প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৫৯ (২)
ইনান হাওলাদার
চৌধুরী নিবাস যতটুকু এরিয়ার মধ্যে রয়েছে তার সবটুকু নিয়েই সাজানো হয়েছে।একদম রাজকীয় ভাবে।ধরণীতে আধার নামার দরুন ফেইরি লাইটের আলোয় পুরো বাড়ি ঝলমল করছে।পথযাত্রীরা আসতে-যেতে বারবার তাঁকাচ্ছেন বাড়ির দিকে।কেউ তো আবার যতক্ষণ না বাড়িটি দৃষ্টির আঁড়াল হচ্ছে ততক্ষণ তাঁকিয়ে থাকছেন। চৌধুরীদের বাগানটা হলুদের থিমে সাজানো হয়েছে। সেখানে থাকা একটা গাছও রেহায় পায়নি ,তাদেরও সাজানো হয়েছে। বাগানের মাঝখানে পাতা হয়েছে একটি সুন্দর মঞ্চ।পেছনে থাকা ফ্রেমে সাজানো গাঁদা আর বেলি ফুলের ঝালর – যার মাঝখানে হাতে আঁকা নকশায় লেখা — ‘তূর্যাহির হলুদ সন্ধ্যা’
লেখাটাকে পিছনে নিয়ে বসে আছে তূর্য-আহি।এখানেও পাশাপাশি দুটো রাজকীয় আসন।তাদের সামনে নানান ভাবে ডেকোটের করা বিভিন্ন প্রকারের খাবারের আইটেম সারিবদ্ধ করে রাখা। অথিতিরা আসছেন ,সেগুলো থেকে একটু করে দুজনের মুখে তুলে দিচ্ছেন তারপর ওদের সাথে ছবি তুলে পুনরায় জায়গায় গিয়ে বসছেন।
আহির পরনে জলপাই সবুজ রঙের শাড়ি, যার উপর সূক্ষ্ম কারুকাজ । স্টেজ লাইটের আলোয় সেগুলো চিকচিক করছে। শাড়ির পাড়ে গাঢ় রঙের নকশা–কালো, লাল আর সোনালির মিশেলে তৈরি জটিল ডিজাইন।হাতভর্তি সোনালি চুড়ি ।সাথে মানান সই সাজ।
অন্যদিকে তূর্যের পোশাক একদম বিপরীত। আহির সাজ যতটা ভারি ওর ঠিক ততটাই হালকা।একদম মার্জিত পোশাক। সে পরেছে সাদা রঙের পাঞ্জাবি, যার উপর একটি নেহরু জ্যাকেট। জ্যাকেটটির রঙ আহির শাড়ির সঙ্গে সুন্দরভাবে মিল রেখে সাজানো।
দুইজনে পাশাপাশি বসে থাকলেও তূর্য মাত্র একবার দেখেছে আহিকে–যখন মঞ্চে উঠছিল।কিন্তু সেই একবারেই কত সময় কেঁটে গেছে ওর জানা নেই। নাবিল-তাসিনসহ আরো কয়েকজনের অট্টহাসিতে ধ্যান ভাঙে ওর। দ্বিতীয়বার আর তাঁকায়নি। যদিও মনটা আকুপাকু করছে পাশে তাঁকানোর জন্যে।তবে সে সাহস করে উঠতে পারছে না।
এদিকে সে না তাঁকালেও আহি যে বারবার ওকে চোরা চোখে দেখছে বুঝতে পারছে ও। নিজের দিকে মেয়েটার বারবার তাঁকানোর কারণ খুঁজে পায় না ও। সে তো আর ওর মতো করে সাজেনি তাহলে বারবার দেখার কী কারণ!
এভাবে পার হলো কিছু সময়।এক পর্যায়ে তূর্যের মনে হলো আহি এখন আর ওর দিকে তাঁকাচ্ছে না । কারণ খুঁজতে লাগলো সে।স্টু’পিডটা কি রা’গ করলো?কেন? যদিও রাগ করার যথেষ্ট কারণ আছে ।এতক্ষণ ধরে মেয়েটা বারবার তাঁকিয়েছে তার দিকে অথচ সে একবারও দেখলো না ওকে।অভিমান করাটা যুক্তিযুক্ত।কিন্তু ওর যে তাঁকানোর কোনো সাহস নেই।হৃদয়ে করুণ অবস্থা নেমে আসবে–যা এই মুহূর্তে চাইছে না সে।
তূর্য গলা খাঁখারি দিয়ে নিজের দিকে মনোযোগ আনার চেষ্টা করলো প্রেয়সীর। কাজ হলো না দেখে নিজেই পাশ ঘুরল।না..! মুখে কোনো রাগ বা অভিমানের ছাপ নেই।বরংচ মুগ্ধ চাহুনি।স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো ও।পরমুহূর্তে আবার ভ্রু কুঁচকাল।মনে প্রশ্ন জাগলো ,এরকম মুগ্ধ চোখে কি দেখছে ও? অতঃপর আহির দৃষ্টি বরাবর তাঁকালো । এতে ভ্রু জোড়া আরো কুঁচকে গেল ওর। একটা ছেলে একটা মেয়েকে মেহেদী পরিয়ে দিচ্ছে। সবার থেকে অনেকটা দূরে বসে আছে তারা।
নবদম্পতি ওরা।চৌধুরীদের পাশের বিল্ডিংয়ে থাকে। কিছুদিন আগে ভালোবেসে বিয়ে করে ছেলে-মেয়ে দুটো। আহির এভাবে মুগ্ধ হওয়া দেখে চোয়াল ঝুলে পড়ল তূর্যের। বিকেলের ঘটনা মনে পড়লো,
আহি মেহেদী পরে হাত-পা মেলিয়ে ড্রয়িং রুমে বসে ছিল।তূর্য তখন বাইরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে নিচে নামছে।সেটা দেখে আহি ডাক দিলো ওকে,
” তূর্য ভাই?”
এতক্ষণ ধরে মেয়েটা ওর জন্যে অপেক্ষা করছিল হয়তো।তূর্য ব্যস্ত কন্ঠে বলল,
” হুম বল ”
আহি কিছু বলল না।লাজুক হাসলো।তূর্য বুঝলো ওর মনের কথা। মৃদু হেসে বসলো ওর পাশে।দুই হাত ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে বললো,
” ডিজাইন যেমন-তেমন বাট তূর্যের বউয়ের হাতে যাওয়ার পর বেস্ট হয়ে গিয়েছে আই থিঙ্ক। উফফ… হবু বউ ” ফিসফিস করে বলল ও।লজ্জায় আহির মুখ লাল হয়ে উঠলো।নিঃশব্দে চোখ নামিয়ে নিলো। তূর্য হাতে একটু ফাঁকা জায়গা লক্ষ্য করলো। কৌতূহল নিয়ে পুনরায় বলল,
” এখানে ফাঁকা রেখেছিস কেন? ”
” আপনার নাম লিখবো বলে ” বলে তূর্যের দিকে তাঁকালো আহি।
” তো এখনো লিখিস কেন? মেয়েগুলো তো চলে গিয়েছে মেইবি ”
” আপনি লিখে দিবেন ” ধীর কন্ঠে বলল আহি।তূর্য চিন্তিত হলো।মেহেদী ধরে কিভাবে সেটাই জানে না সে।আর কিছু লেখা তো বিলাসিতা।ও বুঝিয়ে বলল আহিকে,
” এগুলো আমি পারি না। তুই কাউকে দিয়ে লিখিয়ে নে।আলিয়া আছে ,পিংকি আছে, তোর ফ্রেন্ড আছে। ”
তূর্যের মুখে এমন কথা শুনে মুখ গোমড়া হয়ে গেল মেয়েটার। তূর্য নরম কন্ঠে পুনরায় বলল,
” দেখ,আমি দিলে এখন তোর সুন্দর হাতটা নষ্ট হয়ে যাবে।ওদের দিয়ে লিখে নিস ওকেই ? আসি , হ্যাঁ?”
বলে ওদিক-ওদিক তাঁকালো সে।চারপাশটা ভালো করে পরখ করে নিলো একবার।সবাই যার-যার কাজে ব্যস্ত ।ও দ্রুত আহির হাত দুটি নিজের দুই হাতের মুঠোয় নিলো।তারপর ওর আধ শুকনো মেহেদীওয়ালা হাতের পিঠে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ালো।পরপর দুই হাতে। অতঃপর প্রেয়সীর নাকের ডগায় জমে থাকা ঘাম মুছিয়ে বেরিয়ে গেল।
নাবিল-তাসিনের কাপল ডান্স শেষে হাত তালি দেওয়ার শব্দে ধ্যান ভাঙলো তূর্যের।বেরিয়ে আসলো ভাবনা থেকে। মাথা চাড়া দেওয়া কথাগুলোকে ঝেড়ে ফেলে গম্ভীর মুখে আস্তে করে বলল,
” ওদের অত কি দেখছিস ?”
আহির মনোযোগ ক্ষুণ্ন হলো। তূর্যের কি বলেছে বুঝেনি ও।তবে কিছু একটা বলেছে বুঝতে পেরে চট করে পাশ ফিরলো ।অন্যমনস্কতায় আউড়ালো,
” উউ? ”
তূর্য দ্বিতীয়বার প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করলো,
” ওদের অত কি দেখছিস ?”
আহি চোখ মুখ ঝকঝকে করে বলল,
” দেখেছেন নাহিন ভাইয়া ভাবিকে কি সুন্দর মেহেদী পরিয়ে দিচ্ছে ”
তূর্য পুনরায় ওদের দিকে তাঁকালো।কিছু একটা দেখার আপ্রাণ চেষ্টা করে বলল,
” চোখের পাওয়ার তো মাশাআল্লাহ!এখানে বসে তিন মাইল দূরে কে ,কেমন, কি লাগাচ্ছে দেখে নিচ্ছিস।আর রেটিংও দিচ্ছিস! ”
তূর্য বুঝে শুনেই বলল এই কথা। এত দূর থেকে দূর্বিন ছাড়া আহি কেন? অন্য কারো পক্ষেও ডিজাইন বুঝা সম্ভব নয়।তার কথায় আহি একটু বিরক্ত হলো বোধ হয়।কিন্তু সেটাকে এক পাশে রেখে বলতে আরম্ভ করলো,
” ডিজাইন কেমন হলো সেটা ফ্যাক্ট না তূর্য ভাই।নাহিন ভাইয়া চেষ্টা করছেন এটাই অনেক।দুজনেই মুখের হাসি দেখেছেন? কি মিষ্টি লাগছে। ” বলে মিষ্টি হাসলো সে।তারপর পুনরায় বলতে আরম্ভ করলো।এবারে কিছুটা অভিজ্ঞদের ন্যায়।
“দেখেন সবাই নাচ-গান নিয়ে কত ব্যস্ত।কিন্তু ওরা ঠিকই নিজেদের শান্তি খুঁজে নিয়েছে।বাইরের জগতের দিকে কোনো খেয়াল নেই ওদের।নিজেদের মোমেন্ট ইনজয় করছে।
এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুহূর্তগুলো অনেক স্পেশাল হয় তূর্য ভাই। ”
তূর্য বুঝলো না ঘুরে ফিরে ওকেই খোঁটা দিলো কিনা! এসব জ্ঞান কি ওর নেই? নাকি বুঝে না? এখন ওগুলো সে না পারলে কি করবে..!
” খুব রোমান্টিক এগুলো। ফি’জিক্যাল টা’চই শুধু রোমান্টিকতা নয় ,বুঝলেন ?”
” মন মতো জাস্ট একটা চু’মু খেয়েছি।তাতেই খোঁটা দিচ্ছিস?” বলে কপট গম্ভীরতার নাটক করলো তূর্য।
” আপনি থামবেন তূর্য ভাই?” বোধহয় ধ’মকালো আহি।আর তূর্য ও ভ’য় পেল কি? বলল,
” ওকেই থামলাম বাট এসব কয়দিন ধরে মুখস্ত করলি?”
” কোন সব?” বুঝতে পারলো না আহি।
” এতক্ষণ ধরে যা যা বললি ”
অসহ্য রকমের বিরক্ত লাগলো মেয়েটার।এসব কথা মুখস্ত করতে হয়? সে কি এতটাই অবুঝ নাকি যে এসব বিষয় বুঝবে না।মুখ ফুলিয়ে রাখলো ও।এ কথায় কোনো উত্তর দিতে চায় না সে।চুপ করে বসে রইলো।
তিন চৌধুরী দূর থেকে দাঁড়িয়ে ছেলে-মেয়েদের হাসি-মজা-আনন্দ দেখছেন।কি সুন্দর মানিয়েছে ছেলে-মেয়ে দুটোকে।মনে মনে মাশাআল্লাহ বলতে ভুললেন না তারা।
একটু আগেই একবার তূর্যের সাথে চোখ&চোখি হয়েছে আকবর চৌধুরীর।দুইজনেই সৌজন্যমূলক হেসেছেন।এখন তিন ভাইয়ে মিলে নানান বিষয়ে আলোচনা-সমালোচনা করছেন। যতই গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন না কেন ওনারা তিন ভাই এক জায়গা হলে খুনসুঁটি করতে ভুলেন না। ছোট বেলার অভ্যাস এখনো পর্যন্ত অব্যাহত আছে। ইতিমধ্যে তারা দুষ্টুমিতে মেতেও উঠেছেন। আসিফ চৌধুরী কপট মন খারাপের নাটক করে বললেন,
” হাহ..! তোমরা বেশি আপন হয়ে গেলে ভাইজান।বেয়াই হয়ে গেলে।”
” সেভাবে দেখতে গেলে আমরা তিন জনেই তিন জনের বেয়াই ” বলে হাসলেন আকবর চৌধুরী। আসলাম চৌধুরী বললেন,
” না না ! তোমাদের ভুল হচ্ছে আমরা এখনো বেয়াই হলাম কই? আগে বিয়েটা হোক … ”
” আগে বিয়েটা হোক মানে? তোর কি নতুন কোনো কারসাজি করার প্ল্যান আছে নাকিরে?” ভাইয়ের মুখ থেকে কথা টেনে নিয়ে বললেন আকবর চৌধুরী।
অতীতের করা কান্ড নিয়ে খুবই অনুতপ্ত আসলাম চৌধুরী।আর সেই কথাটাই বারবার টেনে আনেন তিনি।যদিও মজা করে বলেন ।কিন্তু আসলাম চৌধুরী সহজভাবে নিতে পারেন না।তিনি থমথমে গলায় বললেন,
” আর কত লজ্জা দিবে ভাইজান?”
” যতদিন বেঁচে আছি ” বলে চায়ের কাপে চুমুক দিলেন আকবর চৌধুরী। আসিফ চৌধুরী দুটো ছেলেকে ডেকে বললেন এদিকে তিনটা চেয়ার দিতে।তারপর বড় ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বললেন,
” তূর্য একদম বড় ভাইজানের স্বভাব পেয়েছে।”
” তোর ভাজতার মতো ওরকম চটাং-চটাং কথা কোনো কালেই আমি বলতাম না ” বিরোধিতা করলেন তিনি।আসলাম চৌধুরী বললেন,
” আমার জামাই নিয়ে সমালোচনা কম করো তোমরা ”
ওনাদের কথার মাঝে আকবর চৌধুরী আবার স্টেজের দিকে তাঁকালেন।পুনরায় চোখ-চোখি হলো তূর্যের সাথে।এবারে সাথে সাথে চোখ সরিয়ে নিলেন তিনি। সন্দিহান গলায় ভাইয়েদের উদ্দেশ্যে বললেন,
” ওই ছেলে বারবার এদিকে তাঁকাচ্ছে কেন?”
” হয়তো লজ্জা পাচ্ছে ”
” ঐ ছেলের আবার লজ্জা !” ছোট ভাইয়ের কথার প্রেক্ষিতে বিদ্রুপ করে বললেন আকবর চৌধুরী।
” কি করেছে ও ?” আসলাম চৌধুরী প্রশ্ন করলেন।
” ওসব আর বলতে চাইছি না। বেঁচে থাকলে দেখতে পাবি ”
বলে তিনি কল্পনায় ডুব দিলেন ___
তূর্য আর আহির বিষয়টা বাড়ির সবাই জানার সপ্তাহ খানেক আগেই আকবর চৌধুরীর কানে দেন পারভীন বেগম। তিনি সবটা জেনে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি। শুধু একদিন তূর্যকে ডেকেছিলেন। শান্ত কন্ঠে বলেছিলেন,
” তোমার মা সবটা বললো। দেখো,নিজেদের মধ্যে বিবাহের সম্পর্কে না জড়ানোই উত্তম।”
” আচ্ছা ”
তূর্যের এমন উত্তরে খুশি হয়েছিলেন তিনি।ভাবতে পেরেছিলেন না ছেলেটা এত সহজে সবটা মেনে নিবে।খুশিতে বাকবাকুম হয়ে বলেছিলেন,
” তাহলে তুমি মেনে নিচ্ছ আমার কথা? ”
” না ” ছেলের ভাবলেশহিন কণ্ঠস্বরে মুখে আধার নেমে আসে ওনার।প্রশ্ন করলেন,
” তাহলে আচ্ছা বললে কেন ? ”
সে কথার কোনো উত্তর তিনি পেলেন না। ছেলে সাবলীল গলায় বলেছিল,
” আম্মু যখন বলেছে আই থিঙ্ক সবটাই বলেছে। তারপরেও এসব বলে কি ফায়দা !”
আশ্চর্য হয়েছিলেন তিনি।মাথায় উল্টো-পাল্টা কথা ঘুরপাক খেতে লাগলো।
” সবকিছু বলেছে মানে? ” উত্তেজিত হয়ে কথাটা বলে আবার নিজেকে শান্ত করলেন তিনি।পুনরায় বললেন,
” তোমাদের বিয়েতে আমার যে আপত্তি আছে এমন না। কিন্তু সবার মতামত থাকবে এমনটাও তো না। এসব কথা জানাজানি হলো অশান্তি বাড়তে পারে। তাই মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলাই ভালো।”
” ওকে ” ছেলের কথায় আবারো খুশি হলেন তিনি। চোখ মুখ চকচকে করে বললেন,
” ঝেড়ে ফেলছো তাহলে?”
” না ” ফের সাবলীল কন্ঠ তূর্যের।তিনি এবার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললেন।বললেন,
” রোবটের মতো উত্তর দিয়ে যাচ্ছ কেন? কি পেয়েছ মেয়েটার মধ্যে? আর মেয়েটাই কি বুঝে তোমার মতো ঘাউরার জ্বালে ফাঁসল আল্লাহ মালুম ”
” সেটাই! আল্লাহ মালুম !” বাবার তালে তাল দিলো তূর্য।
নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত রাখলেন আকবর চৌধুরী।বললেন,
” চোখের সামনে তো আর আমাদের মেয়েটাকে তোমার মতো ছেলের হাতে দিয়ে দিতে পারি না।আহি মামনি তোমার থেকে ভালো ছেলে ডিজার্ভ করে ।তোমাকে নাহয় কষ্ট করে হলেও ওর মতো একটা মেয়ে খুঁজে বিয়ে দিয়ে দিবো। ”
” বাট আমার ওকেই লাগবে ”
” কেন কি আছে ওর মধ্যে?” তেঁতে উঠে বলেছিলেন তিনি।
” নেই,থাকবে ইন ফিউচার। ”
” কথা বুঝিয়ে বলো।হেঁয়ালি করবে না আমার সামনে ”
” আপনার ভবিষ্যৎ খেলার সাথী ইনশাআল্লাহ ”
তূর্য কি বলতে চাইছে সেটা বোঝার আর বাকি রইলো না আকবর চৌধুরীর।তিনি খ্যাঁক করে উঠলেন,
” নি’র্লজ্জ ছেলে । কোথায় কী বলতে হয় সেই আদবটুকু নেই।বাবা হই তোমার। যাও এখন ”
” আই হোপ বিয়ের ব্যবস্থাটা খুব শীঘ্রই করবেন।আমার জন্যে না হলেও নিজের জন্যে। ” যেতে যেতে বলে গেল সে।
কল্পনা থেকে বেরোলেন আকবর চৌধুরী।ঐযে প্রথম ওনার সামনে নি’র্লজ্জতার পরিচয় দিলো তূর্য।তারপর থেকেই এটা-ওটা বলেই আসছে।
আহি এখনো থমথমে মুখ করে বসে আছে।তূর্য মেহেদী লাগিয়ে দেয়নি বলে ওর কোনো দুঃখ নেই।দুঃখ হলো ও একটা সিরিয়াস কথা বললে তূর্য ভাই মানেন না। একটু আগের কথা গুলো তার অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে বলেছিল।কিন্তু লোকটা কীভাবে বলে দিলো এটা নাকি ওর মুখস্থ কথা।আসলে মানুষ যেমন সে সবাইকে তেমন ভাবে।তাছাড়া, সে মেনেই নিলো তূর্যের কথা। মুখস্ত করে হলেও তো বলেছে ! ওই লোক তো জীবনেও কিছু বলেনি। মুখস্ত করেও না। পেশাটাই তো মানুষের হৃদয় নিয়ে কাঁ’টা ছেঁড়া করা।এসব ভালোবাসাময় কথা জানবেই বা কোত্থেকে।বেকার বেকার এত কিছু আশা করা।
তূর্য ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো ওকে।যেমন মুখ করে রেখেছে তার বাবা দেখলে নিশ্চয় ভাববে এই মেয়েকে ও জোর করে বিয়ের জন্যে রাজি করিয়েছে। পারলে বিয়েটা ভেঙে দিবেন মহাশয়।
তূর্য নিজের হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
” হাত দে ”
” কেন ? ” প্রশ্নটা করেই তূর্যের হাতের দিকে নজর গেল ওর। মেহেদী ধরে বসে আছে লোকটা। এখানে তো কোনো মেহেদী-টেহেদী ছিল না। তাহলে কোথায় পেল ওটা? একটু আগে শান্তকে ডাকতে শুনেছিল।ওকে দিয়ে আনালো তবে? আহির নানান প্রশ্নের মাঝে তূর্য নিজেই ওর হাত টেনে নিলো।হাত কেন টানছে বুঝতে বাকি রইলো না আহির । ও বাঁধ সেধে বলল,
” কত মানুষ তূর্য ভাই ”
” তাতে আমার কি? ” বলে কাজে লেগে পড়লো সে।তূর্য বুঝে পায় না এর কান্ড-কারখানা। একটু আগেও মন খারাপ করছিল।আর এখন যেই ওর মনের ইচ্ছা পূরণ করতে এসেছে ‘ কত মানুষ তূর্য ভাই ‘ মানুষ দিয়ে ও কি করবে?
আহি হাবলার মতো তাঁকিয়ে রইলো। তূর্য মেহেদীর সাথে কিছুক্ষণের যু’দ্ধ শেষে মুখে ‘ চ ‘ সূচক শব্দ করে বলল,
” স্টুপিড মেহেদী ! বের হচ্ছে না কেন? ” বিরক্তিতে ভরপুর দৃষ্টি ওর।
আহি মেহেদীটা হাতে নিয়ে দেখলো পিন-ই খোলেনি লোকটা।শব্দ করে হেসে উঠলো ও।পিন বের করে তূর্যের হাতে দিলো মেহেদীটা ।আর হাসি অব্যহত রেখে বলল,
” এবার নিন ”
তূর্য চোখ রাঙিয়ে বলল,
” একদম হাসবি না।এসব বুঝি নাকি আমি।আশ্চর্য !”
আহিও সাথে সাথে মুখে হাত দিয়ে হাসি আটকে ফেললো। অতঃপর দীর্ঘ একটা যাত্রা শেষে শুধু ‘ T ‘ শব্দটা লিখতে পারলো। এই একটা অক্ষর লিখতে পুরো দশ মিনিট পার করিয়ে দিয়েছে। অবশ্য লাগারই কথা। এই কাজে একেবারে অপারগ সে। কিন্তু অক্ষরটা খুব স্টাইলিশ এবং সুন্দর করে লিখেছে। ছোট থেকে অভ্যাস ওর — যেটা পারবে না করবে না, কিন্তু একবার করলে সেটা নিখুঁত ভাবেই করবে।সে ক্লান্ত মুখ নিয়ে বলল,
” আর হচ্ছে না জা’ন ”
সাথে সাথে চারিপাশ দিয়ে হৈহৈ করে তার শেষ বলা কথাটা প্রতিধ্বনিত হলো,
” জাআআআআআন ” টেনে টেনে বলল তাসিন আর নাবিল। তূর্য চমকে উঠে ওদের দিকে তাঁকালো। প্রচন্ড রকমের বিরক্ত হলো।গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
” সব জায়গা আড়ি পাতা লাগবে তোদের ?”
” তুমি খোলা ময়দানে বলতে পারবে আর আমরা শুনলেই দোষ বন্ধু?” তারপর আবার তূর্যকে ব্যঙ্গ করলো তাসিন,
” আর হচ্ছে না জা’ন!কেন জা’ন?এইটুকুতেই টা’য়ার্ড হলে হবে জা’ন?”
ওদের ডাবল মিনিং কথা শুনে চোখ রাঙিয়ে তাঁকালো তূর্য।দাঁত পি’ষে চাপা কন্ঠে বলল,
” ই’ডিয়ট , আহি পাশে । বুঝে-শুনে কথা বল ”
নাবিল আহির দিকে তাঁকিয়ে বলল,
” তুমি কিছু শুনছ আহি?”
আহি দ্রুত দুই পাশে মাথা নেড়ে বলল ,
” না না..ভাইয়া! কিচ্ছু শুনতে পাইনি আমি।”
মেয়েটা যে ডাহা মিথ্যা কথা বলছে ওরা সবাই বুঝলেও মেনে নিলো।বলল,
“এদিকে কান দিও না ।তুমি নাচ দেখো কেমন ? ”
আহি কি করবে বুঝে না পেরে ঘাড় কাত করে দ্রুত সাঁয় জানালো তাসিনের কথায়।
নাবিল তূর্যের কাঁধে হাত রেখে বলল,
” বা’ড়া শুধু জা’ন কইলে হইবো ? বলবি.. ” তারপর সেকেন্ড খানিকের মধ্যে গেয়ে উঠলো,
‘ জা’ন,ও বে’ইবি … সোনার ময়না পাখি
কবে তুমি হবে আমার আসিবে বুকে ।
হায় !!! ‘
গানের সাথে সাথে নানান অঙ্গভঙ্গি করলো সে। তূর্য শুধু চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে রইলো ওদের দিকে। তাসিন বলল,
” ভাই কি সুন্দর গান গাইলো নাবিল তুই একটু রেসপন্স করবি না ? ”
” অফকোর্স ” দাঁত চেপে কথাটা বলে নাবিলের পেট বরাবর কনুইয়ের গুতো দিলো তূর্য।সেটা দেখে তাসিন এক দৌঁড়ে জায়গা ত্যাগ করলো।এই মুহূর্তে সে ভাল্লুকের গল্পের সেই গাছে ওঠা বন্ধুটার রোল প্লে করলো সে।তার মস্তিষ্কে তখন মাত্র একটা কথাই চলছিল ‘ জীবন বাঁচানো ফরজ ‘
এদিকে নাবিল পেট চেপে কুঁজো হয়ে আছে।যতটা না ব্য’থা পেয়েছে তার থেকে চার গুণ বেশি ঢং করছে।তূর্য শাশালো ওকে,
” যাবি? নাকি আরেকটা খাবি ?”
সে নাটকীয় ভাবে কা’তরাতে কা’তরাতে বলল,
” বা’ড়া সময় মতো বাসর করতে পারবি না তুই ।অ’ভিশাপ দিলাম। ” বলে আর এক সেকেন্ড সময় নষ্ট করলো না ও।সোজা হয়ে দৌঁড় লাগালো। দেরি করলে আরেক ঘা বসিয়ে দিতে পারে তার প্রাণের বন্ধু।
তূর্য আহির দিকে তাঁকিয়ে থমথমে গলায় বলল,
” অ’ভিশাপটা আবার সাকসেসফুল করে দিস না ”
প্রায় অর্ধেক রাত শেষে শোয়ার প্রস্তুতি নিলো সবাই। সবার অবস্থা এমন ‘ যেখানে রাত সেখানে কাঁত।’ যে যেখানে সুযোগ পেয়েছে শুয়ে পড়েছে। একটু পিঠ রাখার জায়গা পেলেই হচ্ছে। শুধু পিংকি আর তারিনের জন্যে আলাদা ব্যবস্থা করা হয়েছে।দুজনেই অসুস্থ।ওরা আহির কাছে আছে।সাথে আলিয়াও।
তূর্য রুমে ফিরে আগে ওয়াশরুমে গিয়েছিল । হাত মুখ ধুয়ে বের হওয়ার পর কপালে ভাঁজ পড়লো। নাবিল আর তাসিন বিছানা দখল করে আছে। শোয়ার কোনো দিক-দিশা নেই। পূর্ব দিকে মাথা রেখেছে তো এক পা উত্তরে আরেক পা দক্ষিণে। এমনি সময়ে তূর্য এলাও না করলেও এখন কিছু বলল না। শোবার জায়গার সংকট বুঝতে পারলো। সে নিরিবিলি হেঁটে কাবার্ডের কাছে গেল।টিশার্ট বের করতে করতে বলল,
” ঠিক হয়ে শো ”
দুইজনের লাফ দিয়ে উঠলো।চোখ বন্ধ করে তূর্যের অপেক্ষাই করছিল ওরা।
” শো মানে? কোনো শোয়া-শুয়ি নেই ভাই।মাস্তি হবে মাস্তি ”
তাসিনের কথায় বি’রক্ত তূর্য আরো বিরক্ত হলো। গায়ে টিশার্ট জড়ানো রেখে বলল,
” তোরা টায়ার্ড হোস না? ”
” ভাই অনেক দিন পর তোর বডি দেখলাম ” তাসিন এমন ভাব করলো যেন কি না কি দেখে ফেলেছে।এমন ভাব যেন চোখ জোড়া বেরিয়ে আসবে কোটর হতে। নাবিল মধ্যম আওয়াজে বিড়বিড় করে বলল,
” কোত্থেকে বাড়ার গ্যে ধরে বন্ধু বানিয়েছিলাম ”
ওর কথা কান অবধি পৌঁছালো তাসিনের।নাবিলের দিকে চোখ রাঙিয়ে তাঁকালো ও। সে প্রসঙ্গ পাল্টানোর চেষ্টায় কথাটা বলল।আর এই মদন স’মকামী বানিয়ে দিল?ও খ্যাঁক করে উঠে বলল,
” এই ব’লদ শা’লা থাম তুই ”
তূর্য ওদের কথার মাঝে বা হাত ঠেললো । রুমের বাইরে ইশারা করে বলল,
” বাইরে গিয়ে তামাশা কর তোরা। যা ”
ভদ্র বাচ্চার মতো দুজনেই থেমে গেল। তারপর উপরে-উপরে হাত দিয়ে বিছানা ঠিক করার নাটক করতে লাগলো।তারপর বালিশ ঠিক করে তাসিন বলল,
” আয় ভাই শুয়ে পড় ”
তূর্য ডিভানে বসে পায়ের জুতা খুলতে খুলতে বলল,
” আমি এখানে ঘুমোচ্ছি।তোরা চুপচাপ শুয়ে পড় ”
তারপর ঘাড়ের নিচে একটা কুশন দিয়ে শুয়ে পড়লো ও। চোখের উপর বাম হাত রেখে বলল,
” লাইট অফ কর ফাস্ট ”
” এক সাথে ঘুমাই আই প্লিজ ”
তাসিনের অনুরোধে বলা কথা মন গলাতে পারলো না তূর্যের। ও উল্টে প্রশ্ন করলো,
” বেড শেয়ার করি আমি?”
নাবিল তাসিনকে সান্ত্বনা দিলো,
” থাক বা’ড়া,কাঁন্দিস না।ওই বা’ড়া জীবনেও পাশে ঘুমাইতে নিছে? বউ লইয়া কালকে কেমনে ঘুমাস দেখমুনে ”
নাবিলের কথায় সাঁয় দিলো তাসিন,
” হ্যাঁ,ঠিক ! কালকে বউ পাশে নিয়ে কীভাবে ঘুমাবি ? ”
” ঘুমাবো না ” নির্লিপ্ত কণ্ঠস্বর তূর্যের ।
” কালকে না হয় লীলাখেলা দেখাইলা । পরে কেমনে ঘুমাইবা চান্দু ?নাকি প্রত্যেকদিন…… ” নাবিলের কথা সম্পূর্ণ করতে দিলো না তূর্য। অসভ্যের হাঁটি! রেগে বলল,
” ঘুমাবো না মিনস পাশে নিয়ে ঘুমাবো না ”
” তাহলে কোথায় নিবি? ” কৌতূহলী কণ্ঠস্বর তাসিনের।
” নাবিলের কাছে শোন ” এবারে শান্ত কন্ঠস্বর তূর্যের।নাবিল অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছে বললো,
” বুকে লইয়া ঘুমাবি তুই? ” দুই হাত মাথায় উঠে গেল ওর। তাসিনের দিকে তাঁকিয়ে বলল,
” বা’ড়া কি কইলো অয়। আমাদের পাশে নিতাছে না আর আহিকে বুকে নিবো ”
এতক্ষণ ধরে চোখের উপর হাত রেখে কথা বললেও এবারে হাত নামালো তূর্য। ওদের দিকে তাঁকিয়ে দাঁত পিষে বলল,
” কেন? তোরা বউ হোস আমার ? ”
এদিকে তাসিন যেন অবুঝ বাচ্চা হয়ে আছে। হা করা মুখ এখনো বন্ধ করেনি ও।এবারে সেই মুখটাকে নাড়িয়ে-চাড়িয়ে বলল,
” ভাই তুই কীভাবে বুঝলি তূর্য বউ বুকে নিয়ে ঘুমাবে? ওহ,বুঝেছি…মানে তুই তোর বউ নিয়ে যেভাবে ঘুমাস তূর্যও সেভাবে ঘুমাবে এইটা মিন করলো ও? ” তারপর নাখ মুখ কুঁচকে ফের বলল,
” আর তুই পিংকিকে বুকে নিয়ে ঘুমাস? কেমনে ভাই? ফ্রেন্ড হতো তোর।লজ্জা লাগে না ? ছিহহ!”
” বা’ড়ার নাটক করস?এমন ভাব যেন কিচ্ছু বুঝস না ।দুই দিন পর ওর বাচ্চা বাপ হবো আমি। আর উনি বুকে নেওয়ার খবর লইয়া আইছে। এর লাইগা তুই সিঙ্গেলই ম’রবি। ”
প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৫৯
” তোরটা তাও মেনে নিলাম ভাই।কিন্তু তূর্য কেমনে বুকে নিয়ে ঘুমাবে?ওর তো বোন হয় ” তাসিনের মুখ থেকে এই কথাটা শোনার অপেক্ষা করছিল তূর্য।কিন্তু তাসিন বলল না। না বলে জা’নে বেঁচে গিয়েছে ছেলেটা আজকে।বললে ওর আজ কি অবস্থা করত তূর্য নিজেও জানে না।
