Home প্রণয় ব্যাকুলতা প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪৭ (২)

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪৭ (২)

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪৭ (২)
ইনান হাওলাদার

জীবনের প্রথম এবং খালি পেট থাকায় তুলনামূলক দ্রুত ও তী’ব্রভাবে অ্যা’লকোহলের প্রভাব পড়েছে তূর্যের উপর। প্রথম চুমুকেই বুকে জ্বা’লা ধরলেও সে থামেনি। আহির দেওয়া কষ্টের সামনে এই জ্বা’লা খুবই নগণ্য।
বহু চেষ্টা করেও তাসিন আর নাবিল থামাতে পারেনি ওকে। এখন একাধারে ব’মি করে একটু শান্ত হয়েছে। অতিরিক্ত ব’মি হওয়ার দরুন নাবিল আর তাসিন তূর্যকে ছাদে নিয়ে এসেছে।তারপর চোখ মুখে পানি ছিটিয়ে বসিয়েছে ।
ছাদের রেলিংয়ের সাথে গা এলিয়ে দিয়ে এলোমেলো ভঙ্গিতে পা ছড়িয়ে পড়ে আছে সে।চোখের পাতা বন্ধ ,থেকে থেকে চোখ – ভ্রু কুঁচকে ফেলছে।আবার কোনো কারণে,কি ভেবে মুচকি হাসছে। ইতিমধ্যে পুরো শরীর ঘামতে আরম্ভ করেছে।এলোমেলো ভাবে হাত চালিয়ে শার্টের প্রথম কয়েকটা বোতাম খুলে দিলো। জ্যাকেট আরো আগেই খুলে ফেলেছে।

হঠাৎ দপ করে চোখ খুললো সে।কয়েকবার মাথা ঝাকি দিয়ে ওঠার চেষ্টা করলো।প্রতিবারই ব্যর্থ হয়ে আবার বসে পড়লো। নাবিল – তাসিন ধরতে গেলেও বারবার ওদের হাত সরিয়ে দিচ্ছে। জড়ানো গলায় ধ’মকা-ধ’মকি করছে। আর এখন কিসব যেন বিড়বিড় করছে। নাবিল তাসিন একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছে। মাথায় পানি দিতে পারলে হয়তো পাগলামি কিছুটা কমতো।কিন্তু শীতের দিনে ঠান্ডা লেগে যাবে।
আপন মনে বিড়বিড় করতে করতে শব্দ করে হাসলো তূর্য।পরমুহুর্তে আবার গ’ম্ভীর হলো।চোখের সামনে আহির প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠেছে। এবার খুব স্বাভাবিক ভাবে উঠে পড়লো সে। তূর্য দেখতে পাচ্ছে ছাদের মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে আছে আহি। টলতে টলতে আহির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। মেয়েটার দুই বাহু ধরে ঝাঁকিয়ে অস্পষ্ট ভাষায় বলতে আরম্ভ করলো,

” এমনটা কেনো করলি? কেন সবার সামনে আমার হাতটা ধরতে পারলি না ? স্পিক আপ, জান?শুধু আমাকে না চাস,বলতি আমি দুইজনকেই চাই ! যেখানে তুই-ই আমাকে চাস না ,সেখানে আমি কাকে নিয়ে ফা’ইট করবো বল,কাকে নিয়ে? তোকে ছাড়া আমি বাকিটা জীবন কিভাবে কাটাবো , জা’ন? ম’রে যাবো আমি,একেবারে শেষ হয়ে যাব। আ’ল ডা’ই কমপ্লিটলি। খুব ক’ষ্ট হচ্ছে আমার। আই ক্যা’ন্ট টেইক দিস পে’ইন এনিমোর । আই ক্যা’ন্ট…. আই ক্যা’ন্ট… আই ক্যা……”
শেষ কথাগুলো গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিয়ে বলল সে। কথাগুলো বলতে বলতে যখন পড়ে যাচ্ছিলো।তাসিন নাবিল দৌঁড়ে এসে ধরলো ওকে। ওদের দূর্বল হাতে ধাক্কা দিলো তূর্য। মে’জাজ দেখিয়ে বলল,

” ছাড় !” তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে পুনরায় বলল,
“আহি , শোন জান…” থেমে গেল সে। চারিদিকে তাঁকিয়ে আহিকে খুঁজতে লাগলো। কোথাও নেই মেয়েটা। চোখের পলকে কোথায় চলে গেল ? গগন ফাটিয়ে চি’ৎকার করে উঠলো তূর্য ,
” আহি কোথায় গেল ? কোথায় গেলি জা’ন ? কোথায় গেলি!” বলে হাঁটু গেড়ে মেঝেতে বসে পড়লো সে।শরীর প্রচণ্ড পরিমাণে টলছে দেখে সাথে সাথে তাসিন-নাবিল এগিয়ে এসে ধরলো ওকে। পুনরায় মে’জাজ দেখিয়ে বলল,
” বারবার ধরাধরি করছিস কেন? আমি কি ড্রা’ঙ্কড হয়েছি ,স্টু’পিড?
তাসিন বলল,

” হ্যাঁ,ভাই তুই ড্র্যাং’কড হোসনি জানি।চল ,বাসায় চল এখন ”
” তোর বাসায় কেন যাবো? নন’সেন্সিক্যাল কথা বলবি না।এখন তোর বাড়িতে গেলে আহির বাপ ভাববে আমি কষ্ট পেয়েছি,ওনার মেয়ের জন্যে পথে ঘাটে মা’তলামি করছি।তাছাড়া আহিকেও তো বোঝাতে হবে ও আমার লাইফে না থাকলে আমার কিচ্ছু আসে-যায় না। ওকে বলেছিলাম, ‘ তোকে ভুলতে আমার দুই সেকেন্ডও লাগবে না।’ এখন দেখ, দুই সেকেন্ড তো দূরে থাক এক সেকেন্ডও লাগলো না।পাট নিয়ে বলল ফ্যামিলিকে চায় ,তুই থাক তোর ফ্যামিলিকে নিয়ে। আমি থাকবো তোকে নিয়ে ”
তাসিন সাঁয় দিলো তূর্যের কথায় ।বলল,

” আমরা জানি আহি না থাকলে তোর কিচ্ছু আসে যায় না।এখন চল ভাই ”
তাসিনের কথায় খি’টখিটে মে’জাজে নাবিল বলে উঠলো,
” এই বা’ড়া এখন ওরে বুঝাইয়া কাজ হইবো ? জোর কইরা নিয়া চল।কত রাত হইছে হুশ আছে। আমি আন্টিরে কইয়া দিতাছি ও
আমাগো লগে থাকবো ”
ওদের ধাক্কা দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো তূর্য। পা এখনো টলছে।কিছুক্ষণ ঝিম মে’রে থেকে বলল,
” এত ড্রিংক করার পরেও নে’শা ধরছে না কেন? হোয়াই?
পানি মিক্সড করে দিয়েছে মেইবি। ”
ব্যস! তারপর ঢলে পড়লো তাসিনের কাঁধে। তাসিন হিমসিম খেয়ে সামলালো তূর্যকে। নাবিল ওকে নাড়াচাড়া দিয়ে বুঝলো জ্ঞান হারিয়েছে। এতে যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো দুইজনে। খুব সাবধানে নিচে নামলো।ইমারজেন্সি ক্যাব বুক করে ওকে নিয়ে গেল তাসিনের ফ্ল্যাটের উদ্দেশ্যে।

বাড়িতে ফিরে যেন মস্ত বড় পাপ করেছে মেহেদী। উঠতে-বসতে বাবার খোঁ”চা দেওয়া কথা শুনতে শুনতে হাঁপিয়ে উঠেছে। কটা খাবার খেতে গিয়েও শান্তি নেই। ভাত খেয়ে হজম করবে কি ? কথা গিলেই হজম করতে পারে না। অথচ এই বাড়িতে তার সাপোর্টে কথা বলার মতো কেউ নেই। নাজমা বেগম একটু বলেন ,তাও পেরে উঠেন না। আর তারিন? স্বামীর পক্ষ না নিয়ে মুচকি মুচকি হাসে। মুখ দেখেই বোঝা যায় ব্যাপারটাতে ভীষণ মজা পাচ্ছে সে। কত বড় ফাজিল মেয়ে। তখন মনে চায় দাঁত গুলো ভেঙে দিতে। বেয়াদব কোথাকার !
এইযে সে রা’গ করে খাবার রেখে উঠে চলে আসলো তারিনের কি উচিত ছিল না তাকে আটকানো ? যদিও সে পেট পুরে খেয়েই রা’গ দেখিয়েছে,তবুও !
এখন থমথমে মুখে খাটের হেড বোর্ডে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে মেহেদী।আর তারিন ড্রেসিং টেবিলের সামনে টুল পেতে বসে মুখে কিসব প্রসাধনী মাখছে আর গুনগুন করে গান গাইছে। মনে প্রচুর সুখ। যেটা দেখে প্রচণ্ড পরিমাণে রা’গ হচ্ছে মেহেদীর। সে থমথমে কন্ঠে বলল,

” আমি ঘুমাবো ”
তারিন একবার পিছন ঘুরে তাকে দেখলো।তারপর সাবলীল গলায় বলল,
” ঘুমান ! ”
” লাইট অফ করো ”
” কাজ সেরে করছি ” বলে পুনরায় নিজের কাজে মন দিলো তারিন। মেহেদী গম্ভীর গলায় বলল,
” দ্রুত সারো ”
” একটু সময় লাগবে।এগুলো তুলবো তারপর ” তারিন
কথাটা বলার সাথে সাথে বিছানা থেকে উঠলো মেহেদী। ওয়্যারড্রবের উপরে থাকা টিস্যু বক্স হতে কয়েকটা টিস্যু বের করে নিয়েই তারিনের সারা মুখ ডলতে আরম্ভ করলো। তারিন চেঁ’চামেচি করতে করতে ওকে ঠেকানোর চেষ্টা করলো।কিন্তু ব্যর্থ হলো। মেহেদী,তারিনের মুখে থাকা প্রলেপ সমস্তটুকু তুলে ক্ষা’ন্ত হলো। মুখে বলল,

” তোলা শেষ ! এবার ঘুমাও ”
তারিন মেহেদীকে ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করে বলল,
” দূরে সরুন, মেহেদী ”
মেহেদী এতক্ষণে নিজেদের মধ্যের দূরত্ব খেয়াল করলো। সে দূরে সরার পরিবর্তে তারিনের কোমর ধরে হ্যাঁচকা টানে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে চোখে চোখ রাখলো।ভ্রু নাচিয়ে বলল,
” যদি না সরি ? ”
তারিন ওর বাঁধনের থেকে ছোটার পায়তারা করলো।মোচড়া মুচড়ি করতে করতে বলল,
” আজব! কি করছেন মেহেদী! ”
মেহেদীর চোখে-মুখে এখন আর কোনো গম্ভীরতা নেই।শুধু দুষ্টুমি! সে তারিনকে আরেকটু শক্ত করে ধরে ফিসফিস করে বলল,

” দুইবার ! ”
তারিন কপট মে’জাজ দেখিয়ে ধমকে উঠে বলল,
” মেহেদী ! ”
মেহেদী ফের একই কায়দায় বলল,
” তিনবার ! ”
” কি দুইবার, তিনবার করছেন ? ”
” এইযে আমার নাম নিলে। আই মিন, শুধু নামটা-ই ! আগে পরে কিছু নেই ”
নিজের নড়াচড়া শিথিল করলো তারিন।থতমত করতে করতে বলল,
” কি চাইছেন আপনি? মেহেদী ভাইয়া বলবো ? ”
” আগে তো সেটাই বলতে ”
মেহেদী সেই তখন থেকে মুগ্ধ নয়নে দেখছে তারিনকে।এবার তারিন চোখে চোখ মেলালো।গম্ভীর গলায় বললো,
” আগে আর এখনের মধ্যে অনেকটা তফাৎ ”
ভ্রু কুচকালো মেহেদী।প্রশ্ন বিদ্ধ নয়নে তাকিয়ে বলল,
” কই ? আমি তো তেমন কিছু দেখছি না। ”
মেহেদীর এরকম হঠাৎ কাছে আসা সহ্য করতে পারলো না মেয়েটা।হাসফাস করতে করতে বলল,

” আপনি দূরে সরে কথা বলুন ।অনুরোধ করছি ”
” কিন্তু আমি যে শুনছি না । ” বলে একটু থামলো মেহেদী তারপর একটু ভাবুক হয়ে বলল,
” আচ্ছা তারিন? আমাদের মধ্যে কিছুতো একটা হওয়া উচিত । বলো? উচিত না ? ”
” আপনি ছাড়ুন প্লিজ ”
” উচিত কিনা বলুন প্লিজ ” তারিনকে ব্যঙ্গ করে বলল মেহেদী।
মেয়েটা ফের অ’নুরোধ করলো,
” প্লিজ ছাড়ুন ”
নিজেদের মধ্যের সবটুকু দূরত্ব ঘোচালো মেহেদী।তারিনের কানের মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললো,
” প্লিজ বলুন ”
তারিন এই অস্বস্তিকর পরিবেশ থেকে বাঁচতে চোখ খিঁচে একনাগাড়ে বলতে আরম্ভ করলো,
” উচিত ! উচিত ! এবার ছাড়ুন ”
বলেই যেন ফেঁসে গেল সে। অপর প্রান্তের লোকটাকে আরো সুযোগ করে দিলো।মেহেদী বলল,

” তাহলে তো উচিত কাজ ফেলে রাখা অনুচিত । তাইনা ? ”
” মেহেদী ? ” আ’র্তনাদ করে উঠলো তারিন।
” জ্বি,মেহেদীর ওয়াইফি ” হাস্কি স্বরে বলল মেহেদী।
” বাড়াবাড়ি করছেন ”
” উহু ! এখন করবো ”
বলে তারিনকে নিয়ে পায়ে পায়ে হাঁটতে হাঁটতে বিছানার কাছে গেল মেহেদী। ওকেসহ অস্তে আস্তে বালিশে মাথা দিলো । গলায় মুখ গুজে ফিসফিস করে বলল,

” অনুমতি…….! ”
তারিন কোনো উত্তর করলো না।এখনো সরে যাওয়ার পায়তারা করছে। মেহেদী পুনরায় বলল,
” দিলে দেও না দিলে নাই।নিজের হক নিজেই আদায় করে নিবো”
বলে একটানে বুকের উপর থেকে ওড়না সরালো সে। তারিন তো সেই কখন অনুভূতির জোয়ারে ভেসেছে।এখন শুধু কোনরকমে মুখ ফুটে আউড়ালো,
” প্লিজ লাইট….” কথাটা সম্পন্ন করতে পারলো না।কেমন যেন কন্ঠ রোধ হয়ে আসছে। মুখ উঠালো মেহেদী । তারিনের বদ্ধ চোখ চোখ রেখে জিজ্ঞেস করলো ,
” হুঁ? লাইট …. তারপর? বলো!”
” লাইট অফ করুন , প্লিজ ”
” তো? আলটিমেটলি পারমিশন পেয়েই গেলাম তাহলে। ”
বলে মুহূর্তের মধ্যে আলো নিভিয়ে পুনরায় নিজের অবস্থানে ফিরলো মেহেদী। তারিনের লজ্জায় রাঙা মুখ দেখে মুচকি হাসলো। রক্তিম হয়ে থাকা দুই গালে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চুম্বন এঁকে আস্তে আস্তে অবাধ্য করলো নিজেকে।তারিন যতটুকু কল্পনা করেছিল তার থেকে বেশি।অনেকটা বেশি ! তবুও ছেলেটার সকল অবাধ্যতা মেনে নিলো। পূর্ণতা পেল এক বৈধ সম্পর্কের।

গ্লাস সরিয়ে দুই হাতে জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে আহি।দৃষ্টি শূন্যে ! চোখের পলকে জীবনটা কেমন এলো মেলো হয়ে গেল।আগের সেই চঞ্চলতা এখন আর আহির মধ্যে দেখা যায় না।সারাদিন রুম বন্ধী হয়ে পড়ে থাকে। মন চাইলে নিচে গিয়ে সবার সাথে খায় ,নাহয় মারুফা বেগম খাবার রুমে দিয়ে যান।
সেদিন দুপুরের পর আজ এক মাস পার হয়ে গিয়েছে। এই ত্রিশ দিন তার কাছে ত্রিশ যুগের মতো ঠেকেছে। চোখের নিচে ডার্ক সার্কেল।ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া না করার দরুন শরীরের হাড় বেরিয়ে গেছে। এর মধ্যে আবার দুই দিন হাসপাতালেও কাটিয়ে এসেছে। ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া না করায় অতিরিক্ত দুর্বলতার দরুন স্যালাইন নিতে হয়েছিল। টানা একটি দিন অবচেতন অবস্থায় ছিল। তবে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে , তাকে দেখতে একটা বারের জন্যে তূর্য হাসপাতালে যায়নি। তার হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন ছিল আহি।তবুও একটি বারের জন্যে পায়ে হেঁটে কেবিন পর্যন্ত যায়নি। যদিও তূর্য তার খোঁজ খবর নিবে,দেখতে যাবে,তার অসুস্থতায় কাতর হয়ে পড়বে সেই আশা এখন আর করে না আহি।কিন্তু একটাবার বাড়ির অন্য যেকোনো সদস্যের কাছে তো অসুস্থতায় খবর নিতে পারতেন । কিন্তু সেটা তিনি করলেন না।

না করাটাই স্বাভাবিক। তার বলা একটা কথার জন্যেই তো এতকিছু। সেদিন যদি সে ফ্যামিলিকে না বেছে নিয়ে তূর্যকে নিতো।তাহলে হয়তো এমন দিন দেখতে হতো না।কিন্তু একটা মেয়ের পক্ষে কি সেটা করা আদেও পসিবল ? ভাবতে ভাবতে দুই চোখ বেয়ে একাধারে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে মেয়েটার। আর চোখের জল মুছে পারছে না সে।এত কান্নার পরেও চোখের পানি কেন ফুরায় না ?

তূর্য ভাই নাকি প্রথম কয়েকদিন খুব বেপরোয়া আচরণ করেছে। শুনেছে দুইদিন ড্রিংক করেও নাকি বাড়ি ফিরেছে।নে’শার ঘোরে আব্বু আর বড় আব্বুর সাথে খারাপ ব্যবহার করেছেন।কিন্তু এখন নাকি খুব স্বাভাবিক হয়ে গেছেন।ঠিক আগের মতো ! তাহলে সে কেনো স্বাভাবিক হতে পারছে না ? তূর্য তাকে মাত্র এতটুকু ভালোবেসেছিল ? হয়তো ! নাকি তার উপর অভিমান থেকে এগুলো করছে ? কিচ্ছু মাথায় আসছে না তার । কিচ্ছু না ! চোখ – মুখ খিঁচে দুই হাতে মাথার চুল টেনে ধরলো। কিছুক্ষণ বাদে নিজেকে শান্ত করে ঢকঢক করে এক গ্লাস পানি পান করলো। ব্যস্ত হাতে চোখ মুখ মুছে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালালো। আয়নার সামনে গিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করলো।জোর করে মুখে হাসি ফুটালো ঠিকই ,কিন্তু চোখ বেয়ে আপনা আপনি নোনাজল গড়িয়ে পড়তে লাগলো।সেগুলো দুই হাতে আটকালো মেয়েটা। ভাগ্য কেন এত অসহায় হলো তার? কত জায়গা-ই তো চাচাতো ভাই-বোনের বিয়ে হচ্ছে।তারা সংসার করছে।তাহলে তারা কেনো সংসার করতে পারবে না ? কেনো ?সে নিজের ভাগ্যের প্রতি যখন হাজারটা অভিযোগ দিতে ব্যস্ত তখন দরজা ঠেলে মারুফা বেগম প্রবেশ করলেন।নরম কন্ঠে বললেন,

” নাস্তা কোথায় করবি ? এখানে নিয়ে আসবো ? ”
” না ! আমি নিচে আসছি ”
” আয় তাহলে ” বলে চলে যাচ্ছিলেন মারুফা বেগম।কিন্তু পারলেন না। আহি দৌঁড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে দিল। মারুফা বেগমেরও বুকের মধ্যে হুহু করে উঠলো।একটা জ্বলজ্যান্ত হাসি খুশি মেয়েকে কোন মা এভাবে চোখের সামনে শেষ হয়ে যেতে দেখতে পারে ? মারুফা বেগম এখন খুব করে চান তার মেয়েটা আবার আগের মত চঞ্চল হয়ে যাক।তিনি উঠতে বসতে ব’কাবকি করবেন।কখনো কখনো দুই ঘা লাগিয়ে দিবেন।সেটাই খুব ভালো।উপরওয়ালা তার আধ পাগলা ,বোকা সোকা মেয়েটাকে ফিরিয়ে দিক।
” আমি ঠিকই আব্বুর চোখ দেখে বুঝে ফেললাম উনি কি চান।তাহলে আব্বু কেন বুঝলো না আম্মু ? ”
মায়ের বুকে মুখ গুঁজে ফোঁফাতে ফোঁফাতে বলল আহি। মারুফা বেগম মেয়েকে সান্ত্বনা দিলেন,
” সব ঠিক হয়ে যাবে মা। এভাবে কান্না করিস না। আম্মু ,আব্বুকে বুঝিয়ে বলবে।ঠিক আছে ? ”
” কিছু ঠিক নেই আম্মু। এভাবে দিন পার করতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।বুকের মধ্যে জ্ব’লে পু’ড়ে যাচ্ছে। তোমরা কেন দেখতে পাচ্ছো না? তূর্য ভাইকে একটু বলো না আমার সাথে কথা বলতে । উনি কেন আমার সাথে কথা বলেন না, আম্মু? ” বলে মাকে ছেড়ে চোখের পানি মুছলো আহি।
কান্না গিলে নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল,

” আচ্ছা কথা বলা লাগবে না । একটু দেখা দিতে বলো । সেদিন দুপুরের পর আমি আর ওনাকে দেখিনি । তূর্য ভাই আমার কথা জিজ্ঞেস করে না আম্মু? কেন করে না ? আমি অনেক অপরাধ করে ফেলেছি তাই না ? আমার ভুল আমি শুধরে নেবো । একটু দেখা দিতে বলোনা” বলতে বলতে আবারো খতখত করে কান্না করে দিলো মেয়েটা।
মারুফা বেগম মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। এসব আর তিনি চোখে দেখতে পারছেন না। মেয়ের সাথে নিজেও কান্না করে দিলেন তিনি। আহি পুনরায় বলল,
” আম্মু ? বড় মা কেন আমার সাথে কথা বলে না ? আমি তো ওনার সাথে কিছু করিনি। ছেলের জন্যে এমন করছে,তাইনা? তাহলে বড় মা যে বলতেন আমি ওনার মেয়ে ? সেটার কি হলো ? ”
মারুফা বেগম ভেজা গলায় বললেন,

” চোখের পানি মুছে নিচে চল মা।খেতে হবে না ? চলো ”
” আমি যাবো না।তুমি বরং খাবার গুলো এখানে নিয়ে এসো আম্মু” মন ম’রা হয়ে বলল আহি।
” একটু আগেই না বললে যাবে ? এখন আবার কি হলো ?চলো মা।সবার সাথে খেলে ভালো লাগবে ”
চোখ জ্বলজ্বল করে উঠলো আহির। উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
” সবাই আছে? তূর্য ভাইও আছে আম্মু ? ”
” হ্যাঁ ,আছে ” বলে মেয়ের চোখের পানি মুছিয়ে দিলেন তিনি।
” তাহলে চলো। ” বলে উৎফুল্লতার সহিত মায়ের হাত ধরে নিয়ে গেল আহি। হাসি ফুটলো মারুফা বেগমের মুখে।ডাক্তার বারবার করে বলেছেন মেয়েকে একা একা থাকতে না দিতে।স্বাভাবিক করার চেষ্টা করতে।নাহলে ওর যেসব লক্ষণ ,এসব চাপ সামাল দিতে না পারলে সময়ের সাথে সাথে মানসিক রোগীতে পরিণত হতে পারে।
ডাইনিংয়ে এসে পুনরায় মন খারাপ হলো আহির। বাড়ির সবাই সেখানে উপস্থিত।কিন্তু তূর্য নেই।তাহলে মারুফা বেগম যে বললেন তূর্য আছে? চোখ ছলছল করে উঠলো তার। আহিকে দেখে সবাই মুখে হাসি ফুটালো। আকবর চৌধুরী নিজের পাশের চেয়ার দেখিয়ে বললেন,

” তুমি এখানে বসো মামনি।”
আহি মুখে জোর পূর্বক হাসি এটে চাচার পাশে গিয়ে বসলো।তিনি আহির সামনে থাকা প্লেট উল্টে তাতে নিজ হতে ভাত তুলে দিতে দিতে বললেন,
” ভার্সিটি যেতে হবে না ? পরীক্ষা শুরু হয়ে গেলে তো ফেইল করবে। তখন ল’জ্জা লাগবে না ? ”
” কয়দিন পর থেকে যাবো বড় আব্বু ”
টুকিটাকি আরো অনেক কথা বললেন আকবর চৌধুরী।সাথে বাকিরাও নানান কথা বললো ,প্রশ্ন করলো আহিকে।সে চুপচাপ নিরিবিলি সকলের প্রশ্নের উত্তর দিলো।
কয়েক মিনিট বাদে হাতের ঘড়ি ঠিক করতে করতে নিচে নামলো তূর্য।পরনে ফরমাল পোশাক।হাসপালে যাবে হয়তো।হাতের ঘড়ির দিকে পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে চেয়ার টেনে বসলো। মাকে ডাকলো কিছু বলার উদ্দেশ্যে,

” আম্মু…..”
বাকি কথাটা মুখে আটকে নিলো।সম্মুখ দিকে তাঁকাতেই অনাকাঙ্ক্ষিত কারো অশ্রুসিক্ত নয়নের সাথে মিলন ঘটলো।এক মুহূর্তের জন্যে দৃষ্টি স্থির করলো সে। তারপর দ্রুত নজর ঘোরালো। চোখে – মুখে ক্ষো’ভ উপচে পড়ছে। মায়ের উদ্দেশ্যে কন্ঠ গ’ম্ভীর করে বলল,
” আমার খাবার রুমে পাঠিয়ে দেও ”
বলে আর এক সেকেন্ড সময় ব্যয় করলো না সে। বড়বড় পায়ে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে গেল।আহি ছলছল নয়নে সব দৃশ্যটুকু দেখলো।সে বুঝলো তাকে দেখে উঠে গেল তূর্য। কতটা ঘৃ’ণিত কাজ করেছে সে।আবারো বুক ফেঁ’টে কান্না আসছে মেয়েটার।কিন্তু কান্নাটুকু খাবারের লোকমার সাথে গিলে ফেললো। আস্তে আস্তে খাবার চিবোতে লাগলো। একে একে সবাই খাবার টেবিল থেকে উঠে গেলেও আহির প্লেট ভর্তি এখনো খাবার। সে খাবারগুলো শুধু নাড়াচাড়াই করছে। এক পর্যায়ে খাবার রেখে সেও উঠে গেল।হাত ধুয়ে পারভিন বেগমের কাছে গেল ।অ’পরাধ মিশ্রিত কন্ঠে ডাক দিলো,

” বড়মা ”
পারভিন বেগম কোনো সাড়া দিলেন না। আহি পুনরায় ডাকলো,
” বড়মা ”
এবারেও একই অবস্থা। তিনি হাতের কাজ করতে ব্যস্ত। আহি জড়িয়ে ধরলো ওনাকে।কান্না করতে করতে বলল,
” আপনিও এমন কেনো করছেন বড়মা? আমি স্যরি । একটু কথা বলুন না আমার সাথে।” পারভিন বেগম কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। আহি পুনরায় অভিমানী গলায় বলল,
” আপনারা সবাই খারাপ, বড়মা ”
” হ্যাঁ! আমরা সবাই খারাপ।তুই আর তোর বাজান ভালো।এখন ,ছাড় আমাকে”
চোখের পানি আটকে গম্ভীর গলায় বললেন পারভীন বেগম।
আহি অধিকার দেখিয়ে গো ধরে বলল,

” ছাড়বো না ”
বরাবরই নরম মনের মানুষ পারভিন বেগম।আহির এতটুকু কথাতেই গলে জল হয়ে গেলেন তিনি।পাহাড় সমান অভিমান মুহুর্তেই সমতল ভূমিতে পরিণত হলো।এইযে উনি মেয়েটার উপর অভিমান করেছিলেন তাতে কি ?সেই সবসময় মেয়েটার খেয়াল তিনিই রেখেছেন।সময় মতো খাবার দেওয়া ,ওষুধ দেওয়া সবকিছু তিনিই টাইমলি মারুফা বেগমকে মনে করিয়ে দিয়েছেন।

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪৭

” এখানে এত অধিকার না দেখিয়ে যেখানে দেখাতে হবে সেখানে গিয়ে দেখা ” গম্ভীর গলায় বললেন পারভিন বেগম।
এক মুহূর্তের জন্যে কথাটার মানে বুঝলো না আহি।পরমুহুর্তে বুঝে মুখ কাচুমাচু করে ফেললো। সে কিভাবে ওই ব্যক্তির সামনে দাঁড়াবে? কোন মুখ নিয়ে কথা বলবে? কিভাবে নিজের অ’পরাধ স্বীকার করবে ?

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪৮