েটার একটার জায়গা দুইটা পরে আছে।আর এই লোক ঠিকই উদাম শরীরে উপুড় হয়ে দুই হাত কম্বলের নিচ থেকে বের করে বালিশে রেখে শুয়ে আছে।সবাই-ই তো জানে চৌধুরী বাড়ির বড় ছেলে — জনাব তাশরীক চৌধুরী তূর্য একজন সুদর্শন পুরুষ।তাহলে ঘুমের ঘোরেও সেটা প্রমাণ করতে হবে? এদিকে এমন সুঠাম দেহ দেখে যে তার লো’ভ হয় সেই খবর এই লোক রাখে?
এখন খুব করে তার একটা গান গাইতে ইচ্ছা করছে।ভয়েস তো মাশাআল্লাহ ! এই কন্ঠ নিয়ে গান গাইলে মানসম্মান যেটুকু আছে সেইটুকুও আর অবশিষ্ট রইবে না।কিন্তু তাই বলে কি সে গান গাইবে না ? অবশ্যই গাইবে! সে মনে মনে আউড়াতে আরম্ভ করলো,
” সে যে হৃদয় হ’রণ করলো কখন
কিছুই জানি না!
আমার প্রাণ যে মানে না,
কিছুই ভালো লাগে না ”
” আর কতক্ষন দাঁড়িয়ে থাকবি?”হঠাৎ ঘুম জড়ানো গভীর পুরুষালী কন্ঠে কেঁপে ওঠে আহি।এভাবে হুট করে কথা বললে তো কেঁপে ওঠার-ই কথা।এই লোকের মাথায় কি ম্যাগনেট আছে নাকি? কিভাবে যেন ঘুমের ঘোরেও সকলের উপস্থিতি বুঝতে পারে।সে উল্টে প্রশ্ন করলো,
” আপনি আর কতক্ষন ঘুমোবেন তূর্য ভাই ?”
ফের একই কায়দার কন্ঠস্বর,
” লাস্ট তিন উইকের ঘুম ঘুমোচ্ছি ।ডি’স্টার্ব করিস না ”
” ঘুমান আপনি।আমি কি মানা করছি নাকি? কথাও তো বলিনি তাহলে ডি’স্টার্ব কিভাবে করলাম?”
” কথা বলার প্রয়োজন নেই , তোর উপস্থিতিই ডি’স্টার্ব করে আমাকে ”
কি আশ্চর্য এক অবস্থা! কালকের রাতের তূর্যের সাথে এখনের তূর্যের কোনো মিল আছে? মানুষ এভাবে রূপ বদলায় কিভাবে? তার তো উচিত আবার অ’ভিমান করে পড়ে থাকা।কিন্তু এত ঘনঘন রা’গ – অ’ভিমান করলে পড়ে কত? তারপর তো আর তূর্য ভাই কোনো পাত্তা দিবেন না।ভাববেন,’ এই মেয়ে তো সব সময়ই রা’গ করে পড়ে থাকে ।ঘটা করে এত অ্যাটেনশন দেওয়ার কি আছে !’ সসম্মানে কেঁ’টে পড়াই ভালো।সে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার মধ্যেই তূর্য ডেকে ওঠে। গাঢ় কন্ঠে বললো,
” কফি করে নিয়ে আয় ”
আহি যেন আস্কারা পেল। শুকিয়ে যাওয়া চোখমুখ মুহূর্তে জ্বলজ্বল করে উঠলো।এক ছুটে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।গন্তব্য চৌধুরী বাড়ির রান্নাঘর।আহি যেতেই তূর্য ঘুরে শুলো। বালিশে কনুই ঠেকিয়ে হাতের তালুতে মাথার ভর দিলো।গম্ভীর গড়নের মুখের চিকন ওষ্ঠ জোড়া প্রসারিত হলো। দৃষ্টি ফেলল ছুটতে থাকা এলোকেশীর পানে।এভাবে চুল ছেড়ে আসার কারণ কি? গোসল করলে তো এতক্ষণে তো চুলগুলো শুকিয়ে যাওয়ার কথা।তাছাড়া ও গোসল করেছে কিনা সন্দেহ! যেখানে গরমকালে বৃষ্টির পর একটু ঠাণ্ডা আবহাওয়া হলেই গোসলের নাম নেয় না।সেখানে এই নিম্ন তাপমাত্রায় আহি যে গোসল করতে পারে সেটা সে নিজ চোখে দেখলেও বিশ্বাস করবে না।তাছাড়া দুপুরে গোসল নিয়ে মারুফা বেগম চি’ল্লাচ্ছিলেন শুয়ে শুয়ে সবটা শুনেছে সে । তাহলে চুল ছেড়ে আসার কারণ কি? তাকে স্যি’ডিউস করা?
এক্সট্রা অ্যাটেনশন পেতে চায়? তার একমাত্র অ্যাটেনশন-ই তো ওই নি’র্বোধ। তাতে সে যেভাবেই থাকুক!পা’গলের বেশে বা পরিপাটি হয়ে।কিন্তু এই ব’লদটাকে এসব কথা কে বোঝাবে!
বেশিক্ষণ সময় নিলো না আহি।কফি নিয়ে ফের ছুটতে ছুটতে আসলো।তূর্য ততক্ষণে ফ্রেশ হয়ে গায়ে গরম কাপড় জড়িয়ে নিয়েছে। আহি কফির মগ দিয়ে তার পাশে বসলো।উৎসুক হয়ে জানতে চাইলো,
” কেমন হয়েছে তূর্য ভাই ?”
” প্রতিদিন যেমন হয় !”
” আমি কি প্রতিদিন বানাই নাকি? আচ্ছা থাক ! তাহলে বলুন প্রতিদিন কেমন হয়?”
” আজকে যেমন হয়েছে !”
এই পর্যায়ে বি’রক্ত হলো আহি।বলল,
” ধুর ! আপনি শুধু কথা প্যাঁ’চান ,তূর্য ভাই ”
” অনেস্ট রিভিউ দিলে তো মুখ ফুলিয়ে বসে থাকবি।তারপর আমাকে কত মেহেনত করতে হবে কে জানে! আবার ভালোবাসা না সত্ত্বেও আই লাভ ইউ-ও বলতে হবে । ব্যাপারটা ল’জ্জাজনক !”
“থাক ! বলতে হবে না কিচ্ছু ” থমথমে গলায় কথাটা বলে উঠে যাচ্ছিলো আহি। হাত ধরে আটকালো তূর্য।হ্যাঁচকা টানে পুনরায় নিজের পাশে বসালো।এবারে কফির মগ রেখে প্রেয়সীর পানে এগিয়ে গেল সে। পিছন থেকে বাহুবদ্ধ করলো তাকে।বলিষ্ঠ দেহের মাঝে আহির ছোট্ট দেহটা ঢাকিঢাকি অবস্থা।হাসফাস করে উঠলো মেয়েটা।হুট করেই কন্ঠের পরিবর্তন ঘটলো তূর্যের।বলল,
” তুই তো চাস আমি প্রেমিকসুলোভ বিহেভ করি।তাহলে একটু কাছে এলেই এমন করিস কেন আহি ? আমার সীমা ,আমার জানা আছে ।কোনো বাড়াবাড়ি হবে না। স্টে রিল্যাক্সড !”
আহি ইতঃস্তত গলায় ডাকলো,
” তূর্য ভাই …” সে বাক্য সম্পন্ন করার আগেই ওর চুলে নাক ডুবিয়ে দিলো তূর্য। জড়ানো গলায় বলল,
” হুমমম! চুলে কি শ্যাম্পু ইউজ করিস তুই ? ”
এ প্রশ্নের উত্তর করলো না আহি।সে বলল,
” ছাড়ুন আ..মাকে ”
তূর্য নিজের কাজ বহাল রেখেই বলল,
” ছাড়বো ! আগে বল ছেড়ে দিলেই পালাবি না ? ”
সম্মতি দিলো আহি।মুখে বলল,
” আচ্ছা!”
মুহুর্তেই দূরে সরে বসলো তূর্য।আহিও নিজের কথার খেলাপ করলো না। মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ বসে থেকে বলল,
” কিছু না বললে আমি যাই । বলবেন কিছু ? ”
” হুম! ঘোর আমার দিকে ”
সভ্য মেয়ের মতো ঘুরে বসলো আহি।তূর্য কিছুক্ষণ তাকে পরখ করে মুখের উপর ঝুঁকে হিসহিসিয়ে বলল,
” আই লাভ ইউ ।”
চোখ বড় বড় করে তার দিকে অবিশ্বাস্য চাহুনি নিক্ষেপ করলো আহি।একটু বাদে তূর্য ফের বলল,
” আই লাভ ইউ ” এভাবে কিছুক্ষন পরপর বলতেই থাকলো।এদিকে আহির দুই চোয়াল ল’জ্জায় লাল হয়ে গিয়েছে। সে নতজানু দৃষ্টিতে মিইয়ে যাওয়া গলায় বলল,
” শুনেছি তো !”
ভ্রু কুঞ্চিত করলো তূর্য।সন্দিহান গলায় বলল,
” শুনেছিস? তাহলে আপনারও কিছু বলা উচিত, আই থিঙ্ক !”
প্রথমবারেই বুঝলো আহি,তূর্য কি বলতে চাইছে। সে অকপটে বলল,
” আমিও ভালোবাসি ”
ফের ভ্রু কুঁচকালো তূর্য। বলল,
” ভালোবাসিস? কাকে?”
” আপনাকে ! ”
” কেমন ভালোবাসা ? বিয়ে করতে পারবি ? ”
” হুম ”
” কখন? ”
” আপনি যখন চাইবেন ”
আহির উত্তরে ঠোঁট টিপে হাসলো তূর্য।তাকে জ্বালাতে বলল,
প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪৩
” এমন অ্যানসার করে কি বোঝাতে চাইছিস? ওয়াইফ ম্যাটেরিয়াল তুই ?”
সফল হলো সে।আহি অভিমানী গলায় বলল,
” দেখেছেন তূর্য ভাই আপনি আবার খোঁচা দিয়ে কথা বলা শুরু করেছেন।এমন করলে আমি কিন্তু বিয়ে করবো না ”
” তুই তো করবি সাথে তোর বাপও করবে ।”
